কাদের মোল্লা আপিল শুনানী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কাদের মোল্লা আপিল শুনানী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৩

কাদের মোল্লাকে ৫ অভিযোগ থেকে খালাস দিলেন বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা

মেহেদী হাসান, ৫/১২/২০১৩
রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে  আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের  মোট ছয়টি অভিযোগ এনেছিল। ট্রাইব্যুনালের রায়ে একটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দিয়েছিল। কিন্তু আপিল বিভাগের রায়ে কাদের মোল্লাকে ছয়টি অভিযোগেই সাজা দেয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের রায়ে  খালাস দেয়া অভিযোগটিতেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড  প্রদান করা হয়  আপিল বিভাগের রায়ে। কিন্তু বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা আপিল বিভাগের অপর চার বিচারপতির সাথে ভিন্নমত পোষন করে ভিন্ন রায়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে ৫টি অভিযোগ থেকেই খালাস দেন। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত একটি মাত্র যাবজ্জীবন সাজা তিনি বহাল রাখেন এবং সেক্ষেত্রেও তিনি আপিল বিভাগের অপর চার বিচারপতির সাথে ভিন্নমত পোষন করে ভিন্ন রায় দেন।

গত ১৭ সেপ্টেম্বরের সংক্ষিপ্ত রায়ে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে (৪ : ১) আব্দুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদন্ড দেয়। অর্থাৎ চার জন বিচারপতি মৃত্যুদন্ডের পক্ষে এবং একজন বিচারপতি মৃত্যুদন্ডের বিপক্ষে রয়েছেন। ভিন্নমত পোষনকারী বিচারপতির নাম সংক্ষিপ্ত রায়ে উল্লেখ ছিলনা। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ  রায় প্রকাশের পর  দেখা গেছে বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা অপর চার বিচারপতির সাথে একমত পোষণ করেননি।  সাজার বিষয়ে তিনি ভিন্ন রায় দিয়েছেন। 

রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে  আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের  মোট ছয়টি অভিযোগ এনেছিল। ছয়টি অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে দুইটি অভিযোগে যাবজ্জীবন, তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে কারাদন্ড দেয়।  একটি অভিযোগ থেকে খালাস দেয়।

আপিল বিভাগের রায়ে একটি যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। এ অভিযোগটি হল  মিরপুরে কালাপানি লেনে হযরত আলী,  তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীকে হত্যা ও    মেয়েদের ধর্ষনের ঘটনা । এটি ছিল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনীত ছয় নং অভিযোগ।

এছাড়া ট্রাইব্যুনালের অপর চারটি অভিযোগে প্রদত্ত সাজা বহাল রাখা হয় আপিল বিভাগের রায়ে। অপর দিকে একটি অভিযোগ থেকে ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে তাকে খালাস দিলেও আপিল বিভাগ ওই অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজা দেন। অর্থাৎ ছয়টি অভিযোগেই আপিল বিভাগ সাজা দেয় আব্দুল কাদের মোল্লাকে এবং বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা ছয়টি সাজার ক্ষেত্রেই ভিন্নমত পোষন করে ভিন্ন রায় লিখেছেন।  সংক্ষিপ্ত রায়ে ছয়টি অভিযোগেই সাজা দেয়া হয় ৪ অনুপাত ১ ভিত্তিতে।

ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে মোট পাঁচটি অভিযোগে দন্ডিত করে। এর মধ্যে চারটি অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছেন বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা তার রায়ে। এছাড়া ট্রাইব্যুনাল যে অভিযোগ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে অব্যাহতি দেয় সেটি বহাল রেখেছেন তিনি। ফলে তিনি মোট পাঁচটি অভিযোগ থেকে খালাস দিলেন আব্দুল কাদের মোল্লাকে।

রায় :
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার অংশের রায়ে বলেছেন, সরকারের দায়ের করা আপিল রনযোগ্য। চতুর্থ অভিযোগ থেকে কাদের মোল্লাকে অব্যাহতির ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাতিল করে এই অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করা হল। ৬ ন¤¦র অভিযোগে ট্রাইবুনালের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ বাতিল করে তার বদলে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হল। অপরদিকে, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে কাদের মোল্লার দায়ের করা আপিল খারিজ করা হল।

আব্দুল কাদের মোল্লাকে ছয় নং অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদন্ড প্রদান বিষয়ে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখেছেন, অপরাধের মাত্রা যদি কাদের মোল্লার সাজার ভিত্তি ধরা হয়, তাহলে অভিযোগ ন¤¦র ৬ এর েেত্র কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ দন্ড প্রদানের েেত্র উপযুক্ততম মামলা যেখানে হত্যা এবং ধর্ষণ ছিল বর্বরোচিত, ঠান্ডা মাথার ও নিষ্ঠুরতম। এই অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় এই মামলায় যদি ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ সাজা না দেয় তাহলে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার মতো অন্য কোন মামলা পাওয়া কঠিন হবে।

ট্রাইবুনাল রায়ে বলেছেন আদালতের কাজে বিশ্বাসযোগ্য একমাত্র সাীও সাজা দেওয়ার েেত্র যথেষ্ট। এেেত্র ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপরে ৩ ন¤¦র সাীকে ৬ ন¤¦র অভিযোগ প্রমানের েেত্র একমাত্র সাী বিবেচনায় এনেছে। ট্রাইব্যুনাল এেেত্র ভুল করেছে। কারণ, রাষ্ট্রপরে ৩ ন¤¦র সাী ছাড়াও রাষ্ট্রপরে ১, ২, ৪, ৭ এবং ৯ ন¤¦র পারিপার্শ্বিক সাী রাষ্ট্রপরে ৩ ন¤¦র সাীকে সমর্থন করেছে। তাদের স্যা ১৯৭০ সালের নির্বাচন থেকে কাদের মোল্লার এই অপরাধ সংঘটনের অসৎউদ্দেশ্য সমর্থণ করে। তার এই অসৎউদ্দেশ্য থেকে এটি পরিস্কার যে, কাদের মোল্লা এ অপরাধ করেছিল।

রাষ্ট্রপরে ৩ ন¤¦র সাীর স্যাপ্রমান থেকে এই উপসংহারে পৌছান যায় যে, এটি এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী হত্যাকান্ডের ঘটনা ছিল যার জন্য যাবজ্জীবন সাজা অপর্যাপ্ত, মৃত্যুদন্ডই যার উপযুক্ত সাজা।
বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী তার রায়ে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার অপরাধসমূহ এতই পৈশাচিক যে, মৃত্যুদন্ড ছাড়া পৃথিবীর ফৌজদারি আইনের পুস্তকে নির্ধারিত কোন সাজাই তার জন্য পর্যাপ্ত নয়। একমাত্র মৃত্যুদন্ডই তার প্রাপ্য।

৫ অভিযোগে খালাস দিলেন বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা

বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা  আপিল বিভাগের অপর চার বিচারপতির সাথে ভিন্নমত পোষন করে আব্দুল কাদের মোল্লাকে ছয়টি অভিযোগের মধ্য থেকে ৫টিতেই খালাস দিয়েছেন । একটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের প্রদত্ত যাবজ্জীবন সাজা বহাল রেখেছেন  এবং এ ক্ষেত্রেও তিনি আপিল বেঞ্চের অপর বিচারপতিদের সাথে ভিন্নমত পোষন করে ভিন্ন রায় দিয়েছেন।

ট্রাইব্যুনালে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মোট ছয়টি অভিযোগ এনেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। ট্রাইব্যুনালের রায়ে একটি অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছিল আব্দুল কাদের মোল্লাকে । এছাড়া ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সাজা প্রদান করা চারটি অভিযোগ থেকেও তিনি আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দিয়েছেন। সব মিলিয়ে ছয়টি অভিযোগের মধ্য থেকে তিনি পাঁচটি অভিযোগ থেকে খালাস দিলেন আব্দুল কাদের মোল্লাকে।  ছয়টি অভিযোগের মধ্যে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করা ট্রাইব্যুনালের একটি রায় তিনি বহাল রাখলেন।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে ১ নং অভিযোগ যথা মিরপুরে  পল্লব হত্যার দায়ে ১৫ বছর জেল দেয়া হয়েছে। আপিল বিভাগ এ রায় বহাল রেখেছেন। অপরদিকে বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা এ অভিযোগ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দিয়েছেন তার রায়ে। তিনি বলেছেন রাষ্ট্রপক্ষ এ অভিযোগ প্রমানে ব্যর্থ হয়েছে এবং ট্রাইব্যুনাল অন্যায়ভাবে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ২ নং অভিযোগ তথা কবি মেহেরুন্নেসা হত্যার অভিযোগে ১৫ বছর দণ্ড দেয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। আপিল বিভাগের রায়ে ট্রাইব্যুনালের  এ দণ্ড  বহাল রাখা হয়েছে । বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্ব মিঞা এ অভিযোগেও  আপিল বেঞ্চের অপর চার বিচারপতির সাথে  ভিন্নমত পোষন করে  আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দিয়েছেন এবং মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমান করতে পারেনি।
আব্দুল কাদের মোল্লাকে ৩ নং অভিযোগ যথা সাংবাদিক খন্দকার  আবু তালেব হত্যার অভিযোগে ১৫ বছর সাজা দেয়া হয়েছে। আপিল বিভাগের রায়ে এ দণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা এ অভিযোগেও আপিল বিভাগের চার বিচারপতির সাথে ভিন্নমত পোষন করে আসামীকে খালাস দিয়েছেন অভিযোগ থেকে।
চার নং অভিযোগ যথা কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর হত্যাকান্ডের অভিযোগ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। আপিল বিভাগ এ অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছেন আব্দুল কাদের মোল্লাকে। কিন্তু বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা ট্রাইব্যুনালের  দেয়া খালাস রায় বহাল রেখেছেন।

৫ নং অভিযোগ যথা  মিরপুর আলুবদি হত্যাকান্ডের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের রায়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে।  আপিল বিভাগ এ রায় বহাল রেখেছেন। কিন্তু বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা এ অভিযোগ থেকেও আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দিয়ে লিখেছেন আব্দুল কাদের মোল্লা সেখানে উপস্থিত ছিল এবং এ গনহত্যায় কোন সহযোগিতা করেছে এ মর্মে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমান করতে পারেনি। ট্রাইব্যুনাল ভুল করেছে এ সাজা দিয়ে।
মিরপুরে হযরত আলী পরিবারের হত্যাকান্ডে ট্রাইব্যুনাল যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় আব্দুল কাদের মোল্লাকে। আপিল বিভাগের রায়ে এ সাজা বাড়িয়ে সর্বোচ্চা সাজা মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন। কিন্তু বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা এ ট্রাইব্যুনালের এ রায় বহাল রাখেন।

রায় প্রকাশ :
জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলায় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত এটর্নি জেনারেল এমকে রহমান আজ দুপুরের পর আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের কাছে রায় প্রকাশের ঘোষনা দেন। এরপর বিকালে সুপ্রীম কোর্টের ওয়েব সাইটে রায় প্রকাশ করা হয়।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রীম কোর্ট এর আপিল বিভাগ  আবেদন  শুনানী শেষে  আব্দুল কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেন। ওইদিন মৃত্যুদন্ডের সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষনার আড়াই মাসের মাথায় আজ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ৫ ফেব্রুয়ারি আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।  । আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের  যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ  আলোচিত এ মামলার  আপিল শুনানী গ্রহণ শেষে রায় ঘোষনা করেন।  আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলায় আপিল শুনানীর জন্য গঠিত আপিল বেঞ্চের অপর চার বিচারপতি হলেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী।

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে পূর্ণ রায় লিখেছেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা এবং বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন রায়ে লিখেছেন তিন বিচারপতির লেখা রায় তিনি পড়েছেন এবং বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সাথে তিনি একমত পোষন করেন। একইভাবে রায়ের প্রতি একমত পোষন করেছেন অপর বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।  পূর্নাঙ্গ রায়টি মোট ৭৯০  পৃষ্ঠার।   এর মধ্যে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ২৫২ পৃষ্ঠা, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা ২২৭ পৃষ্ঠা এবং বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী ৩১০ পৃষ্ঠা লিখেছেন।

বৃহস্পতিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৩

আব্দুল কাদের মোল্লার পূণার্ঙ্গ রায় প্রকাশ : ৫ অভিযোগ থেকে খালাস দিলেন বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা

মেহেদী হাসান, ৫/১২/২০১৩
জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলায় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত এটর্নি জেনারেল এমকে রহমান আজ দুপুরের পর আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের কাছে রায় প্রকাশের ঘোষনা দেন। এরপর বিকালে সুপ্রীম কোর্টের ওয়েব সাইটে রায় প্রকাশ করা হয়।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রীম কোর্ট এর আপিল বিভাগ  আবেদন  শুনানী শেষে  আব্দুল কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেন। ওইদিন মৃত্যুদন্ডের সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষনার আড়াই মাসের মাথায় আজ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ৫ ফেব্রুয়ারি আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।  । আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের  যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ  আলোচিত এ মামলার  আপিল শুনানী গ্রহণ শেষে রায় ঘোষনা করেন।  আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলায় আপিল শুনানীর জন্য গঠিত আপিল বেঞ্চের অপর চার বিচারপতি হলেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী।

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে পূর্ণ রায় লিখেছেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা এবং বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন রায়ে লিখেছেন তিন বিচারপতির লেখা রায় তিনি পড়েছেন এবং বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সাথে তিনি একমত পোষন করেন। একইভাবে রায়ের প্রতি একমত পোষন করেছেন অপর বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।  পূর্নাঙ্গ রায়টি মোট ৭৯০  পৃষ্ঠার।   এর মধ্যে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ২৫২ পৃষ্ঠা, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা ২২৭ পৃষ্ঠা এবং বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী ৩১০ পৃষ্ঠা লিখেছেন।

১৭ সেপ্টেম্বরের সংক্ষিপ্ত রায়ে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে (৪ : ১) আব্দুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদন্ড দেয়। অর্থাৎ চার জন বিচারপতি মৃত্যুদন্ডের পক্ষে এবং একজন বিচারপতি মৃত্যুদন্ডের বিপক্ষে রয়েছেন। ভিন্নমত পোষনকারী বিচারপতির নাম সংক্ষিপ্ত রায়ে উল্লেখ ছিলনা। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ  রায় প্রকাশের পর  দেখা গেছে বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা অপর চার বিচারপতির সাথে একমত পোষণ করেননি।  সাজার বিষয়ে তিনি ভিন্নমত পোষণ করেন।

রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে  আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের  মোট ছয়টি অভিযোগ এনেছিল। ছয়টি অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে দুইটি অভিযোগে যাবজ্জীবন, তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে কারাদন্ড দেয়।  একটি অভিযোগ থেকে খালাস দেয়।

আপিল বিভাগের রায়ে একটি যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। এ অভিযোগটি হল  মিরপুরে কালাপানি লেনে হযরত আলী,  তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীকে হত্যা ও    মেয়েদের ধর্ষনের ঘটনা । এটি ছিল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনীত ছয় নং অভিযোগ।

এছাড়া ট্রাইব্যুনালের অপর চারটি অভিযোগে প্রদত্ত সাজা বহাল রাখা হয় আপিল বিভাগের রায়ে। অপর দিকে একটি অভিযোগ থেকে ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে তাকে খালাস দিলেও আপিল বিভাগ ওই অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজা দেন। অর্থাৎ ছয়টি অভিযোগেই আপিল বিভাগ সাজা দেয় আব্দুল কাদের মোল্লাকে এবং বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা ছয়টি সাজার ক্ষেত্রেই ভিন্নমত পোষন করে ভিন্ন রায় লিখেছেন।  সংক্ষিপ্ত রায়ে ছয়টি অভিযোগেই সাজা দেয়া হয় ৪ অনুপাত ১ ভিত্তিতে।

ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে মোট পাঁচটি অভিযোগে দন্ডিত করে। এর মধ্যে চারটি অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছেন বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা তার রায়ে। এছাড়া ট্রাইব্যুনাল যে অভিযোগ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে অব্যাহতি দেয় সেটি বহাল রেখেছেন তিনি। ফলে তিনি মোট পাঁচটি অভিযোগ থেকে খালাস দিলেন আব্দুল কাদের মোল্লাকে।

রায় :
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার অংশের রায়ে বলেছেন, সরকারের দায়ের করা আপিল রনযোগ্য। চতুর্থ অভিযোগ থেকে কাদের মোল্লাকে অব্যাহতির ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাতিল করে এই অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করা হল। ৬ ন¤¦র অভিযোগে ট্রাইবুনালের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ বাতিল করে তার বদলে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হল। অপরদিকে, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে কাদের মোল্লার দায়ের করা আপিল খারিজ করা হল।

আব্দুল কাদের মোল্লাকে ছয় নং অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদন্ড প্রদান বিষয়ে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখেছেন, অপরাধের মাত্রা যদি কাদের মোল্লার সাজার ভিত্তি ধরা হয়, তাহলে অভিযোগ ন¤¦র ৬ এর েেত্র কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ দন্ড প্রদানের েেত্র উপযুক্ততম মামলা যেখানে হত্যা এবং ধর্ষণ ছিল বর্বরোচিত, ঠান্ডা মাথার ও নিষ্ঠুরতম। এই অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় এই মামলায় যদি ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ সাজা না দেয় তাহলে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার মতো অন্য কোন মামলা পাওয়া কঠিন হবে।

ট্রাইবুনাল রায়ে বলেছেন আদালতের কাজে বিশ্বাসযোগ্য একমাত্র সাীও সাজা দেওয়ার েেত্র যথেষ্ট। এেেত্র ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপরে ৩ ন¤¦র সাীকে ৬ ন¤¦র অভিযোগ প্রমানের েেত্র একমাত্র সাী বিবেচনায় এনেছে। ট্রাইব্যুনাল এেেত্র ভুল করেছে। কারণ, রাষ্ট্রপরে ৩ ন¤¦র সাী ছাড়াও রাষ্ট্রপরে ১, ২, ৪, ৭ এবং ৯ ন¤¦র পারিপার্শ্বিক সাী রাষ্ট্রপরে ৩ ন¤¦র সাীকে সমর্থন করেছে। তাদের স্যা ১৯৭০ সালের নির্বাচন থেকে কাদের মোল্লার এই অপরাধ সংঘটনের অসৎউদ্দেশ্য সমর্থণ করে। তার এই অসৎউদ্দেশ্য থেকে এটি পরিস্কার যে, কাদের মোল্লা এ অপরাধ করেছিল।

রাষ্ট্রপরে ৩ ন¤¦র সাীর স্যাপ্রমান থেকে এই উপসংহারে পৌছান যায় যে, এটি এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী হত্যাকান্ডের ঘটনা ছিল যার জন্য যাবজ্জীবন সাজা অপর্যাপ্ত, মৃত্যুদন্ডই যার উপযুক্ত সাজা।
বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী তার রায়ে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার অপরাধসমূহ এতই পৈশাচিক যে, মৃত্যুদন্ড ছাড়া পৃথিবীর ফৌজদারি আইনের পুস্তকে নির্ধারিত কোন সাজাই তার জন্য পর্যাপ্ত নয়। একমাত্র মৃত্যুদন্ডই তার প্রাপ্য।

৫ অভিযোগে খালাস দিলেন বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা

বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা  আপিল বিভাগের অপর চার বিচারপতির সাথে ভিন্নমত পোষন করে আব্দুল কাদের মোল্লাকে ছয়টি অভিযোগের মধ্য থেকে ৫টিতেই খালাস দিয়েছেন । একটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের প্রদত্ত যাবজ্জীবন সাজা বহাল রেখেছেন  এবং এ ক্ষেত্রেও তিনি আপিল বেঞ্চের অপর বিচারপতিদের সাথে ভিন্নমত পোষন করে ভিন্ন রায় দিয়েছেন।

ট্রাইব্যুনালে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মোট ছয়টি অভিযোগ এনেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। ট্রাইব্যুনালের রায়ে একটি অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছিল আব্দুল কাদের মোল্লাকে । এছাড়া ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সাজা প্রদান করা চারটি অভিযোগ থেকেও তিনি আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দিয়েছেন। সব মিলিয়ে ছয়টি অভিযোগের মধ্য থেকে তিনি পাঁচটি অভিযোগ থেকে খালাস দিলেন আব্দুল কাদের মোল্লাকে।  ছয়টি অভিযোগের মধ্যে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করা ট্রাইব্যুনালের একটি রায় তিনি বহাল রাখলেন।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে ১ নং অভিযোগ যথা মিরপুরে  পল্লব হত্যার দায়ে ১৫ বছর জেল দেয়া হয়েছে। আপিল বিভাগ এ রায় বহাল রেখেছেন। অপরদিকে বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা এ অভিযোগ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দিয়েছেন তার রায়ে। তিনি বলেছেন রাষ্ট্রপক্ষ এ অভিযোগ প্রমানে ব্যর্থ হয়েছে এবং ট্রাইব্যুনাল অন্যায়ভাবে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ২ নং অভিযোগ তথা কবি মেহেরুন্নেসা হত্যার অভিযোগে ১৫ বছর দণ্ড দেয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। আপিল বিভাগের রায়ে ট্রাইব্যুনালের  এ দণ্ড  বহাল রাখা হয়েছে । বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্ব মিঞা এ অভিযোগেও  আপিল বেঞ্চের অপর চার বিচারপতির সাথে  ভিন্নমত পোষন করে  আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দিয়েছেন এবং মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমান করতে পারেনি।
আব্দুল কাদের মোল্লাকে ৩ নং অভিযোগ যথা সাংবাদিক খন্দকার  আবু তালেব হত্যার অভিযোগে ১৫ বছর সাজা দেয়া হয়েছে। আপিল বিভাগের রায়ে এ দণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা এ অভিযোগেও আপিল বিভাগের চার বিচারপতির সাথে ভিন্নমত পোষন করে আসামীকে খালাস দিয়েছেন অভিযোগ থেকে।
চার নং অভিযোগ যথা কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর হত্যাকান্ডের অভিযোগ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। আপিল বিভাগ এ অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছেন আব্দুল কাদের মোল্লাকে। কিন্তু বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা ট্রাইব্যুনালের  দেয়া খালাস রায় বহাল রেখেছেন।

৫ নং অভিযোগ যথা  মিরপুর আলুবদি হত্যাকান্ডের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের রায়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে।  আপিল বিভাগ এ রায় বহাল রেখেছেন। কিন্তু বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা এ অভিযোগ থেকেও আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দিয়ে লিখেছেন আব্দুল কাদের মোল্লা সেখানে উপস্থিত ছিল এবং এ গনহত্যায় কোন সহযোগিতা করেছে এ মর্মে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমান করতে পারেনি। ট্রাইব্যুনাল ভুল করেছে এ সাজা দিয়ে।
মিরপুরে হযরত আলী পরিবারের হত্যাকান্ডে ট্রাইব্যুনাল যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় আব্দুল কাদের মোল্লাকে। আপিল বিভাগের রায়ে এ সাজা বাড়িয়ে সর্বোচ্চা সাজা মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন। কিন্তু বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা এ ট্রাইব্যুনালের এ রায় বহাল রাখেন।



বুধবার, ১৯ জুন, ২০১৩

কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী//এটর্নি জেনারেল এর প্রতি আদালত : আপনার আবেদন গ্রহণ করলে আইন রিরাইট করতে হবে


mehedy hasan
আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানীর সময় এটর্নি জেনারেল এর প্রতি লক্ষ্য করে আদালত বলেন, আপনার আবেদন গ্রহণ করা হলে আমাদেরকে আইন রিরাইট করতে হবে। আইন রিসেটেল এবং রিস্টাবলিশ করতে হবে।
আদালত আরো বলেন, মনে রাখবেন আমরা আজ  এ মামলায় এখান থেকে যে ব্যাখ্যা দেব তা আইন হয়ে যাবে।  ভবিষ্যতে এর অনেক প্রভাব আছে। সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তাই যা বলার সাবধানে বলবেন। আপনি রাষ্ট্রের এটর্নি জেনারেল। একই সাথে আপনি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক। সাবমিশন রাখার সময় এ বিষয় মনে রাখবেন। 

রাষ্ট্রপক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আপিল আবেদন করেছে। ট্রাইব্যুনালের সাজার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ ছিলনা পূর্বে। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন রায় প্রদানের পর শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনের দাবির ফলে   গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আইনের আপিলের ধারা সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষকেও আপিলের সুযোগ দেয়া হয়। এ সংশোধনের ফলে রাষ্ট্রপক্ষ ফাঁসির দাবিতে আবেদন করেছে । আজ বুধবার  রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল তার দাবির পক্ষে যুক্তি পেশ করার সময়  দেশের সর্বোচ্চ আপিল আদালত তাকে উদ্দেশ্য করে একথা বলেন।

গতকালের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আজ বুধবার শুনানীতে এটর্নি জেনারেল  মাহবুবে আলম  বলেন, আদালতের প্রশ্ন হল ট্রাইব্যুনাল আইনের চতুর্থ সংশোধনী কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য কি-না। এ প্রশ্নে আমার জবাব হল- প্রযোজ্য। ট্রাইব্যুনাল রায় প্রদানের পর  এ বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের সমান সুযোগ দিয়ে আইনের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে এ সংশোধনী কার্যকর হবে। আপনাদের ধরে নিতে হবে এই সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর আছে। কাদের মোল্লার রায় হবার আগে থেকেই অর্থাৎ ২০০৯ সাল থেকে  রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সমান সুযোগ ছিল বলে ধরে নিতে হবে। সেখানে কবে রায় হল এবং কবে  আইন সংশোধন হল এটা অপ্রাসঙ্গিক  বিষয়। কারণ সংশোধনীতে বলা হয়েছে এ সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর।

এটর্নি জেনারেল বলেন,  সংবিধানের ৪৭ ধারা মোতাবেক ১৯৭৩ সালের আইন সংরিক্ষত একটি আইন। এ আইনকে চ্যালেঞ্জ করা যাবেনা। সে হিসেবে আইনের চতুর্থ সংশোধনীও চ্যালেঞ্জ করা যাবেনা। তিনি বলেন, এই আইন চ্যালেঞ্জ করা যাবেনা। চ্যালেঞ্জ করলে আইনের উদ্দেশ্য ফ্রাসট্রেট হয়ে যাবে।

এটর্নি জেনারেল এর এ সাবমিশনের জবাবে আদালত বলেন, আমরা কোন আইন বা সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করছিনা। আমরা সিম্পল জানতে চাচ্ছি  ১৮ ফেব্রুয়ারি যে সংশোধনী হয়েছে তা  কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না।
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বলেন,  এই সংশোধনী বিশেষ করে এই মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না তা বলেন।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, এই সংশোধনীতেতো কোন দণ্ড দিচ্ছেন না, বরং রাষ্ট্রপক্ষকে  আপিলের পাওয়ার দিচ্ছেন।

বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা গতকালের মত আজো প্রশ্ন করেন, ভারতীয় উপমহাদেশে বা ইংল্যান্ডে যেকোন একটি সিঙ্গেল বেঞ্চ  এর একটি উদাহরন দেখান যেখানে রায় হবার পর এ ধরনের আইন সংশোধন করে রিট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট কার্যকর করা হয়েছে।
এসময় এটর্নি জেনারেল বলেন, পৃথিবীর কোথাও বাংলাদেশের মত ৩০ লাখ লোক মারা যায়নি, এত লোক ধর্মান্তরিত, দেশান্তরিত হয়নি এবং এত লোক ইজ্জত হারায়নি।
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, এরকম হলে আসামী ন্যায় বিচার পাবেননা। ইমশোনাল হবেননা।
বিচারপতি ওয়াহহাব মিয়া বলেন, ১৯৭১ সালে কি হয়েছিল তা কি আমরা জানিনা? আমরা কি বিদেশ থেকে এসেছি? আমরা যদি ইমশোনাল হয়ে যাই তাহলে কি ন্যায় বিচার হবে?
এর এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ঠিক আছে আপনি কন্টিনিউ করেন। আমরা কম ইন্টারফেয়ার করব।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, কি বলেন আপনি? আমরা কি প্রশ্ন করবনা? আমরা কি কিয়ার হবনা? মনে করেন আমরা আসামীকে ফাঁসি দিয়ে দিলাম। তাহলে এর বিরুদ্ধে আসামীর আপিলের সুযোগ কোথায়? কারণ ট্রাইব্যুানালের রায়ের বিরুদ্ধে তারা এখানে এসেছে আপিল নিয়ে। ট্রাইব্যুনালতো তাকে ফাঁসি দেয়নি। এখন আমরা ফাঁসি দিলে তারা পরে আর আপিলের সুযোগ কোথায় পাবে? আর রাষ্ট্রপক্ষেরওতো আগে আপিলের সুযোগ ছিলনা।

সাবমিশনের এক পর্যায়ে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, মাইলর্ড, আসামীর ক্ষেত্রে এখানে ইননোসেন্ট শব্দ ব্যবহার হবে কেন?
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বলেন, আমাদের এখানে তো ইননোসেন্ট হিসেবে একটা সাবমিশন আছে।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া এটর্নি জেনারেলকে বলেন, তাহলে আপনারা আপিলের বিধান না রাখলেই পারতেন। ট্রাইব্যুনালই সব, বলে দিলে পারতেন। মিস্টার এটর্নি জেনারেল, মনে রাখবেন আমাদের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রাখতে হবে। আমরা আজ এখানে যে ব্যাখ্যা দেব তাই আইন। ভবিষ্যতে এর অনেক প্রভাব থাকবে। তাই যা বলার সাবধানে বলবেন।
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এটর্নি জেনারেল এর উদ্দেশে বলেন,  আপনার আবেদন গ্রহণ করতে হলে ইউ হ্যাব টু রিরাইট দি ল’, রিসেটেল দি ল’ এন্ড  রিস্টাবলিশ দি ল’।

বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, আপনি রাষ্ট্রের একজন এটর্নি জেনারেল। সেই সাথে রাষ্ট্রের একজন নাগরিক। কাজেই সে হিসেবে সাবমিশন রাখবেন।

আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এর আগে তার সাবমিশনের বলেছিলেন,  ট্রাইব্যুনালের সাজার বিরুদ্ধে পূর্বে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ ছিলনা। কিন্তু ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধনের পর  রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের সুযোগ পেয়েছে এবং তারা মৃত্যুদন্ডের দাবি করে আবেদন করেছে। ১৮ ফ্রেবুয়ারি যদি আইনটি সংশোধন না হত তাহলে কাদের মোল্লার ফাঁসির কোন সুযোগ ছিলনা। আপিল বিভাগকে হয় ট্রাইব্যুনালের সাজা যাবজ্জীবন বহাল রাখতে হত না হয় কমাতে হত। কিন্তু যাবজ্জীবন বাড়িয়ে ফাঁসি দিতে পারতনা। ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধনের ফলে আসামীর অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।
আইন সংশোধন, আসামীর অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নিয়ে গতকাল এবং আজো বিতর্ক চলে শুনানীতে।

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে  চার নং অভিযোগ কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর হত্যাকান্ড থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। এর বিরুদ্ধেও সাজা দাবি করে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছে।  এ আপিলের সুযোগ আছে কিনা- আদালতের এ প্রশ্নের জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, সুযোগ আছে।






মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৩

ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য কি-না সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই // আইন পাশে এমপিদে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন প্রধান বিচারপতির

মেহেদী হাসান
আব্দুল কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল আইনের আপিলের ধারা সংশোধন করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রপক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চা শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আপিল আবেদন করেছে। কিন্তু আইনের সংশোধনিটি আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে  কি-না সে বিষয়ে কোথাও কোন কিছু উল্লেখ নেই।  এমনকি সংশোধনী পাশের সময় এ বিষয়ে সংসদের আলোচনায়ও কোন কিছু উল্লেখ করা হয়নি। আজ  মঙ্গলবার আপিল আবেদন শুনানীর সময় সংশোধনী আইনের এ অস্পষ্টতা নিয়ে দীর্ঘ  বিতর্ক চলে। আইনটি পাশের উদ্দেশ্য বিষয়ে সংসদের আলোচনায় এ বিষয়ে কোন কিছু না থাকায় প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

রায় হয়ে যাবার পর  আইন সংশোধন করে রিট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট কার্যকর করা বিষয়েও রাষ্ট্রপক্ষকে নজির পেশ করতে বলেন আদালত। 

ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ক্ষেত্রে পূর্বের বিধান ছিল আসামী পক্ষ সাজার  বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আসামীকে সাজা দেয়া হলে রাষ্ট্রপক্ষ আর  আপিল করতে পারবেনা। ট্রাইব্যুনালের রায়ে যদি আসামীকে পুরোপুরি খালাস দেয়া হয় শুধুমাত্র সেক্ষেত্রে সরকার পক্ষ বা অভিযোগকারী আপিল করার সুযোগ পাবে; অন্যথায় নয়। কিন্তু আব্দুল কাদের মোল্লাকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের পর তার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলন গড়ে  ওঠে।  সে প্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইবুনালের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয় সংসদে।  সংশোধিত আইনে বলা হয় আসামী পক্ষের মত সরকার পক্ষও আপিলের সমান সুযোগ পাবে। অর্থাৎ শুধু খালাসের ক্ষেত্রে নয়, ট্রাইব্যুনালের যেকোন রায়ের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষও আপিল করতে  পারবে ।
আইনের আপিল সংক্রন্তা ধারা সংশোধনের পর সরকার পক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের দাবি জানিয়ে আপিল আবেদন করে। এছাড়া  কাদের মোল্লাকে যে একটি অভিযোগ থেকে ট্রাইব্যুনাল খালাস দিয়েছে সেটিতেও সাজা দাবি করা হয়েছে সরকার পক্ষের আবেদনে।
আজ  আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায়  আপিল  আবেদন শুনানীর সময় যুক্তি পেশ করছিলেন রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এসময় আদালত তাকে প্রশ্ন করেন আপনারা যে আইনের বলে আপিল আবেদন করেছেন তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না। কোন বিধান বলে আপনারা এই মামলার ক্ষেত্রে এ দরখাস্ত করেছেন।

তখন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জবাব দেয়ার চেষ্টা করেন  এই মামলার ক্ষেত্রে ২০১৩ সালের সংশোধনী আইন  প্রযোজ্য এবং আইনের সংশোধনীতে বলা  আছে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে এ সংশোধনী কার্যকর বলে ধরে নেয়া হবে।
এসময় আদালত জানতে চান  ১৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধনী আইন পাশ  যে আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা  কোথাও উল্লেখ আছে কি-না।  এসময় আদালত আইনটি সংশোধনের  উদ্দেশ্য পড়ে শোনাতে বলেন এটর্নি জেনারেলকে। আইন পাশের উদ্দেশ্য পড়ে শোনানো হলে তাতে দেখা যায় আইনে যেমন এ বিষয়ে কোন কিছু বলা হয়নি তেমনি সংশোধনী আইন পাশের বিষয়েও আব্দুল কাদের মোল্লার মামলা বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ নেই। তখন প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সংশোধনী পাশের সময় এর উদ্দেশ্য নিয়ে  সংসদে কি আলোচনা হয়েছিল তা আছে আপনার কাছে? সংসদে এর উদ্দেশ্য নিয়ে কোন আলোচনা হয়েছিল না শুধু হাত তুলে হ্যা জয়যুক্ত হয়েছে বলে পাশ হয়েছিল? এটর্নি জেনারেল এসময় সংশোধনী আইন পাশের সময়কার সংসদীয় প্রসিডিংস উপস্থাপন করেন আদালতে।
কিন্তু তা পর্যালোচনা করে দেখা যায় তাতেও সংশোধনীটি পাশের ক্ষেত্রে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোন কিছু উল্লেখ নেই। আব্দুল কাদের মোল্লার রায় বের হবার পর সেক্ষেত্রে  সংশোধনী প্রযোজ্য হবে কি-না সে বিষয়ে কেউ কোন আলোচনাও পেশ করেননি সংসদে। তখন এমপিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন।

এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বিলটি পাশের ক্ষেত্রে সংসদের যে প্রসিডিংস উত্থাপন করেন তাতে  দেখা যায় মো : ফজলে রাব্বি মিয়া সংশোধনী প্রস্তাব বিল আকারে সংসদে উত্থোপন করেন। হুইপ আব্দুল ওয়াহাব  এর ওপর আলোচনা করেন। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সংশোধনী গ্রহনের জন্য স্পিকারের মাধ্যমে অনুরোধ জানান। এরপর কণ্ঠভোটে হ্যা জয়যুক্ত হয়েছে মর্মে বিলটি পাশ হয়। এছাড়া রাশেদ খান মেনন সংশোধনীতে ‘অর্গানাইজেশন’ শব্দটি যোগ করার জন্য প্রস্তাব করেন এবং এ বিষয়ে তিনি বক্তব্য রাখেন। তা এটর্নি জেনারেল পড়ে শোনান আদালতে। তাতে দেখা যায় রাশেদ খান মেনন জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছেন। তিনি বলেন,  ১৯৭১ সালে  জামায়াতে ইসলামী সিদ্ধান্ত নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছে।  আল বদর, আল শাসস, রাজাকার গঠন করে। আজো তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে চলেছে। তাই সংগঠন হিসেবে তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্য তিনি সংশোধনীতে ‘অর্গানাইজেশন’ শব্দ যোগ করার প্রস্তাব করেন। তার বক্তব্য পাঠ শেষ হলে প্রধান বিচারপতি বলেন, এসবতো বেখাপ্পা কথাবার্তা। অস্পষ্ট। এর মধ্যেতো সংশোধনী পাশের উদ্দেশ্য বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ নেই। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এবং বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়াও  একই ধরননের মন্তব্য করেন এসময়।
এসময় সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রধান বিচারপতি   মো : মোজাম্মেল হোসেন বলেন,  এই যে, বলা হয় শুধু হাত তোলা ছাড়া কোন কাজ নেই.........। আজকের পত্রিকায় যে  হেডলাইন আছে....।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধ আইনটি পাশের ক্ষেত্রে সংসদে আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে কত সুন্দর  আলোচনা এবং বিতর্ক হয়। অনেক এমপি আইনের ক্ষেত্রে তাদের মতামত তুলে ধরেছিলেন। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরসহ অন্যরা  আইনটি বিষয়ে সংসদে কথা বলেছিলেন।
এসময় অপর বিচারপতি সুরেন্ত্র কুমার সিনহা  আফসোস করে বলেন, সেই সংসদ আর আজকের সংসদ; কোথায় এসে দাড়িয়েছে।
আদালতের নির্দেশে আইনটি পাশের  উদ্দেশ্য সম্পর্কে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ  এর বক্তব্য পড়ে শোনান এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সেখানে উল্লেখ আছে যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে ইন্টারন্যানশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যক্ট প্রণয়ন করা হয়। .....উক্ত অ্যাক্টের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠনক্রমে যুদ্ধাপরাধসহ মানবতাবিরোধী অপরাধেল সাথে জড়িতদের বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য পড়ে শোনানোর পর বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, এখানে ‘বিচার কার্যক্রম চলামান রয়েছে’ বলে একটি কথা আছে। এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মারাত্মক। তিনি বলেন, মিস্টার এটর্নি জেনারেল, এ থেকে যেটি স্পষ্ট তাহল ১৮ ফেব্রুয়ারির সংশোধনী ট্রাইব্যুনালের যেসব বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে সেক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।  এ মামলার ক্ষেত্রে নয়।

বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এটর্নি জেনারেলকে বারবার একটি প্রশ্ন করেন-রায় বের হবার পর আইন সংশোধন করে রিট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট কার্যকর করা হয়েছে এমন একটি নজির দেখান। কিন্তু এটর্নি জেনারেল তা দেখাতে পারেননি।
আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে আদালতের পক্ষ থেকে প্রশ্ন আসে আসামীর অধিকার ুন্ন হওয়া বিষয়ে। কারণ ট্রাইব্যুনালের আইনে ফাঁসির বিধান থাকলেও আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়া হয়নি। দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন।  তাই ফাঁসির উদ্দেশে আইন সংশোধন করা হলে আসামীর অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন আসে। বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া এটর্নি জেনারেলকে বলেন আপনার দরখাস্ত গ্রহণ করা হলে তো আসামীকে ফাঁসি দিতে হয়।
এটর্নি জেনারেল বলেন, আমাকে আপিলের একটা সুযোগ দেয়া  হয়েছে আইন সংশোধন করে। সেখানে আসামীর অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন আসবে কেন?
২০১৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালের আইনের সংশোধনী  আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি-না সে বিষয়ে দুর্বলতা, অস্পষ্টতা বিষয়ে  বিতর্ক চলাকালে আদালত বিরতিতে চলে যান গতকাল। দুপুর ১২টায় আবার কোর্ট বসে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন অনুপস্থিত থাকায় আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার শুনানী আজ আর হয়নি।
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানী গ্রহণ করেন।






বুধবার, ১২ জুন, ২০১৩

কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী//এটর্নি জেনারেলকে একের পর এক প্রশ্ন আদালতের

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত  যাবজ্জীবন কারাদান্ডের বিরুদ্ধে আপিল শুনানী অব্যাহত রয়েছে। আজ আসামী পক্ষের  শুনানীর জবাব দিচ্ছিলেন  রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা বা এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। জবাব প্রদানের সময় একের পর এক নানামুখী প্রশ্নের মুখোমুখি হন এটর্নি জেনারেল। প্রশ্নের জবাব প্রদানে এটর্নি জেনারেলকে  সহায়তা না করায় কোর্টে উপস্থিত অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল, ডেপুটি এটর্নি জেনারেলদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন  দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায়ের বিভিন্ন অসঙ্গতি, দুর্বল  দিক তুলে ধরে অনেক অভিযোগ উত্থাপন করেন আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।  এটর্নি জেনারেল এর কাছে এসব অভিযোগের জবাব  দাবি করেন কোর্ট। এটর্নি জেনারেল কোর্টের  বিভিন্ন প্রশ্নের এবং আসামী পক্ষের অভিযোগের জবাব প্রদানের সময় রায়ের কপি, ফরমাল চার্জসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট থেকে পাতা উল্টিয়ে রেফারেন্স দেয়ার চেষ্টা করেন।  প্রথম বেঞ্চে তখন  তিনজন অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এবং আরো কয়েকজন ডেপুটি এটর্নি জেনারেলসহ  এটর্নি জেনারেল অফিসের  ছয় থেকে সাতজন  আইন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তারা এটর্নি জেনারেলকে প্রশ্নের জবাব প্রদানে কোন সহায়তা করছিলেননা। তখন প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ অন্যান্য বিচারপতিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাদের প্রতি। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ওনারাতো সব জেনারেল। ওনারা কি সহায়তা করবেন। এটর্নি জেনারেলকে সহায়তা করতে হলে  বিগ্রেডিয়ার, কর্নেল, লে, লে কর্নেল এবং ক্যাপ্নে লাগবে। তিনি এটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, জবাব দিতে এত সময় লাগলে তো চলবেনা। কেউ তো আপনাকে কোন রেফারেন্স দিয়ে হেল্প করেনা। আপনাকে আমরা এত সময় দেব কেন? তিনি অন্যন্যা সরকারি আইন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন শুধু ম্যাটেরিয়াল এক্সিবিট হয়ে লাভ নেই।
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা  বলেন, আপনার টিম এসব কালেক্ট না করে আসলে কেমনে হবে?
বিচারপতি আব্দুল  ওয়াহহাব মিয়া বলেন,  ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাহেব যখন সাবমিশন রাখেন তখন তার জুনিয়ররা তার সাথে সাথে তাল মিলিয়ে একের পর পাতা উল্টায় বিভিন্ন ডকুমেন্ট থেকে। তাকে রেফারেন্স দিয়ে সহায়তা করেন। ভুল হলে কানে কানে আবার বলে দেয়। আপনারা এরকম পারেননা?

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আসামী পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের সময় এর আগে বলেছেন,  এইডিং, এ্যাবেটিং এবং কমপ্লিসিটি বিষয়ে কাউকে সাজা দিতে হলে রাষ্ট্রপক্ষকে প্রমান করতে হবে যে, অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে আসামী আব্দুল কাদের মোল্লার সারকমসটেনশিয়াল কন্ট্রিবিউশন বা যথার্থ অবদান ছিল।  তিনি বলেন,  অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে আব্দুল কাদের মোল্লার সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্টতা ছিল এটি রাষ্ট্রপক্ষ  পক্ষ প্রমান করতে পারেনি। অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে সাবসটেনশিয়াল কন্ট্রিবিউশন না থাকলে  এইডিং, এ্যাবেটিং এবং কমপ্লিসিট এর অভিযোগে সাজা দেয়া যায়না।
এইডিং, এ্যাবেটিং, কমপ্লিসিটি এবং সারকমসটেনশিয়াল কন্ট্রিবিউশন কি সে বিষয়ে রেফারেন্স হিসেবে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক রুয়ান্ডার লরেন স্যামেঞ্জার মামলার রেফারেন্স দিয়েছিলেন।
আজ যুক্তি পেশের সময় এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম লরেন স্যামেঞ্জা মামলার বেশ বড় একটি ডকুমেন্ট বঁধাই করে বিচারপতিদের সরবরাহ করেন।
এরপর বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া এটর্নি জেনারেলকে প্রশ্ন করেন, এটি আপনি কেন দিলেন সে বিষয়ে তো কিছু বললেননা। এটি দিয়ে আপনি কি বোঝাতে চান?  এটা কেন দিলেন আমরাতো তা কিছু বুঝলামনা। ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাহেব এ বিষয়ে কি সাবমিশন রেখেছিলেন এবং কি বলতে চেয়েছিলেন?
তখন এটর্নি জেনারেল বলেন, ওনারা যে কি বোঝাতে চেয়েছিলেন তা আমিও বুঝিনি। তখন বিচারপতি এবং কোর্টে উপস্থিত অনেকের মাঝে হাসির সৃষ্টি হয়।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব  মিয়া বলেন, আপনি আপনাকে হেল্প করছি মি. এটর্নি জেনারেল। ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাহেব বলতে চেয়েছিলেন, অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে আব্দুল কাদের মোল্লার সাবসটেনশিয়াল কন্ট্রিবিউশন ছিলনা। সাবসটেনশিয়াল কন্ট্রিবিউশন না থাকলে কাদের মোল্লাকে সাজা দেয়া যাবেনা এই ছিল তার সাবমিশন। এখন আপনি এর জবাব দেন।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  আসামী পক্ষে  যুক্তি পেশের সময় রাষ্ট্রপক্ষের চার নম্বর সাক্ষী কাজী রোজীর সাক্ষ্য বিষয়ে নানা অসঙ্গতি এবং বৈপরীত্য তুলে ধরে বলেছিলেন, তার সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়।
এটর্নি জেনারেল আজ যুক্তি পেশের সময় বলেন, তার সাক্ষ্য অবশ্যই বিশ্বাস যোগ্য। সে একজন ন্যাচারাল সাক্ষী। এসময় বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী প্রশ্ন করেন, আসামী পক্ষ বলেছেন, সাক্ষী শোনা কথা বলেছেন। সাক্ষী কার কাছ থেকে শুনেছেন তা প্রকাশ করা হয়নি। সাক্ষী কার কাছ থেকে শুনেছে সে সোর্স প্রকাশ করতে বাধ্য কিনা?
এটর্নি জেনারেল বলেন, অবশ্যই সাক্ষী সোর্স প্রকাশ করতে বাধ্য নন।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, তাছাড়া আসামী পক্ষের অভিযোগ একটি শোনা কথা  আরেকটি শোনা কথাকে সহায়তা করতে পারেনা।  কবি মেহেরুন্নিসা ছিলেন অ্যকশন কিমিটির সেক্রেটারি। আর কাজী রোজী ছিলেন সভানেত্রী। তাই কাজী রোজী কবি মেহেরকে নিয়ে যে বই লিখেছেন তাতে তো বিস্তারিতভাবে থাকা দরকার ছিল স্বাভাবিকভাবে। আব্দুল কাদের মোল্লার নাম সেখানে নেই কেন।
এসময়  আরো  দুয়েকজন বিচারপতি প্রশ্ন করেন আব্দুল কাদের মোল্লার নাম তার বইয়ে নেই। এটি ছিল আসামী পক্ষের দাবি।
এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আব্দুল কাদের মোল্লার নাম বইতে  উল্লেখ  করলে লেখকের জীবনের হুমকি ছিল।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন,  তদন্ত কর্মকর্তার কাছে  এসব বলেননি কেন তিনি?
তখন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কবি মেহেরকে নিয়ে কাজী রোজীর বইটি ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়েছে এবং তখন আব্দুল কাদের মোল্লা জেলে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যুক্তি পেশের সময় বলেছিলেন  আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় চার্জ গঠন  এবং বিচার শুরুর পরও তদন্ত পরিচালিত হয়েছে যা আইনবিরোধী। তারা তিনজন সাক্ষী পরবর্তীতে অতিরিক্ত সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ বিষয়ে আদালত জানতে চাইলে এটর্নি জেনারেল বলেন, আইনের ৯(৪) এবং রুলের ৪৬ (এ) অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল অতিরিক্ত তিনজন সাক্ষী অন্তর্ভুক্ত করেছে।

প্রধান বিচারপতি  মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে আজ  আপিল শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। শুনানী আগামীকাল পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।






বৃহস্পতিবার, ৬ জুন, ২০১৩

আব্দুল কাদের মোল্লা মামলা/// আসামী পক্ষের আপিল শুনানী শেষ রাষ্ট্রপক্ষের জবাব প্রদান শুরু

মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আসামী পক্ষের আপিল শুনানী আজ শেষ হয়েছে।  আসামী পক্ষের শুনানী শেষে রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম   তার জবাব প্রদান শুরু করেছেন।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল  হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ  শুনানী গ্রহণ করেন।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আজ শুনানীর শেষ পর্যায়ে তিনটি  দফা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন আব্দুল কাদের মোল্লা হাক্কা গুন্ডা, আক্তার গুন্ডাসহ বিহারী গুন্ডাদের  কালপাবল এসোসিয়েশন ছিল বলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়টি তারা জুড়িশিয়াল নোটিশের মাধ্যমে আমলে নিয়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে বিহারী গুন্ডাদের দোসর হিসেবে বর্নিত করা হয়েছে। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন,   ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত কোন ঘটনাকে আদালত জুড়িশিয়াল নোটিশে নিতে পারে। তা প্রমানের দরকার হয়না। যেমন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের ঘটনা আদালত জুড়িশিয়াল নোটিশে নিতে পারে। এটা নতুন করে প্রমানের দরকার হয়না। কিন্তু আব্দুল কাদের মোল্লা বিহারী গুন্ডাদের দোসর ছিল এবং তাদের সাথে অপকর্মে অংশ নিয়েছে এটা প্রমান করা ব্যাতিরেকে কি করে আদালত জুড়িশিয়াল নোটিশে নিতে পারে?  আব্দুল কাদের মোল্লা  বিহারী গুন্ডাদের দোসর হিসেবে বিভিন্ন অপকর্ম করেছে তা তো কোন প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। কিন্তু জুড়িশিয়াল নোটিশের সুযোগ নিয়ে ট্রাইব্যুনাল এটি করেছে। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন এটা  অবৈধ।
এরপর তিনি বলেন,  ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে আলুবদী হত্যাকান্ড এবং হযরত আলী পরিবারকে হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ এ অভিযোগে ফাঁসির দাবি করেছে।  রাষ্ট্রপক্ষের এখন প্রমান করতে হবে ট্রাইব্যুনাল যে যাবজ্জীবন রায় দিয়েছে তা একটি  পারভারস বা ন্যায়ভ্রষ্ট রায়। এটি প্রমান না করে তারা এ দাবি করতে পারেনা। একই ভাবে  ঘাটার চর  হত্যাকান্ড অভিযোগ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষ এ অভিযোগে শাস্তি দাবি করে আপিল করেছে। এ ক্ষেত্রেও তাদের প্রমান করতে হবে যে,  ট্রাইবু্যুনাল এ ক্ষেত্রেও ন্যায়ভ্রষ্ট রায় দিয়েছে।
তিনি বলেন, হযরত আলী হত্যাকান্ডে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মোমেনা বেগমকে পুনরায় পাঁচটি প্রশ্নের জেরা করার জন্য রিকলের আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সে আবেদন খারিজ করে দিয়েছে।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মোমেনা বেগম তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন সেখানে তিনি  তার পিতা এবং পরিবারের লোকজনের হত্যাকান্ড বিষয়ে আব্দুল কাদের মোল্লার নাম বলেননি। তিনি বলেছেন- বিহারীরা এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে এবং তাদের তিনি চিনতেন। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার  কাছে মোমেনা বেগমের এ জবানবন্দী আমলে নেয়ার  ব্যবস্থা করা হোক।

ঘাটার চর ঘটনা এবং আদালতের প্রশ্ন এটর্নি জেনারেলের কাছে : চার নং অভিযোগ কেরানীগঞ্জের ঘাটার চর হত্যাকান্ড  থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে শুনানী পেশের সময় এটর্নি জেনারেলকে আদালত কয়েকটি প্রশ্ন করেন। সে  প্রশ্নে যাবার আগে ঘাটার চর ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট সাক্ষীর জবানবন্দী বিষয়ে জেনে নেয়া দরকার।
ঘাটার চর ঘটনার অভিযোগ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বিবরন : ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর আব্দুল কাদের মোল্লা   ৬০-৭০ জন রাজাকার আল বদর বাহিনী নিয়ে ঘাটার চরে হামলা চালায়। এসময় তারা ওসমান গনি এবং গোলাম মোস্তফা নামে দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। এছাড়া দুটি গ্রামে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষ হত্যা করে।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষে তিন জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের একজন হলেন আব্দুল মজিদ পালোয়ান। তিনি  বলেছেন ২৫ নভেম্বর সকালে তাদের গ্রামের উত্তর দিক থেকে গুলি  আসতে লাগল। তিনি ঘটনা জানার জন্য যেদিক থেকে গুলি আসতে লাগল সেদিকেই অগ্রসর হন।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব  মিয়া  এটর্নি জেনারেলকে প্রশ্ন করেন আর্মি আসা এবং গুলির আসার শব্দে সবাই যাচ্ছে একদিকে আর সাক্ষী যাচ্ছে যেদিক থেকে গুলি আসচে সেদিকে। এটা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব কি-না। সেসময় সাক্ষীর বয়স কত ছিল?
এটর্নি জেনারেল বলেন ১৬। বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, ১৫/১৬ বছরের একটি ছেলের পক্ষে আর্মি আসার খবর পেয়ে সেখানে দাড়িয়ে থাকা এবং গুলি যেদিক থেকে আসছে সেদিকে  এগিয়ে যাওয়া কি সম্ভব?
এটর্নি জেনারেল বলেন, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা । তাছাড়া যুদ্ধ তখন শেষ পর্যায়ে। তাই এটা সম্ভব ছিল।

বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, আসামী পক্ষের আইনজীবী দাবি করেছেন আপনারা যে মৃত্যুদণ্ড এবং খালাস দেয়া অভিযোগে শাস্তি দাবি করেছেন তার পক্ষে প্রমান করতে হবে যে, ওই বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের রায় পারভারস ছিল। সাধারনত রায় পারভারস না হলে আমরা হস্তক্ষেপ করিনা।
এ পর্যায়ে আজকের মত শুনানীর শেষ হয়।
আসামী পক্ষে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে যুক্তি  উপস্থাপনে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, অ্যাডভোকেট শিশির মো : মনির, অ্যাডভোকেট সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ ।




বুধবার, ৫ জুন, ২০১৩

কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী/// ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগম বলেছেন তিনি হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী কিন্তু জল্লাদখানা ডকুমেন্টে লেখা রয়েছে তিনি ঘটনার ২ দিন আগে শশুর বাড়ি চলে যান


মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যে দুটি  অভিযোগে  যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান  করা হয়েছে তার মধ্যে একটি অভিযোগ হল মিরপুরে কালাপানি লেনে হযরত আলী,  তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীকে হত্যা ও    মেয়েদের ধর্ষনের ঘটনা।

এ ঘটনায় বেঁচে যায় হযরতী আলী লস্করের   বড় মেয়ে মোমেনা বেগম। মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে এসে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন এ ঘটনা বিষয়ে । ট্রাইবু্যুনালে মোমেনা বেগম বলেছেন ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং ধর্ষনের ঘটনা দেখেছেন। তিনি নিজেও  শারিরীক লাঞ্ছনার শীকার হন এবং এক পর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন। একই সাক্ষী মোমেনা বেগম  তাদের  পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং ধর্ষনের ঘটনা সম্পর্কে  ২০০৭ সালে মিরপুর  জল্লাদখানা যাদুঘর (মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর এর অংশ) কর্তৃপক্ষের  কাছে বিবরন দেন। মোমেনা বেগমের  বরাত দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ এ ঘটনা বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। সে প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়  মোমেনা বেগম   ঘটনার দুই  দিন আগে  শশুরবাড়ি চলে যাওয়ায় প্রানে বেঁচে যান।

কোর্টে তিনি বললেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন আর মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত বক্তব্যে দেখা যায় তিনি ঘটনার দুই দিন আগে শশুর বাড়ি চলে যান।

আব্দুল কাদের মোল্লাকে  ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদান্ডের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন শুনানীর সময় আজ  ৬ নং অভিযোগ তথা হযরত আলী পরিবারের হত্যাকান্ডের বিষয়ে যুক্তি পেশ করেন আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।    এ ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হযরত আলীর মেয়ে মোমেনা বেগমের ট্রাইব্যুনালে প্রদত্ত জবানবন্দী এবং জল্লাদ খানা যাদুঘরে রক্ষিত ডকুমেন্ট পড়ে শোনান তিনি।

প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।

৬ নং অভিযোগ হযরত আলী হত্যাকান্ড : ৬ নং অভিযোগ হযরত আলী হত্যাকান্ড বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগমের  জবানবন্দীর আজ আদালতে পড়ে শোনান ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। ঘটনাটি সংক্ষেপে নিম্নরূপ : ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঘটনা ঘটে। মোমেনা বেগমরা তখন মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের  ৫ নং কালাপানি লেনে ২১ নম্বর বাসায় থাকতেন। মোমেনা বেগম কোর্টে সাক্ষ্য দিয়ে  ঘটনা বিষয়ে বলেন, সন্ধ্যার সময় তার পিতা হযরত আলী হন্তদন্ত হয়ে  ঘরে আসলেন এবং  বললেন কাদের মোল্লা তাকে মেরে ফেলবে। কাদের মোল্লা এবং তার বিহারী সাগরেদ আক্তার গুন্ডা তার পিতাকে হত্যার জন্য ধাওয়া করছে। তার পিতা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এরপর তারা বাইরে বোমা ফাটাল। দরজা খোলার জন্য গালিগালাজ করল। তার মা দাও  হাতে নিয়ে দরজা খুলল। তারা ঘরে ঢুকে গুলি করে হত্যা করল তার মাকে। কাদের মোল্লা তার পিতাকে কলার ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গেল। তার সঙ্গীরা তার বোন খাদিজা এবং তাসলিমাকে জবাই করল। দুই বছরের ভাইকে আছড়িয়ে হত্যা করে।
মোমেনা জানায় সে এবং তার  ১১ বছর বয়স্ক অপর বোন আমেনা খটের নিচে আশ্রয় নেয় ঘটনার সময়। আমেনা ভয়ে চিৎকার দেয়ায় তাকে খটের নিচ থেকে টেনে বের করে জামাকাপড় ছিড়ে ফেলে এবং এক পর্যায়ে তার কান্না থেমে যায়।  এক পর্যায়ে তাকেও টেনে বের করে এবং ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এক পর্যায়ে সে জ্ঞান হারায় এবং জ্ঞান ফিরে পেটে প্রচন্ড ব্যর্থা অনুভব করে। তার পরনের প্যাণ্ট ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পান তিনি। পরে এক  ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং তাদের সেবার মাধ্যমে কিছুটা সুস্থ হন। পরে তার শশুর খবর পেয়ে তাকে এসে নিয়ে যান।

মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত ডকুমেন্টে যা রয়েছে :
মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত  পাম্প হাউজে  এনে ১৯৭১ সালে বিহারীরা বাঙ্গালীদের হত্যা করত। হত্যার পর তাদের লাশ ফেলে দিত পানির ট্যাংকি এবং পার্শবর্তী ডোবায়। ১৯৯০ দশকে  এখানকার বধ্যভূমিটি আবিষ্কার হয় এবং  অসংখ্য শহীদদের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এরপর পাম্প হাউজটিকে  জল্লাদখানা যাদুঘর করা হয় এবং এটি বর্তমানে মুুক্তিযুদ্ধ যাদু ঘরের অংশ।  জল্লাদখানায় ১৯৭১ সালে যাদের হত্যা করা হয়েছে যাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাদের পরিবারে অনেক আত্মীয় স্বজনকে খুঁজে বের করে বিভিন্ন  সময়ে তাদের সাক্ষাতকার  বক্তব্য রেকর্ড করে তা যাদুঘরে সংরক্ষন করে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ।
হযরত আলী হত্যাকান্ডসহ আরো অনেক হত্যাকান্ড বিষয়ে  শহীদ পরিবারের আত্মীয় স্বজনদের  সাক্ষাতকার,  লিখিত বক্তব্যের মূল কপি, অডিও ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। এছাড়া লিখিত  বক্তব্যের ডুপ্লিকেট কপি সংরক্ষিত আছে মিরপুর জল্লাদখানা যাদুঘরে। 

যে হযরত আলী হত্যাঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে সেই ঘটনার একটি বিবরন রক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে। হযরত আলীর বেঁচে যাওয়া একমাত্র মেয়ে মোমেনা বেগমের বরাত দিয়েই সে ঘটনার বর্ননা  লিপিবদ্ধ এবং সংরক্ষন করা হয়েছে।  মোমেনা বেগমের সাক্ষাতকার গ্রহনের মাধ্যমে এ ঘটনার বিবরন তারা সংগ্রহ করে।    মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে রক্ষিত সে ডকুমেন্টে  লেখা আছে ঘটনার দুই দিন আগে মোমেনা বেগম তার শশুর বাড়ি চলে যান।

হযরত আলী হত্যাকান্ড বিষয়ে তার মেয়ে মোমেনা বেগমের সাক্ষাতকার যাদুঘর কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে ২৮/৯/২০৭  তারিখ। তিনি তখন তাদের কাছে ঘটনার যে বিবরন দেন তা নিম্নরূপ।

‘ঘটনার বিবরণ : ১৯৭১ সালে মিরপুরের কালাপানি এলাকায় বিহারিদের সঙ্গে কিছু বাঙালি পরিবারও বাস করতো। ৭ মার্চ এর পর থেকে দেশের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে কিছু কিছু বাঙালি পরিবার এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। অনেকের অন্যত্র যাওয়ার অবস্থা ছিল না ফলে এলাকায় রয়ে গেলেন। যে কয়েকটি পরিবার অন্যত্র যেতে পারলেন না তাদের মধ্যে একটি হযরত আলী লস্কর-এর পরিবার।
হযরত আলী লস্কর ছিলেন একজন দর্জি/খলিফা। মিরপুরেই তার দোকান ছিল। সকলে যখন এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন তখন হযরত আলী লস্করকেও তারা চলে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর যাওয়ার জায়গা ছিল না। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হয়ে গেলে ২৬ মার্চ সকাল সাতটার দিকে বিহারিরা হযরত আলী লস্কর-এর বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং তাকে ধরে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরই তারা তাঁর স্ত্রী, দুই কন্যা ও শিশু পুত্রকে ধরে নিয়ে যায় এবং সকলকে এক সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করে পাশের বাড়ির কুয়োতে সব লাশ ফেলে যায়। বিহারিরা তার দ্বিতীয় কন্যা আমেনা বেগমকে ঘরের ভতর সারাদিন আটকে রেখে ধর্ষণ করে। পরে তাকেও হত্যা করে সেই কুয়োতে ফেলে। হযরত আলীর বড় মেয়ে মোমেনা বেগম মাত্র দুইদিন আগে শ্বশুরবাড়িতে চলে যাওয়ায় একমাত্র সেই প্রানে বেঁচে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত আলী স্ত্রী সে সময় অন্তঃসত্বা ছিল।
কয়েকদিন পরই এ খবর হযরত আলীর বড় মেয়ে মোমেনা বেগম জানতে পারেন। কিন্তু মিরপুরের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে তিনি বাড়ি আসতে পারলেন না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজ বাড়িতে এসে তিনি আর কিছুই অবশিষ্ট পেলেন না। ভগ্নহৃদয়ে ফিরে গেলেন শ্বশুরবাড়িতে।”

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে বলেছেন তিনি ঘটনার তিন বছর পর পর্যন্ত পাগল ছিলেন। তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হত। তিনি তার পিতার হত্যার ঘটনা দেখেননি। ঘটনার দিন তার পিতাকে ধরে নিয়ে যেতে দেকেছেন। কিন্তু কারা কিভাবে হত্যা করেছে তা তিনি দেখেননি। তিনি কামাল নামে একজনের কাছে শুনেছেন তার পিতার হত্যার ঘটনা।

আজ  ছয় নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপনের পূর্বে   পাঁচ নং অভিযোগ তথা আলুবদি অভিযোগ বিষয়ে অসমাপ্ত বক্তব্য পেশ করেন। এ ঘটনা বিষয়ে ৯ নং সাক্ষী আমির হোসেনর সাক্ষ্য এবং তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যের মধ্যে গরমিল তুলে ধরেন। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাক্ষী বলেছেন তিনি ১৯৭০ সালে আব্দুল কাদের মোল্লাকে  চিনতেন। ঘটনার দিন আব্দুল কাদের মোল্লাকে তিনি রাইফেল হাতে দাড়িয়ে থাকতে দেখেছেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় বলেছেন এ কথা সাক্ষী তাকে বলেননি।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাক্ষী আমির হোসেন মোল্লা বলেছেন তিনি ঘটনার দিন গ্রামের উত্তর পশ্চিম পাশে কচুরিপানার মধ্যে  লুকিয়ে থেকে ঘটনা দেখেছেন। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ঘটনার বিবরন অনুযায়ী পাকিস্তান আর্মি আসে  গ্রামের পশ্চিম দিক থেকে। আব্দুল কাদের মোল্লা আসে পূর্ব দিক থেকে। আর সাক্ষী ছিল গ্রামের উত্তর পশ্চিম পাশে কচুরিপানার মধ্যে। এভাবে কি কারো পক্ষে গ্রামের মধ্যে ঘটনা দেখা যায়?
এছাড়া ষষ্ঠ সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা বলেছেন তিনি ঝোপের মধ্যে  চারফিট গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থেকে দেকেছেন  ঘটনা। গ্রামের চারদিকে তখন ধানক্ষেত। সাক্ষীর কথা অনুযায়ী সে  ধানক্ষেত ছিল মানুষের সমান লম্বা। এভাবে গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থেকে ধান ক্ষেতের মাথার ওপর দিয়ে ঘটনা দেখা  এবং মানুষ চেনা কি করে সম্ভব হতে পারে>
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের সাবমিশন হল এ দুজন সাক্ষী বিশ্বাসযোগ্য নয় কোন অবস্থাতেই।
শুনানী শেষে অ্যাডভোটেক শিশির মো : মনির  সাংবাদিকদের জানান সাক্ষী আমির হোসেন মোল্লার বিরুদ্ধে তারা ১১টি মামলার রেকর্ড সংগ্রহ করেছেন। হাইকোর্টের একজন বিচারকের জমিদখলসহ তার বিরুদ্ধে আরো অনেক দখল, লুটপাটের মামলা হয়েছে। ইনকিলাবসহ বিভিন্ন পত্রিকায় তার অপরাধ বিষয়ে লিড নিউজ হয়েছে। সাক্ষী এলাকায় লাটভাই নামে পরিচিত।

যুক্তি উপস্থাপনে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, শিশির মো : মনির, সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ।

মঙ্গলবার, ৪ জুন, ২০১৩

আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী/// আলুবদি হত্যাকান্ড বিষয়ে যুক্তি পেশ শুরু

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত সাজা বিষয়ে আসামী পক্ষের  আপিল শুনানী চলছে।   আজ পাঁচ নং অভিযোগ তথা  মিরপুরে  আলুবদি হত্যাকান্ড বিষয়ে  যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেছেন আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ  শুনানী গ্রহণ করেন।

আব্দুল কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল-২ যে দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন কারদন্ড প্রদান করেছে তার মধ্যে একটি হল মিরপুরের আলুবদি  গ্রামে গণহত্যার  ঘটনা। আব্দুল  কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এটি ছিল পাঁচ নং অভিযোগ।

৫ নং অভিযোগ : ট্রাইব্যুনালের রায়ে  আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ৫ নং অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরন তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়- ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল  সাড়ে চারটার সময় আব্দুল কাদের মোল্লার  সদস্যরা (মেম্বারস)  পাকিস্তান আর্মি সাথে নিয়ে মিরপুর পল্লাবীর  আলুবদি গ্রামে নিরীহ বেসামরিক লোকজনের ওপর আক্রমন পরিচালনা করে । আক্রমনের অংশ হিসেবে তারা নির্বিচারে গুলি চালায় এবং এতে ৩৪৪ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়। এ গণহত্যায় সহায়তার অভিযোগে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

৫ নং অভিযোগ বিষয়ে  রাষ্ট্রপক্ষ দুই জন সাক্ষী হাজির করে। তারা হলেন  ৬ নং সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা এবং ৯ নং সাক্ষী আমির হোসেন মোল্লা। তারা দাবি করেছেন তারা এ গনহত্যা তারা দেখেছেন এবং আব্দুল কাদের মোল্লা মূল নায়ক হিসেবে এতে অংশগ্রহণ করে। তারা সে সময় ওই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন ।
অপর দিকে এ ঘটনা বিষয়ে আসামী পক্ষের একজন সাক্ষী হল আলতাফ উদ্দিন মোল্লা। আলতাফ উদ্দিন মোল্লা আবার রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লার ছোট ভাই।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  আজ উক্ত তিনজন সাক্ষীর জবানবন্দী এবং জেরা পড়ে শোনান আদালতে। এরপর রায় থেকে কিছু ফাইন্ডিংস তুলে ধরেন। এরপর তিনি ৬ নং  সাক্ষী সফিউদ্দিন মোল্লা এবং তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যের গরমিল তুলে ধরেন।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ৬ নং সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা ট্রাইব্যুনালে বলেছেন- তিনি ১৯৭০ সালে আব্দুল কাদের মোল্লাকে চিনতেন। তার দাবি আব্দুল কাদের মোল্লা তখন গোলাম আযমের নির্বাচনের পক্ষে কাজ করেছেন। অন্যদিকে সাক্ষী নিজে আরেক প্রার্থী জহির উদ্দিন জালালের পক্ষে কাজ করেছেন কর্মী হিসেবে। সেই হিসেবে তিনি আব্দুল কাদের মোল্লাকে চিনতেন।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাক্ষীকে জেরায় প্রশ্ন করা হয়-১৯৭০ সালে আব্দুল কাদের  মোল্লাকে চেনার কথা কি আপনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে বলেছিলেন?
সাক্ষী  উত্তর দিয়েছেন-বলেছি।
তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার সময় প্রশ্ন করা হয় সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা ১৯৭০ সালে আব্দুল কাদের মোল্লাকে চিনত একথা কি আপনাকে বলেছিল? তদন্ত কর্মকর্তা জনান-না বলেননি।

তাছাড়া সাক্ষীকে প্রশ্ন করা হয় আপনি যে প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছিলেন সে কি বাঙ্গালী না অবাঙ্গালী ছিলেন। তার উত্তর তিনি দিতে পারেননি। এছাড়া নির্বাচনী এরিয়ার কথাও তিনি বলতে পারেননি।

সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, তিনি দেখেছেন ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল ঘটনার সময় আব্দুল কাদের মোল্লা রাইফেল হাতে দাড়িয়ে ছিল এবং নিজে গুলি করেছে।
জেরায় তাকে প্রশ্ন করা হয় একথা আপনি তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেছিলেন কি-না। সে জবাব দেয়-বলেছি। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় জানান  আব্দুল কাদের মোল্লাকে রাইফেল হাতে দাড়িয়ে থাকতে দেখার কথা সাক্ষী তাকে  বলেননি।
সাক্ষী বলেছেন তিনি ফজরের আজানের সময় ঝোপের মধ্যে চার ফিট একটি গর্তের মধ্যে থেকে এ ঘটনা দেখেছেন।
সাক্ষী আরো বলেছেন তিনি দেখেছেন আব্দুল কাদের মোল্লা আর্মির সাথে উর্দুতে কথা বলেছেন। কিন্ত দূরে থাকায় তিনি তা শুনতে পাননি।
শুনানী শেষে আসামী পক্ষের অপর আইনজীবী শিশির মো : মনির সাংবাদিকদের জানান, আমরা আগামীকাল বুধবার আদালতে স্কেচ ম্যাপ দিয়ে দেখাব ঝোপের মধ্যে চারফিট গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থেকে হত্যাকান্ডের  স্থান এবং ঘটনা দেখা কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে আজ যুক্তি উপস্থাপনে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, শিশির মো : মনির, সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ।



সোমবার, ৩ জুন, ২০১৩

কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী তালেব হত্যা বিষয়ে ফরমাল চার্জ, সাক্ষী এবং তদন্ত কর্মকর্তার পরষ্পর বিরোধী তথ্য


মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত সাজা বিষয়ে আসামী পক্ষের  আপিল শুনানী অব্যাহত রয়েছে। আজ সোমবারও তিন নং অভিযোগ সাংবাদিক আইনজীবী  খন্দকার আবু তালেব হত্যার বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

যুক্তি উপস্থাপনের সময় ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  খন্দকার আবু তালেব হত্যা ঘটনা বিষয়ে সাক্ষী, তদন্ত কর্মকর্তা এবং ফরমাল চার্জ থেকে  পরষ্পর বিরোধী বিষয়গুলো  তুলে ধরেন।  তিনি আদালতকে দেখান যে, তালেব  হত্যার ঘটনার বিবরনে ফরমাল চার্জ এবং সাক্ষীদের দেয়া সাক্ষ্যে পরষ্পর বিরোধী তথ্য রয়েছে। যেমন ফরমাল চার্জে ঘটনা বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে মিরপর ১০ নং বাস স্ট্যান্ড থেকে  আবু তালেবকে কাদের মোল্লা অন্যান্য আলবদর, রাজাকার এবং বিহারী দৃস্কৃতকারীরা ধরে  দড়ি দিয়ে বেঁধে মিরপুর জল্লাদখানায় নিয়ে হত্যা করে। অপর দিকে এ ঘটনা বিষয়ে  রাষ্ট্রপক্ষের যে দুজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা বলেছেন খন্দকার আবু তালেব বাসায় ফেরার পথে ইত্তেফাকের  প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা বিহারী আব্দুল হালিম তাকে বিহারীদের হাতে তুলে দেয়। আব্দুল হালিম মিরপুরে  বাসায় পৌছে দেয়ার নাম করে তার গাড়িতে  খন্দকার আবু তালিবকে তোলে এবং তাকে কাদের মোল্লা/বিহারীদের হাতে তুলে দেয়।

আব্দুল কাদের মোল্লাকে যে তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে  কারাদণ্ড প্রদান করেছে ট্রাইব্যুনাল-২  তার মধ্যে একটি হল খন্দকার  আবু তালেব হত্যার অভিযোগ।
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের  আপিল বেঞ্চ শুনানী  গ্রহণ করেন আজ।

তালেব হত্যা বিষয়ে সাক্ষী, তদন্দ কর্মকতা এবং ফরমাল চার্জের গরমিল তুলে ধরে আজ ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যে যুক্তি তুলে ধরেন তা নিম্নরূপ।

৩ নং অভিযোগ : আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জের তিন নং অভিযোগ খন্দকার আবু তালেব হত্যার ঘটনা বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে -১৯৭১ সালে ২৯ মার্চ সাংবাদিক আইনজীবী খন্দকার আবু তালেব তার মিরপুর ১০ নং সেকশনে অবস্থিত বাসা থেকে  আরামবাগ যাচ্ছিলেন। তিনি মিরপুর ১০ নং বাস স্ট্যান্ডে পৌছার পর ইসলামী ছাত্র সংঘ নেতা  আব্দুল কাদের মোল্লা অন্যান্য আল বদর সদস্যা, রাজাকার  এবং দৃষ্কৃতকার এবং বিহারীদের সাথে নিয়ে তাকে ধরে ফেলে।  তারা খন্দকার আবু তালেবকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মিরপুর জল্লাদখানা পাম্প হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে সেখানে হত্যা করা হয়।

ফরমাল চার্জ থেকে পড়ে শোনানোর পরে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আবু তালেবের ছেলে  ৫ নং সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসানের সাক্ষ্য পড়ে শোনান।

সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান  ট্রাইব্যুনালে বলেছেন- ২৫ মার্চ ইত্তেফাক অফিস গুড়িয়ে দেয়ার  খবর শুনে তার পিতা খন্দকার আবু তালেব সেখানে যান তার সহকর্মীদের অবস্থা জানতে। তিনি সেখানে কিছু মৃতদেহ দেখতে পান। ২৯ মার্চ তিনি তাদের মিরপুর বাসায় আসছিলেন তার গাড়ি এবং টাকা নেয়ার জন্য। কিন্তু মিরপুর যাবার পথে ইত্তেফাকের প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা  অবাঙ্গালী আব্দুল হালিমের সাথে দেখা হয় তার। আব্দুল হালিম  তাকে পৌছে দেয়ার নাম করে তার গাড়িতে ওঠান এবং আব্দুল কাদের মোল্লার কাছে নিয়ে যান। এরপর মিরপুর ১০ জল্লাদ খানায় তার পিতাকে আব্দুল কাদের মোল্লা হত্যা করে।  এসময় আব্দুল কাদের মোল্লার সাথে আক্তার গুন্ডা এবং আরো অবাঙ্গালী দুস্কৃতকারীরা ছিল।

সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান জেরায় জানান, তিনি তার পিতার একসময়কার  সহকর্মী  অ্যাডভোকেট খলিল  এর কাছ থেকে শুনেছেন যে, ইত্তেফাকের প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা আব্দুুল হালিম  তার পিতাকে তার গাড়িতে করে নিয়ে গিয়ে কাদের মোল্লা এবং তার সহযোগীদের হাতে তুলে দিয়েছে। জেরায় তিনি আরো বলেন, তাদের অবঙ্গালী  ড্রাইভার নিজাম তাকে বলেছেন যে,  আব্দুল হালিম তার পিতাকে আব্দুল কাদের মোল্লা এবং তার সঙ্গীদের হাতে তুলে দিয়েছে।


এ ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের আরেক সাক্ষী হলেন আব্দুল কাইউম। তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি মিরপুরের বাসিন্দা এবং  খন্দকার আবু তালেবের বন্ধু ছিলেন। তিনি বলেছেন-  ফারুক খানের (তার কলিগ) কাছে তিনি শুনেছেন যে, স্থানীয় আক্তার গুন্ডা, বিহারী এবং কাদের মোল্লা তালেব সাহেবকে হত্যা করেছে মিপুর ১০ জল্লাদ  খানায়। এছাড়া  তালেব সাহেবের  ড্রাইভার নিজামের কাছ থেকেও তিনি  শুনেছেন যে, খন্দকার আবু তালেব মিরপুরে তার বাসায় আসার পথে ইত্তেফাকের অবাঙ্গালী হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা   আব্দুল হালিম তাকে  বিহারীদের হাতে তুলে দেয় যারা তাকে মিরপুর ১০ জল্লাদখানায় হত্যা করে।

খন্দকার  আবু  তালেবকে  ধরে নিয়ে যাওয়া বিষয়ে  রাষ্ট্রপক্ষেরই  এ বিপরীতধর্মী তথ্য তুলে ধরে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন,    খন্দকার আবু তালেবের ছেলে খন্দকার আবুল আহসান এবং  অপর সাক্ষী আব্দুল কাইউম দুজনেই বলেছেন, ইত্তেফাকের বিহারী হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা আব্দুল হালিম  আবু তালিবকে বাসায় পৌছে দেয়ার নাম করে  তার নিজের গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যায় এবং বিহারীদের হাতে তুলে দেয়া হয়। তিনি বলেন,   তিন পক্ষের পরষ্পর বিরোধী তথ্যের কোনটা আপনারা বিশ্বাস করবেন? তাছাড়া দুজন সাক্ষীই শোনা কথা বর্ননা করেছেন। অপর দিকে জেরায় তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন আক্তার গুন্ডাম হাক্কা গুন্ডা এবং কাদের মোল্লা আবুল তালেবকে হত্যা করেছে একথা -১০ নং সাক্ষী আব্দুল কাইউম  তার কাছে বলেননি।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  বলেন, তাছাড়া জল্লাদখানা যাদুঘর কর্তৃপক্ষের  দুই ভাইবোন যথা খন্দকার আবুল আহসান এবং সখিনা বেগম তাদের পিতা আবু তালেব হত্যা বিষয়ে যে জবানবন্দী দিয়েছেন সেখানেও তারা কেউই আব্দুল কাদের মোল্লার নাম উচ্চারন করেননি।  জল্লাদখানা যাদুঘর কর্তৃপক্ষও  এ ঘটনা বিষয়ে উল্লেখ করেছে অবাঙ্গালী বিহারীরা আবু তালেবকে হত্যা করেছে।
কাজেই আবু তালেব হত্যা বিষয়ে আব্দুল কাদের মোল্লা কোন অবস্থাতেই জড়িত নন।

আজ যুক্তি উপস্থাপনে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট শিশির মো : মনির। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, অ্যাডভোকেট সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ।



রবিবার, ২ জুন, ২০১৩

আপিল শুনানী// জল্লাদখানায় রক্ষিত ডকুমেন্টে পিতা হত্যা বিষয়ে আব্দুল কাদের মোল্লার নাম বলেননি সাক্ষী

মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত সাজা বিষয়ে আসামী পক্ষের  আপিল শুনানী অব্যাহত রয়েছে। আজ রোববার শহীদ খন্দকার আবু তালেব  হত্যাকান্ডের অভিযোগ বিষয়ে আসামী পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। আব্দুল কাদের মোল্লাকে যে তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে  কারাদণ্ড প্রদান করেছে ট্রাইব্যুনাল-২  তার মধ্যে একটি হল খন্দকার  আবু তালেব হত্যার অভিযোগ।

এ ঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লাকে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে দুজন সাক্ষীর শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আজ যুক্তি উপস্থাপন করে   সর্বোচ্চ আদালতে বলেছেন খন্দকার আবু তালেবের ছেলে খন্দকার আবুল  আহসান ট্রাইব্যুনালে এসে বলেছেন তিনি শুনেছেন তার পিতাকে  আব্দুল কাদের মোল্লা হত্যা করে।  কিন্তু তিনি মিরপুর জল্লাদখানা যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে তার পিতার  হত্যার যে বিবরন  দিয়েছেন এর আগে সেখানে তিনি তার পিতার হত্যার সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার নাম বলেননি। তার  বোন সখিনাও  মিরপুর জল্লাদখানা যাদুঘর  কর্তৃপক্ষের কাছে তার পিতা হত্যার ঘটনার বিবরন দিয়েছেন। তিনিও সেখানে আব্দুল কাদের মোল্লার নাম বলেননি।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জল্লাদখানা যাদুঘর কর্তৃপক্ষও তাদের প্রতিবেদনে খন্দকার আবু তালে হত্যা বিষয়ে অবাঙ্গালী বিহারীদের নাম উল্লেখ করেছে।
এছাড়া  দুই জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের বিপরীতধর্মী বক্তব্য তুলে ধরে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, খন্দকার আবুল আহসান বলেছেন ড্রাইভার নিজামের কাছ থেকে তিনি  শুনেছেন  আবু  তালেবকে আব্দুল কাদের মোল্লার হাতে তুলে দিয়েছেন বিহারীরা। অপর দিকে ১০ নং সাক্ষী আব্দুল কাইউম বলেছেন  আব্দুল কাদের মোল্লাকে বিহারীদের হাতে তুলে দেয়ার কথা।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন আজ।

৩ নং অভিযোগ : তিন নং অভিযোগ খন্দকার  আবু তালেব হত্যা বিষয়ে রায়ে বলা হয়েছে -১৯৭১ সালে ২৯ মার্চ সাংবাদিক আইনজীবী খন্দকার আবু তালেব তার মিরপুর ১০ নং সেকশনে অবস্থিত বাসা থেকে  আরামবাগ যাচ্ছিলেন। তিনি মিরপুর ১০ নং বাস স্ট্যান্ডে পৌছার পর ইসলামী ছাত্র সংঘ নেতা  আব্দুল কাদের মোল্লা অন্যান্য আল বদর সদস্যা, রাজাকার  এবং দৃষ্কৃতকার এবং বিহারীদের সাথে নিয়ে তাকে ধরে ফেলে।  তারা খন্দকার আবু তালেবকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মিরপুর জল্লাদখানা পাম্প হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে সেখানে হত্যা করা হয়। একজন বেসামরিক ব্যক্তির হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণ এবং সহাতার কারনে তার বিরুদ্ধে আইনে বর্নিত মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে । 

সাক্ষী :  রায়ে বলা হয় এ অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ দুই জন সাক্ষী হাজির করেছে। এদের মধ্যে একজন হলেন খন্দকার আবু তালেবের ছেলে খন্দকার আবুল আহসান (৫ নং সাক্ষী) এবং অপর আরেকজন সাক্ষী হলেন  খন্দকার আবু তালেবের বন্ধু সৈয়দ আব্দুল কাইউম (১০ নং সাক্ষী)।  তারা তখন মিরপুরে থাকতেন। তাদের দুজনেই এ হত্যাকান্ডের কথা শুনেছেন, দেখেননি।

ব্যারিস্টাার আব্দুর রাজ্জাক সাক্ষী সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান  ট্রাইব্যুনালে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তা পড়ে শোনান শুনানীর সময়।  খন্দকার  আবুল আহাসন ট্রাইব্যুনালে  বলেছেন, ২৫ মার্চ ইত্তেফাক অফিস গুড়িয়ে দেয়ার  খবর শুনে তার পিতা খন্দকার আবু তালেব সেখানে যান তার সহকর্মীদের অবস্থা জানতে। তিনি সেখানে কিছু মৃতদেহ দেখতে পান। ২৯ মার্চ তিনি তাদের মিরপুর বাসায় আসছিলেন তার গাড়ি এবং টাকা নেয়ার জন্য। কিন্তু মিরপুর যাবার পথে ইত্তেফাকের প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা  অবাঙ্গালী আব্দুল হালিমের সাথে দেখা হয় তার। আব্দুল হালিম  তাকে পৌছে দেয়ার নাম করে তার গাড়িতে ওঠান এবং আব্দুল কাদের মোল্লার কাছে নিয়ে যান। এরপর মিরপুর ১০ জল্লাদ খানায় তার পিতাকে আব্দুল কাদের মোল্লা হত্যা করে।  এসময় আব্দুল কাদের মোল্লার সাথে আক্তার গুন্ডা এবং আরো অবাঙ্গালী দুস্কৃতকারীরা ছিল।

সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান জেরায় জানান, তিনি অ্যাডভোকেট খলিল  এর কাছ থেকে শুনেছেন যে, ইত্তেফাকের প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা আব্দুুল হালিম  তার পিতাকে তার গাড়িতে করে নিয়ে গিয়ে কাদের মোল্লা এবং তার সহযোগীদের হাতে তুলে দিয়েছে। জেরায় তিনি আরো বলেন, তাদের অবঙ্গালী  ড্রাইভার নিজাম তাকে বলেছেন যে,  আব্দুল হালিম তার পিতাকে আব্দুল কাদের মোল্লা এবং তার সঙ্গীদের হাতে তুলে দিয়েছে।


খন্দকার আবু তালেব হত্যা বিষয়ে জল্লাদখানা যাদুঘরের ডকুমেন্ট :  শহীদ খন্দকার আবু তালেব, পল্লব হত্যাকান্ড  এবং হযরত আলী হত্যাকান্ডসহ আরো অনেক হত্যাকান্ড বিষয়ে  শহীদ পরিবারের আত্মীয় স্বজনদের  সাক্ষাতকার,  লিখিত বক্তব্যের মূল কপি, অডিও ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। এছাড়া লিখিত  বক্তব্যের ডুপ্লিকেট কপি সংরক্ষিত আছে জল্লাদখানা যাদুঘরে।  মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত  পাম্প হাউজে  এনে ১৯৭১ সালে বিহারীরা বাঙ্গালীদের হত্যা করত। হত্যার পর তাদের লাশ ফেলে দিত পানির ট্যাংকি এবং পার্শবর্তী ডোবায়। ১৯৯০ দশকে  এখানকার বধ্যভূমিটি আবিষ্কার হয় এবং  অসংখ্য শহীদদের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এরপর পাম্প হাউজটিকে  জল্লা খানা যাদুঘর করা হয় এবং এটি বর্তমানে মুুক্তিযুদ্ধ যাদু ঘরের অংশ।  জল্লাদখানায় ১৯৭১ সালে যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের পরিবারে অনেক আত্মীয় স্বজনকে খুঁজে বের করে বিভিন্ন  সময়ে তাদের সাক্ষাতকার  বক্তব্য রেকর্ড করে তা যাদুঘরে সংরক্ষন করে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ।

সেখানে শহীদ  সাংবাদিক    খন্দকার আবু তালেব  সম্পর্কে তার ছেলে খন্দকার  আবুল আহসানের  বক্তব্য রেকর্ড করা আছে যিনি ট্রাইব্যুনালেও সাক্ষ্য দিয়েছেন। জল্লাদখানা যাদুঘরে রক্ষিত  ডকুমেন্ট এ ড দেখা যায় খন্দকার আবুল আহসান তার পিতার হত্যার ঘটনার সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার নামই উল্লেখ করেননি।
এই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়ার আগে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর  কর্তৃপক্ষের কাছে খন্দকার আবুল আহসান  কর্তৃক  আবু তালেব হত্যা  ঘটনার যে বিবরন উল্লেখ করা হয়েছে তা নিম্নরূপ। 

‘আজ দীর্ঘ ছত্রিশ বছর ‘আব্বা’ বলে সম্বোধন করার সমস্ত পথ পাকিস্তানি হায়েনারা বন্ধ করে দিয়ে করেছে এতিম, মাকে করেছেন উন্মাদিনী, পাগল ও বিধবা। একজনের অনুপস্থিতি একটা পরিবারের সহায়-সম্বলহীন করে দেয় তার জ্বলন্ত সাক্ষী এই শহীদ খন্দকার আবু তালেবের পরিবার।

আমার বাবা ছিলেন কর্মমুখী, দায়িত্বশীল, পরোপকারী এবং স্বাধীনচেতা একজন মানুষ জ্ঞানচর্চা, তার পছন্দের বিষয় ছিল। আমাদের ভাই-বোনের সাথে তাঁর আচরণ ছিল বন্ধুসুলব। আমাদেরকে উৎসাহ দিতেন। কিন্তু বাবাকে হারানোর পর আমাদের সে রকম সুযোগ হয়নি ভালভাবে পড়ালেখা। আমাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত কষ্টের। যুদ্ধের সময় দেশে মা ও ভাই-বোনকে টাকা পাঠাতাম ঢাকায় চা বিক্রি করে। আমাদের পরনে কাপড় পর্যন্ত ছিল না। আর্থিক দৈন্যের কারণে গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে লেখা করতে হয়েছে। বড় ভাইও অনেক কষ্ট করেছেন। স্বাধীনতার পর পরই তিনি প্রথমে গণকণ্ঠ এবং  ৭৪ সালে দৈনিক অবজারভারে চাকরি করে সংসারের ভরণ-পোষণ করেছেন। কষ্ট করতে করতে উন্মাদিনী মা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। আর্থিক দৈন্য না কাটলেও আমরা বেঁচে আছি।
কারো কাছে আমাদের কিছু চাওয়ার নেই। সকল শহীদ পরিবারের মতো শহীদদের স্বপ্ন--- দেশই আমাদের একান্ত কাম্য।’

জল্লাদখানা যাদুগরের এ ডকুমেন্ট আসামী পক্ষ ট্রাইব্যুনালে এবং আপিল আদালতেও জমা দিয়েছেন।




বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০১৩

বিচরপতি শামসুদ্দীন চৌধুরীর বিতর্কের কারনে কোর্ট মুলতবি করলেন প্রধান বিচারপতি

মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত সাজা বিষয়ে আসামী পক্ষের  আপিল শুনানী অব্যাহত রয়েছে। আজ বৃহষ্পতিবার কবি  মেহেরুন্নেসা হত্যাকান্ডের অভিযোগ বিষয়ে আসামী পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়েছে এবং তিন নং অভিযোগ খন্দকার আবু তালেব হত্যার অভিযোগ বিষয়ে শুনানী শুরু হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল  হোসেন এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।
আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আজ যুক্তি পেশ করে বলেন, কবি মেহেরুন্নেসা হত্যার অভিযোগ বিষয়ে  রাষ্ট্রপক্ষ তিনজন সাক্ষী হাজির করেছে। তিনজন সাক্ষী তিনরকম সাক্ষ্য দিয়েছেন। ২ নং সাক্ষী শহীদুল হক মামলা বলেছেন, তিনি জনতার কাফেলা থেকে এবং পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে শুনেছেন এ ঘটনা। ১০ নং সাক্ষী আব্দুল কাইউম বলেছেন অবাঙ্গালীরা কবি মেহেরুনকে হত্যা করেছে। অপর দিকে ৪ নং সাক্ষী কাজী রোজী ট্রাইব্যুনালে এসে আব্দুল কাদের মোল্লাকে জড়িয়ে এ ঘটনায় সাক্ষ্য দিলেও তার নিজের লেখা বইয়ের  তথ্যের সাথে ট্রাইব্যনালে প্রদত্ত বক্তব্যের গরমিল রয়েছে। তাহলে কার কোন বক্তব্য আপনারা গ্রহণ করবেন? কাউকে কোন অভিযোগে সাজা দিতে হলে সকলের সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে তাদের এভিডেন্স বিষয়ে একটাই উপসংহারে  পৌছতে হবে। কিন্তু এখানে সবার সাক্ষ্য বিবেচনা করে একটা উপসংহারে পৌছানো সম্ভব নয়। তাই এ অভিযোগে তাকে সাজা দেয়ারও উপায় নেই।

বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী বিতর্কের কারনে  কোর্ট মুলতবি করতে বাধ্য হলেন প্রধান বিচারপতি :

গত মঙ্গলবার ২৮  মে শুনানীর সময় ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন কবি মেহেরুন হত্যা বিষয়ে সাক্ষী কাজী রোজী তার জবানবন্দীর এক স্থানে বলেছেন তিনি শুনেছেন এবং আরেক স্থানে বলেছেন তিনি দেখেছেন। এভাবে তিনি বিপরীতধর্মী সাক্ষ্য দিয়েছেন।
আজো শুনানীর সময়  আবারো এ বিষয়ের অবতারনা হলে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী  ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে বলেন, আপনি বলেছেন সাক্ষী  একস্থানে বলেছেন তিনি দেখেছেন আরেক স্থানে বলেছেন তিনি শুনেছেন। সাক্ষী ঘটনা দেখার কথা কোথায় বলেছেন তা দেখান।
ডিড শি সে শি স’ ইট?  শো ইট ।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক তখন সাক্ষীর জবানবন্দী পড়ে শোনাতে শুরু করেন। সাক্ষী কাজী রোজী বলেছেন “২৭ মার্চ  বিকালে খবর পেলাম যে, মেহেরুন্নেসা ও তার দুই  ভাই ও মাকে কাদের মোল্লা ও তার সহযোগী যারা ছিলেন তাদের অনেকে মাথায় সাদা অথবা লাল পট্টি বেঁধে সকাল ১১টা মেহেরের বাসায় ঢুকে যায় বলে শুনেছি।”
আরেক জায়গায় তিনি বলেছেন “কাদের মোল্লার নেতৃত্বে সেদিন ওরা মেহেরুনের বাসায় ঢুকেছিল। কিন্তু কাদের মোল্লা নিজে ওই বাসায় ঢুকেছিল কি-না তা বলতে পারবনা। ”
সাক্ষীর জবানবন্দী থেকে রেফারেন্স পেশ শেষ করে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এখানে তিনি ঘটনা এমনভাবে বর্ননা করছেন মনে হয় যেন তিনি নিজে ঘটনা দেখেছেন।
এসময় বিচারপতি এ এইচ এম  শামসুদ্দীন চৌধুরী বলেন, এখানে তিনি দেখেছেন তা কোথায় আছে? তিনি দেখেছেন একথা কি বলেছেন সাক্ষী?
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, হ্যা বলেছেন। এটা আমার সাবমিশন। আপনি এর সাথে একমত হতেও পারেন আবার নাও হতে পারেন সেটা আপনার এখতিয়ার। কিন্তু আমাকে আমার সাবমিশন রাখতে দেন। আমি একজন কাউন্সেল।
এসময় কিছুটা উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বিচারপতি এ এইচ এম  শামসুদ্দীন চৌধুরীকে থামার ইশারা দিয়ে ব্যারিস্টার  আব্দুর রাজ্জাককে চালিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়ে বলেন, প্লিজ প্রসিড। প্লিজ  প্রসিড মিস্টার রাজ্জাক।
বিচারপতি  এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী  ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে লক্ষ্য করে বলেন, প্লিজ ডোন্ট মিস লিড দি কোর্ট।  কোর্টকে মিস লিড করবেননা।  দিস ইজ দি হাইয়েস্ট কোর্ট অব দি নেশন। কোর্টকে মিস লিড করবেননা।
তিনি আবারো জানতে চান সাক্ষী দেখার কথা বলেছেন তা কোথায় আছে দেখান। এসময় আবারো প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরীর দিকে  তাকিয়ে   তাকে থামার অনুরোধ করে বলেন, মিস্টার জাস্টিস চৌধুরী প্লিজ, প্লিজ । এটা ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাহেবের সাবমিশন। এরপর তিনি  ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে  সামনে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়ে আবারো বলেন, মিস্টার রাজ্জাক প্লিজ প্রসিড।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বিচারপতি শামুসুদ্দীন চৌধুরীর  প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে বলেন, সিঙ্গেল জাস্টিসকে এড্রেস করে সাবমিশন রাখবেননা। কোর্টকে এড্রেস করে সাবমিশন রাখুন প্লিজ। প্লিজ প্রসিড, প্রসিড মিস্টার রাজ্জাক।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমরা তো শিখেছি কোর্টের কোন একজন জাজ কোন প্রশ্ন করলে সেটা কোর্টেরই কোশ্চেন ধরে নেয়া হয়। সেজন্য আমি তার জবাব দেয়ার চেষ্টা করছি।
এসময় বিচারপতি এ এইচ এম  শামসুদ্দীন চৌধুরী আবারো ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের উত্তেরের বিরোধীতা করে মন্তব্য  মন্তব্য করা অব্যাহত রাখলে  এবং তার প্রশ্নের জবাব চাওয়ায় প্রধান বিচারপতি তাকে উদ্দেশ করে বলেন, মিস্টার জাস্টিস চৌধুরী প্লিজ প্লিজ ।  কিন্তু তখনো  তিনি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের  সাবমিশনের বিরোধীতা করে তার মত প্রকাশ করায় প্রধান বিচারপতি  কোর্ট মুলতবি ঘোষনা করেন।
তখন ঘড়ির কাটায় ১০টা ৫৫ বাঁজে। সাধারনত সকাল ১১টায় কোর্ট মুলতবি হয় এবং ১২টায় আবার বসে। আজ  বিতর্কের এ পর্যায়ে ১০টা ৫৫ মিনিটের সময় কোর্ট মুলতবি ঘোষনা করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ১২টা আবার বসবে কোর্ট। যথারীতি ১২টায় আবার কোর্ট বসে।

বিতর্কের এক পর্যায়ে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও একবার দাড়িয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন হাত নেড়ে।

বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান এর অবসর গ্রহণ : আপিল বিভাগের বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান এর চাকরির  বয়স পূর্ণ হওয়ায় তিনি অবসরে গেছেন। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ আজ  তাকে বিদায় জানান। এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি এজে মো : আলী তাকে বিদায় সম্ভাষন জানান।  বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান ছিলেন আব্দুল কাদের মোল্লার আপিল শুনানীর জন্য গঠিত বেঞ্চের সদস্য। তার অবসরর গ্রহনের ফলে এ বেঞ্চের সদস্য সংখ্যা দাড়াল এখন পাঁচ।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে যুক্তি উপস্থাপনে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট শিশির মো : মনির। অন্যাান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম, ফরিদ উদ্দিন খান, সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ।




মঙ্গলবার, ২৮ মে, ২০১৩

কাজী রোজী তার নিজের বইয়েই আব্দুল কাদের মোল্লার নাম উল্লেখ করেননি/// পল্লব হত্যা বিষয়ে জল্লাদখানা যাদুঘরের রেকর্ড পড়ে শোনানো হল আপিল শুনানীতে


মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক প্রদত্ত সাজা খারিজ চেয়ে আসামী পক্ষের দায়ের করা আবেদনের ওপর আপিল শুনানী চলছে। আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আজ কবি মেহেরুন্নেসা  এবং পল্লব হত্যা বিষয়ে যুক্তি পেশ করেন।  আব্দুল কাদের মোল্লাকে যে তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে তার মধ্যে এ  দুটি হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসন এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।

কবি মেহেরুন্নেসা বিষয়ে যুক্তি পেশ : কবি মেহেরুন্নেসা হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে তিনজন সাক্ষী হাজির করে। তিনজনই এ ঘটনা বিষয়ে শোনা সাক্ষী।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  আজ কাজী রোজী নামে একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য  বিষয়ে বিভিন্ন স্ববিরোধীতা তুলে ধরে যুক্তি পেশ করেন।

তিনি বলেন সাক্ষী কাজী রোজী ‘শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা’ নামে একটি বই লিখেছেন। সে বইয়ে তিনি কবি মেহেরুন্নেসা হত্যা বিষয়ে আব্দুল কাদের মোল্লার নাম উল্লেখ করেননি। অথচ তিনি ট্রাইব্যুনালে এসে এ ঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লাকে দায়ী করে  সাক্ষ্য দিয়েছেন। জেরায় কাজী রোজীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনিতো আপনার নিজের লেখা বইয়ে আব্দুল কাদের মোল্লার নাম লেখেননি  এ ঘটনা বিষয়ে। তখন তিনি জবাব দিয়েছিলেন ভয়ে তিনি আব্দুল কাদের মোল্লার নাম উল্লেখ করেননি।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আব্দুল কাদের মোল্লাকে গ্রেফতার করা হয়েছে ২০১০ সালের জুলাই মাসে আর কাজী রোজী  তার বইটি লিখেছেন ২০১১ সালে।  তাহলে এখানে জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় আসামীর নাম উল্লেখ করতে ভয়ের কি  যুক্তি থাকতে পারে।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বরং যেটা সত্য তা হল কাজী রোজী তার বইয়ের ২৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন অবাঙ্গালীরা কবি মেহেরুন্নেসাকে হত্যা করেছে। রাষ্ট্রপক্ষের দশম সাক্ষী আব্দুল কাইউমও বলেছেন  কাজী রোজীকে নিজ  বাড়িতে সপরিবারে হত্যা  করে অবাঙ্গালীরা।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কাজী রোজী কবি মেহেরুন্নেসা হত্যা বিষয়ে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার মধ্যে অনেক স্ববিরোধীতা রয়েছে এবং তিনি তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন।
তিনি তার সাক্ষ্যে একস্থানে বলেছেন তিনি ঘটনার কথা শুনেছেন, আরেক স্থানে বলেছেন তিনি দেখেছেন।
তিনি বলেছেন, গুলজার নামে একজন অবাঙ্গালীর কাছে কবি মেহের হত্যার কথা শুনেছেন। আবার আরেক জায়গায় বলেছেন তিনি কাদের কাছ থেকে শুনেছেন তাদের নাম বলতে পারবেননা।
এসময় বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী  বলেন,  সাক্ষী নাম বলতে পারবোনা বলে যে কথা বলেছেন সেটা অন্য বিষয় সম্পর্কে বলেছেন তিনি। ২৭ মার্চের পরের ঘটনা সম্পর্কে কার কাছ থেকে শুনেছেন তাদের নাম বলতে পারবেননা বলে বলেছেন। তিনি মেহেরুন্নেসা হত্যা বিষয়ে ২৭ মার্চের আগেই শুনেছেন।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আপনি ভিন্নমত পোষন করতেই পারেন। কিন্তু কাজী রোজী তার সাক্ষ্যে  বলেছেন, কাদের মোল্লার নেতৃত্বে তারা কবি মেহেরুন্নেসার বাসায় ঢুকেছিল। কিন্তু কাদের মোল্লা নিজে ঘরে ঢুকেছিল কি-না তা বলতে পারবনা।
তিনি এমনভাবে এ ঘটনা বলছেন যেন মনে হয় তিনি সেখানে ছিলেন ঘটনার সময়।
তিনি তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেছেন তাদের মাথায় সাদা পট্টি বাঁধা ছিল। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় বলেছেন সাক্ষী তাকে একথা বলেননি। আবার তিনি বলেছেন, কোরআন শরীফ বুকে চেপে বাঁচতে চেয়েছিল মেহের। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন একথাও তাকে বলেনি সাক্ষী।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাক্ষী কাজী রোজী ২৪ মার্চ  ভারতে যান। স্বাধীনতার পর ফিরে আসেন। তিনি কার কাছ থেকে কিভাবে ঘটনা শুনলেন? একবার বলেছেন গুলজার নামে একজন  অবাঙ্গালীল কাছ থেকে শুনেছেন। তার কথায় অনেক বৈপরীত্য রয়েছে। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আব্দুল কাদের মোল্লাকে জড়িয়ে তিনি যে অভিযোগহ করেছেন তা সত্য হলে তিনি তার নিজের বইতে  আব্দুল কাদের মোল্লার নাম উল্লেখ করতেন।



পল্লব হত্যা বিষয়ে জল্লাদখানা যাদুঘরের ডকুমেন্ট পড়ে শোনানো হল :
মিরপুর বাংলা কলেজের ছাত্র পল্লব হত্যা বিষয়ে গতকাল সোমবার  যুক্তি উপস্থাপনের  সময় ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আসামী পক্ষের চতুর্থ সাক্ষী সাহেরা বেগমের সাক্ষ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেন। সাহেরা বেগম  হলেন পল্লবের ভাবী।   সে ছিল রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। পরে সে পক্ষ ত্যাগ করে আসামী পক্ষে সাক্ষ্য দেন। এ কারনে তার সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এ বিষয়ে আজ যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন,  ঠিক আছে, পল্লবের ভাবী পক্ষ ত্যাগ করে আসামী পক্ষে এসেছেন  কিন্তু ২০০৮ সালে তিনি তার দেবর সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা নিয়েতো আর প্রশ্ন নেই। মিরপুর জল্লাদখানা যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে সাহেরা বেগম পল্লব হত্যা বিষয়ে যে  বিবরন দেন তা তিনি  আজ আদালতের সামনে পড়ে শোনান। সেখানে তিনি পল্লব হত্যা বিষয়ে আব্দুল কাদের মোল্লার নাম বলেননি বলে  উল্লেখ করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

পল্লব হত্যাকান্ড,   শহীদ খন্দকার আবু তালেব, এবং হযরত আলী হত্যাকান্ডসহ আরো অনেক হত্যাকান্ড বিষয়ে  শহীদ পরিবারের আত্মীয় স্বজনদের  সাক্ষাতকার,  লিখিত বক্তব্যের মূল কপি, অডিও ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। এছাড়া লিখিত  বক্তব্যের ডুপ্লিকেট কপি সংরক্ষিত আছে জল্লাদখানা যাদুঘরে।  মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত  পাম্প হাউজে  এনে ১৯৭১ সালে বিহারীরা বাঙ্গালীদের হত্যা করত। হত্যার পর তাদের লাশ ফেলে দিত পানির ট্যাংকি এবং পার্শবর্তী ডোবায়। ১৯৯০ দশকে  এখানকার বধ্যভূমিটি আবিষ্কার হয় এবং  অসংখ্য শহীদদের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এরপর পাম্প হাউজটিকে  জল্লাদ খানা যাদুঘর করা হয় এবং এটি বর্তমানে মুুক্তিযুদ্ধ যাদু ঘরের অংশ।  জল্লাদখানায় ১৯৭১ সালে যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের পরিবারে অনেক আত্মীয় স্বজনকে খুঁজে বের করে বিভিন্ন  সময়ে তাদের সাক্ষাতকার  বক্তব্য রেকর্ড করে তা যাদুঘরে সংরক্ষন করে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ।

পল্লব হত্যাকান্ড বিষয়ে   যাদুঘর কর্তৃপক্ষ পল্লবের  ভাবী সায়রা বেগমের সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন ০৬/০৬/২০০৮ তারিখ।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়ার আগে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর  কর্তৃপক্ষের কাছে  পল্লব হত্যা বিষয়ে   তার ভাবী সাহেরা বেগম যা বলেছিলেন তা নিম্নরূপ :
 ‘ ভোটাভুটি হয়ে যাওয়ার পর ধরাধরি শুরু হয়। আমি ভোট দিয়েছিলাম। তখন আমার এক ছেলে ফারুকের বয়স পাঁচ মাস। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কথা মনে আছে। তার পর থেকে আমরা ঘরে থাকতে পারিনি। আশ্রয়ের জন্য আমরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে আবার ঢাকায় আসি। সাভার থাকার সময় আমার দেবর টুনটুনি মিয়া (পল্লাব) বাসা ছেড়ে চলে যায়। কারণ ও ছিল মুক্তিযোদ্ধা। পরে আবার একদিন সাভারে আমাদের কাছে এসেছিল। কিন্তু শুধু বলছিল যে, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা, আমি বসে থাকতে পারি না।’ বিহারিরা তাকে খুঁজছিল তা সে জানতে পারে। ফলে সে ভারতে যাওয়ার জন্য পথে বের হয়। নবাবপুর রোডে বিহারিরা তাকে ধরে ফেলে। কেউ তার হাত কাটে, কেউ তার পা কাটে, এভাবে তাঁকে হত্যা করে বিহারিরা।
বিয়ের জন্য আমরা রসিকতা করলে সে বলতো, ‘আমি রাজনীতি করি, আমার বিয়ে হবে ভাল পরিবেশ।’ শেষ রাতের তারা’ নামে একটা সিনেমায় সে অভিনয় করেছিল। নাটকে অভিনয় করতো। আমাদের বলতো সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবে। টুনটুনি মিয়া তার কলেজে প্যারেড করাতো। সেই গল্প আমাদের শুনাতো বাসায় এসে। পেটে বাচ্চা বেঁধে দৌড়াতে হতো সেই প্যারেডে। আর সে থাকতো খুব ফিটফাট। কবি নজরুলের ভক্ত ছিল টুনটুনি মিয়া। কবির মতো তাঁর গায়ে পেঁচানো থাকতো একখানা চাদর। সে কত ভাল ছিল তা আর কি বলবো! আমার বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ঘুরতো সব সময়। বাইরে বাইরে থাকতো প্রায়ই। তবু তাঁর জন্য এতদিন পরেও আমার চোখে জল আসে। ’

সাহেরা বেগম ছাড়াও আব্বাস নামে আরো এক ব্যক্তির  জবানবন্দী যা জল্লাদখানা যাদুঘরের কাছে রক্ষিত আছে তা পড়ে শোনান ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। সেখানেও পল্লব হত্যা বিষয়ে আব্দুল কাদের মোল্লার নাম বলা হয়নি বলে আদালতকে জানান তিনি।
সাহেরা বেগম পল্লব হত্যা বিষয়ে আসামী পক্ষের হয়ে ট্রাইব্যুনালে যে জবানবন্দী দেন তাও আদালতে আজ পড়ে শোনান ব্যারিস্টার আব্দুর রাজাক।
যুক্তি উপস্থাপনে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট শিশির মো : মনির। এসসময় আসামী পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, অ্যাডভোকেট সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ ।


সোমবার, ২৭ মে, ২০১৩

আপিল আবেদন শুনানীতে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক// কল্পনার ওপর ভিত্তি করে কাদের মোল্লাকে সাজা দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল

মেহেদী হাসান, ২৭/৫/২০১৩
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক প্রদত্ত যাবজ্জীবন সাজার  বিরুদ্ধে দায়ের করা  আপিল আবেদনের ওপর শুনানী চলছে।  তাকে সাজা থেকে খালাস চেয়ে করা আবেদনের ওপর শুনানীতে অংশ নিয়ে আজ   আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ট্রাইব্যুনাল অনুমান এবং কল্পনার ওপর ভিত্তি করে আব্দুল কাদের মোল্লাকে সাজা দিয়েছে। ফ্যাক্টস বা ঘটনার ওপর ভিত্তি করে সাজা দেয়নি।  আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে কোন অপরাধ প্রমানিত হয়নি এবং তাকে সাজা  দেয়ার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল বিরাট বড় ভুল করেছে  বলে তিনি  আপিল শুনানীতে বলেন।
আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে  এক নং অভিযোগ তথা পল্লব হত্যার অভিযোগে প্রদত্ত সাজার  বিরুদ্ধে তিনি যুক্তি পেশ করছিলেন। প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।
মিরপুর বাংলা কলেজের ছাত্র পল্লব হত্যার অভিযোগে  ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত সাজার বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপনের সময় ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক রায় থেকে দীর্ঘ সময় নিয়ে পড়ে শোনান এবং রায়ের নানা অসঙ্গতি  তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, পল্লব হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের দুজন সাক্ষী ছিল এবং দুজনই শোনা সাক্ষী। এদের একজন হলেন আব্দুল কাইউম । তিনি    ট্রইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, আব্দুল কাদের মোল্লা  পল্লব নামে মিরপুর  বাংলা কলেজের একজন ছাত্রকে হত্যা করেছে বলে তিনি শুনেছেন। আবার এ শোনা কথা  তিনি  তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দীতে বলেননি; বলেছেন  ট্রাইব্যুনালে এসে। তাকে জেরার সময় প্রশ্ন করা হয়েছিল তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তিনি  একথা বলেছিলেন  কি-না।  তিনি বলেছেন  ‘হ্যা বলেছি’।  তদন্ত কর্মকর্তকে জেরার সময়  প্রশ্ন করা হয়েছিল আব্দুল কাইউম আপনাকে এ বিষয়ে বলেছিলেন  কি-না। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন ‘না তাকে আব্দুল কাইউম একথা বলেননি’। 
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এরূপ সাক্ষীর  শোনা কথা কি করে এভিডেন্সে হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? এভাবে সাক্ষীর বিভিন্ন দুর্বল দিক তুলে ধরে তিনি বলেন,  আব্দুল কাইউমের সাক্ষ্য পুরোপুরি বাদ  হলে পল্লব হত্যা বিষয়ে একজন মাত্র সাক্ষী থাকেন এবং তিনি হলেন শহীদুল হক মামা। সাক্ষী  শহীদুল হক মামা বলেছেন- তিনি জনতার কাফেলা থেকে এবং পরিচিতদের কাছ থেকে শুনেছেন এ ঘটনার সাথে আব্দুল কাদের মোল্লা জড়িত ছিল। 
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ট্রাইব্যুনালের রায়ের সমালোচনা করে বলেন, ট্রাইব্যুনালের রায়েই বলা হয়েছে অন্যান্য ডকুমেন্ট দরকার  এ ঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লাকে  সাজা দেয়ার জন্য। কিন্তু আব্দুল কাইউমের সাক্ষ্য  বাদ দিলে তো আর কোন ডকুমেন্ট নাই। শুধুমাত্র শহীদুল হক মামার শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে তাকে সাজা দেয়া যেতে পারে? অন্যান্য ডকুমেন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আব্দুল কাদের মোল্লা ষাটের দশকে কি করতেন, সত্তরের দশকে কি করতেন, জামায়াতে ইসলামের সাথে তার সম্পর্ক কি ছিল এসব। ব্যারিস্টার রাজ্জাক প্রশ্ন করেন এসব কি কোন ডকুমেন্ট হতে পারে সাজা দেয়ার  জন্য। তিনি বলেন, আব্দুল কাদের মোল্লাকে সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল বিরাট ভুল করেছে। তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ প্রমানিত হয়নি। সম্পূর্ণ কল্পনা এবং অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তাকে সাজা দেয়া হয়েছে।

ব্যারিস্টার  আব্দুর রাজ্জাক বলেন, পল্লবের আপন ভাবী সাহেরা খাতুন আব্দুল কাদের মোল্লার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালে। তিনি সাক্ষ্য দেয়ার সময় বলেছিলেন পল্লব হত্যা বিষয়ে আব্দুল কাদের মোল্লার নাম জীবনেও শোনেননি। জীবনেও আব্দুল কাদের মোল্লার নাম শোনেননি বলায় তার সাক্ষ্য আমলে নেয়নি ট্রাইব্যুনাল।




বুধবার, ২২ মে, ২০১৩

শুনানীতে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক// বিচার শুরুর পরও তদন্ত কার্যক্রম চালানো হয়েছে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে


মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল  কাদের মোল্লার আপিল আবেদন শুনানীতে আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিল করার  পরও  এক বছর পর্যন্ত তদন্ত কাজ চালানো হয়েছে। এমনকি চার্জ গঠনের পরও  তদন্ত বন্ধ করা হয়নি যা বিস্ময়কর ঘটনা।

প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের আপিল বেঞ্চ-এ শুনানীর সময় আজ  তিনি এ কথা বলেন।  ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক আব্দুল কাদের মোল্লাকে প্রদত্ত  সাজা খালাস চেয়ে আসামী পক্ষে দায়ের করা আবেদনের ওপর শুনানী চলছে বর্তমানে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে তদন্ত সংস্থা তদন্ত  শুরু  করে  ২০১০ সালের ৭ জুলাই।  তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটরের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ২০১০ সালের ৩০ অক্টোবর। প্রসিকিউশন তা ফরমাল চার্জ আকারে ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর।  ট্রাইব্যুনাল ফরমাল চার্জ আমলে নয় ২০১১ সালের ২৮ ডিসম্বের। চার্জ গঠন করা হয় ২০১২ সালের ২৮ মে।

কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন  ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া, চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর পরও তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। ২০১২ সালের ২৮ মে চার্জ গঠন করা হল আর তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়েছে ২০১২ সালের ২৭ আগস্ট। ২০১২ সালের ২৭ আগস্ট পর্যন্ত তদন্ত কাজ চালানোর কথা তদন্ত কর্মকর্তা জেরায়   স্বীকার করেছেন।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া এবং  চার্জ গঠন করে বিচার শুরু হয়ে যাবার পরও কি করে তদন্ত চলতে পারে? তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার পরও এক বছর তদন্ত কাজ চালানো হয়েছে। এর মাধ্যমে  ট্রাইব্যুনালের রুল ভঙ্গ করা হয়েছে। এর পরে আর এ বিচার চলতে পারেনা। এ বিচারের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল বিচার ব্যবস্থার দর্শনই সম্পূর্ণরুপে বদলে দিয়েছে।
এসময়  একজন বিচারপতি বলেন,  ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব ক্ষমতা দেয়া আছে।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন,  ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব ক্ষমতা আছে সত্য,  কিন্তু এ ধরনের আইনবিরোধী, বিধি বিধান বিরোধী কাজের জন্য ট্রাইব্যুনাল কোন আদেশ দেয়নি এবং রাষ্ট্রপক্ষ থেকেও কোন দরখাস্ত করা হয়নি।
এসময় আরেকজন বিচারপতি এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে বলেন, আসামী পক্ষের এ অভিযোগ বিষয়ে ভাল করে খোঁজ খবর নিয়ে জবাব  দিতে হবে এবং কোর্টকে  সন্তুষ্ট করতে হবে।

গতকাল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে পল্লব হত্যা বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত রায়ের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, পল্লাব হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের দুজন সাক্ষী ছিল এবং দুজনই শোনা সাক্ষী। সাক্ষী  শহীদুল হক মামা বলেছেন তিনি জনতার কাফেলা থেকে এবং পরিচিতদের কাছ থেকে শুনেছেন এ ঘটনার সাথে আব্দুল কাদের মোল্লা জড়িত ছিল।  এটা কেমনতর শোনা কথা হল? কি করে এ জাতীয় শোনা কথাকে এভিডেন্স আকারে গ্রহণ করা যায়? শোনা কথাকে এভিডেন্সে হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের আইনে দেয়া হয়েছে কিন্তু শোনা কথা এমন হতে হবে যার বিচাররিক মূল্য রয়েছে। যদি সাক্ষী বলত যে, আমাকে আমার ভাগনে বলেছে সে দেখেছে আব্দুল কাদের মোল্লা  অমুককে মেরেছে তা হলে তার মূল্য থাকে। কিন্তু এখানে তো এরকম কেউ বলেনি। একটা শোনা কথা আরেকটা শোনা কথাকে সহায়তা করতে পারেনা।  
পল্লব হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের  আরেক সাক্ষী আব্দুল কাইউমও একজন শোনা সাক্ষী। সে মিরপুর বাংলা কলেজের একজন ছাত্রের কাছ থেকে শুনেছে আক্তার গুন্ডা  আব্দুল কাদের মোল্লাসহ পল্লবকে হত্যা করেছে। আবার একথা সে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বলেনি, বলেছে ট্রাইব্যুনালে এসে। তাকে জেরার সময় প্রশ্ন করা হয়েছিল তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সে একথা বলেছিল কি-না।  সে বলেছে হ্যা।  আবার তদন্ত কর্মকর্তকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আব্দুল কাইউম আপনাকে এ বিষয়ে বলেছিল কি-না। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছে বলেনি। এরূপ সাক্ষীর শোনা কথা কি করে এভিডেন্সে হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাক্ষী শহিদুল হক মামা বিটিভির কাছে এক সাক্ষাৎকারে ১৯৭১  সালের  ২৫ মার্চের পর ঘটনার বিস্তারিত বর্ননা দিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছে। জেরায় সে বলেছে বিটিভিতে সে যা বলেছে তা সত্য। কিন্তু তার ওই সাক্ষাৎকারে আব্দুল কাদের মোল্লার নাম  উচ্চারন করেনি এবং আব্দুল কাদের মোল্লাকে জড়িয়ে যে ঘটনার অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে করা হয়েছে সে বিষয়েও কিছু বলেননি।

এদিকে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন শুনানী  অনুষ্ঠিত হয়নি।
শুনানীতে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট আব্দুস সোবহান তরফদার, অ্যাডভোকেট শিশির মো : মনির প্রমুখ।



মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০১৩

শুনানীতে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক// ১৯৭৩ সালের আইনে কাদের মোল্লাকে সাজা দেয়ার এখতিয়ার নেই

মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আপিল আবেদন শুনানীতে আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দর রাজ্জাক বলেছেন, ১৯৭৩ সালের আইনে ব্যক্তি হিসেবে আব্দুল কাদের মোল্লাকে সাজা দেয়ার এখতিয়ার নেই। আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আলবদর বা রাজাকার বাহিনীর সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রমানিত হয়নি এবং তাকে সে হিসেবে সাজাও দেয়া হয়নি। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক তাকে সাজা দেয়া হয়েছে একজন ব্যক্তি হিসেবে। কিন্তু কোন বাহিনীর সাথে জড়িত না থাকলে বিচ্ছিন্ন একজন ব্যক্তি হিসেবে তার বিচার করা এবং  সাজা দেয়ার এখতিয়ার ১৯৭৩ সালের আইনে নেই।

আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড দাবি করে রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক দাখিল করা আপিল আবেদনের শুনানীতে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আজ  একথা বলেন। প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের আপিল বেঞ্চে এ শুনানী চলছে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৫  জন  পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাকে বিচারের জন্য বাছাই করেছিল স্বাধীনতার পর। কিন্তু ১৯৭৪ সালে তৃতীয় দেশীয় চুক্তির মাধ্যমে তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দেয়া হয় এবং  তাদের  বিচার করা হয়নি।  ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের  বিচারের জন্য যে আইন ১৯৭৩ সালে করা হয়েছিল সেই  আইনের অধীনে আজ দেশীয় সহযোগীদের বিচার করা হচ্ছে।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মূল অপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে, বিচার থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাদের সহযোগীদের বিচার করা যায়না। বাংলাদেশ হাইকোর্ট কর্তৃকও এ বিষয়ে একটি রায় রয়েছে (৫৪ ডিএলআর-২৯৮)।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাজনৈতিক কারনে এ বিচার করা হচ্ছে।  ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামী এবং আওয়ামী লীগ একসাথে আন্দোলন করার সময় দুই দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনেক বৈঠক হয়েছে। সেসব বৈঠকে তখন আব্দুল কাদের মোল্লা অংশ নিয়েছেন। তিনি তখন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করেছেন। আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমদ এবং আব্দুল  কাদের মোল্লাকে ১৯৯৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি একসাথে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। ইতিহাসে এটা নজিরবিহীন ঘটনা যে, একসাথে দুটি দলে আন্দোলন করার পর একটি দল কর্তৃক আরেক দলের নেতাদের ৪০ বছর পর বিচারের মুখোমুখি করা হয়। শুধুমাত্র রাজনৈতিক  প্রতিপক্ষতার কারনেই  আজ এ বিচার করা হচ্ছে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক শুনানীতে বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছর পর কেন এ বিচার করা হচ্ছে, বিচার করতে কেন ৪০ বছর সময় নেয়া হল সে বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ একটি শব্দও উল্লেখ করেনি, কোন ব্যাখ্যা দেয়নি।
এসময় একজন বিচারপতি প্রশ্ন করেন হিটলারের নাজি সদস্যদেরতো এখনো খুঁজে পাওয়া গেলে বিচার করা হচ্ছে।
জবাবে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরাজিত  দলের অনেকে পালিয়ে ছিল। যাদের পাওয়া গেছে তাদের বিচার হয়েছে। সেব্রেনিসা গণহত্যার জন্য দায়ী রাদোভান কারাদজিকও নয় বছর পালিয়ে থাকার পর ধরা পড়েছে এবং তার বিচার হয়েছে। কিন্তু  দীর্ঘ ৪০ বছরে আব্দুল কাদের মোল্লা কখনো পালিয়ে ছিলেননা। তিনি স্বাভাবিক জীবন যাপন করেছেন, চাকরি করেছেন, রাজনীতি করেছেন, দলে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বও পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে  যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে কোন অভিযোগ আগে আনা হয়নি।

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল -২ কর্তৃক আদালত অবমাননার অভিযোগে জারি করা রুলের লিখিত জবাব প্রদানের জন্য ২৯ মে শেষ সুযোগ দেয়া হয়েছে  বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হামিদুর রহমান আয়াদ এমপি। আসামী পক্ষে গতকাল সময় প্রার্থনা করায় ট্রাইব্যুনাল-২ এ সময় প্রদান করেন।

এছাড়া  ট্রাইব্যুনাল-১ এ আজ  মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে অষ্টম সাক্ষীর জেরা শেষ হয়েছে।


সোমবার, ২০ মে, ২০১৩

কাদের মোল্লার মামলায় আপিল শুনানীতে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক/// ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীদের বিচারের জন্যই ১৯৭৩ সালের আইন করা হয়েছিল

Mehedy Hasan
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা আপিল আবেদনের শুনানীতে আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন,  ১৯৭৩ সালের যে আইনের মাধ্যমে আজ জামায়াতসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের বিচার করা হচ্ছে  সে আইনটি করা হয়েছিল শুধুমাত্র ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের জন্য।।  বাংলাদেশীদের ঐ আইনের অধীনে বিচারের কোন উদ্দেশ্যই ছিলনা।
১৯৭৩ সালের আইনটি যে  শুধুমাত্র ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তার বিচারের জন্যই পাশ করা হয়েছিল সে বিষয়টি তুলে ধরার জন্য ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আইন পাশের আগে বিলের ওপর তৎকালীন সংসদে যে আলোচনা হয়েছিল তা তুলে ধরেন আপিল বিভাগে। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর বিলের ওপর এবং আইনটি পাশ বিষয়ে যে  বক্তব্য দিয়েছিলেন তা আদালতে পাঠ করে শোনান তিনি।  আইনমন্ত্রী  মনোরঞ্জন ধরের বক্তব্য উদ্ধৃতি করে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  বলেন, পাকিস্তানী  শসন্ত্র বাহিনীর সদস্যরা বাঙ্গালী জাতির বিরুদ্ধে বর্বর মানবতাবিরোধী অপরাধমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করেছে। তাদের বিচারের জন্য এই আইন প্রণয়ন করা হল।
এছাড়া আব্দুল্লাহ সরকার, এম সিরাজুল হক, আব্দুস সাত্তারসহ অন্য যারা ১৯৭৩ সালে সংসদে বিলের ওপর আলোচনা করেছিলেন তাদের বক্তব্যও পড়ে শোনানো হয়। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ১৯৭৩ সালের আইনের খসড়ায় ‘ইনকুডিং এনি পারসন’ বলে শব্দ  যুক্ত ছিল। এ  নিয়ে তখন সংসদ সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। আব্দুল্লাহ সরকার সংসদে বলেছিলেন, এনি পারসন বলতে যেকোন ব্যক্তিকেই  এই আইনের আওতায় ফেলে দেয়া যাবে। এখানেই আমার আপত্তি।
আব্দুস সাত্তারসহ অন্যান্য অনেকে তখন প্রস্তাব করেন, যুদ্ধবন্দীসহ যেকোন ব্যক্তির পরিবর্তে শুধু যুদ্ধবন্দী শব্দ রাখা হোক।
আইনমন্ত্রী শ্রী মনোরঞ্জন ধর তখন সংসদে বলেন আমি এটা গ্রহণ করলাম। এরপর তিনি সংশোধনী  আনেন এবং ইনকডিং শব্দ বাদ দিয়ে বিলটি আইন আকারে পাশ করা হয়। মনোরঞ্জন ধর তখন বলেছিলেন আমাদের মহান নেতার (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) সম্মতিতে এ সংশোধনী আনা হয়েছে এবং এ প্রস্তাব গ্রহণ করা হোক।
এসব রেফারেন্স পেশ করে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ১৯৭৩ সালের আইন পাশের পূর্বে সংসদের তখনকার আলোচনা থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে,  ১৯৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দী ছাড়া অন্য কারো বিচার করা এ আইনের কোন উদ্দেশ্য ছিলনা। কোন বাংলাদেশীযে যাতে এ আইনের অধীনে বিচার করা না হয় সেজন্য তারা  উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং সংসদে আলোচনা শেষে বিল থেকে  ‘যেকোন ব্যক্তি’ কথাটি বাদ  দিয়ে শুধু যুদ্ধবন্দী কথাটা রাখা হয়।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কিন্তু আজ সেই পাকিস্তানীদের সেনা কর্মকর্তাদের জন্য প্রণীত আইনটিকেই ২০০৯ সালে সংশোধন করে দেশীয় লোকদের বিচার করা  হচ্ছে। সংসদে আলোচনার মাধ্যমে  ‘যেকোন ব্যক্তি’ কথাটি বাদ দেয়া হলেও ২০০৯ সালের আবার ‘ইন্ডিভিজুয়াল’ (একক ব্যক্তি) এবং গ্রুপ অব ইন্ডিভিজুয়ালস’ (ব্যক্তিগোষ্ঠী) শব্দ যোগ করা হল।

প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের আপীল বেঞ্চ আজ  শুনানী গ্রহণ করেন।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  এ পর্যায়ে শুনানী পেশ করার সময় প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এটর্নি জেনারেল মাহবুলে আলমকে উদ্দেশ করে বলেন আপনি ভাল করে প্রস্তুতি নিয়ে আসবেন এর জবাব প্রদানের জন্য এবং কোর্টকে সহায়তা করবেন।

শুনানীতে  ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আইনটি পাশ করা হয়। আইনটি পাশের আগে ১৫ জুলাই বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করা হয় আর এটিই ছিল সংবিধানের প্রথম সংশোধনী।  ১৯৭৩ সালের আইন পাশের জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হয়েছিল  কারণ ১৯৭৩ সালের আইনে ১৯৯৫ জন যুদ্ধবন্দীদের জন্য বাংলাদেশের সংবিধানে মৌলিক মানবাধিকারের বেশ কয়েকটি  ধারা রহিত করা হয়েছিল।
সেজন্য ৭৩ সালের আইনটিকে সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানে সংশোধনী আনতে হয়েছিল। ৪৭ (ক) ও ৪৭ (৩ ) নামে দুটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়।