সাঈদী : বিশেষ রিপোর্ট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাঈদী : বিশেষ রিপোর্ট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

সুখরঞ্জন বালীর জন্য অপেক্ষা

মেহেদী হাসান, ২১/৯/২০১৪
‘মোর স্বামীর পরানডা কি  আছে? আমনেগো পায় ধরি, মোর স্বামীরে আইন্যা দ্যান।  মোরে এটটু খবর  দ্যান।”
প্রায় দুই বছর আগে সুখরঞ্জন বালীর স্ত্রী আরতী রানী  এই আকুতি প্রকাশ করেছিলেন। বালী নিখোঁজ হবার পর ২০১২ সালের   ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আরতী রানীকে ফোন করা হলে নিখোঁজ স্বামীর জন্য তিনি বিলাপ করে এভাবে আকুতি প্রকাশ করেছিলেন।

নিখোঁজ স্বামীর কোন সন্ধান ছাড়াই আরতী রানীর পর হয়ে যায় ছয় মাস।  এরপর ২০১৩ সালের ১৬ জুন ঢাকার নিউএজ পত্রিকায় খবর বের হয় সুখরঞ্জন বালীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি ভারতের কারাগারে বন্দী আছেন। 

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে ২০১২ সালের পাঁচ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে অপহরনের শিকার হন সুখরঞ্জন বালী। গত ১৭ সেপ্টেম্বর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল মামলার চূড়ান্ত রায় হয়েছে। কিন্তু বালীর জন্য অপেক্ষার পালা শেষ হয়নি তার অসুস্থ স্ত্রী এবং সন্তানদের।

গত শুক্রবার সকালে আবার ফোনে যোগাযোগ করা হয় সুখরঞ্জন বালীর স্ত্রী আরতী রানীর সাথে। স্বামীর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেই কান্নার  সুর ভেসে আসতে থাকে ফোনের ওপার থেকে।  “মোর স্বামীরে আইন্না এটটু দেহান মোরে। মোর অসুখ। মরার আগে স্বামীর মুখ দেখে যেন মরতে পারি হেই ব্যবস্থা করেন আমনেরা।”

সংসার কিভাবে চলছে জানতে চাইলে আরতী রানী জানান, তার স্বামী সুখরঞ্জন বালী কাঠমিস্ত্রীর কাজ করত। নিখোঁজ হবার আগে একটি ঘর বানিয়েছিলেন নিজেদের জন্য ।  কিন্তু সে ঘরে আজ নেই তিনি। স্বামী নিখোঁজের পর দিশাহীন অবস্থায় পাগলের মত এদিক সেদিক ঘুরেছেন আরতী রানী। বেহাল দশা নেমে আসে সংসারে। আগে থেকেই তার হাপানীসহ আরো রোগব্যাধি ছিল। স্বামীর শোক এবং সংসারের এ দুরবস্থার কারনে তার অসুস্থতার মাত্রা আরো বেড়ে যায়। অধিকাংশ সময় তিনি এখন শয্যাশায়ী ।  একমাত্র মেয়ে মনিকার বিয়ে হয়েছিল । সে স্বামীর বাড়ি না থেকে এখন বাপের বাড়ি থাকে তার দেখাশুনার জন্য। মনিকা ছাড়া তাদের  অপুর্ব নামে আরেকটি ছেলে আছে ১৬ বছর বয়সের।

আরতী রানী জানান, স্বামী কাঠ মিস্ত্রী বাবদ যে আয় করত তা দিয়েই চলত সংসার। জমিজমা নেই; সামান্য বাস্তুভিটা এবং একটা গরু আছে। স্বামী নিখোঁজ হবার পর অভাব অনটন নেমে আসে সংসারে। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতে থাকে। গরুটি তিনি বেঁচতে চেয়েছিলেন। মেয়ে বলেছে বাবার স্মৃতি বেচা ঠিক হবেনা ।  একথা বলার সময় আবার কান্নার সুর ভেসে আসে ফোনে।

ফোনে কথা বলার সময় আরতি রানী প্রথমে কথা বলদে দ্বিধা এবং  জড়তা প্রকাশ করেন। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান কত লোক কত কথা জানতে চায়। কার কাছে কি বললে কোন বিপদ নেমে আসে সে ভয়ে আছেন তারা। তার স্বামী মাওলানা সাঈদীর মামলার স্বাক্ষী হওয়া এবং নিঁেখাজ হবার পর অনেক লোক অনেক কথা বলেছে। অনেকে অনেক কিছু জানতে চেয়েছে তাদের কাছে।  অনেকে ভয়ভীতিও দেখিয়েছে।
আরতী রানী বলেন, তার সাথে এখনো অনেকে কথা বলেনা। এড়িয়ে চলে। কারণ এর ফলে যদি তাদেরও কোন বিপদ হয়। দোকানে কোন কিছূ কিনতে গেলে দোকানদার তাড়াতাড়ি সদায় দিয়ে বিদায় করতে চায়।
আরতী রানী জানান, সুস্থ থাকলে তিনি মানুষের বাড়িতে কিছু কাজ টাজ করেন। কিন্তু বেশিরভাগ সময় তিনি এখন অসুস্থ। হাটাচলা করতে পারেননা ঠিকমত। কারণ হিসেবে সঙ্কোচের সাথে জানালেন তার জরায়ু অনেক নিচে নেমে গেছে অনেক দিন থেকে। কোন চিকিৎসা হয়নি। হাপানিরও কোন চিকিৎসা হচ্ছেনা। তুদপরি রয়েছে ঠিকমত খাবার না পাবার সমস্যা। আরতি রানী জানান তার বয়স ৫০ এর উপরে হবে।

কে সুখরঞ্জন বালী : মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে যেসব অভিযোগ আনে তার মধ্যে একটি অভিযোগ হল পিরোজপুরের উমেদপুর গ্রামে বিশাবালী নামে একজনকে  নারকেল গাছের সাথে বেঁধে রাজাকাররা  মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে তারই সামনে গুলি করে হত্যা করে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে মাওলানা সাঈদীকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়। তার মধ্যে একটি হল এই বিশাবালী হত্যার অভিযোগ। আপিল বিভাগের রায়ে বিশবালী হত্যার অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে আজীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। সেই বিশাবালীর আপন ছোটভাই হলেন সুখরঞ্জন বালী। তিনি ছিলেন মাওলানা স্ঈাদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী।  কিন্তু তিনি পক্ষ ত্যাগ করে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালে আসেন। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে  সাক্ষ্য দিতে আসার দিন ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে তাকে অপহরন করা হয়। 

গোটা বিশ্বে এ নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। এরপর ২০১৩ সালের ১৬ মে ঢাকার দৈনিক নিউএজ পত্রিকায় ডেভিড বার্গম্যানের একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয় সুখরঞ্জন বালী বিষয়ে। তাতে বলা হয় সুখরঞ্জন বালীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দমদম সংশোধন কেন্দ্রে রয়েছেন। সুখরঞ্জন বালীর সাথে তারা যোগাযোগ করলে বালী তাদের জানিয়েছেন ঢাকার আইনশঙ্খলা বাহিনী তাকে অপহরন করে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছে।

ভারতে বালী : নিউএজ পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানানো হয় বালীকে ৫ নভেম্বর অপহরনের পর ডিসেম্বরের শেষের দিকে ভারতে পাঠানো হয় জোর করে। অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের দায়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ তাকে গ্রেফতার করে উত্তর চব্বিশপরগনার বশিরহাট জেলে রাখে।  এরপর বশিরহাট আদালত ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল   অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে বালীকে ১০৫ দিনের কারাদণ্ড দেয়।  যেহেতু বিচার চলাকালে এই মেয়াদটা  তিনি কারাভোগ করেছেন, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে  তাকে যেকোনো দিন বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যেতে পারে বলে মত দেন আদালত।

সুখরঞ্জন বালীর ভারতে অবস্থানের বিষয়ে জানার পর হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারতের প্রতি অনুরোধ জানায় তাকে যেন বাংলাদেশে ফেরত না পাঠানো হয় কারণ তাতে তার জীবনের আশঙ্কা রয়েছে।

সুখরঞ্জন বালীকে সহায়তার জন্য এ পর্যায়ে বেশ কিছু মানবাধিকার সংস্থা এবং আইনজীবী এগিয়ে আসেন। সুখরঞ্জন বালীর কারাভোগের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পর তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। সেজন্য তিনি ভারতের সুপ্রীম কোর্টের দ্বারস্থ হন তার সাহায্যে এগিয়ে আসা আইনজীবীদের মাধ্যমে।  সুপ্রিম কোর্টে বালী অনুরোধ করেন তাকে যেন দেশে ফেরত পাঠানো না হয়। দেশে ফেরত পাঠালে তার জীবনহানির আশঙ্কা রয়েছে। ২০১৩ সালের ২রা আগস্ট শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট বালীকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি দুই সপ্তাহ স্থগিত করে আদেশ দেন।

এরপর কলকাতা হাইকোর্ট  ছয় আগস্ট এক আদেশে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশ মেয়াদ শেষ হলে ২০ আগস্টের পর বালীকে দেশে পাঠানোর জন্য।
এ প্রেক্ষিতে বালী ১৩ আগস্ট ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবদন করেন এবং ১৬ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট  এক আদেশে বলেন তাকে দেশে ফেরত পাঠানো বা ভারতে রাখার বিষয়টি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছা। সেই অবধি এখনো ভারতেই সরকারি হেফাজতে আছেন তিনি।

তবে বালীর জন্য অপেক্ষারত তার অসুস্থ স্ত্রী এবং সন্তানেরা চান বালী দেশে ফিরে আসুক এবং আগের মত যেন স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন সে নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করা হোক।




বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ঘটনাবহুল আলোচিত একটি মামলা

 মেহেদী হাসান, ১৭/৯/২০১৪
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে আলোচিত মামলা  হিসেবে স্থান পেয়েছে  ১৯৭১ সালের  যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম।  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেসব মামলা হয়েছে  তার মধ্যে নানা কারনে অন্যতম  আলোচিত এবং ঘটনাবহুল মামলায় পরিণত হয় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা। ট্রাইব্যুনালে মাওলানা সাঈদীর মামলাটিই ছিল প্রথম মামলা। তবে এ মামলার প্রতি মানুষের অধীর আগ্রহের মূলে সেটা গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় ছিলনা। ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে অপহরন করা, স্কাইপ কেলেঙ্কারি, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী গণেশ চন্দ্র  পক্ষ ত্যাগ করে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়াসহ নানা কারনে বিশ্বজুড়ে মনোযোগ আকর্ষণ করে এ মামলা। 

মামলার আসামী যেমন এ মামলায় মানুষের আকর্ষনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু তেমনি এ মামলার বিভিন্ন অভিযোগ এবং মামলাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত একের পর এক ঘটনা প্রবাহের  কারনেও এ মামলার খবরাখবর পাঠকের কাছে ছিল গভীর আগ্রহের বিষয়। ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগ, ‘সাঈদী’ এবং ‘দেলু  শিকদার’ এসব বিষয়ও ছিল এ মামলার আলোচিত বিষয়।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ১৯৭১ সালের ৮ মে তার নেতৃত্বে  পাকিস্তান আর্মি, রাজাকার এবং শান্তি কমিটির লোকজন পিরোজপুরের পাড়েরহাট বাজারের নিকটস্থ  চিথলিয়া গ্রামে যায় এবং মানিক পসারীর বাড়ি লুট করে । এরপর সেখান থেকে ইব্রাহীম কুট্টি এবং মফিজউদ্দিন পসারীকে ধরে পাড়েরহাট বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা ওই বাড়িতে কাজ করত। পাড়েরহাট নেয়ার পর মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে পাকিস্তান আর্মি ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে হত্যা করে । 
বিচার চলাকালে আসামী পক্ষ আদালতে জানান, ইব্রাহীম কট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই পিরোজপুরে একটি মামলা করেছিলেন। সেই মামলায় তিনি পাকিস্তান আর্মিসহ মোট ১৪ জনকে আসামী করেছিলেন। আসামীর তালিকায়  আল্লামা সাঈদীর নাম নেই। ওই মামলার বিবরনে আরো বলা হয় ইব্রাহীম কুট্টিকে  ১৯৭১ সালে ১ অক্টোবর তার শশুরবাড়ি নলবুনিয়ায় হত্যা করা হয়। আসামী পক্ষ অভিযোগ করে মমতাজ বেগম এখনো জীবিত কিন্তু তাকে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হিসেবে হাজির করেনি।

মাওলানা সাঈদী একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মোফাসসিরে কোরআন এবং সুললিত কণ্ঠস্বরের অধিকারী  হওয়ায় দেশে এবং বিদেশে অগণতি মানুষের নিয়মিত মনোযোগের বিষয়ে পরিণত হয়  এ মামলার কার্যক্রম ।
মাওলানা সাঈদীর বিচারে যখন সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয় তখন এ বিষয়ক খবরের জন্য পাঠকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। জেরায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীর মুখ থেকে আইনজীবী মিজানুল ইসলাম কি বের করে আনেন তা জানার জন্য পরের দিনের পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করেছেন অগণিত পাঠক। পিরোজপুরের বর্তমান এমপি একেএমএ আউয়াল মাওলানা সাঈদীর বিপক্ষে সাক্ষ্য দেন। মাওলান সাঈদীর পক্ষেও সাক্ষ্য দিয়েছেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। তাছাড়া জেরায়  রাষ্ট্রপক্ষের বেশ কয়েকজন সাক্ষীর বিরুদ্ধে চুরি, জেল খাটাসহ আরো নানাবিধ তথ্য বের হয়ে আসে যা ছিল  পাঠকের কাছে বেশ  আকর্ষণীয়। 

ট্রাইব্যুনাল থেকে এ মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সারা দেশে দেড়শতাধিক মানুষ জীবন দেয়। সারা দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিবাদে নেমে আসে রাজপথে।
বিচার চলাকালে  এবং বন্দী থাকা অবস্থায় মাওলানা সাঈদী প্রথমে তার মাকে হারান। এরপর  ২০১২ সালে  জুন মাসে বিচার চলাকালে  ট্রাইব্যুনালে বসে অসুস্থ হয়ে মুত্যৃর কোলে ঢলে পড়েন তার বড় ছেলে রাফিক বিন সাঈদী।

মামলা চলাকালে ২০১২ সালের  পাঁচ নভেম্বর মাওলানা সাঈদীর পক্ষে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন সুখরঞ্জন বালী। সেদিন তাকে ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে অপহরন করে নিয়ে যাওয়া হয়। বালী অপহরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সাড়া ফেলে। কারণ সুখরঞ্জন বালী ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। তিনি পক্ষ ত্যাগ করে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। আরো একটি কারনে বালী অপহরন ঘটনা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে সেটি হল  তিনি ছিলেন বিশাবালীর আপন ভাই। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের  অভিযোগ ছিল তার নির্দেশে বিশাবালীকে নারকেল গাছের সাথে বেঁধে হত্যা করা হয়। সেই বিশাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালী এসেছিলেন মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে।
এরপর ২০১৩ সালের ১৬ মে ঢাকার দৈনিক নিউএজ পত্রিকায়  প্রকাশিত ডেভিড বার্গম্যানের  অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে  বলা হয় সুখরঞ্জন বালীর সন্ধান  পাওয়া গেছে। তিনি ভারতের একটি কারাগারে বন্দী আছেন। বালী জানিয়েছেন তাকে আইনশঙ্খলা বাহিনীর লোকজন ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে অপহরন করে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছে। এরপর আবার নতুন করে শুরু হয় এ চাঞ্চল্যকর ঘটনা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। 

গণেশ চন্দ্র সাহা ছিলেন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আরেকজন সাক্ষী। কিন্তু গনেশ রাষ্ট্রপক্ষে  সাক্ষ্য না দিয়ে উল্টো মাওলানা সাঈদীর পক্ষে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন।  ১৯৭১ সালে পিরোজপুরে একটি মর্মান্তিক হত্যাকান্ড হল ভাগিরথী হত্যাকান্ড। বিধবা ভাগীরথীকে পাকিস্তান আর্মি ক্যাম্পে আটকে রেখে ইজ্জত হরন করে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তথ্য পাচারের অভিযোগে ভাগিরথীকে পাকিস্তান আর্মি গাড়ির পেছনে বেঁধে টেনে হিচড়ে হত্যা করে।  মাওলানা সাঈদীর সহায়তায় এই ভাগীরথীকে হত্যার অভিযোগ আনা হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। সেই  ভাগিরথীর ছেলে হলেন সাক্ষী গনেশ চন্দ্র সাহা। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। কিন্তু তিনি কোর্টে এসে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে বললেন  মাওলানা সাঈদী তার মাকে মারেননি। পাকিস্তান আর্মিরাই তার মাকে মেরেছে।  এ ঘটনা তখন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। 

২০১২ সালের ছয় ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে এ মামলার সমস্ত কার্যক্রম শেষে রায়ের তারিখ ঘোষনা করার কথা ছিল। সেদিন দেশ বিদেশের অসংখ্য সাংবাদিক হাজির হন ট্রাইব্যুনালে। কিন্তু সেদিন ফাঁস হল স্কাইপ কেলেঙ্কারীর খবর।  ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নিজেই বিষয়টি ওপেন কোর্টে প্রকাশ করলেন সেদিন এ ঘটনা।  

বিচারপতি নিজামুল হক বলেন,   ব্রাসেলসে বসবাসরত আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের কাছ থেকে ট্রাইব্যুনালের  বিচার প্রকৃয়া চলাকালে এবং বিভিন্ন আদেশের  সময় সহায়তা নিয়েছেন তিনি। এ উপলক্ষে তাদের দুজনের মধ্যে স্কাইপের মাধ্যমে কথপোকথন হয়েছে। এ  তথ্য হ্যাক করে ইকনোমিস্ট হস্তগত করেছে বলে   উল্লেখ করেন তিনি ।
নয় ডিসেম্বর থেকে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে বিচারপতি নিজামুল হক ও ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের স্কাইপ কথোপকথন।  এ নিয়ে দেশে বিদেশে তুমুল ঝড়  ওঠে।    বিচারপতি নিজামুল হকের কথোপোকথনের বিষয়বস্তু পড়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে গোটা জাতি। বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা একে  দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করেন। শুধু স্কাইপ সংলাপ নয় বিচারপতি নিজামুল হক এ বিচার বিষয়ে তার সাথে যেসব মেইল আদান প্রদান করেছেন তাও ফাঁস হয়ে যায়। বিচারের বিভিন্ন বিষয় বেলজিয়াম থেকে লিখে পাঠানোর ঘটনার চিত্র বের হয়ে পড়ে এতে । এ ঘটনার জের ধরে  ১১ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন তিনি।

২০১২ সালের ২০ মার্চ  রাষ্ট্রপক্ষ থেকে  মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে   ৪৬ জন সাক্ষীর বিষয়ে একটি দরখাস্ত দাখিল করা হয়  ট্রাইব্যুনালে । দরখাস্তে নিবেদন করা হয়  ৪৬ জন সাক্ষীকে  ট্রাইব্যুনালে হাজির করা তাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। তাই এসব সাক্ষী  তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন তা তাদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হোক।
সাক্ষী হাজির করতে না পারার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় কেউ নিখোঁজ, কেউ পলাতক, কেউ অসুস্থ, কেউবা চলে গেছে ভারতে।

ট্রাইব্যুনাল ২৯ মার্চ ১৫ জন সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী প্রদান করেন তা তাদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে আদেশ দেয়।

এরপর ৩রা জুন আসামী পক্ষ সেফহাউজের (ঢাকায় যেখানে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী  এনে রাখা হত)  বিশাল ডকুমেন্ট ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়ে বলেন সাক্ষী হাজির করতে না পারা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যে কারণ দেখিয়েছে তা সম্পূর্ণ  মিথ্যা। সাক্ষীগন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ তাদেরকে আদালতে হাজির করেনি।   অনেক সাক্ষী তাদের হেফাজতেই ছিল এবং সেফহাউজের রেজিস্ট্রার বইয়ে  তার প্রমান রয়েছে।  কোন সাক্ষী কবে সেফহাউজে আসে, কতদিন থাকে,  কে কয়বেলা খেয়েছে তার সমস্ত তথ্য রেজিস্ট্রার বইয়ে লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়।  আসামী পক্ষ রাষ্ট্রপক্ষের সেফহাউজ থেকে রেজিস্ট্রার খাতা সংগ্রহ করে ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।  অবশ্য রাষ্ট্রপক্ষ তাকে জাল হিসেবে আখ্যায়িত করে।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার একেবারে শুরুতে বিতর্ক শুরু হয় ট্রাইব্যুনালের তখনকার চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হককে নিয়ে।  বিচারপতি নিজামুল হক ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি  (ঘাদানিক)  গঠিত  জাতীয়  গণতদন্ত কমিশিনের সেক্রেটারিয়েট এর সদস্য ছিলেন।

এ তদন্ত কমিশন কারাবন্দী মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ  মোট ১৬ জনকে  যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করে দুই দফা তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করে ১৯৯৪ এবং ১৯৯৫ সালে। মাওলানা সাঈদীর আবেদনে  বলা হয় যিনি আগে থেকেই আসামীদের বিচারের সাথে জড়িত তার কাছ থেকে ন্যায় বিচার পওয়ার আশা করা যায়না। তাই তাকে সরে দাড়ানোর অনুরোধ করা হয়। এ নিয়ে ট্রাইব্যুনাল থেকে ওয়াকআউট করার ঘটনাও ঘটে আসামী পক্ষের আইনজীবীদের।

শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৩

ভানু সাহাকে তবে কে ধর্ষন করল?

 ২৯/১২/১১

মেহেদী হাসান
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যে বিচার বর্তমানে চলছে তাতে একটি আলোচিত  চরিত্র ভানু সাহা । ভানু সাহাকে জড়িয়ে মাওলানা  দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী,  পিস কমিটির নেতা মোসলেম  উদ্দিন মাওলানা এবং পাক আর্মির বিরুদ্ধে  ধর্ষন বিষয়ে  আদালতে  পরষ্পর বিরোধী সাক্ষ্য   দিয়েছেন সাক্ষীরা।

আদালতে সাক্ষীদের দেয়া তথ্য  এবং অনুসন্ধানে জানা গেছে ভানু সাহার পিতার নাম বিপদ সাহা। । ১৯৭১ সালে পিরোজপুর পারেরহাট বাজারে বিপদ সাহা তার মেয়ে ভানু সাহাকে নিয়ে বাস করতেন।  পারেরহাট বাজারে তাদের একটি দোকান ছিল  এবং দোকানের  পেছনেই   ছিল তাদের বসবাসের ঘর।  ভানু সাহা দেখতে খুবই সুন্দরী  এবং বয়সে তরুনী ছিল তখন ।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে  এ পর্যন্ত আদালতে সাতজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এদের মধ্যে তিনজন সাক্ষী তাদের  জবানবন্দীতে ভানু সাহাকে  ধর্ষনের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। ধর্ষনের বিষয়ে তিনজন সম্পূর্ণ তিন রকম কথা বলেছেন।  একজন সাক্ষী বলেছেন শান্তি কমিটির নেতা মোসলেম উদ্দিন মাওলানা, যিনি এখন পিরোজপুর ওলামা লীগের  নেতা,  তিনি ভানু সাহাকে নিয়ে ভানু সাহার বাড়িতে বাস করতেন। অপর  আরেক সাক্ষী  বলেছেন, ভানু সাহাকে মাওলানা সাঈদী নিয়মিত ধষর্ন করতেন। আরেক  সাক্ষী  বলেছেন, পাক আর্মি তাকে  আটকে রেখে মাসের পর মাস ধর্ষন করত। তিন সাক্ষীর এই পরষ্পর বিরোধী  বক্তব্যের ফলে প্রশ্ন উঠেছে ভানু সাহা  সত্যিকার অর্থে কার দ্বারা নির্যাতনের  শিকার হন।

গত ২৭ ডিসেম্বর  মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পঞ্চম সাক্ষী  মাহতাব উদ্দিন হাওলাদার জেরার সময় জানান, পারেরহাটে বিপদ সাহার  মেয়েকে নিয়ে বিপদ সাহার বাড়িতেই বাস করতেন  পিস কমিটির নেতা মোসলেম উদ্দিন মাওলানা। মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী তাকে প্রশ্ন করেন, ভানু সাহাকে মোসলেম মাওলানা বিয়ে করে জামাই হিসেবে থাকতেন কি-না।  তখন মাহতাব উদ্দিন বলেন, বিয়ে করেছিল কিনা বলতে পারবনা। তবে গন্ডগোলের সময় ভানু সাহাকে নিয়ে মোসলেম মওলানা   থাকতেন বিপদ সাহার বাড়িতে।  মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী   সাক্ষীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, মোসলেম উদ্দিন মাওলানা বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত এবং তিনি   পিরোজপুর ওলামা লীগের সভাপতি  এ বিষয়টি জানেন কি-না? সাক্ষী  ‘সত্য নয়’ বলে জবাব দেন।

এর আগে ৮ ডিসেম্বর দ্বিতীয় সাক্ষী রুহুল আমিন নবিন আদালতে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, ভানু সাহা ও  ছবি রায়সহ আরো অনেক  মেয়েদের  পাক আর্মি শান্তি কমিটি ও  রাজাকারদের সাথে নিয়ে  ধর্ষন করত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে।  ভানু সাহাকে দীর্ঘ কয়েক মাস  আটকে রেখে পাক  আর্মি উপর্যপুরী ধর্ষন করে। 

এ দুজন সাক্ষী ভানু সাহাকে ধর্ষন বিষয়ে মাওলানা সাঈদীর নাম বলেননি।  কিন্তু ২১ ডিসেম্বর  চতুর্থ সাক্ষী  সুলতান আহমদ হাওলাদার আদালতে ভানু সাহা প্রসঙ্গে  বলেন, মাওলানা সাঈদী  ভানু সাহাকে নিয়মিত ধর্ষন করত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। 

মোসলেম মাওলানার খপ্পরে ভানু সাহা
পারেরহাট    সূত্র জানায় মোসলেম মাওলানা একটি লাঠি  হাতে নিয়ে পারেরহাট বাজারে ঘোরাফেরা করত। বাজারে মাতব্বরী খবরদারী করত।  উর্দু ভাষা ভাল জানায় তিনি পাক আর্মিদের সাথে সবরকম যোগাযোগ করতেন এবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। পারের হাটে  পিস কমিটি গঠনে ভূমিক পালন এবং পাক আর্মির সাথে সম্পর্কের কারনে  তখন  পারেরহাটের একচ্ছত্র নেতায় পরিণত হন তিনি।
পারেরহাট বাজারে  নিয়মিত যাতায়াতের সুবাদে  মোসলেম মাওলানার  চোখ পড়ে  বিপদ সাহার  মেয়ে ভানু সাহার ওপর।  মোসলেম মাওলানা ভানুসাহাকে বিয়ের জন্য চাপ দেয় বিপদ সাহার ওপর।  বিপদ সাহা তখন মোসলেম মাওলানাকে তার বাড়িতে ওঠাতে  বাধ্য হন তার প্রভাবের কারনে। সেই সুযোগে মোসলেম মাওলানা ভানু সাহার সাথে একত্রে বসবাস করে।  মোসলেম মাওলানার প্রভাবে এবং পাক আর্মিদের হাত থেকে রক্ষার জন্য বিপদ সাহা এবং তার ছেলেরা তখন মাথায় টুপি পরে বাজারে যাতায়াত করত। মাঝে মাঝে মসজিদে গিয়ে নামাজও পরত। বাজারের লোকজন তখন মনে করত মোসলেম মাওলানা  ভানুসাহা এবং তার পরিবারের সবাইকে মুসলমান বানিয়েছে  এবং ভানু সাহাকে বিয়ে করে তার সাথে বাস করছে।  তবে বিয়ে হয়েছিল কিনা  সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধারা  ভানু সাহাকে উদ্ধার করে। এরপর তারা সবাই আবার নিজ ধর্মে ফিরে যায়  সবাই ভারতে চলে যায়। 

মোসলেম মাওলানার একচ্ছত্র প্রভাবের কারনে এবং পারেরহাট বাজার  তাদের নিয়ন্ত্রনে থাকায় তখন  ভানু সাহার সাথে বসবাস নিয়ে কেউ তার বিরুদ্ধে কোন কথা বলার সাহস পায়নি। সবাই তখন তাকে ভয় করে চলত।

কে এই মোসলেম মাওলানা?
পিরোজপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বইয়ের ৪১২ পৃষ্ঠায় স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে মোসলেম মাওলানার অপকর্মের বিষয়ে  উল্লেখ আছে।  মোসলেম মাওলানা ১৯৬৯ সালে ঢাকা রেসিডেন শিয়াল মডেল স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি এলাকায় চলে আসেন। তার গ্রাম বাদুরায়।  পারেরহাটে পাক আর্মি আসার আগেই  মোসলেম মাওলানার নেতৃত্বে সেখানে পিস কমিটি গঠন করা হয়। পিস  কমিটির সভাপতি করা হয়  রাজলক্ষী স্কুলের  সাবেক শিক্ষক এবং পরবর্তীতে  ইউনিয়ন চেয়ারম্যান দানেশ মোল্লাকে। সেক্রেটারি করা হয় সেকেন্দার শিকদারকে। তবে পিস কমিটি পরিচালনার কাজ করেন  মোসলেম মাওলানা।

স্বাধীনতার পরপরই  এলাকা থেকে পালিয়ে যায় মোসলেম মাওলানা। এরপর এরশাদের সময় আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।  আশ্রয় নেন  জমিয়তুল মোদাররেছীনের তলে।  পরবর্তীতে জড়িত হন আওয়ামী লীগের অঙ্গ সঙ্গঠন ওলামা লীগের সাথে।

মোসলেম মাওলানার  অপকর্মের দায়ভার মাওলানা সাঈদীর?
যে ভানু সাহার সাথে বাস করত  মোসলেম মাওলানা  সেই ভানু সাহাকে  জড়িয়েই মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিচ্ছে সাক্ষীরা ।


মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পারেরহাট বাজারে  লুটপাট অগ্নিসংযোগ বিষয়ে আদালতে এ পর্যন্ত যতজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের সকলেই বলেছেন, মাওলানা সাঈদী আরবী এবং  উর্দু ভাল জানায় তিনি  পারেরহাট বাজারে পাক সেনা ক্যাম্পের ক্যাপ্টেন এজাজের সাথে সকল প্রকার যোগাযোগ রক্ষার কাজ করতেন।  তিনিসহ অন্যান্য পিস  কমিটির নেতারা পারের হাট বাজারে পাক আর্মি আসার পর অভ্যর্থনা জানান। মাওলানা সাঈদীর নামের সাথে প্রায় সবগুলো ঘটনায় মোসলেম মাওলানার নাম উল্লেখ করেছে

সাক্ষীরা। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তারা বলেছে মাওলানা সাঈদী উর্দু ভাষায় পাক সেনাদের সাথে কথাবার্তা বলছেন  এবং সকল প্রকার যোগাযোগ রক্ষা করতেন। মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে এবং নেতৃত্বে  পাক আর্মি সেখানে সকল অপকর্ম পরিচালনা করত।  

কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে মোসলেম মাওলানা উর্দু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন  এবং  তিনিই পাক আর্মিদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন।  কিন্তু  মোসলেম মাওলানার বিরুদ্ধে অভিযোগের স্থলে এখন বসিয়ে দেয়া হয়েছে মাওলানা সাঈদীর নাম। 

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় আরেকটি আলোচিত ঘটনা ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা মামলা। মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে ইব্রাহীম কুট্টিকে পারেরহাট বাজারে পাক আর্মি  মে মাসে হত্যা করেছে বলে সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিয়েছেন। কিন্তু ইব্রাহীমের স্ত্রী  মমতাজ বেগম   দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে স্বামী হত্যার অভিযোগে একটি মামলা করেন। সে মামলায় আসামী করা হয় মোসলেম মাওলানাকে। মাওলানা সাঈদী নন। তাছাড়া  স্ত্রীর দায়র করা মামলার এজহারে ইব্রাহীমকে হত্যার ঘটনা স্থল  উল্লেখ করা হয়েছে ইব্রাহিমের শ্বশুর বাড়ি নলবুনিয়া  গ্রাম। পারেরাট বাজার নয়। ঘটনার তারিখ অক্টোবর মাস, মে মাস নয়।  মমতাজ বেগমের মামলায় মাওলানা সাঈদীর নাম  আসামীর তালিকায় না থাকা সত্ত্বেও   এবং ঘটনাস্থল ও ঘটনার তারিখ সম্পূর্ণ ভিন্ন   হবার পরও ইব্রাহীম হত্যার জন্য মাওলানা সাঈদীকে জড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাক্ষীরা।
মোসলেম মাওলানার সাথে যোগাযোগের জন্য মোবাইলে ফোন দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।


মোর স্বামীর পরানডা কি আছে?//বিলাপ করে বলল বালীর স্ত্রী


২৫/১২/২০১২
 Mehedy Hasan
‘মোর স্বামীর পরানডা কি  আছে? আমনেগো পায় ধরি, মোর স্বামীরে আইন্যা দেন। মোরে এটটু ঢাকা লইয়া যান। মুই যামু।’

 দৈনিক নয়া দিগন্তের পক্ষ থেকে ফোন করা হয় অপহরনের শীকার সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীর স্ত্রী আরতী রানী বালীর কাছে। সুখরঞ্জন বালীর কোন খোঁজ পেলেন কি-না, আপনাদের এখন কি অবস্থা এসব প্রশ্ন করতেই   কান্নার সুর ভেসে আসতে থাকে ফোনের অপর প্রন্ত থেকে। কান্না আস্তে আস্তে বিলাপে পরিণত হয়। বিলাপ করতে করতে  আরতী রানী বারবার একটা কথাই বলতে লাগল ‘মোর স্বামীরে  আইন্যা দেন, মোর স্বামীরে আইন্যা দেয়ার ব্যবস্থা করেন।  মোর স্বামীর পরানডা কি আর আছে? মোরে এটটু  খবর দেন।’


আরতী রানী  কাঁদতে কাঁদতে আরো বলেন, ‘ক্যান যে হে সাক্ষ্য দেতে গেল। আগেই বাড়ি আইয়া লোকজন কইছিল সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেলে তোরা বাঁচতে পারবিনা। শেষ পর্যন্ত কি হেইয়্যাই (তাই)   আইল । ৩ তারিখ গেল ঢাকা। ৫ তারিখ ধইর‌্যা লইয়া গেল। আর কোন খবর পাইলামনা।’

আপনারা কোনভাবে খোঁজ খবর নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন কি-না বা কেউ কোন খবর দিয়েছে কি-না জানতে চাইলে  আরতী রানী বলেন, ‘মোরা মুর্খ মানুষ। কোথায় কার কাছে কি খোঁজ নিমু। কারে জিগামু। কে দেবে মোর স্বামীর খবর। মুই পইর‌্যা আছি বিছানায়। কাসতে কাসতে মোর জীবন যায়। মোর অসুখ।’
আপনাদের আয় রোজগার কি, সংসার কিভাবে চলছে জানতে চাইলে আবার কান্না জুড়ে দিয়ে  বলেন, সংসার আর চলেনা। মাইয়ার জামাই ৫ কেজি চাউল দেছে।  বুইনে দেয় মাঝে মাঝে, ভাইয়ে দেয়। মাঝে মাঝে  অন্যরা দুয়েক কেজি চাউল লইয়া আয়। এইভাবে আর কয়দিন চলবে।’

সুখরঞ্জন বালী কি করত জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিস্ত্রির কাজ করত। এই দিয়ে সংসার চলত। আবার কান্নার সুর তুলে ুিতনি বলতে লাগলেন ‘ঘর বানাইছে কিন্তু ঘরে রইতে পারলনা। মানুষটা  কই চইল্যা গেল। আমনোগো পায়ে ধরি, মোর স্বামীরে আইন্যা দেন।  আর কিছু চাইনা।’
ছেলে মেয়ের  বিষয়ে জানতে চাইলে আরতী রানী বলেন, এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলের বয়স ১৭/১৮ বছর।

গত ৫ নভেম্বর সুখরঞ্জন বালী মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে  সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ।  ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা  তাকে অপরহন করে ।  মাওলানা সাঈদীর পক্ষের কয়েকজন আইনজীবী এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এ ঘটনা সাথে সাথে ট্রাইব্যুনালকে (১) অবহিত করে আসামী পক্ষ। ট্রাইব্যুনাল চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুকে   এ বিষয়ে খোঁজ নেয়ার জন্য নির্দেশ  দেন। বেশ কিছুক্ষন পর তিনি ট্রাইব্যুনালে এসে জানান তিনি দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে এ নিয়ে আলাপ করেছেন। তারা জানিয়েছেন এ ধরনের কোন ঘটনার খবর তারা জানেননা। ট্রাইব্যুনালের গেটে এ জাতীয় কোন ঘটনাই ঘটেনি।  এভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপহরনের দায়িত্ব অস্বীকার করে বিষয়টি এড়িয়ে গেল।
তারপর থেকে আজ অবধি নিখোঁজ সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী।

সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য  না দিয়ে মাওলানা  সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। বালীর বড় ভাই বিশাবালী ১৯৭১ সালে শহীদ হয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়েছে। নিখোঁজ হবার আগে বালী একটি টিভিতে প্রদত্ত সাক্ষাৎকার দিয়ে বলে গেছেন পাকিস্তান আর্মি তার ভাইকে মেরেছে। তার ভাইকে  ঘর থেকে ধরে  নেয়া এবং  হত্যার সময় সাঈদী সাহেব  ছিলনা।

গত পাঁচ নভেম্বর মাওলানা সাঈদীপর  আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম, মনজুর  আহমদ আনসারী, হাসাুল বান্না সোহাগের সাথে একই গাড়িতে করে ট্রাইব্যুনালে আসছিলেন সুখরঞ্জন বালী। সেদিন ট্রাইব্যুনালে বিশেষ নিরাপত্তার  আয়োজন ছিল। বালীকে অপরহন করে নিয়ে যাওয়া বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবীরা জানান, তাদের বহনকারী গাড়িটি ট্রাইব্যুনালের গেটে পৌছলে গাড়ি থামিয়ে তাদের সামনেই বালীকে গাড়ি থেকে নামায়   পুলিশের লোকজন। এরপর  তাকে সাদা পোশাকধারী  গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা দুই দিক থেকে দুই হাত ধরে  টেনে দূরে নিয়ে পুলিশের গাড়িতে করে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশের লোকজন।


বিভিন্ন সূত্র  থেকে জানানো হয়েছে অপহরনের পর দুবার তাকে পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল অসুস্থ অবস্থায়। কিন্তু সর্বশেষ  সুখরঞ্জন বালী কোথায় কি অবস্থায় আছে তার খোঁজ খবর কেউ বলতে পারলনা। মানবাধিকার সংস্থারও  কেউ এগিয়ে আসেনি বালী বা তার পরিবারের  পাশে দাড়ানোর জন্য। ঢাকায় একটি মানবাধিকার সংস্থার প্রধানকে ফোন করা হলে তিনি বিরক্তসহকারে বলেন আমরা এ নিয়ে কোন কথা বলতে চাইনা। এ  নিয়ে আমরা কোন খোঁজ রাখিনা। কিছু জানিনা। আমাকে মাফ করবেন, কিছু মনে করবেননা, আমি এ নিয়ে কোন কথা বলতে পারবনা।

সাক্ষাতকারে সুখরঞ্জন বালী//আমার ভাই হত্যার সময় সাঈদী সাহেব ছিলেন তা কখনো শুনিনাই// তারা আমাকে দিয়ে মিথ্যা বলানোর চেষ্ট করছে

 ৯/১১/২০১২
Mehedy Hasan
মাওলানা  সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে  অপহরনের শিকার সুখরঞ্জন বালী বলেছেন, আমার ভাইকে হত্যার সময় সাঈদী সাহেব ছিলেন বলে কখনো শুনিনাই। মিলিটারি এবং  দেশীয় যেসব লোক আমাদের বাড়ি থেকে আমার ভাইকে ধরে নিয়ে যায় সেদিন সাঈদী সাহেব সেখানে ছিলেননা, তাকে দেখিনাই।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হওয়া সত্ত্বেও সাক্ষ্য দিতে না আসা প্রসঙ্গে সুখরঞ্জন বালী বলেছেন, মামলার বাদী মাহবুবুল আলম হাওলাদার আমাকে  বলতে বলে সাঈদী সাহেব ছিল এই কথা বলবা। আমাকে দিয়া তারা মিথ্যা কথা বলানোর জন্য চেষ্টা করছে । তাতে রাজি না হওয়ায় আমারে তারা আনেনাই। আমিও   হেদিকে  যাই নাই ।

গত চার নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে সাক্ষাৎকারে সুখরঞ্জন বালী উপরোক্ত কথা বলেন। রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার বিনিময়ে তাকে একটি বাড়ি একটি খামার এবং নগত অর্থও  দিতে চাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন সুখরঞ্জন বালী।

১৯৭১ সালে  পিরোজপুরে উমেদপুরে বিশাবালী নামে এক ব্যক্তিকে নারকেল গাছের সাথে বেঁধে মাওলানা  সাঈদীর নির্দেশে এবং উপস্থিতিতে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ আনা হয়েছে  মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে। সেই বিশাবালীর ছোট ভাই সুখরঞ্জন বালীকে সাক্ষী করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। তবে তিনি রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে সাক্ষ্য দিতে না এসে মাওলানা সাঈদীপর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন গত  পাঁচ নভেম্বর। সেদিন তাকে গোয়েন্দা পুলিশ অপহরন করে নিয়ে যায় ট্রাইব্যুালের গেট থেকে।

বিশাবালী নিহত হওয়া বিষয়ে সুখরঞ্জন বালী বলেন, ১৯৭১ সালের জৈষ্ঠ্য মাসের মাঝামাঝি সময়  হবে। আমার ভাই বিশাবালী  অসুস্থ  ছিলেন  ।  ঘটনার দিন মিলিটারি আসার খবর এবং চিৎকার টের পেয়ে  আমি আমার মাকে নিয়ে বাড়ির পাশে বাগানে যাই।  আমার অসুস্থ ভাই ঘরে থাকে।  ১৫/১৬ জন মিলিটারি আসে। তাদের সাথে  রাজ্জাক, সেকেন্দার শিকদার, দানেশ মোল্লা, গনি গাজি, মোসলেম মওলানা, মোহসিন ও মোমিন ও মুন্সি এরা ছিল । সাঈদী সাহেব ছিলেন না।  তারে আমরা ভালোভাবেই চিনি। তার শ্বশুরের কাপড়ের দোকান  ছিল পাড়েরহাটে। সে কারনে তার সাথে আমাদের পরিচয় ছিল।  ঘটনার দিন তিনি থাকলে  আমরা চিনতাম। তিনি  ছিলেন না, তারে আমরা দেখি নাই।

সুখরঞ্জন বালী বলেন, মিলিটারি এবং তাদের সাথে থাকা দেশী মানুষ আমাদের ঘরে উইড্যা  আমার অসুস্থ ভাই বিশাবালীকে  ঘর থেকে নামাইয়া রাইফেলের কোন্দা দিয়া পিডায়। পিডাইয়া তারে বাইন্দা ছাইন্দা নিয়া যায়। পরদিন সকাল বেলা শুনি পিরোজপুর বলেশ্বর নদীর পাড়ে নিয়া আমার ভাই ও হোগলাবুনিয়ার যে ৫/৬


জন লোক ধরছে তাদেরকে একত্র করিয়া বলেশ্বর নদীর ঘাটে নিয়া গুল্লি কইরা হত্যা করছে। আমার ভাইকে হত্যার সময় সাঈদী সাহেব ছিলেন বলে কখনো শুনিনাই।
রাষ্ট্রপক্ষের তালিকাভুক্ত সাক্ষী হওয়া সত্ত্বেও আপনি তাদের পক্ষে কেন সাক্ষ্য দিতে আসলেননা সে প্রশ্নের জবাবে  সুখরঞ্জন বালী জানান, আসি নাই কারন আমি সত্য সাক্ষী দিতে চাই। কিন্তু তারা আমারে বলতে বলে সাঈদী সাহেব ছিল এই কথা বলবা। আমাকে দিয়া তারা মিথ্যা কথা বলানোর জন্য চেষ্টা করছে । আমি বলছি, না আমি বলতে পারবো না।  আমি মিথ্যা কথা বলবো না। যারে আমি দেহি নাই তার নামে কিভাবে মিথ্যা বলব। এজন্য আমি হেদিকে  যাই নাই। এদিকে আমারে আনছে।  তারা আমারে আনে নাই।

রাষ্ট্রপক্ষের কথামত সাক্ষ্য দিতে চাপ সৃষ্টি প্রসঙ্গে সুখরঞ্জন বালী বলেন, ট্রাইব্যুনালের পক্ষে  লোক গেছিলো  আমার বাড়িতে।  তখন মাহবুব (মামলার বাদী) আমার বাড়িতে যাইয়া বলে তুমি সাক্ষী দিতে যাবা একটু পাড়ের হাট। আমি বলছি, ঠিক আছে আমি যা জানি সেই সত্য কথাই বলব। সে বলে, ঠিক আছে যাবা আমার সাথে এহন চলো। হেরপর, আমারে নিয়া পাড়েরহাট রাজলক্ষী স্কুলের দোতলায় বইস্যা আমার সাক্ষী নেয়া শুরু করছে। আমি যেডুক জানি আমার ভাই সমন্ধে তা বলি। আমার ভাইরে কে মারছে এই কথা আমি বলা শুরু করছি । আমি বলি  অমুক অমুক ছিল, তখন মাহবুব বলে যে, না ঐসব বাদ দিয়ে তুমি সাঈদীর কথা বলবা। আমি বলছি আমি পারবনা।  তখন আমার পেট পাছাইয়া চিমটি মারে, আমার পিঠে আঙুল দিয়া গুতা মারে মানিক (মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষী এবং পিরোজপুরে দায়ের করা মামলার বাদী) ও মাহবুব।

এসময় ঢাকা থেকে যাওয়া এক লোক  বলে , মাহবুব সাহেব আপনি যে সাক্ষী আনছেন, এই সাক্ষীতে  আপনার সর্বনাশ হইয়া যাইতেছে, আপনার সাক্ষী হয় না। এরপর ঐখান দিয়া মাহবুব আর মানিক  আমারে উঠাইয়া দেয়।  আমি চইল্লা আসি ।

রাষ্ট্রপক্ষ থেকে গত মার্চ মাসে ট্রাইব্যুালে অভিযোগ করা  হয়েছে আপনিসহ আরো অনেক সাক্ষীকে মাওলানা সাঈদীর  পক্ষে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা হুমকি ধামকি দিয়েছে। সে কারনে আপনি চার মাস   ধরে নিখোঁজ। তারা  আপনাকে খুঁজে পাচ্ছেনা এবং ট্রাইব্যুনালেও হাজির করতে পারছেনা। এ প্রশ্নের জবাবে সুখরঞ্জন বালী বলেন,    কোনদিন আমার সাথে হেদের কেউ দেখাও করে নাই, হুমকি ধামকিও দেয় নাই। বর্তমানে আওয়ামী লীগের যে মাহবুব আর মানিক হেরা আমারে হুমকি ধামকি করতেছে। আমাকে আর একদিন বলছে  তোমারে একটি বাড়ি একটি খামার দেব আর দেড় লাখ টাকা দেব, তুমি সাঈদী সাহেবের নামের কথা বলবা। আমি বলছি না, আমার মরা ভাইকে আমি বেচতে আমি স্বিকার নাই। আমি মিথ্যা কথা কইতাম না। যারে না দেখছি আমি কেউর নামের কথা বলতে পারব না।

সাঈদী সাহেবের লোকজন কর্তৃক ভয়ভীতি দেখানো এবং আপনার নিখোঁজ হওয়া বিষয়ে আপনার মেয়ে একটি জিডি করেছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ প্রশ্নের জবাবে সুখরঞ্জন বালী বলেন,  আমি রাজি না হওয়ায়  মাহবুব আর মানিক  আমারে লোকজন দিয়া রগকাটার হুমকি দিছে। ওরা বাড়িতে যাইয়া  গালাগালি করছে।

হেরপর একদিন আমার সাথে  দেখার পরে বলে তুমি একটি বাড়ি একটি খামার  নিবা নাইলে তুমি এই দেশে থাকতে পারবা না। তারপরে আমি বাড়ি থেকে চইল্লা গেছি। চইল্লা যাওয়ার পরে আমার মেয়ে, মেয়েরে এসে হুমকি ধামকি দিছে, তোর বাবার নামে তুই  গুম কেস করবি। । আমার মেয়ে বলছে, আমার বাবার নামে গুম কেস করা লাগবে না। আমার স্ত্রী বলছে, হেয় যেখানে থাকুক না কেন আমাগো সাথে কথা বার্তা চলে, আমরা কারো নামে গুম কেস করতে পারব না। শেষ মেষ বলে জোর করে আমার মেয়েকে ১০০০/- এক হাজার

টাকা দিয়া একটা সাদা কাগজে সই নিছে। তারপর ঐ সই করা কাগজ দিয়া তারা কি করছে না করছে তা আমি বলতে পারব না।

বিশাবালী হত্যা বিষয়ে অভিযোগ : মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যে ২০ টি অভিযোগে বিচার চলছে তার মধ্যে একটি হল তার নির্দেশে এবং উপস্থিতিতে বিশাবালী নামে একজনকে নারকেল গাছের সাথে বেঁধে হত্যা করা হয়। এ অভিযোগ বিষয়ে মামলার বাদী এবং প্রথম সাক্ষী মাহবুবুল আলম গত বছর ৭ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী প্রদানের সময় বলেন,
২ জুন সকাল বেলা আমি নিজ বাড়িতে ছিলাম। লোকদের কাছ থেকে জানতে পারি অনুমান সকাল ১০টায় পারের হাটের শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী দানশ আলী মোল্লা, সেকেন্দার শিকদার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মোমিন হাওলাদার, হাকিম  কাজী, হাবিবুর রহমান মুন্সী  পাক হানাদার বাহিনী সঙ্গে নিয় উমেদপুর গ্রামে  আমার বাড়ির  নিকটস্থ হিন্দু পাড়ায় আক্রমণ চালিয়েছে।  ২৫/৩০টি ঘর লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। বিশাবালী অসুস্থ  থাকায় তাকে ধরে ফেলে এবং একটি নারিকেল গাছের সাথে বেঁেধ মারমিট করে। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নির্দেশক্রমে বলে যে, ওটাকে যখন পেয়েছি ওটাকে গুলি কর। জনৈক রাজাকার গুলি করে বিশাবালীকে হত্যা করে।

কে এই সুখরঞ্জন বালী?   বিশাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালী  শুধু যে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ছিলেন তাই নয়। যে ১৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দী তাদের অনুপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনাল মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন সেই ১৫ জনেরও একজন এই   সুখরঞ্জন বালী। ।

গত ২০ মার্চ  রাষ্ট্রপক্ষ থেকে  মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে   ৪৬ জন সাক্ষীর বিষয়ে একটি দরখাস্ত দাখিল করা হয়  ট্রাইব্যুনালে । দরখাস্তে নিবেদন করা হয়  ৪৬ জন সাক্ষীকে  ট্রাইব্যুনালে হাজির করা তাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। তাই এসব সাক্ষী  তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছে তা তাদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হোক।
৪৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪ জন সম্পর্কে দরখাস্তে রাষ্ট্রপক্ষ উল্লেখ করেছিল  আসামীর (মাওলানা সাঈদী) পক্ষ অবলম্বনকারী পিরোজপুরের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক সাক্ষীদের বাড়িতে গিয়ে হুমকির  প্রেক্ষিতে ভয়ে ভীত হয়ে তারা আত্মপোগন করেছে। তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। তাই তাদের হাজির করা সম্ভব নয়।
সুখরঞ্জন বালী সম্পর্কে বলা হয়েছিল চার মাস আগে  নিজ বাড়ি থেকে বের হবার পর নিখোঁজ।
রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের  প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল গত ২৯ মার্চ ১৫ জন সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী প্রদান করেন তা তাদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে আদেশ দেন।  সুখরঞ্জন বালীর  নাম সেই ১৫ জনের তালিকায়ও রয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষ যে সাক্ষীর বিষয়ে বলেছিল মাওলানা সাঈদীর  পক্ষাবলম্বনকারী অস্ত্রধারী  সন্ত্রাসীদের ভয়ে বাড়ি থেকে নিখোঁজ সেই সুখরঞ্জন বালী এসেছিলেন মাওলানা সাঈদীর পক্ষে  সাক্ষ্য দিতে। ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে তাকে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশ সদস্যরা অপহরন করে নিয়ে গেছে। রাষ্ট্রপক্ষের  প্রধান আইনজীবী গোলাম আরিফ টিপু বলেছেন সেদিন এ ধরনের কোন ঘটনাই ঘটেনি।


“মা বলেছেন মরার আগে হুজুরের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলতে পারবনা”

২৬/৩/২০১২, সোমবার

মেহেদী হাসান
“মা বলেছেন আমি মৃত্যুর পথে। মরার আগে আমি হুজুরের (মাওলানা সাঈদী) বিরুদ্ধে  মিথ্যা কথা বলতে পারবনা। হুজুর ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেননা। ওনার বিরুদ্ধে আমি এখন মিথ্যা কথা বলব কেমন করে?”

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর  বিরুদ্ধে অনুপস্থিত ৪৬ সাক্ষীদের একজন মো: মোস্তফা  তার মায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে  বললেন একথগুলো । মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মোস্তফা, তার  মা সিতারা বেগম এবং তার বোন রানী  বেগমেরও নাম রয়েছে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষীদের তালিকায়।  কিন্তু তারা সহ মোট ৪৬ জন সাক্ষীর কাউকেই সাক্ষ্য দিতে আদালতে আদৌ হাজির করা সম্ভব নয় বলে গত ২০ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের  পক্ষ থেকে আদালতে দরখাস্ত দিয়ে জানানো হয়েছে। ৪৬ জন সাক্ষীদের মধ্যে ১৯ জন সাক্ষী সম্পর্কে বলা হয়েছে তাদের কেউ কেউ নিখোঁজ, আত্মগোপনে  এবং কেউ কেউ পালিয়ে ভারতে চলে গেছে। দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় কর্মরত একজন সাংবাদিক হিসেবে   এ ১৯   সাক্ষীর  মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন সাক্ষী এবং তাদের আত্মীয় স্বজন  এর সাথে কথা হয় আমার।  সাক্ষীরা   জানিয়েছেন  রাষ্ট্রপক্ষের  তদন্ত সংস্থা  এবং আইনজীবীদের শেখনো মতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজী নন বলেই তারা সাক্ষ্য দিতে যাননি। মাওলানা সাঈদীর সন্ত্রাসীদের কর্তৃক ভয়ভীতি এবং হুমকির ফলে আত্মগোপনে চলে যাবার   অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। বরং তারা  মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগের ভয়ে আছেন সরকারী লোকজনের পক্ষ থেকে। যেসব সাক্ষী এবং তার আত্মীয় স্বজনের সাথে কথা হয়েছে তাদের সকলেই জানিয়েছেন তারা মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে কিছুই বলেননি জবানবন্দীতে। কিন্তু তাদের  নামে কি জবানবন্দী জমা দেয়া হয়েছে তদন্ত কর্মকর্তার পক্ষ থেকে তাও তারা জানেননা।  তারা  যা বলতে চান তা বলতে না দিয়ে অন্য কথা বলার জন্য চাপ দেয়ার কারনে তারা মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে যাননি বলে অভিযোগ করলেন।

যেসব সাক্ষী এবং তাদের আত্মীয় স্বজনের সাথে কথা বলা হয়েছে তা এখানে তুলে ধরা হল।

মো: মোস্তফা:  

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযোগ হল ইব্রাহীম কুট্টি নামে  এক লোককে মাওলানা সাঈদীর নেতৃত্বে ধরে নিয়ে  যায় এবং তারই নির্দেশে পারেরহাট বাজারে   পাক বাহিনী তাকে গুলি করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। এই ইব্রাহীম কুট্টির শ্যালকই হলেন মো: মোস্তফা। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মো: মোস্তফা, তার মা সিতরা বেগম এবং মোস্তফার  এক বোন রানী বেগমকে সাক্ষী করা হয় মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে।
মো: মোস্তফার  সাথে কথপোকথন: আপনি, আপনার মা এবং বোনসহ মোট ১৪ জন সাক্ষীর বিরুদ্ধে  রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে দরখাস্ত দিয়ে জানানো হয়েছে আপনাদের মাওলানা সাঈদীর সন্ত্রাসীরা ভয়ভীতি দেখিয়েছে। সে কারনে আপনারা আত্মগোপন করেছেন।  আপনাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।  আপনারা এখন কোথায় আছেন একটু বলবেন?
মোস্তফা: আমাদের  সাঈদীর কোন লোক কোন ধরনের ভয়ভীতি দেখায়নি। এ অভিযোগ মিথ্যা। আমরা  কোথাও আত্মগোপনও করিনাই। আমরা সবাই  নিজ বাড়িতেই আছি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে মোস্তফা জানান, আমাদের তিনজনকে যে সাক্ষী মানা হয়েছে তা প্রথমে আমরা জানিওনা। পরে আমাদের জানানো হয়েছে।
পিরোজপুর কোর্টের দারোগা আসেছ,  ঢাকা থেকে লোক এসেছে। বাবুল পন্ডিত, মাহবুবুল  আলম হাওলাদার, মাহতবা এরা এসে বলেছে বেয়াই সাক্ষী দিতে যাইতে হইবে। আমি বললাম আমার বোনকে (মমতাজ বেগম, তার স্বামীই ইব্রাহিম কুট্টি এবং তাকে হত্যার অভিযোগ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে)  সাক্ষী না বানিয়ে আমাকে কেন সাক্ষী বানানো হল।
মো: মোস্তফা বলেন, ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার সময় হুজুর (মাওলানা সাঈদী) ছিলনা। ইব্রাহীমকে পারেরহাটে নয় আমাদের বাড়িতে (নলবুনিয়ায়) হত্যা করা হয়েছে। পারেরহাটে হত্যা করার কথা ভুয়া।  আমার দুলাভাই ইব্রাহিমের সাথে আমার বড় ভাই সাহেব আলীকেও মারা হয়েছে। আমার দুলাভাইকে বাঁচাতে গিয়ে আমার বোন মমতাজের হাতেও গুলি লাগছে।  রাত ১২টার দিকে পাক আর্মি আমাদের বাড়িতে আসে। আমার দুলাইভাই ইব্রাহীমকে  আমাদের বাড়িতেই গুলি করে মারা হয়। আমার ভাইকে পিরোজপুর নিয়ে মারা হয়।
মো: মোস্তফা জানান তিনি ঐ হত্যার ঘটনার সময় বাড়িতে ছিলেন। হত্যাকান্ডের সময় হুজুর ছিলনা। এ বিষয়ে হুজুরের নাম কোনদিন  শুনিও নাই।  হুজুরের নাম আমি শুনছি বড় হয়ে । তিনি ওয়াজ করার কারনে তার নাম শুনেছি অনেক পরে।

আপনার দুলাইভাইকে যে রাতে মারা হয় সে রাতে আপনাদের বাড়িতে কারা এসেছিল তাতো  শুনেছেন পরবর্তীতে?
আমি তখন ছোট ছিলাম। আমার মা, বোন মমতাজ বেগম তাদের কাছে শুনেছি মোসলেম মাওলানা, দানেস মোল্লা, আইউব আলী, সুন্দর আলী দফাদার, ইউসুফ চকিদার এরা ছিল পাক আর্মিদের সাথে। আমার বোন, মা তাদের দেখছে। আমার বোন  মমতাজ তাদের নামে মামলাও করেছিল । তারাই এর সাথে জড়িত ছিল। এর সাথে হুজুরের নাম কোনদিন কারো মুখে শুনিনাই। এখন মামলা হওয়ার পর শুনতে পেলাম।

আপনারা সাক্ষী দিতে চাচ্ছেননা কেন?
মোস্তফা বলেন, আমার বোনের (মমতাজ বেগম) স্বামীকে হত্যা করা হল। সে মামলা করেছিল । তাকে সাক্ষী না বানিয়ে আমাদের কেন সাক্ষী বানানো হল। আমরা জবানবন্দী দিছি। তাতে বলেছি হুজুর ছিলনা ঐ সময় । সব জায়গায় একই কথা বলেছি।  মা বলেছে মুত্যুর আগে মিথ্যা কথা বলতে পারবনা হুজুরের বিরুদ্ধে।  হুজুরতো ছিলনা। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা কেমনে কমু?

আশিষ কুমার মন্ডল, সুমতি রানী এবং এবং সমর মিস্ত্রী:
এ তিনজন সম্পর্কে  সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে  জানানো হয়েছে তারা ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম  সপ্তাহ থেকে নিখোঁজ। জানা যায় তারা গোপনে  ভারতে চলে গেছে।  রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে এর আগে ট্রাইব্যুনালে জানানো হয়েছিল তারা  ঢাকায় তাদের হেফাজতে ছিল কিন্তু আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাবার কথা বলে চলে যাবার পর আর আসেনি।

আশিষ কুমারের একজন ঘণিষ্ঠ আত্মীয়ের সাথে  গতকাল দৈনিক নয়া দিগন্তের পক্ষ থেকে কথা হয়। সে তার নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।  উক্ত তিন   সাক্ষী নিখোঁজ বিষয়ে তাকে জানানো হলে তিনি বলেন, তারা  তো মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে চায়নি। তারা সাক্ষী দেবেই বা কি। তারা তো  বাগেরহাটের লোক। পিরোজপুর এসেছে ১৯৭৩ সালে। ১৯৭১ সালে আশিষের বয়স ছিল ৬/৭ বছর। আশিষ কুমারের একজন মামা এবং পাঁচজন মা খালা ছিল।  পাক বাহিনীর হাতে তার নানা উপেন্দ্রনাথ  এবং মামা  বিজয় মারা যাবার পর পিরোজপুর তাদের বাড়িতে  পাহারা দেয়ার জন্য ১৯৭৩ সালে আসেন আশিষ কুমার মন্ডল, তার মা সুমতি রানী মন্ডল এবং সমর মিস্ত্রি। এরপর থেকে তারা এখানে নানার বাড়িতে আছে। তারা ১৯৭১ সালের পিরোজপুরের ঘটনা কি জানে আর বলবেই  বা কি? তাদের বাড়ি বাগেরহাটের পঞ্চমালা গ্রামে। গ্রামের লোকজনও বলেছে তোমরা কি বলবা আমরাই তো   তেমন কিছু জানিনা।

তিনি অভিযোগ করে বলেন,  আশিষ কুমারসহ উক্ত তিনজনকে সাক্ষী বানানোর জন্য অনেক চাপ দেয়া হয়েছে। আমাকেও চাপ দেয়া হয়েছিল সাক্ষ্য দেয়ার জন্য।  এমপি  একেএমএ আউয়াল সাব সরাসরি তাদের বাড়িতে এসে বলেছে সাক্ষ্য দিতে হবে।  এরপর পুলিশ এসে তাদের তিনজনকে ঢাকায় ধরে নিয়ে যায়। এক থেকে দেড়মাস আটকে রাখে।  মিথ্যা কথা বলতে চাপ দেয় সাঈদীর বিরুদ্ধে। কিন্তু তারা তাতে কোন মতেই রাজি হয়নি।  যা বললে তাদের ক্ষতি হবে, সাঈদীরও ক্ষতি হবে  সে কথা বলতে বলে। কিন্তু তারা তাতে রাজি নয়। ১৫ দিন আগে আশিষের সাথে আমার ফোনে কথা হয়েছে। আশিষ বলেছে,  ঢাকায় নিয়ে বলা হয়েছে “চো--(অকথ্য)------পোলা, তোকে যা কইতে কমু  তা কবি।” সে  আরো জানিয়েছে তার মায়ের সাথে  অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগ আনতে বলে সাঈদীর বিরুদ্ধে। কোন ছেলে মায়ের নামে একথা বলতে পারে? এমন মিথ্যা কথা কেমনে কমু? আশিষ জানিয়েছে তার মা কান্নাকাটি করছে। তাদেরকে টরচার করা হয়েছে মিথ্যা বলার জন্য।

আশিষ কুমারের  এ আত্মীয় জানান, শুনেছি তারা ভারতে চলে গেছে। আসলে চলে গেছে না পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে তার কিছূ জানিনা। তাদের কোন খোঁজ খবর আমাদের কাছে নেই।  তাদের ঢাকায় নিয়েও কেন সাক্ষ্য দেয়ানো গেলনা, তাদের কি কি বলা হয়েছিল সে বিষয়গুলো এলাকায় আসলে হয়ত জানাজানি হবে সেকারনে তাদের ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হতে পারে।

তিনি বলেন, সাঈদীর   নামে কোন অন্যায় অত্যাচারের কথা শুনিনাই। আমার বাবা সুরেন্দ্রনাথ মন্ডলসহ ৫ জন পাক আর্মির হাতে মারা গেছে। এর সাথে সাঈদীর নাম শুনিনাই কখনো।
আমরা দেলোয়ার সিকদার নামে এক রাজাকারের নাম শুনেছিলাম এবং  তাকে স্বাধীনতার পরপরই মেরে ফেলা হয়েছে বলে জানি।

অপূর্ব ও রীতা:
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হল বিশাবালী নামে একজনকে গাছের সাথে বেঁধে তার নির্দেশে হত্যা করা। এ বিষয়ে সাক্ষী মানা হয়েছে বিশাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালীকে। সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন তিনি ৪ মাস ধরে নিখোঁজ। গতকাল সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীর স্ত্রী রীতা এবং তার ছেলে অপুর্বের সাথে কথা হয়  ।  রীতা জানান, তার স্বামী  তাকে বলেছেন, তিনি কোন মিথ্যা কথা বলতে পারবেননা। তারা  তাকে দিয়ে মিথ্যা কথা বলাতে  চাইছিল। তারা বলতে বলেছিল  সেখানে গাছ ছিল। গাছের সাথে বেঁধে তার ভাই বিশাবালীকে  গুলি করে হত্যা করা হয়েছে । আরো অনেক কথা বলতে বলেছিল। তিনি মিথ্যা কথা বলতে পারবেননা। উনি ঘটনার সময় বাড়িতে ছিলেননা। আমার শ্বাশুড়ী বলেছেন বিশাবালী অসুস্থ ছিলেন। তাকে গুলি করে মারা হয়নি। তাকে বন্দুক দিয়ে  পাক বাহিনী বুকে তিনটি ঘা মারে।  এর তিনঘন্টা পর তিনি মারা যান। গুলি করার কথা সত্য নয়। সেখানে সেময় কারা ছিল তাদের তিনি দেখেনওনি চেনেনওনি। এখন চাইপপা ধইররা কি কওয়াইতে চায় তার উপরওয়ালা ভাল জানেন।

কেন সাক্ষী দিতে তিনি রাজী নন এ বিষয়ে আবারো প্রশ্ন করা হলে রীতা জানান আমার স্বামী মিথ্যা কথা বলতে পারবেননা।

উষারানী মালাকার: রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে সাক্ষী উষারানী মালাকার সম্পর্কে বলা হয়েছে তার স্মরনশক্তি লোপ পেয়েছে। ভ্রমনে মুত্যুর ঝুকি রয়েছে। সে কারনে তাকে সাক্ষ্য দিতে আনা সম্ভব নয়।
গতকাল সকালে কথা হয় উষারানী মালাকারের ছেলের ঘরের নাতির সাথে। তিনি জানান, সর্বশেষ যেদিন আমাদের কাছে আসে আমার দাদু তাদেরকে স্টেট বলে দিয়েছেন তিনি কিছু দেখেননি। জানেননা। মিথ্যা বলতে পারবেননা।
উষারানী মালাকারের স্বামী হরলাল মালাকার পারেরহাটে থাকতে মারা গেছে। উষারানী তখন সেখানে ছিলেননা। কারা মেরেছে তাও তিনি জানেননা বলে জানান।

উষারানীর নাতী জানান, তারা আমার দাদুকে নেয়ার অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু তিনি যাবেননা ।

চান মিয়া: মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ হল মানিক পসরার বাড়িতে  অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং তাদের বাড়ির কাজের লোক ইব্রাহিম কুট্টিকে ধরে নিয়ে পারেরহাট বাজারে হত্যা করা। এ বিষয়ে মানিক পসারীসহ বেশ কয়েকজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে।  কিন্তু তার ভাই চান মিয়া  গতকাল বললেন,  “আমাদের বাড়িতে আগুন দেয়া হয় কিন্তু মাওলানা সাঈদী সেখানে ছিলেননা। সাঈদীর নামই এ বিষয়ে কোনদিন শুনিনাই। সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলতে পারবনা। আমার ভাই মানিক পসারী আমাকে মিথ্যা সাক্ষী দেয়ার জন্য হুমকি দিয়েছে। আমার কাছে যখন তদন্তের লোকজন আসে তখন আমি সত্য কথা বলে দিয়েছি। শুনেছি আমার নাম সাক্ষীর তালিকায় আছে। কিন্তু আমি সত্য কথা বলতে চেয়েছিলাম সেজন্য তারা আর আমার কাছে আসেনি।
আমাদের বাড়িতে ঘর পোড়ানোর সাথে সেকেন্দার  শিকদার, দানেস মোল্লা, কাইউম, মমিন রাজাকার জতি ছিল বলে শুনেছি। সাঈদীর নামই তখন শুনিনাই।”

মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম খান সেলিম: মাওলানা সাঈদীর সন্ত্রাসীদের ভয়ে  আত্মগোপনে থাকার তথ্য জানিয়ে যে ১৪ জনের  নাম দেয়া হয়েছে তার মধ্যে একজন সাক্ষী হলেন শহিদুল ইসলাম খান সেলিম। তার সাথে গতকাল টেলিফোনে কথা  হলে তিনি বলেন,  সাঈদীর সন্ত্রাসীদের ভয় দেখানোর কথা সত্য নয়। আত্মগোপনে থাকা বিষয়ে তিনি বলেন আমি বর্তমানে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের একটি অনুষ্ঠানে আছি। সাক্ষী দিতে  চাচ্ছেননা কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নই। যুদ্ধ শুরুর আগেই আমি বাড়ি থেকে  অন্যত্র চলে যাই। কাজেই আমাদের বাড়িতে কারা আগুন দিয়েছিল তাতো আমি  দেখিনাই। সেজন্য সাক্ষী দিতে ইচ্ছুক নই।

গোপাল কৃষ্ণ মন্ডল: আমি জবানবন্দী দিয়েছি। তবে আমার নামে কি লেখা হয়েছে তা আমি জানিনা। জবানবন্দীতে আমি সাঈদীর বিরুদ্ধে কিছু বলিনাই। আত্মপোগনে থাকা  বিষয়ে তিনি বলেন, আমি বাসায় আছি। কোর্টেও যাই।

মাওলানা সাঈদীর পিরোজপুর ও যশোরে অবস্থান নিয়ে উভয় পক্ষের সাক্ষীরা যা বললেন

 ২৯/১০/২০১২
মেহেদী  হাসান
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন ১৯৭১ সালের মে মাসে মাওলানা সাঈদী পিরোজপুরের পাড়েরহাটে ছিলেন। ৭ মে পাড়েরহাট পাকিস্তান আর্মি আসার পর মাওলানা সাঈদীসহ শান্তি কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ তাদের অভ্যর্থনা জানান। এরপর মাওলানা সাঈদীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের নির্দেশ মোতাবেক পাকিস্তান আর্মি ও শান্তি কমিটির লোকজন পাড়েরহাট বাজারে এবং এর আশপাশের এলাকায় লুটপাট. অগ্নিসংযোগ এবং হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত হয়।

অন্যদিকে মাওলানা সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীরা দাবি করেছেন ১৯৭১ সালে  স্বাধীনতাযুদ্ধ  শুরুর অনেক আগে থেকেই মাওলানা সাঈদী যশোরের নিউটাউনে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন সপরিবারে ।  যশোরের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মসভা করতেন। এরপর  ১৯৭১ সালে ২৬ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি পরিবারের লোকজনসহ  যাশোরে মহিরন  গ্রামে তিনি তার পরিচিত এক পীর সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর  ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম দিকে তিনি  বাঘারপাড়া থানার দোহাকোলা গ্রামে রওশন আলী নামক এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নেন। জুলাই মাস পর্যন্ত সেখানে থাকার পর তিনি পিরোজপুরে নিজ বাড়িতে যান।

১৯৭১ সালের মে মাস থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত  যে সময় পিরোজপুরে পাড়েরহাটসহ আশপাশের এলাকায় মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ করেছেন মাওলানা সাঈদীর বিপক্ষের সাক্ষীরা ঠিক সেই সময় মাওলানা সাঈদী পিরোজপুরেই ছিলেননা বলে দাবি করছেন মাওলানা সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীরা।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা যা বললেন :
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার বাদী এবং ১ নং সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদার ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন,  ১৯৭১ সালের  মে মাসের প্রথম সপ্তায় পাক হানাদার বাহিনী পিরোজপুরে আসে। ৭ মে সকাল বেলা আমি নিজ বাড়িতেই ছিলাম।  লোকমুখে শুনতে পাই পাক হানাদার বাহিনী পাড়েরহাট আসিতেছে  এবং পাড়েরহাটের শান্তি কমিটির লোকেরা পাড়েরহাট রিক্সা স্ট্যান্ডে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে। আমি পাড়েরহাটে যাইয়া  রিক্সা স্ট্যান্ডের আড়ালে থেকে  গোপনে লক্ষ্য করিতেছি পাড়েরহাটের শান্তি কমিটির লোকেরা দাড়িয়ে আছে। কিছু পরে ২৬টি রিক্সায় ৫২ জন পাক হানাদার বাহিনী রিক্সা স্ট্যান্ডে নামে। শান্তি কমিটির লোকেরা তাদের অভ্যর্থনা জানায়। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী উর্দুভাষা ভাল জানতেন বিধায় ক্যাপ্টেন ইজাজের সাথে কথা বলেন।

দ্বিতীয় সাক্ষী রুহুল আমিন নবীন বলেন, ৭ মে  পাড়েরহাটের শান্তি কমিটির  সেকেন্দার  আলী শিকদার, দানেস মোল্লা, মাওলানা মোসলেম উদ্দিন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবসহ আরো কয়েকজন পাড়েরহাটে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য রিক্সা স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করতে থাকে।

রাষ্ট্রপক্ষের চতুর্থ সাক্ষী সুলতান আহমদ হাওলাদার ট্রাইব্যুনালে বলেন, ১৯৭১ সালে আমি   পিরোজপুর সোহরাওয়াদী কলেজের   ছাত্র ছিলাম। পিরোজপুরে পাক বাহিনী আসার খবর পেয়ে  গ্রামে চলে যাই। গ্রামে গিয়ে  জানতে  পারি জামায়াত নেতা সেকেন্দার  আলী শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, দেলোয়ার হোসেন


শিকদার বর্তমানে সাঈদী, মোসলেম মাওওলানা এদের নেতৃত্বে পিস কমিটি গঠিত হয়।   পাক বাহিনী  পাড়েরহাটে আসার পর উপরে বর্নিত পিস কমিটির নেতৃবৃন্দ পাক পাহিনীকে স্বাগত জানায় এবং বাজারে নিয়ে   যায় লুটপাটের জন্য।

৫ম সাক্ষী মাহতাব উদ্দিন  তার জবানবন্দীতে বলেন,  ১৯৭১ সালের ২ জুন আমি পাড়েরহাট বাজারে যাই। তখন  শান্তি কমিটির দেলোয়ার হোসেন শিকদার বর্তমানে সাঈদী, দানেশ আলী মোল্লা, সেকেন্দার শিকার, মাওলানা মোসলেম উদ্দিন সশস্ত্র রাজাকার এবং পাক আর্মিদের  নিয়ে উমেদপুর গ্রামে যেতে দেখি।

ষষ্ঠ সাক্ষী মানিক পসারী জবানবন্দীতে বলেন, ১৯৭১ সালে ৮ মে পাক সেনাবাহিনী নিয়ে দেলোয়ার শিকদার বর্তমানে সাঈদী, সেকেন্দার শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা, রেজাকার  মবিন, হাকিম কারী, সোবহান মাওলানাসহ আরো অনেকে রেজাকার আমার বাড়িতে   প্রবেশ করে।

সপ্তম সাক্ষী  মফিজ উদ্দিন বলেন,  ১৯৭১ সালের ৮ মে সকালে   ১২/১৪ জন পাক আর্মি, ২০/২২ জন রাজাকার মামার বাড়ি যাচ্ছে দেখতে পাই। তার মধ্যে দিলু  শিকদার ছিল।

অষ্টম সাক্ষী মোস্তফা হাওলাদার  জবানবন্দী দিতে গিয়ে বলেন, আমি ১৯৭১ সালে পাড়েরহাট বাজারে বুটমুড়ি ফেরি করে বিক্রি করতাম।  মে মাসের সাত তারিখ  শান্তি কমিটির দেলোয়ার  শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা এরা  বাজারের উত্তর মাথায় রিক্সা স্ট্যান্ডের কাছে যায়। কিছুক্ষন পর ২৬টি  রিক্সায় ৫২ জন পাক আর্মি আসে। পাক আর্মি নামার পর তারা দেলোয়ার শিকদার, মোসলেম মাওলানা,  দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার শিকদার এদের জিজ্ঞসা করে বাজারের  অবস্থা কি । তারপর শান্তি কমিটির লোকজন পাক আর্মিদের হিন্দু এবং নৌকা মার্কার লোকজনের দোকান, ঘরবাড়ি দেখিয়ে দেয়।  

নবম সাক্ষীর জবানবন্দী  আলতাফ হাওলাদার বলেন, মে মাসের  সাত তারিখ পাক আর্মি পাড়েরহাট বাজারে আসে। পাক আর্মি আসার  ছয়/সাত দিন আগে  সেকেন্দার শিকদার, দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী, মোসলেম মাওলানা, দানেশ আলী মোল্লার নেতৃত্বে শান্তি কমিটি গঠন হয়। তারপর রেজাকার বাহিনী গঠন হয় দেলাওয়ার হোসেন  সাঈদীর নেতত্বে।

দশম সাক্ষী বাসুদেব মিস্ত্রী  বলেন,  ১৯৭১ সালে  মে মাসের ৮ তারিখে পাঞ্জাবী আর্মি, রাজাকার, শান্তি বাহিনীর লোকজন মানিক পসারীর বাড়িতে আসে। দিলু শিকদার, সেকেন্দার আলী শিকদার, মোসলেম মাওলানা, দানেশ আলী মোল্লা, রুহুল আমিন, হাকমি কারী মোমিন এদের দেখেছি তখন।

আরেক সাক্ষী আব্দুল জলিল  বলেন,  ১৯৭১ সালের ৮ মে দেলোয়ার হোসেন দিলু,  দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার শিকদার, আরো কয়েকজন রাজাকার মিলে ১০/১৫   জনের  একটি দল এবং পাক সেনা মিলে আমাদের চিথলিয়া গ্রামে আসে।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীরা যা বললেন : মাওলানা সাঈদীর পক্ষে চতুর্থ সাক্ষী মো: আবুল হোসেন বলেন, ১৯৬৮ সাল হতে যশোর নিউ টাউন, ব্লক -এ, ১৮৫ নম্বর বাড়িতে বসবাস করে আসছি। ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ কালরাত্রে পাক হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে । যশোর সেনানিবাস থেকে গোলাগুলি শুরু হয়। ২৬, ২৭  ও ২৮ শে মার্চ ওখান থেকে নিয়মিত গোলাগুলি চলে। আমার বাড়ির পাশে ১৮৪ নম্বর বাড়িতে বসবাস করতেন শহিদুল ইসলাম সাহেব। তিনি শেখহাটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তার পাশের বাসায় ১৮৩ নম্বর বাড়িতে বসবাস করতেন একই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক ( নাম মনে পড়ছেনা এখন) ।  ১৮২ নম্বর বাসায় বসবাস করতেন দেলওয়ার হোসেন সাঈদী সাহেব। যশোর শহর থেকে অনেক পরিবার ভয়ে শহর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যাচ্ছিল। তখন


আমাদের এই চার পরিবারের অভিভাবকরা আলোচনা করলেন যে, এখানে তো আর থাকা যায় না। আমরা ১৯৭১ সালের ৩ অথবা ৪ এপ্রিল তারিখে যশোর থেকে শেখহাটি চলে যাই। রাত্রে শেখহাটিতে অবস্থান করি। ওখান থেকে সকালে আমরা আরও ভিতরে পূর্বদিকে ধানঘাটা গ্রামে চলে গিয়ে অবস্থান নেই। সেখানে ১৮৩ নম্বর বাড়ির বাসিন্দার (তার নাম   মনে পড়ছে আবুল খায়ের) মামার বাড়িতে অবস্থান করি। সেখানে ৭/৮ দিন থাকার পরে  সিদ্ধান্ত হয় যে, আমাদের পরিবার এবং শহিদুল ইসলামের পরিবার ভারতে চলে যাবে ।  আবুল খায়ের তিনি তার মামার বাড়ি ধানঘাটায় থেকে গেলেন । সাঈদী সাহেব ওখান থেকে ৮/৯ মাইল দূরে চলে গেলেন যশোরের বাঘারপাড়া থানাধীন মহিরন উনার এক পীর সাহেবের বাড়িতে। আমাদের পরিবার এবং শহিদুল ইসলামের পরিবার ভারতে চলে যাই। এরপর সাঈদী সাহেবের সংগে আমার আর যোগাযোগ হয় নাই।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে যশোরের আরেক সাক্ষী রওশন আলী তার  জবানবন্দীতে বলেন, আমাদের  গ্রাম দোহাকোলা, থানা বাঘারপাড়া, যশোর। ১৯৬৯/৭০ সালে আমাদের এলাকায় সাঈদী সাহেব অনেক ধর্মসভা করেছেন। সে ধর্মসভার মাধ্যমে ওনার সাথে আমার পরিচয় হয়। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে যখন পাকিস্তানী সেনারা গুলিগোলা মারতে  শুরু করল তখন সাঈদী সাহেব তার পরিবারসহ বাঘারপাড়ার মহিরন গ্রামের পীর সদরুদ্দীন সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি পীর   সাহেব হুজুর আমাকে খবর দেন। আমি পীর সাহেবের বাড়িতে যাই। পীর সাহেব হুজুর আমাকে বললেন তাদের বাড়িতে সদস্য সংখ্যা অনেক। তারও কিছু আত্মীয় স্বজন ঢাকা থেকে এসেছেন তাদের বাড়িতে। তিনি আমাকে অনুরোধ করেন  আমি যেন সাঈদী সাহেবকে স্বপরিবারে আমাদের বাড়িতে নিয়ে  রাখার ব্যবস্থা করি। তিনিও (সাঈদী সাহেব) এখানে কষ্ট পাচ্ছেন। মে মাসের প্রথম দিকে তাকে স্বপরিবারে আমার বাড়িতে নিয়ে আসি। আড়াই মাসের মত সাঈদী সাহেব আমার বাড়িতে থাকেন। জুলাই মাসের মাঝামাঝি তিনি তার গ্রামের বাড়ি চলে যান।

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে  ১২ তম সাক্ষী   মোঃ হাফিজুল হক  বলেন, আমাদের  গ্রাম- খড়কী, বামনপাড়া রোড, থানা-কোতয়ালী, জেলা-যশোর। আমার পিতা মাস্টার  মোঃ শহিদুল ইসলাম ১৯৬৬ সালে যশোর নিউ টাউনে এ ব্লকের ১৮৪ নম্বর বাসা একজন এ্যালটির কাছ থেকে ক্রয় করেন। তারপর আমরা ঐ বাসায় স্বপরিবারে বসবাস করতে থাকি। ১৯৬৮ সালে আমার বাসার পশ্চিম পাশে ১৮৫ নম্বর বাসা মৃত হযরত আলী সাহেব এক এলোটির কাছ থেকে ক্রয় করেন। তারপর আমরা দুই পরিবার পাশাপাশি বসবাস করতে থাকি। ১৯৬৯ সালে আমার বাসার পূর্বদিকে প্রিন্সিপাল আনোয়ার সাহেবের ১৮৩ নম্বর বাসায় মাওলানা আবুল খায়ের সাহেব ভাড়াটিয়া হিসাবে বসবাস করতে থাকেন।  ঐ একই সময়ে প্রফেসর আনোয়ার সাহেবের ১৮২ নম্বর বাসায় মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেব ভাড়াটিয়া হিসাবে বসবাস করতে থাকেন। আমার পিতা মাস্টার  মোঃ শহিদুল ইসলাম শেখহাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। মরহুম হযরত আলী মিয়া যশোর এস.পি অফিসের হেড কার্ক ছিলেন। মাওঃ আবুল খায়ের সাহেব আমার পিতার স্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। মাওঃ দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেব বৃহত্তর যশোরের বিভিন্ন এলাকায় ওয়াজ মাহফিল করতেন।
১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ  ভয়াল রাতে  যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে যশোর শহরের উপর গোলাগুলি চলতে থাকে।  পরবর্তী ২/৩ দিন ও একই ভাবে গোলাগুলি চলতে থাকে। এমতাবস্থায় শহরের লোকজন গ্রামের দিকে আশ্রয় নিতে থাকে। আমার পিতা, হযরত আলী চাচা, আবুল খায়ের চাচা এবং সাঈদী চাচা সম্মিলিতভাবে এক বৈঠক করেন। বৈঠকে তারা সিদ্ধান্ত নেন অন্যত্র চলে যাওয়ার।
পরবর্তী ৪ এপ্রিল সন্ধ্যার দিকে শেখহাটি চলে যাই। ওখানে আমার পিতার স্কুলের তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মরহুম জয়নুল আবেদীন সাহেবের বাসায় রাত্রি যাপন করি। পরের দিন সকালে চাচা আবুল খায়ের সাহেবের মামার বাড়িতে ধান কাটাঘাটা নামক স্থানে চলে যাই। ওখানে আমরা ৭/৮ দিন থাকি। অনেকগুলি পরিবার এক জায়গায় থাকায় আবার ৪ জন মুরব্বিরা মিলে  সিদ্ধান্ত  নেন অন্যত্র চলে যাওয়ার। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেব বলেন যে, তিনি বাঘার পাড়ায় মহিরণের পীর সাহেবের বাড়ি


যাবেন। আমার পিতা এবং হয়রত আলী সাহেব একত্রে ইন্ডিয়া চলে যাবেন। পরবর্তী দিন সকালে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেব মহিরনের উদ্দেশ্যে চলে যান। তারপর হযরত আলী এবং আমরা ভারতের উদ্দেশ্যে চলে যাই এবং মাওলানা আবুল খায়ের সাহেব ঐ বাড়িতেই থেকে যান।

১৪ তম সাক্ষী  এমরান হোসাইন বলেন, আমার   গ্রাম- মহিরন, থানা- বাঘারপাড়া, জেলা যশোর । আমার পেশা শিক্ষকতা। বাঘারপাড়া পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়।
১৯৭১ সালে  আমি ছাত্র ছিলাম। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৭১ সালের  মে মাসের মাঝামাঝি সময় আমাদের মহিরন গ্রামে মরহুম সদরুদ্দিন পীর সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে ১৫ দিন থাকার পরে দোহাকোলো গ্রামের রওশন আলী সাহেবকে পীর সাহেব ডেকে বললেন, আমার বাড়িতে লোকজনের ভিড় হয়েছে, থাকার সমস্যা । আপনি আপনার বাড়িতে সাঈদী সাহেবকে নিয়ে যান। উনার বাড়িতে আড়াই মাস থাকার পর সাঈদী সাহেবকে তার ভাই এসে তাকে দেশের বাড়িতে পিরোজপুর  নিয়ে গেলেন।
এছাড়া কোবাদ আলী নামে  আরেক সাক্ষী মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন ১৯৭১ সালের মে মাসে মাওলানা সাঈদী যশোর ছিলেন।

৭২সালে জন্ম নেয়া ব্যক্তি ৭১ সালের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী!

 ২০/৪/১২
মেহেদী হাসান
খলিলুর রহমানের জন্ম ১৯৭২ সালের ১৩ এপ্রিল। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে খলিলুর রহমান যে  জবানবন্দী  দিয়েছেন তাতে মাওলানা সাঈদী কর্তৃক ১৯৭১ সালে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটন তিনি  নিজে  দেখেছেন বলে  উল্লেখ করেছেন।

এছাড়া ১৯৭১ সালে পাক হানাদার এবং রাজাকার বাহিনী কর্তৃক  হিন্দু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধ সমর্থক  অনেকের দোকানপাট, বসতবাড়ি লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, হত্যা, নির্যাতনের অনেক ঘটনাও তিনি দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। মাওলানা সাঈদী এবং অন্যান্য রাজাকার কর্তৃক রইজ উদ্দীন পসারীর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে  ধ্বংস  করা এবং লুটপাটের ঘটনার তিনি একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলে  জানান।  রইজ উদ্দীনের বাড়িতে লুটপাটের ঘটনা দেখার সময় মাওলানা সাঈদী তাকে ধাওয়া দেন বলেও উল্লেখ করেন। অথচ জন্ম সনদ অনুযায়ী  ১৯৭১ সালে তার জন্মই হয়নি।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে খলিলুর রহমান তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে  জবাবনবন্দী দেন  তাতে তিনি  ১৯৭১ সালে তার বয়স উল্লেখ  করেছেন ১৩/১৪ বছর। তবে খলিলুর রহমানের জন্ম সনদে   জন্ম তারিখ   লেখা রয়েছে  ১৯৭২ সালের ১৩ এপ্রিল।  ভোটার তালিকা এবং তার  কর্মস্থলের তথ্য বিবরনিতেও  জন্ম    তারিখ একই লেখা আছে।

রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যে ৬৮ জন  মূল সাক্ষীর তালিকা জমা দেয়া হয়েছিল  তার মধ্যে একজন ছিলেন এই খলিলুর রহমান । তবে  তার সাক্ষ্য দেয়া হয়নি শেষ পর্যন্ত।

গত ৭ ডিসেম্বর মামলার বাদী মাহবুবুল আলম হাওলাদার আদালতে সাক্ষ্য দেন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে। ঐ সময় তিনিও সাক্ষী  খলিলুর রহমানের নাম উল্লেখ করেন ১৯৭১ সালের ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে।
খলিলুর রহমান সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন “২ জুন সকাল বেলা আমি নিজ বাড়িতে ছিলাম। স্বাক্ষী খলিলুর রহমান খুব ভোরে আমার বাড়ি এসে গোপনে জানিয়ে দেয় যে, আপনি এবং আপনার ঘরে যে আওয়ামী লীগ এর  নেতাকর্মী  এবং মুক্তিযোদ্ধারা আছে তাদের লিস্ট হয়েছে ধরার জন্য।”

খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে ছয় মামলা :
খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়  চাঁদাবাজি, প্রতারনা, জমিদখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে  মামলা এবং  থানায় জিডি করেন অনেক ভুক্তভোগী ।  তার বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
। একটি ফৌজদারি  মামলায় তার এক  বছর ৩ মাসের সাজা হয় পিরোজপুর  অতিরিক্ত মেজিস্টেট কোর্টে। পিরোজপুর সেশন জজ আদালত এবং হাইকোর্টেও সে সাজা বহালা রাখা হয়।  সর্বশেষ আপিল বিভাগে আবেদন করেন খলিলুর রহমান ।  সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল আমিন এবং  অপর প্রধান বিচারপতি  সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেনের বেঞ্চ আবেদনটি   শুনানী শেষে খারিজ করে দেন। ফলে  নিম্ন আদালত  তাকে যে সাজা দেন তা বহাল থাকে।

রাষ্ট্রপতি বরাবর ক্ষমা প্রার্থনা :
খলিলুর রহমান ২০০৮ সালে রাষ্ট্রপতি বরাবর ক্ষমা প্রার্থনার দরখাস্ত করেন। কিন্তু তাতেও কোন ফল হয়নি।  গত বছর আবারো খলিলুর রহমানসহ পাঁচজন আসামীকে ক্ষমা প্রদর্শনের জন্য রাষ্ট্রপতি বরাবর  আবেদন পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। এ উদ্যোগের প্রেক্ষিতে খলিলুর রহমানসহ  পাঁচজনের বিষয়ে অবহিত করে  ২০১১ সালের ২৪ জুলাই পিরোজপুর জেল সুপার (ভারপ্রাপ্ত) কারা মহাপরিদশর্ক বরাবর একটি চিঠি পাঠান। চিঠির শিরোনাম “কয়েদি নং ৪৯/এ মো: খলিলুর রহমানসহ ০৫ জনের ক্ষমা প্রদর্শনের কাগজপত্র প্রেরন প্রসঙ্গে”। চিঠিতে উল্লেখ করা হয় আবেদনকারী কয়েদীগন ২৪/০৪/১৯৯৫ তারিখে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে আগমন করেন এবং ২৪/০৫/১৯৯৫ সালে জামিনে মুক্তিপান। এরপর তারা আর কারাগারে আগমন করেননি। তাদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং     মামলার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রেরন করা হয়েছে এতদসঙ্গে।

পিরোজপুর জেল সুপারের চিঠিতে স্বরারাষ্ট্র   মন্ত্রণালয় এবং কারা অধিদপ্তরের ২০১১ সালের জুন মাসের চিঠির সূত্র উল্লেখ করা হয় বরাত হিসেবে।

অভিযোগ রয়েছে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য  দিতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে খলিলুর রহমানকে  রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ক্ষমা পাইয়ের দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১১ সালে।   ক্ষমা পাওয়া বিষয়ে সর্বশেষ উদ্যোগের ফলাফল কি হয়েছিল সে  বিষয়ে কিছু জানাতে পারেননি খলিলুর রহমান।

গত ২০ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে একটি আবেদন পেশ করা হয়। আবেদনে বলা হয়  মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে  ৪৬ জন  সাক্ষীকে  হাজির করা আদৌ সম্ভব নয়। তাই  ৪৬ জন সাক্ষী  তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে  জবানবন্দী  দিয়েছেন তা  তাদের অনুপস্থিতিতে আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহন করা হোক।
এই ৪৬ জন  অনুপস্থিত সাক্ষীর মধ্যে একজন ছিলেন খলিলুর রহমান। তবে আদালত যে ১৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দী তাদের অনুপস্থিতিতে গ্রহণ করেছেন তার মধ্যে  খলিলুর রহমান নেই।

সাজা মাথায় নিয়ে চাকরি :
খলিলুর রহমান বর্তমানে পারেরহাট শেখ হাসিনা একাডেমীতে একজন নাইটগার্ড হিসেবে চাকরি করছেন। শেখ হাসিনা একাডেমীর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি স্থানীয় এমপি একেএমএ আউয়াল।
খলিলুর রহমান জানান তিনি ১৯৮৫ সালে এ স্কুলে যোগদান করেন। তবে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীদের মাসিক সরকারি বেতন ও অন্যান্য ভাতা উত্তোলন বিবরনী বইয়ে উল্লেখকৃত তথ্যে দেখা যায় খলিলুর রহমান ২/৩/১৯৯৬  তারিখে শেখ হাসিনা একাডেমীকে যোগদান করেন। তার ইনডেক্স নম্বর ২৯২০১৬। সখানে তার বেতন, ব্যাংক একাউন্টেসহ অন্যান্য তথ্যাদিও রয়েছে।  উক্ত বইয়েও খলিলুর রহমানের জন্ম  সাল উল্লেখ রয়েছে ১৯৭২। বইয়ে স্কুল পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান স্থানীয় এমপি একেএমএ আউয়ালের স্বাক্ষর রয়েছে।

দণ্ডপ্রাপ্ত মামলার বিবরন :
খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে  ইন্দুরকানী থানায় যে মামলা হয় তাতে পিরোজপুর অতিরিক্ত মেজিস্ট্রেট কোর্টে তাকে    এক  বছর তিন মাস সাজা দেন। ১৯৯৫ সালের ২৪ এপ্রিল মামলার রায় হয় এবং ঐদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এক মাস সাজাভোগের পর তিনি ২৪ মে ১৯৯৫ সালে জামিনে মুক্ত হন।

মেজিস্ট্রেট কোর্টে প্রদত্ত সাজার বিরুদ্ধে তিনি পিরোজপুর  সেশন জজ এবং হাইকোর্টে যাবার পর সেখান থেকেও সাজা বহাল রাখা হয় । এরপর তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের  আপীল বিভাগে লিভ টু আপিল করলে   ২০০৩ সালের ১৬ নভেম্বর  আপিল বিভাগ তার আবেদন খারিজ  করে দেন।  তবে সাজা বহাল থাকলেও মাহবুবকে পরবর্তীতে জেলে যেতে হয়নি।
যে মামলায় খলিলুর রহমানের সাজা হয় সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ১৯৯৩ সালেল ৯ মার্চ খলিলুর রহমান এবং অন্যরা মিলে জনৈক আবুবকর সিদ্দিক, তার ভাগিনা ও ভাতিজা কলাই ক্ষেত মাড়াইয়ের সময় তাদের ওপর হামলা চালায় এবং কুপিয়ে জখম করে।

কুপিয়ে জখম করা বিষয়ে  মামলার  বিবরন- ইন্দুরকানী  থানা মামলা নং ০২, তারিখ ১৪/০৩/১৯৯৩,  জি আর ৪৭/৯৩, ধারা ৪৪৭/৩২৩ ।

সাক্ষ্য দেয়ার জন্য দুই দফা ঢাকায় আসেন খলিল :
অনুসন্ধানে জানা গেছে  মাওলানা সাঈদীর বিরদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য খলিলুর রহমানকে  দুইদফা ঢাকায় আনা হয়  । প্রথম দফায় তাকে ঢাকা আনা হয় ৪/১২/২০১১ তারিখ। ১৪/১২/২০১১ তারিখ তাকে প্রসিকিউশনে হাজির করা হয় । পরের দিন ১৫/১২/২০১১ তারিখ তাকে বাড়ি পাঠানো হয়। এরপর তাকে আবার ঢাকায় আনা হয় ৩/১/২০১২ তারিখ  । ৪/১/২০১২ তারিখ তাকে অন্য সাক্ষী আলতাফ হোসেন, মাহতাব উদ্দিন এবং আব্দুল লতিফের সাথে প্রসিকিউশন কক্ষে হাজির করা হয়। কিন্তু সেদিনও তার সাক্ষ্য দেয়া হয়নি। পরের দিন  ৫/১/২০১২ তারিখ তাকে আবারো বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়।  পুলিশ হেফাজতেই তাকে ঢাকা আনা নেয়া এবং থাকার ব্যবস্থা করা হয়।

সাজা বহালা থাকা অবস্থায় পলাতক আসামীর প্রকাশ্যে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগদান এবং চাকির চালিয়ে যাওয়া,  তাকে আবার  সাক্ষী নির্বাচন করা এবং   রাষ্ট্রীয় হেফাজতে ঢাকায় আনার  বিষয়টি অনেকের কাছে বিস্ময়কর।

খলিলুর রহমানের বক্তব্য :
খলিলুর রহমান দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ২০০৩ সালের আপিল বিভাগে আবেদন খারিজ হওয়ার পর  রাষ্ট্রপতির কাছে দায়ের করা মার্সি পিটিশনের একটি কপি থানায় জমা দেয়া হয়। ফলে তাকে আর গ্রেফকতার করা হয়নি।   তিনি ক্ষমা পেয়েছিলেন কি-না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে পরবর্তীতে কোন কিছু জানতে পারিনি আর। আপিল বিভাগে আবেদন বাতিল হবার পর তিনি  জেল এড়াতে কখনো পালিয়ে ছিলেন কি-না জানতে চাইলে বলেন তিনি পালাননি। তিনি বর্তমানেও বাড়িতেই আছেন।
তার বিরুদ্ধে ছয়/সাতটি মামলা এবং জিডি বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে খলিলুর রহমান জানান এগুলো সব নিষ্পত্তি হয়েছে এবং আমার পক্ষে রায় পেয়েছি। এরপর টেলিফোন লাইন কেটে দেন তিনি। লাইন কেটে দেয়ার দুই দিন পর আবার তার সাথে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে সাথে সাথে আবারো লাইন কেটে দেন খলিলুর রহমান।

সাক্ষাৎকারে গণেশ চন্দ্র সাহা // আমি সত্যিকথা কমু এজন্য আমারে আনেনাই

 ২/১১/২০১২
মেহেদী হাসান
আমাকে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে আনার জন্য যে কতবার সরকারী লোকজন বাড়িতে গেছে তার কোন গোনাবাছা নেই। ডিসি  অফিস, থানার ওসি, স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজন বারবার বাড়িতে লোক পাঠাইছে  আমাকে যাওয়ার জন্য। অনেকবার পুলিশ গেছে। কোর্টের লোকজন গেছে ঢাকা থেকে। একবার দারোগা এসে হোন্ডায় করে পিরোজপুর থানায় নিয়ে গেল। তাদের সবার কথা একটাই। আমাকে বলতে হবে আমার মাকে সাঈদী সাহেব মারছে। আমি তাতে রাজি হইনি।  সে কারনে আমি সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আসি নাই। আমি সত্যিকথা কমু এজন্য তারা আমাকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আনেনাই।

গনেশ চন্দ্র  সাহা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ছিলেন। গত ২৩ অক্টোবর তিনি  আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (১)  হাজির হয়ে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে না আসার কারণ সম্পর্কে গণেশ  চন্দ্র দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে  সাক্ষাৎকারে উপরোক্ত কথা বলেন। গনেশ চন্দ্র বলেন,  সরকার পক্ষের লোকজনের কথামত সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় বারবার তাদের বাড়িতে লোক পাঠানো হয়েছে।  থানায় নিয়ে তাকে টাকা সাধা হয়েছে তাদের কথামত সাক্ষ্য দেয়ার জন্য। একবার  রাতে তাকে   স্থানীয় সরকার সমর্থক লোকজন ধরে নিয়ে যায়।  কিন্তু তিনি তার মায়ের নামে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি হননি। গণেশ জানান সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে না আসায়  তাকে  এলাকার আওয়ামী লীগের লোকজন রাজাকার ডাকে।

গনেশ বলেন, “একদিন পিরোজপুরের এক দারোগা  মটর সাইকেলে  করে থানায় নিয়ে গেল।  দারোগার নাম আমি জানি না। অনেক দূর নিয়া তিন তলায় উঠাইছে। কিছুক্ষণ পর  লোকজন আইসা আমার চারপাশে বইছে । তারা ঢাকার লোক। হেগো কতা আমি ভাল বুঝিনা।  উচা উচা লোক। এরপর জনাচারেক  পুলিশ আইছে ।  চারপাশে পুলিশ বইছে।  কতগুলা মেশিন পত্র ফিট করছে।  ফিট কইরা তারপর নানান কথা কইছে । আমার মায়ের  ঘটনাগুলো কইতে কইছে। পরে কওয়া ধরছি। পরে ঢাকার লোক  কয় না, তোমার মায়রে  মারছে সাঈদী সাহেব।  আমারে কইতে কইল তুমি কবা তোমার মায়রে সাঈদী সাহেব মারছে।  আমি কইলাম, না সাঈদী সাহেব মারে নাই। তার নামে মিথ্যা কথা কইতে পারমু না। তারা বলছে হ তুমি কও, তোমারে পয়সা-পাতি দেব। আমি কইলাম কোন পয়সা পাতিতে কাজ হবেনা। তখন আমার সামনে  দুইটা ব্রিফকেস খুইল্লা টাহা দেখাইছে । এই টাকা নিয়া চইল্লা যাবা, তুমি নাম কও। মেলা সময় তোহাই মোহাইয়া কয়, তুমি বোঝ। আমি কইলাম আমার বোঝা হইয়া গেছে, আমি পারমু না। আপনার যা খুশি করতে পারেন। আমি  আমার মরা মায়রে বেচতে পারমু না। মরা মায়রে বেইচ্যা আমি খাবনা । আমি পারলাম না। এইটা বছর দেড় আগের ঘটনা।”
ঢাকা থেকে কোর্টের পরিচয়ে  বাড়িতে লোকজন যাওয়া প্রসেঙ্গ গণেশ চন্দ্র বলেন, “গত ফালগুনের আগের ফালগুনে ছয়জন আমার কাছে গেছে। গিয়ে খুব জোরাজুরি  করেছে। তারা কইল  তোমার মায় যে মারা গেছে তোমরা কি জান? আমি কইলাম   জানি  খাতা মাতা বই পুস্তকে সবতায় আছে, আর্মিতে মাইররা হালাইছে, মিলিটারীতে মারছে সব কিছুই আছে। তারা বলতেছে না সাঈদী সাহেব মারছে, আমি মায়ের কথা বলতে পারমুনা, মরা মায়ের নামে মিথ্যা কথা বলতে পারমুনা। এই লইয়া বেশ তোহাই মোহাই কইররা তহন কইছে তয় কেডা মারছে? আমি কইলাম মারছে পাক সৈন্যতে। তারা কয়  তুমি এখন বিচার চাও? আমি কইলাম হ আমি বিচার চাই। পরে তারা বলছে তয় কও বিচার চাই বিচার চাই, বার বার কবা। পরে আমি বিচার চাই বিচার চাই, বার বার কইছি । ”

-    গণেশ চন্দ্র বলেন, “এইর মধ্যে এক রাইতে  স্থানীয় আর পিরোজপুরের আওয়ামী লীগের লোকজন আমারে ধইর‌্যা নিয়া গেছে। মটর সাইকেলে কইরা নিয়া গেল পিরোজপুর পর্যন্ত। রাস্তায় আমি কইলাম আমারে  ছাড় নাইলে চিক মারমু (চিৎকার করব) । তারপর আমি ঐ জায়গা থেকে দৌড়াইয়া এক বাড়িতে গিয়া উঠছি।  সে আমারে উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে নিয়া  গেল ভোরে।  উপজেলা চেয়ারম্যান মতি সরদাররে জানাইলাম যে, এই এই ঘটনা। মতি সরদার একজন মুক্তিযোদ্ধা। সে মোবাইল করল কাকে কাকে যেন। মোবাইলে কইল  তোরা গনেশের সাথে এসব  কি শুরু করছ।  ওকে কি তোরা এলাকায় থাকতে দিবিনা? ১৯৭১ সালে সাঈদীরে তো আমিই চিনতামনা, দেখিনাই।  ও   চেনবে  ক্যামনে?”
-  
“এর মাঝে একদিন পুলিশ আইছে আমাগো বাড়ী। আইসা আমারে ডাকাইয়া আনছে। আমি বাড়ী ছিলাম না বাইরে ছিলাম। পুলিশ কইছে, তোমার সাথে কিছু কতা আছে, আমি কইছি কোন কেস আছে নিহি? কয়, না কেস নাই। আমি কইলাম, তয় কন কি কতা? কয়, না এহন কবনা পরে এক সময় কব। ওসি সাহেব কতা হোনতে কয়। পরে  আর যাই নাই।”

-    গনেশ বলেন, “বহুবার লোক গেছে আমাকে আনার জন্য গেছে। ওর কোন গোনা-বাছা নাই। তাদের বক্তব্য একটাই যে, তারা যা বলবে তা বলতে হবে, তাদের এই কথায় আমি রাজী হইনাই। যার কারনে আমি আসি নাই।  ডিসি ও ওসি দিয়াও খবর দেওয়াইছে কিন্তু আমি রাজী হইনাই।  সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে না আসায় এলাকার আওয়ামী লীগের লোকজন আমারে কয় তুই রাজাকার। তোর সাঈদী তোরে বাঁচাইতে পারবেনা। সে যাইতে পারবেনা ইলেকশনে।  সে বের হইতে পারবেনা। আমরাই থাকব এলাকায়। তুই কয়দিন পলাইয়া থাকবি।   সাঈদী সাহেবের রেহাই নাই। ”

কে এই গণেশ?
১৯৭১ সালে পিরোজপুরে  বর্বরোচিত  এবং নিমর্ম হত্যার  শিকার শহীদ ভাগীরথীর ছেলে   গণেশ চন্দ্র সাহা। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ভাগীরথীকে হত্যায় সহযোগিতার  অভিযোগ এনেছে রাষ্ট্রপক্ষ। যে ভাগীরথীকে   হত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সেই ভাগিরথীর ছেলে এসে  সাক্ষ্য দিলেন মাওলানা সাঈদীর পক্ষে। তিনি বললেন,  মাওলানা সাঈদী তার মাকে মারেননি। পাকিস্তান আর্মিরাই তার মাকে মেরেছে।
গণেশ চন্দ্র সাহা শুধু যে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ছিলেন তাই নয়। যে ১৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দী তাদের অনুপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনাল মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন সেই ১৫ জনেরও একজন এই   গণেশ চন্দ্র  সাহা।

গত ২০ মার্চ  রাষ্ট্রপক্ষ থেকে  মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে   ৪৬ জন সাক্ষীর বিষয়ে একটি দরখাস্ত দাখিল করা হয়  ট্রাইব্যুনালে । দরখাস্তে নিবেদন করা হয়  ৪৬ জন সাক্ষীকে  ট্রাইব্যুনালে হাজির করা তাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। তাই এসব সাক্ষী  তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছে তা তাদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হোক।
৪৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪ জন সম্পর্কে দরখাস্তে রাষ্ট্রপক্ষ উল্লেখ করেছিল  আসামীর (মাওলানা সাঈদী) পক্ষ অবলম্বনকারী পিরোজপুরের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক সাক্ষীদের বাড়িতে গিয়ে হুমকির  প্রেক্ষিতে ভয়ে ভীত হয়ে তারা আত্মপোগন করেছে। তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। তাই তাদের হাজির করা সম্ভব নয়।

যে ১৪ জন সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষ এ দাবি করেছিল সেই ১৪ জনের একজন হলেন এই গণেশ চন্দ্র ।
রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের  প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল গত ২৯ মার্চ ১৫ জন সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী প্রদান করেন তা তাদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে আদেশ দেন।  গণেশ চন্দ্রের নাম সেই ১৫ জনের তালিকায়ও রয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষ যে সাক্ষীর বিষয়ে বলেছিল মাওলানা সাঈদীর  পক্ষাবলম্বনকারী অস্ত্রধারী  সন্ত্রাসীদের ভয়ে আত গোপন করেছে, তাদের খুজে পাওয়া যাচ্ছেনা এবং আদৌ হাজির করা  not possible.
 সম্ভব নয় সেই গণেশ মাওলানা সাঈদীর পক্ষে হাজির হয়ে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেন। 

ভাগীরথী হত্যাকান্ড এবং  স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র :
ভাগীরথীর হত্যাকান্ড বিষয়ে স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় একটি রিপোর্ট ছাপা হয় “বর্বরতার রেকর্ড” শিরোনামে । সে রিপোর্টটি  কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র নামক মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রমান্য   গ্রন্থে  হুবহু  স্থান পায়। রিপোর্টটি নিচে তুলে ধরা হল হেডলাইনসহ।

বর্বরতার রেকর্ড

॥ রহিম আজাদ প্রদত্ত ॥
বরিশাল :  ‘মহাদেবের জটা থেকে ‘নয় বাংলা মায়ের নাড়ী ছিঁড়ে জন্ম দিয়েছিলেন যে সোনার মেয়ে সে ভাগীরথীকে ওরা জ্যান্ত জীপে বেঁধে শহরের রাস্তায় টেনে টেনে হত্যা করেছে। খান দস্যুরা হয়তো পরখ করতে চেয়েছিল ওরা কতখানি নৃশংস হতে পারে। বলতে হয় সেক্ষেত্রে ওরা শুধু সফলই হয়নি, বর্বরতার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অষ্টাদশী ভাগীরথী ছিল বরিশাল জেলার পিরোজপুর থানার বাঘমারা কদতলীর এক বিধবা পল্লীবালা। বিয়ের এক পর পর একটি পুত্র সন্তান কোলে নিয়েই তাকে বরণ করে নিতে হয় সুকঠিন বৈধব্য।
স্বাীর বিয়োগব্যথা তাঁর তখনও কাটেনি। এরই মধ্যে দেশে নেমে এল ইয়াহিয়ার ঝটিকা বাহিনী। গত মে মাসের এক বিকেলে ওরা চড়াও হলো ভাগীরথীদের গ্রামে। হত্যা করলো অনেককে যাকে সেখানে যেভাবে পেলো। এ নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের মধ্যেও ভাগীরথীকে ওরা মারতে পাররো না। ওর দেহলাবণ্য দস্যুদের মনে যে লালসা জাগিয়েছিল তাতেই হার মানল তাদের রক্তপিপাসা। ওকে ট্রাকে তুলে নিয়ে এল পিরোজপুরে। তারপর ক্যাম্পে তার উপর চালানো হলো হিংস্র পাশবিক অত্যাচার।
সথী নারী ভাগীরথী। এ পরিস্থিতিতে মৃত্যকে তিনি একমাত্র পরিত্রাণের উপায় বলে ভাবতে লাগলেন। ভাবতে ভাবতেই এক সময় এল নতুন চিন্তাÑ হ্যাঁ মৃত্যুই যদি বরণ করতে হয় ওদেরইবা রেহাই দেবো কেনো? ভাগীরথী কৌশলের আশ্রয় নিল এবার। এখন আর অবাধ্য মেয়ে নয় দম্ভরমত খানদের খুশী করতে শুরু করলো, ওদের আস্থা অর্জনের আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগলো।
বেশি দিন লাগলো না অল্প ক’দিনেই নারীলোলুপ ইয়াহিয়া বাহিনৗ ওর প্রতি দারুণ আকর্ষণ অনুভব করলো। আর এই সুযোগে ভাগীরথী ওদের কাছ থেকে জেনে নিতে শুরু করলো পাক বাহিনীর সব গোপন তথ্য। এক পর্যায়ৈ বিশ্বাসভাজন ভাগীরথীকে ওরা নিজের ঘরেও যেতে দিলো। আর কোনো বাধা নেই। ভাগীরথী এখন নিয়মিত সামরিক ক্যাম্পে যায় আবার ফিরে আসে নিজ গ্রামে।
এরই মধ্যে চতুরা ভাগীরথী তার মূল লক্ষ্য অর্জনের পথেও এগিয়ে গেল অনেকখানি। গোপনে মুক্তিবাহিনীর সাথে গড়ে তুলল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।
এরপরই এল আলস সুযোগ। জুন মাসের একদিন ভাগীরথী খান সেনাদের নিমন্ত্রণ করলো তার নিজ গ্রামে। এদিকে মুক্তিবাহিনীকেও তৈরি রাখা হলো  যথারীতি। ৪৫ জন খান সেনা সেদিন হাসতে হাসতে বাগমারা কদমতলা এসেছিল কিন্তু তার মধ্যে ৪/৫ জন ক্যাম্পে ফিরতে পেরেছে বুলেটের ক্ষত নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে। বাকিরা ভাগীরথীর গ্রামেই শিয়াল কুকুর শকুনের খোরাক হয়েছে। এরপর আর ভাগীরথী ওদের ক্যাম্পে যায়নি। ওরা বুঝেছে, এটা তারই কীর্তি। কীর্তিমানরা তাই হুকুম দিল জীবিত অথবা মৃত ভাগীরথীকে যে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে নগদ এক হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে।
কিন্তু ভাগীরথী তখনও জানতো না ওর জন্য আরো দুঃসহ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। একদিন হাটবারে তাকে শহরের রাস্তায় এনে দাঁড় করানো হলো জনবহুল চৌমাখায়। সেখানে প্রকাশ্যে তার অঙ্গাবরণ খুলে ফেলল কয়েকজন খান সেনা। তারপর দু’গাছি দড়ি ওর দু’পায়ে বেঁধে একটি জীপে বেঁধে জ্যান্তে শহরের রাস্তায় টেনে বেড়াল ওরা মহাউৎসবে। ঘণ্টাখানেক রাজপথ পরিক্রমার পর আবার যখন ফিরে এল সেই চৌমাথায় তখনও রর দেহে প্রাণের স্পন্দন রয়েছে।
এবার তারা দু’টি পা দু’টি জীপের সাথে বেঁধে নিল এবং জী দু’টিকে চালিয়ে দিল বিপরীত দিকে। ভাগীরথী দু’ভাগ হয়ে গেল। সেই দু’ভাগে দু’জীপে আবার শহর পরিক্রমা শেষ করে জল্লাদ খানরা আবার ফিরে এল সেই চৌমাথায় এবং এখানেই ফেরে রেখে গেল ওর বিকৃত মাংশগুলো।
একদিন দু’দিন পরে মাংসগুলো ঐ রাস্তার মাটির সাথেই একাকার হয়ে গেল এক সময়। বাংলামায়ের ভাগীরথী এমনিভাবে আবার মিশে গেল বাংলার ধূলিকণার সাথে। কেবল ভাগীরথী নয়, আরো দু’জন মুক্তিযোদ্ধাকেও রা এমনি করে পিরোজপুর শহরে হত্যা করে।


রাফীক ভাই’র পাশে বসতাম ট্রাইব্যুনালে

 ১৩/৬/১২
মেহেদী হাসান
ট্রাইব্যুনালের কোর্ট রুমে   দুই সারি বেঞ্চ। ডান পাশে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আর বাম পাশে আসামী পক্ষের আইনজীবীরা বসেন। বাম পাশের সারিতে  আসামী পক্ষের আইনজীবীদের পেছনে আসামীর আত্মীয় স্বজনরা বসেন। তাছাড়া দুই পাশেই সাংবাদিকদের জন্য বেঞ্চ বরাদ্দ আছে।  আমি সাধারনত বাম পাশের সারিতে বসি যেখানে আসামীমের আত্মীয় স্বজনরা বসেন। কারন আমার একটু  ঠান্ডাজনিত সমস্যা আছে।  ট্রাইব্যুনালের এসিগুলো সব ডানমুখী। সে কারনে বাম পাশে  ঠান্ডা একটু কম লাগে।
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর  মামলার প্রতি তারিখেই ওনার চার ছেলে   ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত থাকেন। (বিশেষ কারনে কেউ অনুপস্থিত থাকলে সেটা ভিন্ন)। বাম পাশে বসার কারনে প্রতিদিন তাদের সাথে দেখা হয় কথা হয় আমার।  প্রায়ই রাফীক ভাই’র পাশে বসতাম আমি। রাফীক ভাই দেখা হলে সবার আগে সালাম দিতেন। তারপর  ওনার পিতাকে নিয়ে নয়া দিগন্তের  নিউজের  প্রশংসা করতেন।  যেদিন কথা  বলার সুযোগ  হতনা সেদিন নিউজের জন্য মোবাইলে মেসেজ দিয় ধন্যবাদ জানাতেন এবং আমার জন্য দোয়া করতেন। সামনা সামনি যখন ধন্যবাদ জানাতেন তখন ওনার  চোখে মুখে  একটা   তৃপ্তির প্রকাশ আমি লক্ষ্য করতাম। এখন তিনি নেই। কিন্তু তার সেই চেহারা আমার  মনে ভেসে উঠছে বারবার।
গতকাল মঙ্গলবার তিনি আমার আগে কোর্টে  আসেন এবং তার পেছনে গিয়ে বসি আমি। তিনি আমার   দিকে ফিরে সালাম দিয়ে হাত মেলালেন। কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন আস্তে করে।
আজ  বুধবার আমি দশটা ৩৭ মিনিটে কোর্টরুমে প্রবেশ করে। ততক্ষনে কোর্ট  শুরু হয়ে গেছে। আমি আস্তে করে কোর্টরুমে ঢুকে বসে পড়লাম।  কথা বলার সুযোগ পাইনি।
দুপুর ১টায় কোর্ট বিরতি হলে সবার মত রাফীক ভাইও কোর্ট থেকে বের হয়ে যান লাঞ্চের  জন্য। । দেড়টার দিকে   ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় তলার সিড়ির গোড়ায় আবু বকর সিদ্দিক (মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী প্যানেলের সদস্য) আমাকে বললেন রাফীক ভাই আবার স্ট্রোক করেছেন। তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
কোর্টের সামনে   মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীদের বহনকারী গাড়িটি  পার্ক করা থাকে। সেখানে তাদের জন্য লাঞ্চ থাকে। রাফীক ভাই একটার বিরতির পর গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন লাঞ্চের জন্য। গাড়িতে ওঠার সময় তিনি বুকে পেইন ফিল করেন। সাথে সাথে ড্রাইভার মাওলানা সাঈদীর তৃতীয় ছেলে মাসুদ সাঈদীর কাছে ছুটে এসে খবর দেন। মাসুদ দৌড়ে গাড়ির কাছে গিয়ে দেখেন রাফীক ভাইর অবস্থা খুব খারাপ। প্রায় অচেতন। সাথে সাথে তিনি গাড়ি নিয়ে বারডেমে ছুটলেন। এরপরের খবর সবাই জানেন।

এই যখন ঘটনা তখনোও কোর্টে উপস্থিত কেউ তেমন কিছু জানেননা এ খবরের। মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী এবং অন্যান্য আত্মীয় স্বজনরা রাফীক ভাইয়ের অসুস্থতার খবর জানেন শুধু। রাফীক ভাই যে অসুস্থ  হয়েছেন তা কোর্টে উপস্থিত সাঈদী সাহেবকে জানানো হয়নি। ইচ্ছা করেই কেউ জানায়নি। দুপুর তখন পৌনে দুইটা।  তখনো বিরতি চলছে।  আমি কোর্ট রুমে প্রবেশ করলাম। হুজুর (মাওলানা সাঈদী) কোর্টরুমে বেঞ্চে বসা। তার ছোট ছেলে নাসিম তার  সামনে বসে আছেন। হুজুর  আমাকে দেখে কাছে ডাকলেন। কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। অন্যান্য দিনের মতই হাসি খুসী তার চেহারা। আমার কাছে দোয়া চাইলেন। আম্মা  আমার আম্মা আব্বা, আমার পত্রিকার নিউজ এডিটর মাসুমুর রহমান খলিলী, নির্বাহী সম্পাদক সালাহউদ্দিন  বাবর ভাইকে সালাম দিলেন। আমিও  বিনয়ের সাথে তার কাছে দোয়া চাইলাম। তিনি শব্দ করে আমার জন্য দোয়া করলেন। আমিও শব্দ করে আমিন বললাম। রাফীক ভাইর বিষয়ে কিছু জানেন বলে মনে হলনা।
(বিররিতর সময় হুজুর কাঠগড়া থেকে নেমে বেঞ্চে বসেন। মাঝে মাঝে নিচের কাঠগড়ায় না গিয়ে সেখানেই নামাজ পড়েন এবং দুপুরের খাবার খান। )
দুইটার পর আবার কোর্ট শুরু হল। সাড়ে তিনটার দিকে মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী মিজানুল ইসলাম (জেরায় এক্সপার্ট) বিচারপতি নিজামুল   হকের কাছে একটি চিরকুট পাঠালেন।
আমি  মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী তাজুল ইসলামকে জিজ্ঞাসা করলাম চিরকুটে কি লেখা ছিল।
তিনি বললেন, চিরকুট আমিই লিখেছিলাম। আমি লিখেছিলাম সাঈদী  সাহেবের বড় ছেলে গুরুতর অসুস্থ। বিষয়টি হুজুরকে জানানো হয়নি। তাই গোপানে আপনাকে জানাচ্ছি। আমরা আজ এবং আগামীকাল কোর্ট মুলতবি চাচ্ছি।

চিরকুট পড়ে নিজামুল হক বললেন প্রথম অংশ মানা গেল। কিন্তু দ্বিতীয় অংশ মানা গেলনা।
বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, আজকের মত মুলতবি করা যায় ।
মিজানুল ইসলাম বলেন, দয়া করে আগামীকাল মুলতবি করেন।
বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, না সেটি মানতে পারলাম না। আমরা যে কি অবস্থার মধ্যে আছি তা  আপনাকে বোঝাতে পারবনা। সেটি বলতে  চাইনা।
তারপর মিজানুল ইসলাম  আগামীকালের মুলতবির জন্য জোর অনুরোধ জানান। বিচারপতি নিজামুল হকও বারবার দুই পাশে মাথা নেড়ে তা বাতিল করতে থাকেন। তিনি বলেন, আমরা তো জনগনের চাপে আছি।  আগামী কাল কোর্টে কোন মামলা নেই। আমাদের কোন কাজ  নেই। সারা দুনিয়া জানবে কাল কোর্ট বসেনি। আপনি কাল আসতে না পারেন অন্য কাউকে আসতে  বলেন।

এরপর মিজানুল ইসলাম বলেন, আমি আপনার সমস্যা বুঝি। কিন্তু মানবিক কারনে শুধু একটা দিনের জন্য মুলতিব চাচ্ছি।  শুধু একটা দিনের জন্য। আমার শরীরও ভাল না। সকালে সিনিয়র (ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক মিজানুল ইসলামের শরীর খারাপের কারনে মুলতবি চেয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাইব্যুানাল দেননি। )  আবেদন করেছিল। সেটা নিয়ে আমার কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু আমি আপনাকে অনুরোধ করছি দয়া করে একদিন মুলতবি করেন। আমরা সবাই টিম হিসেবে কাজ করি। সবারই কাজ আছে।
এরপর বিচারপতি নিজামুল হক  কিছুক্ষন চুপ থেকে বলেন, তাজুল সাহেব আপনি আমার রুমে আসেন। রাষ্ট্রপক্ষেরও একজন আইনজীবীকে তিনি রুমে যেতে বলেন।
তারা  তার   খাস কামরায়  যাবার পরপরই  তিনটা ৪০ এর দিকে আমি  কোর্ট রুম থেকে বের হয়ে অফিসের দিকে রওয়ান দেই।  অফিসে ফেরার পথে একজন ফোন করে  প্রশ্ন করল  রাফীক  বীন সাঈদী  কি মারা গেছে?
আমি  সন্ধ্যার পর তাজুল ভাইকে ফোন দিয়ে জানতে চাইলাম বিচারপতি নিজামুল হকের খাস কামরায় যাবার পর কি হল। তিনি  জানালেন,  আমরা সেখান  থাকা অবস্থায় মারা যাবার খবর পাইনি। তখন সিদ্ধান্ত হল আগামীকাল (বৃহষ্পতিবার ) সকালে কোর্ট বসবে। তারপর মুলতবি বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এরপর বিচারপতি নিজামুল হকের চেম্বার থেকে বের হবার পরই  মৃত্যুর খবর আসল এবং আমরা কোর্টকে তা জানালাম।
হুজুর জেলে থাকা অবস্থায় কিছু দিন আগে তার মা মারা গেলেন। মৃত্যুল আগে বৃদ্ধা মাতা দেখতে পারলেননা ছেলের মুখ। ছেলেও দেখতে পেলেননা মায়ের মুখ। আর আজ  মারা গেলেন তার  অতি আদরের বড় সন্তান। তখন তিনি  আদালতের কাঠগড়ায়। তিনিও তখন সব থেকে কষ্টের, নির্মম,  ঘোষিত মুত্যৃর  খবরের অপেক্ষায় ।  জানতেও পারলেননা তার আদরের সন্তান  মৃত্যুপথযাত্রী। তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
আমি দেখতাম কোর্ট শুরু হবার আগে এবং পরে রাফীক ভাই যতবারই হুজুরের  কাঠগড়ার সামনে যেতেন তখন তার মাথায়, কপালে  চুম্বন করতেন হুজুর। হুজুরকে সিড়ি থেকে নামা এবং ওঠার সময় তিনি সবসময় তার পাশে পাশে থাকতেন।

ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা ঘটনা এবং তার স্ত্রী মমতাজ বেগমের মামলায় যা রয়েছে


 ২৮/২/২০১৩

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে যে দুটি অভিযোগে মুত্যৃদণ্ড প্রদান করা হয়েছে তার মধ্যে একটি হল ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার ঘটনা।  মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের এ অভিযোগে বলা হয়েছে ১৯৭১ সালের ৮ মে মাওলানা সাঈদীর  সাঈদীর নেতৃত্বে  পাকিস্তান আর্মি এবং শান্তি কমিটির লোকজন চিথলিয়া গ্রামে যায় এবং মানিক পসারীর বাড়ি লুট করে । এখানে ৫টি ঘর তারা কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় লুটপাটের পর। মানিক পসারীর বাড়ি থেকে ইব্রাহীম কৃট্টি  এবং মফিজুল নামে দুজনকে  ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরা দুজন  মানিক পসারীর বাড়িতে কাজ করত। মাওলানা সাঈদী এদের দুজনকে ধরে দড়ি দিয়ে বেঁধে পাড়েরহাট বাজারে নিয়ে যান  তার সাথে লোকজনের সহায়তায়। এরপর মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে পাড়েরহাট বাজহারে ব্রিজের কাছে পাকিস্তান আর্মি ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়। মফিজউদ্দিনকে   আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পর সে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের বেশ কয়েকজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। যে বাড়িতে তারা কাজ করত সেই বাড়ির ছেলে মানিক পসারী এবং পালিয়ে আসা মফিজও সাক্ষ্য দিয়েছেন। গতকাল  ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছেন  মফিজ এ ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এ ঘটনা প্রমানিত হয়েছে উল্লেখ করে মাওলানা সাঈদীকে মুত্যৃ দণ্ড প্রদান করা হয়েছে।


ইব্রাহীমের স্ত্রী মমতাজ বেগমের মামলায় যা উল্লেখ আছে :
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর  ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই  ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম তার স্বামী এবং ভাই সাহেব আলী হত্যার বিচার চেয়ে একটি মামলা করেছিলেন। সেই মামলার এজাহারে মমতাজ বেগম উল্লেখ করেছিলেন যে, তার স্বামী  ইব্রাহীম কুট্টি তার বাপের বাড়ি নলবুনিয়া থাকা অবস্থায় শান্তি কমিটির লোকজন এবং পাকিস্তান আর্মি গুলি করে  হত্যা করে। ঘটনাটি ঘটে  ১৯৭১ সালের ১  অক্টোবর । ওই ঘটনার সময় তাদের বাড়ি থেকে তার ভাই সাহেব  আলীকে এবং তার মা সিতারা বেগমকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পিরোজপুর। পরে তার মাকে ছেড়ে দেয়া হলেও তার ভাই সাহেব আলীকে আর ছাড়া হয়নি। তাকে পাকিস্তান আর্মি গুলি করে হত্যা করে। মমতাজ বেগম  সে মামলায় মোট ১৩ জনকে আসামী করেছেন এবং  সে আসামীর তালিকা মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।

মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা মমতাজ বেগমের মামলার  এজাহার ট্রাইব্যনুলে দাখিল করে বলেন ইব্রাহীম কুট্টিকে  হত্যা করা হয় নলবুনিয়ায় পাড়েরহাট নয়। হত্যার তারিখও ভিন্ন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি ৮ মে। আর মমতাজ বেগমের এজাহারে উল্লেখ রয়েছে ১ অক্টোবর।  তাছাড়া মমতাজ বেগম যে ১৩ জনকে আসামী করেন তখন সেখানে মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। কাজেই মাওলানা সাঈদী কোন অবস্থাতেই এ ঘটনার  সাথে জড়িত নয় বলে দাবি করেন তারা।


ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রীর মমতাজ বেগম যে  মামলা করেন তার এজহারে উল্লেখ  করা হয়েছে জীবন বাঁচাতে  তার স্বামী  ইব্রাহীম কুট্টি তাকে নিয়ে  তার বাপের বাড়ি নলবুনিয়ায় চলে আসেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়।    তিনি তার স্বামীকে নিয়ে বাপের বাড়ি থাকা অবস্থায় ১৯৭১ সালের  ১ অক্টোবর আসামীরা  তার স্বামী  ইব্রাহীম কুট্টিকে গুলি করে হত্যা করে। সে ঘটনায় তার হাতেও গুলি লাগে। মমতাজ বেগম এখনো জীবিত কিন্তু তাকে রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষী হিসেবে হাজির করা হয়নি।

মমতাজ বেগম তার স্বামীর হত্যা মামলায় যাদের আসামী করেছেন তারা হলেন, দানেশ মোল্লা,  আতাহার আল, আশ্রাব আলী, আব্দুল মান্নান, আইউব আলী কালাম চৌধুরী, রুহুল আমিন, আব্দুল হাকিম মুন্সি, মমিন উদ্দিন, সেকোন্দার আলী শিকদার, শামসুর রহমান এসআই, মোসলেম মাওলানা।  আসামীদের তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। এছাড়া পাকিস্তান আর্মিকেও আসামী করা হয় মমতাজ বেগমের মামলায়।

মমতাজ বেগমের মামলার এজাহারে যাদের নাম রয়েছে আসামী হিসেবে  তাদের প্রায় সকলকেই  পাড়েরহাটের  কুখ্যাত রাজাকার এবং পিস কমিটির নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা।


রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা যা বলেছেন :
গত ২৭ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের  ষষ্ঠ সাক্ষী  মানিক পসারী তার জবানবন্দীতে বলেন,  ১৯৭১ সালে ৮ মে পাক সেনাবাহিনী নিয়ে দেলোয়ার শিকদার বর্তমানে সাঈদী, সেকেন্দার শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা, রেজাকার  মবিন, হাকিম কারী, সোবহান মাওলানাসহ আরো অনেক রেজাকার আমার বাড়িতে   প্রবেশ করে। তাদের আসতে দেখে আমি বাড়ির  পাশে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকি এবং সব ঘটনা  দেখতে  থাকি। তারা আমার বাড়িতে প্রবেশ করে আমার ফুফাত ভাই মফিজ উদ্দিন (  বাড়িতে কাজ করত)  এবং অপর কাজের লোক ইব্রাহিম কুট্টিকে আর্মিরা ধরে একই দড়িতে বাঁধে। তারপর  লুটপাট করে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।  মফিজ ও ইব্রাহিম কুট্টিকে  বেঁধে পাড়েরহাট নিয়ে যাবার সময় আমি তাদের পেছনে পেছনে যেতে থাকি। তাকে পারের  হাট বাজারের মধ্যে  ব্রিজের ওপারে নিয়ে যায়।  আমি  এপারে বসে তাদের লক্ষ্য করি। দেলোয়ার  হোসেন শিকদারকে আর্মির সাথে পরামর্শ করতে দেখি। তারপর দেলোয়ার হোসেন শিকদার, সেকেন্দার শিকদারের সাথে পরামর্শক্রমে পাক আর্মিরা  ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে। ইব্রাহিম চিৎকার মারে। তারপর লাশ নদীতে ফেলে দেয়।

গত ২১  ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের চতুর্র্থ সাক্ষী সুলতান আহমদ হাওলাদার বলেন, মানিক পসারীর  বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে দেখি দানেশ আলী মোল্লা, দেলোয়ার হোসেন  শিকদার বর্তমান সাঈদী, মোসলেম মাওলানাসহ অনেক রাজাকার বাহিনী  মানিক পসারীর বাড়ির  কর্মচারী ইব্রাহিম কুট্টিকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে বাজারের দিকে। আমি তাদের পিছু পিছু  যেতে থাকি। বাজারের ব্রিজ পার হয়ে পশ্চিম দিকে যাবার পর আমি এপার বসে  থাকি। উত্তর দিকে থানার ঘাট পর্যন্ত নিয়ে যাবার পর  দেলোয়ার হোসেন শিকদার বর্তমানে সাঈদী সাহেব পাক আর্মির সাথে কি যেন বলাবলি করছে দেখতে পাই। তখনই বিকট  গুলির শব্দ এবং চিৎকার শুনতে পাই।     এরপর   ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসার পর পরের দিন শুনতে পাই মানিক পসারীর বাড়ির কাজের লোক ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দিয়েছে।

২৯ ডিসেম্বর   সাক্ষ্য দেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মফিজউদ্দিন পসারী। মফিজ মানিক পসারীর ফুফাত ভাই এবং সে  মানিক পসারীদের বাড়িতে  কাজ করত। ইব্রাহীম কুট্টির সাথে তাকেও ৮ মে পাড়েরহাট ধরে নিয়ে যায় মর্মে দুজন সাক্ষী তাদের সাক্ষ্যে বলেছেন। তবে মফিজ উদ্দিন প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।    মফিজ উদ্দিন তার জবনাবনন্দীতে বলেন,  ১৯৭১ সালের ৮ মে সকালে   গরু মহিষ  নিয়ে চরে যাই। সাথে ইব্রাহিম কুট্টিও ছিল। কিন্তু  আনুমানিক ১০/১১টার দিকে  চরে বসে বসে মামার   বাড়িতে আগুন  এবং  ধোয়া দেখতে পাই। তারপর মামার বাড়ির দিকে ফিরে আসি।  এসময় দেখি ১২/১৪ জন পাক আর্মি, ২০/২২ জন রাজাকার মামার বাড়ি যাচ্ছে । তার মধ্যে দিলু  শিকদার ছিল। আমরা পালাতে চাইলে পাক আর্মি ধরে ফেলে। আমাদের দুজনকে এক দড়িতে  বাঁধে।  এরপর রাজাকাররা ঘরে ঢুকে  লুটপাট করে এবং কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।  আমাদের দুজনকে পারেরহট বাজারে নিয়ে যায়।   পুল থেকে নামিয়ে দিলু শিকদার (তাদের ভাষায় দিলু শিকদার মানে মাওলানা সাঈদী) সেকেন্দার শিকাদর উর্দুতে কি যেন বলল। আমি উর্দু বুঝিনা এবং কি বলেছিল তা  শুনতে পাইনি। এরপর ইব্রাহিমকে  দড়ি থেকে খুলে ছেড়ে দিল এবং আমাকে নিয়ে সামনের দিকে গেল। তারপর গুলির  শব্দ শুনতে পাই। ইব্রাহিম মা বলে চিৎকার করে। পেছনে তাকিয়ে দেখি ইব্রাহিমকে গুলি করছে। সেনাবানিহনী লাথি মেরে লাশ নদীতে ফেলে দিল।


গত ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের অষ্টম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন  মো: মোস্তফা হাওলাদার।  মোস্তফা হাওলাদার  জবানবন্দীতে বলেন, আমি ১৯৭১ সালে পারেরহাট বাজারে বুটমুড়ি ফেরি করে বিক্রি করতাম।  মে মাসের সাত তারিখ  শান্তি কমিটির দেলোয়ার  শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা এরা  বাজারের উত্তর মাথায় রিক্সা স্ট্যান্ডের কাছে যায়। কিছুক্ষন পর ২৬টি  রিক্সায় ৫২ জন পাক আর্মি আসে।..... অর্মির অর্ডারে শুরু হয় লুটপাট। ....... আমরা খালের ওপারে বসে ধোয়া এবং আগুন দেখতে পাই নুরু খার ঘরের। আগুন আর ধোয়া দেখার পর দেখি  লুটপাট করে লোকজন রইজুদ্দীন কোম্পানীর বাড়ির দিকে যাচ্ছে। রইজুদ্দীন সইজুদ্দীন পসারীর বাড়িতে (মানিক পসারীদের বাড়ি) দুজন লোক থাকত মফিজ উদ্দিন এবং ইব্রাহীম কুট্টি নামে। তারা চরে গিয়েছিল গরু চড়াতে। তারা আগুন দেখে দৌড়ে আসে। এসময় দেলোয়ার শিকদার তাদের চাইপপা ধরে এবং মফিজ উবরাইয়া পরে যায়।  পাক আর্মি ধরে ইব্রাহিম কুট্টিকে। তাদের এক দাড়িতে বেঁধে পারেরহাট বাজারে নিয়ে যায়। তারপর মফিজকে পারেরহাট রাজাকার ক্যাম্পে আর ইব্রাহিমকে নেয়া হয় থানার ঘাটের দিকে। তারপর গুলির শব্দ শুনি। থানার ঘাটের কাছে ব্রিজের গোড়ায় ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে লাথি মেরে পানিতে ফেলে দেয়।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষীরা যা বলেছেন :
মাওলানা সাঈদীর পক্ষে  তিনজন  সাক্ষী ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

গত নয় অক্টোবর ১১ তম সাক্ষী গোলাম মোস্তাফার তার জবানবন্দীতে বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১ অক্টোবর আমার গ্রাম নলবুনিয়ায় আজাহার আলী হাওলাদারের বাড়িতে একটি ঘটনা ঘটে। ওইদিন ফজরের আজানের পূর্ব মুহূর্তে এক প্রচন্ড শব্দ শুনে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম থেকে উঠার পরেই মসজিদে আযান হলে মসজিদে নামায পড়তে যাই। নামাজের পরে মুসল্লিদের মধ্যে আলাপ আলোচনা হতে থাকে যে, আযানের পূর্বে কোথায় এই প্রচন্ড শব্দটি হলো। এই আলাপ আলোচনা করতে করতে আমরা মসজিদের সামান্য দূরে খালের পাড়ের রাস্তায় আসি। একটু পরেই দেখতে পাই  উত্তর দিক থেকে দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা, সেকেন্দার শিকদার, রুহুল আমীন, মোমিন,  আজহার আলী হাওলাদারের ছেলে সাহেব  আলী এবং তার মাকে  নিয়ে পাড়েরহাটের দিকে যাচ্ছে। তার ৫/৭ মিনিট পরে নৌকায় করে আইউব আলী  চকিদার, কালাম   চকিদার, হামিক মুন্সি, আব্দুল মান্নান, আশরাফ আল মিলে আজহার আল হাওলাদারের জামাই ইব্রাহীম কুট্টির লাশ নিয়ে যাচ্ছে।
এরপর আমরা কায়েকজন আজহার হাওলাদারের বাড়ি যাই। সেখানে  গিয়ে বাড়িভর্তি মানুষ এবং ঘরে কান্নার রোল শুনতে পাই। লোকজন বলাবলি করতেছে আজহার হাওলাদারের জামাইকে (ইব্রাহীম কুট্টি)  মেরে ফেলেছে। ইব্রাহীমের স্ত্রী মমতাজ বেগমও সেকথা জানায়।

এরপর আমরা সেখান থেকে চলে আসি।  বিকালের দিকে শুনি সাহেব আলীকে (মমতাজ বেগমের ভাই এবং ইব্রাহীমের শ্যালক)  এবং তার মাকে রাজাকাররা পিরোজপুরে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে গেছে। পরের দিন শুনি  সাহেব আলীর মা সেতারা বেগম ফিরে এসেছে এবং সাহেব আলীকে পাকিস্তানী বাহিনী পিরোজপুরে গুলি করে মেরেছে।

এছাড়া মাওলানা সাঈদীর পক্ষে দ্বিতীয় সাক্ষী আব্দুর রাজ্জাক আঁকনও গত ৫  অক্টোবার ইব্রাহীম কুট্টি  হত্যা বিষয়ে একই ধরনের জবানবন্দী প্রদান করেন।

ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার বিবরন তুলে ধরে গত ২ অক্টোবর  মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে  সাক্ষ্য  দেন পিরোজপুর নলবুনিয়ার জামাল হোসেন ফকির।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আমি আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি রাত্রের শেষ ভাগে আমি নৌকা নিয়ে বড়শি তুলে বাড়ির কাছাকাছি আসলে বিশাল একটা শব্দ শুনতে পাই। পরে আজহার আলীর বাড়ি গিয়ে দেখি  ইব্রাহিম কুট্টির লাশ আইয়ুব আলী চৌকিদার, কালাম চৌকিদার, হাকিম মুন্সি, মান্নান ও আশরাফ আলী খালের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তার পিছে দানেশ মোল্লা, সেকান্দার শিকদার, মোসলেম মওলানা, রুহুল আমিন, মোমিনরা মিলে সাহবে আলীকে পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে তার মাকেসহ পাড়েরহাটে দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সামনে এগিয়ে দেখি ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নৌকায় তুলে পাড়েরহাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সাহেব আলীদের ঘরে চলে আসি। ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতেছে

তারপরের দিন আবার তাদের  বাড়ি গিয়ে জানতে পারি পিরোজপুর নিয়া সাহেব আলীকে মিলিটারীরা গুলি  করে মারছে। সাহেব আলীর মা ফিরে এসেছে।

ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্র ও আসামী পক্ষের সাক্ষীরা যা বললেন ট্রাইব্যুনালে

 ১২/১০/২০১২

মেহেদী হাসান
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগে  বর্তমানে বিচার চলছে তার মধ্যে অন্যতম আলোচিত একটি অভিযোগ হল  ইব্রাহীম কুট্টি  হত্যা ঘটনা।  ১৯৭১ সালের এ হত্যাকান্ড বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা  ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে এবং উপস্থিতিতে পাকিস্তান  আর্মি ১৯৭১ সালের ৮ মে পাড়েরহাট বাজারে ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা করে । অপর দিকে মাওলানা সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীরা বলেছেন, ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর নলবুনিয়া গ্রামে শশুরবাড়িতে থাকা অবস্থায় ইব্রাহীম কুট্টিকে রাজাকাররা গুলি করে হত্যা করে।

দুই পক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যে দেখা যায় ইব্রাহীম কুট্টির হত্যার তারিখ এবং ঘটনা  স্থলের মধ্যে কোন মিল নেই।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা যা বলেছেন :
গত ২৭ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের  ষষ্ঠ সাক্ষী  মানিক পসারী তার জবানবন্দীতে বলেন,  ১৯৭১ সালে ৮ মে পাক সেনাবাহিনী নিয়ে দেলোয়ার শিকদার বর্তমানে সাঈদী, সেকেন্দার শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা, রেজাকার  মবিন, হাকিম কারী, সোবহান মাওলানাসহ আরো অনেক রেজাকার আমার বাড়িতে   প্রবেশ করে। তাদের আসতে দেখে আমি বাড়ির  পাশে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকি এবং সব ঘটনা  দেখতে  থাকি। তারা আমার বাড়িতে প্রবেশ করে আমার ফুফাত ভাই মফিজ উদ্দিন (  বাড়িতে কাজ করত)  এবং অপর কাজের লোক ইব্রাহিম কুট্টিকে আর্মিরা ধরে একই দড়িতে বাঁধে। তারপর  লুটপাট করে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।  মফিজ ও ইব্রাহিম কুট্টিকে  বেঁধে পাড়েরহাট নিয়ে যাবার সময় আমি তাদের পেছনে পেছনে যেতে থাকি। তাকে পারের  হাট বাজারের মধ্যে  ব্রিজের ওপারে নিয়ে যায়।  আমি  এপারে বসে তাদের লক্ষ্য করি। দেলোয়ার  হোসেন শিকদারকে আর্মির সাথে পরামর্শ করতে দেখি। তারপর দেলোয়ার হোসেন শিকদার, সেকেন্দার শিকদারের সাথে পরামর্শক্রমে পাক আর্মিরা  ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে। ইব্রাহিম চিৎকার মারে। তারপর লাশ নদীতে ফেলে দেয়।

গত ২১  ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের চতুর্র্থ সাক্ষী সুলতান আহমদ হাওলাদার বলেন, মানিক পসারীর  বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে দেখি দানেশ আলী মোল্লা, দেলোয়ার হোসেন  শিকদার বর্তমান সাঈদী, মোসলেম মাওলানাসহ অনেক রাজাকার বাহিনী  মানিক পসারীর বাড়ির  কর্মচারী ইব্রাহিম কুট্টিকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে বাজারের দিকে। আমি তাদের পিছু পিছু  যেতে থাকি। বাজারের ব্রিজ পার হয়ে পশ্চিম দিকে যাবার পর আমি এপার বসে  থাকি। উত্তর দিকে থানার ঘাট পর্যন্ত নিয়ে যাবার পর  দেলোয়ার হোসেন শিকদার বর্তমানে সাঈদী সাহেব পাক আর্মির সাথে কি যেন বলাবলি করছে দেখতে পাই। তখনই বিকট  গুলির শব্দ এবং চিৎকার শুনতে পাই।     এরপর   ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসার পর পরের দিন শুনতে পাই মানিক পসারীর বাড়ির কাজের লোক ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দিয়েছে।

২৯ ডিসেম্বর   সাক্ষ্য দেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মফিজউদ্দিন পসারী। মফিজ মানিক পসারীর ফুফাত ভাই এবং সে  মানিক পসারীদের বাড়িতে  কাজ করত। ইব্রাহীম কুট্টির সাথে তাকেও ৮ মে পাড়েরহাট ধরে নিয়ে যায় মর্মে দুজন সাক্ষী তাদের সাক্ষ্যে বলেছেন। তবে মফিজ উদ্দিন প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।    মফিজ উদ্দিন তার জবনাবনন্দীতে বলেন,  ১৯৭১ সালের ৮ মে সকালে   গরু মহিষ  নিয়ে চরে যাই। সাথে ইব্রাহিম কুট্টিও ছিল। কিন্তু  আনুমানিক ১০/১১টার দিকে  চরে বসে বসে মামার   বাড়িতে আগুন  এবং  ধোয়া দেখতে পাই। তারপর মামার বাড়ির দিকে ফিরে আসি।  এসময় দেখি ১২/১৪ জন পাক আর্মি, ২০/২২ জন রাজাকার মামার বাড়ি যাচ্ছে । তার মধ্যে দিলু  শিকদার ছিল। আমরা পালাতে চাইলে পাক আর্মি ধরে ফেলে। আমাদের দুজনকে এক দড়িতে  বাঁধে।  এরপর রাজাকাররা ঘরে ঢুকে  লুটপাট করে এবং কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।  আমাদের দুজনকে পারেরহট বাজারে নিয়ে যায়।   পুল থেকে নামিয়ে দিলু শিকদার (তাদের ভাষায় দিলু শিকদার মানে মাওলানা সাঈদী) সেকেন্দার শিকাদর উর্দুতে কি যেন বলল। আমি উর্দু বুঝিনা এবং কি বলেছিল তা  শুনতে পাইনি। এরপর ইব্রাহিমকে  দড়ি থেকে খুলে ছেড়ে দিল এবং আমাকে নিয়ে সামনের দিকে গেল। তারপর গুলির  শব্দ শুনতে পাই। ইব্রাহিম মা বলে চিৎকার করে। পেছনে তাকিয়ে দেখি ইব্রাহিমকে গুলি করছে। সেনাবানিহনী লাথি মেরে লাশ নদীতে ফেলে দিল।


গত ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের অষ্টম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন  মো: মোস্তফা হাওলাদার।  মোস্তফা হাওলাদার  জবানবন্দীতে বলেন, আমি ১৯৭১ সালে পারেরহাট বাজারে বুটমুড়ি ফেরি করে বিক্রি করতাম।  মে মাসের সাত তারিখ  শান্তি কমিটির দেলোয়ার  শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা এরা  বাজারের উত্তর মাথায় রিক্সা স্ট্যান্ডের কাছে যায়। কিছুক্ষন পর ২৬টি  রিক্সায় ৫২ জন পাক আর্মি আসে।..... অর্মির অর্ডারে শুরু হয় লুটপাট। ....... আমরা খালের ওপারে বসে ধোয়া এবং আগুন দেখতে পাই নুরু খার ঘরের। আগুন আর ধোয়া দেখার পর দেখি  লুটপাট করে লোকজন রইজুদ্দীন কোম্পানীর বাড়ির দিকে যাচ্ছে। রইজুদ্দীন সইজুদ্দীন পসারীর বাড়িতে (মানিক পসারীদের বাড়ি) দুজন লোক থাকত মফিজ উদ্দিন এবং ইব্রাহীম কুট্টি নামে। তারা চরে গিয়েছিল গরু চড়াতে। তারা আগুন দেখে দৌড়ে আসে। এসময় দেলোয়ার শিকদার তাদের চাইপপা ধরে এবং মফিজ উবরাইয়া পরে যায়।  পাক আর্মি ধরে ইব্রাহিম কুট্টিকে। তাদের এক দাড়িতে বেঁধে পারেরহাট বাজারে নিয়ে যায়। তারপর মফিজকে পারেরহাট রাজাকার ক্যাম্পে আর ইব্রাহিমকে নেয়া হয় থানার ঘাটের দিকে। তারপর গুলির শব্দ শুনি। থানার ঘাটের কাছে ব্রিজের গোড়ায় ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে লাথি মেরে পানিতে ফেলে দেয়।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষীরা যা বলেছেন :
মাওলানা সাঈদীর পক্ষে এ পর্যন্ত ১২ জন সাক্ষীর  সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন  সাক্ষী ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

গত নয় অক্টোবর ১১ তম সাক্ষী গোলাম মোস্তাফার তার জবানবন্দীতে বলেন, : ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১ অক্টোবর আমার গ্রাম নলবুনিয়ায় আজাহার আলী হাওলাদারের বাড়িতে একটি ঘটনা ঘটে। ওইদিন ফজরের আজানের পূর্ব মুহূর্তে এক প্রচন্ড শব্দ শুনে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম থেকে উঠার পরেই মসজিদে আযান হলে মসজিদে নামায পড়তে যাই। নামাজের পরে মুসল্লিদের মধ্যে আলাপ আলোচনা হতে থাকে যে, আযানের পূর্বে কোথায় এই প্রচন্ড শব্দটি হলো। এই আলাপ আলোচনা করতে করতে আমরা মসজিদের সামান্য দূরে খালের পাড়ের রাস্তায় আসি। একটু পরেই দেখতে পাই  উত্তর দিক থেকে দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা, সেকেন্দার শিকদার, রুহুল আমীন, মোমিন,  আজহার আলী হাওলাদারের ছেলে সাহেব  আলী এবং তার মাকে  নিয়ে পাড়েরহাটের দিকে যাচ্ছে। তার ৫/৭ মিনিট পরে নৌকায় করে আইউব আলী  চকিদার, কালাম   চকিদার, হামিক মুন্সি, আব্দুল মান্নান, আশরাফ আল মিলে আজহার আল হাওলাদারের জামাই ইব্রাহীম কুট্টির লাশ নিয়ে যাচ্ছে।
এরপর আমরা কায়েকজন আজহার হাওলাদারের বাড়ি যাই। সেখানে  গিয়ে বাড়িভর্তি মানুষ এবং ঘরে কান্নার রোল শুনতে পাই। লোকজন বলাবলি করতেছে আজহার হাওলাদারের জামাইকে (ইব্রাহীম কুট্টি)  মেরে ফেলেছে। ইব্রাহীমের স্ত্রী মমতাজ বেগমও সেকথা জানায়।

এরপর আমরা সেখান থেকে চলে আসি।  বিকালের দিকে শুনি সাহেব আলীকে (মমতাজ বেগমের ভাই এবং ইব্রাহীমের শ্যালক)  এবং তার মাকে রাজাকাররা পিরোজপুরে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে গেছে। পরের দিন শুনি  সাহেব আলীর মা সেতারা বেগম ফিরে এসেছে এবং সাহেব আলীকে পাকিস্তানী বাহিনী পিরোজপুরে গুলি করে মেরেছে। 

এছাড়া মাওলানা সাঈদীর পক্ষে দ্বিতীয় সাক্ষী আব্দুর রাজ্জাক আঁকনও গত ৫  অক্টোবার ইব্রাহীম কুট্টি  হত্যা বিষয়ে একই ধরনের জবানবন্দী প্রদান করেন।

ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার বিবরন তুলে ধরে গত ২ অক্টোবর  মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে  সাক্ষ্য  দেন পিরোজপুর নলবুনিয়ার জামাল হোসেন ফকির।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আমি আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি রাত্রের শেষ ভাগে আমি নৌকা নিয়ে বড়শি তুলে বাড়ির কাছাকাছি আসলে বিশাল একটা শব্দ শুনতে পাই। পরে আজহার আলীর বাড়ি গিয়ে দেখি  ইব্রাহিম কুট্টির লাশ আইয়ুব আলী চৌকিদার, কালাম চৌকিদার, হাকিম মুন্সি, মান্নান ও আশরাফ আলী খালের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তার পিছে দানেশ মোল্লা, সেকান্দার শিকদার, মোসলেম মওলানা, রুহুল আমিন, মোমিনরা মিলে সাহবে আলীকে পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে তার মাকেসহ পাড়েরহাটে দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সামনে এগিয়ে দেখি ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নৌকায় তুলে পাড়েরহাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সাহেব আলীদের ঘরে চলে আসি। ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতেছে

তারপরের দিন আবার তাদের  বাড়ি গিয়ে জানতে পারি পিরোজপুর নিয়া সাহেব আলীকে মিলিটারীরা গুলি  করে মারছে। সাহেব আলীর মা ফিরে এসেছে।

ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মামলায় যা উল্লেখ করেছেন :  বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর  ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই  ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম তার স্বামী এবং ভাই সাহেব আলী হত্যার বিচার চেয়ে একটি মামলা করেছিলেন। সেই মামলার  এজাহার ট্রাইব্যনুলে গত নয় অক্টোবর দাখিল  করেছেন মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা।  মামলার সেই এজাহারে ইব্রাহীম কুট্টির  হত্যার স্থান নলবুনিয়া এবং হত্যার তারিখ ১৯৭১ সালের ১  অক্টোবর  লেখা রয়েছে। পাড়েরহাট বা ৮ মে নয়। তাছাড়া  মমতাজ বেগম  সে মামলায় মোট ১৩ জনকে আসামী করেছেন এবং  সে আসামীর তালিকা মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।

ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রীর মমতাজ বেগম যে  মামলা করেন তার এজহারে উল্লেখ  করা হয়েছে জীবন বাঁচাতে  তার স্বামী  ইব্রাহীম কুট্টি তাকে নিয়ে  তার বাপের বাড়ি নলবুনিয়ায় চলে আসেন।    তিনি তার স্বামীকে নিয়ে বাপের বাড়ি থাকা অবস্থায় ১৯৭১ সালের  ১ অক্টোবর আসামীরা  তার স্বামী  ইব্রাহীম কুট্টিকে গুলি করে হত্যা করে।

মমতাজ বেগম তার স্বামীর হত্যা মামলায় যাদের আসামী করেছেন তারা হলেন, দানেশ মোল্লা,  আতাহার আল, আশ্রাব আলী, আব্দুল মান্নান, আইউব আলী কালাম চৌধুরী, রুহুল আমিন, আব্দুল হাকিম মুন্সি, মমিন উদ্দিন, সেকোন্দার আলী শিকদার, শামসুর রহমান এসআই, মোসলেম মাওলানা।  আসামীদের তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। যারা আসামী তাদের প্রায় সকলকেই  পাড়েরহাটের  কুখ্যাত রাজাকার এবং পিস কমিটির নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা।