ট্রাইব্যুনাল : আলোচনা সমালোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ট্রাইব্যুনাল : আলোচনা সমালোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৩

বাংলাদেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ২০০৯ -স্টিভেন কে কিউসি

১৫/১০/১০
যুগোশ্লাভিয়া এবং  রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনজীবী, যুক্তরাজ্যের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ স্টিভেন  কিউসি বাংলাদেশের  যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বিচারের জন্য প্রণীতি আইন নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করেছেন। বাংলায়  প্রবন্ধটির  পূর্ণ শিরোনাম হল ‘বাংলাদেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ (আদালত) (সংশোধন) এ্যাক্ট ২০০৯’ । এখানে প্রবন্ধটি   ভাষান্তর করে তুলে ধরা  হল। ভাষান্তর করেছেন মেহেদী হাসান।

সংবিধান হল আঠা যা দেশের জনসাধারণকে একসাথে বেঁধে রাখে।  নাগরিকের অধিকার এবং     দায়িত্ব বিষয়ে  এটি সরকার এবং জনগণের মধ্যে একটি চুক্তি যার ওপর ভিত্তি করে সরকার দেশ চালাবে।   সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া বিষয়ে   জাতিসংঘের  বিশেষ সহায়তা  ইউনিটির প্রতি  মহাসচিবের যে  দিক নির্দেশনা রয়েছে তাতেও এ বিষয়টি ফুটে উঠেছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের এ বিশেষ নির্দেশনায় বলা হয়েছে-
“একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপকল্প  রচনার ক্ষেত্রে সংবিধান প্রণয়ন বিশাল সুযোগ এনে দেয়। একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভের ক্ষেত্রে এর গভীর এবং সুদুরপ্রসারী ছাপ পড়ে।”

আন্তর্জাতিক যেসব মানবধিকার সংগঠন এবং অন্যান্য সংস্থা আছে তাদের সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের এ  নির্দেশনা মেনে চলা হয়। জাতিসংঘের রুল অব ল ইউনিটের সহায়তায় ‘রুল অব ল কোঅর্ডিনেশন এন্ড রিসোর্স গ্রুপ’  নামে একটি সমন্বয়ক সংস্থা রয়েছে।  জাতিসংঘের উপমহাসচিব এর চেয়ারম্যান। মানবাধিকার রক্ষা বিষয়ে জাতিসংঘ ঘোষিত যে সার্বজনীন নাগরিক সনদ রয়েছে রাষ্ট্রগুলো যেন তা মেনে চলে তা নিশ্চিত করা এ সংস্থার লক্ষ্য।  এছাড়া রাষ্ট্রগুলোকে এ নাগরিক অধকিার রক্ষায়ও সহয়তা করা হয় এ ইউনিটের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার  বিষয়ক যেসব  চুক্তি এবং ঘোষনা রয়েছে বিভিন্ন দেশের সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে তার একটা প্রভাব আছে এবং এগুলোই হল ন্যায় বিচার  এবং সমঅধিকার  রক্ষা কবচ।

১৯৭২ সালের  সংবিধান
বাংলাদেশের  সংবিধানের একদম শুরুতে প্রস্তবনায় বলা হয়েছে“ আমরা আরো অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক  পদ্ধতিতে এমন এক শোসনমুক্ত সমাজতান্ত্রিক  সমাজ প্রতিষ্ঠা-যেখানে সকল নাগরিকের জন্য  আইনের শাসন, মৌলিক  মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইব্”ে
সংবিধানের সাত ধারায় সংবিধানকে সবার উপরে স্থান দেয়া হয়েছে। গণতন্ত্র  এবং মানবাধিকার রক্ষার জাতীয় অঙ্গীকার ১১ ধারায় উল্লেখ আছে। ‘গণতন্ত্র   ও মানবাধিকার শিরোনামে’  সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে  বলা হয়েছে “প্রজাতন্ত্র  হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক  মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি  শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত  হইবে। এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হাইবে।”


সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ২৭ অনুচ্ছেদে ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’ শিরোনামে  মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে পুনরায় উল্লেখ করে বলা হয়েছে “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।”

২৬ অনুচ্ছেদে আরো বলা হয়েছে “এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসামাঞ্জস্য  সকল  প্রচলিত আইন যতখানি অসামাঞ্জস্যপূর্ণ , এই সংবিধান প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হাইয়া যাইবে (১) । রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসামাঞ্জস্যপূর্ণ কোন  আইন প্রনয়ন  করিবেন না  এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত  যতখানি অসামাঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হাইয়া যাইবে (২)।

তথাপি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সংবিধানে যে প্রথম সংশোধনী আনা হয়  তাতে  সকল নাগরিক সমান- সাম্যের এই   আকাঙ্খা   রহিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী ১৯৭৩
১৯৭৩ সালে সংবিধান সংশোধন  করে ৪৭ অনুচ্ছেদের ৩ উপধারা সংযোজন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে “ এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবাতা বিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক  আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা  বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক ফৌজদারীতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধান সংবলিত কোন আইন বা আইনের বিধান সংবিধানের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য বা পরিপন্থী, এই কারণে বাতিল বা বেআইনী বলিয়া  গণ্য হইবেনা  কিংবা কখনো বাতিল বা বেআইনী হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবেনা।”

যুদ্ধাপরাধের বিচার যাতে কেউ উচ্চ আদালতে  চ্যালেঞ্জ করতে না পারে তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে সংবিধানের এই ধারাটি সংযোজনের মাধ্যমে।

যেমন ৪৭ ক (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে  “এই সংবিধানে যাহা বলা হাইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের  (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়,  এই সংবিধানের  অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবেনা।”
এই ধারার ফলে   ট্রাইব্যুনালের বিচারে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তি  তার নির্দোষীতা প্রমানে উচ্চ আদালতের কাছে বিচার চাইতে পারবেননা।

বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক লোকের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে  এখানে।  যে লোকগুলো এখন পর্যন্ত বিচারে দোষী প্রমানিত হয়নি কেবলমাত্র  অভিযোগ খাড়া করা হয়েছে  তাদের বিরুদ্ধে।

১৯৭৩ সালের সংবিধানে নতুনভাবে সংযোজিত ৪৭  ক (১) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে  সংবিধানে অন্যান্য যেসব মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে তাও কেড়ে নেয়া হয়েছে  নির্দিষ্ট কিছু

লোকের ক্ষেত্রে।  অথচ সংবিধানে বলা হয়েছে সকলেরই আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকার আছে এবং তা রক্ষার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে।

যুদ্ধাপরাধ বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে আটক, আটককৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ, চার্জ গঠন প্রভৃতি ক্ষেত্রে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের যে  বিধান তা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক। এই প্রথমবারের মত বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ‘অসাম্য’  প্রবর্তন করা হল।

বাংলাদেশে প্রথম সংবিধান সংশোধন করা হয় যুদ্ধাপরাধ বিচারকে কেন্দ্র করে


মেহেদী হাসান
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের  লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে ১৮ জুলাই সংসদের একটি আইন পাশ হয়। এর নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস (ট্রাইবিউনালস ) এ্যাক্ট ১৯৭৩’। আইনটি পাশের জন্য বাংলাদেশের সংবিধানের  সংশোধন করতে হয়েছিল। আইনটি পাশ হয় ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই। এর তিনদিন আগে ১৫ জুলাই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রথমবারের মত সংশোধন করা হয়। একটি আইন পাশ করতে সংবিধানে সংশোধনী আনার প্রয়োজন হয়েছিল কেন?

যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে এ পর্যন্ত দেশী বিদেশী যেসব সংস্থা এবং  আইনজ্ঞ  মতামত প্রদান করেছেন তাদের মতে ১৯৭৩ সালের আইনে এমন কিছু ধারা আছে যা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক।  সংবিধানে যে সর্বজনীন মৌলিক মানাবধিকারের ঘোষনা রয়েছে তা   ৭৩ সালের আইনে রহিত করা হয়েছে। সেজন্য ৭৩ সালের আইন পাশ এবং আইনটিকে সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানে সংশোধনী আনতে হয়েছিল। সংবিধান সংশোধন করে ৪৭ (ক) ও ৪৭ (৩ ) নামে দুটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়।  সংবিধান এবং আইনবিশেষজ্ঞদের মতে  এই ধারা দুটি সয়ং সংবিধানের ৩৫, ৩১, ৩৩ এবং ৪৪ ধারা   এবং সংবিধানের  মূল চেতনার পরিপন্থী ও সাংঘর্ষিক।  সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে মানবাধিকার বিষয়ক সংবিধানের বেশ কিছু ধারা অকার্যকর ঘোষনা করা হয়।

আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ স্টিভেন কে কিউসি, টবি ক্যাডম্যান,   বিচারপতি মাইকেল বেলফ,   বিশ্বে আইনজীবীদের সবচেয়ে বড় সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশন (আইবিএ), হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আরো বিভিন্ন  মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সংস্থা এবং আইনবিদদের মতে ১৯৭৩ সালের আইনে বাংলাদেশের সংবিধানে ঘোষিত কিছু মৌলিক অধিকার রহিত করা হয়েছে।  ৭৩ সালের  আইনে এমন কিছু ধারা আছে যা বাংলাদেশের সংবিধান এবং প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার সাথে সাংঘষিক। সেজন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে প্রণীত এ আইনকে যাতে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে না পারে এবং  আইনের অসাংবিধানিক  ধারাগুলোকে সুরক্ষার জন্য সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। 

কী আছে প্রথম সংবিধান  সংশোধনীতে?
সংবিধানে নতুনভাবে সংযোজিত  ৪৭ (৩) ধারায় বলা হয়েছে “ এই সংবিধানে যাহা বলা
হইয়াছে তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবাতা বিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক  আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা  বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক ফৌজদারীতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধান সংবলিত কোন
আইন বা আইনের বিধান সংবিধানের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য বা পরিপন্থী, এই কারণে বাতিল বা বেআইনী বলিয়া  গণ্য হইবেনা  কিংবা কখনো বাতিল বা বেআইনী হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবেনা।”

নতুভাবে সংযোজিত ৪৭ (ক) এ ১ ও ২ নামে দুটি উপধারা রয়েছে। ৪৭ ক (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে  “এই সংবিধানে যাহা বলা হাইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের  (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়,  এই সংবিধানের  অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবেনা।”

৪৭ ক (১) ধারায় বলা হয়েছে “যে বক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) ধারায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়, সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ, ৩৫ অনুচ্ছেদের (১) ও (৩) দফা, এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের অধীনে নিশ্চয়কৃত অধিকারসমূহ প্রযোজ্য ইবেনা। ”

বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে  বলা হয়েছে “অপরাধের দায়যুক্ত কর্মসংঘটনকালে বলবৎ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবেনা  এবং অপরাধ সংঘটনকালে বলবৎ সেই আইনবলে যে দন্ড দেওয়া যাইতে পারিত, তাহাকে তাহার অধিক বা তাহা হইতে ভিন্ন দণ্ড দেওয়া যাইবেনা।”
অর্থাৎ পূর্বে সংঘটিত অপরাধের জন্য পরে আইন করে শাস্তি দেয়া যাবেনা। সংবিধানের এই ৩৫ ধারাসহ  ৩১, ৩৩ এবং ৪৪ ধারায় বর্ণিত আরো কিছু মৌলিক  রহিত করা হয়েছে ১৯৭৩ সালের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে।

বিশেষজ্ঞদের মতে  সংবিধানে ৪৭ (ক) অনুচ্ছেদ সংযোজনের ফলে জুডিশিয়াল রিভিউর অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধের জন্য গঠিত আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যেতে পারবেনা অভিযুক্ত ব্যক্তি।    বাংলাদেশ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বিষয়ে যে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করা হয়েছে তাতে এই  জুডিশিয়াল রিভিউকে সংবিধানের মূল কাঠামো হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর  এই জুৃডিশিয়াল রিভিউর বিধান রাখা হয়নি ১৯৭৩ সালের আইনে। এছাড়া সংবিধান সংশোধন করে ১৯৭৩ সালের আইনকে প্রটেকশন দেয়ার ফলে ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিচারক নিয়োগ এবং রায় নিয়ে কোন আদালতে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবেনা।
যুক্তরাজ্য রানীর সাবেক কাউন্সেলর এবং  বিচারপতি মাইকেল জে বেলফ ১৯৭৩ সালের আইনে জুডিশিয়াল রিভিউ’র ক্ষমতা খর্ব করে  সংবিধানে যে প্রটেকশন দেয়া হয়েছে তাকে অসাংবিধানিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
যুগোশ্লাভিয়া এবং  রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনজীবী, যুক্তরাজ্যের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ স্টিভেন  কিউসি  বলেন,  ১৯৭৩ সালের আইন এবং এ আইনকে সুরক্ষার জন্য যে সংবিধান সংশোধন করা হল তার মাধ্যমে এই প্রথমবারের মত বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ‘অসাম্য’  প্রবর্তন করা হল।
১৯৭৩ সালের সংবিধানে নতুনভাবে সংযোজিত ৪৭  ক (১) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে  সংবিধানে অন্যান্য যেসব মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে তাও কেড়ে নেয়া হয়েছে  নির্দিষ্ট কিছু 

লোকের ক্ষেত্রে। যুদ্ধাপরাধের বিচার যাতে কেউ উচ্চ আদালতে  চ্যালেঞ্জ করতে না পারে তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে সংবিধানের এসব  ধারা সংযোজনের মাধ্যমে।
 ১৯৭৩ সালের সংবিধানে প্রথম যে সংশোধনী আনা হয়েছে তা যে বাংলাদেশের সযং ঐ সংবিধানেরই বিরোধী তা বোঝাতে স্টিভেন  ১৯৭২ সালের সংবিধানের  কয়েকটি ধারা উদাহরণ হিসেবে তুরে ধরেণ। যেমন , সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ২৭ অনুচ্ছেদে ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’ শিরোনামে  মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে পুনরায় উল্লেখ করে বলা হয়েছে “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।”
২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসামাঞ্জস্য  সকল  প্রচলিত আইন যতখানি অসামাঞ্জস্যপূর্ণ , এই সংবিধান প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হাইয়া যাইবে (১) । রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসামাঞ্জস্যপূর্ণ কোন  আইন প্রনয়ন  করিবেন না  এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত  যতখানি অসামাঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হাইয়া যাইবে (২)।
স্টিভেন বলেন, তথাপি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সংবিধানে যে প্রথম সংশোধনী আনা হয়  তাতে  সকল নাগরিক সমান- সাম্যের এই   আকাঙ্খা   রহিত করা হয়েছে।


পূর্বের  অপরাধের বিচার পরে আইন করে করা যায়না
বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে  বলা হয়েছে “অপরাধের দায়যুক্ত কর্মসংঘটনকালে বলবৎ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবেনা  এবং অপরাধ সংঘটনকালে বলবৎ সেই আইনবলে যে দন্ড দেওয়া যাইতে পারিত, তাহাকে তাহার অধিক বা তাহা হইতে ভিন্ন দণ্ড দেওয়া যাইবেনা।”
অর্থাৎ পূর্বে সংঘটিত অপরাধের জন্য পরে আইন করে শাস্তি দেয়া যাবেনা। অপরাধ সংঘটনের সময় বিদ্যমান আইনে যে শাস্তির বিধান থাকে পরে আইন করে তার চেয়ে বেশি শাস্তি দেয়া যায়না। সারা বিশ্বে আইনের মূলনীতি এটি।  বাংলাদেশের সংবিধানেও   নিশ্চয়তা রাখা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৩ সালের সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ৩৫ ধারায় ঘোষিত এ নিশ্চয়তা  অকার্যকর  ঘোষনা করা হয়েছে। কারণ অপরাধ সংঘটন হয়েছে ১৯৭১ সালে। আর অপরাধের বিচারের জন্য আইন করা হয়েছে ১৯৭৩ সালে। পূর্বের অপরাধ পরে  আইন করে বিচারের সুযোগ রাখার জন্য এ সংশোধনী আনা হয়।  আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতি বিরোধী এটি।

যেমন জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০০২ সাল থেকে কার্যকর হয়েছে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত বা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) ।  এ আদালতে ২০০২ সালের পূর্বে সংঘটিত কোন অপরাধের বিচার করা যাবেনা। ২০০৯ সালের  ডিসেম্বর মাসে আইসিসির প্রধান বিচারপতি স্যাং হুন সং বাংলাদেশ সফরের সময় বলেছেন, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা এবং সে সুযোগও নেই।  সরকারকে ডিঙ্গিয়ে ৩৮ বছর আগের বিষয় নিয়ে কাজ করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পরেনা।
(প্রবন্ধটি 2010 সালের কোন এক সময় লেখা)

ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) ও ১৯৭৩ সালের আইনের তুলনা

Mehedy Hasan
জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০০২ সাল থেকে কার্যকর হয়েছে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত বা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) ।  জেনেভার হেগে অবস্থিত এ   আন্তর্জাতিক আদালত চারটি বিষয়ে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। এগুলো হল গণহত্যা,  মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ  এবং আগ্রাসনমূল অপরাধ । বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালের নাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অর্থাৎ বাংলাদেশের এ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক কিছু অপরাধের যথা গনহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ। বাংলাদেশের ১৯৭৩ সালের অপরাধ আইনের সাথে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তিনটি বিষয়ে মিল রয়েছে যথা গণহত্যা,  মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ  । বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালে যেহেতু বিচার্য প্রধান তিনটি বিষয়ে মিল রয়েছে আন্তর্জাতিক আদালতের সাথে তাই  আন্তর্জাতিক আদালতের তুলনায় বাংলাদেশের  আইনের তুলনা করা এবং দুর্বলতাগুলো খুব সহজেই চোখে পড়ছে সবার। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিধানাবলীকে ভিত্তি বা স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে  ধরে  বাংলাদেশের অপরাধ আইনের  সমালোচনা করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং  আইনবিশেষজ্ঞরা।

এ প্রতিবেদনে  আন্তর্জাতিক আদালতের সাথে বাংলাদেশের ১৯৭৩ সালের আইনের কিছু তুলনা তুলে ধরা হয়েছে। তবে তার আগে আন্তর্জাতিক আদালাতের বিষয়ে সামান্য আলোকপাত করা দরকার।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে  সংঘটিত  মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা যাতে পার পেয়ে না যায় সেজন্য একটি আন্তর্জাতিক আদালত প্রতিষ্ঠার দাবী ওঠে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। এ পেক্ষাপটে ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই ইতালীর রোমে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে  যা রোম সংবিধি বা রোম স্ট্যটিউট নামে পরিচিত। এ রোম সংবিধির অধীনেই প্রতিষ্ঠা করা হয় আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি)। আদালত প্রতিষ্ঠার সময় শর্ত দেয়া হয় বিশ্বের ৬০টি দেশ যখন এর পূর্ণাঙ্গ সদস্য হবে তখন থেকে এ আদলত কার্যকর হবে। ২০০২ সালের এপ্রিল মাসে এর সদস্য সংখ্যা ৬০  উন্নীত হয় এবং  ঐ বছরই ১ জুলাই থেকে এ আদালতের বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশ এ রোম সংবিধিতে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ তবে পূর্ণ সদস্য হবার জন্য যে রেটিফিকেশন বা অনুস্বাক্ষর করা দরকার তা করেনি।

কেবলমাত্র এ আদালত কার্যকর হবার দিন থেকে যদি কোথাও  এ ধরণের অপরাধ ঘটে তবে এ আদালত তার বিচার করতে পারবে। আদালত প্রতিষ্ঠার  আগে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার বিচারের ক্ষমতা নেই এ আদালতের। এছাড়া অন্য কোন অপরাধের ক্ষেত্রে   যে রাষ্ট্রে ঐ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে দেশ যদি তার বিচার করে সেক্ষেত্রে এ আদালত আগ বাড়িয়ে কোন হস্তক্ষেপ করবেনা। সংশ্লিষ্ট দেশ  যদি বিচার  না করে এবং সদস্য রাষ্ট্র  যদি বিচারের জন্য আবেদন করে তবেই কেবল শেষ আশ্রয় হিসেবে এ আদালত তার বিচারের উদ্যোগ নেবে।
বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়টি সামনে আসায় শুরুতে অনেকেই এ আদালতের সাহয্য নেয়া বা এ আদালতের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে কথা বলেন। তবে ২০০৯ সালের  ডিসেম্বর মাসে

আইসিসির প্রধান বিচারপতি স্যাং হুন সং বাংলাদেশ সফরের সময় বলেছেন, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা এবং সে সুযোগও নেই।  সরকারকে ডিঙ্গিয়ে ৩৮ বছর আগের বিষয় নিয়ে কাজ করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা।  এরপর থেকে এ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

আইসিসির বিচারিক ক্ষমতা

আন্তর্জাতিক ফৌজদারি  আদালত (আইসিসি)  বিশ্বের বিভিন্ন  প্রান্তে সংঘটিত চারটি বড় ধরণের অপরাধের বিচার করতে পারবে। এগুলো হল
১.    গণহত্যা
২.    মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ
৩.    যুদ্ধাপরাধ এবং
৪.    আগ্রাসনজনিত অপরাধ

গণহত্যা
কোন জাতি, গোষ্ঠী, বর্ণ এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে আংশিক বা পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের বিরুদ্ধে নিচের যেকোন একটি অপরাধমূলক কাজ পরিচালনা করলে তা গণহত্যার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে যথা-

ক. কোন সম্প্রদায় বা শ্রেণীর  সদস্যদের হত্যা করা
খ. সম্প্রদায় বা শ্রেণীর  সদস্যদের শারিরীক এবং মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতি
    করা
গ. আংশিক বা পুরোপুরিভাবে কোন শ্রেণীকে ধ্বংস করার জন্য তাদের ওপর কোনকিছু
    চাপিয়ে দেয় বা জীবন বিপন্ন করে তোলার ব্যবস্থা করা।
ঘ. জন্মহার নিয়ন্ত্রন করার জন্য কোন পদ্ধতি  চাপিয়ে দিয়ে তাদের  নির্মূলের কৌশল গ্রহণ করা
ঙ. শিশুদের জোরপূর্বক এক গ্রুপ থেকে অন্য গ্রুপে স্থানান্তর করা।

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ
বেসামরিক জনসাধারণের ওপর যখন পদ্ধতিগতভাবে বা  ব্যাপকভাবে নিচের যেকোন একটি অপরাধমূলক কর্মকান্ড  পরিচালনা করা হয় তখন তাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে চিহ্ণিত করা হবে যথা-

ক. হত্যা
খ. খাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ থেকে বঞ্চিত করে বিনাস/ধ্বংস/ উচ্ছেদ করা
গ. দাসত্ব করতে বাধ্য করা
ঘ. জোরপূর্বক জনসাধারণকে অন্যত্র স্থানান্তর বা দ্বীপান্তর করা
ঙ. অবরোধ করে  রাখা এবং  জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক  উপাদান থেকে বঞ্চিত করা
চ. নির্যাতন চালানো
ছ. ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা। কোন  জাতিকে দূষিত করা বা তাদের
   মধ্যে অন্য জাতির বিস্তার ঘটানোর  লক্ষ্যে  গণহারে নারীদের ধর্ষণ করে  জোরপূর্বক  গর্ভধারণ
    করানো।  বন্ধ্যাকরণ করা বা অন্য যেকোন ধরণের যৌন অপরাধ
জ. ধর্ম, বর্ণ, গোত্র,  জাতীয়তা, লিঙ্গ বা অন্য কোন কারণে  বৈষম্য, হয়রানি  এবং
   অবমূল্যায়ন করা
ঝ.    রাষ্ট্রীয় সমর্থনে গনগ্রেফতার , অপহরন করে জোরপূর্বক নিরুদ্দেশ  করা
ঞ.    বর্ণবাদের অপরাধ
ট.    অন্য যেকোন অমানবিক অপরাধ

যুদ্ধাপরাধ
ক. জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘন করে সংঘটিত   নিম্নের যেকোন অপরাধ যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গন্য হবে যথা-

১.    ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা
২.    ল্যাবরেটরিতে জীবন নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষাসহ নির্যাতন, অমনাবিক আচরণ করা যা কোন মেডিক্যাল সাসেন্স স্বীকৃত নয়
৩.    ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে কষ্ট দেয়া, আহত করা বা স্বাস্থ্যহানী ঘটানো।
৪.    বেআইনী এবং নির্মমভাবে সম্পত্তির ধ্বংস সাধন এবং অপব্যবহার
৫.    যুদ্ধবন্দীদের বা অন্য বন্দীদেরকে শত্রু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা
৬.    যুদ্ধবন্দী বা অন্য বন্দীদেরকে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত করা।
৭.    বেআইনীভঅবে দ্বীপান্তর, স্থানান্তর বা  আবদ্ধ করা
৮.    বন্দীদের জিম্মী হিসেবে ব্যবহার

খ. আন্তর্জাতিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে যেসব আইন এবং রীতিনীতি আছে তা ভঙ্গ করা যেমন:
১. বেসরমারিক নাগরিক অথবা অন্য ব্যক্তিবর্গ যারা যুদ্ধ বা সংঘাতে জড়িত নয় তাদের
    ওপর       ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমন পরিচালনা করা
২. বেসাসমরিক নাগরিকদের পন্য দ্রব্য বা এমন বস্তু যা যুদ্ধ সরঞ্জাম নয় তার ওপর
    ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমন পরিচালনা করা
৩. উদ্ধারকারী দল, স্থাপনা,  পন্যদ্রব্য, বেসামরিক বা মানবিক কাজে ব্যবহৃত যানবাহন বা
    টিম, শান্তিরক্ষা মিশনের ওপর  ইচ্ছাকৃত আক্রমন পরিচালনা।
৪. বেসরমাকি ব্যক্তিবর্গের জীবনহানি ঘটায়, সহায় সম্পত্তি ধ্বংস করে, স্বল্প এবং দীর্ঘ
    মেয়াদে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, প্রাকৃতিক  পরিবেশ বিপন্ন করে এমন কোন হামলা
    ইচ্ছাতৃতভাবে পরিচালনা করলে।
৫. বেসামরিক ভবন, শহর, গ্রাম এবং  আবাসিক এলাকায় বোমা হামলা  বা আক্রমন 
    পরিচালনা করলে।
৬. আত্মসমপর্ণকারী সৈন্য, বা নিরস্ত্র সৈন্যকে হত্যা বা আহত করা।
৭.  যুদ্ধ বিরতীর পতাকা, সেনা পোশাক, ব্যাজ এবং অন্যান্য সামরিক প্রতীকের প্রতরাণাপূর্ণ
     ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করা
৯.    দখলদার শক্তি কর্তৃক সেখানকার অধিবাসীদের নিজভূমি থেকে বিতদাড়ন করা
    ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঐতিহাসিক স্থাপনা, দাতব্য সংস্থা, হাসপাতাল,
        আশ্রমে ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা চালানো
১০.    বন্দীদের ওপর বেজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো
১১.    প্রতারণামূলকভাবে বন্দীদের হত্যা করা
১২.    বন্দীদেরকে তাদের নিজ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা
১৩.    জীবানু অস্ত্র ব্যবহার বা কারো ওপর প্রয়োগ করা
১৪.    ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা, জাতিকে দূষিত বা এক জাতি থেকে অন্য জাতিতে রূপান্তরের জন্য নারীদের ধর্ষণ করে  জোরপূর্বক  গর্ভধারণ করানো, বন্ধ্যাকরণ করা বা অন্য যেকোন ধরণের যৌন অপরাধ ।
১৫.    নিরাপদ জোনে হামলা চালানো
১৬.    ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা, খাদ্য বহনে বাধা দেয়া
১৭.    ১৫ বছরের নিচের শিশুদের দিয়ে যুদ্ধ করানো

কমান্ডার এবং অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়দায়িত্ব

কমান্ডারের অধীনস্ত সৈনিকদের মাধ্যমে যদি কোন অপরাধমূলক কর্মকান্ড সংঘটিত হয়  তবে হুকুমদাতা হিসেবে তার দায়দায়িত্ব কমান্ডারের ওপর বর্তাবে। কমান্ডারের অধীনস্তদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ কমান্ডারের হুকুমে হয়েছে অথবা তার নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারনে হয়েছে বলে গণ্য করা হবে।

উর্ধ্বতনের নির্দেশ এবং আইনের অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা

সরকার বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে ( সামরিক বা বেসমারিক যা-ই হোক না কেন ) কেউ যদি  যুদ্ধাপরাধের মত কোন অপরাধ করে তবে সেক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি এর দায় থেকে অব্যাহতি পাবে যদি-

ক. সরকার বা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানতে তিনি  আইনগতভাবে বাধ্য থাকেন
খ. তিনি যে আদেশ মানছেন তা যে বেআইনী তা যদি তিনি অবহিত না থাকেন
গ.  আদেশ যে বেআইনী বা অবৈধ তা যদি প্রকাশ করা না হয়

এক নজরে যুদ্ধাপরাধ এ্যাক্ট


 মেহেদী হাসান
নাম:        দি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইবিউনালস) (এমেন্ডমেন্ট) এ্যাক্ট ২০০৯
            (১৯৭৩ সালে দি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইবিউনাল) এ্যাক্ট প্রণীত হয়।
             ২০০৯  সালের ৮ জুলাই সংশোধন করা হয়।)

আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: গণহত্যা, মানবতা বিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও  আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির আটক, বিচার  শাস্তি বিধানের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে এ এ্যাক্ট প্রণীত হয়।

শাস্তি: এই এ্যাক্টের অধীনে প্রতিষ্ঠিত আদালত অপরাধীর সবোর্চচ্চ শাস্তি মুত্যদণ্ড প্রদান
       করতে পারবে।
বিচারের আওতা: এই  এ্যাক্টের অধীনে প্রতিষ্ঠিত আদালত মূলত চারটি অপরাধের বিচার
                    করবে। এগুলো হল-মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে
                    অপরাধ,গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধ। সশস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনী বা
                    সহায়ক বাহিনীর সদস্য ছাড়াও কোন একক ব্যক্তি বা ব্যাক্তিগোষ্ঠীকেও 
                    বিচারের আওতায় আনা যাবে।

অপরাধের সংজ্ঞা:
১. মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ:  হত্যা,  দাসত্ব করতে বাধ্য করা, জোরপূর্বক জনসাধারণকে অন্যত্র স্থানান্তর বা দ্বীপান্তর করা, অবরোধ করে  রাখা, নির্যাতন চালানো,
ধর্ষণ, অপহরণ এবং রাজনৈতিক, ধর্ম, বর্ণ বা  অন্য কোন কারণে বেসরমারিক জনসধারণের বিরুদ্ধে অন্য যেকোন অনমানবিক অপরাধ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। 
২. শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ: আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে আগ্রাসনমূলক যুদ্ধের জন্য  পরিকল্পনা ও  প্রস্তুতি
৩. গণহত্যা: কোন জাতি, গোষ্ঠী, বর্ণ এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে আংশিক বা পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের বিরুদ্ধে নিচের যেকোন একটি অপরাধমূলক কাজ পরিচালনা করলে তা গণহত্যার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে যথা-
ক. কোন সম্প্রদায় বা শ্রেণীর  সদস্যদের হত্যা করা
খ. সম্প্রদায় বা শ্রেণীর  সদস্যদের শারিরীক এবং মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতি
    করা
গ. আংশিক বা পুরোপুরিভাবে কোন শ্রেণীকে ধ্বংস করার জন্য তাদের ওপর কোনকিছু 
    চাপিয়ে দেয় বা জীবন বিপন্ন করে তোলার ব্যবস্থা করা।
ঘ. জন্মহার নিয়ন্ত্রন করার জন্য কোন পদ্ধতি  চাপিয়ে দিয়ে তাদের  নির্মূলের কৌশল গ্রহণ করা
ঙ. শিশুদের জোরপূর্বক এক গ্রুপ থেকে অন্য গ্রুপে স্থানান্তর করা।
৪. যুদ্ধাপরাধ:  যুদ্ধের আইন এবং রীতি লঙ্ঘন করে কাউকে হত্যা করা, দাসে পরিণত করা, যুদ্ধ বন্দীকে হত্যা করা, রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি দখল করা, শহর, নগর এবং বন্দরে নির্মম ধ্বংস লীলা পরিচালনা করা।

আদালত:
এক বা একাধিক আদালত স্থাপন করা যাবে এই এ্যাক্টের অধীনে। প্রতি আদালতে একজন চেয়ারম্যান এবং সদস্য সংখ্যা দুই এর কম এবং চারজনের বেশি হবেনা।  বাংলাদেশের সুপ্রীম কোটের বিচারপতি হবার যোগ্য যেকোন বিচারপতি চেয়ারম্যান বা সদস্য হিসেবে নিয়োগ   করা যাবে।

রুলস অব এভিডেন্স: সংবাদপত্র বা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত খবর, ছবি এবং ক্যামেরায় ধারণ করা চিত্র বা  রেকডির্ং  অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমান হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে। এসনকি মৃত্যবরণকারী কোন ব্যক্তির অতীতে রেকর্ড করা বক্তব্যও প্রমান হিসেবে আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে। বিচারের আগে জিজ্ঞাসাবাদের সময় যেকোন প্রথম শ্রেণীর মেজিস্ট্রেট তার অভিযুক্তের জবানবন্দী রেকর্ড করতে পারবে।

১৯৭৩ সালের আইনের সংশোধন:
১৯৭৩ সালের আইনে  সশস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনী বা
                    সহায়ক বাহিনীর সদস্যদের বিচার করার কথা বলা হয়। পরে ২০০৯ সালের
                      সংশোধনীতে ‘কোন একক ব্যক্তি বা ব্যাক্তিগোষ্ঠীকেও  (ইন্ডিভিজুয়াল অর  গ্রুপ অব
                     ইন্ডিভিজুয়ালস)                       বিচারের আওতায় আনা যাবে’ কথাগুলো যোগ রা  
                    হয় । এ সংশোধনীর   মাধ্যমে বাংলাদেশী লোকজনের বিচারের উদ্যোগ নেয়া
                     হয়েছে।

বিচারের নামে প্রহসনের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ-জন কামেহ

বিশিষ্ট বৃটিশ  আইন বিশেষজ্ঞ জন কামেহ বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) গঠন এবং কিছু সংখ্যক বিরোধী দলীয় রাজনীতিবিদকে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের জন্য অভিযুক্ত করে তাদের বিচারের নামে বড় ধরনের প্রহসনের আয়োজন করেছে। এ বিচার সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত।  ট্রাইব্যুনালে যাদের বিচারক ও প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের অনেকেই এর আগে গণ আদালত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে  রায় প্রদানের সাথে জড়িত ছিলেন।

গত ১৯ মে  ২০১১ ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত আমেরিকান সোসাইটি অব ইন্টারন্যাশনাল ল’ সদর দফতরে বাংলাদেশে গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল  বিষয়ে আয়োজিত  আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন। তিনি  বলেন, সাধারণ ক্ষমার ঘোষনা উপেক্ষা করে ৪০ বছর পর তাদের বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য। বাংলাদেশ সরকার ট্রাইব্যুনালকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছে। তিনি বলেন ১০ মাস ধরে ৫ জন নেতাকে আটক করে রাখা হয়েছে এবং তাদের আটক করা হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কারনে। বর্তমানে যে কারণ দেখিয়ে  তাদের আটক রাখা হয়েছে সেই কারনের সাথে গ্রেফতারের কোন সম্পর্ক ছিলনা। ১০ মাস পরও তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে । তদন্ত কর্মকর্তারা জেরার মাঝখানে এসে সাংবাদিকদের ব্রিফিং দিচ্ছে অপরাধীরা দোষ স্বীকার করেছে বলে। কিন্তু তার কোন রেকর্ড নেই।

জন কামেহ প্রশ্ন করে বলেন, কিভাবে তদন্ত কর্মকর্তারা মাঝখানে সাংবাদিকদের ব্রিফিং দিতে পারেণ।  বিচার কাজে কি এর কোন প্রভাব পড়বেনা? এমন পরিস্থিতিতে অন্য দেশে বিচার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে  এবং  এ ধরনের আচরনের জন্য আদালত অবমাননার  অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।

তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল কি স্বাধীন। বিচারক, প্রসিকিউটর, তদন্ত কর্মকর্তা সবাই সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত। কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ রাখা হয়নি।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিচার আমদানী করেছে আর আন্তর্জাতিক রীতিনীত রপ্তানি করেছে -স্টিভেন কে কিউসি

যুগোশ্লাভিয়া এবং  রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনজীবী, যুক্তরাজ্যের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ স্টিভেন  কিউসি বাংলাদেশের  যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বিচারের জন্য প্রণীতি আইন নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করেছেন। বাংলায়  প্রবন্ধটির  পূর্ণ শিরোনাম হল ‘বাংলাদেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ (আদালত) (সংশোধন) এ্যাক্ট ২০০৯’ ।  এ প্রবন্ধে তিনি বলেন,  ১৯৭৩ সালের যুদ্ধাপরাধ আইন প্রণয়ন এবং এ আইনকে সুরক্ষার জন্য সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রথমবারের মত বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ‘অসাম্য’  প্রবর্তন করা হল। তিনি বলেন,  ১৯৭৩ সালে সংবিধান সংশোধন করে ৪৭ (৩) ও ৪৭ (ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে কিছু কিছু লোকের ক্ষেত্রে  সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সংবিধানে যে প্রথম সংশোধনী আনা হয়  তাতে  সকল নাগরিক সমান- সাম্যের এই   আকাঙ্খা   রহিত করা হয়েছে।

অন্যত্র স্টিভেন বলেন, “বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ আইনী কাঠামোর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আমদানি করেছে এবং একই সময় অভিযুক্তদের যেসব অধিকার রয়েছে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদের যেসব স্বীকৃত নিয়মনীতি রয়েছে সেগুলো রপ্তানি করে দিয়েছে। এবং আপনি এর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ  তুলতে পারবেননা। তারা খুবই অদ্ভুত একটি আদালত স্থাপন করেছে যেখানে অভিযুক্তদের অধিকার  হরণ করা হয়েছে।”

স্টিভেন তার প্রবন্ধে বলেন,  ১৯৭৩ সালের আইনকে প্রটেকশন দেয়ার জন্য সংবিধানে নতুন ধারা সংযোজন বাংলাদেশের সংবিধানম প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক।   তিনি ৭২ সালের সংবিধান থেকে উদাহরন দিয়ে  বলেন, সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ২৭ অনুচ্ছেদে ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’ শিরোনামে  মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে পুনরায় উল্লেখ করে বলা হয়েছে “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।”

২৬ অনুচ্ছেদে আরো বলা হয়েছে “এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসামাঞ্জস্য  সকল  প্রচলিত আইন যতখানি অসামাঞ্জস্যপূর্ণ , এই সংবিধান প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হাইয়া যাইবে (১) । রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসামাঞ্জস্যপূর্ণ কোন  আইন প্রনয়ন  করিবেন না  এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত  যতখানি অসামাঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হাইয়া যাইবে (২)।

তথাপি ১৯৭৩ সালে সংবিধান সংশোধন  করে ৪৭ অনুচ্ছেদের ৩ উপধারা সংযোজন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে “ এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবাতা বিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক  আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা  বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক ফৌজদারীতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধান সংবলিত কোন আইন বা আইনের বিধান সংবিধানের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য বা পরিপন্থী, এই কারণে বাতিল বা বেআইনী বলিয়া  গণ্য হইবেনা  কিংবা কখনো বাতিল বা বেআইনী হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবেনা।”

তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার যাতে কেউ উচ্চ আদালতে  চ্যালেঞ্জ করতে না পারে তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে সংবিধানের এই ধারাটি সংযোজনের মাধ্যমে।

যেমন ৪৭ ক (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে  “এই সংবিধানে যাহা বলা হাইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের  (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়,  এই সংবিধানের  অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবেনা।”
এই ধারার ফলে   ট্রাইব্যুনালের বিচারে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তি  তার নির্দোষীতা প্রমানে উচ্চ আদালতের কাছে বিচার চাইতে পারবেননা।

বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক লোকের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে  এখানে।

যুদ্ধাপরাধ আদালত বিষয়ে আইসিটিজে’র চিঠি আইনমন্ত্রী বরাবর// বিদ্যমান আইন ন্যায় বিচারের মানদণ্ড পূরন করেনা

১৭/৪/১১
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ট্রানজিশনাল জাস্টিস (আইসিটিজে) এর পক্ষ থেকে  বলা হয়েছে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচার  আইন ন্যায় বিচারের মানদণ্ড পূরণ করেনা। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে  আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত  যেসব  মৌলিক অধিকার  রয়েছে তার অনেক কিছুই অনুপস্থিতি বাংলাদেশের আইনে।

আইসটিজে’র সভাপতি ডেভিড টোলবার কর্তক আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক   মন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমেদ বরাবার লিখিত এক চিঠিতে একথা বলা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে বিদ্যমান আইনী কাঠামোতে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য যেসব অধিকার রয়েছে তা পাওয়া সম্ভব নয়। বিদ্যমান  আদালতে  যেসব অপরাধের বিচার করা হবে সে বিষয়গুলো স্পষ্ট করা হয়নি। অপরাধকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। অথচ আদালতের বিচারিক ক্ষমতা, এখতিয়ার  এবং আওতা নিভর  করে এসবের ওপর।  চিঠিতে বলা হয়েছে, নাগরিকদের নির্বিচারে গ্রেপতার  করার অধিকার রাষ্ট্রকে দেয়া হয়নি। কেবলমাত্র  যৌক্তিক এবং সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগেই আদালত কাউকে গ্রেফতারের আদেশ দিতে পারে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে  অভিযুক্ত ব্যক্তির যেসব ন্যূনতম মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা রয়েছে তার তুলনায় বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনটিতে অনেক ঘাটতি রয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে এ বিষয়টি  উপেক্ষিত  রয়ে গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তির মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হতে পারে।

যুদ্ধাপরাধ বিচার আইন তথা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল এর সংশোধনের  দাবি জানিয়েছেন ডেভিড টোলবার। সেইসাথে অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার রক্ষা এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে তার চিঠিতে।

আইনের শাসন, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অভিযুক্তদের অধিকার রক্ষায় এ্যডভোকেসি হিসেবে কাজ করে আসছে আইসিটিজে। গত ১৫ মার্চ এ সংস্থা  বাংলাদেশের আইনমন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়েয়েছে যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে তাদের অভিমত ব্যক্ত করে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যাতে ন্যায় বিচার পায় তার সকল নিশ্চয়তা বিধানের ব্যবস্থা করতে হবে বাংলাদেশকে।  যুদ্ধাপরাধ আইনের ইতোমধ্যে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে তাতে অভিযুক্তদের জন্য কিছু কিছু সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।  কিন্তু তারপরও   আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে  অভিযুক্ত ব্যক্তির যেসব ন্যূনতম মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা রয়েছে তার তুলনায় বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনটিতে অনেক ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়টি  উপেক্ষিত  রয়ে গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তির মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের বিচার প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন ুন্ন হবে তেমনি বিচার  প্রকৃয়ারও বৈধতা  এবং আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে।  এতে করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন থাকবেনা বিচারের প্রতি।



 চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল কনভেন্ট অন সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটস এ চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।  আন্তর্জাতিক এ চুক্তির ১৪ ধারা মোতাবেক  যেকোন ফেজাদরী বিচাররের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায় বিচার প্রাাপ্তির লক্ষ্যে  তার সকল অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।  কিন্তু ঘটনা  হল  যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের  কিছু কিছু অধিকার বাংলাদেশের সংবিধানে রহিত করা হয়েছে বলে  দেখা যাচ্ছে।  বিদ্যমান যুদ্ধাপরাধ আইন এবং আইনী কাঠামো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে আইসিটিজে’র পক্ষ থেকে। সে আলোকে ১০৭১ সালে  পরিচালিত বর্বরতার  শাস্তি বিধানের  ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, বিচারকে আন্তর্জাতকিভাবে গ্রহনযোগ্য এবং  এটি যাতে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ   করে সেজন্য আইসিটিজে’র পক্ষ থেকে কতিপয় প্রস্তাব করা হয়েছে বলে চিঠিতে বলা হয়েছে। প্রস্তাবগুলো নিন্মরূপ

বৈধতার মূলনীতি: যে আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধের বিচার কাজ চলছে সে আইনে অপরাধসমূহকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। আদালতের আওতা বা বিচারিক  ক্ষমতা  নির্দিষ্ট করতে হলে অপরাধকেও সঠিকভাবে বর্ণনা করা এবং নির্দিষ্ট করা দরকার। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কি কি অভিযোগ আনা হয়েছে  সে বিষয়ে যাতে সে  ভাল করে বুঝতে পারে এবং নিজেকে অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রস্তুত করতে যথেষ্ট সময় পান সেজন্য আদালতের আওতা  বা বিচারিক ক্ষমতা অবশ্যই সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। ঐ অআদালত কি কি অপরাধের বিচার করতে পারবে সে বিষয়ে স্পষ্ট বর্ণনা থাকতে হবে। অপরাধের উপাদান কি কি, ব্যক্তিগত অপরাধের দায়দায়িত্ব এবং যে সময়ে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেই সময়ে  অভিযুক্ত’র পক্ষে কি কি গ্রহণযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল  সেসব বিষয় স্পষ্ট  করে উল্লেখ থাকতে  হবে। আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুযায়ী  বিচার সংক্রান্ত  যেকোন বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আপত্তি উত্থাপনের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে এবং  রায়ের বিরুদ্ধে জুড়িশিয়াল রিভিউর সুযোগ থাকতে হবে। 

নির্বিচার গ্রেফতার ঠেকাতে পদক্ষেপ: নির্বিচারে কাউকে গ্রেফতারের অধিকার রাষ্ট্রের নেই এবং  কোন সরকারের এ ধরণের অপরাধ ঠেকাতে রাষ্ট্রের আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করা দরকার। রাষ্ট্র  কর্তৃক নাগরিকদের  নির্বিচারে গ্রেফতার  এখন একটি উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ বিচার আইনে  বলা হয়েছে যে কাউকে  জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনে আটক বা গ্রেফতার করা যেতে পারে। তবে কেবলমাত্র  যৌক্তিক এবং সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগেই আদালত কাউকে গ্রেফতারের আদেশ দিতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে  কি কি অভিযোগ রয়েছে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নোটিশ জারি করা, অভিযোগের ভিত্তি কি  এবং আটককৃতদের জুড়িশিয়াল রিভিউর সুযোগ আইনে অন্তর্ভুক্ত  করতে হবে।

ন্যায় বিচারের অধিকার এবং সঠিক  বিচার প্রকৃয়ার নিশ্চয়তা: বিদ্যমান বিচার কাঠামোতে বিচারের পূর্বে এবং বিচারের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে  যেসব টেকনিক্যায় সুরক্ষা এবং অধিকার থাকা দরকার অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য তার কোন নিশ্চয়তা বিধান করা হয়নি। ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তার আইনজীবীর সাথে পর্যাপ্ত দেখা সাক্ষাত, পরামর্শ গ্রহণ, প্রস্তুতি গ্রহণ এবং অভিযোগ বিষয়ে সুষ্পষ্ট করে জানা অতিশয় জরুরি। অভিযুকক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যেসব স্বাক্ষ্য প্রমান  হাজির করা হবে সেসব যথাযথ প্রকৃয়ায় পরীক্ষা নিরীক্ষা হতে হবে এবং এসবের রিবুদ্ধে জুড়িশিয়াল রিভিউর অধিকার থাকতে হবে অভিযুক্ত ব্যক্তির।  নিজেকে নির্দোষী প্রমানের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনে যে মান দণ্ড ঠিক করা আছে সে বিষয়টি  বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচার আইন এবং আইনের বিধিবিধানে  সঠিকভাবে অন্তভুক্ত করা হয়নি। সমস্ত অভিযুক্ত এবং এর মধ্যে যারা  আটককৃত রয়েছে তাদের সকলেরই ন্যায় বিচার পাবার লক্ষ্যে যেসব টেকনিক্যাল সুরক্ষার বিধান আছে তার  নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।




সমতা: বিদ্যমান আইনী কাঠামোয় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রস্তুতকরণ, সার্বিক আইনী প্রকৃয়া মোকাবেলা, সাক্ষ্যসাবদু সংগ্রহ প্রভৃতির জন্য প্রস্তুতি নিতে যে সময় দরকার তা প্রদান করা হয়নি। অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে  অভিযুক্ত এবং তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা, অভিযুক্ত  এবং স্বাক্ষীর সুরক্ষা, পূর্বে ক্ষমাপ্রাপ্তি  এবং বর্তমান বিচার প্রকৃয়ার মধ্যে সম্পর্ক প্রভৃতি বিষয়ে ব্যাখ্যা থাকতে হবে।

এই সাথে আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলতে চাই যে, আমরা ফৌজদারী বিচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ড   বিধানের বিরুদ্ধে। যেখানে  ন্যায় বিচারের নিশ্চয়তা নেই সেখানে মৃত্যুদন্ড ব্যবস্থা থাকা সত্যিই একটি হুমকি।
 চিঠিতে  বলা হয়েছে, আইসিটিজে’র পক্ষ থেকে উপরে যেসব সমস্যা বর্নিত হল তার আলোকে আমরা বাংলাদেশের আইনটি সংশোধনের দাবি করছি।  যুদ্ধাপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইসিটিজে সার্বিক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশকে।  এ বিষয়ে বিভিন্ন দেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে  আমাদের। 


যুদ্ধাপরাধ বিচার// শুধু আইন নয় এবার সংবিধান সংশোধনেরও দাবি// কী আছে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান সংশোধনীতে?

২০/৫/১১


মেহেদী হাসান
যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের  বিচারের জন্য প্রণীত ১৯৭৩ সালের আইন  সংশোধনের সাথে এবার বাংলাদেশের সংবিধান পরিবর্তনেরও দাবি জানানো হয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এবং আইনজ্ঞদের পক্ষ থেকে। যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে সর্বশেষ  গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর লিখিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে লেখা চিঠিতে বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৭(ক) ধারা বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।  এছাড়া যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ রাষ্ট্রদূত গত ২১ মার্চ বাংলাদেশের কাছে  সুপারিশসংবলিত যে দীর্ঘ চিঠি পাঠিয়েছেন তাতেও অপরাধের সংজ্ঞা নির্ধারণ, অভিযুক্তদের অধিকার রক্ষাসহ অনেকগুলো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধানে নতুন কিছু ধারা সংযোজনের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায়  নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার সম্ভব হবেনা বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তারা।

যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে এ পর্যন্ত দেশী বিদেশী যেসব সংস্থা এবং  আইনজ্ঞ  মতামত প্রদান করেছেন তাদের মতে ১৯৭৩ সালের আইনে এমন কিছু ধারা আছে যা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। সংবিধানে যে সর্বজনীন মৌলিক মানাবধিকারের ঘোষনা রয়েছে তা   ৭৩ সালের আইনে রহিত করা হয়েছে। সেজন্য ৭৩ সালের আইন পাশ এবং আইনটিকে সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানে সংশোধনী আনতে হয়েছিল। ৪৭ (ক) ও ৪৭ (৩ ) নামে দুটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়।  সংবিধান এবং আইনবিশেষজ্ঞদের মতে  এই ধারা দুটি সয়ং সংবিধানের ৩৫ ধারা  এবং সংবিধানের  মূল চেতনার পরিপন্থী ও সাংঘর্ষিক। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের চিঠিতে বলা হয়েছে ১৯৭৩ সালের আইন, আইনের বিধি বিধান এবং সংবিধানের  ৪৭ (ক) ধারা বাতিল না করলে  যুদ্ধাপরাধ বিচার নিরপেক্ষ এবং  আন্তর্জাতিক মানের হবেনা।

প্রথম সংবিধান সংশোধন ও যুদ্ধাপরাধ: যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের  লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে ২০ জুলাই সংসদের একটি আইন পাশ হয়। এর নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস (ট্রাইবিউনালস ) এ্যাক্ট ১৯৭৩’। বাংলাদেশের সংবিধানের  প্রথম সংশোধনী আনা হয় ১৯৭৩ সালের এ আইনটিকে পাশ করার জন্য। একটি আইন পাশ করতে সংবিধানে সংশোধনী আনার প্রয়োজন হয়েছিল কেন?  আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ স্টিভেন কে কিউসি, টবি ক্যাডম্যান,   বিচারপতি মাইকেল বেলফ,   বিশ্বে আইনজীবীদের সবচেয়ে বড় সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশন (আইবিএ), হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আরো বিভিন্ন  মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সংস্থা এবং আইনবিদদের মতে ১৯৭৩ সালের আইনে বাংলাদেশের সংবিধানে ঘোষিত কিছু মৌলিক অধিকার রহিত করা হয়েছে।  ৭৩ সালের  আইনে এমন কিছু ধারা আছে যা বাংলাদেশের সংবিধান এবং প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার সাথে সাংঘষিক। সেজন্য এ আইনকে যাতে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে না পারে এবং  আইনের অসাংবিধানিক  ধারাগুলোকে সুরক্ষার জন্য সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান সংশোধনীতে ৪৭ অনুচ্ছেদের সাথে নতুন দুটি ধারা সংযোজন করা হয়। এ দুটি নতুন ধারা হল ৪৭ (ক) ও  ৪৭ (৩) । ৪৭ (৩) ধারায় বলা হয়েছে “ এই সংবিধানে যাহা বলা
হইয়াছে তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবাতা বিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক  আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা  বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক ফৌজদারীতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধান সংবলিত কোন
আইন বা আইনের বিধান সংবিধানের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য বা পরিপন্থী, এই কারণে বাতিল বা বেআইনী বলিয়া  গণ্য হইবেনা  কিংবা কখনো বাতিল বা বেআইনী হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবেনা।”
 ৪৭ (ক) এ ১ ও ২ নামে দুটি উপধারা রয়েছে। ৪৭ ক (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে  “এই সংবিধানে যাহা বলা হাইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের  (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়,  এই সংবিধানের  অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবেনা।”

৪৭ ক (১) ধারায় বলা হয়েছে “যে বক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) ধারায় বর্ণিত কোন আআনি প্রযোজ্য হয়, সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ, ৩৫ অনুচ্ছেদের (১) ও (৩) দফা, এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের অধীনে নিশ্চয়কৃত অধিকারসমূহ প্রযোজ্য ইবেনা। ”

বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে  বলা হয়েছে “অপরাধের দায়যুক্ত কর্মসংঘটনকালে বলবৎ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবেনা  এবং অপরাধ সংঘটনকালে বলবৎ সেই আইনবলে যে দন্ড দেওয়া যাইতে পারিত, তাহাকে তাহার অধিক বা তাহা হইতে ভিন্ন দণ্ড দেওয়া যাইবেনা।”
অর্থাৎ পূর্বে সংঘটিত অপরাধের জন্য পরে আইন করে শাস্তি দেয়া যাবেনা। সংবিধানের এই ৩৫ ধারাসহ  ৩১, ৩৩ এবং ৪৪ ধারায় বর্ণিত আরো কিছু মৌলিক  রহিত করা হয়েছে ১৯৭৩ সালের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে।

বিশেষজ্ঞদের মতে  সংবিধানে ৪৭ (ক) অনুচ্ছেদ সংযোজনের ফলে জুডিশিয়াল রিভিউর অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধের জন্য গঠিত আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যেতে পারবেনা অভিযুক্ত ব্যক্তি।    বাংলাদেশ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বিষয়ে যে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করা হয়েছে তাতে এই  জুডিশিয়াল রিভিউকে সংবিধানের মূল কাঠামো হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর  এই জুৃডিশিয়াল রিভিউর বিধান রাখা হয়নি ১৯৭৩ সালের আইনে। এছাড়া সংবিধান সংশোধন করে ১৯৭৩ সালের আইনকে প্রটেকশন দেয়ার ফলে ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিচারক নিয়োগ এবং রায় নিয়ে কোন আদালতে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবেনা।
যুক্তরাজ্য রানীর সাবেক কাউন্সেলর এবং  বিচারপতি মাইকেল জে বেলফ ১৯৭৩ সালের আইনে জুডিশিয়াল রিভিউ’র ক্ষমতা খর্ব করে  সংবিধানে যে প্রটেকশন দেয়া হয়েছে তাকে অসাংবিধানিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
যুগোশ্লাভিয়া এবং  রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনজীবী, যুক্তরাজ্যের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ স্টিভেন  কিউসি  বলেন,  ১৯৭৩ সালের আইন এবং এ আইনকে সুরক্ষার জন্য যে সংবিধান সংশোধন করা হল তার মাধ্যমে এই প্রথমবারের মত বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ‘অসাম্য’  প্রবর্তন করা হল।
১৯৭৩ সালের সংবিধানে নতুনভাবে সংযোজিত ৪৭  ক (১) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে  সংবিধানে অন্যান্য যেসব মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে তাও কেড়ে নেয়া হয়েছে  নির্দিষ্ট কিছু


লোকের ক্ষেত্রে। যুদ্ধাপরাধের বিচার যাতে কেউ উচ্চ আদালতে  চ্যালেঞ্জ করতে না পারে তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে সংবিধানের এসব  ধারা সংযোজনের মাধ্যমে।
 ১৯৭৩ সালের সংবিধানে প্রথম যে সংশোধনী আনা হয়েছে তা যে বাংলাদেশের সযং ঐ সংবিধানেরই বিরোধী তা বোঝাতে স্টিভেন  ১৯৭২ সালের সংবিধানের  কয়েকটি ধারা উদাহরণ হিসেবে তুরে ধরেণ। যেমন , সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ২৭ অনুচ্ছেদে ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’ শিরোনামে  মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে পুনরায় উল্লেখ করে বলা হয়েছে “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।”
২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসামাঞ্জস্য  সকল  প্রচলিত আইন যতখানি অসামাঞ্জস্যপূর্ণ , এই সংবিধান প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হাইয়া যাইবে (১) । রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসামাঞ্জস্যপূর্ণ কোন  আইন প্রনয়ন  করিবেন না  এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত  যতখানি অসামাঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হাইয়া যাইবে (২)।
স্টিভেন বলেন, তথাপি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সংবিধানে যে প্রথম সংশোধনী আনা হয়  তাতে  সকল নাগরিক সমান- সাম্যের এই   আকাঙ্খা   রহিত করা হয়েছে।






এসব কারনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আরো অনেক সংস্থা এবং ব্যক্তিবর্গ  যুদ্ধাপরাধ বিচার আইনকে সুরক্ষার জন্য  ১৯৭৩ সালে  সংবিধানে যে ৪৭ (ক)  এবং ৪৭ (৩) ধারা সংযোজন করা হয় তা বাতিলের দাবি জানান।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ রাষ্ট্রদূত  স্টিফেন জে র‌্যাপ তার চিঠিতে বিচারকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ  এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার লক্ষ্যে সংবিধানে বেশ কিছু নতুন ধারা সংযোজনের প্রস্তাব করেছেন।  র‌্যাপের চিঠিতে  বলা হয় বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের আইনে অপরাধের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা এবং ব্যাখা নেই। তাই আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে বাংলাদেশের ১৯৭৩ সালের আইনে  অপরাধকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার  নিশ্চয়তা বিধানের জন্যও সংবিধানে ধারা সংযুক্ত করা উচিত।   গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ  এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত  করতে হলে  এসব অপরাধের  আন্তর্জাতিক স্বীকৃত  এবং গ্রহণযোগ্য যে সংজ্ঞা রয়েছে সে অনুযায়ী  সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে। স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকতে হবে। তিনি বলেন,  আইসিসিপিআরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যেসব আইনী সুরক্ষা এবং অধিকার  প্রদান করা হয়েছে সেগুলো যাতে অভিযুক্ত ব্যাক্তিরা পেতে পারেন তার নিশ্চয়তা বিধান করে সংবিধানে একটি ধারা সংযোজন করা উচিত। ‘অভিযুক্তর অধিকার রক্ষা করতে হবে’ শিরোনামে র‌্যাপ তার চিঠিতে বলেন, কোন ব্যক্তি যত বড় অপরাধের অভিযোগেই অভিযুক্ত হোকনা কেন অভিযুক্ত ব্যক্তির অধকার  রক্ষা করতে হবে। এভাবে আরো কয়েকটি ক্ষেত্রে  তিনি সংবিধানে নতুন ধারা সংযোজনের প্রস্তাব    করেছেন।

৭৩ সালের আইনের সংশোধন: ২০০৯ সালে ১৯৭৩ সালের যুদ্ধাপরাধ  আইনের সংশোধন করা হয়। নতুন নাম হয় ‘দি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইবিউনালস) (এমেন্ডমেন্ট) এ্যাক্ট ২০০৯’।  ১৯৭৩ সালে  এ আইন প্রণয়ন করা হয় ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তার বিচারের জন্য। কিন্তু ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লীতে  ভারত-পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষমা করা হয়। ফলে এ আইন এতদিন কোন কাজে আসেনি। আইনটি  প্রণয়ন করা হয়  সশস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনী বা              সহায়ক বাহিনীর সদস্যদের বিচারের জন্য।   ২০০৯ সালে আইনটি সংশোধন  করে ‘একক ব্যক্তি বা ব্যাক্তিগোষ্ঠীকেও  বিচারের আওতায় আনা যাবে’ কথাগুলো যোগ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের চিঠি// ১৯৭৩ সালের আইন সংশোধন না হলে বিচার নিরপেক্ষ হিবেনা

19/4/11
নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যুদ্ধাপরাধ বিচারের লক্ষ্যে প্রণীত ১৯৭৩ সালের আইন এবং আইনের বিধিবিধান সংশোধনের দাবি জানিয়েছে।  প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা বরাবর লিখিত  চিঠিতে এ দাবি জানিয়ে বলা হয়, অন্যথায়    নিরপেক্ষ বিচারের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে মানদণ্ড রয়েছে তা বিদ্যমান আইনটি  পূরণ করবেনা। একই চিঠিতে তিনি ন্যায় বিচারের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনেরও দাবি জানিয়েছেন।

সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক ব্রাড এডামস লিখিত এ চিঠি গত ১৮ মে ২০১১  প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র  মন্ত্রী এবং ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও রেজিস্ট্রার বরাবার পাঠানো হয়। স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ বিচারের দাবি জানিয়ে চিঠিতে বলা হয় যুদ্ধপরাধ,  গণহত্যা এবং  মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট করতে হবে আইনে। তাছাড়া ১৯৭৩ সালের আইনকে সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানে প্রথম সংশোধনী এনে ৪৭ ধারায় যেসব সংযোজনী আনা হয়েছিল তাও বাতিল করতে হবে। বিচারকে স্বচ্ছ নিরপেক্ষ করতে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত যেসব অধিকার রয়েছে তা বহাল রেখে ১৯৭৩ সালের আইন এবং আইনের বিধিবিধান সংশোধনের দাবি জানানো হয়েছে চিঠিতে।  তিনি বলেন আদালতে এমন কোন বিচারক নিয়োগ দেয়া উচিত নয় যাদের বিচার নিয়ে  কোন  ধরনের সন্দেহ দেখা দিতে পারে।

যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার অনুষ্ঠানকে স্বচ্ছ  এবং নিরপেক্ষ করার জন্য ব্রাড এডামসের চিঠিতে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আইনের  ৬ (৮) ধারা সংশোধন। এ ধারায় বলা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের  গঠন,  এবং ট্রাইব্যুনালে চেয়ারম্যান, মেম্বার নিয়োগ এবং তাদের  বিষয়ে কোন আপত্তি তুলতে পারবেনা অভিযুক্ত পক্ষ।  ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট  অন সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিআরপি)’র ১৪ (১) ধারা  অনুযায়ী ৬(৮) ধারা সংশোধন করতে হবে।
বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৭ (ক) ধারা বাতিল করতে হবে। ৪৭ ক (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে  “এই সংবিধানে যাহা বলা হাইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের  (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়,  এই সংবিধানের  অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবেনা।”

চিঠিতে বলা হয়েছে ১৯৭৩ সালের সংবিধানে নতুনভাবে সংযোজিত ৪৭  ক (১) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে  সংবিধানে অন্যান্য যেসব মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে তাও কেড়ে নেয়া হয়েছে  নির্দিষ্ট কিছু  লোকের ক্ষেত্রে।  অথচ সংবিধানে বলা হয়েছে সকলেরই আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকার আছে এবং তা রক্ষার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তি তার অধিকার রক্ষার জন্য হাই কোর্টে আবেদন করার অধিকারসহ সংবিধানের ৩১, ৩৩, ৩৫ এবং ৪৪ ধারায় যেসব  অধিকার দেশের সকল নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রদান করা হয়েছে তা  সংবিধানের ৪৭ (১) ধারার মাধ্যমে কিছু কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্র থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে।

আইসিসিআরপির ১৪ ধারা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ৫৫ ও ৬৭ ধারায় বর্ণিত অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

এডামস ব্রাড তার চিঠিতে উল্লেখ করেণ, মানবাধিকার এবং আর্ন্তাজাতিক  বিভিন্ন আইনে বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী দেশ। এসব আইন এবং চুক্তি ছাড়াও বাংলাদেশের সংবিধানে যে মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার ঘোষনা দেয়া হয়েছে তার সাথে সমন্বয়  করে ১৯৭৩ সালের যুদ্ধাপরাধ আইনের সংশোধন করা উচিত। ইতোমধ্যে ১৯৭৩ সালের আইন এবং আইনের বিধিবিধানের যেসব সংশোধন করা হয়েছে তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আইনটির আরো সংশোধন না হলে স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ বিচারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত যে মানদণ্ড রয়েছে তা ১৯৭৩ সালের আইন  পূরণ করতে পারবে  বলে আমাদের মনে হয়না এবং এ বিষয়ে আমরা  উদ্বিগ্ন।  তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের আইন প্রণীত হওয়ার পর বিশ্বে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক আদালত গঠন এবং  বিচার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালের আইনে যে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের কথা বলা হয়েছে ঐসব আন্তর্জাতিক আদালতেও এসব অপরাধের বিচার হয়েছে।  যেমন যুগোস্লাভিয়া ও রুয়ান্ডার জন্য গঠিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমানাল কোর্ট, সিয়েরালিওনে স্পেশাল কোর্ট এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমানাল কোর্ট। এসব আদালতে বিচারের যে আওতা, অপরাধের যে সংজ্ঞা   নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করা হয়েছে বাংলাদেশের তা আমলে নেয়া উচিত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারের লক্ষ্যে।

 বাংলাদেশ আইসিসিআরপির একটি পক্ষ হওয়ায় নিরপেক্ষ বিচার অনুষ্ঠান এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে উল্লেখ করেণ তিনি।


ব্রাড এ্যাডামসের চিঠিতে  অপরাধের সংজ্ঞা, বিচারক, বিচার প্রকৃয়া, অভিযুক্তদের অধিকার রক্ষা, বাংলাদেশের সংবিধানে ঘোষিত মৌলিক মানাবধিকার এবং ৪৭ (ক) ধারা সংযোজন,  স্বাক্ষীদের  নিরাপত্তা, জামিন, বিচারের আওতা, আটক ব্যক্তিদের চিকিৎসা, তদন্ত, মৃত্যুদণ্ড প্রভৃতি  ১২ টি  বিষয়ে দফাভিত্তিক সুপারিশ পেশ করা হয় ।

ব্রাড বলেন আইসিসির ২৬ ধারায়  উল্লেখ  করা হয়েছে  “অপরাধ সংঘটনের সময় যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে ছিল তাদেরকে আদালত বিচারের আওতায় আনতে পারবেনা”। বাংলাদেশেও যুদ্ধাপরাধ  বিচারের লক্ষ্যে প্রণীত আইনে এ জাতীয় ধারা সংযোজন করতে হবে।

আইনে বলা হয়েছে বিচারে আসামী  দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর কেবল মাত্র আপীল বিভাগে আবেদন করতে পারবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চলাকালেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আপিল চেম্বারে পেশ করতে পারে। মধ্যবর্তী জামিনের জন্য একটি  বিশেষ আপিল আদালত গঠন করা দরকার।

কনভেনশন এগেনেস্ট টরচার (ক্যাট) এর বাংলাদেশ একটি পক্ষ।  ক্যাট চুক্তিতে বলা হয়েছে জোর করে, নির্যাতন করে, বল প্রয়োগ করে আসামীর কাছ থেকে তথ্য আদায় করা যাবেনা। বাংলাদেশে তথ্য আদায়ের জন্য নির্যাতনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এ বিষয়টি সংশোধন করা দরকার।

চিঠিতে ব্রাড উল্লেখ করেণ,     ১৯৭৩ সালের আইনে  যুদ্ধাপরাধ, গনহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনে বর্ণিত অন্যান্য অপরাধের বিচার এবং আদালত গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আইনে এসব অপরাধের কোন সুষ্পষ্ট সংজ্ঞা এবং ব্যাখ্যা বিশ্লেষন নেই। আইসিসি, আইসিসিপিআর ধারা অনুযায়ী অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট করে আইন সংশোধনের দাবি জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন এমন কোন বিচারক নিয়োগ দেয়া উচিত নয় যাদের বিচার নিয়ে কোন ধরনের সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। আইনের ৬(৮) ধারায় বলা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের গঠন, চেয়ারম্যান এবং মেম্বার নিয়োগ নিয়ে কেউ কোন আপত্তি তুলতে পারবেনা।  অথচ  রোম সংবিধি অনুযায়ী আসামী এবং আইনজীবী উভয় পক্ষ থেকে বিচারককে অযোগ্য ঘোষনার দাবি করার অধিকার রয়েছে। তাই ৬(৮) ধারা নিয়ে আমরা খুব  উদ্বিগ্ন  এবং এটি সংশোধন করা উচিত।

অভিযুক্তদের অধিকার রক্ষায় আইন এবং আইনের বিধিবিধান সংশোধনের দাবি জানিয়ে বলা হয় আইসিসি অনুযায়ী  কাউকে দোষ শিকারে বাধ্য করা যাবেনা, নিরব থাকার অধিকার দিতে হবে। আসামী পক্ষকে মামলার জন্য প্রস্ততি গ্রহনে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বিষয়ে তাকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত আসামী সম্পূর্ণ নিদোষ এ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ দেখতে চাই-এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল


মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ তথা যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়ে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ১৯৭৩ সালের আইনে অনেক দুর্বলতা রয়েছে যা ন্যায় বিচারের  পরিপন্থী ।  “আমরা স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ বিচারের যে মানদণ্ড রয়েছে তার সফল প্রয়োগ  দেখতে চাই বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে।”

১৯৭৩ সালের আইন, আইনের বিধিবিধান এবং সংবিধান পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে এম্যানেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে  আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বচ্ছ এবং ন্যায় বিচারের যে মানদণ্ড রয়েছে তার অনেক কিছুই অনুপস্থিত ১৯৭৩ সালের আইনে। তাই এসব দুর্বলতা সংশোধন করা না হলে  বিচার  প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে উদ্বেগ  প্রকাশ করা হয়েছে এ্যামনেস্টির পক্ষ থেকে।

যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত  ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থার এশিয়া প্যাসেফিক অঞ্চলের ডেপুটি ডাইরেক্টর মধু মালহোত্রা লিখিত এ চিঠিতে আইনটির বিভিন্ন দুর্বলতা উল্লেখ এবং সেগুলো  সংশোধনের জন্য দীর্ঘ সুপারিশমালা  পেশ করা হয়েছে।


চিঠিতে বলা হয়েছে যথাযথ অনুসন্ধানের মাধ্যমে সরকার দলীয় এবং সরকার সমর্থক দলের  যারা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত তাদেরকেও  গ্রেফতার করা না হলে এ ট্রাব্যুনালকে বিরোধী নেতা শিকারের একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

১৯৭৩ সালের আইনের বিভিন্ন দুর্বলতা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়েছে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা  বিষয়ে যে সংজ্ঞা ১৯৭৩ সালের আইনে দেয়া হয়েছে তার সাথে  আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞার মিল নেই। ১৯৭৩ সালের আইন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইন এবং  মানবাধিকার বিষয়ক চুক্তির পরিপন্থী।  গত ২১ জুন পাঠানো চিঠির সুপারিশসমূহ  নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হল।

চিঠির শুরুতে উল্লেখ  করা হয়েছে “আমাদের এ সুপারিশসমুহ পাঠানোর উদ্দেশ্য হল যুদ্ধাপরাধ বিচারের আইনে যেসব দুর্বলতা আছে সেগুলো দূর করা যাতে বিচার নিরপেক্ষ হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বচ্ছ  এবং নিরপেক্ষ বিচারের যে মানদন্ড রয়েছে   তা মেনে যদি অভিযুক্তদের শাস্তি প্রদান করা না হয় তাহলে তা হবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আরেকটি ঘটনা।

যুদ্ধাপরাধ বিচার কাজ একটি কঠিন বিষয় আমরা তা বুঝতে পারি কিন্তু  আন্তর্জাতিক যে অভিজ্ঞতা  এবং উদাহরণ রয়েছে সেখান থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিয়ে এবং আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে বাংলাদেশের আইন ও বিধিবিধান সংশোধন করে বিচারকে স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ করতে পারে । আমরা স্বচ্ছ এবং



নিরপেক্ষ বিচারের যে মানদণ্ড রয়েছে তার সফল প্রয়োগ  দেখতে চাই বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে। ”

চিঠিতে বলা হয়, আমরা এখানে কিছু সুপারিশ সন্নিবেশ করেছি যেগুলো বিচারকে স্বচ্ছ  এবং নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে  অবিলম্বে প্রয়োগ করা অতিশয় জরুরি বলে আমরা মনে করি।
আমরা লক্ষ্য করেছি এখন পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধের দায়ে যে সাত জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তারা সকলেই বিরোধী দলের নেতা। এদের মধ্যে পঁচ জন জামায়াতের এবং দু’জন বিএনপির । এতে মনে হচ্ছে যে, ট্রাইব্যুনাল শুধুমাত্র  বিরোধী দলের সাথে   সম্পৃক্ত সন্দেহভাজনদেরই বিচারের কাজ করছে। সরকারী দল বা সরকার সমর্থক কোন দলের নেতা হবার কারনে কেউ যেন নিজেদেরকে বিচারের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারে সেজন্য অবশ্যই আরো অধিকতর গুরুত্বের সাথে অনুসন্ধান কাজ চালানো উচিত।  অন্যথায় এ ট্রাব্যুনালকে বিরোধী নেতা শিকারের একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

বিচারে সন্দেহাতীতভাবে দোষী প্রমানের আগ পর্যন্ত একজন অভিযুক্ত  নিজেকে নির্দোষী দাবি করার যে অধিকার তা প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান, ১৯৭৩ সালের আইন বা আইনের বিধি কোনকিছুই পরিবর্তন করা হয়নি। এটি আমাদের কাছে অস্বস্তিকর। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক । অথচ বাংলাদেশ এটি মানতে বাধ্য। এসব আইনের সংশোধন দরকার।  বিচারে দোষী প্রমানের আগে অভিযুক্ত’র নির্দোষীতার দাবি নিশ্চিত করতে হবে ট্রাইব্যুনালকে।

যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা  বিষয়ে যে সংজ্ঞা ১৯৭৩ সালের আইনে দেয়া হয়েছে তার সাথে  আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞার মিল নেই। ১৮৬০ সালের পেনাল কোড প্রয়োগ করা হবে কিনা সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে ঘোষনা করা হয়েছে আইনের চোখে সবাই সমান।  কিন্তু ট্রাইব্যুনালে যাদের বিচারের জন্য হাজির করা হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে এ অধিকার হরন করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে যে নাগরিক অধিকার ঘোষনা করা হয়েছে তা সংবিধানে ৪৭ (ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে হরণ করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালে যাদের বিচার করা হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে।
৪৭ ক (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে  “এই সংবিধানে যাহা বলা হাইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের  (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়,  এই সংবিধানের  অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবেনা।”

 এটি ইন্টারন্যাশনাল কনভেন্ট  অন সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর) চুক্তির ৯ ধারার পরিপন্থী।

বিচারের জন্য অপেক্ষমান এবং আটকৃত ব্যক্তি জামিনা পাবেনা এটি আইসিসিপিআর এবং বিশ্বের প্রায় সকল আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান রীতির পরিপন্থি। ১৯৭৩  সালের আইনের ৩ (২) ধারাটি আইসিসিপিআর এর সাথে সাংঘর্ষিক। ট্রাইব্যুনাল  নিজ ক্ষমতাবলে অন্তত একজনকে জামিন দিয়েছে। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে  আইনের বিদ্যমান বাঁধা ট্রাইব্যুনালের এ ক্ষমতা প্রয়োগকে বাঁধা গ্রস্ত করতে পারে।

অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রোম সংবিধির ৫৫ ধারা এবং সকল আন্তর্জাতিক আদালতের স্বীকৃত যে বিধান রয়েছে তা মানা হয়নি ১৯৭৩ সালের আইনে।
 আটক অবস্থায় যদি কেউ নির্যাতনের শিকার হয় তবে তা তদন্ত  করে দেখার কোন বিধান রাখা হয়নি ১৯৭৩ সালের আইনে। তাছাড়া নির্যাতনের মাধ্যমে তথ্য আদায় না করা বিষয়েও কোন সুরক্ষা নেই


আইনে। একজন বন্দী অভিযোগ করেছেন যে, তাকে আটকের পরপরই নির্যাতন করা হয়েছে। এ  অভিযোগ  তদন্ত করে দেখার জন্য  ট্রাইব্যুনালের কোন উদ্যোগ এখন পর্যন্ত  লক্ষ্য করা যায়নি। অথচ কনভেনশন এগেনেস্ট টরচার চুক্তির ১২ এবং ১৩ ধারা মোতাবেক এটি করার দরকার ছিল।


অভিযুক্তদের আটকাদেশের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করা এবং আটকাদেশ অবৈধ হলে বন্দীকে  মুক্ত করার আবেদনের   নিশ্চয়তা রাখা হয়নি ১৯৭৩ সালের আইনে। এটি আইসিসিপিআর ৯ (৪) ধারার পরিপন্থী।

কাউকে  মিথ্যা অভিযোগে   বেআইনীভাবে আটক রাখলে তাকে ক্ষতিপুরণ দেয়ার বিধান রয়েছে আইসিসিপিআর এ কিন্তু  ১৯৭৩ সালের আইনে এ জাতীয় কোন বিধান নেই।

১৮৭২ সালের এভিডেন্স এ্যাক্ট এবং ১৮৯৮ সালের কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে  প্রযোজ্য হবেনা বলা হয়েছে। এসব আইন অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার রক্ষায় ভাল ভূমিকা পালন করে।

কোন প্রশ্নের জবাবে আসামীর নিরব অধিকার অধিকার সারা বিশ্বে স্বীকৃত। কিন্তু ১৯৭৩ সালের আইনের ১১ (২) ধারার মাধ্যমে এ অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে।

আসামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হবার আগ পর্যন্ত তাকে নির্দোষ দাবির নিশ্চয়তা সংবিধান, ১৯৭৩ সালের আইন বা বিধিমালা কোথাও রাখা হয়নি।

৫০ (১) বিধিতে বলা হয়েছে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমানের বাধ্যবাধকতা নেই বিচারের ক্ষেত্রে।

ভুল বিচারের ক্ষেত্রেও কোন ক্ষতিপূরনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ  এবং মানবতার বিরুদ্ধে  অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত সমস্ত আন্তর্জাতিক আদালতে এ ব্যবস্থা আছে। এটি আইসিসিপিআর এর ১৪ (৬) ধারার পরিপন্থী।


ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্তর অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়নি সংবিধান এবং ১৯৭৩ সালের আইনে।
পুলিশ, আইনজীবী বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক অভিযুক্তকে তার অধিকার সম্পর্কে অবহিত  করার কোন ব্যবস্থা নেই। তদন্ত, আপীল, বিচার প্রকৃয়ার অগ্রগতি সম্পর্কেও অভিযুক্তকে জানানোর যে  বিধান রয়েছে তার কোন ব্যবস্থা নেই আইনে।

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে মুখোমুখি লর্ড এ্যাভেবুরি ও আইনমন্ত্রী// মিথ্যাচারসহ ২০ দফা লিখিত অভিযোগ

29/7/11   mehedy hasan
সম্প্রতি লন্ডন সফরে আইনমন্ত্রী  ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে মুখোমুখি হন লর্ড এরিক এ্যাভেবুরির সাথে। লর্ড এ্যভেবুরি যদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশোধন বিষয়ে আইনমন্ত্রীর বিরুদ্ধে  অভিযোগ আনেন। স্টিফেন জে র‌্যাপ ট্রাইব্যুনালের বিধিবিধান সংশোধনের যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তার কিছুই সরকার বাস্তবায়ন করেনি বলে লিখিতভাবে আইনমন্ত্রীকে জানান তিনি। এছাড়া যুদ্ধাপরাধ সংশোধন বিষয়ে আইনমন্ত্রী  যুক্তরাষ্ট্রকে অসত্য তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে বলেও অভিযোগ করেণ লর্ড এ্যাভেবুরি।

গত ২৭ জুলাই  ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন এর চেয়ারম্যান এবং চিটাগং হিল ট্রাক্টস কমিশন কো চেয়ারম্যান লর্ড এরিক এ্যাভেবুরি লন্ডনে আইমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেণ। সেখানে যুদ্ধাপরাধ  ট্রাইব্যুনাল  এবং বিচার বিষয়ে সর্বশেষ অগ্রগতি মূল্যায়ন করে ২০ দফা লিখিত অভিযোগ  দেন এ্যভেবুরি। বিচার প্রকৃয়া এবং আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি লিখিতভাবে  অভিযোগ করে বলেন, এ  ট্রাইব্যুনাল ও আইন নিরপেক্ষ নয়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানসহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা  ১৯৯৩ সালে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত গণ তদন্ত কমিশিনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তারা তখন যাদেরকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করেণ এবং শাস্তি দাবি করেণ তাদের বেশ কয়েকজন এখন একই অভিযোগে কারাবন্দী।

যুদ্ধাপরাধ  বিচার ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং আদিবাসী (?)  ইস্যু নিয়েও তিনি আইনমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করেন।

ইন্টারন্যাশনাল ল ব্যুরোর ওয়েবসাইটে পরিবেশিত এ বিষয়ক একটি খবরে বলা হয় আইনমন্ত্রী  ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ লর্ড এ্যাভেবুরিকে জানান যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক রাষ্ট্রদূত স্টিফেন জে র‌্যাপ গত ২১ মার্চ যে প্রস্তাব দিয়েছেন তার প্রতি বাংলাদেশ সরকার পূর্ণরুপে সাড়া দিয়েছে।  কিন্তু লর্ড এ্যাভেবুরি আইমন্ত্রীকে লিখিতভাবে বলেন,  তাদের জানা মতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী  বা আইনমন্ত্রী  এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে তাদের জানা নেই। বরং বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত করছে অসত্য তথ্য দিয়ে।

লর্ড এ্যাভেবুরি  তার ২০ দফা লিখিত অভিযোগে বলেন ট্রাইব্যুনাল শুধু বিরোধী নেতৃবৃন্দকে টার্গেট করেছে  এবং তারা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কোন আইনেইর কোন নিয়ম কানুন মানতে রাজি নয়।

যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রকৃয়া এবং আইনের  বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে লর্ড এ্যাভেবুরি যে ২০ দফা অভিযোগ  পেশ করেণ সেগুলো হল:

১. ট্রাইব্যুনালে বিদেশী আইনজীবী    আনয়নের আবেদন প্রত্যখ্যান। এ ক্ষেত্রে যিনি সিদ্ধান্তগ্রহণকারী তিনি হলেন  বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। তিনি  আবার এটর্নি জেনারেল এবং তিনি সরকার কর্তৃক নিযুক্ত। তিনি  একই সাথে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধরীর মামলায় আইনজীবী প্যানেলেরও একজন সদস্য। এটর্নি জেনারেল যিনি  এবং বার কাউন্সিল চেযারম্যান আবেদন করার আগেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা এ ধরনের আবেদন  প্রত্যাখ্যান করবেনা। এর মাধ্যমে তারা তাদের পূর্ব সিদ্ধান্ত প্রকাশ করল।

২. আদালতের বেশ কয়েকজন সদস্য গণতদন্ত কমিশন ( গণ আদালত)  সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন ১৯৯০ সালের দিকে। তখন যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধারাপধ তদন্ত হয় এবং তারা যাদেরকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করেছিলেন  তাদের বেশ কয়েকজন এখন একই অভিযোগে কারাবন্দী। তাদের মুত্যৃদন্ডের দাবিতে কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছে।   ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান গণ তদন্ত কমিশনের সদস্য ছিলেন ।

৩. স্টিফেন জে র‌্যাপের কোন সুপারিশ বাস্তবায়ন না করার পরিণতি। রুলস অব প্রসিউিউর এখন আগের চেয়েও আরো খারাপ করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী  নিয়মিত বিচারপতি  এবং আইনজীবীদের সাথে বৈঠক করেণ যা কাম্য নয়।

৪. আইন এবং সংবিধান সংশোধনে ব্যর্থতা।  যুক্তরাষ্ট্র দূত স্টিফেন জে র‌্যাপ কে আইনমন্ত্রী বলেছেন সংবিধান সংশোধনী দরকার  নেই। সংবিধানে প্রথম যে সংশোধনী আনা হয়েছিল তা অভিযুক্তদের ক্ষতির জন্য করা হয়নি। আসলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে প্রধান বিচারপতি বিভ্রান্তিজনকভাবে বলেছেন যে, মধ্যবর্তী আবেদন সুপ্রীম কোর্টের বিষয়। অথচ রায় হবার আগে  মধ্যবর্তী আবেদনের কোন সুযোগ নেই । ট্রাইব্যুনালের কোন বিচারপতি, ট্রাইব্যুনাল, আইন বা ট্রাইব্যুনালের কোন সিদ্ধান্তের   বিরুদ্ধে কোন  চ্যালেঞ্জ জানানো যাবেনা। ট্রাইব্যুনাল নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই বা যে বিচারপতি জড়িত তিনি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে  পুনর্বিবেচনা করতে পারবে এ বিষয়ক একটি বিধি জারি করেছে।

৫. ট্রাইব্যুনাল সর্বশেষ শুনানীতে আসামী পক্ষকে লিখিত আদেশের কপি দিতে অস্বীকার করেছে।

৬.ট্রাইব্যুনাল সর্বশেষ শুনানীতে অভিযুক্ত’র পক্ষে যে মন্তব্য করেছেন তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

৭. ঐ তারিখে শুনানীর দিন  কৌশুলীরা একটি কপিও প্রকাশ করতে সমর্থ হননাই। ট্রাইব্যুনাল বলল  যে, তদন্ত গোপনীয় এবং কপি প্রকাশ না করাকে আদালত সমর্থন করলেন। ইন্টারন্যাশনাল কনভেন্ট  অন সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটস চুক্তির এটি বিরোধী  অথচ বাংলাদেশে এ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ।

৮. ট্রাইব্যুনাল দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার সম্পূর্ণরুপে অনীহা প্রকাশ করেছে। ট্রাইব্যুনাল যদি নিজেদের দেশীয় বিচার ব্যবস্থার একটি অঙ্গ মনে করে তবে তাদের দেশীয় আইন মেনে চলা উচিত। আর যদি এটাকে  একটি আন্তর্জাতিক  ট্রাইব্যুনাল মনে করেণ তাহলে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা উচিত। কিন্তু তারা এ দুটির একটির মধ্যেও নেই।

৯. আইনের ৩ ধারায় অপরাধের যথাযথ সংজ্ঞা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে।

১০. ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর কর্তৃপক্ষ ১৭ মাস সময় নিলেন। এবং  এক বছর ধরে অভিযুক্তরা বন্দী অবস্থায় রয়েছেন।

১১.ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি, আইনজীবী এবং তদন্তকারীদের অভিজ্ঞতার যথেষ্ঠ অভাব রয়েছে এবং আইনের জটিল ক্ষেত্রে  তাদের কোন  প্রশিক্ষন নেই। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) কর্তৃক তারা প্রশিক্ষন নিয়েছেন বলে যদি বলা হয় তবে তা অসত্য। এ বিষয়ে আইসিসি থেকে যাচাই করা হয়েছে।

১২. আইনের বিধিতে মৌলিক অধিকার এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। সংবিধানে সবার জন্য  যে মৌলিক অধিকার ঘোষনা করা হয়েছে তা বাতিল করা হয়েছে সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে। এই বিষয়টি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ব্যাড এডামস উত্থাপন করেন। আইনমন্ত্রী তখন যে জবাব দেন তাহল “এই লোকগুলো  খুন করেছে”।

১৩. ট্রাইব্যুনাল শুধুমাত্র বিরোধী নেতৃবৃন্দকে টার্গেট করেছে।
১৪.আইনটি বৈষম্যমূলক। আইনে  যুদ্ধে শুধু একপক্ষের  অপরাধের বিচারের কথা বলা হয়েছে  ইচ্ছাকৃতভাবে।

১৪. ট্রাইব্যুনাল নিরপেক্ষতা প্রমানে ব্যর্থ হয়েছে। বিচারপতিরা ঘন ঘন  সরকারি কর্মকর্তা  এবং অভিযোগকারী ভুক্তভোগীদের সাথে বৈঠক করেণ।

১৫ গণমাধ্যমের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের কারনে এ বিষয়ে কোন প্রকাশ্য বিতর্ক আয়োজন সম্ভব হচ্ছেনা। ট্রাইব্যুনাল বা সরকারের কোন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলে আদালত অবমাননা মামলায় জড়ানোর ভয় রয়েছে।

১৬ আন্তর্জাতিক আইন কানুন, নিয়মনীতি, স্বচ্ছ, নিরপক্ষে এবং মুক্তভাবে কাজ করার বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছেনা। বিচার প্রকৃয়া এবং প্রস্তুতির বিষয়ে আন্তর্জাতিক কোন পর্যবেক্ষন এবং  যাচাই বাছাইয়ের ব্যাপার তাদের চূড়ান্ত অনীহা রয়েছে। প্রকৃয়াকে সঠিক করার একমাত্র উপায় হল (১)  বিদেশী আইনজীবী  আনার সুযোগ রাখা। (২) আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষন ব্যবস্থার সুযোগ রাখা (৩)  আন্তর্জাতিক আইনের বিধিবিধানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করে আইনের সংশোধন।

১৭. সালাহউদ্দিন চৌধুরীকে যতবারই আদালতে নেয়া হয়েছে তিনি র‌্যাবের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তার কোন তদন্তের ব্যবস্থা করেনি।
১৯ জিজ্ঞাসাবাদকালে অভিযুক্ত’র বক্তব্য আদালতে ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। ফলে এ জিজ্ঞাসাবাদ উদ্দেশ্যহীন।
২০. যতদূর জানা গেছে স্টিফেন জে র‌্যাপ যেসব প্রস্তাব দিয়েছিলেন সে বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী  এবং আইনমন্ত্রী  কোন পদক্ষেপ নেননি।

যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের মধ্যে বিভক্তি


যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত  ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের  বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে প্রণীত  ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইবিউনাল) এ্যাক্ট নিয়ে এ বিভক্তি দেখা দিয়েছে।  যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য বিদ্যমান এ আইনটি কতটুকু যথার্থ   এবং আইনটি  বিষয়ে ইঊরোপী ইউনিয়নের প্রকাশ্যে কি  অবস্থান নেয়া উচিত তা নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ তৈরি   হয়েছে ।

জানুয়ারি ২০১১ সালে  ঢাকা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনকি নিউএজ পত্রিকায়  এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

ডেভিড বার্গম্যানের এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে  যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য প্রণীত আইনটি নিয়ে  আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন, বিচারক এবং আইনজীবীদের কাছ থেকে ইতোমধ্যে যে সমালোচনা এসেছে তার সাথে ইউরোপের অনেক দেশ একমত পোষন করেছে।   ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কোন কোন দেশের কূটনীতিকরা শুধু আইনটি নয় বরং পুরো বিচার প্রকৃয়াকেই অসচ্ছ হিসেবে মনে করেণ। আইনটির সমালোচনা করে আন্তর্জাতিক আইনজীবীরা  আইনটির যেসব সমালোচনা করেছেন বিট্রিশ দূতাবাস তা  সঠিক মনে করে।
ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশনস ওয়ার ক্রাইমস কমিটি (আইবিএ)সহ আরো যেসব সংস্থা আইনটির সমালোচনা করে এর সংশোধনের জন্য যেসব প্রস্তাব দিয়েছে তার সাথে অনেক দেশের রাষ্ট্রদূত একমত পোষন করেছে।

আবার কোন কোন দেশের কূটনীতিক মনে করেণ বিদ্যমান আইনের মাধ্যমে বিচার কাজ করা সম্ভব এবং তাতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় সমস্যা হবেনা।  এ নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর  কূটনীতিকদের মধ্যে বিতর্ক চলছে।
আন্তর্জাতিক মহল থেকে আসা আইনটির সমালোচনার সাথে সূর মিলিয়ে ঢাকায়  নিযুক্ত ইউরোপীয় উইনিয়নভুক্ত কোন কোন কূটনীতিকের প্রচার করা মন্তব্য বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সংগঠন হিউম্যান রাইটস টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান এন্ড্রু বার্ণার্ড   দৈনিক নিউএজের সাথে এক সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি বলেছেন, আইনটিতে কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা আছে কিন্তু এর মাধ্যমে বিচার করলে তাতে ন্যায় বিচার বাঁধাগ্রস্ত হবেনা। তিনি আরো বলেন হিউম্যান রাইটস টাস্কফোর্স একটি অনানুষ্ঠানিক সংগঠন এবং যুদ্ধপরাধ বিচার বিষয়ে এ সংগঠনের  অবস্থান এখনো পরিষ্কার নয়।

সংগঠনের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে  এ  ধরনের মন্তব্য আসার পর অন্যান্য সদস্যভুক্ত  অনেক দেশের কূটনীতিক এন্ড্রা বার্নার্ডের বক্তব্যের  সাথে ভিন্নতা প্রকাশ করে কড়া  প্রতিকৃয়া ব্যক্ত করেণ। জার্মান দূতাবাসের একজন সিনিয়র কূটনীতিক (ইউ’র রাজনীতি,  বানিজ্য এবং তথ্য বিভাগের  প্রধান) এন্ড্র বার্নাডের সাথে যোগাযোগ করেণ এবং তাকে  তার বক্তব্য সংশোধন করে আরেকটি বিবৃতি প্রদানের অনুরোধ করেণ।
ফলে এন্ড্র বার্ণার্ড আরেকটি বিবৃতি প্রদান করে বলেন, যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়টি বাংলাদেশের বিষয়। তবে ইউরোপী ইউনিয়নের অনুরোধ থাকবে বিচার যেন আন্তর্জাতিক মানের হয় তা নিশ্চিত করার বিষয়ে।
 ইউ রাজনৈতিক এবং বৈশ্বিক বিষয়ক সেক্রেটারী জন রায়ান বলেন, ১৯৭৩ সালের আইনের সমালোচনা করে আইবিএ যে মতামত প্রদান করেছে তার সাথে   আমরা একমত। তারা আইনটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য  ১৭ দফা প্রস্তাব দিয়েছে এবং আমরা চাই তার ভিত্তিতে আইনটি সংশোধন করা  হোক।
ডেভিড বার্গম্যানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে  যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কূটনীতিকদের মধ্যে এমন সময় এ বিতর্ক দেখা দিল যখন  যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রনে যুক্তরাষ্ট্রের স্টিফেন জে র‌্যাপ বাংলাদেশে আসছেন।  বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক স্টিফেনকে ঢাকা সফরের    আমন্ত্রণ  জানানোর মানে হল যুদ্ধাপরাধ বিচার আইন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে সমালোচনা চলছে তা বাংলাদেশ সরকার মেনে নিয়েছে। ইউরোপীয় অনেক  কূটনীতিকগণ অন্তত তাই মনে করেন।

২০০৯ সালের ২৫ মার্চ যুদ্ধাপরাধ বিচার আদালগ গঠন করা হয়েছে এবং জামায়াতের সব শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। বিএনপি স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্যা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও যুদ্ধাপরাধ  বিষয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে ।

যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রী বিভিন্ন সময় যা বলেছেন

মেহেদী হাসান
যুদ্ধাপরাধ ও  মানবতার বিরুদ্ধে অপররাধ নিয়ে যেমন বিভ্রান্তি আছে  তেমনি বিভ্রান্তি চলছে বিচারের আগেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত  করে কাউকে কাউকে  ফাঁসিতে ঝোলানোর  দাবি নিয়ে। আবার  তদন্তের আগেই তালিকা প্রকাশ করে অনেককে  যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত  করে নানাভাবে হেনস্থা  করা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিচারের উদ্দেশ্য নিয়ে।
আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার সফিক আহমেদ বলেছেন, বিচারের আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবেনা। সন্দেহভাজদের গ্রেফতারের বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তা ও আদালতের ওপর নির্ভরশীল। তালিকা প্রকাশ বিষয়েও তার কিছু জানা নেই। অন্যদিকে  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন নিজামী-মুজাহিদসহ অনেককে  গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন।  আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন নিজামী মুজাহিদকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার করে ফাঁসিতে ঝূলানো হবে।

২৭ মার্চ উত্তরায় একটি অনুষ্ঠানে  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন বলেছেন, নিজামী মুজাহিদসহ ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে লালমনিরহাটসহ যেসব  স্থানে  ওয়ারেন্ট জারি করা হয়েছে তার প্রেক্ষিতে তাদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেফতারে আর নতুন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের নির্দেশ দেয়ার   প্রয়োজন নেই।
পয়লা  মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়ানের  তিন সদস্যের এক  প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকে আইনমন্ত্রী বলেছেন তদন্তের পরই যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। তদন্তের পরই জানা যাবে কারা যুদ্ধাপরাধী এবং কাদের বিচার করা হবে। যুদ্ধাপরাধীদের চূড়ান্ত তালিকাও এসময় প্রকাশ করা হবে। তদন্তের আগেই সরকারের যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা  প্রকাশ বিষয়ে তিনি বলেন এ বিষয়ে আমি অজ্ঞ। আমার কিছু জানা নেই।  সরকারের কারো সাথে এ নিয়ে আমার  আলোচনাও হয়নি।  অথচ  দেশের সকল থানায় যুদ্ধপারধীদের তালিকা পৌছনো হয়েছে  ইতোমধ্যে।
২০ মার্চ মানবাধিকার সংস্থা অধিকার আয়োজিত একটি বৈঠকে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িতদের  গ্রেফতার বিষয়ে বলেন, তদন্ত কাজ শুরু হলে পর তদন্ত কর্মকর্তাই ঠিক করবে এ বিষয়টি। তদন্তের স্বার্থে কাউকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করার  প্রয়োজন হলে তারা   ডাকবে। এ  জাতীয় বিধান  তদন্ত প্রক্রিয়ায় থাকবে।  

১৯ মার্চ রাজশাহীর গোদাগড়িতে মাটিকাটা কলেজ মাঠে  আয়োজিত এক সমাবেশে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, নিজামী-মুজাহিদদের মত যুদ্ধাপরাধীদের এদেশের মাটিতে বিচার করে ফােিসত ঝুালানো হবে।

বিচারের  আগেই বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারের আগে কাউকে অপরাধী বা অভিযুক্ত বলা ঠিক নয়। তদন্তই বলে দেবে কার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে এবং কার বিরুদ্ধে নেই।
অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে আর্ন্তজাতিক চাপ বিষয়েও সরকারের  মন্ত্রীরা পরষ্পর বিরোধী বক্তব্য রাখছেন।
গত বছর ১৯ আগস্ট জাতীয় প্রেসকাবে আয়োজিত ‘জঙ্গীবাদ ও বর্তমান বাংলাদেশ: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক বৈঠকে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাঁধা আসছে। একটা মহল আমাদের চাপ দিচ্ছে। সরকার এ বিষয়ে সজাগ আছে।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের  এ বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করে আইনমন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের ওপর কোন চাপ নেই। তবে বিচার যাতে সুষ্ঠু, আন্তর্জাতিক মানসম্মত এবং নিরপেক্ষ হয় সে বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থার তাগিদ রয়েছে। গত বছর ৩০ আগস্ট আইনমন্ত্রী তার দফতরে সাংবাদিকদের একথা বলেন। ২০ মার্চ মানবাধিকার সংস্থা অধিকার আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তিনি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আছে। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন বিষয় এবং  এ বিষয়ে কেউ বিরোধীতা করবেনা।

২০ এপ্রিল আইনমন্ত্রী তার দফতরে সাংবাদিকদের বলেন,  সরকার শুধু চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনবে।  হাজার হাজার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবেনা । ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর যারা দোসর ছিল সেই সহযোগী বাহিনীর বিচার করা হবে। হানাদার বাহিনীকে যারা সহযোগীতা করেছে, হত্যা, ধর্ষণ লুটপাট করেছে তাদের মূল নায়কদের বিচারের আওতায় আনা হবে।

আইনমন্ত্রী বলছেন যুদ্ধাপরাধ নয় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার হবে। অন্যদিকে   আইন  মন্ত্রণালয়ের প্রতিন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম  আগাগোড়া বলে আসছেন  যুদ্ধাপরাধের কথা। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অন্যান্য মন্ত্রী এবং কর্মকর্তারাও বলছেন যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা। আওয়ামী লীগের নির্বাচিনী ইশতেহারেও বলা আছে যুদ্ধাপরাধের কথা। গত বছর ২৯ জানুয়ারি সংসদে যে প্রস্তাব পাশ হয় তাতেও যুদ্ধপরাধ শব্দটি আছে মানবাতর বিরুদ্ধে অপরাধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক  আহমেদ দেশে ফিরে যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেণ। ১৮ মার্চ    যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক এক বৈঠকে যুদ্ধাপরাধের  বদলে  মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের সিদ্ধান্ত হয়। ঐ বৈঠকে আইন  মন্ত্রী ব্যারিস্টার সফিক আহমেদ ছাড়াও আইনপ্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামও উপস্থিতি ছিলেন। বৈঠকের পর থেকে আইনমন্ত্রী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলা শুরু করলেও পরের দিনই একটি জনসভায় কামরুল ইসলাম যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলেন।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গেলে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী উচ্চ পদস্থ জেনারেল যারা  পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তাদের বিচার করার বিষয়টি সামনে আসে। সেজন্য সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বদলে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের বিষয়টি সামনে এনেছে।


ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে সমালোচনার তালিকা ক্রমে দীর্ঘ হচ্ছে


মেহেদী হাসান
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে  গঠিত ট্রাইব্যুনাল নিয়ে ঢাকার নিউএজ পত্রিকায় কর্মরত বিদেশী সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের একটি প্রতিবেদনের কারনে তাকে আদালতে ডেকে পাঠানো হয় সম্প্রাতি। ভবিষ্যতে এ ধরনের মানহানিকর প্রতিবেদন করার বিষয়ে তাকে সাবধান করেছেনে আদালত।

এ বিষয়কে কেন্দ্র করে রেডিও নেদারল্যান্ডে সাংবাদিক রিচার্ড ওয়াকারের একটি  একটি প্রতিবেদন প্রচার করা হয়।  তাতে তিনি বলেছেন, যুদ্ধাপরাধ  বিচারের লক্ষ্যে গঠিত  ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) সম্পর্কে সমালোচনা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। সমালোচনার তালিকা ক্রমে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর  হচ্ছে। ট্রাইবুন্যানের বিরুদ্ধে এ সমালোচনার মূলে রয়েছে এ ধরনের বিচার এবং ট্রাইব্যুনাল গঠনের ক্ষেত্রে  আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যেসব মানদণ্ড রয়েছে তা  মেনে না চলা এবং কোন অভিযোগ ছাড়াই সন্দেহভাজনদের দীর্ঘদিন আটকে রাখা।   ট্রাইব্যুানলের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে    অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালিত হচ্ছে।

রিচার্ড ওয়াকার তার প্রতিবেদনে বলেছেন, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে তিরষ্কারের মাধ্যমে এ আদালত এখন নিজেই  নিজের মুখ খুলেছে। “গত বছর থেকে ট্রাইব্যুনাল  কার্যক্রম শুরু করে। ৪০ বছর আগে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের যারা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত তাদের বিচারের কথা  রয়েছে এ ট্রাইব্যুনালের। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে সমালোচানর তালিকা  ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।” 

এ ধরনের অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে মানদণ্ড রয়েছে তা পূরণ না করায় গত ১২ মাসে ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে অনেক সমালোচনা হয়েছে। কোন অভিযোগ ছাড়াই সন্দেহভাজনদের দীর্ঘদিন ধরে আটক রাখা হয়েছে। তাদের যে পদ্ধতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক  খ্যাতিসম্পন্ন আইনবিদ ব্যারিস্টার স্টিফেন কেই বলেছেন “বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ আইনী কাঠামোর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আমদানি করেছে এবং একই সময় অভিযুক্তদের যেসব অধিকার রয়েছে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদের যেসব স্বীকৃত নিয়মনীতি রয়েছে সেগুলো রপ্তানি করে দিয়েছে। এবং আপনি এর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ  তুলতে পারবেননা। তারা খুবই অদ্ভুত একটি আদালত স্থাপন করেছে যেখানে অভিযুক্তদের অধিকার  হরণ করা হয়েছে।”
এ আদালতের বিরুদ্ধে আরো যেসব অভিযোগ রয়েছে তা হল বর্তমানে যেসব মামলা পরিচালনা করা হচ্ছে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং এসব মামলা  কোর্টরুমেই নির্ধারণ করা হচ্ছে।

মুখ সামলাও: কিন্তু  আদালত এখন নতুন আইনী জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার একটি পত্রিকায় কর্মরত বিদেশী একজন সাংবাদিক সম্প্রদি ট্রাইব্যুনালকে ‘মেরুদণ্ডহীন’ (নো ব্যাকবোন) এবং ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে  আখ্যায়িত করেছেন  একটি প্রতিবেদনে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে আদালতে  তলব করা হয় এবং বিচারক এ কে এম জহির আহমেদ বলেন, “আপনার প্রতিবেদনে আদালতকে  রাবার স্ট্যাম্প হিসেবে আখ্যায়িত করা ছাড়াও আরো অনেক মানহানিকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা আদালত
অবমাননার শামিল। আপনি যদি এভাবে লেখা অব্যাহত রাখেন তবে ভবিষ্যতে আপনার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হবে। ”

বিদ্যমান আইন ন্যায় বিচারের মানদণ্ড পূরন করেনা-আইসিটিজে


যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ট্রানজিশনাল জাস্টিস (আইসিটিজে) এর পক্ষ থেকে  বলা হয়েছে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচার  আইন ন্যায় বিচারের মানদণ্ড পূরণ করেনা। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে  আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত  যেসব  মৌলিক অধিকার  রয়েছে তার অনেক কিছুই অনুপস্থিতি বাংলাদেশের আইনে।

গত ১৫ মার্চ ২০১১ আইসটিজে’র সভাপতি ডেভিড টোলবার কর্তক আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক   মন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমেদ বরাবার  লিখিত এক চিঠিতে একথা বলা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে বিদ্যমান আইনী কাঠামোতে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য যেসব অধিকার রয়েছে তা পাওয়া সম্ভব নয়। বিদ্যমান  আদালতে  যেসব অপরাধের বিচার করা হবে সে বিষয়গুলো স্পষ্ট করা হয়নি। অপরাধকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। অথচ আদালতের বিচারিক ক্ষমতা, এখতিয়ার  এবং আওতা নিভর  করে এসবের ওপর।  চিঠিতে বলা হয়েছে, নাগরিকদের নির্বিচারে গ্রেপতার  করার অধিকার রাষ্ট্রকে দেয়া হয়নি। কেবলমাত্র  যৌক্তিক এবং সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগেই আদালত কাউকে গ্রেফতারের আদেশ দিতে পারে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে  অভিযুক্ত ব্যক্তির যেসব ন্যূনতম মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা রয়েছে তার তুলনায় বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনটিতে অনেক ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়টি  উপেক্ষিত  রয়ে গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তির মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হতে পারে।

যুদ্ধাপরাধ বিচার আইন তথা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল এর সংশোধনের  দাবি জানিয়েছেন ডেভিড টোলবার। সেইসাথে অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার রক্ষা এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে তার চিঠিতে।

আইনের শাসন, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অভিযুক্তদের অধিকার রক্ষায় এ্যডভোকেসি হিসেবে কাজ করে আসছে আইসিটিজে। গত ১৫ মার্চ ২০১১ এ সংস্থা  বাংলাদেশের আইনমন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়েয়েছে যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে তাদের অভিমত ব্যক্ত করে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যাতে ন্যায় বিচার পায় তার সকল নিশ্চয়তা বিধানের ব্যবস্থা করতে হবে বাংলাদেশকে।  যুদ্ধাপরাধ আইনের ইতোমধ্যে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে তাতে অভিযুক্তদের জন্য কিছু কিছু সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।  কিন্তু তারপরও   আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে  অভিযুক্ত ব্যক্তির যেসব ন্যূনতম মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা রয়েছে তার তুলনায় বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনটিতে অনেক ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়টি  উপেক্ষিত  রয়ে গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তির মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের বিচার প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন ুন্ন হবে তেমনি বিচার  প্রকৃয়ারও বৈধতা  এবং আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে।  এতে করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন থাকবেনা বিচারের প্রতি।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন  অন সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটস এ চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।  আন্তর্জাতিক এ চুক্তির ১৪ ধারা মোতাবেক  যেকোন ফেজাদরী বিচাররের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায় বিচার প্রাাপ্তির লক্ষ্যে  তার সকল অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।  কিন্তু ঘটনা  হল  যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের  কিছু কিছু অধিকার বাংলাদেশের সংবিধানে রহিত করা হয়েছে বলে  দেখা যাচ্ছে।  বিদ্যমান যুদ্ধাপরাধ আইন এবং আইনী কাঠামো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে আইসিটিজে’র পক্ষ থেকে। সে আলোকে ১০৭১ সালে  পরিচালিত বর্বরতার  শাস্তি বিধানের  ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, বিচারকে আন্তর্জাতকিভাবে গ্রহনযোগ্য এবং  এটি যাতে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ   করে সেজন্য আইসিটিজে’র পক্ষ থেকে কতিপয় প্রস্তাব করা হয়েছে বলে চিঠিতে বলা হয়েছে। প্রস্তাবগুলো নিন্মরূপ

বৈধতার মূলনীতি: যে আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধের বিচার কাজ চলছে সে আইনে অপরাধসমূহকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। আদালতের আওতা বা বিচারিক  ক্ষমতা  নির্দিষ্ট করতে হলে অপরাধকেও সঠিকভাবে বর্ণনা করা এবং নির্দিষ্ট করা দরকার। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কি কি অভিযোগ আনা হয়েছে  সে বিষয়ে যাতে সে  ভাল করে বুঝতে পারে এবং নিজেকে অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রস্তুত করতে যথেষ্ট সময় পান সেজন্য আদালতের আওতা  বা বিচারিক ক্ষমতা অবশ্যই সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। ঐ অআদালত কি কি অপরাধের বিচার করতে পারবে সে বিষয়ে স্পষ্ট বর্ণনা থাকতে হবে। অপরাধের উপাদান কি কি, ব্যক্তিগত অপরাধের দায়দায়িত্ব এবং যে সময়ে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেই সময়ে  অভিযুক্ত’র পক্ষে কি কি গ্রহণযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল  সেসব বিষয় স্পষ্ট  করে উল্লেখ থাকতে  হবে। আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুযায়ী  বিচার সংক্রান্ত  যেকোন বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আপত্তি উত্থাপনের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে এবং  রায়ের বিরুদ্ধে জুড়িশিয়াল রিভিউর সুযোগ থাকতে হবে। 

মানুষের জীবন নিয়ে এখানে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে-টবি ক্যাডম্যান

বসনিয়া যুদ্ধাপরাধ মামলার প্রধান  আইনজীবী প্রখ্যাত ব্রিটিশ আইনজীবী টবি ক্যাডম্যানের মতে ১৯৭৩ সালের আইন ন্যায়বিচারের বুনিয়াদি মূলনীতি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড বজায় রাখতে পারেনি।  মানুষের জীবন নিয়ে এখানে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। আটককৃতদের সকার ন্যূনতম মৌলিক মানবাধিকার থেকেও বঞ্চিত করেছে। আটককৃতরা কোন অভিযোগেই অভিযুক্ত নয় এটা ছাড়া যে, তারা বিরোধী দলের লোক। অনেক ব্যক্তিকেই প্রাথমিকভাবে অন্য মামলায় ধরে এনে  পরে যুদ্ধাপরাধ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন। কোন অভিযোগ গঠন ছাড়াই তাদেরকে দিনের পর দিন আটকরা রাখা হয়েছে। বর্তমান বিচার প্রকৃয়ায় তাদের   আত্মপক্ষ  সমর্থনের কোন সুযোগ নেই। তাদেরকে এমনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে যা ন্যূনতম মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। তাদের চিকিৎসা সুবিধা দিতে পর্যন্ত অস্বীকার করা হয়েছে। তিনি বলেন, এটা হবে বিচারের  নামে একটি প্রহসন।
রাষ্ট্রদূত  স্টিফেন জে র‌্যাপের সুপারিশ প্রসঙ্গে টবি ক্যাডম্যান বলেন,  সুপারিশগুলো একেবারেই ন্যূনতম হিসেবে গন্য করতে হবে। এ সুপারিশগুলো তেমন গভীরে গিয়ে সমস্যার সমাধান দেয়না  এবং  আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে আইন এবং বিচার প্রকৃয়ার বিরুদ্ধে  উত্থাপিত সব বিষয়কে আন্তর্ভুক্ত করেনা। র‌্যাপের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশের আইনটি   আন্তর্জাতিক মানের কেবল ন্যূনতম শর্তপূরণ করেছে বলে বলা যাবে,  এর বেশি নয়।  কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকার এ সুপারিশ বাস্তবায়নেও কোন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে চোখে পড়ছেনা

আমরাই জামাইর মা আমরাই কইন্যার মা- টিএইচ খান


ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা’র বিচারপতি টিইচ খান বলেছন,  যেভাবেই হোক সাজা দেবই এ উদ্দেশ্যে যুদ্ধাপরাধ  বিচারের আয়োজন চলছে। ন্যায় বিচারের নামে প্রহসন করতে তারা দৃঢপ্রতিজ্ঞ।  কোরবানির গরুকে যেমন চার হাত পা বেঁধে জবাই দেয়া হয় এ আইনের মাধ্যমে তেমন বিচার হবে। এটাই  ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল এ্যাক্টের  সারমর্ম।
টিএইচ খান  বলেন, এ বিচারের অবস্থা হবে   নেকড়ের সেই গল্পের মত। অর্থাৎ তুই দোষ করিষনি তোর বাপে করেছে। এই অপরাধে যদি বিচার হয় তাহলে বলার আর কি আছে। মন্ত্রীরা আগেই বলছেন ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে বিচার করা  হবে। এভাবে বিচারের আগে প্রগান্ডা  চালাচ্ছেন। 

২০১০ সালের ১৬  এপ্রিল হোটেল শেরাটনের উইন্টার  গার্ডেনে ‘দি ন্যাশনাল ফোরাম ফর প্রটেকশন অব হিউম্যান রাইটস’ যুদ্ধাপরাধ আইন বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক   কনফারেন্স এর আয়োজন করে।  কনফারেন্সে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান  আইনজীবী এবং বিচারপতি টিএইচ খান একথা বলেন।

১৯৭৩ সালের যুদ্ধাপরাধ আইনের সমালোচনা করে টি এইচ খান বলেন, স্বাক্ষীকে প্রশ্ন করলে তার জবাব তাকে দিতেই হবে । সে স্বাক্ষ্য যদি তার নিজের বিরুদ্ধেও যায় তবু তাকে উত্তর দিতে হবে।  আর নিজের বিরুদ্ধে  স্বাক্ষী দিলে স্বাক্ষীর কোন শাস্তি হবেনা। এর ফলে যে কারোর মিথ্যা স্বাক্ষী দেয়া অত্যন্ত সহজ হবে। সে  বলবে আমি অমুকের সাথে অমুককে হত্যার সময়, ধর্ষনের সময় এবং অগ্নি সংযোগের সময় ছিলাম। কারণ এটি বলার জন্য তার কোন সমস্যা হবেনা।
ট্রাইট্যুনাল যদি অন্যায় রায় দেয়   তাহলে  আপনি আদালতে যেতে পারবেননা, চ্রালেঞ্জ করতে পারবেনন। তিনি বলেন, আইনের প্রতি সেকশনে গলদ আছে ।
যুগোশ্লাভিয়া,   রূযান্ডসহ যেখানেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে  তাতে সারা বিশ্ব থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ করা হয়েছে এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা হয়েছে। যুগোশ্লাভিয়ায় নয়টি দেশ থেকে  নয় জন বিচারক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।  রুয়ান্ডায় ৬ জন দিয়ে শুরু হয়েছিল।  রোমের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ১৮ জন বিচারপতি রয়েছে। আর  বাংলাদেশের ট্রাইবিউনালের অবস্থা হল আমরাই জামাইর মা, আমরাই কইন্যার মা। একই দলের বিচারপতি, একই দলের আইনজীবী, একই দলের তদন্ত কর্মকর্তা। পত্রিকায় প্রকাশিত মতামত, ছবিও এখানে দলিল হিসেবে বিবেচিত সহবে। এটা হতে পারেনা।  এর মাধ্যমে কি যে বিচার হবে তা আল্লাহই ভাল জানেন  বলে মন্তব্য করেণ টিএইচ খান।  

টিএইচ খান বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের সাথে বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল  ক্রাইমস এ্যাক্টের কোন মিল নেই। আকাশ আর পাতাল পার্থক্য।  মিল আছে শুধু ইন্টারন্যাশনাল শব্দের মধ্যে।  

আইনের সংশোধন বিষয়ে টিএইচ খান বলেন,  ১৯৭৩ সালের মুল আইনে ছিল, শসস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং সহায়ক বাহিনীর সদস্যদের বিচারের কথা। ২০০৯ সালের জুলাইতে যে সংশোধনী করা হল তাতে ব্যক্তি এবং  গ্রুপের কথা ঢুকিয়ে  দেয়া হল। কারণ  বাংলাদেশে তো আর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর লোক নেই। আছে এখানকার লোকজন। তাই  তাদের ধরার জন্য এ  ব্যবস্থা হল।  সংশোধনীর উদ্দেশ্য মহত নয়।

৭৩ সালের আইন ও বিচার নিয়ে উদ্বেগ আইবিএ’র

মেহেদী হাসান

৩৫ হাজার আইনজীবী এবং  ১৯৭ টি আইনজীবী সংস্থা নিয়ে  গঠিত  বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় আইনজীবী সমিতি ‘ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশন’  (আইবিএ) ১৯৭৩ সালের আইনের বিশ্লেষন করে যুক্তরাজ্য  সরকারের সংসদীয় মানবাধিকার  গ্রুপের কাছে ১৭ দফা সুপারিশ পেশ করেছে ২০০৯ সালে। 

আইবিএ’র সুপারিশ মালায়  বলা হয়েছে, “আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল: এই আইনে অভিযুক্ত  ব্যক্তির স্বার্থ  ও অধিকার সংরক্ষন। আমরা মনে করি এই আইনে স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মানদন্ডের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়  এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার  সংরক্ষন বিষয়ক যে আন্তর্জাতিক চুক্তি আছে তার কিছু কিছু ১৯৭৩ সালের আইনে অন্তর্ভুক্ত  হলেও  অনেকগুলো  মানদণ্ড এতে অনুপস্থিত রয়েছে যা ট্রাইব্যুনালকে সমালোচনার মুখোমুখি করবে।
আইবিএ ১৯৭৩ সালের আইনের  বেশ কয়েকটি ধারা/উপধারা বাতিলের সুপারিশ করেছে যা ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।  এর মধ্যে একটি হল ১৮ নং ধারা।  ১৯৭৩ সালের আইনের ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, স্বাক্ষী তার নিজের বিরুদ্ধেও স্বাক্ষ্য দিতে বাধ্য থাকবে তা  যদি তার নিজের বিরুদ্ধেও যায় ।  তার প্রদত্ত স্বাক্ষ্যে যদি প্রমানিত হয় যে সে নিজেও ঐ অপরাধের সাথে জড়িত ছিল  তবু তাকে স্বাক্ষ্য দিতে হবে । সেক্ষেত্রে স্বাক্ষীকে তার অপরাধের  জন্য অভিযুক্ত করা যাবেনা, গ্রেফতার  এবং  বিচারও করা যাবেনা।
আইনজীবীদের মতে এর মাধ্যমে একজন স্বাক্ষীকে মিথ্যা স্বাক্ষ্য প্রদানের অবাধ লাইসেন্স দেয়া হয়েছে এখানে। স্বাক্ষীকে দিয়ে আসামীর বিরুদ্ধে বলানো হবে “অমুককে হত্যা, অমুকের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের সময় আমিও আসামীর সাথে   ছিলাম”। এভাবে আসামী নিজেকে অপরাধের সাথে জড়িত করে স্বাক্ষ্য দিলেও ঐ অপরাধের জন্য তার বিচার হবেনা। ফলে তারা মিথ্যা স্বাক্ষ্য দেবে কাউকে ফাঁসানোর জন্য।

আইবিএ’র সুপারিশে ১৯ ধারার ১ উপধারাও বাতিল করার  দাবি জানানো হয়েছে। ১৯ এর ১ উপধারায় স্বাক্ষ্য আইনের বিধান বাতিল করা হয়েছে। অর্থাৎ আদালতে উপস্থাপিত ডকুমেন্ট সত্য হিসেবে  গৃহীত হবার  যে শর্ত রয়েছে তা উঠিয়ে দেয়া হয়েছে।   ফলে ম্যাগাজিন বা পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন, ছবি, চলচ্চিত্র এবং ক্যাসেটে রেকর্ড করা  ডকুমেন্ট এর ওপর ভিত্তি করে  আসামীকে অভিযুক্ত করা যাবে।



আইবিএ’র  বাতিল তালিকার আরেকটি ধারা হল  ১১  এর ২ উপধারা।  এ ধারায় অভিযুক্ত ব্যক্তির নিরব  থাকার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে।  কোন প্রশ্নের উত্তর না দিলে ধরে নেয়া হবে সে দোষ স্বীকার করেছে।  অথচ নিরব থাকার অধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃত একটি বিষয়।

এছাড়া ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে  স্বতন্ত্র আদালতে (স্রপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ ব্যতীত)   আপীল করার অধিকার প্রদান , ট্রাইব্যুনালের গঠন, চেয়ারম্যান বা  অন্য যেকোন সদস্যের  নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করার অধিকার  প্রদান এবং স্বাক্ষ্য আইন সংযোজনের দাবি জানিয়েছে আইবিএ। 
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে যে আইন প্রণয়ন করা হয় তা সংসদে পাশ করার জন্য সংবিধানে সংশোধনী আনতে হয়েছিল। কারণ, আইন বিশেষজ্ঞদের  মতে  সংবিধানে স্বীকৃত কতিপয় মৌলিক অধিকার হরন করা হয়েছে  ১৯৭৩ সালের আইনে। সেজন্য সংবিধান সংশোধন করে করে ৪৭ (৩) ও ৪৭ (ক) অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয় । ১৯৭৩ সালের আইনে যে মৌলিক অধিকার হরণের  বিষয় রয়েছে তাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এ দুটি সংযোজনীর মাধ্যমে  । সংবিধানে ৪৭ (ক) অনুচ্ছেদ সংযোজনের ফলে জুডিশিয়াল রিভিউর অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধের জন্য গঠিত আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যেতে পারবেনা অভিযুক্ত ব্যক্তি।    শুধুমাত্র বিচার হয়ে গেলে পরে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে যাওয়া যাবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে আপীল বিভাগে  বিস্তারিতভাবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন এবং খন্ডনের সুযোগ নেই। এটি থাকে হাই কোর্টে। কিন্তু সেখানে যাবার সুযোগ নাই অভিযুক্তের। বাংলাদেশ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বিষয়ে যে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করা হয়েছে তাতে এই  জুডিশিয়াল রিভিউকে সংবিধানের মূল কাঠামো হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর  এই জুৃডিশিয়াল রিভিউর বিধান রাখা হয়নি ১৯৭৩ সালের আইনে। এছাড়া সংবিধান সংশোধন করে ১৯৭৩ সালের আইনকে প্রটেকশন দেয়ার ফলে ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিচারক নিয়োগ এবং রায় নিয়ে কোন আদালতে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবেনা।
যুক্তরাজ্য রানীর সাবেক কাউন্সেলর এবং  বিচারপতি মাইকেল জে বেলফ ১৯৭৩ সালের আইনে জুডিশিয়াল রিভিউ’র ক্ষমতা খর্ব করে  সংবিধানে যে প্রটেকশন দেয়া হয়েছে তাকে অসাংবিধানিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মাইকেল  বেলফের মতে ১৯৭৩ সালের আইনের ৬ নং ধারার ৮ উপধারা অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের গঠনকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারার যে বিধান রাখা হয়েছে তাতে এ ট্রাইব্যুনাল পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।  মাইকেলের মতে ১৯৭৩ সালের আইনে সুনির্দিষ্ট কিছু বিধানের অনুপস্থিতি আইনটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষনাপত্র ও আন্তর্জাতিক নাগরিক ও  রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত চুক্তি বিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ করেছে।

আমি এখনো সন্তুষ্ট নই-স্টিফেন জে র‌্যাপ

১৫/৫/২০১৩,

মেহেদী হাসান
বাংলাদেশে বানবতা বিরোধী অপরাধ বিচার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র‌্যাপ বলেছেন, আমি  এখনো সন্তুষ্ট নই।  বিচার বিষয়ে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে (আই এ্যাম নট ইয়েট স্যাটিসফাইড। আই ডু হ্যাব কনসার্ন)। তবে বিচার প্রকৃয়া বিষয়ে তার পুর্বের দেয়া সুপারিশ এবং আরো কিছু প্রসঙ্গে  তিনি বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।

দু’দিনের ঢাকা সফর শেষে স্টিফেন যে র‌্যাপ আজ আমেরিকান সেন্টারে  সাংবাদিকদের কাছে তার মতামত ব্যক্ত করেন এবং বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেন, আপনি মঙ্গলবার রাতে আসামি পক্ষের আইনজীবীদের সাথে বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে আসামী পক্ষ আপনার বরাত দিয়ে বলেছেন আপনি বিচার নিয়ে তাদের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আবার বুধবার আপনি আইনমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী আপনার বরাত দিয়ে বলেছেন আপনি বিচার নিয়ে সন্তুষ্ট।  এ প্রেক্ষিতে আমরা আপনার মুখ থেকে  নির্দিষ্ট করে শুনতে চাই বিচার বিষয়ে আপনি সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট। খুসী না অখুসী।
এ প্রশ্নের জবাবে স্টিফেন জে র‌্যাপ  বিচার নিয়ে সার্বিক অবস্থা বর্ননা করে বলেন, আমি  এখনো সন্তুষ্ট নই।  বিচার বিষয়ে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে (আই এ্যাম নট ইয়েট স্যাটিসফাইড। আই ডু হ্যাব কনসার্ন)।

সংবাদ ব্রিফিয়ের সময় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা উপস্থিত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিযুক্ত যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র‌্যাপ গত মঙ্গলবার দুদিনের সফরে ঢাকা আসেন। ঢাকা সফরকালে যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে আসামী পক্ষ, রাষ্ট্রপক্ষ এবং আইনমন্ত্রীর সাথে মতবিনিময় করেন তিনি। ট্রাইব্যুনালও সফর করেন গতকাল। এর আগেও যুদ্ধাপরাধ বিচার পর্যবেক্ষনের জন্য তিনি তিন দফা ঢাকায় আসেন এবং  বিচারকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য  তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুপারিশ পেশ করেন বাংলাদেশ সরকারের কাছে।

দুদিনের সফর শেষে সাংবাদিকদের কাছে তার অবস্থান তুলে ধরে স্টিফেন জে র‌্যাপ গতকাল তার ব্রিফিংয়ের  শুরতে বলেন, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কাউকে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে সন্দোহীতভাবে অপরাধ প্রমান করতে হবে। বাংলাদেশে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় সংবিধানের আলোকে যেসব  বিষয় কার্যকর আছে তার  অনেক কিছু ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় ।
বিচারকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহনযোগ্য, স্বচ্ছ এবং আসামীর অধিকার রক্ষা বিষয়ে স্টিফেন জে র‌্যাপ ইতোপূর্বে যেসব অভিমত, সুপারিশ পেশ করেন তা পুনর্ব্যক্ত করেন গতকাল।
বাংলাদেশে যে বিচার হচ্ছে তা স্থানীয় আইনে, স্থানীয় বিচারকদের দিয়ে হচ্ছে। কিন্তু অপরাধটা আন্তর্জাতিক। এ বিষয়ে নানা সমালোচনার প্রেক্ষিতে সাংবাদিকরা স্টিফেন জে র‌্যাপের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক এসব অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন রয়েছে। তাই নতুন করে এ বিষয়ে কোন কিছু সংযোজনের সুযোগ  নেই ।
রাজনৈতিক উদ্দেশে বিচার পরিচালনার অভিযোগ এবং শাহবাগের দাবির প্রেক্ষিতে আইনের সংশোধন বিষযক এক প্রশ্নের জবাবে স্টিফেন জে র‌্যাপ বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশে বিচার হচ্ছে এ অভিযোগ উঠেছে প্রতিবারই। তাই এটাকে আরো বেদনাদায়ক করার জন্য রায় হয়ে যাওয়ার পর আইন সংশোধন করাটা ভাল দেখায় না। আর কোন পক্ষের দাবির দিকে তাকিয়ে নয় বরং  ঘটনা (ফ্যাক্টস) এবং সাক্ষ্য প্রমানের ওপর ভিত্তি করেই বিচারকদের রায় দেয়া উচিত। রাজনীতি নয় বরং ফ্যাক্টস এর ওপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

যুদ্ধাপরাধ বিচার আওয়ামী লীগের একটি নির্বাচনী অঙ্গিকার ছিল এবং জনগন তাদের এজন্য ভোট দিয়েছে। এ বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাপ বলেন, বিচারে রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রতিফলন আছে এং রাজনৈতিক ইচ্ছা এখানে একটি বিষয় (দেয়ার ইজ এ রিফেকশন অব পলিটিক্যাল উইল এন্ড পলিটিক্যাল উইল ইজ এ ফ্যাক্টর)।

মৃত্যুদন্ড প্রদান বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আরো সতর্ক  হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।