সাঈদী : হুমায়ুন আহমেদ’র পিতা হত্যার অভিযোগ এবং আয়েশা ফয়েজের বইয়ে যা রয়েছে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাঈদী : হুমায়ুন আহমেদ’র পিতা হত্যার অভিযোগ এবং আয়েশা ফয়েজের বইয়ে যা রয়েছে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৩

হুমায়ুন আহমেদ’র পিতা হত্যার অভিযোগ এবং আয়েশা ফয়েজের বইয়ে যা রয়েছে



 Mehedy Hasan
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বর্তমানে যেসব অভিযোগে বিচার করা হয়েছে  তার মধ্যে  একটি অভিযোগ হল নন্দিত কথা সাহিত্যিক মরহুম  হুমায়ূন আহমেদের পিতা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদসহ  পিরোজপুরে তিনজন সরকারী কর্মকর্তাকে হত্যায়  সহায়তা করা। শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ  ১৯৭১ সালে পিরোজপুর মহকুমার পুলিশ  প্রধান  (এসডিপিও, সাবডিভিশনাল পুলিশ অফিসার) ছিলেন।  ১৯৭১ সালে  ৫ মে  বলেশ্বর নদীর তীরে তাকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তান  মিলিটারি সদস্যরা। 

ট্রাইব্যুনাল  (১) কর্তৃক মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যে চার্জ গঠন করা হয়েছে তাতে  উল্লেখ করা হয়েছে মাওলানা সাঈদীর উপস্থিতিতে ফয়জুর রহমানকে হত্যা করা হয়। ট্রাইব্যুনালে একজন সাক্ষী বলেছেন ফয়ুজর রহমানসহ অন্য দুই সরকারি কর্মকর্তাকে ধরে নিয়ে যাবার সময় পাকিস্তান আর্মিদের গাড়িতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীও ছিলেন।

মাওলানা সাঈদীর যখন বিচার চলে তখনও হুময়ূন আহমেদ জীবিত ছিলেন। বর্তমানে জীবিত রয়েছেন, হুমায়ূন আহমেদের মা শহীদ ফয়জুর রহমানের স্ত্রী আয়েশা ফয়েজ, হুমায়ূন আহমেদ এর দুই ছোট ভাই প্রফেসর ড. জাফর ইকবাল, আহসান হাবিব, বোন সুফিয়া হায়দার, ভগ্নিপতি অ্যাডভোকেট আলী হায়দার খান। কিন্তু তারা কেউই শহীদ ফয়জুর রহমান বিষযে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে আসেননি।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে ‘জীবন যে রকম’ শীর্ষক একটি বই জমা দেয়া হয়েছে। বইটি লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ এর মা শহীদ ফয়জুর রহমানের স্ত্রী আয়েশা ফয়েজ। শহীদ ফয়জুর রহমান এর পিরোজপুরে চাকরির সুবাদে তারা পিরোজপুরে থাকতেন সরকারি বাসায় সপরিবারে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর শহীদ ফয়জুর রহমানকে ধরে নিয়ে যাওয়া, যুদ্ধের কারনে পিরোজপুরের নিভৃত একটি গ্রামে হুমায়ূন আহমেদ এর মা আয়েশা ফয়েজ এর আশ্রয় গ্রহণ, ছোট ছোট ছেলে মেয়ে নিয়ে এ বাড়ি থেকে সে বাড়িতে পালিয়ে বেড়ানোর অবর্ননীয় দুখ কস্টের স্মৃতিসহ অনেক বিষয় বর্ননা করা হয়েছে বইটিতে।
শহীদ ফয়জুর রহমানের স্ত্রী হুমায়ুন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজ ‘জীবন যে রকম’ নামে যে বই লিখেছেন তাতে তার স্বামীর হত্যা বিষয়ে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ তো  দূরের কথা বইয়ে একটি বারের জন্য তিনি  মাওলানা সাঈদীর নামটি পর্যন্ত  উল্লেখ করেননি।  স্বামী হত্যা বিষয়ে স্বাধীনতার পর পিরোজপুরে তিনি যে কেস ফাইল করেন তাতে তিনি দুজন প্রধান আসামীর নাম উল্লেখ করেছেন যথা ব্রিগেডিয়ার আতিক রশিদ এবং মেজর এজাজ। স্বামী হত্যার জন্য তিনি  তার বইতে পাকিস্তানী সেনাদের অভিযুক্ত করেছেন।  এছাড়া এদেশীয় অন্যান্য যারা জড়িত ছিল তাদের নাম ধামও পরিস্কার করে বর্ননা করেছেন।
এসব বিষয় নিয়ে কোর্টে আর্গুমেন্ট হয়েছে। এছাড়া হুমায়ূন আহমেদ এর নিজের লেখা  ইতিহাস বিষয়ক বই জোছনা ও জননীর গল্পসহ আরো কিছু বই আসামী পক্ষ জমা দিয়ে প্রমানের চেষ্টা করেছেন শহীদ ফয়জুর রহমান হত্যার সাথে কোনক্রমেই মাওলানা সাঈদী জড়িত ছিলেননা। আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন ডা. জাফর ইকবাল,  আয়েশা ফয়েজসহ অনেকে টিভি টকশোতে বলে বেড়াচ্ছেন শহীদ ফয়জুর রহমানকে সাঈদী সাহেব হত্যা  করেছেন। কিন্তু তাদের নিজেদের লেখা বইতে তারা কোথাও  সাঈদীর  নাম উল্লেখ করেননি এবং কোর্টে আসেননি।
আসুন দেখা যাক আয়েশা ফয়েজ তার বইতে কি লিখেছিলেন। সুপাঠ্য এ বইটি আমি আগাগোড়া পড়েছি এবং এখানে সংশ্লিষ্ট অংশ আপনাদের সামনে তুলে ধরা হল।

বইটিতে সরাসরি যাবার আগে সংক্ষেপে জেনে নেয়া দরকার শহীদ ফয়জুর রহমান হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ চার্জশিটে মাওলান সাঈদীর বিরুদ্ধে কি বলেছিল এবং সাক্ষীরাও বা কি বলেছিল।

ফয়জুর রহমান হত্যা বিষয়ে মাওলানা সাঈদীর  বিরুদ্ধে চার্জ :
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল -১  গত ৩/১০/২০১১ তারিখ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগ গঠন করে। এর মধ্যে একটি অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে “১৯৭১ সালের ৫ মে সাঈদী ও তার সহযোগী শান্তি কমিটির মন্নাফ কয়েকজন পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়ে পিরোজপুর হাসপাতালে যায়। সেখান থেকে তারা সাইফ মিজানুর রহমানকে ধরে  বলেশ্বর নদীর তীরে  নিয়ে যায়। সাইফ মিজান সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের নেতা। একই দিন লেখক হুমায়ুন আহমেদের পিতা পিরোজপুরের সাবডিভিশন পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) ফয়জুর রহমান এবং ভারপ্রাপ্ত এসডিও আব্দুর রাজ্জাককে কর্মস্থল থেকে ধরে নিয়ে বলেশ্বর নদীর তীরে গুলি করে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। সাঈদীর উপস্থিতিতে এ তিন সরকারী কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।”

ফয়জুর রহমান হত্যা বিষয়ে সাক্ষী যা বলেছেন:
২০ ফেব্রুয়ারি ২০১২ নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি এবং নড়াইল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাইফ হাফিজুর রহমান খোকন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন।  সাইফ হাফিজুর রহমান খোকন  আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে জানান, তার ভাই  সাঈফ মিজানুর রহমান ১৯৭১ সালে পিরোজপুর জেলা মেজিস্ট্রেট এবং ডেপুটি কালেক্টর  ছিলেন।

খান বাহাদুর আফজালের (পিরোজপুর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান)  কাছ থেকে জানতে পারি আমার ভাই মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা  করার কারনে এবং ট্রেজারি থেকে অস্ত্র বের করে দেয়ার কারনে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। আমার বড় ভাই মিজানুর রহমান, এসডিও আব্দুর রাজ্জাক, এসডিপিও ফয়জুর রহমানকে বলেশ্বর নদীতে নিয়ে যায়। তাদেরকে  ধরে গাড়িতে নিয়ে যাবার সময় গাড়িতে পাক আর্মি ছিল। দেলোয়ার হোসেন ও মন্নাফ রাজাকারও  ছিল গাড়িতে। মন্নাফের কাছে শুনতে পাই। ওনাদেরকে গ্রেফতার করে ঐ গাড়িতে করে বলেশ্বর নদীতে নিয়ে হত্যা করা হয়।

শাহরিয়ার কবির  যা বললেন: গত ২১ জুলাই শাহরিয়ার কবির একটি টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে বলেছেন আয়েশা ফয়েজ স্বামী হত্যার বিষয়ে ১৯৭২ সালে যে মামলা করেন তাতে দ্বিতীয় আসামী হল মাওলানা সাঈদী।  অথচ আয়েশা ফয়েজ তার বইয়ে প্রধান আসামীর সাথে  দ্বিতীয় যার নাম উল্লেখ করেছেন  তার নাম মেজর এজাজ।
এভাবে শহীদ ফয়জুর রহমানকে হত্যা বিষয়ে ঢালাওভাবে মাওলানা সাঈদীকে জড়িয়ে যে যার খুসীমত   বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে চলেছেন।

ফয়জুর রহমান হত্যা বিষয়ে আয়েশা ফয়েজের বইয়ে যা রয়েছে :

শহীদ ফয়জুর রহমানের স্ত্রী আয়েশা ফয়েজের বইটি ২০০৮ সালে প্রথম মুদ্রিত হয়।  পান্ডুলিপি প্রকাশের উপযোগী করেন তার ছেলে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। প্রকাশক : সময় প্রকাশন। এখানে বইটি থেকে প্রাসঙ্গিক অংশ তুলে ধরা হল।

চারদিকে গুজব। মিলিটারি বাগেরহাটে এসে গেছে। পিরোজপুর আসবে যেকোন সময়।... স্বাধীনতা সংগ্রামকে সাহায্য করার জন্য অস্ত্রাগার খুলে দেয়া হয়েছে। তরুনরা সেই রাইফেল কাাঁধে নিয়ে সারা শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শহরে উত্তেজনা এবং খানিকটা বিশঙ্খলা। কাজলের আব্বা সব দেখেশুনে আমাকে  বাচ্চাকে নিয়ে গ্রামের দিকে চলে যেতে বললেন। আমি রাজি হইনা। আল্লাহর ওপর ভরসা করে সবাই একসাথে থাকার আমার ইচ্ছা। সে আমাকে বোঝালো আমাদের তিন তিনজন ছেলে মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। মিলিটারির অন্ধরাগ তাদের ওপর। হঠা? করে মিলিটারি আসলে যাবার কোন উপায় থাকবেনা (পৃষ্ঠা ৫৭)।

....অনেক বোঝানোর পর আমি রাজি হলাম। আমি আমার ছেলে মেয়েদের নিয়ে নাজিরপুর (পিরোজপুর) থানায়  হাজির হলাম। ...সেখানে প্রায় মাসখানেক ছিলাম (পৃ ৬৮) ।
....মে মাসের প্রথম দিকে পিরোজপুরের আলী হায়দার খান একটা কাগজ নিয়ে হাজির হল। তাকে কাজলের আব্বা এক লাইন লিখেছে, আয়েশা এই ছেলেটা যা বলবে তাই করবে। ..আলী হায়দার খান আমাদের সবাইকে নিয়ে বাবলা নামক এক গহিন গ্রামে মুবারক খান নামে এক গ্রাম্য  মাদব্বরের বাসায় পৌছে দিল। বিপদের সময় এগিয়ে আসা এই তরুন অ্যাডভোকেট আমাদের জীবনের সাথে নানাভাবে জড়িত। যুদ্ধের পর তার সাথে আমার বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছি।
...শেষ পর্যন্ত একদিন কাজলের বাবা বাবলায় আমাদের কাছে এসে হাজির হল।..... কাজলের আব্বা খুব চিন্তিত। মিলিটারি আসবে যেকোন মুহুর্তে। অনেক চিন্তা ভাবনা করে ঠিক করা হয়েছিল যে,  থানা খালি করে সবাই চলে যাবে।
ভোর দশটার দিকে একজন লোক একটা চিঠি নিয়ে এল। চিঠি লিখেছেন থানার ওসি তফাজ্জল হোসেন। তিনি পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী থানা খালি না করে সেখানে রয়ে  গেছেন। কোর্ট ইনেসপেক্টর আলাউদ্দিন এবং সিআই আব্দুল হালিমও  এসে গেছে। মিলিটারিরা এসেছে এবং কোন সমস্যা হয়নি। ওসি লিখেছেন কাজলের আব্বা যেন অবিলম্বে চলে  আসেন। কারণ অন্য সবাই চলে এসেছে কোন সমস্যা হবেনা (পৃ ৫৯)।
চিঠিটা আমাদের খুব চিন্তিত করে দিল। প্রথমত এখানে গোপনে থাকা হচ্ছে। চিঠি নিয়ে কেউ যদি চলে আসে সেটা গোপন হতে পারেনা। আমি বললাম এখন কি করবা?
কাজলের আব্বা বললেন যদি না যাই আমার নামে হুলিয়া নিয়ে ধরার জন্য চলে আসবে। ছেলে মেয়ে সবাইকে ধরে নিয়ে যাবে। কোথায় পালাব আমরা এতগুলো মানুষ? আমাকে যেতে হবে।
..... একটু পরে কাজলের আব্বা ইকবালকে সাথে নিয়ে নৌকা করে রওয়ানা হল। আমার আল্লাহর ওপর খুব বিশ্বাস। নফল নামাজ পড়েছি। রোজা রাখছি। ...পরদিন বিকালে ইকবাল একা ফিরে এল। খালি পা. গায়ে একা ছেড়া শার্ট, পরনে লুঙ্গি। গ্রামের মাঝ দিয়ে একজন মাঝিকে দিয়ে পালিয়ে এসেছে। তাকে এভাবে দেখে আমি আতঙ্কে শিউরে উঠলাম। নি:শ্বাস আটকে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে ইকবাল?
ইকবাল একটা লম্বা নি:শ্বাস নিয়ে বলল , আব্বা কালকে বিকালে মিটিংয়ে গিয়েছেন আর ফিরে আসেননি। সবাই বলেছে মিলিটারিরা মেরে ফেলেছে। ...কাল রাত নেমে এল। রাত শেষ হয়না। আমি বসে আছি। ভোরের আলো ফুটে উঠতেই আমি নৌকা করে পিরোজপুরে রওয়ান দিলাম। ........দীর্ঘ সময় লাগল পিরোজপুর পৌছতে। রিক্সা করে বাসায় পৌছতে বুকটা হা হা করে উঠল। যে বিছনায়

কাজলের বাবা শুয়েছিল এখনো সেই বিছানা এলামেলো হয়ে আছে। .. আমি  থানায় ফোন করলাম। ফোন ধরলেন থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন। আমার গলার স্বর শুনেই ফোনটা রেখে দিল। এরপর যতবার ফোন করি অন্য একজন ফোন করে বলে ওসি নেই। আমি তখন সিআই হালিম সাহেবকে চাইলাম। তিনিও নেই। অনেকবার চেষ্টা করে আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম, ঠিক আছে আমি থানায় আসছি। দেখি কে আছে। সাথে সাথে সিআই হালিম সাহেব ফোন করলেন। বললেন ভাবী আপনি কখন এলেন। বাচ্চারা কোথায়?
আমি তাকে কাজলের আব্বার কথা জিজ্ঞেস করলাম, এসডিপিও সাহেব কোথায়। ঠিক করে বলেন তার কি হয়েছে?
স্যার আছেন, আর্মির ব্যাপারতো ? তারা সাথে রেখেছে।
আমি শুনেছি আপনি নতুন এসডিপিও হয়েছেন।
কে বলে এসব? বাজে কথা।
ঠিক আছে আমি মিলিটারি কর্নেল আতিক রশীদের সাথে দেখা করতে চাই। একটা ব্যবস্থা করেন।
শুনে তিনি হা হা করে উঠলেন। বললেন দাড়ান আসছি। প্রায় সাথে সাথে তিনি বাসায় এসে হাজির  হলেন। বললেন কর্নেলের সাথে দেখা করলে ব্যাপারাটা খুব খারাপ হবে। ওরা হয়ত রেগে যাবে। আপনি খাওয়া দাওয়া করেন। আমি  খাবার পাঠাচ্ছি। বাচ্চাদের রেখে এলেন কেন? কালকেই একটা নৌকা পাঠিয়ে ওদের নিয়ে আসা যাবে। স্যারের কোন বিপদ হলে আমরা এখানে থাকতাম নাকি? আবার আসব আমি।
তিনি আর আসেননি। ফোন করে জানিয়েছেন মিলিটারিরা এখন আমার সাথে দেখা করবেনা।
আমি তখন গেলাম প্রাক্তন মুসলিম লীগের মন্ত্রী বর্তমান শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আফজাল সাহেবের বাসায়। আমাদের বাসার সামনেই তার বাসা। বাবার বিশেষ বন্ধু ছিলেন। আমাকে দেখে একেবারে হকচকিয়ে গেলেন। আপনি?
জি, আমি জানতে  এসেছি এসডিপিও সাহেবের কি হয়েছে।
আপনি ভয় পাবেননা। সব ঠিক  আছে।
তাকে কি মেরে ফেলেছে?
না মরেনি।
তাহলে তিনি কোথায়?
কোথায় তো জানিনা। তারপর বিরক্ত হয়ে বললেন দেশের সত্যি খবরটা তো রাখেননা।  শুধু ইন্ডিয়ার রেডিও শোনেন। এখন আপনার বাচ্চাদের নিয়ে দেশে যান। আমি আপনার বাবাকে খবর দিই।
আমার বাবাকে আপনার খবর দিতে হবেনা। তিনি নিজেই আসবেন। আপনার  কাছে যেটা জানতে চেয়েছি সেটা বলেন। এসডিপিও সাহেবকে কি মেরে ফেলা হয়েছে?
তিনি বললেন, না মরেনি।
কাজলের আব্বাকে মে মাসের পাঁচ তারিখ বিকেল পাঁচটায় বলেশ্বর নদীর তীরে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছিল। সবাই সেটা জানত। আমাকে সামনাসামনি সেটা বলার কারো সাহস হয়নি  (পৃ ৬০-৬৩)।

স্বাধীনতার পর ফেব্রুয়ারি মাসে পিরোজপুর রওয়ান দিলাম। আমি ডাক্তার সাহেবের বাসায় উঠেছি। নির্জন নদী তীরে যেখানে  কাজলের বাবাকে কবর দেয়া হয়েছে সেখান থেকে দেহাবশেষ তুলে আমি দেশে নিয়ে যেতে চাই তা সবাইকে জানালাম। মুক্তিযোদ্ধারা বললেন স্যার আমাদের এলাকার প্রথম শহীদ। তাকে নেবেননা। এখানেই রেখে যান। ....আমি রাজি হলাম। সবাই মিলে তখন আরেকটি  প্রস্তাব দিল। এদেশে পাকিস্তান মিলিটারি লক্ষ লক্ষ মানুষ মেরেছে। কিন্তু হত্যাকান্ডের জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী করা যায় সেরকম সাক্ষ্য প্রমান কারো বিরুদ্ধে নেই। কাজলের (হুমায়ূন আহমেদ) বাবার হত্যাকান্ডের সাক্ষী প্রমান  রয়েছে। কে মেরেছে, কারা মেরেছে, কিভাবে মেরেছে তাও জানা আছে। সে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান অল্প কিছু মানুষের একজন যার মৃতদেহ শুকুনী, গৃধিনী ছিড়ে ছিড়ে খায়নি, যাকে মানুষেরা তুলে এনে দাফন করেছে ।

তার দেহাবশেষ তুলে এনে ময়না তদন্ত করা  যাবে এবং হত্যাকারী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একটি পূর্নাঙ্গ খুনের মামলা দায়ের করা যাবে। খুনী আসামীর প্রধান নায়ক বিগ্রেডিয়ার আতিক রশীদ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ধরা পড়েছে। এখন যুদ্ধবন্দী হিসেবে আছে। সাধারন যুদ্ধবন্দীরা মুক্তি পেয়ে দেশে যেতে পারে কিন্তু যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তাকে বিচার করে শাস্তি দেয়া যাবে।
সবাই মিলে নদী তীরে এক নির্জন জায়গায় আমরা হাজির হলাম। ইকবাল (ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল) আমাকে এক নির্জন জায়গায় বসিয়ে দিয়ে গেল। সে নিজেই আমানুল্লাহকে নিয়ে কবর খুড়ে তার বাবার দেহাবশেষ বের  করেছিল। এই দীর্ঘদিন পরেও তার বাবার পায়ে নাকি ছিল একজোড়া অবিকৃত নাইলনের মোজা। ডাক্তার সাহেব ছিলেন । তিনি ময়নাতদন্ত করলেন। বেশ কয়েকটি গুলি লেগেছিল। একটি পায়ে একটি বুকে একটি মাথায়। যেটি মাথায় সেটি সম্ভবত তার প্রাণ কেড়ে নিল। ... কফিন নৌকায় তুলে শহরে আনা হল। .....যখন কফিন আনা হয়েছে ঠিক তখন আফজাল সাহেবকেও (খান বাহাদুর সৈয়দ মো: আফজাল, পিরোজপুর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান) গ্রেফতার করে থানায় আনা হল। আমি তার কাছ থেকে একদিন কাজলের বাবার কথা জানতে চেয়েছিলাম। উত্তর না দিয়ে দেশ সম্পর্কে আমাকে জ্ঞান দান করেছিলেন। আমাকে দেখে তিনি শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
চিনতে পারলেন সেরকম ভাব করলেননা।
...যতদিন ছিলাম প্রতিদিন ভোরে  কবরস্থানে যেতাম। মাথার কাছে বসে কোরআন শরীফ পড়তাম (পৃ ৭৮-৮১)।

...অনেক কষ্ট করে খুনের কেসটা দাড় করানো  হয়েছিল। যারা দেখেছে তাদের সাক্ষী প্রমান। যারা কবর দিয়েছে তাদের সাক্ষী প্রমান। ময়না তদন্তের রিপোর্ট সবকিছু।  প্রধান আসামী ব্রিগেডিয়ার আতিক রশিদ। সাথে মেজর এজাজ। দীর্ঘ সময় নিয়ে তৈরি করে সেই কেস ফাইল করা হল (পৃ ৮৩)।

আমি ঢাকা ফিরে এলাম। ছেলেমেয়েদের বললাম যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। তাদের বাবাকে যারা হত্যা করেছে তাদের এদেশের মাটিতে বিচার করা হবে। এই স্বাধীন দেশের মানুষের সামনে  দাড়িয়ে জবাবদিহি করতে হবে সেই হত্যাকারী খুনীদের। বলতে হবে কেন বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে এই মানুষদের। ... আমি অপেক্ষা করে আছি। আমার ছেলে মেয়েরা অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হলনা। এদেশের ত্রিশ লাখ মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানের নব্বই হাজার সৈন্য সসম্মানে তাদের দেশে ফিরে গেল। এদেশের সরকার একটি বার তার বিচারের কথা উচ্চারন পর্যন্ত করলনা। ত্রিশ লক্ষ প্রানের প্রতি অবমাননার এর থেকে বড় উদাহরন পৃথিবীর ইতিহাসে আর একটিও নেই। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে আমি সেজন্য কখনো  ক্ষমা করিনি।
এরপর প্রত্যেক নতুন সরকার আসার পর দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে আবেদন করে বলেছি, পাকিস্তান সরকারের কাছে আমার স্বামীর হত্যাকারীদের ফেরত চেয়ে এদেশে মাটিতে তাদের বিচার করা হোক। ত্রিশ লক্ষ প্রানের প্রতি যে অবমাননা দেখানো হয়েছে সেই অবমাননার অবসান করা হোক। কোন লাভ হয়নি। ...পাকিস্তান সরকারের কাছে সেই হত্যাকারিদের  ফেরত চাওয়া হোক (পৃ ৮৩-৮৪)

রক্ষীবাহিনী বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় হুমায়ূন আহমেদদের

Mehedy Hasan
শহীদ পরিবার হিসেবে আয়েশা ফয়েজ স্বাধীনতার পর একটি বাড়ি বরাদ্দ পেয়েছিলেন সরকারিভাবে। সে বাসায় ওঠার তিনদিনের মাথায় তাদেরকে রক্ষীবাহিনী বাসা থেকে পথে নামিয়ে দেয়। সে কথা লিখেছেন তিনি তার ‘জীবন যে রকম’ বইয়ে।
“বাবর রোডের বাসায় ওঠার তিনদিন পর হঠাৎ একদিন রক্ষীবাহিনী এসে হাজির হল। একজন সুবেদার মেজর জিজ্ঞাসা করল, এ বাড়ি আপনি কোথা থেকে পেলেন?
আমি বললাম সরকার আমাকে  দিয়েছে। আমার স্বামী যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তাই।
সুবেদার মেজর কিছু না বলে চলে গেল। আমার মনের ভেতর হঠাৎ করে একটা খটকা লেগে গেল। হঠাৎ করে রক্ষীবাহিনী আসছে কেন? ক্ষানিকক্ষন পর আরেকজন সুবেদার মেজর এসে হাজির। সে একা নয়। তার সাথে বোঝাই এক ট্রাক রক্ষী বাহিনী। সবার হাতে অস্ত্র। সুবেদার মেজরের নাম হাফিজ। ভেতরে ঢুকে বলল, এই বাড়ি  আমার। শেখ সাহেব আমাকে দিয়েছেন।
আমি বললাম, সে কি করে হয়? আমার সাথে বাসার এলটমেন্ট রয়েছে।
সে কোন কথা না বলে টান দিয়ে ঘরের একটা পর্দা ছিড়ে ফেলল। সাথে আসা রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের বলল ছেলে মেয়েদের ঘাড় ধরে বের কর ।
আমি এতদিনে পোড় খাওয়া পাথর হয়ে গেছি। রুখে দাড়িয়ে বলেছি, দেখি তোমার কত সাহস।
সুবেদার মেজর একটু থমকে গিয়ে কিছু না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
দেখতে দেখতে পুরো  এলাকা রক্ষী বাহিনী দিয়ে বোঝাই হয়ে গেল। বাসা চারদিকে ঘেরাও হয়ে আছে। কাউকে বাসায় ঢুকতেও দেয়না, বের হতেও দেয়না। কাজল (সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ) মহসিন হলে  ছিল। খবর পেয়ে এসেছে। তাকেও ঢুকতে দিলনা। সারা রাত এভাবে কেটেছে।
ভোর হতেই আমি বের হলাম। পুলিশের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইলাম। পুলিশ বলল আমরা গোলামীর পোশাক পরে বসে আছি। রক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা কি করব?
বঙ্গভবন, গণভবন এমন কোন জায়গা আমি বাকি রাখলামনা সাহায্যের জন্য। কিন্তু লাভ হলনা। আমি তুচ্ছ মানুষ। আমার জন্য কার মাথাব্যথা?
রাতে ফিরে এসেছি। আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেবেনা। অনেক বলে ভেতরে ঢুকেছি। রাত আটটার দিকে রক্ষীবাহিনীর দল লাথি মেরে দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে গেল। ইকবাল  (ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল) আমাকে আড়াল করে দাড়াল। একজন বেয়োনেট উচিয়ে লাফিয়ে এল। রাইফেল তুলে ট্রিগারে হাত দিয়েছে। চিৎকার করে কিছু একটা বলছে। গুলি করে মেরে ফেলবে আমাদের?
আমি ছেলে মেয়েদের হাত ধরে বের হয়ে এলাম।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাকে প্রথমবার গৃহহারা করেছিল।
বাংলাদেশ সরকারের রক্ষীবাহিনী আমাকে দ্বিতীয়বার গৃহহারা করল।

রক্ষী বাহিনী হুমায়ূন আহমেদদেরকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়ার পরের দৃশ্য

স্বাধীনতার পর আয়েশা ফয়েজ শহীদ পরিবার হিসেবে বাবর রোডে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দ পেয়েছিলেন। সে বাড়ি বরাদ্দ পেতে তাকে অশেষ লজ্জা, অপমান, হেনস্থা এবং হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছিল সরকারি অফিসে। দিনের পর দিন ঘুরতে হয়েছে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে। এক অফিসার থেকে আরেক অফিসারের টেবিলে । কিন্তু বহু কষ্টে বরাদ্দ পাওয়া সেই বাড়ি থেকে মাত্র দিন দিনের মাথায় তাদেরকে রী বাহিনী অস্ত্রের মুখে তাড়িয়ে দেয়। তাড়িয়ে দেয়ার আগে আয়েশা ফয়েজ রুখে দাড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে শত শত রীবাহিনী তাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে বাড়ি অবরোধ করে। কিন্তু সে অবস্থায়ও তারা বাড়ি ছেড়ে চলে না যাওয়ায় তাদেরকে গুলি করতে উদ্যত হয় রীবাহিনীর সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত ছেলে মেয়ের জীবন বাঁচাতে শূণ্য হাতে ছেলে মেয়েদের হাত ধরে রাতের অন্ধকারে বের হয়ে আসেন রাস্তায়।

আয়েশা ফয়েজের লেখা বই ‘জীবন যে রকম’ অবলম্বনে এ পর্যন্ত হয়ত অনেকে জেনেছেন। কিন্তু রাস্তায় বের হয়ে আসার পরে কি হয়েছিল? আসুন সে বিষয়ে জেনে নেয়া যাক।

প্রথমে হুমায়ূন আহমেদের লেখা থেকেই জানা যাক।
“সদ্য দেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার দয়াপরবশ হয়ে আমার মাকে বাবর রোডে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দ দিয়েছে। আমরা সেই বাড়িতে বাস করি। আসবাবপত্র খাট পালঙ্ক কিছু নেই। কম্বলের ওপর শোয়া, কম্বলের ওপর বসা। বাড়িতে পানি নেই। তাতে কী? মাথার ওপর একটা ছাদ তো আছে! আমরা ভাগ্যবান, রাস্তায় বসে নেই। আমাদের সৌভাগ্য স্থায়ী হলনা। এক মধ্যরাতে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিল।
কম্বল এবং হাড়িপাতিলসহ আমি, ভাইবোল, মা, একটা আট বছর বয়সী কাজের ছেলেকে নিয়ে রাস্তায় বসে রইলাম। তিন বোনের মধ্যে দুজন ফিচ ফিচ করে কাঁদছে। মা কাঁদছেন। আমাদের কাজের চেলে জিতু মিয়া কাঁদছে চিৎকার করে। আমি অধিক শোকে পাথর। এক সময় রাত কাটবে। সকাল হবে। এদেরকে নিয়ে কোথায় যাব? জলে ভেসে যাওয়া একটি শহীদ পরিবারকে কে আশ্রয় দেবে?
আমরা সারা রাত পথে বসে রইলাম। সকাল হল। হঠাৎ দেখি রিক্সা করে ছফা ভাই এসে উপস্থিত। তার সঙ্গে একটি কেরোসিনের টিন। মুখ অত্যন্ত গম্ভীর। আমাকে বললেন, হুমায়ূন রিক্সায় উঠুন।
আমি বললাম, কোথায় যাব?
ছফা ভাই বললেন, গণভবনে যাব। নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেব। একটি শহীদ পরিবারের প্রতি যে অপমান করা হয়েছে তার প্রতিবাদ স্বরূপ এ কাজটা করব। আত্মহুতি।
কি বলছেন ছফা ভাই?
কথা বলে সময় নষ্ট করবেননা। উঠে আসুন। সঙ্গে ভারী চাদর নিয়ে এসেছি। আপনি আমার গায়ে ভালমতো চাদরটা জড়িয়ে দেবেন। যেন আগুনটা ঠিকমত লাগে।
ছফা ভাই গায়ে কেরোসিন ঢেলে জীবন বিসর্জন দিতে যাচ্ছেন। এ খবর চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। কবি সিকান্দার আবু জাফর ব্যস্ত হয়ে ছুটে আসলেন ছফা ভাইয়ের কাছে। তাকে ধমক দিয়ে বললেন, আমি ব্যবস্থা করছি। কথা দিচ্ছি এই শহীদ পরিবারের জন্য থাকার একটা ব্যবস্থা করব। তুমি কেরোসিন টিন আমার বাসায় দিয়ে এসো। আমি ভাইবোন নিয়ে আগের বাড়িতেই ওঠার সুযোগ পেলাম।”
(পুরো বাড়ি আয়েশা ফয়েজকে ফিরিয়ে দেয়া হয়নি। একটি তলা দেয়া হল আয়েশা ফয়েজকে এবং নিচের তলা দেয়া হল দখলদার রীবাহিনীর মেজর হাফিজকে। এভাবে এর সমাধান করা হল এবং আয়েশা ফয়েজ তা মেনে নিলেন)।

বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার পরের দৃশ্য বিষয়ে আয়েশা ফয়েজ যা লিখেছেন: হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজ তার জীবন যে রকম বইয়ে লিখেছেন,

“রী বাহিনীর এই গোলমালের মাঝে যারা সাহায্যের জন্য ছুটে এলেন তার মাঝে একজন হলেন আহমদ ছফা। এই খেয়ালী মানুষটি রীবাহিনীর এমন আচরনে একেবারে েেপ গেল। চেনাজানা সমস্ত মানুষকে সে টেনে নিয়ে এল বাবর রোডে। প্রাণ নিয়ে আমরা বাসা থেকে বের হয়ে আসার পর রীবাহিনীর বীর জওয়ানেরা আমাদের বাসার সমস্ত জিনিসপত্র টেনে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। তার মাঝে চেয়ার টেবিলও আছে। রাত্রিবেলা সেখানেই সবাই বসেছে। খোলা আকাশের নিচে রাত্রিবেলায় এক রাউন্ড চাও খেয়ে নিল সবাই। সরকারি যে দলিলটির জন্য আমার আজ এতবড় লজ্জা সেটি ছফা যাবার সময় হাতে করে নিয়ে গেল। পরদিন গণকণ্ঠ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় শহীদ পরিবারের ওপর নির্যাতনের এই খবরটি ছবিসহ ছাপা হল। সাথে সরকারি এলটমেন্ট বরাদ্দের ডকুমেন্টের একটি ছবি (যেটি ছফা নিয়ে গিয়েছিল হাতে করে)। আওয়ামী লীগ সরকার তখন প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করছে। তাদের কিংবা রীবাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলে সেরকম সাহস কারোর নেই। গণকণ্ঠ একমাত্র কাগজ যারা সাহস করে কিছু বলত। ”

পরবর্তীতে রী বাহিনী র্র্র্কর্তৃপ এর একটা সুরাহা করতে এগিয়ে আসে। রীবাহিনী প্রধান নুরুজ্জামান ওপরের তলা দিলেন আয়েশা ফয়েজকে এবং নিচের তলা দিলেন রী বাহিনীর মেজর সুবেদার হাফিজকে।

কাজল (হুমায়ূন আহমেদ) ঝামেলা মোটে সহ্য করেনা। এসব ঝামেলা দেখে সে মহসিন হলে পাকাপাকিভাবে আশ্রয় নিল। প্রতিদিন সকালে উঠে সে কাগজে খঁজত রীবাহিনী কাউকে বাসা থেকে উচ্ছেদ করেছে এরকম কোন খবর আছে কি-না। যদি না থাকে মাঝে মাঝে দেখা করতে আসে।

শহীদ পরিবারের কাজ হল ঘোরাঘুরি:

আয়েশা ফয়েজ তার বইয়ে লিখেছেন, “পেনশনের টাকা তোলার জন্য কাগজপত্র নিয়ে আবার গেলাম। কাজলের আব্বার পরিচিত একজন এআইজি তার অধস্তন অফিসারকে ডেকে আমার সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন। অফিসার বিনয়ে গলে গিয়ে বলল, কোন চিন্তা করবেননা স্যার। সব ঠিক করে দেব।
তার সাথে অফিসে গিয়েছি। সে   রাগে ফেটে  পড়ল। মুখ খিচিয়ে বলল, আপনার বেশি ক্ষমতা  হয়েছে না? ভাবেন ওপরওয়াল বললেই সব হয়ে যাবে? মনে রাখবেন টাকা অত সহজে পাওয়া যায়না। টাকা যদি চান এখানে এসে খরচপাতি করবেন।
ভদ্র লোক গজগজ করতে করতে তার এক সহকর্মীকে বললেন, এই একটা নতুন দল বের হয়েছে। শহীদ পরিবার। যেখানেই যাই সেখানেই শহীদ পরিবার। জ্বালিয়ে খাচ্ছে এরা।

এইভাবে শহীদ পরিবার হিসেবে আমার এক নতুন জীবন শুরু হল। শহীদ পরিবারের  প্রথম কাজ হচ্ছে ঘোরাঘুরি করা। আমার ঘোরা ঘুরি শুরু হল। এক অফিস থেকে আরেক অফিস। এক অফিসার থেকে আরেক অফিসার। এভাবে আস্তে আস্তে ঘোরাঘুরিতে অভিজ্ঞ হয়ে গেলাম।

ঢাকায় থাকার জায়গার খুব সমস্যা। শহীদ পরিবারকে বাড়ি দেয়া হয়েছে শুনে তার জন্য ঘোরাঘুরি শুরু করেছি।  একদিন খোঁজ খবর নিয়ে বাড়ি সংক্রান্ত একজন মন্ত্রী, নাম মতিউর রহমান, তার সাথে দেখা করতে গেলাম। গিয়ে দেখি আমার মত আরো অনেকে আছেন। দীর্ঘ সময় পর মন্ত্রী  মহোদয়ের সাথে দেখা হল। আমাদের দেখে একেবারে ক্ষেপে গেলেন মহোদয়। পেয়েছেন কি আপনারা? প্রত্যেক দিন সকালে এসে বসে থাকেন? সকালে ঘুম থেকে উঠেই আর কত বিধবার মুখ দেখব?
আমি লজ্জায় মরে গেলাম। খোদা তুমি আমাকে আর কত অপমান সহ্য করাবে?

অবশেষে এভাবে ঘেরাঘুরি করতে করতে  অশেষ লজ্জা অপমান হজম করে আয়েশা ফয়েজ শহীদ পরিবার হিসেবে একটি বাড়ি বরাদ্দ পেয়েছিলেন। তার স্বামীর বন্ধু কাজী জাহেদুল ইসলাম বাড়িটি তাকে পাইয়ে  দেয়ার ব্যবস্থা করেন। জনৈকি অবাঙ্গালীর পরিত্যাক্ত বাসা। ১৯/৭ বাবর রোড।
এই বাড়ি থেকেই তিনদিনের  মাথায় তাদেরকে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের  রক্ষীবাহিনী অস্ত্রের মুখে তাড়িয়ে দেয়। ডাক্তার মনোয়ার হোসেন নামে এক প্রতিবেশী তাদের আশ্রয় দেন ।  
মনীষী আহমদ ছফা গণকণ্ঠ পত্রিকায়  পরের দিন  শহীদ পরিবারের ওপর এ নির্যাতনের একটি খবর ছাপার ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে  রক্ষী বাহিনী প্রধান নুরুজ্জামান ওপরের তলা দিলেন  আয়েশা ফয়েজকে  এবং নিচের তলা দিলেন  রক্ষী বাহিনীর মেজর সুবেদার  হাফিজকে।

বাসা লুট:
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর এসডিপিও ফয়জুর রহমান তার স্ত্রী আয়েশা ফয়েজ এবং ছেলে মেয়েদের পিরোজপুরের সরকারি বাসা ছেড়ে নাজিরপুর থানার  নিভৃত  পল্লী বাবলা গ্রামে গোপন আশ্রয়ে পাঠিয়ে দেন। সেখানে একদিন গোপনে  পরিবারের সাথে দেখা করতে আসেন ফয়জুর রহমান। এ অবস্থায় পিরোজপুর থানার ওসি তফাজ্জাল হোসেন তাকে অভয় দিয়ে পিরোজপুর আসার জন্য চিঠি লেখেন। । চিঠি মোতাবেক পিরোজপুর হাজির  হবার পর ১৯৭১ সালের ৫ মে ফয়জুর রহমানকে বলেশ্বর নদীর তীরে গুলি করে হত্যা করা হয়।

স্বামী হত্যার খবর পাওয়ার সাথে সাথে আয়েশা ফয়েজ সমস্ত বাঁধা বিপত্তি উপেক্ষা করে   একা ছুটে যান পিরোজপুর। ওসি তফাজ্জালসহ স্বামীর অফিসের অধস্তন কর্মকর্তা, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান খান বাহাদুর সৈয়দ মো: আফজাল সবার সাথে দেখা করে স্বামীর  বিষয়ে সঠিক খবর জানতে চান। কিন্তু সবাই  তার কাছে   স্বামী ফয়জুর রহমান হত্যার কথা  গোপন রাখে।  স্বামীর ব্যাপারে কোন সন্ধান না
পেয়ে  আয়েশা ফয়েজ ফিরে আসেন পিরোজপুর তাদের সরকারি বাসায়।  সে বাসা লুট হওয়া বিষয়ে তিনি তার বইয়ে যা লিখেছেন তা এখানে তুলে ধরা হল। 

“আমি একা বাসায় বসে আছি। রাতে ঘরদোর গুছিয়ে বাসায় বসে থাকলাম। ....কিন্তু সে (স্বামী ফয়জুর রহমান) আর আসেনা। ভোর হতেই সবাই আমাকে চাপ দেয় চলে যাবার জন্য। .... আমি তখন বাসা ছেড়ে বাচ্চাদের কাছে যাব বলে ঠিক করলাম। আমি আবার ঘর পরিস্কার করে দিলাম। কাজলের (হুমায়ূন আহমেদ) বাবা যদি ফিরে আসে  তার জন্য পরিস্কার কাপড় আলনায় ঝুলিয়ে দিলাম। বিছানায় নতুন চাঁদর দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে একটা রিক্সা নিলাম। রিক্সা নৌকাঘাটে পৌছানোর আগেই মিলিটারি সদলবলে এসে আমার বাসা লুট করে নিল। আমার এতদিনের সংসার, কাজলের আব্বার শত শত বই, তার লেখা অপ্রকাশিত বইয়ের পান্ডুলিপি, বাচ্চাদের ছেলেবেলার স্মৃতি সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। রাস্তার মানুষ ডেকে মিলিটারি আদেশ দিল সব কিছু  লুট করে নিয়ে যেতে। ”

হুমায়ূন আহমেদের মা যে কারনে আওয়ামী লীগকে মা করেননি কখনো




Mehedy Hasan
হুমায়ূন আহমেদের পিতাকে কারা কিভাবে কোথা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে তা তিনি লিখেছেন ‘জীবন যে রকম’ নামে বইয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সেই দু:সহ দিনগুলোতে কিভাবে তিনি তার ছয় সন্তান নিয়ে পিরোজপুরের নিভৃতি পল্লীতে একটুখানি আশ্রয়ের জন্য ঘুরে বেরিয়েছেন এবং দুর্যোগ উপো করে সন্তানদের আগলে রেখেছেন তার স্মৃতিচারন করেছেন এ বইয়ে। দেশ স্বাধীনের পর আয়েশা ফয়েজ তার স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করেছিলেন। সে মামলায় তিনি আসামী করেছিলেন পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার আতিক রশিদ এবং ক্যপ্টেন এজাজকে। স্বামী হত্যার জন্য তিনি পাকিস্তান সেনাদের দায়ী করেছেন সম্পূর্ণভাবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে ভারত- পাকিস্তান- বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ হত্যা, লাখ লাখ মা বোনের ইজ্জত লুন্ঠনকারী, গ্রামের পর গ্রাম, নগর জনপদ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখারকারী সমস্ত যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী সৈন্যদের কোন বিচার ছাড়াই স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়। এ কারনে আয়েশা ফয়েজ তার বইয়ে মন্তব্য করেছেন “ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে আমি সেজন্য কখনো মা করিনি।”

আয়েশা ফয়েজ  তার বইয়ে লিখেছেন-কাজলের (হুমায়ূন আহমেদ) বাবার হত্যাকান্ডের সাী প্রমান রয়েছে। কে মেরেছে, কারা মেরেছে, কিভাবে মেরেছে তাও জানা আছে। সে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান অল্প কিছু মানুষের একজন যার মৃতদেহ শুকুনী, গৃধিনী ছিড়ে ছিড়ে খায়নি, যাকে মানুষেরা তুলে এনে দাফন করেছে ।

তার দেহাবশেষ তুলে এনে ময়না তদন্ত করা যাবে এবং হত্যাকারী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একটি পূর্নাঙ্গ খুনের মামলা দায়ের করা যাবে। খুনী আসামীর প্রধান নায়ক বিগ্রেডিয়ার আতিক রশীদ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ধরা পড়েছে। এখন যুদ্ধবন্দী হিসেবে আছে। সাধারন যুদ্ধবন্দীরা মুক্তি পেয়ে দেশে যেতে পারে কিন্তু যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তাকে বিচার করে শাস্তি দেয়া যাবে।
সবাই মিলে নদী তীরে এক নির্জন জায়গায় আমরা হাজির হলাম। ইকবাল (ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল) আমাকে এক নির্জন জায়গায় বসিয়ে দিয়ে গেল। সে নিজেই আমানুল্লাহকে নিয়ে কবর খুড়ে তার বাবার দেহাবশেষ বের করেছিল। এই দীর্ঘদিন পরেও তার বাবার পায়ে নাকি ছিল একজোড়া অবিকৃত নাইলনের মোজা। ডাক্তার সাহেব ছিলেন । তিনি ময়নাতদন্ত করলেন। বেশ কয়েকটি গুলি লেগেছিল। একটি পায়ে একটি বুকে একটি মাথায়। যেটি মাথায় সেটি সম্ভবত তার প্রাণ কেড়ে নিল। ... কফিন নৌকায় তুলে শহরে আনা হল। .....যখন কফিন আনা হয়েছে ঠিক তখন আফজাল সাহেবকেও (খান বাহাদুর সৈয়দ মো: আফজাল, পিরোজপুর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান) গ্রেফতার করে থানায় আনা হল। আমি তার কাছ থেকে একদিন কাজলের বাবার কথা জানতে চেয়েছিলাম। উত্তর না দিয়ে দেশ সম্পর্কে আমাকে জ্ঞান দান করেছিলেন। আমাকে দেখে তিনি শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
চিনতে পারলেন সেরকম ভাব করলেননা।
...যতদিন ছিলাম প্রতিদিন ভোরে কবরস্থানে যেতাম। মাথার কাছে বসে কোরআন শরীফ পড়তাম (পৃ ৭৮-৮১)।
...অনেক কষ্ট করে খুনের কেসটা দাড় করানো হয়েছিল। যারা দেখেছে তাদের সাী প্রমান। যারা কবর দিয়েছে তাদের সাী প্রমান। ময়না তদন্তের রিপোর্ট সবকিছু। প্রধান আসামী ব্রিগেডিয়ার আতিক রশিদ। সাথে মেজর এজাজ। দীর্ঘ সময় নিয়ে তৈরি করে সেই কেস ফাইল করা হল (পৃ ৮৩)।
আমি ঢাকা ফিরে এলাম। ছেলেমেয়েদের বললাম যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। তাদের বাবাকে যারা হত্যা করেছে তাদের এদেশের মাটিতে বিচার করা হবে। এই স্বাধীন দেশের মানুষের সামনে দাড়িয়ে জবাবদিহি করতে হবে সেই হত্যাকারী খুনীদের। বলতে হবে কেন বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে এই মানুষদের। ... আমি অপো করে আছি। আমার ছেলে মেয়েরা অপো করে আছে। কিন্তু সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হলনা। এদেশের ত্রিশ লাখ মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানের নব্বই হাজার সৈন্য সসম্মানে তাদের দেশে ফিরে গেল। এদেশের সরকার একটি বার তার বিচারের কথা উচ্চারন পর্যন্ত করলনা। ত্রিশ ল প্রানের প্রতি অবমাননার এর থেকে বড় উদাহরন পৃথিবীর ইতিহাসে আর একটিও নেই। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে আমি সেজন্য কখনো মা করিনি।
এরপর প্রত্যেক নতুন সরকার আসার পর দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে আবেদন করে বলেছি, পাকিস্তান সরকারের কাছে আমার স্বামীর হত্যাকারীদের ফেরত চেয়ে এদেশে মাটিতে তাদের বিচার করা হোক। ত্রিশ ল প্রানের প্রতি যে অবমাননা দেখানো হয়েছে সেই অবমাননার অবসান করা হোক। কোন লাভ হয়নি। ...পাকিস্তান সরকারের কাছে সেই হত্যাকারিদের ফেরত চাওয়া হোক (পৃ ৮৩-৮৪)

হুমায়ূন আহমেদের ভগ্নিপতির লেখায়ও মাওলানা সাঈদীর নাম নেই

শহীদ ফয়জুর রহমানের বড় জামাতা এবং হুমায়ূন আহমেদের ভগ্নিপতি অ্যাডভোকেট আলী হায়দার খানের পিরোজপুর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি লেখা   কবি হাসান হাফিজুর রহমান  সম্পাদিত তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক  প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র’ প্রামান্য গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে।  সে লেখায়  শহীদ ফয়জুর রহমানকে হত্যার কথাও উল্লেখ আছে। কিন্তু ওই  লেখার কোথাও তিনি  শহীদ ফয়জুর রহমানকে হত্যার সাথে জড়িয়ে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেননি।  তার লেখায় কোথাও মাওলানা সাঈদীর নামও নেই।

আলী হায়দার খানের বাড়ি পিরোজপুর এবং শহীদ ফয়জুর রহমানের পরিবারের সাথে নানাভাবে তিনি জড়িত ছিলেন।  মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শহীদ ফয়জুর রহমানের স্ত্রী আয়েশা ফয়েজসহ অন্যান্যদের পিরোজপুরের এক গহীন গ্রামে  নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর শহীদ ফয়জুর রহমানের বড় মেয়ে সুফিয়া হায়দারের  সাথে তার বিয়ে হয়। আয়েশা ফয়েজ তার ‘জীবন যে রকম’ বইয়ে  আলী হায়দার খানের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। আয়েশা ফয়েজের বইয়েও স্বামী  ফয়জুর রহমানকে হত্যা বিষয়ে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই এবং তিনি তার বইয়ে মাওলানা সাঈদীর নাম উল্লেখ করেননি পিরোজপুর বিষয়ক কোন ঘটনায়। আয়েশা ফয়েজ তার বইয়ে  স্বামী হত্যার জন্য সরাসরি পাকিস্তানী দুজন সেনা অফিসারকে দায়ী করেছেন। এরা হলেন ব্রিগেডিয়ার আতিক রশিদ এবং ক্যাপ্টেন এজাজ। 

‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র’ প্রামান্য গ্রন্থের  অষ্টম   খন্ডে  ২৪৫  পৃষ্ঠায়  আলী হায়দার খানের লেখাটি  উল্লেখ করা হয়েছে। ১৬/৮/১৯৭৩ তারিখ স্বাক্ষরিত লেখাটি এখানে হুবহু তুলে ধরা হল।

“কর্নেল আতিকের নেতৃত্বে পাক সেনারা  হুলাল হাট (পিরোজপুর) আসে। ঢুকেই ঘরবাড়ি জ্বালাতে থাকে। মুসলিম লীগাররা তাদেরকে স্বাগত জানায়। পাক সেনারা বলে হিন্দু বাড়ি কোথায়? এরপর থেকে

হিন্দু ঘরবাড়ি জ্বালাতে থাকে। লুটপাট, হত্যা অনবরত করতে থাকে। পিরোজপুর মহকুমা প্রশাসক মহিববুল্লাহ শাহ (সিন্ধি, পাকিস্তানের বিশিষ্ট ন্যাপ নেতা বাকের শাহর  ভাইপো) আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সম্পূর্ণ সমর্থক ছিলেন। তিনি বলেছিলেন দোস্ত তোমরাতো স্বাধীনতা পেয়ে যাচ্ছো। আমরা পেলাম না।
৫ ই মে ষড়যন্ত্র করে ওসি (পিরোজপুর থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন) এসডিও আব্দুর রাজ্জাক (২), এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ (৩), মেজিস্ট্রেট মিজানুর রহমানকে ডেকে আনিয়ে মিটিং করে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে।  বাড়িঘর লুট করে।
এরপর অত্যাচার শুরু করে। পিরোজপুরের চৌদ্দআনা ঘুরদুয়ার  ধ্বংস করেছে, লুটপাট করেছে।
পাক সেনারা হুকুম দেয় প্রতি ইউনিয়ন থেকে ২০ জন করে যুবক দিতে হবে। এই মোতাবেক গ্রাম থেকে ধরে ধরে শত শত লোককে হত্যা করেছে। চার হাজারের বেশি লোক পাক সেনারা হত্যা করেছে।  ভাগীরথী নামে স্পাই সন্দেহে ধরে গাড়ির পেছনে বেঁধে সারা শহর  ঘুরিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় বিশিষ্ট ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র গনপতি হালদারকে (মেট্রিকে প্রথম, আইএসসিতে প্রথম) নির্মমভাবে হত্যা করেছে। দৈনিক হত্যা করেছে।
ঘাটের পাড়ে দাড় করিয়ে গুলি  করে হত্যা করেছে। গাছের সাথে বেঁধে বেয়োনেট চার্জ করে হত্যা  করেছে।  চিৎ করে শুইয়ে বাশের গোড়া দিয়ে পিটিয়ে হাড় সম্পূর্ণ ভেঙ্গে গেলে বেয়োনেট দিয়ে হত্যা করেছে। পিটিয়ে অনেককে হত্যা করেছে। বেঁধে পায়ে আগুন চেপে ধরেছে, সুচ ফুটিয়েছে।
এসডিওর বাংলোতে যেখানে পাক ক্যাম্প ছিল সেখানে সেখানে অসংখ্য নারীকে ধর্ষণ করেছে। ফুলু রানী বিশ্বাসের (কলেজ ছাত্রী ) ওপর অমানুষিক দৈহিক নির্যাতনের ফলে তার মুত্যৃ ঘটে। সমস্ত থানাতেই পাক সেনারা ব্যাপক নির্যাতন চালিয়েছে। ”

আলী হায়দার প্রসঙ্গে আয়েশা ফয়েজ তার ‘জীবন যে রকম’ বইয়ে লিখেছেন “....মে মাসের প্রথম দিকে পিরোজপুরের আলী হায়দার খান একটা কাগজ নিয়ে হাজির হল। তাকে কাজলের (হুমায়ূন আহমেদ) আব্বা এক লাইন লিখেছে, আয়েশা এই ছেলেটা যা বলবে তাই করবে। ..আলী হায়দার খান আমাদের সবাইকে নিয়ে বাবলা নামক এক গহিন গ্রামে মুবারক খান নামে এক গ্রাম্য  মাদব্বরের বাসায় পৌছে দিল। বিপদের সময় এগিয়ে আসা এই তরুন অ্যাডভোকেট আমাদের জীবনের সাথে নানাভাবে জড়িত। যুদ্ধের পর তার সাথে আমার বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছি।”

অ্যাডভোকেট আলী হায়দার খান বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করেন। হাইকোর্টে প্রাকটিস করেন তিনি। তাকে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষী মানা  হয়েছিল সরকার পক্ষ থেকে। কিন্তু তাকে কোর্টে আনা হয়নি । মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে  ৪৬ জন সাক্ষী আদৌ হাজির করা সম্ভব নয় বলে সরকার পক্ষ থেকে যে সাক্ষীর তালিকা জমা দেয়া হয়েছিল তাতে অ্যাডভোকেট আলী হায়দার খানের নাম রয়েছে। আল হায়দার খানের স্ত্রী  হুমায়ূন আহমেদের বোন সুফিয়া হায়দার, হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই ড. জাফর ইকবালকেও মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষী করা হয়েছিল। কিন্তু তাদেরও কাউকে আনা  হয়নি সাক্ষ্য দেয়ার  জন্য। তাদের নামও  অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ৪৬ জনের তালিকায়। গত সাত  আগস্ট জেরায় তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন স্বীকার করেছেন আলী হায়দার খান, জাফর ইকবাল, সুফিয়া হায়দারসহ ঢাকায় বসবাসরত অনুপস্থিত কোন সাক্ষীর কাছেই তিনি সমন নিয়ে যাননি তাদের হাজির করার জন্য। ঢাকায় আরো যেসব অনুপস্থিত  সাক্ষী রয়েছে তাদের কারো কাছেই না গিয়ে তাদের আদৌ হাজির করা সম্ভব নয় বলে  দরখাস্তে উল্লেখ করা হয়েছে।  ঢাকায় রয়েছেন কিন্তু আদৌ হাজির করা সম্ভব নয় বলে আরো যেসব সাক্ষী ৪৬ জনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে  তাদের মধ্যে রয়েছেন জাদু শিল্পী জুয়েল আইচ, শাহরিয়ার কবির, সবসেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিন প্রমুখ।

গত ২৪ জুলাই দৈনিক জনতা পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রিপোর্টে  শহীদ ফয়জুর রহমানের ছেলে ড. জাফর ইকবালের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা হয়েছে -আমি আমার পিতার হত্যার বিচার চাই। সাঈদী আমার পিতার হত্যাকারী সেটা আমি জানিইনা। তাহলে কেন আমি সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে যাব?
মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী জানিয়েছেন অ্যাডভোকেট আলী হায়দার খান, সুফিয়া হায়দার এবং ড. জাফর ইকবাল তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন তাতে কোথাও মাওলানা সাঈদীর নাম উল্লেখ করেননি শহীদ ফয়জুর রহমান  হত্যার ব্যাপারে।