সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী : আসামী পক্ষের সাক্ষী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী : আসামী পক্ষের সাক্ষী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২৯ জুলাই, ২০১৩

বিচারপতি শামীম হাসনাইন বিষয়ক রিভিউ আবেদন খারিজ// রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থন চলছে

২৯/৭/২০১৩
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে হাইকোর্টে কর্মরত  বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে সাক্ষী হিসেবে হাজিরের জন্য সময় চেয়ে দায়ের করা রিভিউ আবেদন খারিজ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুাল-১। আজ  সকালে এ আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় দিনের মত রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয় ।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য  পাঁচজন সাক্ষীর তালিকা জমা দেয়া হয়েছিল আসামী পক্ষ থেকে।  সাক্ষীর তালিকায় হাইকোর্টের কর্মরত বিচারপতি শামীম হাসনাইন এর  নাম ছিল। বিচারপতি শামীম হাসনাইন ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী ছিলেন। সে জন্য অনুমতি চেয়ে তিনি গত ২২ জুলাই প্রধান বিচারপতি বরাবর একটি চিঠি লিখেন।  এদিকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুীর পক্ষে চতুর্থ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়ে যায় গত ২৪ জুলাই। এদিন আসামী পক্ষের পঞ্চম সাক্ষীও হাজিরের জন্য ধার্য্য ছিল। কিন্তু আসামী পক্ষ পঞ্চম সাক্ষী হাজির করতে পারেনি কারণ বিচারপতি শামীম হাসনাইন তখনো প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে কোন জবাব পাননি তার ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়া বিষয়ে। ফলে ২৪ জুলাই  আসামী পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহন বন্ধ করে দিয়ে মামলার যুক্তি উপস্থাপন করার জন্য ২৮ জুলাই তারিখ নির্ধারন করে ট্রাইব্যুনাল। এদিন অর্থাৎ ২৪ জুলাই  আসামী পক্ষ থেকে আবেদন দিয়ে বলা হয় পঞ্চম সাক্ষী হাজিরের জন্য তাদের আরো সময় দেয়া হোক এবং যুক্তি উপস্থান মুলতবি রাখা হোক পরবর্তী সাক্ষী হাজির না করা পর্যন্ত।  ট্রাইব্যুনাল এ আবেদন খারিজ করে দেন।

এরপর গত ২৮ জুলাই যুক্তি উপস্থাপনের দিন আসামী পক্ষ থেকে আবারো আবেদন দাখিল করে বলা হয় তাদের পক্ষে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে হাজিরের জন্য সময় দেয়া হোক এবং যুক্তি উপস্থাপন মুলতবি রাখা হোক। এসময় তারা বিচারপতি শামীম হাসনাইন কর্তৃক প্রধান বিচারপতি বরাবর অনুমতি চেয়ে লিখিত চিঠিও দাখিল করে ট্রাইব্যুনালে।  রিভিউ আবেদন বিষয়ে পরের দিন  জানানো হবে উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল  রাষ্ট্রপক্ষকে যুক্তি উপস্থানের নির্দেশ দেন । আজ সোমবার রিভিউ আবেদনটি খারিজ করে দেয়া হয়েছে।
এর ফলে আসামী পক্ষের সাক্ষী হাজিরের সুযোগ  বন্ধ হয়ে গেল।

রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন চলছে : রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সুলতান মাহমুদ সিমন আজ দ্বিতীয় দিনের মত যুক্তি উপস্থাপন করেন। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৩ টি অভিযোগের মধ্যে আজ তিনি তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ অভিযোগ পর্যন্ত  যুক্তি পেশ করেন। তৃতীয় অভিযোগ নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যাকান্ড, চতুর্থ অভিযোগ জগৎমল্লপাড়া হত্যাকান্ড, পঞ্চম অভিযোগ সুলতানপুর, বনিকপাড়া হত্যাকান্ড এবং ষষ্ঠ অভিযোগ ৬৯ পাড়া গনহত্যা বিষয়ে যুক্তি পেশ করে সুলতান মাহমুদ সিমন বলেন এ অভিযোগগুলো সন্দেহাততীভাবে প্রমানিত হয়েছে। এসব হত্যাকান্ডের সময় আসামী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। নূতন চন্দ্র সিংহকে তিনি নিজে গুলি করেছেন। সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং অন্যান্য ডকুমেন্ট থেকে তা প্রমানিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এসব অভিযোগ বিষয়ে ১৯৭২ সালে দায়ের করা তিনটি মামলার রেফারেন্স দিয়ে তিনি বলেন, এসব মামলার আসামীর তালিকায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নাম রয়েছে।




বিচারপতি শামীম হাসনাইন এর চিঠি


২৮/৭/২০১৩
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক পাঁচজন সাক্ষীর সংখ্যা নির্ধারন  করে দেয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী আসামী পক্ষ থেকে পাঁচজন সাক্ষীর তালিকা জমা দেয়। সাক্ষীর তালিকায় হাইকোর্টের কর্মরত বিচারপতি শামীম হাসনাইন এর  নাম ছিল। বিচারপতি শামীম হাসনাইন ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী ছিলেন। সে জন্য অনুমতি চেয়ে তিনি গত ২২ জুলাই প্রধান বিচারপতি বরাবর একটি চিঠি লিখেন তিনি। তবে সে চিঠির কোন জবাব তিনি পাননি। এদিকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুীর পক্ষে চতুর্থ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়ে যায় ২৪ জুলাই। এদিন পঞ্চম সাক্ষীও হাজিরের জন্য ধার্য্য ছিল। কিন্তু আসামী পক্ষ পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে এদিন হাজির করতে ব্যর্থ হয় । তখন ট্রাইব্যুনাল আসামী পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ পর্ব বন্ধ ঘোষনা করে মামলার যুক্তি উপস্থাপনের তারিখ ধার্য্য করেন ২৮ জুলাই। আসামী পক্ষ থেকে আবেদন দাখিল করে বলা হয় পঞ্চম সাক্ষী হাজিরের জন্য তাদের আরো সময় দেয়া হোক এবং মামলার যুক্তি উপস্থানের যে তারিখ ধার্য্য করা হয়েছে তা মুলতবি রাখা হোক। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল  এ আবেদন খারিজ করে দেয়।
এরপর আজ  রোববার ২৮ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষের  যুক্তি উপস্থানের দিন আসে। আসামী পক্ষ থেকে  ট্রাইব্যুনালে আবারো একটি আবেদন দিয়ে বলা হয় পঞ্চম সাক্ষী বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে হাজির না করা পর্যন্ত যুক্তি উপস্থাপন মুলতবি রাখা হোক। ট্রাইব্যুনাল এ আবেদন বিষয়ে আগামীকাল  সিদ্ধান্ত হবে মর্মে  উল্লেখ করে রাষ্ট্রপক্ষকে যুক্তি উপস্থাপনের নির্দেশ দেন।


বিচারপতি শামীম হাসনাইনের চিঠি :
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বরাবর ইংরেজিতে পাঠানো চিঠিতে বিচারপতি শামীম হাসনাইন লিখেছেন, “আমি জানতে পেরেছি যে, সালাহউদ্দিন চৌধুরী মামলায় আমার নাম আসামী পক্ষের সাক্ষীর তালিকায় রাখা হয়েছে আসামী পক্ষ থেকে। আসামী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী লাহোরের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কাসমেট ছিলেন। আমার ধারণা সে কারনে হয়ত তিনি তার পক্ষে আমাকে সাক্ষী মেনেছেন। এটা সত্য ঘটনা যে, ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করেছেন। আমার সহকর্মীরা আমাকে জানিয়েছেন যে, হাইকোর্টের একজন কর্মরত বিচারপতি হিসেবে যেকোন কোর্টে সাক্ষী হিসেবে হাজির হতে আমার বারন রয়েছে।
একদিকে আমার অফিসিয়াল বাধ্যবাধকতা/আচরনবিধি এবং অন্যদিকে আমার বিবেক-এ দুই অবস্থার মধ্যে আমি ঘুরপাক খাচ্ছি। কাজেই আমার সাক্ষ্যদান বিষয়ে যদি কোন বাঁধা থাকে তবে সে বিষযে বিবেচনার জন্য আপনার সহযোগিতা কামনা করছি। ”

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০১৩

কাইউম রেজা চৌধুরীর জেরা


সাবেক প্রধান বিচারপতি মাঈনুর রেজা চৌধুরীর ছোট ভাই কাইউম রেজা চৌধুরী সাক্ষ্য দিয়েছেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে। গত ১৬ জুলাই তিনি জবানবন্দী প্রদানের পর জেরা শুরু হয়। সামান্য কিছু প্রশ্ন করার পর জেরা মুলতবি করা হয়। ২১/৭/২০১৩ তার জেরা সমাপ্ত হয়।


জেরা ঃ-
১৬/৭/২০১৩
আমি জমিদার বংশের ছেলে। অদ্য আমি সুস্থ শরীরে ট্রাইব্যুনলে জবানবন্দী করেছি। ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রিকেট খেলা চলাকালীন সময়ে এ্যাসেমব্লি স্থগিত করায় খেলা পন্ড হয়ে যায় ‘‘কথাগুলো সত্য নয়”। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী আমার আপন খালাতো ভাই। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এর পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব কখনো বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাকে সমর্থন করেছিলেন কি না তাহা আমার জানা নাই (চলবে)


২১-০৭-২০১৩ইং পুনরায় জেরা শুরু ঃ-
আমি ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ডিগ্রী লাভ করি। ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন চত্বরে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল কিনা তাহা আমি জানি না। কারণ আমি সেদিন ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলার মাঠে ছিলাম। ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ তারিখে ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান বনাম ইংল্যান্ড ক্রিকেট খেলা চলাকালীন দুপুরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষনা করলে খেলা পন্ড হয়েছিল। ২রা মার্চ ১৯৭১ তারিখে ঢাকা স্টেডিয়ামে কোন ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠিত হয় নাই, ইহা সত্য নহে। আমি গার্মেন্টস বাইং হাউজের সংগে জড়িত আছি। আমার ব্যবসা সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং আয়কর সম্পর্কিত কাগজপত্র অদ্য আমি ট্রাইব্যুনালে আনি নাই, প্রয়োজন হলে দেখাতে পারব। ১৯৪৭ সালের আগে আমার পিতা মুসলিম লীগের রাজনীতি করতেন এবং মুসলিম লীগ থেকে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ এ্যাসেমব্লীর সদস্য হয়েছিলেন, ইহা সত্য নহে। আমার যেহেতু জন্ম হয় নাই সেহেতু, আমি বলতে পারব না যে, কত সালে আমার বাবা মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। আমার পিতা পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আমার পিতা এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব এবং সালমান এফ রহমান সাহেবের পিতা একই সাথে একই দল থেকে পাকিস্তান আন্দোলনের সংগে যুক্ত ছিলেন কিনা তাহা আমার জানা নাই। খেলাধুলার কারণে শেখ কামালের সংগে আমার সুসম্পর্ক ছিল তাহা অসত্য, ইহা সত্য নহে। ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব কনভেনশন মুসলি লীগের সভাপতি এবং প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, পরবর্তীতে স্পীকার, প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খানের পরে তিনি কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন কিনা তাহা আমি জানি না। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান, তার সরকার ও দল বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কট্টর বিরোধী ছিলেন এবং আত্মনিয়ন্ত্রকারী বাঙ্গালী জনগনের বিরুদ্ধে তীব্র দমন, পীড়ন, হত্যা, নির্যাতন ইত্যাদি চালিয়েছিলেন, ইহা সত্য। আমি জানি যে, ১৯৬৮ সালে জানুয়ারী মাসের প্রথম দিকে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে ১ নম্বর আসামী করে আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করেছিলেন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রভাবাধীন ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), জামায়াত পন্থী ইসলামী ছাত্র সংঘ, কনভেনশন মুসলিম লীগ পন্থী এন,এস,এফ, ছিল। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেব সরকারী দল অর্থাৎ এন,এস,এফ এর সংগে যুক্ত ছিলেন এবং মুসলিম লীগ পরিবারের সদস্য ছিলেন তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী আইয়ুব খানের ঘনিষ্ট ছিলেন বিধায় বঙ্গবন্ধু আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হলে তার মুক্তি আন্দোলনে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী কে নিয়ে আমি অংশ নিয়েছিলাম মর্মে আমার প্রদত্ত জবানবন্দীর বক্তব্য অসত্য, ইহা সত্য নহে। আমার মনে নাই যে, ছাত্র সমাজ কোন মাসে এগারদফা আন্দোলনের কর্মসূচী দেয় এবং তার ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। আমার স্মরণ নাই যে, কোন কোন ছাত্র সংগঠনের কোন কোন ছাত্র নেতারা এগার দফা আন্দোলনের কর্মসূচীতে স্বাক্ষর করেছিল। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারী মাসে এগারো দফা কর্মসূচী ঘোষিত হয়েছিল কিনা তাহা আমার স্মরণ নাই। এগারো দফা আন্দোলনে আমরা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবকে নিয়ে অংশ গ্রহণের যেসকল কথা আমার জবানবন্দীতে বলেছি তাহা অসত্য, ইহা সত্য নহে। শহীদ আসাদ কোন ছাত্র সংগঠনের সদস্য ছিল তাহা আমি বলতে পারবনা, তবে আমাদের সামনে যে শহীদ হয়েছিল। শহীদ আসাদকে গুলি করার সময় আমি, সালমান এফ রহমান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এগার দফা আন্দোলনের সময় মিছিলে ছিলাম এবং শহীদ আসাদকে গুলি করার সময় আমরা গাছের পিছনে ছিলাম মর্মে জবানবন্দীতে যে বক্তব্য প্রদান করেছি  তাহা সর্বাংশে মিথ্যা, ইহা সত্য নহে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবকে আন্দোলনের সময় ই,পি,আর পিছন দিক থেকে লাথি মারার যে কথা জবানবন্দীতে বলেছি তাহা সর্বাংশে ভিত্তিহীন, বানোয়াট এবং অসত্য, ইহা সত্য নহে। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশুনাকালীন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেব কোন ছাত্র নেতা ছিলেন না, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশুনা করাকালীন অবস্থায় সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের ধানমন্ডিস্থ বাসায় আসার যে কথা জবানবন্দীতে বলেছি, তাহা মিথ্যা, বানোয়াট এবং অসত্য, ইহা সত্য নহে। আমার খালু সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেব চট্টগ্রামের কোন নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচন কররিলেন তাহা আমি জানি না তবে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থির নিকট হেরেছিলেন। আমার ভাই এরফান রেজা চৌধুরী ১৯৭০ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে হেরেছিলেন।
‘‘ঐ সময় আমার ইংরেজীতে দখল থাকার কারণে বঙ্গবন্ধু আমাকে বাদশা ভাইয়ের সংগে বিদেশী সংবাদিকদের দেখাশুনা ও অনুবাদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এইজন্য ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ইংরেজী টাইপিং এর দায়িত্ব আমার উপর পড়ে। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষনের সময় রেসকোর্সে আমাদের সংগে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। ঐ সময় আওয়ামী লীগের কাজের জন্য আই,সি,আই, আমাকে একটি গাড়ি দিয়েছিল। এই গাড়িটি বিদেশী সাংবাদিকদের আনা নেওয়া এবং তাদের প্রেসের খোঁজ খবর দেওয়ার কাজে আমি ব্যবহার করতাম” বা ‘‘১৯৭১ সালের ১৮ কিংবা ১৯শে মার্চ বিকাল ৪.০০ টার সময় বঙ্গবন্ধু ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেবের সংগে দেখা করার জন্য ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেবের বাসায় এসেছিলেন এবং আমি বঙ্গবন্ধুর সংগে ছিলাম। তাদের আলোচনার সবকিছু আমি শুনি নাই তবে শুধু একটি কথা কানে এসেছিল যে, ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন পাকিস্তানিদের বিশ্বাস করো না” বা ‘‘ ১৯৭১ সালের ২৩ বা ২৪ শে মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধুর সংগে বিদেশী সাংবাদিকদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা আমি এবং বাদশা ভাই মিলে করে দিতে পারি নাই। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাত্রে বাদশা ভাই, নিজাম আহম্মেদ, নেওয়াজ আহম্মেদকে নিয়ে আমি গাড়ি চালিয়ে তৎকালীন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে প্রেস রিলিজ দেওয়ার জন্য যাই। প্রেস রিলিজ দেওয়ার পর আমি গাড়িতে ফেরত আসি, বাদশা ভাই তখন হোটেল থেকে বের হয়ে আসবেন তখন প্রায় ১০.২০ বাজে। এই সময় একজন পাকিস্তানি সৈন্য বন্দুক তাক করে আমাদেরকে হোটেলের মধ্যে যেতে নির্দেশ দিল। বাদশা ভাইয়ের ব্রীফকেসটি গাড়িতে আটকা পড়লো যাহার মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ন কাগজপত্র ছিল” -এই কথাগুলি অসত্য, ইহা সত্য নহে।
শেখ কামালকে নিয়ে আমি আমার জবানবন্দীতে যে সকল বক্তব্য প্রদান করেছি তাহা অসত্য, ইহা সত্য নহে। তেজগাঁও থেকে কয়টি পি,আই,এ এবং বিদেশী বিমান যাতায়াত করতো তাহা আমি জানি না, তবে প্রতিদিন দুপুরে একটি ফাইট ছিল। ১৯৭১ সালে ঢাকা থেকে করাচী যেতে কলম্বোর উপর দিয়ে যাওয়ার কারণে ৬ ঘন্টা সময় লাগতো। 
 ‘‘ আমি এবং নিজাম আহম্মেদ ২৮শে মার্চ সুইডিস পরিবারের বাসায় গিয়ে উঠি” বা ‘‘ ২৮শে মার্চ তারিখে ৮ নম্বর ব্রীজের কাছে আমি যখন গাড়ি নিয়ে বের হই তখন শেখ কামালকে দেখতে পাই। শেখ কামালকে নিয়ে আমি ঐ সুইডিস পরিবারের বাসায় ফিরে আসি। সুইডিস মহিলা শেখ কামালকে দেখে শেখ কামালের গোফ কেটে দিল এবং মাথার চুল মাঝখান দিয়ে চিরুনী করে দিল যাতে তাকে দেখে সহজে চেনা না যায়” বা ‘‘ শেখ কামাল, নিজাম আহম্মেদ এবং আমি ৩/৪ দিন ঐ সুইডিস পরিবারের সংগে ছিলাম। ৩০/৩১শে মার্চ শেখ কামাল টুঙ্গিপাড়ায় যেতে না পেরে সেই সুইডিস পরিবারে আবার ফেরত এসেছিল। এই সময় পাকিস্তান সরকার সুইডিস পরিবারকে দেশ ত্যাগের নির্দেশ প্রদান করে। এই নির্দেশের পরে আমি, শেখ কামাল এবং নিজাম আহম্মেদ খাবার দাবার নিয়ে ৩২ নম্বরে আমার বোনের বাড়ীতে উঠি” বা ‘‘ঐ সময় আমরা সিদ্ধান্ত হীনতার মধ্যে শেখ কামাল বললেন আমি টুঙ্গিপাড়ায় যাই আর তোমরা তোমাদের বন্ধু বান্ধব সহ জার্মানীতে যাওয়ার চেষ্টা করো। ৪ঠা এপ্রিল কিংবা ৫ই এপ্রিল তারিখে শেখ কামাল টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়ার সময় আমাকে তার পরিবারের সদস্যদের দেখাশুনা করার জন্য অনুরোধ করেছিল। আমি আমার ভাইয়ের গাড়ি নিয়ে আমি মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় গেলাম। সেখানে যাওয়ার পর মামি-অর্থাৎ বেগম মুজিব আমাকে দেখে বললেন বাবা তুমিই প্রথম আমাদের দেখার জন্য এখানে এসেছো। সেখানে শেখ জামাল, শেখ রাশেল, শেখ রেহানা, বর্তমানে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা, ডঃ ওয়াজেদ মিয়া ছিলেন। মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় আমি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে নিজাম আহম্মেদ এবং শেখ কামাল সেখানে উপস্থিত হয়, কারণ শেখ কামাল টুঙ্গিপাড়ায় যেতে পারেনি। তখন আমরা তিনটি গাড়িতে করে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদেরকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া থেকে ১ নম্বর আউটার সার্কুলার রোডস্থ মিসেস বদরুন্নেছা আহম্মেদের বাড়ীতে নিয়ে আসি”- এই কথাগুলি সম্পূর্ণ অসত্য, ইহা সত্য নহে।
‘‘২৮শে মার্চ দুপুরের পরে আমি হেটে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ১৮ নম্বর রোডের বাসায় যাই। আমাকে দেখে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলল, আমি আগামী কাল করাচি যেতে চাই, আমাকে পরের দিন এয়ারপোর্টে পৌছে দিতে হবে। ৩২ নম্বর রোডস্থ আমার বোন মিসেস ফারাদি খান এর বাসা থেকে আমার দুলাভাইয়ের টয়োটা করোনা যার নম্বর ৪৮৯৩ গাড়ি করে আমি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাসায় যাই এবং তাকে গাড়িতে তুলে দুপুরে তেঁজগাও আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছে দিই” বা ‘‘। আমি করাচি পৌঁছাবার দুইদিন পরে যখন আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য একটি বাড়ি খুঁজতে বেরিয়েছিলাম তখন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সালমান এফ, রহমানের বাসায় এসেছিল, সে সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের সংগে আমার দেখা হয় নাই। আমার ভায়রা মিঃ আব্দুল মোমেন চৌধুরী যিনি তানজানিয়া থেকে করাচি এসেছিলেন আমি আশিকুর রহমান সাহেবের অফিসে গিয়ে তার সংগে দেখা করি” বা ‘‘ আশিকুর রহমান সাহেবের অফিসে বসে আব্দুল মোমেন চৌধুরী বললেন তোমার কাজিন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের দেখা হয়েছে এবং পরিচয় হয়েছে” এই কথাগুলি সম্পূর্ণ বানোয়াট, মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং কাল্পনিক,  ইহা সত্য নহে।
আমার ভাইয়েরা এবং আত্মীয় স্বজনরা মুসলিম লীগের রাজনীতির সংগে জড়িত ছিল বিধায় আমি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্স হিসাবে ছাত্র আন্দোলন নস্যাত করার জন্য নিয়োজিত ছিলাম, ইহা সত্য নহে। আমি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের আত্মীয় বিধায় তার পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য প্রদান করার জন্য ট্রাইব্যুনালে এসেছি, ইহা সত্য নহে। আমি সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য এসেছি। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের বিরুদ্ধে যে সকল মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনয়ন করা হয়েছে তাহা সঠিক ভাবে আমার জানা নাই। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের ঘনিষ্ঠজন সেজে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত বাঙ্গালীর স্বাধীনতার লড়াইকে নস্যাতের অভিপ্রায়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ১৯৭১ সালে যে সমস্ত মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন তার দায় থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য আমি খালাতো ভাই হিসাবে আসামী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এর পক্ষে মনগড়া, শেখানো, মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট সাক্ষ্য ট্রাইব্যুনালে প্রদান করলাম, ইহা সত্য নহে। (সমাপ্ত) 


সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে চতুর্থ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ


২৪/৭/২০১৩
জবানবন্দী :
আমার নাম আব্দুল মোমেন চৌধুরী। আমার বয়স  ৭৩ বৎসর। আমার ঠিকানা রোড নম্বর ৪১ বাড়ী নম্বর ৪৪, গুলশান, ঢাকা।

আমি বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত কুটনীতিবিদ। আমি ১৯৮৫ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রদুত হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমি ১৯৬৮ সালে সিরিয়ার দামেস্কাসে ৩য় সেক্রেটারী হিসাবে প্রথম যোগদান করি। ১৯৭০ সালে বাবার মৃত্যুতে আমি ঢাকায় এসেছিলাম। মাস খানেক ঢাকায় অবস্থান করে আমার শিশু কন্যা শ্বশুরের নিকট রেখে আমরা আবার দামেস্কাসে চাকুরীস্থলে ফিরে যাই। ১৯৭১ সালের জানুয়ারী মাসের ২৮ তারিখে আমার স্ত্রীকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিই। ঐ সময় ইন্ডিয়ান একটি বিমান হাইজাক হওয়ার কারণে ইন্ডিয়ান এয়ার স্পেস পাকিস্তানি ফাইটের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমার স্ত্রীকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়ার পর তার সংগে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে পাকিস্তান সরকার আমাকে দামেস্কাস থেকে তানজানিয়ায় বদলী করেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় সপ্তাহে ছুটি নিয়ে ঢাকায় আসার উদ্দেশ্যে করাচি যাই। আমি করাচিতে আমার এক বন্ধু আব্দুল জলিলের সংগে সেন্ট্রাল গভঃ হোষ্টেল, গার্ডেন রোডে আনুমানিক দুই সপ্তাহ অবস্থান করি। ঐ সময় আমার উদ্দেশ্য ছিল ঢাকায় আসার কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও পি,আই,এ, এর কোন টিকিট সংগ্রহ করতে পারি নাই। ঐ সময় সম্পূর্ণ ভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে আমি খুবই উদ্বিগ্ন ছিলাম। টেলিফোনেও  যোগাযোগ করতে পারি নাই। আমার একই ব্যাচের সিভিল সার্ভিসের অনেক কর্মকর্তা পাকিস্তানের অনেক স্থানে কর্মরত ছিলেন ঐ সময়। তখন আমার ব্যাচমেট মিঃ হাবিবুন নবী আশিকুর রহমান সিন্ধু সরকারের অধীনে কর্মরত আছে। তখন আমি উনার খোঁজ করে একদিন তার অফিসে যাই। যখন আমি উনার অফিসে যাই তখন উনার অফিসে একজন ভদ্রলোক বসা ছিলেন। আমি উক্ত ভদ্রলোককে পূর্বে চিনতাম না। আশিকুর রহমান সাহেব তার সংগে আমার পরিচয় করিয়ে দেন যে, তিনি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আশিকুর রহমান সাহেবও ঐ সময় করাচি থেকে আমার পরিবারের সংগে কোন রকম যোগাযোগ করে দিতে সক্ষম হননি। উনার অফিসে কিছুক্ষণ অবস্থানের পরে আমি গর্ডেন রোডে ফিরে আসি। আশিকুর রহমান সাহেবের অফিসে অবস্থানকালে দুইজনের কথা প্রসংগে জানতে পারলাম কাইউম রেজা চৌধুরীও করাচিতে অবস্থান করছেন। কাইউম রেজা চৌধুরী সাহেবকেও আমি ঐ সময় ভালভাবে চিনতাম না যদিও আমার শ্বাশুড়ীদের সংগে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। আশিকুর রহমান সাহেবের অফিসে যাওয়ার আনুমানিক এক সপ্তাহ পরে কাইউম রেজা চৌধুরী আমার গার্ডেন রোডের বাসায় হঠাৎ একদিন আসে। তখন আমি আমার পরিবারের কথা জিজ্ঞাসা করলে উনি বলেন তারা নিরাপদে আছে। কিন্তু কোথায় আমার পরিবার আছে তাহা বলতে পারলেন না। আমি চিন্তার মধ্যে থাকলাম। ফকরউদ্দিন সাহেব যিনি পরবর্তীতে পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন তার পরামর্শক্রমে আমি দামাস্কাস হয়ে পরবর্তীতে তানজানিয়ায় চলে গেলাম। ১৯৭১ সালে আমি কখনও পূর্ব পাকিস্তানে আসি নাই।

জেরা ঃ
আমি অদ্য আমার ঢাকাস্থ গুলশানের বাসভবন থেকে অত্র ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য প্রদান করতে এসেছি। (চলবে)
জেরা ঃ-
আমি অদ্য আমার ঢাকাস্থ গুলশানের বাসভবন থেকে অদ্য ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য প্রদান করতে এসেছি। আমি অদ্য ট্রাইব্যুনালে জেনে শুনে বুঝেই সত্য কথা বলার জন্য এসেছি। আমি গুলশান থেকে বেলা ১১.০০ টার সময় গাড়ি যোগে ট্রাইব্যুনালে এসেছি। আমার জন্য একটি গাড়ি পাঠানো হয়েছিল। সেই গাড়িতেই আমি এসেছি। আমাকে কোর্টে আসার জন্য ব্যারিস্টার এ,কে,এম ফখরুল ইসলাম সাহেব টেলিফোনে বলেছিলেন। অদ্য তারিখে পূর্বে থেকে আমি জানতাম অদ্য মামলায় আমাকে সাফাই সাক্ষ্য দিতে হবে। আজ  থেকে সাত থেকে দশ দিন আগে জনাব এ,কে,এম ফখরুল ইসলাম সাহেব আমাকে এ মামলায় সাক্ষ্য দিতে হবে একথা বলেছেন আমি ১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তান সরকারের সরকারী চাকুরীতে যোগদান করি। আমার চাকুরী ফরেন সার্ভিসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নাই। আমি অক্টোবর ১৯৬৬ ফরেন সার্ভিসে যোগদান করি। ১৯৬৮ সালের সেপ্টম্বর মাসে সিরিয়ার দামেস্কোতে যোগদান করি এবং ১৯৯৭ সালে আমার বয়স ৫৭ বৎসর পূর্ন হওয়ায় আমি  চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করি। ঐ সময় আমি ইন্দোনেশিয়া রাষ্ট্রদূত হিসাবে কর্মরত ছিলাম। ১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাস থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি একনাগাড়ে পাকিস্তান সরকারে অধীনে চাকুরীরত ছিলাম। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন কালীন সময়ে আমি সিরিয়ার দামাস্কাস কর্মরত থাকা অবস্থায় সেখান থেকে নির্বাচনের ফলাফল অবগত হয়েছিলাম। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল তাহা আমি জানতাম। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল ও নেতার নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাত্রে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী রাজধানী ঢাকা সহ সারা বাংলাদেশে যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় সে খবর আমি বিস্তারিত জানতাম না। ২৫ শে মার্চ রাত্রে অর্থাৎ ২৬শে মার্চ তারিখের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেন একথা আমি জানতাম এবং স্বাধীনতার ঘোষনার পর পরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনার আলোকে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রবাসী সরকার গঠিত হয়েছিল তাহা আমার জানা আছে। প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে ৯ মাস যাবৎ ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। ২৫ শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনায় উজ্জীবিত হয়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন দূতাবাসে কর্মরত দেশ প্রেমিক বাঙ্গালী অফিসাররা পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষ অবলম্বন করেছিল তাহা আমি জানতাম। তাদের মধ্যে ছিলেন হোসেন আলী, জনাব হুমায়ন রশিদ চৌধুরী প্রমুখ উল্লেখ যোগ্য। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাস রক্তখাত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাক হানাদার বাহিনী তাদের এদেশিয় সহযোগী সহ আত্মসমর্পন করে এবং আত্মসর্ম্পন দলিলেও স্বাক্ষর করে আমি জানতাম। আমি সহ কুটনীতিবিদরা ‘‘হোয়াইট লাই” “ঞরিংঃবফ াবৎংব” এই  শব্দগুলির সাথে পরিচিত। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের চাকুরীর মোহ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করি নাই বা করার চেষ্টা করি নাই ইহা সত্য নয়। কাইয়ুম রেজা চৌধুরী সাহেব আমার ভায়রা। কাইয়ুম রেজা চৌধুরী এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেব পরস্পর আত্মীয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী আমার কোন আত্মীয় নহেন, তবে কাইয়ুম রেজা চৌধুরী ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেব পরস্পর কাজিন বিধায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেব আমার আত্মীয়ের আত্মীয়। ১৯৭১ সালে ফকরুদ্দিন সাহেব পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ কওে বাংলাদেশের পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন ইহা সত্য নহে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে চট্টগ্রামের গুডসহিল রাউজান ও রাউজান চট্টগ্রাম এলাকায় সংগঠিত মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচার চলছে-
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় সপ্তাহে ছুটি নিয়ে ঢাকায় আসার উদ্দেশ্যে করাচি যাই। আমি করাচিতে আমার এক বন্ধু আব্দুল জলিলের সংগে সেন্ট্রান গভঃ হোষ্টেল, গার্ডেন রোডে আনুমানিক দুই সপ্তাহ অবস্থান করি। ঐ সময় আমার উদ্দেশ্য ছিল ঢাকায় আসার কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও পি,আই,এ, এর কোন টিকিট সংগ্রহ করতে পারি নাই। ঐ সময় সম্পূর্ণ ভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে আমি খুবই উদ্বিগ্ন ছিলাম। টেলিফোনেও  যোগাযোগ করতে পারি নাই। আমার একই ব্যাচের সিভিল সার্ভিসের অনেক কর্মকর্তা পাকিস্তানের অনেক স্থানে কর্মরত ছিলেন ঐ সময়। তখন আমার ব্যাচমেট মিঃ হাবিবুন নবী আশিকুর রহমান সিন্ধু সরকারের অধীনে কর্মরত আছে। তখন আমি উনার খোঁজ করে একদিন তার অফিসে যাই। যখন আমি উনার অফিসে যাই তখন উনার অফিসে একজন ভদ্রলোক বসা ছিলেন। আমি উক্ত ভদ্রলোককে পূর্বে চিনতাম না। আশিকুর রহমান সাহেব তার সংগে আমার পরিচয় করিয়ে দেন যে, তিনি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আশিকুর রহমান সাহেবও ঐ সময় করাচি থেকে আমার পরিবারের সংগে কোন রকম যোগাযোগ করে দিতে সক্ষম হননি। উনার অফিসে কিছুক্ষণ অবস্থানের পরে আমি গর্ডেন রোডে ফিরে আসি। আশিকুর রহমান সাহেবের অফিসে অবস্থান কালে দুইজনের কথা প্রসংগে জানতে পারলাম কাইউম রেজা চৌধুরীও করাচিতে অবস্থান করছেন। কাইউম রেজা চৌধুরী সাহেবকেও আমি ঐ সময় ভালভাবে চিনতাম না যদিও আমার শ্বাশুড়ীদের সংগে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। আশিকুর রহমান সাহেবের অফিসে যাওয়ার আনুমানিক এক সপ্তাহ পরে কাইউম রেজা চৌধুরী আমার গার্ডেন রোডের বাসায় হঠাৎ একদিন আসে। তখন আমি আমার পরিবারের কথা জিজ্ঞাসা করলে উনি বলেন তারা নিরাপদে আছে। কিন্তু কোথায় আমার পরিবার আছে তাহা বলতে পারলেন না এইকথাগুলো অসত্য ইহা সত্য নয় আমার উল্লেখিত কথাগুলো হোয়াইট লাই, ঞরিংঃবফ াবৎংব নহে। তবে কুটনীতিবিদরা সৎ তবে দেশের স্বার্থে অনেক সময় অসত্য কথা বলতে হয়।
তদানিন্তন পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকারের চাকুরী বিধিমালা অনুসারে কোন কর্মকর্তা কর্মচারীকে বদলী করলে বদলীকৃত কর্মস্থলে যোগদানের সময়ে নির্ধারন করে দেওয়া হত ইহা সত্য নয়। ১৯৭১ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে পাকিস্তান আমলে দামাস্কাস থেকে তানজানিয়াতে বদলী আদেশে দুই সপ্তাহের মধ্যে যোগদান করার নির্দেশ থাকার কথা ছিল, ইহা সত্য নহে। এই ট্রাইব্যুনালে শপথ নিয়ে আমি অদ্য যে সাক্ষ্য প্রদান করেছি সেই সাক্ষ্যের সমর্থনে কোন দালিলিক প্রমানপত্র আমার নিকট নাই, তবে আমার চাকুরী সংক্রান্ত কাগজপত্র আমার নিকট নাই, তবে চাকুরীর কাগজপত্র আমার নিকট আছে। সাক্ষ্যের মধ্যে বিভিন্ন দেশে ঐ সময় আমি যে ভ্রমন করেছি সেই সংক্রান্তে কোন ডকুমেন্ট আমার নিকট নাই। ১৯৭১ সালে করাচি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ছিল। ঐ সময় করাচি এয়ারপোর্টে বিদেশী এয়ারলাইন্স যাতায়াত করতো। ১৯৭১ সালে টেলিকমিউনিকেশন চালু ছিল কি না তাহা আমি জানি না কারণ আমি তখন পাকিস্তানে ছিলাম না। ঢাকা করাচি টেলিকমিউনিকেশন কবে বন্ধ হয়েছিল এবং কখন পুনরায় চালু হয়েছিল এ সম্পর্কে আমার কোন ধারনা নাই। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের দালালিতে ব্যস্ত ছিলাম, প্রকৃত সত্য জানা সত্ত্বেও সত্য গোপন করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের সংগে আত্মীয়তার সূত্রধরে এবং আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে অত্র ট্রাইব্যুনালে শপথ গ্রহণ করে অসত্য সাক্ষ্য প্রদান করলাম ইহা সত্য নয়। 

বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৩

সাবেক প্রধান বিচারপতি মইনুর রেজা চৌধুরীর ছোট ভাই কাইউম রেজা চৌধুরী সাক্ষ্য দিলেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে


১৬/৭/২০১৩
জবানবন্দী :
আমার নাম কাইউম রেজা চৌধুরী, আমার বয়স ৬৩ বৎসর, আমার ঠিকানা-হাউজ নম্বর ১৩, রোড নম্বর ৫১, গুলশান-২, ঢাকা, আমার স্থায়ী ঠিকানা-রাজশাহী হাউজ, ৯৮ বড় মগবাজার, ঢাকা।
আমার পেশা ব্যবসা। আমার পিতা মরহুম মোর্তজা রেজা চৌধুরী ১৯৪৭ সালের পূর্বে রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এবং বেঙ্গল লেজিসলেটিভ এ্যাসেমব্লির মেম্বার ছিলেন ।  তিনি সৈয়দ আজিজুল্লাহ সাহেবের বড় জামাতা ছিলেন। সেই সুবাদে  উনার অন্য দুই শ্যালিকার সহিত ফজলুর রহমান সাহেব (সালমান এফ রহমানের পিতা)  এবং ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেবের বিবাহ প্রদান করেন। তৎকালে তারাও রাজনীতির সংগে জড়িত ছিলেন। দেশ বিভাগের পূর্বে কলিকাতায় হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হয়েছিল। দাঙ্গা পরবর্তী সময়ে আমার পিতাকে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা সমূহে খাদ্য বিতরণের জন্য ফুড কমিশনার হিসাবে বৃটিশ সরকার নিয়োগ প্রদান করেছিলেন। ঐ সময় ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাসমূহে খাদ্য বিতরণের কাজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কাজ করেছিলেন। দেশ বিভাগের পরে আমার পিতা পরিবারসহ রাজশাহীতে চলে আসেন। লাহোরে প্রথম মুসলিম লীগ কনভেনশনে আমার পিতা অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ আলী সাহেবের মন্ত্রীসভায় আমার পিতা অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং সেই কারণে তিনি করাচিতে থাকতেন। ইস্কান্দার মির্জা সাহেব মোহাম্মদ আলী সাহেবের মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত করলে আমার পিতাকে কলিকাতায় পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার হিসাবে নিয়োগ প্রদান করেন। আমি তখন কলিকাতায় সেন্ট জেভিয়ার স্কুল এন্ড  কলেজে পড়াশুনা করতাম। আমার বড় ভাই মইনুর রেজা চৌধুরী সেন্ট জেভিয়ার পাটনাতে পড়াশুনা করতেন এবং পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। আমার অন্য দুই ভাই মৃত কামরান রেজা চৌধুরী এবং সাহেদ রেজা চৌধুরী পাকিস্তানের ভাওয়ালপুরে সাদিক পাবলিক স্কুলে পড়াশুনা করতো। ১৯৫৬ সালে কলিকাতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব এবং আতাউর রহমান খান সাহেব আমাদের কলিকাতায় বাসায় এসেছিলেন এবং সেই সময় আমার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের সংগে আমার জীবনে প্রথম দেখা হয়। ১৯৫৮ সালে ১০ই অক্টোবর তারিখে আমার পিতার মৃত্যুর পরে আমরা ফিরে এসে বসবাস করতে শুরু করি। এরপর আমি সেন্ট জোসেফ হাইস্কুলে ভর্তি হই। ১৯৬৪ সালে আমি সেন্ট জোসেফ হাইস্কুল ছেড়ে শাহিন স্কুলে ভর্তি হই। এই শাহিন স্কুলে আমার সংগে শেখ কামাল এবং নিজাম আহম্মেদ (ডি,ডব্লিউ-২) সাহেবের সংগে আমার পরিচয় হয়। এই স্কুলে পড়াশুনা করাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু, শেখ কামাল এবং নিজাম আহম্মেদকে তার গাড়ি নম্বর ৩১৩১ এ করে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আসতেন। কোন কোন সময় বঙ্গবন্ধু অনুপস্থিতি লক্ষ্য করলে শেখ কামাল প্রশ্নের জবাবে বলতেন বাবাকে এ্যারেষ্ট করে নিয়ে গিয়েছে। আমি এবং শেখ কামাল উভয়ে খেলাধুলায় পারদর্শী থাকার কারণে আমাদের উভয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব আরও ঘনিষ্ঠ ছিল, যদিও শেখ কামাল আমার চেয়ে এক কাস নিচে পড়তো। আমি শাহিন স্কুল থেকে ১৯৬৬ সালে এস,এস,সি পাশ করি। এরপর আমি ঢাকা নটর ডেম কলেজে ভর্তি হই। সেখানে সালমান এফ, রহমান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং নিজাম আহম্মেদও ভর্তি হয়। নটর ডেম কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় অন্যান্য বিষয় যেমন বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ইনডোর আউটডোর গেমসের উপর প্রাধান্য দেওয়া হতো এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেব ইন্টার কলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নটর ডেম কলেজের প্রতিনিধিত্ব করতেন। আমার খালু জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেবে যখন পাকিস্তানের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে ঢাকায় আসতেন তখন তিনি আমাদের রাজশাহী হাউজে আমার মাকে সালাম করতে আসতেন। ১৯৬৬ সালে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হওয়ার সুবাদে আমার কাজিন (খালাত ভাই) সালমান এফ, রহমান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আমাদের বন্ধু নিজাম আহম্মেদের সংগে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। নিজাম আহম্মেদের বন্ধুত্বের সুবাদে আমরা প্রায়শই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে যেতাম। নিজাম আহম্মেদ এবং বঙ্গবন্ধু বাড়ির মধ্যখানে যাতায়াতের জন্য একটি ছোট্ট গেইট ছিল যা এখনও আছে। নটর ডেম কলেজে পড়াকালীন সময়ে সালাউদ্দিন কাদের ইস্কাটনের একটি বাসায় একাই থাকতেন এবং সেখানে আমরাও যেতাম। আমি এবং সালমান এফ, রহমান বিজ্ঞান বিভাগে ছিলাম এবং নিজাম আহম্মেদ এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী মানবিক বিভাগে ছিল। আমরা নটর ডেম কলেজ থেকে এইচ,এস,সি, তে সকলেই প্রথম বিভাগে পাশ করি। এর পরবর্তীতে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ও নিজাম আহম্মেদ অর্থনীতি বিভাগে, সালমান এফ,রহমান পদার্থ বিদ্যায় এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হই। ঐ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছয় দফা ও এগারো দফা আন্দোলনের জন্য উত্তাল ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করলে আমরা তার মুক্তির আন্দোলনে শরীক হই এবং সেই আন্দোলনে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সহ আমরা সকলেই অংশগ্রহণ করি। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডে আই,জি,পি, আলমগীর কবির সাহেবের বাসায় থাকতে শুরু করেন। ঐ আন্দোলনের সময় মিছিলে আমরা শহীদ আসাদের সংগে ছিলাম। শহীদ আসাদকে যখন গুলি করা হয় তখন আমি, সালমান এফ, রহমান ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী একটি গাছের পিছনে, নিজাম আহম্মেদ শহীদ আসাদের দুই ফিট দূরে এবং খায়রুল বাশার সেই সময় রায়ট ভ্যানের উপরে ছিল। এই আন্দোলনের সময় একদিন যেহেতু সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেব আমাদের চেয়ে লম্বা ছিলেন সম্ভবত সেই কারণেই ই,পি,আর, তার পিছনের দিকে লাথি মেরেছিল। অর্থনীতিতে পাঠ দানকালে প্রফেসর রেহমান সোবহান সাহেব পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের বিষয়ে পড়াতেন এবং তাতে আকৃষ্ট হয়ে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করি। আমার আব্বা মারা যাওয়ার পরে বিহারের সম্পত্তি হারানোর ক্ষতিপুরণ হিসাবে আমাদেরকে নবাব শাহ্ সিনদে নয় হাজার বিঘা তুলা উৎপাদনের জমি দিয়েছিল। এই জমি থেকে উপার্জিত অর্থ দ্বারা আমাদের সংসার এবং লেখাপড়ার খরচ চলতো। পাকিস্তানে এত সম্পত্তি পাওয়ার পরেও আমাদের মধ্যে এই চেতনা ছিল যে, বঙ্গবন্ধুর আন্দোলনের কারণ যৌক্তিক। খন্দকার আমিনুল হক বাদশা সাহেবের সুবাদে এবং অনুপ্রেরণায় বঙ্গবন্ধুর সংগে আমার ঘনিষ্ঠতা আরও বৃদ্ধি পায়। এই আন্দোলন চলাকালে আমরা যারা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করতাম তারা জয় বাংলা শ্লোগান এবং আন্দোলনকারীদের একটা অংশ দুনিয়ার মজদুর এক হও শ্লোগান দিতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে ধানমন্ডিতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের বাসায় সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ আসতেন। মূল জায়গা ছিল আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বাড়ি যেহেতু সেটা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির নিকটবর্তী। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। এই নির্বাচনে আমার খালু ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব এবং ভাই এরফান রেজা চৌধুরী সাহেব পরাজিত হন। ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ ইংল্যান্ড এবং পাকিস্তানের মধ্যে ক্রিকেট খেলা চলাকালীন সময়ে এ্যাসেমব্লির অধিবেশন স্থগিত ঘোষনা করায় খেলা পন্ড হয়ে যায়। ঐ সময় আমার ইংরেজীতে দখল থাকার কারণে বঙ্গবন্ধু আমাকে বাদশা ভাইয়ের সংগে বিদেশী সংবাদিকদের দেখাশুনা ও অনুবাদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এইজন্য ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ইংরেজী টাইপিং এর দায়িত্ব আমার উপর পড়ে। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষনের সময় রেসকোর্সে আমাদের সংগে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। ঐ সময় আওয়ামী লীগের কাজের জন্য আই,সি,আই, আমাকে একটি গাড়ি দিয়েছিল। এই গাড়িটি বিদেশী সাংবাদিকদের আনা নেওয়া এবং তাদের প্রেসের খোঁজ খবর দেওয়ার কাজে আমি ব্যবহার করতাম। ১৭ই মার্চ, ১৯৭১ তারিখে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুকে হ্যাপি বার্থ ডে উইশ করার পরে জিজ্ঞাসা করলেন আজকে আমাদের উদ্দেশ্যে আপনি কি বলবেন। বঙ্গবন্ধু জবাবে বললেন ‘‘ডযধঃ রং সু নরৎঃয ফধু ধহফ যিধঃ রং সু ফবধঃয ফধু, সু ষরভব রং ভড়ৎ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ড়ভ ঊধংঃ চধশরংঃধহ.”
১৯৭১ সালের ১৮ কিংবা ১৯শে মার্চ বিকাল ৪.০০ টার সময় বঙ্গবন্ধু ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেবের সংগে দেখা করার জন্য ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেবের বাসায় এসেছিলেন এবং আমি বঙ্গবন্ধুর সংগে ছিলাম। তাদের আলোচনার সবকিছু আমি শুনি নাই তবে শুধু একটি কথা কানে এসেছিল যে, ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন পাকিস্তানিদের বিশ্বাস করো না। ১৯৭১ সালের ২৩ বা ২৪ শে মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধুর সংগে বিদেশী সাংবাদিকদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা আমি এবং বাদশা ভাই মিলে করে দিতে পারি নাই। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাত্রে বাদশা ভাই, নিজাম আহম্মেদ, নেওয়াজ আহম্মেদকে নিয়ে আমি গাড়ি চালিয়ে তৎকালীন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে প্রেস রিলিজ দেওয়ার জন্য যাই। প্রেস রিলিজ দেওয়ার পর আমি গাড়িতে ফেরত আসি, বাদশা ভাই তখন হোটেল থেকে বের হয়ে আসবেন তখন প্রায় ১০.২০ বাজে। এই সময় একজন পাকিস্তানি সৈন্য বন্দুক তাক করে আমাদেরকে হোটেলের মধ্যে যেতে নির্দেশ দিল। বাদশা ভাইয়ের ব্রীফকেসটি গাড়িতে আটকা পড়লো যাহার মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ন কাগজপত্র ছিল। বিদেশী সাংবাদিক সায়মন ড্রিং বাহিরে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকেও বাঁধা প্রদান করে। আমরা হোটেলের মধ্যে আটকা পড়ে গেলাম। আমরা ঐ হোটেলে অবরুদ্ধ থাকাকালীন সময়ে ব্যারিষ্টার মওদুদ আহম্মেদ এবং হারুন আহম্মেদ চৌধুরীকেও সেখানে দেখি। ২৭শে মার্চ সকালে কারফিউ শিথিল  হলে আমি রাজশাহী হাউজে, নিজাম আহম্মেদ এবং তার ভাই তাদের বাসায় এবং বাদশা ভাই পালিয়ে/আত্মগোপনে চলে গেলেন। ২৮শে মার্চ তারিখে নিজাম আহম্মেদ আমাদের বাসায় আসে এবং নিজাম আহম্মেদ বলে যে, ধানমন্ডির ৮ নম্বর ব্রীজের কাছে যে সুইডিস পরিবার ছিল তারা আমাদের পূর্ব থেকেই পরিচিত ছিল এবং তারাই বলেছিল যে, আমাদের সমস্যা হলে তাদের বাসায় গিয়ে থাকতে পারবে। সেই সুবাদে আমি এবং নিজাম আহম্মেদ ২৮শে মার্চ সুইডিস পরিবারের বাসায় গিয়ে উঠি। ঐ বাসাটি ছিল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবদের বাসার দুই রাস্তার আগে। ২৮শে মার্চ তারিখে ৮ নম্বর ব্রীজের কাছে আমি যখন গাড়ি নিয়ে বের হই তখন শেখ কামালকে দেখতে পাই। শেখ কামালকে নিয়ে আমি ঐ সুইডিস পরিবারের বাসায় ফিরে আসি। সুইডিস মহিলা শেখ কামালকে দেখে শেখ কামালের গোফ কেটে দিল এবং মাথার চুল মাঝখান দিয়ে চিরুনী করে দিল যাতে তাকে দেখে সহজে চেনা না যায়। ঐদিন অর্থাৎ ২৮শে মার্চ দুপুরের পরে আমি হেটে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ১৮ নম্বর রোডের বাসায় যাই। আমাকে দেখে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলল, আমি আগামী কাল করাচি যেতে চাই, আমাকে পরের দিন এয়ারপোর্টে পৌছে দিতে হবে। ৩২ নম্বর রোডস্থ আমার বোন মিসেস ফারাদি খান এর বাসা থেকে আমার দুলাভাইয়ের টয়োটা করোনা যার নম্বর ৪৮৯৩ গাড়ি করে আমি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাসায় যাই এবং তাকে গাড়িতে তুলে দুপুরে তেঁজগাও আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছে দিই। আমার বোনের স্বামী যেহেতু ইউ,পি এর মানুষ সেহেতু বাদশা ভাই সহ আওয়ামী লীগের আরও অনেকে আমার ঐ বোনের বাড়ীতে ঐ সময় আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। শেখ কামাল, নিজাম আহম্মেদ এবং আমি ৩/৪ দিন ঐ সুইডিস পরিবারের সংগে ছিলাম। ৩০/৩১শে মার্চ শেখ কামাল টুঙ্গিপাড়ায় যেতে না পেরে সেই সুইডিস পরিবারে আবার ফেরত এসেছিল। এই সময় পাকিস্তান সরকার সুইডিস পরিবারকে দেশ ত্যাগের নির্দেশ প্রদান করে। এই নির্দেশের পরে আমি, শেখ কামাল এবং নিজাম আহম্মেদ খাবার দাবার নিয়ে ৩২ নম্বরে আমার বোনের বাড়ীতে উঠি।

আমার বোনের বাড়ীতে থাকাকালীন সময়ে আমি উর্দূ জানার কারণে ঘোরাফেরা করতে পারতাম। ঐ সময় আমরা সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে শেখ কামাল বললেন আমি টুঙ্গিপাড়ায় যাই আর তোমরা তোমাদের বন্ধু বান্ধবসহ জার্মানীতে যাওয়ার চেষ্টা করো। ৪ঠা এপ্রিল কিংবা ৫ই এপ্রিল তারিখে শেখ কামাল টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়ার সময় আমাকে তার পরিবারের সদস্যদের দেখাশুনা করার জন্য অনুরোধ করেছিল। আমি আমার ভাইয়ের গাড়ি নিয়ে আমি মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় গেলাম। সেখানে যাওয়ার পর মামি-অর্থাৎ বেগম মুজিব আমাকে দেখে বললেন বাবা তুমিই প্রথম আমাদের দেখার জন্য এখানে এসেছো। সেখানে শেখ জামাল, শেখ রাশেল, শেখ রেহানা, বর্তমানে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা, ডঃ ওয়াজেদ মিয়া ছিলেন। মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় আমি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে নিজাম আহম্মেদ এবং শেখ কামাল সেখানে উপস্থিত হয়, কারণ শেখ কামাল টুঙ্গিপাড়ায় যেতে পারেনি। তখন আমরা তিনটি গাড়িতে করে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদেরকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া থেকে ১ নম্বর আউটার সার্কুলার রোডস্থ মিসেস বদরুন্নেছা আহম্মেদের বাড়ীতে নিয়ে আসি।
২/৩ দিন পরে সালমান এফ, রহমান শাইন পুকুর থেকে ঢাকায় আসেন। নিজাম আহম্মেদের কোন পাসপোর্ট ছিল না। ৮ই এপ্রিল,  ১৯৭১ তারিখে সালমান এফ, রহমান, নিজাম আহম্মেদ এবং আমি পি,আই,এ, বিমান যোগে করাচি যাই এবং সেখানে গিয়ে সালমান এফ, রহমানের বাসায় উঠি। আমি করাচি পৌঁছাবার দুইদিন পরে যখন আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য একটি বাড়ি খুঁজতে বেরিয়েছিলাম তখন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সালমান এফ, রহমানের বাসায় এসেছিল, সে সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের সংগে আমার দেখা হয় নাই। আমার ভায়রা মিঃ আব্দুল মোমেন চৌধুরী যিনি তানজানিয়া থেকে করাচি এসেছিলেন আমি আশিকুর রহমান সাহেবের অফিসে গিয়ে তার সংগে দেখা করি। উক্ত আশিকুর রহমান সাহেব বর্তমানে আওয়ামী লীগের এম,পি, এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের ফুফাতো বোনের স্বামী। আশিকুর রহমান সাহেবের অফিসে বসে আব্দুল মোমেন চৌধুরী বললেন তোমার কাজিন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের দেখা হয়েছে এবং পরিচয় হয়েছে। আমার এবং নিজাম আহম্মেদের উদ্দেশ্য ছিল জার্মানীতে যাওয়। আমি এবং নিজাম আহম্মেদ মে মাসের প্রথম সপ্তাহে জার্মানী যাওয়ার উদ্দেশ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছালাম। ইসলামাবাদে পৌঁছার পরের দিন আমার বোনের বাসা থেকে আমাকে গ্রেফতার করে করাচিতে নিয়ে আসা হয়। এই আমার জবানবন্দী।

জেরা ঃ-
আমি জমিদার বংশের ছেলে। অদ্য আমি সুস্থ শরীরে ট্রাইব্যুনলে জবানবন্দী করেছি। ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রিকেট খেলা চলাকালীন সময়ে এ্যাসেমব্লি স্থগিত করায় খেলা পন্ড হয়ে যায় ‘‘কথাগুলো সত্য নয়”। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী আমার আপন খালাতো ভাই। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এর পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব কখনো বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাকে সমর্থন করেছিলেন কি না তাহা আমার জানা নাই (চলবে)

সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৩

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে করাচীতে আমার বাসায় আমাকে দেখতে আসেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী


Mehedy Hasan
বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে আজ সাক্ষ্য দিয়েছেন নিজাম আহমেদ নামে এক ব্যক্তি। তিনি জানান ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের করাচী যাবার পর সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার বাসায় তাকে দেখতে এসেছিলেন।

জবানবন্দী :
আমার নাম নিজাম আহমেদ, আমার বয়স-৬৩ বৎসর। আমার ঠিকানা-ফাট ২০১, হাউজ নম্বর এন,ই,জি ২এ, রোড ৮৪, গুলশান-২, ঢাকা।

আমার সালাউদ্দিন কাদের চৌধূরী সাহেবের সংগে প্রথম পরিচয় হয় নটরডেম কলেজে শিক্ষাবর্ষ ১৯৬৭-৬৮ সালে। আমার স্কুলের বন্ধু ছিল কাইয়ুম রেজা চৌধূরী, সে আমাকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধূরীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেখানে সালমান ফজলুর রহমান (সালমান এফ রহমান)  ছিলেন যিনি কাইয়ুম রেজা সাহেবের কাজিন। আমরা একসাথে ঘোরাফেরা বা চলাফেরা করতাম বন্ধু হিসাবে। পরবর্তীতে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৮-৬৯ ব্যাচে ভর্তি হই।  সালাউদ্দিন কাদের ঐ সময় ধানমন্ডিতে বসবাস করতেন। ১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলন শুরু হলে আমরা তাতে অংশগ্রহন করি এবং শহীদ আসাদ যখন গুলিবিদ্ধ হয় তখন তিনি আমার থেকে দুই ফিট দূরে অবস্থান করছিলেন। তখন সালমান, কাইয়ুম, সালাউদ্দিন ও আমিসহ, আমরা একত্রে ছিলাম।
১৯৭১ সালে ২৫শে মার্চ সন্ধ্যার দিকে আমরা বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারী আমিনুল হক বাদশার সহিত হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে যাই বিদেশী সাংবাদিকদের নিকট প্রেস রিলিজের কপি দেওয়ার জন্য। ঐদিন রাত্রি সাড়ে দশটার দিকে পাকিস্তানী সৈন্যরা বলল যে, ঐ হোটেল থেকে কেউ বের হতে পারবেনা। আমরা ২৫শে মার্চ রাত্রি থেকে ২৭শে মার্চ সকালে কারফিউ ভাঙ্গার পূর্ব পর্যন্ত আমরা ঐ হোটেলেই ছিলাম। সেখানে ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমেদ, সাইমন ড্রিং এবং ফরাসী ফটোগ্রাফার যার নাম মিশেল ছিলেন। এই দুইজন সাংবাদিক লুকিয়ে পাকিস্তানী সৈন্যদের নির্দেশ অমান্য করেও গণহত্যার বিভিন্ন ছবি তুলেছিলেন। ২৭শে মার্চ কারফিউ ভাঙ্গার পরে আমি এবং আমার ছোট ভাই হাটতে হাটতে ধানমন্ডি চলে যাই, কাইয়ুম তার মগবাজারের বাসায় চলে যান এবং বাদশা ভাই আতœগোপনে চলে যান। এরপর আমরা আমাদের পরিবারের সদস্য সহ ইস্কাটনে আমার খালার বাড়িতে চলে যাই। ২৮শে মার্চে আমি এবং কাইয়ুম সাহেব ধানমন্ডির ৮ নম্বর রোডে (পুরাতন) অবস্থিত সুইডিস পরিবারের বাসায় উঠি যাহা সালাউদ্দিন কাদের চৌধূরী সাহেবের বাসার দুই রাস্তা পরে অবস্থিত। ঐ বাসায় আমরা ৪/৫ দিন ছিলাম। ঐ সময় কাইয়ুম সাহেব উর্দু ভাষা জানতো বলে তিনি গাড়ি নিয়ে বের হতেন এবং ঐ সময় শেখ কামালের সংগে কাইয়ুমের দেখা হয়। শেখ কামালও আমাদের সংগে ঐ সুইডিস বাসায় থাকা আরম্ভ করল। ঐ বাসায় থাকাকালীন সময়ে কাইয়ুম আমাকে বলেছিল যে, তিনি সালাউদ্দিন কাদের চৌধূরীকে বিমান বন্দরে রেখে এসেছেন এবং শেখ কামালকে টেকি্রার ব্যবস্থা করে আরিচা ফেরিঘাটের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন, তবে শেখ কামাল যেতে নাপেরে ফিরে এসেছিলেন। পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার ঐ সুইডিস পরিবারকে ঢাকা ছাড়ার জন্য নির্দেশ দেন। এরপর ঐ সুইডিস পরিবার আমাদের খাবার দাবার দিয়ে গাড়ি করে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে কাইউমের বোনের ভাড়া বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। ঐ বাসায় আমরা শেখ কামাল সহ আনুমানিক ৩/৪ দিন ছিলাম। তারপর আমি আমার নিউস্কাটনস্থ খালার বাসায় চলে যাই। তখন শুনলাম আমার অনেক বন্ধুরা করাচিতে চলে যাচ্ছে। আমিও চিন্তা করলাম যে, করাচি হয়ে খাইবার পাস হয়ে জার্মানীতে যাবো। কারণ উদ্দেশ্য ছিল আমাদের কয়েকজন বন্ধু জার্মানীতে ছিল এবং কয়েকজন ইতোমধ্যে সেখানে চলে গিয়েছিল। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের ৭/৮ তারিখ কাইউম, সালমান এবং আমি একই বিমানে করে করাচিতে গিয়ে সালমানের বাসায় উঠি। সেখানে ২/১ দিন পরে সালাউদ্দিন কাদের চৌধূরী সাহেবও সেই বাসায় আমাদের দেখতে আসেন। ঐ সময় কাইউম সাহেব বাসায় ছিলেননা, আমি এবং সালমান ছিলাম। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের এপ্রিল কিংবা মে মাসে ঢাকার হোটেল পূর্বানীতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধূরী সাহেবের সংগে আমার দেখা হয়। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে করাচিতে সালমানের বাড়িতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধূরী সাহেবের সংগে আমার দেখা হওয়ার পর ১৯৭৪ সালের এপ্রিল/মে ঢাকার হোটেল পূর্বানীতে দেখা হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে আমার সহিত তার আর দেখা হয়নাই। করাচি থেকে ইসলামাবাদ যাওয়ার পরে কাইউম ইসলামাবাদে তার বোনের বাড়ি থেকে গ্রেফতার হন। ইহার ১৫/২০ দিন পর আমি ঢাকায় ফিরে আসি এবং জুন মাসের শুরুর দিকে আমি ভারতের আগড়তলা চলে যাই। এই আমার জবানবন্দী।

জেরা
অদ্য ট্রাইব্যুনালে আমি আমার পেশার বিবরণ প্রদান করিনাই। আমি নিজাম আহমেদ তৎমর্মে আমার নিকট জাতীয় পরিচয়পত্র নাই, তবে পাসপোর্ট আছে। পাসপোর্ট এই মুহুর্তে আমার নিকট নাই। (চলবে)
৯/৭/২০১৩
জেরা
আমি  ১৯৬৬ সালে ঢাকার শাহীন স্কুল থেকে মানবিক বিভাগে এস,এস,সি পাশ করেছি। ১৯৬৮ সালে নটরডেম কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইস,এস,সি পাশ করেছি। আমরা দুই ভাই, দুই বোন এবং দুইজন বৈমাত্রেয় ভাই আছে। আমার অপর ভাইয়ের নাম নেওয়াজ আহমেদ এবং আমার দুই বোনের নাম নাছরিন আহমেদ এবং নাতাশা আহমেদ। আমার আম্মা ১৯৭৪ সালে এবং আমার আব্বা ২০১০ সালে মারা যান। আমার দাদার বাড়ি ছিল কুষ্টিয়া শহরে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৮-৬৯ ব্যাচে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হই। মুক্তিযুদ্ধের কারণে অর্থনীতি সম্মান কোর্স সম্পন্ন করিতে পারিনাই। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে বি.এ.পাশ কোর্সে পাশ করেছি। আমি অনার্সে পরীক্ষা দিইনাই। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেবকে আমি অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের মত মুসলিম লীগের নেতা হিসাবে চিনতাম। জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব আইয়ুব সরকারের আমলে স্পিকার ছিলেন এবং শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে ঐ সময় আমাদের স্কুল পরিদর্শন করেছিলেন। আমার বন্ধু সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের অনুপস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট পদের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আমার জবানবন্দীতে যে ১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলনের কথা বলেছি সেই আন্দোলনটি ছিল ৬ দফা এবং ১১ দফার ভিত্তিতে গণ-আন্দোলন। সেই গণ-আন্দোলন ছিল আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্রের বিরূদ্ধে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল। উক্ত আন্দোলন বাংলাদেশের জনগণের আতœনিয়ন্ত্রণ আধিকার প্রতিষ্টার জন্য ছিল কিনা তাহা আমি জানিনা। আমার বন্ধু সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পরে আমি খুব একটা পত্রপত্রিকা পড়িনাই। ঐ সময়ের পর আমি ঢাকা শহরে খুব একটা ঘোরাফেরা করতামনা।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চে গণহত্যার পর এপ্রিল মাসের পাকিস্তানপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এবং মুসলিম লীগের নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব সহ অন্যান্য নেতারা লেঃ জেনারেল টিক্কা খানের সংগে সাক্ষাৎ করিয়া সমর্থন জানান কিনা তাহা আমি জানিনা। ১৯৭৪ সালে হোটেল পূর্বানীতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের সংগে আমার দেখা হওয়ার পূর্বে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে করাচিতে দেখা হওয়ার কথা অসত্য, ইহা সত্য নহে। ঐ সময় বিমান যোগে ঢাকা থেকে পাকিস্তান যাওয়ার পথে শ্রীলংকার উপর দিয়ে যেতে হতো বিধায় ৬ঘন্টা সময় লাগতো। পাকিস্তান থেকে ঢাকায় আসতে একই সময় লাগতো। ঢাকা-করাচি এবং করাচি-ঢাকা বিমান ভ্রমণ সংক্রান্ত কোন ডকুমেন্ট আমি ট্রাইব্যুনালে দাখিল করিনাই, তবে ট্রাইব্যুনাল চাইলে দাখিল করতে পারবো। ‘‘১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলন শুরু হলে আমরা তাতে অংশগ্রহন করি এবং শহীদ আসাদ যখন গুলিবিদ্ধ হয় তখন তিনি আমার থেকে দুই ফিট দূরে অবস্থান করছিলেন। তখন সালমান, কাইয়ুম, সালাউদ্দিন ও আমি সহ, আমরা একত্রে ছিলাম”-কথাগুলি অসত্য, ইহা সত্য নহে। ‘‘২৮শে মার্চে আমি এবং কাইয়ুম সাহেব ধানমন্ডির ৮ নম্বর রোডে (পুরাতন) অবস্থিত সুইডিস পরিবারের বাসায় উঠি”-কথাগুলি অসত্য, ইহা সত্য নহে। ‘‘ ঐ বাসায় আমরা ৪/৫ দিন ছিলাম। ঐ সময় কাইয়ুম সাহেব উর্দু ভাষা জানতো বলে তিনি গাড়ি নিয়ে বের হতেন এবং ঐ সময় শেখ কামালের সংগে কাইয়ুমের দেখা হয়। শেখ কামালও আমাদের সংগে ঐ সুইডিস বাসায় থাকা আরম্ভ করল। ঐ বাসায় থাকাকালীন সময়ে কাইয়ুম আমাকে বলেছিল যে, তিনি সালাউদ্দিন কাদের চৌধূরীকে বিমান বন্দরে রেখে এসেছেন এবং শেখ কামালকে টেকি্রার ব্যবস্থা করে আরিচা ফেরিঘাটের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন, তবে শেখ কামাল যেতে না পেরে ফিরে এসেছিলেন ” বা,  ‘‘ ঐ বাসায় আমরা শেখ কামাল সহ আনুমানিক ৩/৪ দিন ছিলাম। তারপর আমি আমার নিউস্কাটনস্থ খালার বাসায় চলে যাই। তখন শুনলাম আমার অনেক বন্ধুরা করাচিতে চলে যাচ্ছে। আমিও চিন্তা করলাম যে, করাচি হয়ে খাইবার পাস হয়ে জার্মানীতে যাবো। কারণ উদ্দেশ্য ছিল আমাদের কয়েকজন বন্ধু জার্মানীতে ছিল এবং কয়েকজন ইতোমধ্যে সেখানে চলে গিয়েছিল। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের ৭/৮ তারিখ কাইউম, সালমান এবং আমি একই বিমানে করে করাচিতে গিয়ে সালমানের বাসায় উঠি। সেখানে ২/১ দিন পরে সালাউদ্দিন কাদের চৌধূরী সাহেবও সেই বাসায় আমাদের দেখতে আসেন। ঐ সময় কাইউম সাহেব বাসায় ছিলেননা, আমি এবং সালমান ছিলাম।”- একথাগুলি অসত্য, ইহা সত্য নহে।
১৯৬৯ সালে শহীদ আসাদ গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থান ঢাকা মেডিকেল কলেজের পুরাতন ইমার্জেন্সির বিপরীতে রাস্তার উপর।
আমার কোন পেশা নাই, আমার কোন রোজগার নাই, আমি একজন ভবগুরে ব্যক্তি হওয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবের পরিবারের লোকজনের নিকট হতে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে আর্থিক লাভবান হয়ে, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক সত্য গোপন ও অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের অসম্মান করে, শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানী করে শিখানো মতে অসত্য ও বানোয়াট সাক্ষ্য ট্রাইব্যুনালে প্রদান করেছি, ইহা সত্য নহে। (সমাপ্ত)

শুক্রবার, ৫ জুলাই, ২০১৩

Full deposition of Salahuddin Quader Chowdhury in the International Crimes Tribunal-1, Dhaka

মেহেদী হাসান, ৭/৭/২০১৩
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে আজ ১২ তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন রথিন্দ্র নাথ কুন্ডু। সাক্ষী তার জবানবন্দীতে বলেন, তার ভায়রা অনিল কুন্ড ১৯৭১ সালে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ভাগ্নেকে জবাই করে হত্যা করে। কারণ হিসেবে সাক্ষী জানান মাওলানা নিজামীর ভাগ্নের নেতৃত্বে   রাজাকাররা অনিলদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল।  সাক্ষী বলেন, ১৯৮৫ সালে তিনি তার ভায়রা অনিল কুন্ডুর বাড়িতে গেলে তখন ১৯৭১ সালের এ ঘটনা অনিল তাকে জানান। অনিল ২০১০ সালে মারা যায়।
জবানবন্দী শেষে সাক্ষীকে জেরা করেন মাওলানা নিজামীর পক্ষে আইনজীবী মিজানুল ইসলাম। জেরায় সাক্ষীর কাছে মাওলানা নিজামীর আইনজীবী মতিউর রহমান নিজামীর নিহত ভাগ্নের নাম জানতে চাওয়া হলে তিনি জানাতে পারেননি। এছাড়া ১৯৭১ সালে মাওলানা নিজামীর কোন ভাগ্নে খুন হয়েছিলেন কি-না সে বিষয়ে ১৯৮৫ সালের পরবর্তীতে সাক্ষী কোন খোঁজ খবরও নেননি বলে জানান সাক্ষী।
১৯৭১ সালে হত্যা, গনহত্যাসহ মানবতাবিরোধী নানা কর্মকান্ডের নেতৃত্বে অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচার চলছে মাওলানা নিজামীর।
জবানবন্দী :
আমার নাম রথিন্দ্র নাথ কুন্ডু, আমার বয়স- আনুমানিক ৫৮ বৎসর।
বর্তমানে আমি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হাসপাতালে চিকিৎসক হিসাবে কর্মরত আছি। আমি ১৯৬৮ সালে এস,এস,সি, ১৯৭০ সালে এইচ,এস,সি, এবং ১৯৮৪ সালে এম,বি,বি,এস পাশ করি। ২২-০২-১৯৮৪ সালে আমি আই,এস,টি, হিসাবে সরকারী চাকুরীতে যোগদান করি। ১৪-০৭-১৯৮৫ তারিখে আমি সরকারী আদেশে হেলথ সাব সেন্টার, আটঘড়িয়ায় যোগদান করি। ১৯৯১ সালের ২রা জুন তারিখে আমি কারা বিভাগে যোগদান করি। ১৯৮৫ সালে আমি আমার স্ত্রীসহ নীলফামারীতে অবস্থানরত আমার ভায়রা অনিল কুন্ডুর বাড়িতে যাই। সেখানে যাওয়ার পর অনিল তার জীবনের কিছু কিছু ঘটনা আমাকে জানায়। অনিল আমাকে জানায় যে, সে ১৯৭০ সালে সাঁথিয়া হাইস্কুলের এস,এস,সি, ছাত্র ছিল এবং ১৯৭১ সালে এস,এস,সি, পরীক্ষার্থী ছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অনিল তার বন্ধু বান্ধব সহ ভারতের পানিঘাটাতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেওয়ার জন্য চলে যায়। সেখানে তিন/চার মাস ট্রেনিং নেওয়ার পর বাংলাদেশে ফিরে এসে ৭ নং সেক্টরে বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। এর ফলে অনিলের পিতা-মাতা তৎকালীন ইসলামী ছাত্র সংঘের নাজিমে আলা যাকে সভাপতি বলা হয় আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা মতিউর রহমান নিজামী, রাজাকারদের অত্যাচারে ভারতে চলে যায়। নিজামীর নির্দেশে অনিল মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অপরাধে ১৯৭১ সালের মে মাসে তার এক ভাগ্নের নেতৃত্বে একদল রাজাকার অনিলদের বাড়ি লুটপাট করে এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এরপর অনিল ও তার গ্রুপ কমান্ডার বাতেন, হামিদ, ফনিন্দ্র নাথ ঘোষ এবং হাবিবুর রহমানসহ সাঁথিয়া থানার অন্তর্গত সোনাতলা গ্রামের পাশ দিয়ে বহমান ইছামতি নদীতে টহল ডিউটি করতো। অনিল তার বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ক্ষোভে নিজামী সাহেবের উক্ত ভাগ্নেকে ধৃত করার জন্য একটি ফাঁদ পাতে। অনিল জানতো নিজামী সাহেবের ঐ ভাগ্নের মেয়েদের প্রতি আসক্তি ছিল। সেই সুযোগ নেওয়ার জন্য অনিল নিজে মেয়েদের শাড়ী ব্লাউজ পরে মেয়ে সেজে একটি ছইওয়ালা নৌকায় ঐ ইছামতি নদীতে ঘোরাফেরা করতে থাকে ১৯৭১ সালের আগষ্ট মাসের শেষের দিকে। নিজামী সাহেবের ঐ ভাগ্নে রাজাকারদের একটি দলসহ ইছামতি নদীতে পেট্রোলিং ডিউটি করতো। পেট্রোলিং ডিউটি করাকালীন ঘটনার ঐ দিন অনিলদের নৌকা দেখে নৌকার কাছে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করে, নৌকার মধ্যে একটি মেয়েকে দেখে লাফ দিয়ে ঐ নৌকায় উঠে পড়ে। অনিলদের ঐ নৌকা হামিদ নামে একজন চালাচ্ছিলেন, ফনিন্দ্র ও হাবিবুর রহমান অস্ত্রসহ নৌকার পাটাতনের নীচে লুকিয়ে ছিল। নিজামী সাহেবের ঐ ভাগ্নে নৌকায় উঠা মাত্র অনিল এবং হামিদ ক্ষিপ্রতার সহিত তাকে জাপটে ধরে। সংগে সংগে পাটাতনের নীচ হতে তাদের সহযোগী দুইজন বেরিয়ে ব্লাংক ফায়ার করে। ইহাতে নিজামী সাহেবের ভাগ্নের সহযোগী রাজাকাররা নৌকা নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। তখন অনিলরা নিজামী সাহেবের ভাগ্নেকে নৌকার গলাইয়ের উপর শুয়ায়ে জবাই করে হত্যা করে লাশ ইছামতি নদীতে ফেলে দেয়। এই ঘটনা হয়েছিল ১৯৭১ সালের আগষ্ট মাসের শেষের দিকে। নিজামী সাহেবের ভাগ্নেকে মারার কারণে নিজামীর নির্দেশে একদল রাজাকার বাতেনকে সোনাতলায় ধরে নিয়ে আসে এবং পথিমধ্যে তাহাকে নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা করে। এই ঘটনাটি ঘটে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে। আমি আমার জবানবন্দীতে যে অনিলের কথা বলেছি তার বাড়ি সাঁথিয়া থানার সোনাতলা গ্রামে ছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট তারিখে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর মতিউর রহমান নিজামী সাহেবের ভয়ে অনিল সোনাতলা গ্রাম ত্যাগ করে নীলফামারীতে চলে যায় এবং সেখানে অবস্থানকালীন সময়ে ৮ই মে, ২০১০ তারিখে মৃত্যুবরণ করে।
আমি আটঘড়িয়ায় অবস্থান করাকালে ১৯৭১ সালের আগষ্ট মাসের শেষ সপ্তাহে আমার স্কুল জীবনের বন্ধু স্বপনের সংগে আমার দেখা হয়। স্বপন আমাকে বলে যে, ১৯৭১ সালের ১০ই জুন তারিখে আমাদের স্কুলের শিক্ষক মাওলানা কছিম উদ্দিন আহম্মদসহ আরও দুইজনকে চোঁখ বাঁধা অবস্থায় পাকিস্তান আর্মিরা জীপে তুলে পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন স্বপন দেখেছিল যে পাক আর্মির ঐ জীপে মতিউর রহমান নিজামী সাহেব বসা ছিলেন। ০২-০৬-২০১১ তারিখে আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার অফিসে জবানবন্দী প্রদান করেছি। আমি যে মতিউর রহমান নিজামী সাহেবের কথা বলেছি তাকে আমি চিনি, তিনি অদ্য ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপস্থিত আছেন (সনাক্তকৃত)

জেরা-
জেরায় আইনজীবীর প্রশ্নে সাক্ষী যে উত্তর দেন তা নিম্নরূপ
আমার জন্ম তারিখ ০১-০১-১৯৫৪। ১৯৭০ সালে এস,এস,সি পাশ করার পর পাবনা এডওয়ার্ড কলেছে বি,এস,সিতে ভর্তি হই। আমার এইচ,এস,সি পড়াশুনাও পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। ১৯৭১ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্রলীগের সভাপতি বা সেক্রেটারী যে ছিলেন তাহা এডওয়ার্ড কলেজে আমার পড়াকালীন সময়ে ছাত্র সংসদেও কোন নির্বাচন হয়েছিল কিনা তাহা বলতে পারছি না। ঐ সময় এডওয়ার্ড কলেজে ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন আব্দুস ছাত্তার লালু, রফিকুল ইসলাম বকুল, সোহরাব উদ্দিন সোভা, ইশরাত আলী জিন্নাহ। ঐ সময় ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) এবং ইসলামী ছাত্রসংঘের কার্যক্রম ছিল। ছাত্রসংঘের উল্লেখযোগ্য কারো নাম আমার এ মূহুর্তে মনে পড়ছে না। আমি ঐ কলেজে পড়াশুনা করা ব্যতীত আমি পিতামাতার সঙ্গে শহরের বাসায় থাকতাম। আমাদের বাসা ছিল দিলাপুরে (পাথরতলা) ১৯৭১ সালে আমি পাবনা শহরের শালগাড়ি এলাকা চিনতাম। ১৯৭১ সালে নগরবাদি ফেরীঘাট পার হয়ে গাড়ী সাধারনত কাশিনাথপুর, পাবনা শহরের মুজাহিদ স্যারের পাশ দিয়ে যেতো। ১৯৭১ সালে পাবনা শহরের বাসস্ট্যান্ড ছিল গোপালপুর। নগরবাড়ী ঘাট থেকে রাজশাহী যাতায়াতের জন্য উল্লেখিত সড়ক পথ ছাড়া বিকল্প কোন সড়ক পথ ছিল না। বাসস্ট্যান্ড থেকে শালগাড়ীয়ার দূরত্ব ছিল উত্তর দিকে আনুমানিক দুই কিলোমিটার। বাসস্ট্যান্ড থেকে শালগাড়িয়ার দিকে একটি কাঁচা রাস্তা ছিল, তবে সেটা নগরবাড়ী থেকে রাজশাহী যাওয়ার রাস্তা হিসাবে ব্যবহৃত হতো না। ১৯৭১ সালে ৯ই এপ্রিল তারিখে পাকিস্তানী সৈন্যরা সর্বপ্রথম পাবনা শহরে আসে কিনা তাহা আমার মনে নাই। পাকিস্তানী আর্মিরা ১৯৭১ সালে নগরবাড়ী ঘাট দিয়ে পাবনায় প্রবেশ করেছিল। নগরবাড়ী ঘাট দিয়ে পাকিস্তানী আর্মিরা পাবনায় আসার আগে কিছু আর্মি যারা পাবনায় ছিল তারা ডাক বাংলায় অবস্থান করতো। ডাক বাংলায় অবস্থানরত আর্মিরা নগরবাড়ী ঘাট দিয়ে আসা আর্মিদের সঙ্গে একত্রিত হয়েছিল কিনা তাহা আমার জানা নাই। ডাক বাংলা থেকে আমাদের শহরের বাড়ির দূরত্ব ৪ কিলোমিটার। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ থেকে ২৯ শে মার্চ পর্যন্ত আমি পাবনা শহরে দিলাপুরে আমার বাড়িতে ছিলাম। উল্লেখিত সময়ের মধ্যে পাবনা শহরে কোন যুদ্ধ হয়নি, তবে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল যার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালিন জেলা প্রশাসক জনাব নূরুল কাদির সাহেব। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ থেকে ৯ই এপ্রিল তারিখের মধ্যে পাবনা শহরে কোন হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল কিনা তাহা আমার স্মরন নাই। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ থেকে ৯ই এপ্রিল তারিখ পর্যন্ত জেলা স্কুল মাঠ সেখানে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল সেখানে আমার যাতায়াত ছিল। জেলা স্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের যারা ট্রেনিং দিতেন তাদের মধ্যে ছিলেন কাছিম উদ্দিন স্যার, বকুল ভাইসহ আরও অনেকে ছিল সকলের নাম আমার মনে নাই। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ থেকে ৯ই এপ্রিল তারিখ পর্যন্ত কোন ই,পি,আর. সদস্যকে আমি পাবনা শহরে দেখেছিলাম কিনা তাহা আমার স্মরন নাই। পাবনা শহরে এন,এস,এফ. এর কার্যালয় কোথায় ছিল তাহা আমার স্মরন নাই। ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), ইসলামী ছাত্রসংঘের অফিস কোথায় ছিল তাহা আমার মনে পড়ছে না। ছাত্রলীগের অফিস ছিল শহরে তাহা আমি চিনতাম। ১৯৭১ সালে পাবনা শহর বা জেলার ছাত্রসংঘের সভাপতি বা সেক্রেটারীর নাম আমার মনে নাই। ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাবনা শহরে ছাত্রসংঘের পাঠক্রম কোথায় থেকে কে পরিচালনা করতো এ সম্পর্কে আমার কোন ধারনা নাই। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত পাবনা শহরে ইসলামী ছাত্রসংঘের কার্যক্রম সম্পর্কে আমার কোন ধারনা নেই। ৯ই এপ্রিল তারিখে নগরবাড়ী ঘাট দিয়ে পাকিস্তান আর্মিরা প্রবেশ করার পর আমি শহরে থাকতাম। আমি ১৯৭১ সালের মে মাসের শেষের দিকে ভারতে চলে যাই। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে আমি ভারত থেকে ফিরে আসি। ভারত থেকে ফেরত এসে চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার কোন একটা থানা এলাকায় ছিলাম তবে সেই থানার নাম আমার এ মূহুর্তে মনে পড়ছে না। ঐ এলাকায় বা চাপাইনবাবগঞ্জ জেলায় কতদিন ছিলাম তাহা অনুমান করে বলতে পারব না। ১৯৭১ সালে চাপাইনবাবনগঞ্জ জেলা থেকে পাবনা জেলায় ফেরত আসার আগ পর্যন্ত আমি বিভিন্ন জেলায় অবস্থান করেছি তবে তার নাম আমার এ মূহুর্তে স্মরন হচ্ছে না। বিজয় অর্জনের পর আমি বেড়া থানা এলাকায় আসি। আমি স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমি সাথিয়া এলাকায় যাই নাই। মে মাসের শেষের দিকে ভারত চলে যাওয়ার পর বিজয় অর্জন পর্যন্ত আমি পাবনা শহরে আসি নাই।
আমি আমার জবানবন্দীতে যে হাবিবুর রহমানের কথা বলেছি তার পিতার নাম শহীদ কোবাদ আলী,  সাকিম সাধুপাড়া, থানা পাবনা সদর কিনা তাহা আমি জানি না। আমি আমার জবানবন্দীতে যে বাতেনের নাম বলেছি তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত পাবনার রাজনীতি ত্রিধারায় বিভক্ত ছিল একটি হলো স্বাধীনতাপন্থী, একটি হলো পাকিস্তান পন্থী এবং অন্যটি নকশাল পন্থী। নকশাল পন্থীদের নেতৃত্বে টিপু বিশ্বাস ছিলেন তবে বাতেন ছিলেন কিনা তাহা আমার জানা নাই।
মতিউর রহমান নিজামী সাহেবের যে ভাগ্নেকে হত্যা করার কথা বলা হয়েছে তার নাম অনিল আমাকে বলে নাই কিংবা আমি জানি না। মতিউর রহমান নিজামী সাহেবের কোন ভাগ্নে ১৯৭১ সালে খুন হয়েছিল কিনা তাহা আমি অনুসন্ধান করি নাই বা যাচাই করি নাই।
আমি সাংগব মাছের নাম শুনেছি। সাংগব মাছের লেজ চাবুক হিসেবে ব্যবহার করা হয় কিনা তাহা আমি জানি না। আমি চর্ম রোগের চিকিৎসা করি। সাংগব মাছের লেজের বাড়ি মানুষের শরীরে লাগলে চামড়ায় পচন সৃষ্টি হয় কিনা তাহা আমার জানা নাই। অনিলের সঙ্গে আমার চলাফেরা দেখা সাক্ষাত হয়েছে। মতিউর রহমান নিজামী সাহেবকে ১৯৭১ সালে আগষ্ট মাসের শেষে আটক করা হয়েছিল মর্মে অনিল আমাকে কোন তথ্য দিয়েছিল কিনা তাহা এ মূহুর্তে আমার মনে নাই।
১৯৭৬ সালে আমি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ছাত্র হিসেবে ভর্তি হই। ১৯৭১ সালে বিজয় অর্জনের পর আমি দেশের বাইরে যাই এবং ১৯৭৪ সালে ফিরে এসে ১৯৭৬ সালে মেডিকেলে ভর্তি হই।
১৯৭১ সালে বিজয় অর্জনের পরে পাবনা শহর এবং বেড়া এলাকায় স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনের জন্য অনেক স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল। বিজয় অর্জনের পর থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মতিউর রহমান নিজামী সাহেবের বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়েছিল কিনা তাহা এ মূহুর্তে আমার স্মরন নাই। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ থেকে ১৯৭৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত কোন পত্রিকায় মতিউর রহমান নিজামী সাহেবকে আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে দেখিয়ে কোন সংবাদ পরিবেশিত হয়েছিল কিনা তাহা এ মূহুর্তে আমার মনে নাই। (চলবে)
পূনরায় জেরা
তাং- ০৮/০৭/২০১৩ ইং

মতিউর রহমান নিজামী সাহেবকে আমি কলেজে পড়াকালীন সময় থেকে চিনি। ১৯৭১ সাল বা তার আগে আমি মতিউর রহমান নিজামী সাহেবের বাড়িতে যাই নাই। ঐ সময় তার গ্রামের বাড়ি কোথায় ছিল তাহা আমি জানতাম না। আমি যতটুকু জানি তিনি আটঘরিয়ায় একটি মাদ্রাসায় জায়গীর থেকে লেখাপড়া করেছেন। তিনি ঐ মাদ্রাসায় কোন্ কাস থেকে কোন্ কাস পর্যন্ত পড়েছেন তাহা আমার জানা নাই। আমি সাথিয়া থানার সোনাতলা গ্রামে কোনদিন যাই নাই। অনিলেরা সম্ভবত চার ভাই। অনিলের পিতা সত্তর দশকের পূর্বেই নিলফামারীতে বাড়ি করে বসবাস করতেন, ইহা সত্য নহে। মতিউর রহমান নিজামী সাহেবের কোন বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগ্নেকে আমি কোন দিন দেখি নাই। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের আগে ১৯৭০ সালের পূর্বে আমি নিজামী সাহেবকে দেখেছি।
পাবনা শহর বা জেলায় শান্তি কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কে ছিলেন তাহা আমার মনে নাই। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে শান্তি কমিটি গঠিত হয়েছিল, তবে কোন্ মাসে তাহা আমার মনে নাই। ক্যাপ্টেন জায়েদী সাহেবকে চিনতাম তিনি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা বিরোধী ভূমিকা পালন করেন, তবে তিনি শান্তি কমিটি, রাজাকার নাকি আলবদরের সদস্য ছিলেন তাহা আমার মনে নাই।
শহিদ মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা কাছিম উদ্দিন সাহেবকে আমি যখন কাস থ্রিতে পড়তাম তখন থেকেই চিনতাম, তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০৩ রাইফেলের ট্রেনিং দিতেন, তিনি একজন ভাল ক্যাডেট প্রশিক্ষক ছিলেন। তার ট্রেনিং ক্যাম্প কতদিন স্থায়ী ছিল তাহা আমার মনে নাই।
আমি একটিই মাত্র বিবাহ করেছি, আমার শ্বশুরের নাম নারায়ণ চন্দ্র কুন্ডু। অনিল চন্দ্র কুন্ডুসহ তার এক ভাই মারা গেছে, অপর দুই ভাই জীবিত আছে। অনিল চন্দ্র কুন্ডুদের সোনাতলা গ্রামে কে কে থাকে তাহা আমার জানা নাই।
১৯৭১ সালের মে মাসে ভারতে যাওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমি পাবনার আটঘরিয়া ও চাটমোহর এলাকায় এসেছিলাম, তবে পাবনা শহরে আসি নাই। ১৯৭১ সালের আগষ্ট মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মতিউর রহমান নিজামী সাহেব পাবনার কোন্ এলাকায় থাকতেন তাহা আমার জানা নাই।
নিজামী সাহেব আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মর্মে সংবাদ আমি ১৯৭১ সালের দৈনিক সংগ্রাম কিংবা দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় দেখেছিলাম। ঐ সংবাদটি আমি ভারতে যাওয়ার আগে নাকি পরে দেখেছি তাহা আমার মনে নাই।
বি,এল,এফ বা তার গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নাই। দেশ স্বাধীনের পর পাবনা জেলায় নকশালদের কোন উৎপাত ছিল না, কিন্তু ১৯৭০ সালের পূর্বে ছিল।
“নিজামী সাহেবের ভাগ্নেকে মারার কারণে নিজামীর নির্দেশে একদল রাজাকার বাতেনকে সোনাতলায় ধরে নিয়ে আসে” বা “আমি আটঘড়িয়ায় অবস্থান করাকালে ১৯৭১ সালের আগষ্ট মাসের শেষ সপ্তাহে আমার স্কুল জীবনের বন্ধু স্বপনের সংগে আমার দেখা হয়। স্বপন আমাকে বলে যে, ১৯৭১ সালের ১০ই জুন তারিখে আমাদের স্কুলের শিক্ষক মাওলানা কছিম উদ্দিন আহম্মদসহ আরও দুইজনকে চোঁখ বাঁধা অবস্থায় পাকিস্তান আর্মিরা জীপে তুলে পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন স্বপন দেখেছিল যে পাক আর্মির ঐ জীপে মতিউর রহমান নিজামী সাহেব বসা ছিলেন।” একথাগুলি আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলি নাই, ইহা সত্য নহে।
তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের নাজিমে আলা যাকে সভাপতি বলা হয় আল বদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা একথাগুলি আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলি নাই, ইহা সত্য নহে। ১৯৭১ সালের মে মাস উল্লেখে রাজাকাররা অনিলের বাড়ি লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার কথা আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলি নাই, ইহা সত্য নহে।
তদন্তকারী কর্মকর্তার ডাকে আমি তার নিকট জবানবন্দী প্রদান করি। অনিলের উদ্ধৃতি দিয়ে আমি যে সাক্ষ্য প্রদান করেছি তাহা অসত্য, ইহা সত্য নহে। স্বপনের উদ্ধৃতি দিয়ে আমি যে সাক্ষ্য প্রদান করেছি তাহাও অসত্য, ইহা সত্য নহে। আমি একজন সরকারী কর্মকর্তা হওয়ায় সরকারী এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে মতিউর রহমান নিজামী সাহেবকে জড়িয়ে অসত্য জবানবন্দী দিয়েছি, ইহা সত্য নহে। (জেরা সমাপ্ত)

বৃহস্পতিবার, ৪ জুলাই, ২০১৩

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জেরা : দিনভর দফায় দফায় উত্তেজনা দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে


মেহেদী হাসান
বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপিকে জেরার সময় আজ দিনভর ট্রাইব্যুনালে দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বংশ পরিচয় নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর প্রথম প্রশ্ন  থেকেই তীব্র হৈচে এবং বাকবিতন্ডা শুরু হয় । সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার সহজসুলভ ভঙ্গিতে সবসমসয় হাসি এবং রসিকতা ছড়িয়ে উত্তর দিয়েছেন জেরার ।  আইনজীবীর কিছু কিছু প্রশ্নে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী যে জবাব দিয়েছেন তা মাঝে মাঝে হাসির রেশ ছড়িয়েছে পুরো ট্রাইব্যুনালে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে জেরা করেন।

জেরা :
প্রশ্ন : আপনার বংশ পরিচয় চৌধুরী নয়।
উত্তর : আমার বংশ পরিচয় সেনও না, পালও না দাসও না। আমার বংশ পরিচয় চৌধুরী।
প্রশ্ন : চৌধুরী সাহেব আপনার আদি বংশ পরিচয় কি?
উত্তর : আমার শরীরের গঠন থেকেই বুঝতে পারছেন আমি বাঙ্গালী বংশো™ভ’ত নই। আমাদের পূর্ব পুরুষ বাইরে থেকে এসেছে। তবে চিটাগাংয়ের লোক নিজেদের  বাঙ্গালী দাবি করেনা। আমরাও করিনা। আমরা বাংলাদেশী।
প্রশ্ন : আমি বলছি আপনাদের পূর্ব পুুরুষ লস্কর। তারা ভারতের গৌড় থেকে এসেছে।
উত্তর : সত্য নয়। এসময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবিরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি যতদূর জানি স্যার আপনাদের এলাকার (চেয়ারম্যানের বাড়ি চাপাইনবাবগঞ্জ এলাকায়) লোক গৌড় থেকে এসেছে। মেঘনা পাড়ি দিয়ে গৌড়ের কেউ চট্টগ্রামে যায়নি।
প্রশ্ন : ২ জুলাই আপনি যে চারটি প্রদর্শনী দাখিল করেছেন তা  পড়ে জেনে বুঝে শুনে দাখিল করেছেন।
উত্তর  : আমি পড়িনি। আমার উকিলরা হয়ত পড়েছেন।
প্রশ্ন : ট্রাইব্যুনালের আইন অনুযায়ী না জেনে বুঝে দাখিল করার কোন সুযোগ নাই।
উত্তর : আমার পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবীরা এটা দাখিল করেছেন। তারা পড়েছেন বা বুঝে শুনে করেছেন কি-না তা তারা জানে। আমার জানা নেই।
প্রশ্ন : আপনার সাক্ষ্যের পক্ষে আপনি কোন ডকুমেন্ট, পেপার কাটিং, সাময়িকী, বই দাখিল করেননি।
উত্তর : আমরা আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে পরে দাখিল করব।
প্রশ্ন : আপনার জন্ম ১৯৫৯ সালের ১৩ মার্চ রাউজানের  গহিরায় এক বাঙ্গালী মুসলিম পরিবারে।
উত্তর : সত্য নয়। চট্টগ্রাম শহরে মুসলিম পরিবারে আমার জন্ম। বাঙ্গালী মুসলিম পরিবার নয়।
প্রশ্ন : আপনার মাতৃভাষা কি?
উত্তর : চাটগাইয়া।
প্রশ্ন : আমি বলছি আপনার মাতৃভাষা বাংলা।
উত্তর : সঠিক নয়। তবে আমার বায়ের বাড়ি কুমিল্লা। এটা ত্রিপুরার সাথে যুক্ত ছিল।
প্রশ্ন : আপনার নয়দিন ব্যাপী জবানবন্দী চার্জের সাথে সম্পৃক্ত নয়।
উত্তর : সত্য নয়। আমার প্রত্যেকটা বাক্য, প্রত্যেকটা শব্দ চার্জের সাথে সম্পৃক্ত। যারা আমার জবানবন্দী পড়েছে তারা এটা বুঝবেন।  আপনিতো জবানবন্দী পড়েননি।
প্রশ্ন : চাটগাইয়া ভাষার কোন বর্নমালা আছে?
উত্তর : আছে। সিরাজগঞ্জের ড. আযম এটি লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
প্রশ্ন : চৌধুরী সাহেব, আপনিতো অনেক পড়াশুনা করা লোক। ১৯০৫ সালের পার্টিশান অব বেঙ্গল গভর্নমেন্ট রেজুলেশন পড়েছেন নিশ্চয়ই।
উত্তর : পড়েছি।
প্রশ্ন : জেয়াদ আল মালুম বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র প্রথম  খন্ডে বর্নিত সে রেজুলেশন থেকে কিছু অংশ পড়ে শোনান যেখানে বাংলা কোন এলাকা নিয়ে গঠিত তা বর্নিত আছে এবং আসাম যে বাংলার সাথে ঢাকার অধীনে আসাবে তা উল্লেখ করা আছে।   এরপর বিষয়টির প্রতি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
উত্তর : ঠিক আছে।
প্রশ্ন : একইভাবে ইন্ডিয়ান  ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট অব ১৯৪৭ ও আপনার পড়া এবং জানাশোনা আছে নিশ্চয়ই।
উত্তর : হ্যা।
প্রশ্ন : ভারত এবং পাকিস্তানের সীমানা বর্নিত আছে সে অংশ পড়ে শোনান জেয়াদ আল মালুম। এরপর বলেন, এই কথাগুলো এ্যক্টে উল্লেখ আছে।
উত্তর : আমার কাছে একটি রেফারেন্স থাকলে বা আরেকটি কপি থাকলে বুঝতে পারতাম আপনার কথা সঠিক কি-না। আপনি যা পড়ছেন সে বিষয়ে আমার ধারণা নেই।
প্রশ্ন : আপনার এবং আপনার পিতার জন্মের বহু আগে থেকেই  চট্টগ্রাম বাংলার অংশ ছিল। কখনোই চট্টগ্রাম বা চট্টগ্রামবাসী আলাদা জাতিসত্তা হিসেবে স্বীকৃত ছিলনা। এই  ঐতিহাসিক বাস্তবতা জানা সত্বেও সত্য গোপন করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দিয়েছেন আপনি।
উত্তর : সত্য নয়। এটা বৃটিশ এডমিনিস্ট্রটেটিভ অংশ  ছিল। বহু পূর্ব থেকে একসাথে ছিল যদি বলেন তাহলে আমার ভিন্নমত আছে। ওইপনিবেশিক বৃটিশ রাজের আইনের মাধ্যমে  জাতিতত্তার স্বীকৃতি পাওয়া যায় এই ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রশ্ন : স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন বাংলাদেশের সংবিধান।
উত্তর : সত্য। তবে আর্টিকেল ১৫৩ অনুযায়ী এই সংবিধানের কার্যকারিতা ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে  শুরু। এই সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদে ভূতপূর্ব কার্যকারিতার কোন সুযোগ  দেয়া হয়নি।
প্রশ্ন : চট্টগ্রাম বিষয়ে আপনি গত ১৮ জুন যে জবানবন্দী দিয়েছেন তা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, সংবিধান অবমাননার শামিল এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে।
উত্তর : সংবিধান সম্পর্কে জ্ঞানের স্বল্পতার কারনে  এ ধরনের প্রশ্ন করছেন। আমার বক্তব্য সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাংঘর্ষিক এবং অবমাননাকর তা উল্লেখ করেননি বিধায় সাংঘর্ষিক আখ্যায়িত করা যাচ্ছেনা।
প্রশ্ন : অনুচ্ছেদ ৭ (ক) (১), ৮ (ক) (২) অনুযায়ী সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং অবমাননাকর।
উত্তর : ৭ (ক) তে সংবিধান লঙ্ঘনের কথা বলা আছে। আমার জবানবন্দীর মাধ্যমে কোনটা ভঙ্গ করেছি তা বলেন।
প্রশ্ন : ১৮ জুনের আপনার দেয়া জবানবন্দী সংবিধানের প্রস্তাবনার বিরোধী এবং একইভাবে অনুচ্ছেদ ১-প্রজাতন্ত্র, ২-রাষ্ট্রের সীমানা, ৩-রাষ্ট্রভাষা, ৪-জাতীয় সঙ্গীত পতাকা ও প্রতীক, ৬-নাগরিকত্ব, ৮-মূলনীতিসমূহ, ৯-জাতীয়তাবাদ, ১০-সমাজতন্ত্র তথা শোসনমুক্তি, ১২-ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদ এর বিরোধী আপনার বক্তব্য। অনুচ্ছেদ ৭ (ক) (১) অনুযায়ী আপনার বক্তব্য ঔদ্ধত্যপূর্ণ, সংবিধান বিরোধী।
উত্তর :  আমার কোন বক্তব্য কোন আইনের কোন ধারার সাথে সাংঘর্ষিক? যেমন আমার বক্তব্যের কোন অংশ সংবিধানের প্রস্তাবনার সাথে সাংঘষির্ক এসব বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নয় বিধায় এর জবাব দেয়া সম্ভব নয়।
প্রশ্ন : ১৯৭০ সালে আপনার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী কোন এলাকার প্রার্থী ছিলেন?
উত্তর : রাউজান, হাটহাজারী।
প্রশ্ন : আওয়ামী লীগ প্রার্থী ছিলেন অধ্যাপক মো : খালেদ এবং তার কাছে বিপুল ভোটে আপনার পিতা পরাজিত হন।
উত্তর : শুনেছি।
প্রশ্ন : এই পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে না পেরে আপনার পিতা এবং আপনি শসস্ত্র গুন্ডাদের সাথে নিয়ে (আসামী পক্ষের আইনজীবীরা এসময় হৈচে করেন) পরাজয়ের পর থেকে রাউজানের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর শসস্ত্র হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং লুটতরাজের মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টি করে প্রথম সাধারন নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে রাউজানের  দণিাঞ্চলে দাঙ্গাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে অনেকেকে মারপিট  এবং রক্তাক্ত যখম করা হয়। এর বিস্তারিত খবর ১৯৭০ সালের ৯ ডিসম্বের আজাদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
উত্তর : আজাদী পত্রিকার এডিটর  খালেদ সাহেব ছিলেন আমার বাবার প্রতিদ্বন্দ্বী। তার পত্রিকায়  কি ছাপা হয়েছিল তা আমার জানা নেই।

আপনার ফাঁসির বাসনা আমারা পূরন করতে পারবনা :
এসময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এ প্রশ্নের জবাবে আরো একটু ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন আমি তখন কোন প্রার্থী ছিলামনা, কোন দলের সদস্যও ছিলামনা। প্রার্থী ছিলেন আমার পিতা। কাজেই আমার গ্লানির কি আছে। এ বিষয়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ব্যাখ্যা দিতে  চাইলে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আর দরকার নেই। আপনার কাছে জানতে মূলত জানতে চাওয়া হয়েছে আপনি পত্রিকার ওই খবরটা জানতেন কি-না। এতটুকু।
তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, একটা কথা বলতে চাই কিছু মনে করবেননা। আমার ফাঁসির রায়ে একথাটা একটু লিখে দিয়েন।

তখন চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবির বলেন, আমি ৩১ বছর সেশন জজ  হিসেবে ট্রায়াল করেছি। কাউকে কোনদিন বলতে শুনিনি আমাকে ফাঁসি দেন। এই ট্রাইব্যুনালেও আপনি ছাড়া আরো অনেক আসামী আছে। তাদেরও কাউকে বলতে শুনিনি আমাকে ফাঁসি দেন। তারা সবসময় নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।  কিন্তু আপনি বারবার বলছেন আমাকে ফাঁসি দেন, জেল দেন। আমি  বছর দশেক আগে একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম। সেটা ছিল অপরাধীদের মনস্তত্ব বিষয়ে। একজন অপরাধী যখন তার অপরাধের বিষয়ে খুব বেশি অনুশোচনায় ভোগেন তখন তিনি  বলেন, আমাকে ফাঁসি দেন, আমাকে মেরে ফেলেন, আমাকে শাস্তি দেন। আমি জানিনা আপনি ৭১ সালের কোন অনুশোচনার কারনে না কি অন্য কোন কারনে বারবার ফাসির দাবি করছেন। সেটা আপনিই জানেন, আমরা জানিনা। তবে আপনার চাওয়া অনুযায়ী আপনার ফাঁসির বাসনা পূরন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা কেবল আমাদের সামনে যে সাক্ষ্য প্রমান আসবে সে অনুযায়ী বিচার করব।
তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক কারনে এ বিচার হচ্ছে। সেজন্য হতাশা থেকে মাঝে মাঝে একথা বলি। গাজিপুরে একটি বিচার হচ্ছে। ৬ তারিখ তার রায় হবে।

প্রশ্ন : প্রদর্শনী বি। ড. এম এ হাসান কর্র্তৃক রচিত বই-যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা ও বিচার প্রসঙ্গ। এর ১৬৩ পৃষ্ঠায় ডিটেইলস অব নেম অব পলিটিক্যাল মেম্বার অব একিউজড অব ক্রাইমস এগেন্স হিউম্যানিটি এন্ড ক্রাইম অব জেনোসাইড শিরোনামে ১০৬ জনের নামের তালিকা আছে। ১৬৬ পৃষ্ঠায় তালিকার ৯৫ ক্রমিকে ফজলুল কাদের চৌধুরী মুসিলম লীগ সভাপতি, চট্টগ্রাম উল্লেখ আছে। ৯৮ ক্রমিকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মেম্বার অব মুসলিম লীগ উল্লেখ আছে।
উত্তর : সত্য। এটা ওই লেখকের অভিমত।
প্রশ্ন : প্রদর্শনী সি। সিরু বাঙ্গালীর লেখা-আমার যুদ্ধ, আমার একাত্তর বইয়ের ১০৯  পৃষ্ঠায় জালালাবাদ এম্বুশ: ব্যর্থ পরিবের সাথে মতবিরোধ শিরোনামে লেখা হয়েছে-১৪ জুন সোমবার সকালে ক্যাপ্টেন করিম আমাকে নির্দেশ দিল ফজুলল কাদের চৌধুরীর ছাত্রবাহিনী হাটহাজারি লালিয়াহাটের সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে এম্বুশ করে খতম করতে হবে।
১১১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-চারটা হতে ছয়টার মধ্যেই সৈয়দ ওয়াদিুল আলম ও ফজুলল কাদের চৌধুরীর বড় ছেলে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে সাকা চৌধুরী জীপ নিয়ে শহরে তাদের জিপ নিয়ে নির্যাতন কেন্দ্র গুড়সহিলের দিকে যাচ্ছে। ছয়টা বাজার আগেই দেখলাম  আমাকে যে ছেলেটি ইনফরমেশন দিয়েছে সে  দিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে তার ইনফরমেশন ঠিক ছিল কি-না এব্যাপারে। সে নিশ্চিত হতে পারছিলনা। শেষ পর্যন্ত আমি প্রগ্রাম বাতিল করতে বাধ্য হলাম।  এ ঘটনার দুই দিনপর হাটহাজারি থেকে ইনফরমেশন নিয়ে আসা সেই ছেলেটির কাছে শুনেছিলাম যে, তার ইনফরমেশন আদতে একদম খাটি ছিল। কিন্তু যে কোন কারনেই হোক শত্রুরা চারটা বাজার অনেক আগেই আড়াইটার সময় রাউজানের গহিরা থেকে রহমতগঞ্জ থেকে  গুডসহিলে ফেরত আসে। সে কারনে আমাদের এম্বুশ ব্যর্থ হয়।
উত্তর  : নিশ্চয়ই উল্লেখ আছে। আপনারাই প্রমান দিলেন আমি ছিলামনা। একথা বলে হাসেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
প্রশ্ন : একই লেখকের আরেকটি বই বাঙ্গাল কেন যুদ্ধে গেল বইতেও একই তথ্য উল্লেখ আছে।
উত্তর : হ্যা। এটাই প্রমান করে আমি ওখানে যাইনি।
প্রশ্ন : আপনার শিক্ষা জীবনের কোন সনদ দাখিল করেননি।
উত্তর : ট্রাইব্যুনালে কেন নির্বাচন কমিশনেও দাখিল করিনি।
প্রশ্ন : একইভাবে হল হোস্টেল বা রেসিডেন্স এর কোন ডকুমেন্টও দাখিল করেনন্ ি
উত্তর : আমি কোনদিন হলে থাকিনি।
প্রশ্ন : আপনার জবানবন্দী অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্জাব এবং লন্ডনের লিংকন ইনে পড়ার কথা সত্য নয়।
উত্তর : আপনার দাবি সত্য নয়।
প্রশ্ন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় এবং লিঙ্কন ইনে পড়ার কোন ডকুমেন্ট দাখিল করেননি।
উত্তর : আমার এসব লাগেনা।
১৯৭১ সালের ২০ সেপ্টম্বর চট্টগ্রামে গেরিলা বাহিনীর আক্রমনে আঘাতের কারনে আহত হয়ে চট্টগ্রামে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। ওই আক্রমনে আপনার ড্রাইভার নিহত হয়। পিটিআই পরিবেশিত এই খবর আপনার পিতা ফজলুল কাদের চৌধরুল তথ্যের ভিত্তিতে ২৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তা আপনি গোপন করেছেন আপনার জবানবন্দীতে।
উত্তর : ২০ এবং ২৯ সেপ্টেম্বর আমি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেই ছিলামনা।
প্রশ্ন : ১৯৭৪ সালে দেশে ফেরত আসা বিষয়ে কোন বিমান টিকেট, ভিাস পাসপোর্ট ডকুমেন্ট হিসেবে জমা দেনন।ি
উত্তর : সত্য তবে। ১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল থেকে ১৯৭৪ সালের ২০ এপ্রিল পর্যন্ত আমার স্থায়ী ঠিকানার কোন ডকুমেন্ট ট্রাইব্যুনালে কোন পক্ষ থেকে প্রদর্শন করা হয়নি।
প্রশ্ন : আপনি ১৯৭৪ সালে বেনামে, বেআইনীভাবে দেশে এসেছেন।
উত্তর : সত্য নয়। নিজনামে আইনীভাবেই এসেছি।
প্রশ্ন : আপনি দেশে আসার পর ১৯৭৪ সালে ছদ্মবেশে ছিলেন।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর গেরিলা আক্রমনে আহত হওয়ার পর চিকিৎসা শেষে আপনি দেশ থেকে পালিয়ে যান।
উত্তর : সত্য নয়। আমি তো দেশেই ছিলামনা।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালের ঘটনায় ১৯৭২ সালে আপনার বিরুদ্ধে দালাল আইনে অনেক মামলা হয় এবং জনরোষ থেকে বাঁচার জন্য আপনি আত্মগোপনে ছিলেন।
উত্তর : সত্য নয়। তবে আত্মগোপন অবস্থায়, জনরোষ নিয়েও  আমি রাউজান থেকে তিনবারসহ মোট ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি।
প্রশ্ন : আত্মগোপনে থাকার কারনে ১৯৭৪ সালের ২৩ জুন আপনার ছোট বোন হাসিনা চৌধুরীর বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারেননি।
উত্তর : সত্য নয়। আমিই পাত্রী তুলে দিয়েছিলাম বরের হাতে। আমি সর্বক্ষন উপস্থিত ছিলাম।
প্রশ্ন : পরে আপনি গোপন আস্তানা থেকে শাড়ি এবং বোরকা পরে এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে আপনার বোন এবং বোনজামাইকে আর্শীবাদ করেন।
এসময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, এসব প্রশ্নের কি দরকার। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, খুবই দরকারী প্রশ্ন এটা। ছয়ফুট দুই ইঞ্চি একজন মানুষ বোরখা পড়লে কি অবস্থা দাড়ায় তা দেখুক মানুষ। বলে তীব্র হাসি শুরু করলেন। এসময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে সে হাসির রেশ। এরপর এ প্রশ্নের উত্তর লেখা হয় সত্য নয় বলে।
উত্তর : ৯ দিনের দীর্ঘ জবানবন্দীতে আপনি কোথাও নিজেকে নির্দোষ দাবি করেননি।
উত্তর : রাজনৈতিক নিষ্পেষনের শিকার হিসেবে আমি এখানে দাড়িয়ে আছি। আমি বলেছি আমি তখন দেশেই ছিলামনা। কাজেই নির্দোষ দাবির দরকার কোথায় এখানে।
আজ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জেরা শেষ হয়েছে। আগামী ৮ জুলাই তার পক্ষে পরবর্তী সাক্ষীর তারিখ ধার্য করা হয়েছে।

মঙ্গলবার, ২ জুলাই, ২০১৩

কিছু ব্যর্থ বামপ্রেমিকদের পৃষ্ঠপোশকতায় জাতিকে বিভক্ত এবং মুসলমানদের দোষী সাব্যস্ত করার জন্য বিচার চলছে-ট্রাইব্যুনালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী

মেহেদী হাসান
বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার জবানবন্দীতে বলেছেন, এ দেশের মুসলমানদের দোষী হিসেবে  সাব্যস্ত করার জন্যই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ  নেতাদের বিরুদ্ধে  বিচার পরিচালিত হচ্ছে।  তারই অংশ হিসেবে  আজ এদেশের আলেমদের বিরুদ্ধে কোরাস তোলা হয়েছে এবং মুসলিম নেতাদের বিচার করা হচ্ছে ।

তিনি বলেন, কিছু ব্যর্থ বামপ্রেমিকদের প্ররোচনায় আজ আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নিষ্পেষন চলছে। ধর্মনিরপক্ষেতার ছদ্মাবরনে তারা আজ জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত করার  প্রচেষ্টায় লিপ্ত।  এই অশুভ  প্রচেষ্টারই  অংশ হিসেবে তারা এদেশে আলেমদের বিরুদ্ধে কোরাস তুলছে এবং নানা রকম আইনের অধীনে মুসলিম উম্মাহর নেতাদের বিচার করা হচ্ছে। উদ্দেশ্যমূলক এই কর্মসূচীরই অংশ হিসেবে আজ আমি এই ট্রাইব্যুনালের সামনে দণ্ডায়মান আছি। আজকের সমাজ যেখানে নাস্তিক এবং বিশ্বাসী এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে সেখানে আমি বর্তমানে হুমকির মুখে থাকা বিশ্বাসীদের দলে রয়েছি এবং তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করছি। ফলে আমি আমার প্রথাগত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নাস্তিকদের ক্রোধ এবং বিষের শিকার হয়েছি।

আজ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দীর শেষ দিনে একথা বলেন। তিনি বলেন, আমি আবারো দায়িত্ব নিয়ে বলছি ১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল থেকে ১৯৭৪ সালের ২০ এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানে ছিলাম; বাংলাদেশে ছিলামনা। এ বিষয়ে সমস্ত ডকুমেন্ট আমার রয়েছে।
আজ  সালাহউািদ্দন কাদের চৌধুরীর জবানবন্দী শেষে জেরা শুরু হয়েছে। জবানবন্দী প্রদান থেকে শুরু করে জেরা পর্যন্ত দফায় দফায় দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র বাকবিতন্ডা এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ইংরেজিতে দেয়া জবানবন্দীতে  বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনের গো-দেবতাদের সম্মান দেখাতে না পারার কারনে আমি আজ রাজনৈতিক নিষ্পেষনের শিকার। আমার কোন সন্দেহ নাই যে, ১৯৭১ সালে এখানে নির্মম গনহত্যা পরিচালিত হয়েছে। আমি এ মাটির সন্তান। ভারত থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে আসিনি। কাজেই বাংলাদেশের  প্রতি আমার দেশপ্রেম এবং আনুগত্য নিখাঁদ এবং প্রশ্নাতীত। বীর  মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমরা আর্থিক এবং বস্তুগত নানা সহায়তার মাধ্যমে  সম্মান দেখিয়েছি। আমি  বিশ্বাস করি এবং জোর দিয়ে বলছি আমরা  তিরিশ লক্ষ শহীদীদেরকে শুধুমাত্র সংখ্যার মধ্যে লুকিয়ে রেখেছি উদ্দেশ্যমূলকভাবে। শসস্ত্র বাহিনীর  মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তাদের নাম ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের গেটে খোদাই করে রাখা হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল ৪২ বছরেও আমরা ৩০ লাখ বেসামরিক শহীদদের নামাঙ্কিত করতে পারিনি। তবে আশার বিষয় হল আমার বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জে কিছু নাম উঠে এসেছে যাদেরকে গত ৪২ বছরেও কেউ স্বীকৃতি দেয়নি এবং দাবিও করেনি। আমার বিরুদ্ধে চার্জে যেসব মৃত ব্যক্তিদের নাম উঠে  এসেছে তাদের অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর এবং শত্রু সম্পত্তি অধ্যাদেশ জারির পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিপুল সংখ্যক হিন্দু  ভারতে চলে যায়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে আবার বাংলাদেশে চলে আসে। শত্রু সম্পত্তি অধ্যাদেশের মাধ্যমে দখলীকৃত জমি  ফেরত দাবি করে হিন্দুদের ৭৪ হাজার মামলা বর্তমানে পেন্ডিং আছে। আমার বিরুদ্ধে চার্জে  মৃত যাদের নাম আছে তাদের মধ্যে একমাত্র নূতন চন্দ্র সিংহ বাবু ছাড়া আর কারোর নাম ১৯৭০ সালের ভোটার লিস্টে বা জমির রেকর্ডে নেই।  কারো কবর বা চিতার ডিএনএ টেস্টও করা হয়নি।

জেরায় তীব্র উত্তেজনা :
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী জবানবন্দী প্রদানের সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে দীর্ঘসুত্রিতার অভিযোগ তোলা হয়। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমাকে ফাঁসির কাষ্ঠে দাড় করিয়েছেন। কথাতো বলতে দিতেই হবে। তখন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম বলেন, অপরাধ করলেতো কাঠগড়ায় দাড়াতে হবে। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আপনাদেরও যে এখানে দাড়াতে হতে পারে তা কি করে অস্বীকার করি। কাজেই অত বলবেননা। তখন জেয়াদ আল মালুম সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে হুমকি দেয়ার অভিযোগ করেন।
এরপর জেরার শুরু হলে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয় দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জবানবন্দী শেষে জেয়াদ আল মালুম তাকে জেরা শুরু করেন। জেরায় প্রথম প্রশ্ন করেন, আপনার নাম সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে সাকা চৌধুরী। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী  উত্তর দেন ‘নো’ বলে। কিন্তু আদালতের প্রসিডিংসে উত্তরটি লেখা হয় এভাবে ‘আমার নাম সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, সাকা চৌধুরী নয়।
তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমিতো  এ উত্তর দেইনি। আমি শুধু বলেছি ‘নো’। কারণ এ প্রশ্নটির মধ্যে এক ধরনের ইনসাল্টিংয়ের বিষয় আছে। তখন কোর্ট তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, এতে ইনসাল্টিংয়ের কিছু নেই। তাছাড়া বোঝার সুবিধার্থে কোর্টের নিয়ম অনুযায়ী উত্তর লিখতে হবে।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী জেরার শুরুতে বলেন, আমি ইংরেজিতে উত্তর দেব। তখন কোর্ট বলেন, প্রশ্নগুলো করা হচ্ছে বাংলায়। উত্তর যদি ইংরেজিতে লেখা হয় তাহলে দেখতে ভাল দেখায়না। আপনি ইংরেজিতেই উত্তর বলেন। আমরা আমাদের মত করে বাংলায় লিখব।
এরপর জেয়াদ আল মালুম প্রশ্ন করেন, আপনি গত ১৭ জুন থেকে ৯ দিন ধরে সাক্ষ্য দেয়ার নামে যা বলেছেন তা জেনে বুঝে বলেছেনতো?
তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ইংরেজিতে জোর দিয়ে বলিষ্ঠভাবে বলেন, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। হোয়াট আই সে আই মিন ইট এন্ড আই সে ইট নোয়িংলি (আমি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আমি যা বলি তা মিন করি এবং আমি যা বলি তা জেনে বুঝেই বলি)।
কিন্তু উত্তরটি প্রথমে বাংলায় লেখার সময়  কোর্টের পক্ষ থেকে বাংলায় উচ্চারন করা হয়-আমি আমার জবানবন্দীতে যা বলেছি তা সঠিক এবং বুঝে শুনেই বলেছি। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমি যা ইংরেজি বললাম তার অর্থতো এর মধ্যে আসলনা। তখন আরেকটু পরিবর্তন করে বাংলা লেখা  রেকর্ড করা হয়।
এরপর তাকে প্রশ্ন করা হয়-আপনি যে দীর্ঘ পারিবারিক পরিচয় বললেন তার  কৃষ্ঠি আছে?
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আছে।
এ পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জেরার প্রস্তুতির জন্য আগামী রোববার পর্যন্ত মুলতবি প্রার্থনা করা হয়। কোর্ট বৃহষ্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি করেন।
ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির, সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এবং বিচারপতি আনোয়ারুল হক গতকাল বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

সোমবার, ১ জুলাই, ২০১৩

১৯৭১ সালে পাকিস্তানে অবস্থান বিষয়ে সাক্ষী হিসেবে সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিসহ জীবিত অনেকের নাম বললেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী


মেহেদী হাসান
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে হত্যা, গনহত্যা, অগ্নিসংযোগ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেসব অপরাধ সংঘটনের  সময়কাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মূলত এপ্রিল এবং অক্টোবর মাসে। সাক্ষীরাও বলেছেন তারা রাউজান রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এপ্রিল মাসে হত্যা এবং গনহত্যায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে অংশ নিতে দেখেছেন।

কিন্তু আজ  সোমবার সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন ১৯৭১ সালে  তিনি পাকিস্তান ছিলেন। বাংলাদেশে ছিলেননা। পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। ১৯৭১ সালে তার পাকিস্তান অবস্থান বিষয়ে বাংলাদেশের এবং পাকিস্তানের জীবিত অনেক ভিআইপি ব্যক্তিবর্গের নাম  উল্লেখ করেছেন তিনি। বাংলাদেশে যাদের নাম উল্লেখ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন সুপ্রীম কোর্টের বর্তমান বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নাম। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেছেন শামীম হাসনাইন তার সাথে তখন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন এবং তিনি তার বন্ধু ছিলেন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানে অবস্থান বিষয়ে পাকিস্তানে বর্তমানে জীবিত যেসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নাম উল্লেখ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এবং ২০০৮ সালে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মিয়া সামরু, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ইসকাহ খান খাকওয়ানী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিদ্দিক খান কানজু প্রমুখ। এরা সকলেই তার কাসমেট ছিলেন। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ট্রাইব্যুনালে বলেন, আমি যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ছিলাম সে মর্মে তারাসহ আরো অনেকে এফিডেভিড পাঠিয়েছেন আমাকে। তারা আমার পক্ষে এসে সাক্ষ্য দিতে চান কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তাদের এদেশে আসার বিষয়ে ভিসা দিচ্চেনা।

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান  সালাহউদ্দিন কাদের সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচার চলছে। নিজের পক্ষে নিজে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি আজ  ট্রাইব্যুনালে এসব তথ্য উত্থাপন করেন।

ইংরেজিতে প্রদান করা জবানবন্দীতে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ আমি করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করি।  আমার বন্ধু এবং  কাজিন কাইউম রেজা চৌধুরী আমাকে তেজগাও বিমানবন্দরে পৌছে দেন। পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের (পিআইএ) ডিস্ট্রিক ম্যানেজার হামিদ জংয়ের সহায়তায় আমি একটি সিট পাই। ওইদিন সন্ধ্যায় আমি করাচি পৌছাই। সেখানে আমাকে আমার স্কুল জীবনের বন্ধু মুনিব আরজুমান্দ খান এবং মেহমুদ হারুনের প্রাইভেট সেক্রেটারি  রিসিভ   করে আমাকে। মেহমুদ হারুন পরে  হামিদ জংকে একটি ধন্যবাদ বার্তা পাঠিয়েছিলেন আমাকে সিট ম্যানেজ করে দেয়ার জন্য।
আমি মেহমুদ হারুনের বাড়ি- সিফিল্ড, ভিক্টোরিয়া রোড, করাচিতে উঠলাম। তিন হারুন ব্রাদার যথা ইউসুফ এ হারুন, মেহমুদ এ হারুন এবং সাইয়্যেদ এ হারুন ছিল স্যার আব্দুল্লাহ হারুনের ছেলে। বৃটিশ ইন্ডিয়ায় স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সময় আমার পিতার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক  পৃষ্ঠপোষক  ছিলেন স্যার আব্দুল্লাহ হারুন। হারুন ভ্রাতৃত্রয় মধ্য পঞ্চাশের দশক থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করেছেন। তারা ছিল আলফা ইন্স্যুরেন্স এর মালিক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহামন  এর একজন উপদেষ্টা ছিলেন।  করাচির সিফিল্ডে আমি ১৯৭১ সালের এপ্রিলে তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত    থেকেছি। এসসময় সিফিল্ডে ইউসুফ এ হারুনের সাথে আমার  কয়েকবার দেখা হয় স্বাভাবিকভাবে। তখন তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। হারুন পরিবার ছিল ডন গ্রপ অব পাবলিকেশন্স এর মালিক এবং ডন পত্রিকা যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর দাবির প্রতি  সমর্থন জানিয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। এর প্রতিদানে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার পর হিথ্রো এয়ারপোর্টে মেহমুদ এ হারুনের কথা স্মরন করেছিলেন।  দুই পরিবারের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রীয় সফরে ইউসুফ এ হারুন ঢাকায় আসলে শেখ হাসিনা তার সাথে সাক্ষাত করেন।
ইউসুফ এ হারুন এক বছর আগে মারা গেছেন। মেহমুদ এ হারুন মারা যান  তিন বছর আগে । আম্বার হারুন সাইগল নামে বর্তমানে মেহমুদ এ হারুনের এক  কন্য রয়েছেন। ১৯৭১ সালে এপ্রিলের  প্রথম তিন সপ্তাহ যে আমি করাচি তাদের বাসায় ছিলাম  সে মর্মে আম্বার হারুন সাইগল একটি বিবরন এফিডেভিড করে পাঠিয়েছেন। করাচি থাকাকালে  মুনিব আরজুমান্দ খান এবং মোহাম্মদ মিয়া সামরুর সাথে আমার পরিচয় হয়। সাদিক পাবলিক স্কুলে পড়ার সময় সামরু ছিলেন আমার কাসমেট । সামরু পরবর্তীতে ২০০৮ সালে পাকিস্তানের কেয়ারটেকার সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন। মুনিব আরজুমান্দ খান  এবং সামরু দুজনেই আমার ১৯৭১ সালের এপ্রিলে পাকিস্তান অবস্থান বিষয়ে বিবরন দিয়ে এফিডেভিড পাঠিয়েছেন। তারা আমার পক্ষে সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারেও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ইসলামবাদে বাংলাদেশের দূতাবাস তাদেরকে ভিসা দিচ্ছেনা।
আমার ঢাকার বন্ধু সালমান এফ রহমান, নিজাম আহমেদ, কাইউম রেজা চৌধুরী, আরিফ জিওয়ানীম ওসমান সিদ্দিক, রেজাউর রহমান এরা সকলেই এপ্রিল মাসে ঢাকার ভয়াবহ পরিস্থিতির কারনে করাচিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
ওসমান সিদ্দিকির পিতা ছিলেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার বদলী কাগজপত্র পাঠানোর ব্যাপারে তিনিই আমাকে সব ধরনের সহায়তা করেন। ঢাকা থেকে কাগজপত্র পাবার পর আমার বন্ধু ইসহাক খান খাকওয়ানীর পরামর্শে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। এরপর তার সাথেই বসবাস শুরু করলাম। এপ্রিলের  তৃতীয় সপ্তায় আমি লাহোর পৌছলাম এবং  ইসহাক খান খাকওয়ানির আল-আজম বাড়িতে বাস করা শুরু করলাম। এটা ছিল ৭, ওয়াহদাত কলোনি রোড, লাহোর।
আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স শেষ বর্ষে ভর্তি  হলাম বদলী ছাত্র হিসেবে। এখানে আমার বন্ধু শামীম হাসনাইনের সাথে সাক্ষাৎ হল। তিনি ১৯৭১ সালে মে মাসে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার সাথে  ১৯৬৬ সাল থেকে নটরডেম কলেজে থাকতে আমার পরিচয়। এরপর একসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং খাকওয়ানীর বাড়িতেও শামীম হাসনাইনের সাথে আমার দেখা সাক্ষাৎ হত। লাহোরে থাকতে যাদের সাথে আমার দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন রিয়াজ নূন, নাঈম আখন্দ, মোহাম্মদ মিয়া সামরু। তারা প্রত্যেকেই লাহোর থাকা বিষয়ে এফিডেভিড পাঠিয়েছেন। আমি যে ১৯৭১ সালে তাদের সাথে লাহোর ছিলাম সে মর্মে তারা আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে চান  কিন্তু তাদেরকে বাংলাদেশে আসার বিষয়ে ভিসা দেয়া হচ্ছেনা। আম্বার হারুন সাইগল এখন হেরাল্ড গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স এর চেয়ারম্যান। তিনিও আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে চান কিন্তু তাকেও ভিসা দেয়া হচ্ছেনা বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে।
১৯৭১ সালের মে মাসে আমি আমার পুরনো কাসমেট নাসির খান খাকওয়ানীর এনগেজমেন্ট অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য  মুলতান গিয়েছিলাম। আমার সাথে সিদ্দিক খান কানজু, নাঈম আখন্দ, রিয়াজ নূন, ইসহাক খান খাকওয়ানী ছিল । জুন জুলাই এবং আগস্ট মাসে আমার অবস্থান  লাহোরে সীমাবদ্ধ ছিল। কারণ আমি ফাইনাল পরীক্ষার পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন সিলেবাসের কারনে আমি  বেশ চাপে ছিলাম এবং শামীম হাসনাইন এবং আমি দীর্ঘ সময় লাইব্রেরিতে কাটাতাম। এসময় লাহোরে আমার পরিচিত আর যেসব বাঙ্গালী ছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন আমার কাজিন ফারহানা রহমান, এবং হুসাইন রহমান। ফারহানা তখন লাহোরে  কিনিয়ার্ড কলেজে পড়ত। আর হুসাইন রহমান ছিল আমার নটরডেম কলেজের এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  বন্ধুৃ। ফারহানা এবং হুসাইন রহমান পরষ্পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। মুলতানে আমি আমার বন্ধুর বিবাহ অনুষ্ঠানে যাবার সময় তাদেরও দাওয়াত করেছিলাম কিন্তু তারা কেউ রাজি হয়নি।
লাহোর থাকার সময় সেখানে আমার কাছে যারা গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন সালমান এফ রহমান। তিনি তিন থেকে চারবার আমার কাছে গিয়েছিলেন। তিনি থাকতেন স্যার সিকান্দার হায়াত খানের ছেলে সরদার শওকত হায়াত খানের সাথে।
১৯৭১ সালের আগস্টে পরীক্ষা শেষে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে পাকিস্তানের উত্তারাঞ্চলের পার্বত্য অঞ্চল মারিতে যাই তিন সপ্তাহের জন্য।   ইসহাক খান খাকওয়ানী, রিয়াজ  নূন, নাঈম আখন্দ, সালমান এফ রহমান, সিদ্দিক খান  কানজু, মুনিব আরজুমান্দ খান এবং আমি  গিয়েছিলাম সেখানে। লাহোর ফিরে এসে আমরা আমাদের বন্ধু রিয়াজ নূনকে ১৯৭১ সালের ২৪ অথবা ২৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে বিদায় জানালাম। এর মধ্যে ইসহাক খান খাকওয়ানী, নাঈম আখন্দ এবং আমি লাহোর থেকে লন্ডন যাত্রার প্রস্ততি নিলাম সড়কপথে। আমার বাবা সম্ভবত ৮ অক্টোবর লাহোর আসলেন এবং অ্যাম্বাসেডর হোটেলে ছিলেন । সম্ভবত ১৯ অক্টোবর আমি তাকে সেখানে বিদায় জানালাম। সেটাই ছিল আব্বার সাথে আমার জীবনের শেষ দেখা (এসময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী কাঠগড়ায় আবেগ আপ্লূত হয়ে পড়েন এবং রুমাল দিয়ে চোখ মোছেন)।

আমরা লাহোর থেকে প্রথমে ইসলামাবাদে যাত্রাবিরতি করলাম। সেখানে আমার কাজিন জর্জিয়ার বাসায় উঠলাম দুপুরে। তার স্বামী হেদায়েত আহমেদ ছিলেন ক্যাবিনেট ডিভিশনের ডেপুটি সেক্রেটরি। ওইদিন রাতে আমরা পেশওয়ার গেলাম এবং আমার স্কুল জীবনের বন্ধু মুসা আখতার আফরিদির বাসায় থাকলাম। ১৯৭১ সালের ১২ অক্টোবার আমরা পাকিস্তানের তোখরাম সীমান্ত পাড়ি দিলাম। এরপর  আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, হল্যান্ড এবং ফ্রান্স হয়ে লন্ডন পৌছলাম নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তায়।  ইসহাক খান এবং নাঈম দুই সপ্তাহ পর লন্ডন থেকে চলে গেল। আর আমি সেখানে রয়ে গেলাম এবং লিঙ্কন ইনে ভর্তি হলাম।

পাকিস্তানে অবস্থানকালে যাদের সাথে বসবাস করেছেন এবং দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে তাদের পরিচয় দিয়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ইসকাহ খান খাকওয়ানী পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রী, সিদ্দিক খান কানজু পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মোহাম্মদ মিয়া সামরু  পাকিস্তান কেয়ারটেকার সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। নিয়াজ নূর ছিলেন ভিকারুননিসা নূন এবং স্যার ফিরোজ রেজা নূনের নাতি। শামীম হাসনাইন বাংলাদেশের সুপ্রীম কোর্টর বিচারপতি এখন। সালমান এফ রহমান এফবিসিসিআই;র সাবেক সভাপতি । অন্যান্যরাও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বদে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৭১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্যে ছিলেন বলে জানান।
আগামীকাল মঙ্গলবার একঘন্টার মধ্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জবানবন্দী প্রদান শেষ হবার কথা রয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির, সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন চৌধুরী এবং বিচারপতি আনোয়ারুল হক বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন।




রবিবার, ৩০ জুন, ২০১৩

১৯৬৯ সালে শেখ কামাল, তোফায়েল আহমেদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সিরাজুল আলম খানসহ অনেকে আমার বাসায় যেতেন-ট্রাইব্যুনালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী


মেহেদী হাসান, ৩০/৬/২০১৩
বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেছেন, ১৯৬৯ এর আন্দোলনে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। সেই সুবাধে ছাত্রলীগ এবং ছাত্রইউনিয়নের অনেকের সাথে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৬৯ সালে তার ধানমন্ডির বাসায়  শেখ কামাল, তোফায়েল আহমেদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ অনেকে যেতেন।  এছাড়া তার বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিরাজুল আলম খান, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুর রউফ, ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদসহ অনেকে যোগ দিতেন।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, তিনি ১৯৭১ সালের   রেসকোর্স ময়দানে  ঐতিহাসিক সাত মার্চের সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তোফায়েল আহমেদ, সালমান এফ রহমানসহ অনেকে তার সাক্ষী আছেন। বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষনকে যদি স্বাধীনতার ঘোষনা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় তাহলে  সে সমাবেশে অংশগ্রহনের কারনে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী  নিজেকে  স্বাধীনতার স্বপক্ষে একজন সক্রিয় সমর্থক  হিসেবে দাবি করেন  আইনগতভাবে। তার এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচার চলছে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আসামী পক্ষের এক নং সাক্ষী হিসেবে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজেই নিজের পক্ষে সাক্ষী প্রদান করছেন। আজ  তিনি সাক্ষ্যপ্রদানকালে উপরোক্ত তথ্য তুলে ধরেন।

ইংরেজিতে প্রদান করা জবানবন্দীতে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, গুডস হিল আমাদের পারিবারিক বাসা কিন্তু সীমিত কিছু  সময় ছাড়া  আমার সেখানে কখনোই স্থায়ীভাবে বসবাস করা হয়নি। ১৯৬০ সালে তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তান ক্যাােডট  কলেজ বর্তমানে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে আমার স্বাধীন জীবন যাপন   শুরু হয়। একইভাবে  ভাওয়ালপুর সাদিক পাবলিক  বোর্ডি স্কুল, নটরডেম কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনাকালে আমি স্বাধীনভাবে  জীবন যাপন করেছি । ১৯৬৫ সালের শেষের দিকে অথবা ১৯৬৬ সালের শুরুর দিকে  এসএসসি পরীক্ষার সময় চারমাস ছাড়া চট্টগ্রামের গুডস হিলে আমার কখনোই বাস করা হয়নি।  আমার  প্রায় সব বন্ধুবান্ধব এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের সাথে আমার সম্পর্ক তৈরি হয় ১৯৭৪ সালের পর। চট্টগ্রামে  আমার যারা পরিচিত তারা সবাই ১৯৬০ সালের পূর্বের এবং     ১৯৭৪ সালের পরবর্তী সময়ে। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ সালে আমি ঢাকার ধানমন্ডিতে একা এক বাসায় থাকতাম এবং আমার তখন একটি  গাড়ি ছিল ব্যবহারের জন্য।  আমার পিতা মাসে এক দুইবার আমাকে দেখতে আসতেন তখন ঢাকায়।  ধানমন্ডি বাসায় বসবাসকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার যেসব বন্ধু ধানমন্ডি এবং ধানমন্ডির বাইরে  বাস করত এবং ধানমন্ডি এলাকার   আমার অনেক বন্ধু, আমার বাসায় নিয়মিত আসত। বিশেষ করে ১৯৬৯  এর আন্দোলনের সময়। আমিও সে আন্দোলনে অংশ নিয়েছি । সেসমময় আমার বাসায় আমার যেসব পরিচিত বন্ধুবান্ধব আসতেন তাদের মধ্যে  মধ্যে রয়েছেন  শেখ কামাল, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, তৌহিদ সামাদ, আহমেদ সালমান এফ রহমান, নিজাম আহমেদ, খায়রুল বাসার, ইরফান খান, ইমরান আহমেদ, কাজী আনোয়ার, আব্দুস সামাদ, কাইউম রেজা চৌধুরী। চলমান আন্দোলনের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আমার বাসায় তখন ছাত্রনেতাদের অনেক বৈঠক হত। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর আহবানে ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ, ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, সিরাজুল আলম খান, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, শাহজাহান সিরাজসহ অনেকে আমার বাসায়  বৈঠক করেছেন চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে। এসব নেতাদের অনেকে আমার পিতার সাথে বেশ কয়েকবার দেখা সাক্ষাৎ করেছেন। বড়ভাইদের এসব মিটিংয়ে আমার বাড়ি ব্যবহার ছাড়াও তাদের  আসা যাওয়ার জন্য আমার গাড়ি  দিয়ে সেবা করার সুযোগ হয়েছিল।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ১৯৬৫র শেষে বা ১৯৬৬ সালের শুরুতে আমার পিতাকে  মুসলিম লীগ থেকে বহিস্কার করা হয়। ফলে আমার পিতা একজন স্বাধীন পার্লামেন্ট মেম্বার হিসেবে আইউব বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এসময়  পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের অনেকের সাথে আমারও বন্ধুত্ব হয়। আমি কখনো কোন ছাত্রসংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলামনা কিন্তু তারপরও ১৯৬৯ এর আন্দোলনে আমি অংশগ্রহণ করে।  ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে আসাদ নিহত হওয়ার সময়  আমি তার থেকে মাত্র দুশফুট দূরে অবস্থান করছিলাম। 
সালাহবউদ্দিন কাদের চৌধুরী উপরে যাদেরকে তার বাসায় যাবার কথা উল্লেখ করেছেন তারা মূলত এসময়ে তার  যেতেন বলে বলেছেন।
সালাহউািদ্দন কাদের চৌধুরী বলেন, ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুদের সাথে আমি রেসকোর্স ময়দানে  ঐতিহাসিক ৭ মার্চের সমাবেশে যোগ দিয়েছিলাম। শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তোফায়েল  আহমেদ, মনিরুল হক চৌধুরী, নুরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, সালমান এফ রহমান, খায়রুল বাশার, কইউম রেজা চৌধুরী, ড. বেলাল বাকী, তৌহিদ সামাদসহ অনেকে তার সাক্ষী আছেন। সাত মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষনকে অনেকে স্বাধীনতার ঘোষনা হিসেবে আখ্যায়িত করে। বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষন যদি সর্বসম্মতভাবে স্বাধীনতার ঘোষনা হিসেবে  গ্রহণ করা হয় তাহলে সেই সমাবেশে আমার সক্রিয় অংশগ্রহনের কারনে আমি স্বভাবতই স্বাধীনতার পক্ষে একজন সক্রিয় সমর্থক হিসেবে দাবি করতে পারি।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন,  সাত মার্চ থেকে ২২ মার্চ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার আমার পিতা বঙ্গবন্ধুর সাথে বৈঠক করেছেন। তাছাড়া ১৯৭২ সালে আমার পিতার বিরুদ্ধে দালাল আইনের মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আসামী পক্ষের সাক্ষীর তালিকায় রাখা হয়। এর মাধ্যমে যেটি প্রমানিত তা হল আমার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবু রহমানকে পাকিস্তানের নির্বাচিত নেতা হিসেবে  এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেকে তার হাতে  ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে ছিলেন।

ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির এবং সদস্য বিচারপতি আনোয়ারুল হক আজ বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। আগামীকাল সোমবারের মধ্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে তার জবানবন্দী শেষ করার জন্য  বলেছেন ট্রাইব্যুনাল।
এদিকে ট্রাইব্যুনাল-১ এ আজ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত  সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফরমাল চর্জ জমা দেয়ার জন্য আগামী ১৫ জুলাই নির্ধারন করা হয়েছে।
   

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৩

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে সালমান এফ রহমানসহ চার সাক্ষীর তালিকা জমা ট্রাইব্যুনালে

মেহেদী হাসান
বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে  প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানসহ চারজন সাক্ষীর তালিকা ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া হয়েছে। আসামীর পক্ষে ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম আজ  সাক্ষীর এ তালিকা জমা দিয়েছেন। তালিকায় থাকা অপর তিনজন সাক্ষী হলেন, সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি শামীম হাসনাইন, সাবেক প্রধান বিচারপতি মাঈনুর রেজা চৌধুরীর ভাই কাইউম রেজা চৌধুরী এবং নিজাম আহমেদ।

এফবিসিসিআই সাবেক সভাপতি সালমান এফ রহমান বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত  উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা। এসব ভিআইপি সাক্ষী সত্যিই সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে ট্রাইব্যুনালে আসবেন কি-না জানতে চাইলে ব্যারিস্টার  ফখরুল ইসলাম বলেন, তারা ব্যক্তিগতভাবে আমার সাথে যোগাযোগ করে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

তাদেরকে সাক্ষী করার কারণ কি জানতে চাইলে ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন এবং ১৯৭১ সালে তিনি পাঞ্জাবে ছিলেন। বিচারপতি শামীম হাসনাইনও একই সময়ে  পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন।  ১৯৭১ সালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী যে পাঞ্জাবে ছিলেন  সে বিষয়ে সাক্ষী বিচারপতি শামীম হাসনাইন। কারণ তিনিও তখন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন।

এছাড়া সালমান এফ রহমান, কাইউম রেজা চৌধুরী নিজাম আহমেদ এরা প্রত্যেকেই সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন । তারাও ১৯৭১ সালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পাঞ্জাবে অবস্থান বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী এবং কোর্টে তারা সাক্ষ্য দিতে আসলেই এসব তথ্য জানতে পারবেন।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে মোট এক হাজার ১৫৩ জন সাক্ষীর তালিকা জমা দেয়া হয়েছিল।  সে তালিকায়ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ অনেক সেলিব্রেটি ভিআইপি ব্যক্তিবর্গের নাম ছিল। সাক্ষীর এ তালিকা থেকে মোট পাঁচজন সাক্ষীর সংখ্যা নির্ধারন করে গত ১৩ জুন আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজে এক নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান শুরু করেন গত ১৭ জুন।
আজ  অপর চার সাক্ষীর তালিকা জমা  দিলেন তারা।

গত বুধবার সাক্ষীর তালিকা জমা দেয়ার শেষ সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল

বুধবার, ২৬ জুন, ২০১৩

শায়িত অবস্থায় ট্রাইব্যুনালে আনা হল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে

মেহেদী হাসান
বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে আজ  ইজি চেয়ারে শায়িত  অবস্থায় ট্রাইব্যুনারের বিচার কক্ষে হাজির করা হয়। তার শারিরীক অবস্থা জবানবন্দী দেয়ার  পর্যায়ে না থাকায় বিচার কার্যক্রম মুলতবি  করা হয়।

গত সোমবার জবানবন্দী প্রদানের সময় কাঠগড়ায় হঠাৎ অসুস্থ  হয়ে পড়েন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আজ  তাকে সাড়ে ১১টার দিকে ট্রাইব্যুনালে আনার পর তিনি হাজতখানার ইজি চেয়ারে শুয়ে থাকেন।
সকালে মামলার কার্য তালিকায় প্রথমে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলা ছিল। কিন্তু কোর্ট শুরুর নির্ধারিত সময় সাড়ে দশটার মধ্যে তাকে জেল কর্তৃপক্ষ ট্রাইব্যুনারে  হাজির  করতে না পারায় মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলার কার্যক্রম শুরু করা হয়। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলা নিয়ে যাওয়া হয়  দুপুরের বিরতির পর।  দুপুরের বিরতির পর দুইটায় কোর্ট  বসলে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবীরা তার অসুস্থতার কথা জানান এবং বিচার কার্যক্রম মুলতবি রাখার অনুরোধ করেন।  ট্রাইব্যুনাল তাকে  কোর্টরুমে নিয়ে আসতে বলেন। নির্দেশ মোতাবেক  কয়েকজন পুলিশ ইজি চেয়ারে শায়িত থাকা অবস্থায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দোতলার কোর্টরুমে নিয়ে আসেন নিচ তলা থেকে। কোর্টরুমে আনার পরও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী শুয়ে থাকেন। এসময় তিনি লুঙ্গি পরিহিত ছিলেন এবং তাকে বিপর্যস্ত  ও বিমর্শ দেখাচ্ছিল। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির জানতে চান তিনি জবানবন্দী প্রদানের মত অবস্থায় আছেন কি-না। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী কোন কথা বলছিলেননা। এরপর ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সুলতান মাহমুদ সিমনকে বলেন তার কাছে গিয়ে তার শারিরীক অবস্থার খোঁজ নিতে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তখন বলেন, তার প্রেসার ওঠানাম করছে। মাথা ঘুরছে। সবকিছু ঠিকমত দেখতে পাচ্ছেননা। মাথা ঘুরছে। গতকাল নামাজের সময় পড়ে গিয়েছিলেন। কয়েকবার ¯েপ্র নিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালকে সুলতান মাহমুদ তার অবস্থা  জানানোর পর বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির তাকে আবার নিচে হাজতখানায়  নিয়ে যাবার নির্দেশ দেন। এরপর তার সাথে আসা  অ্যাটেনডেন্সকে কোর্টে তলব করেন। জেলখানার ম্যোডিক্যাল অ্যাটেনডেন্স আসার পর বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির তার কাছে জানতে চান আসামীকে নিয়ে সকালে আপনারা কয়টায় রওয়ানা দিয়েছেন। তিনি জবাব দেন নয়টা ২২ মিনিটে। এরপর  কোর্ট জানতে চান তখন তার শারিরীক অবস্থা কেমন ছিল, সাক্ষ্য দেয়ার মত অবস্থা ছিল কি-না।  তিনি জবাব দেন- ভাল ছিল। সাক্ষ্য দেয়ার মত অবস্থায় ছিল। গাড়িতে তোলার পর তিনি পথে ঘুমিয়ে ছিলেন।
এরপর কোর্ট তার কাছে জানতে চান তিনি কখন অসুস্থ হলেন।
অ্যাটেনডেন্স জবাব দেন-ট্রাইব্যুনালে আসার পর তিনি অসুস্থ হন। বুকে ব্যথার কথা বলেন।
এরপর তাকে প্রশ্ন করেন এখন তার অবস্থা কেমন?
তিনি জবাব দেন তার প্রেসার ১০০ বাই ৭০।
তার এখন কি করা উচিত প্রশ্ন করা হলে অ্যাটেনডেন্স বলেন, হৃদরোগের ডাক্তার দেখানো উচিত।
এরপর কোর্ট তার চিকিৎসার যথাযথ নির্দেশ  বিষয়ে অর্ডার দেয়ার কথা বলে বিচার আগামী রোববার পর্যন্ত মুলতবি করেন।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম এরপর দাড়িয়ে বলেন, জেলখানা থেকে তার সাথে একজন মেডিক্যাল এসিসট্যান্ট পাঠানোর বিষয়টি প্রমান করে তাকে যখন নিয়ে আসা হয় তখন তার শারিরীক অবস্থা  ভাল ছিলনা। তাকে আদালতে পাঠানোর সময় শারিরীক অবস্থা  ভাল থাকলে তার সাথে মেডিক্যাল এসিট্যান্ট পাঠানো হতনা।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে গাজিপুরের কাসিমপুর কারাগারে রাখা হয়েছে।