গোলাম আযম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গোলাম আযম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৪

অধ্যাপক আযমের জানাজা কাল // বাসায় হাজারো মানুষের ভিড়

মেহেদী হাসান  ২৪/১০/২০১৪
কাল জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে অধ্যাপক গোলাম আযমের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। জোহরের নামাজের পর জানাজা হবে। অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী জানাজা নামাজের ইমামতি করবেন।
জানাজা শেষে বড়মগবাজার কাজী অফিস লেনের পারিবারিক গোরস্তানে তাকে দাফন করা হবে। আজ সন্ধ্যার পর আব্দুল্লাহিল আমান আযমী এ ঘোষনা দেন।   জানিয়েছেন।

আমান আযমী বলেন, তিনি ছাড়া তার অপর পাঁচভাই সপরিবারে বিদেশে বাস করেন। তাছাড়া তাদের আরো অনেক আত্মীয় স্বজন রয়েছে। তার আব্বার অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী আছেন দেশে বিদেশে। তারা সবাই আব্বার জানাজা এবং দাফনে অংশ নিতে চেয়েছেন। সেজন্য জানাজা এবং দাফনের জন্য অপেক্ষা করা হয়। কিন্তু তার ভাইয়েরা স্বল্প সময়ের নোটিশে ভিসা সংগ্রহ করে দেশে আসতে পারছেননা। তাই আর অপেক্ষা না করে আজ জানাজার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে ।

নিজ বাসায় গোলাম আযম
অধ্যাপক গোলাম আযম নিজ বাসায় ফিরলেন। তবে লাশ হয়ে। পৌনে তিনবছর প্রিজন সেলে বন্দী থাকার পর আজ সকাল সাতটা ৫০ মিনিটে তার লাশ  বড়মগবাজারের কাজী অফিস লেনের নিজ বাসায় আনা হয়।

গত বৃহষ্পতিবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল  করেন অধ্যাপক গোলাম আযম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি অধ্যাপক গোলাম আযমকে গ্রেফতার করা হয়।  গ্রেফতারের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত  নব্বয়োর্ধ অসুস্থ অধ্যাপক গোলাম আযমকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালের প্রিজন সেলেই বন্দী ছিলেন। 

রাত দুইটা ৪৫ মিনিটের সময় অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশ বিএসএমএমইউ থেকে পোস্ট মর্টেমের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পোস্ট মর্টেম সম্পন্ন করার পর সকাল সাতটা ৪০ মিনিটে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে লাশ হস্তান্তর করা হয় অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমীর কাছে। এরপর সাতটা ৫০ মিনিটে তার লাশ বাসায় এসে পৌছে।
বাসায় আনার পর সর্বপ্রথম অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশ গোসল করানো হয়। গোসল শেষে সকাল পৌনে ১১টায় তার লাশ বাসার সামনে নেয়া হয় এবং সেখানে বিপুল সংখ্যক ভক্ত অনুসারী তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ভ্রাম্যমান মরচুয়ারিতে করে ২০ মিনিটের মত বাড়ির সামনে রাখা হয় লাশ । এরপর লাশ আবার ভবনের নিচে নিয়ে যাওয়া হয়।

হাজারো মানুষের ভিড়
অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশ নিজ বাসায় আনার পর বিশ্ববরেণ্য এ রাজনীতিবিদের প্রতি  শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করে হাজারো মানুষ।
তাকে শেষবারের মত দেখা এবং তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সারাদিন অগনতি মানুষ ভিড় জমাতে থাকে কাজি অফিস লেনের বাসভবনের সামনে। জুমার নামাজের পর আবার তার লাশ বাসার সামনে আনা হয় ।  এসময় পুরো কাজী অফিস লেন লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় তাকে শেষবারের মত দেখার জন্য। হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘ সময় লাইনে দাড়িয়ে অপেক্ষা করেন তাকে দেখার জন্য। জুমার নামাজের পর অধ্যাপক গোলাম আযমের জন্য মুনাজাত করেন বাড়ি সংলগ্ন মসজিদের খতিব। এসময় সেখানে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। অনেকের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। এরপর ৯২ বছর বয়সে অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘ বন্দী জীবন এবং বন্দীত্ব অবস্থায় মৃত্যুর পর লাশ হয়ে বাসার ফেরার প্রসঙ্গ তুলে ধরে একজন বক্তব্য রাখার পর অনেকে হুহু করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
এরপর সারাদিনব্যাপী চলতে থাকে অগনিত মানুষের ভিড়।
নির্বাহী পরিষদ সদস্য ডা. আব্দুল্লাহ মো : তাহের, সাবেক এমপি হামিদুর রহমান  আযাদ. কর্মপরিষদ সদস্য ডা. অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, কর্মপরিষদ সদস্য ডা. রেদোয়ান উল্লাহ শাহেদী, ঢাকা মহানগর সেক্রেটারি মনজুরুল ইসলাম ভুইয়া, সেলিম উদ্দিন, ড. রেজাউল করিম, লেবার পার্টির সভাপতি ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, জাগপা মহাসচিব খন্দকার লুৎফর রহমানসহ বিপুলসংখ্যক রাজনীতিবিদ নেতাকর্মী অধ্যাপক গোলাম আযমের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আসেন।
আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বাসার সামনে উপস্থিত থেকে সাংবাদিকদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন।

পোষ্টমর্টেম :
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান  মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রাত ২টায় অধ্যাপক গোলাম আযমের সুরতহাল প্রস্তুত করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তারেক হাসান। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন শাহবাগ থানার এসআই ফেরদৌস আলম।
পরে রাত  ৩টার দিকে এম্বুলেন্সে করে গোলাম আযমের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে সকাল পৌনে ৬টার দিকে অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশ পোষ্টমর্টেম কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সকাল সোয়া ৬টার দিকে লাশের পোষ্টমর্টেম শুরু হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: শফিউজ্জামান খায়ের এবং প্রভাষক ডা: প্রদীপ বিশ্বাসের নেতৃত্বে পোষ্টমর্টেম সম্পন্ন হয়। প্রায় ৩০ মিনিটে পোষ্টমর্টেম সম্পন্ন হয়।
মর্গ সূত্র জানায়, পোষ্টমর্টেমের সময় অধ্যাপক গোলাম আযমের লাং, হার্ট ও পাকস্থলির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে প্যাথলজি পরীক্ষার জন্য।
পোষ্টমর্টেম শেষে ৭-৪০ মিনিটে অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশ হস্তান্তর করা হয় স্বজনদের কাছে। সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী পিতার লাশ গ্রহণ করেন। এসময় কারাগারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারারক্ষি মো: জাকারিয়া ।
এদিকে অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নেয়ার পর সেখানে আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা ভিড় করেন। সকাল হলে ভিড় আরো বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে সেখানে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। 



মৃত্যুর ঘোষনা
গ্রেফতারের পর থেকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন ছিলেন অধ্যাপক গোলাম আযম। গত দুই সেপ্টম্বর থেকে  ৯২ বছর বয়সী অধ্যাপক গোলাম আযমের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। এরপর থেকে তাকে বেশ কয়েকবার সিসিইউ, আইসিইউতে নেয়া হয়। গত বৃহষ্পতিবার অধ্যাপক গোলাম আযমের রক্তচাপ একেবারেই কমে যায় সকালে এক পর্যায়ে তার রক্তচাপ ৬০/৪০ এ নেমে আসে এবং সহজে কারো ডাকে সাড়া দিচ্ছিলেননা। অনেকক্ষন ডাকাডাকির পর মাঝে মাঝে তিনি চোখ তুলে তাকাতেন। এ পর্যায়ে চিকিৎসকরা ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে তার রক্তচাপ বাড়ানোর চেষ্টা করেন এবং পরবর্তীতে কৃত্রিম শ্বাসপ্রসাসের ব্যবস্থা করা হয়। বৃহষ্পতিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে অধ্যাপক গোলাম আযমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে সংবাদ মাধ্যমে। ১০টার দিকে অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে আব্দুল্লাহিল আমান আযমী জানান তার বাবা আর বেচে নেই। এরপর ডাক্তারা প্রথমে তাকে কিনিক্যালী ডেড ঘোষনা করে। রাত ১১টা ৫২ মিনিটের মিনিটে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আব্দুল মজিদ ভূইয়া তার মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষনা করেন। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, ম্যাসিভ হার্ট এ্যাটাকের কারণে রাত ১০টা ১০ মিনিটে অধ্যাপক গোলাম আযম মৃত্যুবরণ করেছেন।

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে  ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ অধ্যাপক গোলাম আযমকে ৯০ বছর কারাদণ্ড প্রদান করে।



বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৪

অধ্যাপক গোলাম আযমের ইন্তেকাল


মেহেদী হাসান
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯১    বছর ১১ মাস। আজ  রাত ১১টা ৫২ মিনিটে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আব্দুল মজিদ ভূইয়া তার মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষনা করেন। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, ম্যাসিভ হার্ট এ্যাটাকের কারণে রাত ১০টা ১০ মিনিটে অধ্যাপক গোলাম আযম মৃত্যুবরণ করেছেন। রাতেই কারা বিধি অনুযায়ী তার লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। যেহেতু তিনি একজন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি তাই পোস্ট মর্টেম হবে কিনা কারা কর্তৃপক্ষই তা নির্ধারণ করবেন বলে জানান তিনি।

বিএসএমএমইউ’র পরিচালকের বক্তব্যের কিছুক্ষণ পূর্বে অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী সাংবাদিকদের জানান, তার পিতা আর বেঁচে নেই। একজন মুসলমান হিসেবে যেভাবে দাফন-কাফন করা প্রয়োজন তারা সেটাই চান। তার এ বক্তব্যের কিছুক্ষণ পরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অধ্যাপক গোলাম আযমের মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষনা করেন।

গত কয়েকািদন ধরে মারাত্মক অসুস্থতার পর গতকাল সকাল থেকেই তার অবস্থার অবনতি ঘটে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ম্যাসিভ হার্ট এ্যাটাকের পর মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ জানান, অধ্যাপক গোলাম আযম ‘কিনিক্যালি ডেড’। তবে তাকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। রাত ১০টার দিকে আইনজীবী তাজুল ইসলাম গোলাম আযমের ছেলে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনালের আব্দুল্লাহিল আমান আযমীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, ‘আমার পিতা আর বেঁচে নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেন তার মৃত্যুর ঘোষনা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাচ্ছেননা তা আমরা জানিনা’।

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আব্দুল মজিদ ভূইয়া রাত ৯টা ৫৮ মিনিটে অধ্যাপক গোলাম আযমের মৃত্যুর খবরটি গুজব বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি তখন জানান, তাকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি মারা যাননি’।

গত ৯ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন অধ্যাপক অধ্যাপক গোলাম আযমকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেদিন বিকাল ৪টার কিছু আগে তাকে প্রিজন সেল থেকে সিসিইউ-এ নেয়া হয়। তিনি দীর্ঘদিন থেকে নানা ধরনের অসুখে ভুগছেন। এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর শ্বাসকষ্ট হওয়ায় তাকে সিসিউি-এ চিকিৎসা দেয়া হয়। তার ছিল অতি উচ্চ রক্তচাপ (১৬০/১০৫), হৃদ স্পন্দন ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি (১৪০-১৪৩)। ফুসফুসে দেখা দেয় সংক্রমণ। তার নিউমোনিয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকরা।

অধ্যাপক গোলাম আযম বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক সুপরিচিত নাম। দেশের বাইরেও ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত কোটি কোটি মানুষের কাছেও তিনি ছিলেন সমাদৃত। ইসলামী আদর্শের একজন একনিষ্ঠ অনুসারী ও নেতা হিসেবে বিশ্বের আনাচে-কানাচেও তার সুনাম ও সুখ্যাতি রয়েছে। বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের নেতা হিসেবেও সর্বত্র তাকে মান্য করা হয়।

 ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনে তার রয়েছে স্মরণীয় ভূমিকা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে পাকিস্তানের অখন্ডতার পক্ষে ভূমিকা রাখায় তিনি নাগরিকত্ব হারান। ১৯৯৪ সালে সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে নাগরিকত্ব ফিরে পান তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি দুইবার ডাকসুর জিএস নির্বাচিত হন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭১ সালের ভূমিকার কারণে তার বিচার শুরু হয় এবং তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
২০১২ সালের ১১ জানুয়ারী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদেশে অধ্যাপক গোলাম আযমকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই তাকে বিএসএমএমইউ’র প্রিজন সেলে রাখা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন।

জানাযা ও দাফন :
অধ্যাপক আযমের ছেলে আব্দুল্লাহিল আমান আযমী জানান, জানাযার বিষয়ে আমার পিতা আমার কাছে অসিয়ত করেছেন যে, জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী যেন তারা জানাযায় ইমামতি করেন। তখন আমি তাকে জানাই মাওলানা নিজামীও কারাবন্দী। এটা শুনে আমার পিতা বলেন, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী যেন তার জানাযা পড়ান। মাওলানা সাঈদীও কারাবন্দী জানানো হলে আমার পিতা জানাযার বিষয়ে আর কিছু বলেননি।

দাফনের বিষয়ে তিনি অসিয়ত করেছেন। মগবাজার কাজী অফিস লেনে আমার দাদার কবরের পাশে দাফন করার কথা বলেছেন।আব্দুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, আমরা ছয় ভাই। আমি ছাড়া অন্যরা প্রবাসে। তারা সবাই দেশে আসলে পিতার দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।
ময়না তদন্ত বিষয়ে তিনি জানান, আমরা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছি, আমার পিতার যেন ময়না তদন্ত না করা হয়। তিনি হাসপাতালের সি ব্লকের সামনে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

হাসপাতাল ও বাসভবনে ভীড় : অধ্যাপক গোলাম আযমের স্বাস্থ্যের অবনতির খবর সকাল থেকেই গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে করে অধ্যাপক গোলাম আযমের পরিবার ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। তারা বিভিন্নভাবে তার শারীরিক অবস্থা জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। সন্ধ্যার পর অনেকেই হাসপাতাল ও মগবাজার কাজী অফিস লেনের বাসভবনে ভীড় করতে থাকেন। উদ্বেগজনক খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার পর রাতে ভীড় আরো বেড়ে যায়। 
রাত ৯টা পর হাসপাতাল ও তার বাসভবনে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। এমনকি রাতে বিএসএমএমইউ’র সি ব্লক স¤পূর্ণটা পুলিশ ঘেরাও করে রাখে। তার স্বাস্থ্যের প্রকৃত অবস্থা জানতে দেশ-বিদেশের বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যম কর্মী হাসপাতালে ভড়ি জমান।

শোক : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ এবং ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান এক বিবৃতিতে অধ্যাপক গোলাম আযমের ইন্তেকালে গভীর শোক ও দু:খ প্রকাশ করেছেন। বিৃবতিতে তারা বলেন, অধ্যাপক গোলাম আযমের এ মৃত্যু ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য এক অপুরণীয় ক্ষতি। তিনি ছিলেন এদেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের অভিভাবক তুল্য। মহাল আল্লাহ পাক এ মর্দে মুৃমিনকে জান্নাতে উত্তম প্রতিদান দিন। দলের পক্ষ থেকে আজ দেশ-বিদেশে সর্বত্রই গায়েবানা জানাযার আহবান জানানো হয়েছে।


অধ্যাপক গোলাম আযমের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি 

অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯২২ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকার লক্ষ্মিবাজারে তার মাতুলালয় শাহ সাহেব বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস ব্রাèনবাড়িয়ার নবীনগরের বীরগাঁও গ্রামে।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে  ১৯৪৬ সালে বিএ ও  ১৯৪৮ সালে এমএ পাশ করেন। এর আগে ১৯৪৪ সালে ঢাকার তৎকালীন ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে মেধা তালিকায় দশম স্থানসহ ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ১৯৫০ থেকে ৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজে অধ্যাপনা করেন।

অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯৪৭-৪৮ মেয়াদে ডাকসু’র জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৪৮-১৯৪৯ মেয়াদে তিনি পুনরায় এ পদে নির্বাচিত হন। তিনি অন্যতম একজন ভাষাসৈনিক। ডাকসু জিএস থাকাকালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে সকল ছাত্র-ছাত্রীর পক্ষে তিনি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের কাছে ঐতিহাসিক স্মারকলিপি উপস্থাপন করেন।  ভাষা আন্দোলনের কারণে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ তাকে গ্রেফতার করা হয়। রংপুর কারমাইকেল কলেজে অধ্যাপনার সময়ও তিনি কারাবরন করেন। জীবনের শুরুতে তিনি তাবলীগ জামায়াতের সাথে যুক্ত হন। পরে ১৯৫৪ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত  তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত একই দলের  সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জীবনে বহুবার তিনি রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করেছেন। 
জামায়াতে ইসলামীর আমিরসহ এ দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের পাশপাশি তিনি পাকিস্তান সরকার বিরোধী আন্দোলন এবং জাতীয় বিভিন্ন সঙ্কট উত্তোরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পক্ষে প্রচারণা, আইউব খান বিরোধী জোট ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি’র (ডাক) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, পাকিস্তান শাসক বিরোধী জোট পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (ডিপিএম) এর সেক্রেটারি জেনারেল এর দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর তিনি পাকিস্তানের উদ্দেশে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন এবং ১৯৭৩ সালে লন্ডন যান। ১৯৭৮ সালের ১১ আগস্ট তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং  আবার জামায়াতের আমির নিযুক্ত হন । ২০০১  সালে তিনি আমিরের দায়িত্ব থেকে অবসরে যান। ১৯৭৩ সালে অধ্যাপক গোলাম আযমের বাংলাদেশী নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয় এবং পরবর্তীতে নাগরিকত্ব বিষয়ে আলোচিত মামলায়  ১৯৯৪ সালে হাইকোর্ট  তার নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেন ।  

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার রূপকার  অধ্যাপক গোলাম আযমের পরিচিতি রয়েছে দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সুবাদে বিশ্বের অনেক রাজনৈতিক  নেতৃবৃন্দের কাছে অধ্যাপক গোলাম আযম একজন ইসলামী রাজনীতিবিদ  হিসেবে খুবই পরিচিত একটি নাম।

জেনারেল এরশাদের শাসনামলে আশির দশকের মাঝামাঝি তিনি জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ধারণা প্রচার করেন। এরপর ১৯৯১ সালে এ ব্যবস্থার অধীনে বাংলাদেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যা স্বাধীন বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে মাইলফলক এবং যুগান্তকারী ঘটনা  হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এরপর তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় আরো তিনটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

অধ্যাপক গোলাম আযম  বেশ কিছু  আলোচিত  গ্রন্থের প্রণেতা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পলাশী থেকে বাংলাদেশ, ইকামতে দ্বীন, মনটাকে কাজ দিন, তার আত্মজীবনীমূলক বই ‘জীবনে যা দেখলাম’। এছাড়া তার বেশ কিছু অনুবাদ গ্রন্থও রয়েছে।

অধ্যাপক গোলাম আযমের ছয় ছেলে। এর মধ্যে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী দেশে আছেন। তার স্ত্রী সৈয়দা আফিফা আযম জীবিত আছেন।

গ্রেফতার ও মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরন

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলার কার্যক্রম শুরু হলে অধ্যাপক গোলাম আযমকে ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ মোতাবেক তিনি ট্রাইব্যুনালে হাজির হলে সেদিনই  ট্রাইব্যুনাল তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে  ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ অধ্যাপক গোলাম আযমকে ৯০ বছর কারাদণ্ড প্রদান করে।

অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে পাঁচ ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। পাঁচ ধরনের অভিযোগ হল ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উসকানি, সহযোগিতা এবং সিরু মিয়া দারোগা ও তার কিশোর পুত্র আনোয়ার কামালসহ মোট ৩৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া কারাগারে হত্যার নির্দেশ।

উর্দ্ধতন নেতৃত্বের দায় হিসেবে ১৯৭১ সালের যাবতীয় অপরাধের দায় আনা হয়েছে অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ৩০ লাখ নরনারী হত্যা, ৪ লাখ নারী ধর্ষণসহ সমস্ত অপরাধ এবং  ধ্বংসযজ্ঞের দায়ভার চাপানো হয়েছে অধ্যাপক গোলাম আযমের ওপর ।
ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির রায় ঘোষনার সময় বলেছেন, অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সরাসরি কোন অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়নি বা  অপরাধ স্থলে উপস্থিত থাকা বা তার কথায় উদ্ভুদ্ধ হয়ে কেউ কোন অপরাধ সংঘটন করেছে সরাসরি এমন কোন অভিযোগও আনা হয়নি তার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা হল- উর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় বা সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র অভিযোগ। তিনি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির। এ দলের আমির হিসেবে রাজাকার, শান্তি কিমিটি, আল বদর, আল শামস প্রভৃতি বাহিনী গঠন এবং এসব বাহিনীর কার্যক্রমের ওপর তার নিয়ন্ত্রন ছিল। এসব বাহিনী ১৯৭১ সালে  পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করে হত্যা, গনহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে। তাছাড়া সরাসরি জামায়াতে ইসলামও পাকিস্তানের সহযোগী বাহিনী হিসেবে কাজ করেছে। তাই এসব বাহিনীর অপরাধমূলক কর্মকান্ডের দায় তিনি এড়াতে পারেননা।











মঙ্গলবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১৩

দুর্ভাগ্য, আমাদের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়েছে :একান্ত সাক্ষাতকারে অধ্যাপক গোলাম আযম

মেহেদী হাসান, ১৭/১২/১১
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির, প্রবীণ রাজনীতিবিদ অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছেন, ‘১৯৭১ সালে যে আশঙ্কার কারণে আমরা পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম, আমাদের সেই আশঙ্কা দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্যে পরিণত হয়েছে। আমরা স্বাধীন নেই। আমরা ভারতের কুক্ষিগত। ভারত যা চায় আমরা সব দিতে বাধ্য। আমাদের অধিকার কিছুই দিতে চায় না তারা। আর তাদের যা ইচ্ছা তাই তারা চায় এবং তাই তারা পায়। এ অবস্থা কোনো স্বাধীন দেশের হতে পারে না।’
নয়া দিগন্ত’র পক্ষে এ প্রতিবেদকের কাছে  অধ্যাপক গোলাম আযম  গত শুক্রবার রাতে নিজ বাসায় একান্ত  সাক্ষাতকারে  এ কথা বলেন। ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালে  অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দায়ের করা চার্জশিটে অর্ধশতাধিক অভিযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলো অভিযোগ নয় বরং অপবাদ। এর একটাও তারা প্রমান করতে পারবেনা।

সাক্ষাতকারে অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে যে ধরনের রাজনৈতিক  পরিস্থিতি অত্রিতক্রম করছে তা থেকে  উদ্ধার পাওয়ার জন্য বিরোধী দল যে আন্দোলন  শুরু করেছে তাতে জনগণকে ব্যাপকভাবে সাড়া দিতে হবে। জনগণের অংশগ্রহনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে যদি ক্ষমতা হস্তান্তর করা যায় তাহলে  বাংলাদেশর  ভাল ভবিষ্যত আশা করা যায়। তা নাহলে আমাদের এর চেয়েও কঠিন পরিস্থিতি বরণ করতে হবে। 
নিচে তাঁর সাক্ষাতকারটি তুলে ধরা হলো।

নয়া দিগন্ত: ১৯৭১ সালে আপনারা কেন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন?
গোলাম আযম: আমরা ছিলাম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। দুনিয়ার কোথাও সাধারণত এমনটি হয়নি,  মেজরিটি অংশ মাইনরিটি থেকে আলাদা হতে চায়। আলাদা তো হতে চায় যারা মাইনরিটি  তারা। আমরা কোন দুঃখে আলাদা হতে যাব?  যেহেতু আমরা মেজরিটি তাই  আমাদের দায়িত্ব ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং পাকিস্তানে প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা করা। আমরাই পাকিস্তানের আসল শাসক হব। সে সুযোগ না নিয়ে আমরা কেন পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাব।  দ্বিতীয় কথা হলো, পশ্চিম পাকিস্তান ছিল ভারতের বাইরে। আর আমরা পূর্ব পাকিস্তান  ছিলাম  ভারতের পেটের ভেতরে। আমরা তো আলাদা হয়ে ভারতের আধিপত্য থেকে বাঁচতে পারব না। কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারতের দুইবার যুদ্ধ হয়েছে। সেই যুদ্ধে ভারত কিছুই করতে পারেনি এবং দুইবারই তারা পাকিস্তানের সাথে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালে ভারত যখন যুদ্ধ লাগাল, তখন তারা জয়ী হল এজন্য যে, এখানে জনগণের কোনো সমর্থন তারা পায়নি।
আওয়ামী লীগ যদি রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতা আন্দোলন করে যেত, তাহলে আমরা তাদের সহযোগিতা করতে পারতাম। কিন্তু  তারা ভারতে গিয়ে ইন্দিরার কাছে সাহায্য চাইল স্বাধীনতা অর্জনের জন্য। ভারত তার কূটনৈতিক, সামরিক সব শক্তি  ব্যবহার করল। এ পরিস্থিতিতে আমরা এটা বিশ্বাস করতে পারিনি যে, ভারতের সাহায্য নিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন  করতে পারব। ভারত আমাদেরকে স্বাধীন করার উদ্দেশে সাহায্য করেনি। তারা তাদের স্বার্থের কারণে আমাদের সাহায্য করেছে। তাদের স্বার্থ ছিল তিনটা। প্রথমত, পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা  ভারতকে সুযোগ দিয়েছে পাকিস্তানকে ভাগ করে দুর্বল করার। চির দুশমন পাকিস্তানকে দুর্বল করা গেল। দুইবার যুদ্ধ করে ভারত পরাজিত হয়েছে। এবার তারা তৃতীয়বার সুযোগ পেয়েছে তার প্রতিশোধ নেয়া এবং তাকে ভাগ করে দুর্বল করার।  দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল, যেহেতু বাংলাদেশ ভারতের পেটের ভেতরে সেজন্য তারা বাংলাদেশকে আলাদা করতে

পারলে আমাদের ওপর তারা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। তৃতীয় স্বার্থ ছিল, তারা  তাদের পণ্যের বাজারে পরিণত করবে  এই অঞ্চলকে।
তাদের সেই তিনটা স্বার্থই  উদ্ধার হয়েছে।  তিনটা স্বার্থই  পূরণ  হয়েছে। আমরা এই আশঙ্কা করেই স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারলাম না। আমাদের সেই আশঙ্কা দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্যে পরিণত হয়েছে। আমরা স্বাধীন নেই। আমরা এখন ভারতের কুক্ষিগত। ভারত যা চায় আমরা সব দিতে বাধ্য হচ্ছি । আমাদের অধিকার কিছুই দিতে চায় না তারা। আর তাদের যা ইচ্ছা তাই তারা চায় এবং তাই তারা পায়। এ অবস্থা কোনো স্বাধীন দেশের হতে পারে না। আমরা এই আশঙ্কা করেছিলাম এবং এই আশঙ্কার কারনেই ১৯৭১ সালে  ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান রাখার পক্ষে ছিলাম।

নয়া দিগন্ত: কিন্তু বাস্তবতা হল পাকিস্তান ভেঙ্গে গেল।
গোলাম আযম:  আমরা পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য কোনো সুযোগই পাইনি। কোন পথ পাইনি। বরং তারা এমনসব আচরণ জনগণের সাথে করেছে যে, জনগণ  তাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে। দুই পাকিস্তানকে তো কোন সামরিক শক্তির মাধ্যমে একত্র করা হয়নি। সেটা জনগণের ইচ্ছার মাধ্যমে হয়েছে।  কিন্তু তৎকালীন শাসকশ্রেণী অস্ত্রবলে পাকিস্তানকে এক রাখার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ফলে আমাদের করার কিছুই থাকল না।
আমরা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলাম কথাটার মানে পলিটিক্যালি পাকিস্তান এক থাক সেটা আমরা চেয়েছিলাম। কিন্তু সেজন্য আমারা কি করতে পেরেছি। কিছুই করতে পারিনি। আমাদের কিছু করার সুযোগও ছিলনা, সামর্থ্যও ছিলনা। 

নয়া দিগন্ত: আপনি বলছেন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা অর্জনের পদক্ষেপ নিলে আপনারা আওয়ামী লীগকে সহযোগিতা করতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তো চেয়েছিলেন আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে এবং সেজন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টাও চালিয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তান শাসক শ্রেণীই তো সে উদ্যোগ নস্যাৎ করে দিয়ে সামরিক পথ বেছে নিল।
গোলাম আযম: যুদ্ধ করে দেশকে আলাদা করার চিন্তা শেখ মুজিবুর রহমান করেছেন বলে আমার মনে হয়না। তিনি এরকম ঘোষনাও দেননি। যদি দিতেন তাহলে নিজে ইচ্ছা করে পাকিস্তানের হাতে গ্রেফতার হতেননা। তিনি দেশ ভাগ করতে চাননি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী  হতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা হাতে নিতে চেয়েছিলেন। সেই হিসেবে তিনি পাকিস্তানের কাছে ধরা দিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের আইনজীবী ছিলেন এ কে ব্রুহি। ১৯৭১ সালের জুন মাসে লাহোরে তার সাথে আমার দেখা হয়। তার সাথে আমার আগেই পরিচয় ছিল। আইউব খানের সময় যখন জামায়াতকে  নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয় তখন তিনি আমাদের আইনজীবী ছিলেন।  তিনি আমাকে বললেন, দেখেন রুগী যেমন ডাক্তারের কাছে রোগ গোপন করেনা তেমনি  মক্কেলও উকিলের কাছে কিছু গোপন করেনা। আপনারা যদি মনে করেন শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করতে চান, দেশ ভাগ করতে চান সেটি ভুল ধারণা। আমাদের মনে  হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক দিক দিয়ে কোন চেষ্টা করবেন। কিন্তু তাজউদ্দিন সাহেবরা ভারতে গিয়ে সাহায্য চাইল।  যার ফলে  এ মুক্তিযুদ্ধের পথে যেতে হল।
নয়া দিগন্ত: অর্থাৎ আপনি বলতে চাচ্ছেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দুইভাগ হয়ে গিয়েছিল । শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়া আবার আওয়ামী লীগের আরেকটি  অংশ  চেয়েছিল ভারতের সাহায্য নিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়া।

গোলাম আযম: আমার মনে হয় এটাই সঠিক।
নয়া দিগন্ত: আপনারা চেয়েছিলেন গণতান্ত্রিক প্রকৃয়ায় এগিয়ে যেতে। কিন্তু ১৯৭০ সালে তো আওয়ামী লীগ বিজয় অর্জন করেছিল। সে  হিসেবে  শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা   হোক এই অবস্থান কি তখন জামায়াত নিয়েছিল?
গোলাম আযম: আমি বারবার বিবৃতি দিয়েছি। সেগুলো রেকর্ডে আছে। ব্যালটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার হাতে  ক্ষমতা অর্পন করা দরকার। এমনকি ইয়াহিয়া একবার ঘোষনা করেছিলেন যে, শেখ মুজিবুর

রহমান ইজ দি ফিউচার প্রাইম মিনিস্টার অব পাকিস্তান।  সংসদের অধিবেশন  ডাকা হল। প্রথম অধিবেশনেই তো সংবিধান গঠিত হবার কথা। কিন্তু তা হতে পারলনা। প্রথম অধিবেশনই মূলতবী করে দেয়া হল ভুট্টোর ষড়যন্ত্রে। ভুট্টো ঘোষনা করলো পাকিস্তানে দুইটা মেজরিটি পার্টি। এক দেশে দুইটা মেজরিটি পার্ট হয় নাকি? সে বিরোধী দলের আসনে বসতে রাজি নয়। সে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রস্তাব দিল যে, আমার সাথে আগে পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট কর। এরপর সংসদ বসলে আমরা যাব। সে ঘোষনা দিল আমি তো যাবইনা বরং পূর্ব পাকিস্তান থেকে কেউ আসলে করাচি এয়ারপোর্টে ঠ্যাং ভেঙ্গে দেব। তিনি ঠ্যাং ভেঙ্গে দেয়ার কথা বলেছেন। এভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করেছে ভুট্টো। পাকিস্তান ভাগের জন্য প্রধানত দায়ী ভুট্টো । এরপর ভুট্টোকে সহযোগিতা করার জন্য দায়ী  ইয়াহিয়া খান।

নয়া দিগন্ত: পূর্ব পাকিস্তানকে ভাগ  করে পাকিস্তানকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র ভারত কি আগেই করেছিল না তারা উদ্ভুত পরিস্থিতির  সুযোগ নিয়েছে?
গোলাম আযম: সেটা আমার জানা নেই। কিন্তু আমরা দেখেছি এখানকার নেতৃবৃন্দ তাদের কাছে গিয়ে সাহায্য চাওয়ার পর তারা এ সুযোগ গ্রহণ করেছে।
নয়া দিগন্ত: আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধেদের অভিযোগ আনা  হয়েছে । এটাকে কিভাবে দেখছেন?
গোলাম আযম: আমি তো আশ্চর্য হচ্ছি। আমরা তো যুদ্ধই করলাম না। তাহলে আমাদের যুদ্ধাপরাধী বলে কিভাবে? আমরা যুদ্ধাপরাধী হলাম কিভাবে?
আমি হিসাব করে দেখেছি ১৯৭১ সালের পর থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত এরা কখনো আমাদের যুদ্ধাপরাধী বলেনি। আমাদেরকে রাজাকার গালি দিয়েছে। স্বাধীনতা বিরোধী বলেছে। কিন্তু  যুদ্ধাপরাধী কখনো বলেনি। তারপর যখন এরশাদের বিরুদ্ধে বিএনপি Ñ জামায়াত মিলে আন্দোলন করল তখন তাদের সাথে আমাদের লিয়াজো কমিটি বসেছে। তখনো তারা আমাদের যুদ্ধাপরাধী বলেনি। আমাদের সহায়তা নিয়ে ১৯৯১ সালে যখন বিএনপি ক্ষমতায় আসল তখন আমরা কেয়ারটেকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি  জানালাম। কেয়ারটেকার ব্যবস্থার কারনেই তো বিএনপি ক্ষমতায় আসল। যদি এরশাদের অধীনে  নির্বাচন হত তাহলে তো তিনি আবার ক্ষমতায় আসতেন। আমরা দাবি  জানালাম যে, এই কেয়ারটেকার সিস্টেমটা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। কিন্তু  বিএনপি এতে রাজি  হলনা। ১৯৯৪ সালে  মাগুরার মুহম্মদপুরে উপ নির্বাচনে ঐ আসনটি  বিএনপি দখল করল। ওখানে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি মারা যাবার পর উপ নির্বাচন হল। কিন্তু নির্বাচন সুষ্ঠু হলনা।  এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন শেখ হাসিনা। তিনি বললেন, আমরা এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবনা। কেয়ারটেকার সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কেয়ারটেকার সিস্টেমের জন্য আন্দোলন ঘোষনা দিলেন। কেয়ারটেকার ইস্যু তো আমাদের ইস্যু ছিল। এ অবস্থায় আমরা যদি চুপ করে  থাকি তো আমাদের রাজনীতিই শেষ। সেজন্য আমরা বাধ্য হয়ে আন্দোলনে যোগদান করলাম। এ আন্দোলন শেখ হাসিনার একলা আন্দোলন ছিলনা। আমাদের মিলিত আন্দোলন ছিল। আমাদের লিয়াজো কমিটির সাথে তারা নিয়মিত বৈঠক করেছে। সেসব বৈঠকে কখনো কখনো শেখ হাসিনা অংশ নিয়েছেন। তখন আমরা যুদ্ধাপরাধী ছিলামনা।
তাহলে এ যুদ্ধাপর ধের অভিযোগ আমাদের বিরুদ্ধে কেন আনা হচ্ছে? এর উত্তর তালাশ করতে গিয়ে  আমি দেখলাম ২০০১ সালের নির্বাচনটা ছিল চারদলীয় জোটের ভিত্তিতে। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয়পার্টি আর ইসলামী ঐক্যজোট একত্র হয়ে নির্বাচন করলাম। সিদ্ধান্ত হল এক আসনে দুই দলের কেউ থাকবেনা।  সেই ইলেকশনে জামায়াতে ইসলাম এবং  ইসলামী ঐক্যজোট মিলে ৫০ট“ বেশি আসনে নির্বাচন করেনি। নির্বাচনের পর দেখা গেল  আওয়ামী লীগ বিএনপি এবং উভয়ে ৪০% ভাগ করে ভোট পেয়েছে। বিএনপি ৪০% এর সামান্য কিছু ভোট বেশী পেয়েছে  কিন্তু  তা  ওয়ান পার্সেন্টও বেশি নয়। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল  আওয়ামী লীগ পেল ৫৮, আর বিএনপি পেল ১৯৭। কেমন করে এটা হল?  ৩০০ আসনের মধ্যে আড়াইশ আসনে যেখানে দুই ইসলামী দলের  প থেকে কোন  প্রার্থী ছিলনা সেসব আসনে সব ইসলামপন্থীদের ভোট বিএনপি পেয়েছে। আওয়ামী লীগ একটিও পায়নি।   সমান সমান ভোট পাওয়া সত্ত্বেও এতো বড়ো পার্থক্য কেন হলো?  হয়েছে ইসলামপন্থীদের ভোট বিএনপি একতরফাভাবে পাওয়ার কারনে।

এরপর  থেকেই আওয়ামী লীগ হিসেব করে দেখল যে, জামায়াত আর বিএনপি যদি রাজনৈতিক ময়দানে এক থাকে  তাহলে আওয়ামী লীগ কখনো তাদের পরাজিত করতে পারবেনা। বিএনপি আর জামায়াত একত্র হলেই আওয়ামী লীগ ফেল করে। এর অনেক উদহারণ আছে।
যেমন চট্টগ্রামে মেয়র ইলেকশনে হলো। জামায়াতের প্রার্থী ছিল সেখানে। বেগম জিয়ার অনুরোধে জামায়াত যখন প্রার্থী প্রত্যাহার করলো তখন লক্ষাধিক  ভোট বেশী পেয়ে বিএনপি প্রার্থী পাশ করলো। সুপ্রিমকোর্ট বার এসোসিয়েশন সর্বশেষ  পরপর দুইবার ইলেকশনে  জামায়াত  বিএনপি এক হয়ে গেল আর আ’লীগ ফেল করলো। এভাবে যেখানেই জামায়াত বিএনপি এক হয় সেখানেই আওয়ামী লীগ ফেল করে।
২০০১ সালে পরাজয়ের আগে কখনো তারা যুদ্ধাপরাধী বলেনি। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি। কোন প্রমান তারা করতে পারবেনা। এখন সেক্টর কমান্ডারদেরও ব্যবহার করছে। এর আগে তারাও এ দাবি তোলেনি।
জামায়াতের প্রতি প্রতিহিংশা, প্রতিশোধ এবং জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবেক পঙ্গু করে ফেলার জন্যই এ  যুদ্ধাপরাধ  বিচার চলছে যাতে জামায়াত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মাঠে কোন পদক্ষেপ নিতে না পারে।  জামায়াতের নেতাদের ফাঁসি দিয়ে তারা জামায়াতকে নেতৃত্বশূন্য করতে চায়। এই সেদিন পাটমন্ত্রী বললেন, বিচারের দরকার  নেই। এদের ফাঁসি দিয় ফেলো। তারা বিচারকে প্রহসন হিসেবে ব্যবহার করছে। বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। আসল উদ্দেশ্য হল জামায়াতকে খতম করা।
নয়া দিগন্ত: আপনার বিরুদ্ধে চার্জশিট  জমা দেয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। সেখানে আপনার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী  এবং গণহত্যায় নেতৃত্ব দানের অভিযোগসহ নির্দিষ্ট করে আরো অনেক অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে । আপনার বক্তব্য  কি?
গোলাম আযম: এগুলো অভিযোগ নয় আমি একে  অপবাদ বলি। এর একটাও  অভিযোগ নয় এবং এর একটাও তারা প্রমাণ করতে পারবে না।  মাওলানা সাঈদী এবং মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে যেমন মিথ্যা অভিযোগ বানিয়েছে সেগুলো যেমন অপবাদ আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলোও অপবাদ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়  নাকি  ৩৮ জনকে জেল থেকে বের করে হত্যা করেছি। ব্রাক্ষ্মনবারিয়ায় আমি সে সময় গিয়েছি একথা তারা প্রমান করতে পারবে না। ১৯৭১ সালে কখনো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাইনি। আমার তখন কি ক্ষমতা ছিল যে, আমি তাদের অর্ডার দিলাম আর তারা  তাদের জেল থেকে ছেড়ে দিল? আমার হাতে কি ক্ষমতা ছিল যে, যত গণহত্যা হয়েছে তা সব আমার নির্দেশে হয়েছে? গণহত্যাতো করেছে পাকিস্তান আর্মি। এ গণহত্যায় আমি ভূমিকা পালন করলাম কিভাবে?

নয়া দিগন্ত: তাদের বক্তব্য হচ্ছে আপনারা আর্মিকে সহযোগিতা করেছেন?
গোলাম আযম: কেমন করে? সহযোগী হওয়ার তো কোন সুযোগ ছিলনা।
নয়া দিগন্ত: রাজাকার  আল বদর এসব বাহিনীর মাধ্যমে আপনারা সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ?
গোলাম আযম: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাগজপত্র তালাশ করলে পাওয়া যাবে কিভাবে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়েছে । পুলিশের যেমন সহযোগী বাহিনী আছে আনসার তেমনি পাকিস্তান পুলিশের  সহযোগী বাহিনী হিসেবে গঠন করা হয়েছিল রাজাকার বাহিনী। তাদের  তখন অনেক সহযোগী ফোর্স দরকার ছিল। বর্তমান থানা কর্মকর্তাকে ইউএনও বলা হয়। তখন বলা হত সার্কেল অফিসার। এসব সার্কেল অফিসারদের মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডে ঢোল পিটিয়ে রাজাকার বাহিনীতে জনবল রিক্রুট করা হয়েছে। এটা করা হয়েছে সরকারীভাবে। আমরা করলাম কিভাবে?

নয়া দিগন্ত: অর্থাৎ রাজাকারদের যেসব অপরাধ আপনাদের ওপর  চাপানো হচ্ছে আপনি বলছেন সেগুলোও পাকিস্তান আর্মির একটা অংশ?
গোলাম আযম: অবশ্যই সমস্ত কর্মকান্ডের দায়ভার পাকিস্তান আর্মির।

নয়া দিগন্ত: রাজাকার ছাড়াও পিস কমিটি, আল বদর আল শামস প্রভৃতি বাহিনীও আপনার নেতৃত্বে  গঠিত  এবং পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
গোলাম আযম: এসবই অপবাদ। মার্চের পরে নেজামে ইসলাম পার্টির অল পাকিস্তান সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন ফরিদ আহমেদ। তিনি আমার বাড়িতে আসলেন। এসে বললেন যে, আমরা যেসব রাজনৈতিক দল আছি আমরা  একসাথে বসে একটু পরামর্শ করি। আমরা গেলাম টিক্কা খানের কাছে গেলাম। আমরা বললাম  আর্মিকে জনগণের মধ্যে ছেড়ে দিলে তারা বাড়াবড়ি করবেই। কারণ অস্ত্রের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। এখন যে পাবলিকের ওপর সেনাবাহিনী জুলুম অত্যাচার করছে এর জন্য তারা কার কাছে যাবে? আওয়ামী লীগের লোকজনতো সব ভারতে চলে গেছে। এখন জনগণ আমাদের কাছে আসে। আমরা তাদেরকে কিভাবে সাহায্য করব। মুসলিম লিগের খাজা খায়রুদ্দিন, কৃষক শ্রমিক পার্টির এ এস এম সোলায়মান, জামায়াতের আমি এবং নেজামে ইসলাম পার্টির ফরিদ  আহমেদ। এ কজন আমরা গেলাম। আমরা বললাম ২৫ মার্চ আপনারা যেটা করেছেন এর মাধ্যমে আপনারা  জনগণকে পাকিস্তান বিরোধী বানিয়ে দিচ্ছেন। তারা বলল, যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে তা দমনের জন্য এটা করা ছাড়া আমাদের উপায় ছিলনা। তারা অগ্নিসংযোগ শুরু করেছে। নয়া বাজারে কাঠের দোকানে আগুন লাগিয়েছে। দুদিন  ধরে জ্বলেছে। আমরা এ নিয়ে আপত্তি করলে তিনি বললেন এরকম আর হবেনা। এটা আমরা করতে বাধ্য হয়েছি বিদ্রোহ দমন করার জন্য। সামনে আর এরকম হবেনা। আমরা আমাদের উদ্দেশ্য  ব্যক্ত করে বললাম আমরা এরকম একটা সুযোগ চাই যে, জনগণ আমাদের কাছে কোন অভিযোগ করলে আমরা আপনাদের সাথে যোগাযোগ করে প্রতিকারের চেষ্টা করতে পারি। তখন তিনি ব্রিগেডিয়ার রাও ফরমান আলীকে ডাকলেন। তিনি গভর্ণর হাউজে বসতেন। টিক্কা খান গভর্ণর হলেও তিনি মার্শাল ল’ এডমিনিস্ট্রেটর ছিলেন। তিনি বঙ্গভবনে বসতেননা। ক্যান্টনমেন্টে বসতেন। আমরা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে দেখা করেছি। তিনি রাওফরমান আলীকে বললেন ওনাদের সব টেলিফোন নাম্বার দিয়ে দেন যাতে তারা যোগাযোগ করতে পারেন। আমার কয়েকটা ঘটনার কথা স্পষ্ট মনে আছে। আমার কাছে কেস আসছে আমি ফরমান আলীকে জানিয়েছি। কাকরাইলে সে সাকির্ট হাউজ  আছে সেখানে বসতেন ব্রিগেডিয়ার কাসেম নামে  একজন। তিনি বিগ্রেডিয়ার কাসেমের কাছে রেফার করে দিলেন। তার কাছে অভিযোগ গেলে তিনি প্রতিকার করতেন। আমরা এছাড়া তখন আর কিছুই করতে পারিনা।

এত লোক ভিড় করত আমার বাড়িতে যে, আমি কোন অবসর পেতামনা। আমার হার্টে সমস্যা অনুভব করলাম। ডাক্তারের কাছে গেলাম। ডাক্তার বললেন আপনার বয়স ৪০ পার হয়েছে। আপনি দুপুরে খাবারের পর অবশ্যই একঘন্টা বিশ্রাম নেবেন  শুয়ে। কিন্তু আমি সে বিশ্রাম নিতে পারিনাই। লোক আসতেই থাকত। এ ধরনের সাহায্য ছাড়া ১৯৭১ সালে আমরা আর কিছুই করতে পারিনি।

নয়া দিগন্ত: অর্থাৎ আপনি বলছেন পাকিস্তান আর্মির যে নিপীড়কমূলক ভূমিকা ছিল সেগুলো থেকে জনগণকে রক্ষার জন্যই আপনারা ভূমিকা পালন করেছেন।
গোলাম আযম: ততটুকুই যতটুকু আমাদের কাছে অভিযোগ আসত। একটি মুক্তিবাহিনী এসে কোন পুল উড়িয়ে দিল পাকিস্তান আর্মির চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টির জন্য। তখন  পাকিস্তান আর্মি এসে ঐ গ্রামটা জ্বালিয়ে দিল। তখন আমরাদের সেখানে কি করণীয় ছিল। এ ধরনের ঘটনায় আমরা কিছুই করতে পারিনি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে যেগুলি এসেছে সেগুলি আমরা সমাধান করতে পেরেছি।

নয়া দিগন্ত: আপনার পূর্বের কথার জের ধরে  এখানে আরেকটি প্রশ্ন করতে চাই। আপনি বলেছেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর আপনি শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে বক্তব্য বিবৃতি দিয়েছেন এবং আপনি এটার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এদেশের মানুষের দাবি আদায়ের রাজপথমুখী যে আন্দোলন সংগ্রাম ছিল সেখানে কি আপনাদের কোন অংশগ্রহণ বা কর্মসূচী ছিল?



গোলাম  আযম: আমাদের শক্তি এবং অবস্থান তখন কতুটুক ছিল? নির্বাচনে আমরা একটা আসনও পাইনি।   প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে শুধু বগুড়ায় একটা আসন পেয়েছিলাম। কেন্দ্রে কোন আসন পাইনি। জামায়াতে ইসলাম তখন খুব গুরুত্বপূণ কোন রাজনৈতিক দল হয়ে উঠতে পারেনি।

নয়া দিগন্ত: যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের চার্জশিটে আপনার  নির্দেশে ব্রাক্ষনবাড়িয়ায়  ৩৮ জন জেলবন্দী হত্যার অভিযোগ ছাড়াও সিরু মিয়া নামে একজনকে আপনার নির্দেশে হত্যা করা হয়েছে বলে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোলাম আযম: এরকম নাম আমি কোন দিন  শুনিনি। আমি কোন পত্র দিয়েছি তা তারা প্রমান করুক। আমি চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি তারা প্রমান করুক।
নয়া দিগন্ত: আপনার নির্দেশে ৩৮ জন জেলবন্দীকে হত্যা করা হয়?
গোলাম আযম: আমি তো কর্তা ছিলাম সরকারের আরকি?
নয়া দিগন্ত: ১৯৭১ সালের বিভিন্ন ঘটনা বিষয়ে সংগ্রাম পত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আপনার নামে যেসব  খবর এবং  উদ্ধৃতি প্রচার করে তা কি সঠিক?
গোলাম আযম: তারা কি প্রচার করে আর আমি কি বলেছিলাম তা না দেখলে বলতে পারবনা। আমার কোন কথাটাকে তারা আমার বিরুদ্ধে  ব্যবহার করছে তা না দেখে বলতে পারছিনা।
নয়া দিগন্ত: আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে  পরাজয় নিশ্চিত জেনে আপনি লন্ডনে পালিয়ে যান। আপনার বক্তব্য কি?
গোলাম আযম:  ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো।  ২০শে নভেম্বর রমজান শেষ হলো।  ঈদের পরের দিন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়ে যোগদান করার জন্য আমি লাহোর গেলাম। জামায়াতের হেডকোয়ার্টার তখনো ছিল লাহোর।  এরপরে আমি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম।  একথা বলার জন্য যে, আপনি দেশের প্রেসিডেন্ট, পূর্ব পাকিস্তানে কি হচ্ছে আপনি গিয়ে দেখেন। এজন্য কয়েকদিন সময় লাগলো আমার সেখানে। এভাবে আমি ৩রা ডিসেম্বর রওয়ানা দিলাম করাচী থেকে পিআই এর প্লেনে, এটিই পিআই এর শেষ প্লেন ছিল। ০৩ ডিসেম্বর ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্স থেকে ঢাকা এয়ারপোর্টে বোমা ফেলা হয়েছে। এয়ারপোর্ট বন্ধ হয়ে গেছে। তখন ইন্ডিয়ার সঙ্গে যে সম্পর্ক ছিল তা ইন্ডিয়ার উপর দিয়ে আসতে দিত না, পাকিস্তানের প্লেন আসতো শ্রীলঙ্কা হয়ে। প্লেন কলম্বো আসল। তিন ঘন্টা পর প্লেন আবার উড়লো।  তখন ক্যাপ্টেন ঘোষণা করলো যে, করাচী এবং ঢাকা এয়ারপোর্টের কোথাও যাওয়া সম্ভব না, যুদ্ধ বেধে গেছে।  আমাদেরকে প্লেনকে  বলা হল  আমরা তেহরান বা জেদ্দায় গিয়ে যেন আশ্রয় নেই। এইভাবে আমার প্লেন জেদ্দায় চলে গেল। এরপরে ১০ই ডিসেম্বর ইন্ডিয়া পাকিস্তান সীজফায়ার করলো, একদিন যুদ্ধ বন্ধ থাকবে ঘোষণা করলো, যাতে বিদেশীরা চলে যেতে পারে, সেই দিন সেই ১০ তারিখে আমার প্লেন জেদ্দা থেকে করাচী আসলো। এভাবে আমি পাকিস্তানে আসলাম।  ৩রা ডিসেম্বর আমার প্লেন নামতে পারলো না, তারপর জেদ্দায় চলে গেলাম, তারপরে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। পাকিস্তান থেকে পরে লন্ডন যাই।
নয়া দিগন্ত: আমরা বর্তমান পরিস্থিতিতে আসি। কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার ধারণা আপনি প্রথম দিয়েছিলেন। এখন এটি বাতিল করা  হয়েছে।  আপনার প্রতিক্রিয়া  কি?
গোলাম আযম: আওয়ামী লীগ স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার জন্য এটা করেছে।
নয়া দিগন্ত: অনেকে মনে করেন কেয়ারটেকার ব্যবস্থার কারনে বাংলাদেশে ১/১১  পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। আপনি কি বলেন?
গোলাম আযম: মোটেই না।   ১১ জানুয়ারির ঘটনাতো ঘটেছে  কেয়ার টেকার সরকার প্রধান কে হবে তা নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে মারামারির কারনে। সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে   কেয়ারটেকার প্রধান করা হবে কি হবেনা তা  নিয়েই তো সমস্যার সৃষ্টি হল। তিনি যখন এ পদ গ্রহণে রাজি হলেননা তখন ইয়াজউদ্দিনকে কেয়ারটেকারের কর্তা বানানো হল। আওয়ামী লীগ তো তখন সন্ত্রাসী আন্দোলন করল। তারা এমন সন্ত্রাসী আন্দোলন চালাল যে, সরকার অচল হয়ে গেল। তখন সেনাপ্রধান এটার সুযোগ গ্রহণ করেছে। কেয়ারটেকার সিস্টেমের তো কোন দোষ না। ২০০৭ সালে ১১ জানুয়ারি ঘটনার আগে এর অধীনে তিনটা নিবাচন হয়েছে। সেগুলো হল কিভাবে তাহলে?

নয়া দিগন্ত: কেয়ারটেকার সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগ  তা হল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল যে স্পিরিট তার সাথে এটা সাংঘর্ষিক। অর্থাৎ একটা নির্বাচিত সরকারের প্রতি  আস্থার যে জায়গা সেখানে আঘাত করা। আপনার বক্তব্য কি?
গোলাম আযম: আস্থার অভাবের কারনেই তো এটা আসল। এটা করার আগে আমি চিন্তা করে দেখলাম বাংলাদেশ হবার পরে প্রথম নির্বাচন হল শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে ১৯৭৩ সালে। সেটা মোটেই ফেয়ার ইলেকশন ছিলনা।  ছয়টা বাদে সব আসন  তারা দখল করল। এরপরে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হল সেটাও ফেয়ার ছিলনা। কেয়ারটেকার ধারণা রাজনীতি বিজ্ঞানে অনেক আগে থেকেই ছিল।  নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষ হবার পরে তারা কেয়ারকেটার সরকার হিসেবে পরবতী সরকার দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত দৈনন্দিন রুটিন কাজ করত। রাজনৈতিক কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তাদের থাকতনা।  একটি সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা তাদের প্রধান কাজ ছিল। সরকার তখন থাকবে নাম মাত্র। এটাই ছিল তখন কেয়ারটেকার সরকার। কিন্তু তা হলেও সেটা ছিল পলিটিক্যাল এবং দলীয় কেয়ারটেকার সরকার। আমি তখন চিন্তা করলাম এই কেয়ারটেকার সরকার যদি নির্দলীয় এবং অরাজনৈতিক হয় তাহলে ফেয়ার ইলেকশন সম্ভব। জাস্টিস সাহাবুদ্দিন সাহেবের অধীনে যে দুইটা ফেয়ার ইলেকশন হয়েছে এরকম ফেয়ার ইলেকশন অতীতে কখনো হয়নি। এরপরে হয়নি।
নয়া দিগন্ত: নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেওতো এটা করা যেতে পারে।
গোলাম আযম: এটা হতে পারে যদি রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করে। তাদের যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হয় তাহলে সম্ভব। কিন্তু এখনো সেটা হয়নি।
নয়া দিগন্ত: আপনি বললেন কেয়ারটেকার সিস্টেম  নিয়ে সমস্যা হয়নি। সমস্যা হয়েছে   পদে কাকে বসানো হবে তা নিয়ে। এখানেও একটি অভিযোগ উঠেছে তাহল প্রধান বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে নগ্ন রাজনীতি চালু হয়েছে। বিচার ব্যবস্থা কলুষিত হচ্ছে কেয়ারটেকার সরকার প্রধান   কে হবে তা ঠিক করতে গিয়ে।
গোলাম আযম: কেয়ারটেকার সরকার কে হবে তা নিয়ে যদি সমস্যা হয় তাহলে এর প্রধান কে হবে তা নিয় পুনরায় আলোচনা করা যেতে পারে। কেয়ারটেকার সরকার সিস্টেম নিয়ে সবাই মিলে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান বের করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। প্রধান বিচারপতি ছাড়া আর কাকে প্রধান করা যায় তা আলোচনা করলে অবশ্যই বের করা সম্ভব। আগের পদ্ধতি যদি ঠিক না হয় তাহলে আলোচনা করে সমঝোতা করা হোক। আপত্তিতো নাই কিছু।

নয়া দিগন্ত: বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
গোলাম আযম: বাংলাদেশেতো রাজনীতি  নেই। নির্বাচন কমিশনে যেসব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে তার মধ্যে জামায়াতে ইসলাম একটা। সংসদে তাদের প্রতিনিধি আছে। এই দলটাকে জনসভা করতে  দিচ্ছেনা। মিছিল করতে দিচ্ছেনা। রাস্তায় দাড়াতে দিচ্ছেনা। রাস্তায় দাড়ালে পুলিশের সাথে ধাক্কাধাক্কি হলে পুলিশের  কাজে বাঁধা দেয়ার নাম করে গণহারে তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। মিথ্যা মামলা দিচ্ছে। বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে আসা হচ্ছে। অফিসে বসে মিটিং করলে বলে গোপন বৈঠক করছে। সেখান থেকে তাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তারাতো কোন বেআইনী দল নয়। দলীয় বৈঠক তারা গোপনে করবেনা তো কি পুলিশ ডেকে তাদের সামনে করবে? কিন্তু বলা হচ্ছে তারা গোপন বৈঠক করছে, ষড়যন্ত্র করছে। ধরে নিয়ে মিথ্যা মামলা দিচ্ছে।  রাজনীতি  তো তারা করতে দিচ্ছেনা। এমনকি আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা তারাও পুলিশের সাথে মিলে জামায়াতের ওপর হামলা চালায়। জনসভায় ভাঙচুর  করে। মিছিল করতে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের আবাসিক হল থেকে ছাত্র শিবিরের  নেতাকমীদের ছাত্রলীগের লোকজন মারধর করে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে জঙ্গি বলে। তারাই ধরে মারে আবার পুলিশের হাতে তুলে দেয়।   এটা কোন ধরনের রাজনীতি? রাজনীতি করতে দেয়া হচ্ছেনা। এখন দেশে চলছে শেখ হাসিনার স্বৈর শাসন। বাকশাল টাইটের শাসন চলছে। এটাকে আরো স্থায়ী করার জন্য তারা তাদের দলের অধীনে নির্বাচন করতে চায়। ভারত যা চায় তাই তারা দিয়ে দিচ্ছে। শুধু 


দিচ্ছেনা উৎসাহের সাথে দিচ্ছে। আমার আশঙ্কা আবার তারা  শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসলে  এটা ভারতের না জানি অঙ্গরাজ্য হয়ে যায়।

নয়া দিগন্ত: বিরোধী দল তো সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে
গোলাম আযম: আমি জনগনের কাছে বলতে চাই যে ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা পড়েছি তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য বিরোধী দল যে আন্দোলন  শুরু করেছে তাতে জনগণকে ব্যাপকভাবে সাড়া দিতে হবে। জনগণ যদি আন্দোলনে ব্যপকভাবে সাড়া দেয় এবং এর ফলে এ সরকারের পতন হয় তাহলে এরপর একটা ফেয়ার ইলেকশন আশা করা যায় । এটি হলেই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা আছে। তানা হয়ে যদি আওয়ামী লীগের হাতে এভাবে দেশকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং তারা দলীয়ভাবে নির্বাচন করে আবার ক্ষমতায় আসে  তাহলে তাদের বাড়াবাড়িতো আরো বেড়ে যাবে এবং এরপরে বাংলাদেশের  স্বাধীনতা রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়বে।

নয়া দিগন্ত: আপানর বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। আপনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হতে পারে মামলার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে। আপনার মনের অবস্থা কেমন।
গোলাম আযম: জীবনে অনেকবার  গ্রেফতার হয়েছি।  মুমিনতো  মৃত্যুকে ভয় করে না। যদি অন্যায়ভাবে আমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়, তাহলে মনে করব শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছি।  ইসলামী আন্দোলনের একজন  কর্মী হিসাবে আমি  শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করেছি সারা জীবন। সুতরং ভয় কিসের? আমি প্রস্তুত আছি।
নয়া দিগন্ত: আপনাকে ধন্যবাদ:
গোলাম আযম: নয়া দিগন্তকেও ধন্যবাদ।




গোলাম আযম কেস ফাইল


মেহেদী হাসান
৩ জানুয়ারি ২০১২  শুনানি শেষে গোলাম আযমের মামলা পুনর্বিচারে আসামিপরে আবেদন খারিজ করে দেয় ট্রাইব্যুনাল ।

২০১২  সালের ১৯ ডিসেম্বর মামলাটির পুনর্বিচারের আবেদন জানান গোলাম আযমের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। ২৪ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬ কার্যদিবসে আবেদনগুলোর ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

আসামিপে আবেদনের পে শুনানি করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, সিনিয়র আইনজীবী বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, আসামিপরে প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম। অপরদিকে আবেদনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ বেলজিয়ামের ব্রাাসেলস প্রবাসী বাংলাদেশি আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল-১ এর পদত্যাগী চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপ কথোপকথনের সূত্র ধরে এ আবেদন করেন আসামিপ।

ওই স্কাইপ কথোপকথনের সূত্র ধরে বিচারাধীন জামায়াতের বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামী ও নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং ট্রাইব্যুনাল-২ এ জামায়াতের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলা ৪টিরও পুনরায় শুরু করার আবেদন ২০১৩ সালের  ৩ ও ৭ জানুয়ারি খারিজ করে দেন দু’টি ট্রাইব্যুনাল।

১০ জানুয়ারি এসব খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আসামিপ রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করেন। ১৫-১৬ জানুয়ারি শুনানি শেষে ২১ জানুয়ারি সেসব আবেদনও ট্রাইব্যুনাল খারিজ করে দেওয়ায় মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রমের সকল প্রতিবন্ধকতা দূর হয়েছে।

অন্যদিকে একই ঘটনার সূত্র ধরে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করায় ট্রাইব্যুনাল-১ এর পাশাপাশি পুনর্গঠিত হয় দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালও। ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর প্রথম ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন আর তার স্থলাভিষিক্ত হন এ ট্রাইব্যুনালেরই বিচারক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। 


মামলার ধারাবাহিক কার্যক্রম
২০১০ সালের ১৫ জুলাই গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের তদন্ত সংস্থা। ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর তদন্ত শেষে তদন্ত প্রতিবেদন, অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ, এবং আলামত তদন্ত সংস্থার প থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছে দাখিল করা হয়।
১২ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের প থেকে ট্রাইব্যুনালের কাছে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হয়। ২৬ ডিসেম্বর অভিযোগপত্রে উল্লেখিত অভিযোগগুলো আমলে নেওয়ার জন্য ধার্য দিনে দাখিলকৃত অভিযোগপত্রটি সঠিক বিন্যাসে উপস্থাপিত না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তা আবার প্রসিকিউশনের কাছে ফেরত পাঠান।

২০১২ সালের  ৫ জানুয়ারি ফেরতপ্রাপ্ত অভিযোগপত্রটিকে সঠিকভাবে বিন্যস্ত করে প্রসিকিউশন টিম পুনরায় ট্রাইব্যুনালের কাছে দাখিল করেন।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের জমা দেওয়া ওই আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মোট ৬২টি অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়। মোট ৩৬০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের পাশাপাশি ১০ হাজার পৃষ্ঠার নথিপত্র সংযুক্ত করা হয়।

২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল ১১ জানুয়ারি সশরীরে গোলাম আযমকে হাজির করতে তার আইনজীবীদের নির্দেশ দেন। ওই দিন হাজির না হলে ট্রাইব্যুনাল গোলাম আযমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোযাানা জারির কথা জানান ট্রাইব্যুনাল। ১০ জানুয়ারি গোলাম আযমের আইনজীবীরা তার জামিনের আবেদন করেন।

১১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় গোলাম আযমকে। ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অভিযোগ আমলে নেন এবং জামিন নামঞ্জুর করে গোলাম আযমকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

তার স্বাস্থ্য ও বয়সের দিকটি বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেলে রাখার নির্দেশ দেন।

১৫ ফেব্রুয়ারি থকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয।

রাষ্ট্রপরে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু ও প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম অভিযোগ গঠনের পে যুক্তি উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে গোলাম আযমকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন জানিয়ে যুক্তি দেন তার প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম।

মানবতাবিরোধী ৫ ধরনের অপরাধের ৬১টি অভিযোগে অভিযুক্ত করে ২০১২ সালের  ১৩ মে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।

৩০ মে গোলাম আযমের মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তরের আবেদন করেন আসামিপ। শুনানি শেষে ১৮ জুন তা খারিজ করে দেন ট্রাইব্যুনাল।

১০ জুন গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপ। ১৪২ পৃষ্ঠার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপরে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াাদ আল মালুম, নূরজাহান বেগম মুক্তা, এ কে এম সাইফুল ইসলাম, সুলতান মাহমুদ ও মীর ইকবাল হোসেন।

১ জুলাই থেকে শুরু করে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপরে সাীদের স্যাগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমানসহ গোলাম আযমের বিরুদ্ধে জব্দ তালিকার ৭ সাীসহ রাষ্ট্রপরে মোট ১৭ জন সাী স্যা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ জন সাীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া জবানবন্দিকেই স্যা হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

সাক্ষী :
গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপে স্যা দেওয়া ঘটনার সাীরা হলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর  ড. মুনতাসীর মামুন, মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব উদ্দিন আহম্মদ বীরবিক্রম, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, টিআইবি চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল, মুক্তিযোদ্ধা শফিউদ্দিন আহমেদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৈরতলা দণিপাড়া গ্রামের সোনা মিয়া, আনোয়ারা বেগম (ক্যামেরা ট্রায়াল), গীতিকার ও সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, রাজধানীর নাখালপাড়ার ফরিদ আলম এবং মহসিন আলী খান।

আর জব্দ তালিকার সাীরা হলেন- বাংলা একাডেমীর সহ গ্রন্থাগারিক মো. এজাব উদ্দিন মিয়া, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) রাজনৈতিক শাখার উচ্চমান সহকারী সেলিনা আফরোজ, কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের উচ্চমান সহকারী কাজী আইয়ুব হোসেন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার কামালের বোন ডা. মুনিয়া ইসলাম চৌধুরী, জাতীয় যাদুঘরের কিপার ড. স্বপন কুমার বিশ্বাস, পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কর্মরত সাঁট মুদ্রারিক জামিনুর শেখ।

গোলাম আযমের পে তার ছেলে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী সাক্ষ্য দেন।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি  থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত এবং বুধবার ১২ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী, প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ, প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট জেয়াদ আল মালুম ও প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট সুলতান মাহমুদ সীমন। অন্যদিকে ১০ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এবং বুধবার ১২ কার্যদিবসে আসামিপে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট ইমরান সিদ্দিকী।

গোলাম আযমের বিরুদ্ধে  অভিযোগ
গোলাম আযমের বিরুদ্ধে পাঁচ ধরনের অভিযোগ হলো, মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র, সহযোগিতা, উস্কানি, সম্পৃক্ততা ও বাধা না দেওয়া এবং নির্যাতন।

অভিযোগগুলোর মধ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত ৬টি, তাদের সঙ্গে সহযোগিতা সংক্রান্ত ৩টি, উস্কানি দেওয়ার ২৮টি, তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও হত্যা-নির্যাতনে বাধা না দেওয়ার ২৩টি এবং ব্যক্তিগত হত্যা ও নির্যাতন সংক্রান্ত ১টি অভিযোগ রয়েছে।

১ নং অভিযোগ :
গোলাম আযমের বিরুদ্ধে গঠিত প্রথম  অভিযোগ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত।  এ ধরনের অভিযোগে ছয়টি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষের জমা দেয়া ফরমাল চার্জে।  এগুলোর মধ্যে  রয়েছে  একাত্তরের ৪ এপ্রিল গোলাম আযম, নুরুল আমীন, মৌলভী ফরিদ আহমেদ, খাজা খয়েরউদ্দিন, এ কে এম শফিকুল ইসলাম, মাওলান নুরুজ্জামান, হামিদুল হক চৌধুরী, মোহসিনউদ্দিন আহমেদ, এ টি সাদীসহ ১২ সদস্যের এক প্রতিনিধিদল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে নাগরিক শান্তি কমিটি গঠনের সড়যন্ত্র  করেন। আগের সাাতের সূত্র ধরে ৬ এপ্রিল গোলাম আযম আবারও টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করেন এবং পূর্বোল্লিখিত ষড়যন্ত্রে  অংশ নেন। ১৯ জুন এই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় গোলাম আযম রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া  খানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের  একটি বৈঠক করেন। ১ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে আবারও ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষকে মোকাবিলার জন্য রাজাকার বাহিনীর শক্তি বাডাানোর পরামর্শ দেন।

২ নং অভিযোগ :
 মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনার অভিযোগ।   অভিযোগে তিনটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।  ৪ এপ্রিল টিক্কা খানের সঙ্গে বৈঠকে সারা দেশে শান্তি কমিটি গঠনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৯ এপ্রিল গোলাম আযম ও অন্যরা ঢাকায ১৪০ সদস্যের নাগরিক শান্তি কমিটি গঠন করেন। ৪ মে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে এ কিউ এম শফিকুল ইসলামের বাসভবনে খাজা খয়েরউদ্দিনের সভাপতিত্বে শান্তি কমিটির সভা হয় যেখানে গোলাম আযম উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন ইউনিয়নের  শান্তি কমিটি গঠনের বিষয়ে  পরিকল্পনা করা হয়।


৩ নং অভিযোগ :
এখানে  মানবতাবিরোধী অপরাধে উস্কানির ২৮টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।  এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে  ৭ এপ্রিল গোলাম আযম এক যুক্ত বিবৃতিতে স্বাধীনতাকামী মানুষকে ‘ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাদের যেখানেই দেখা যাবে, সেখানেই ধ্বংস করা হবে। ২২ এপ্রিল শান্তি কমিটির সভা শেষে এক বিবৃতিতে গোলাম আযম অধীনস্থ সংগঠনগুলোর সদস্যদের ‘দেশপ্রেমিক নাগরিক’ উল্লেখ করে দেশের সাধারণ নাগরিকদের ধ্বংস করার আহ্বান জানান।

১৭ মে গোলাম আযম ঢাকায়  এক সভায় স্বাধীনতা আন্দোলনকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ’ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ উল্লেখ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নমের সেনা অভিযানের প্রশংসা করেন। একাত্তরের ১৬ জুলাই রাজশাহী, ১৮ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া , ৪ আগস্ট খুলনা, ৭ আগস্ট কুষ্টিয়া প্রভৃতি এলাকায় আয়োজিত  বিভিন্ন সভায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক ও উত্তেজনাকর বক্তব্য দেন। ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের ২৫তম আজাদী দিবস উপলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  কার্জন হলে, ১৭ ও ২৩ আগস্ট দলীয়  সভায় এবং ২৬ আগস্ট পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত দলীয়  অনুষ্ঠানে গোলাম আযম বিভিন্ন উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন।

১৭ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল এডুকেশন সেন্টারে শিা গ্রহণরত রাজাকারদের শিবির পরিদর্শন করে তাদের সশস্ত্র হওয়ার  আহ্বান জানান। ৩ অক্টোবর ঢাকায় মজলিসে শুরার সভায়  একই ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন গোলাম আযম।

৪ নং অভিযোগ:
চতুর্থ অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতা বা সম্পৃক্ততার ২৩টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। ৪ ও ৬ এপ্রিল টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে গোলাম আযমসহ অন্যরা সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ৯ এপ্রিল গোলাম আযমের সহযোগিতায় নাগরিক শান্তি কমিটি গঠিত হলে ১৫ এপ্রিল এর নাম পরিবর্তন করে কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি করা হয়।  শান্তি কমিটির ২১ সদস্যের কার্যকরী কমিটির একজন সদস্য ছিলেন গোলাম আযম।

১৮ জুন লাহোর বিমানবন্দরে গোলাম আযম বলেন, জনগণ সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে চায়। ১৯ জুন রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া  খানের সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের মোকাবিলার জন্য রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহের আহ্বান জানান। পরদিন লাহোরে জামায়াাতের পশ্চিম পাকিস্তান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে দুষ্কৃতকারীরা সক্রিযয় রয়েছে  এবং তাদের  প্রতিরোধে  ও শান্তিপ্রিয়  নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রসজ্জিত হওয়া  উচিত।

৫ নং অভিযোগ :
পঞ্চম অভিযোগে হত্যা ও নির্যাতনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।  এতে বলা হয়  কুমিল্লার হোমনা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের সিরু মিয়া  একাত্তরে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় দারোগা (সাব-ইন্সপেক্টর) হিসেবে কর্মরত  ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৮ মার্চ তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও ১৪ বছরের ছেলে আনোয়ার কামালকে নিয়ে  কুমিল্লার নিজ বাড়িতে  যান। সেখানে সিরু মিয়া  শরণার্থীদের ভারত গমনে  সাহায্য করতেন।

২৭ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে কসবা থানার তন্তর চেকপোস্টের কাছে সিরু মিয়া ও তার ছেলেসহ ছয়জন  ভারতে যাওয়ার সময় রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন।  তাদের রাজাকার ক্যাম্পে  নিয়ে কয়েক দিন নির্যাতনের পর ব্রাাহ্মণবাড়িয়ার কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।  স্বামী-সন্তানের ধরা পড়ার  খবর পেয়ে সিরু মিয়ার স্ত্রী  গোলাম আযমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সিরু  মিয়ার ভগ্নিপতি ছিলেন গোলাম আযমের দুই ছেলে আজমী ও আমীনের শিক। তিনি গোলাম আযমের কাছে সিরু মিয়া  ও তার ছেলেকে মুক্তি দিতে অনুরোধ জানান।

গোলাম আযম ব্রাাহ্মণবাড়িয়া শান্তি কমিটির নেতা  পেয়ারা মিয়ার কাছে  একটি চিঠি পাঠান, যাতে সিরু মিয়া  ও তার ছেলেকে হত্যার নির্দেশ ছিল। চিঠি পাওয়ার পর  ঈদের দিন রাতে সিরু মিয়াসহ  ৩৮ জনকে পাকিস্তানি সেনারা রাজাকার ও আলবদরদের সহযোগিতায়  হত্যা করা হয়। মোট ৪০ জনকে হত্যার জন্য সেল থেকে বের করা হয়েছিল। একজনকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং অপর একজন প্রানে বেঁচে যায় হত্যাকান্ড থেকে।

বিদেশী সাক্ষী আনতে সমন জারির আবেদন খারিজ

১৮/১০/২০১২
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে  ন্যাটোর সাবেক এক জেনারেলসহ দুজন বিদেশী সাক্ষী  মেনেছিল আসামী পক্ষ। তাদেরকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের জন্য  সমন জারির  প্রার্থনা করে আবেদন করেছিল অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষের আইনজীবীরা। আজ সে আবেদন  খারিজ করে দেয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল বলেন, আসামী পক্ষ যাকে  খুসী সাক্ষী আনতে পারবেন। সেটি তাদের বিষয়। এরপর সমন জারির আবেদন খরিজ করে দেন।

গোলম আযমের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে পারবেন ১২ জন

মেহেদী হাসান, ৯/১০/২০১২
জামায়াতে ইসলামের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে ১২ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে পারবেন। আজ  মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল -১  সাক্ষীর সংখ্যা নির্ধারন করে দিয়ে  এ মর্মে  আদেশ দিয়েছেন।

অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে আসামী পক্ষ থেকে দুই হাজার ৯৩৯ জন সাক্ষীর তালিকা জমা দেয়া হয়েছিল।  গোলাম আযমের এ সাক্ষীর তালিকা খারিজ করে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ থেকে  দরখাস্ত করা হয়েছিল  এবং গত সোমবার এ বিষয়ে শুনানী অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়ে আদেশ দিয়ে বলেছেন  অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে ১২ জন সাক্ষী  হাজির করতে পারবেন আসামী পক্ষ। আগামী ১৪ তারিখ এ সাক্ষীর  তালিকা জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে আসামী পক্ষকে।

সাক্ষীর সংখ্যা ১২ নির্ধারন করে  দেয়া বিষয়ে  আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, এর কোন বাস্তব ভিত্তি আসলে নেই। এর মানে হল  তাড়হুড়া করে বিচার দ্রুত শেষ করা। আমার আশঙ্কা হচ্ছে এতে আমরা ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হব।

সেফ হাউজের ৩৮ সাক্ষী বিষয়ে আদেশ :
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলায়     তদন্ত সংস্থার প্রধান এবং সেফহাউজে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যসহ মোট ৩৮ জনকে সাক্ষী হিসেবে  ট্রাইব্যুনালে হাজিররের জন্য সমন  জারির আবেদন পেশ করেছিলেন আসামী পক্ষ।  সোমবার এ বিষয়ে শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। আজ ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়ে আদেশে বলেছেন, ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে কোন সমন জারি করা হবেনা। আসামী পক্ষ   তাদের সাক্ষী হিসেবে আনতে পারবেন। তবে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষীর সংখ্যা ২০ জন নির্ধারন করে  দিয়ে যে আদেশ  ইতোপূর্বে প্রদান করা হয়েছে নতুন সাক্ষী  আনয়নের ক্ষেত্রে  সাক্ষীর সংখ্যা ২০ অতিক্রম করবেনা।  মোট সাক্ষীর সংখ্যা ২০ থাকতে হবে।

ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক, সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন, বিচারপতি আনোয়ারুল হক  সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুাল  এ আদেশ    প্রদান করেন।

এসময় আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম, মনজরুর  আহমদ আনসারী, ব্যারিস্টার এমরান এ সিদ্দিক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গোলম আযমের পক্ষে সাক্ষীর তালিকা খারিজের আবেদন

মেহেদী হাসান, ৮/১০/২০১২
অধ্যাপক গোলাম  আযমের পক্ষে  দুই হাজার ৯৩৯ জন সাক্ষীর তালিকা জমা দেয়া হয়েছে আসামী পক্ষ থেকে। এ   তালিকা খারিজের আবেদন  করা হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম আবেদনের শুনানীতে বলেন, রাজনৈতিক  অসদউদ্দেশে, বিচারকে বিলম্বিত এবং বাঁধাগ্রস্ত করতে এ দীর্ঘ তালিকা জমা দেয়া হয়েছে।  দীর্ঘ তালিকা অনুযায়ী সাক্ষী হাজির করলে সাড়ে তিন বছর সময় লাগবে শুধু তাদের সাক্ষীর জন্য।

জবাবে গোলাম আযমের পক্ষে আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন,  ১৯৭১ সালে নয় মাসব্যাপী সারা দেশে যত অপরাধ হয়েছে তার সবকিছুৃর সাথে জড়ানো হয়েছে অধ্যাপক গোলাম আযমকে। ৩০ লাখ মানুষ হত্যা, দুই লাখ বা তার বেশি ধর্ষণ,  লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ যত অপরাধ আছে তার সবকিছুর তাকে দায়ী করা  হচ্ছে আমার আসামীকে ।  কাজেই সাক্ষীর সংখ্যা বেশি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া  দীর্ঘ  তালিকা জমা দেয়া মানে তাদের সবাইকে হাজির করা  হবে সেটা বোঝায় না। আমরা  এখান থেকে যাদের উপযুক্ত মনে করব তাদের হাজির করব।
তাজুল ইসলামস বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের  তাড়াহুড়ার ধরন দেখে মনে হচ্ছে ডিসেম্বরের আগে বিচার শেষ করার পেছনে যে নীলনকশা,   চক্রান্ত চলছে  সেটা বাস্তবায়নের জন্য এই তাড়াহুড়া। ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে আসামীকে ফাঁসি  দিতে হবে। সাক্ষীর তালিকা খারিজের যে আবেদন করা হয়েছে  তার পেছনের উদ্দেশ্য হচ্ছে  সময় নির্ধারন করা এবং নির্ধারিত সমেয়র মধ্যে আসামীকে দোষী সাব্যস্ত করার আয়োজন করা ।   এ আবেদন গ্রহণ করা মানে হল আসামীকে হাত পা বেঁধে জবাই করার শামিল। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে আমরা বিচার বিলম্বিত করার জন্য দীর্ঘ তালিকা দিয়েছি। কিন্তু বিচার সংক্ষিপ্ত করার জন্য সাক্ষীর তালিকা খারিজ করার নজির কোথায় আছে তা  তারা দেখাক আমাদের।

এছাড়া আজ  আরো কয়েকটি আবেদনের ওপর শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে একটি রয়েছে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে একজন সাক্ষীর জবানবনন্দী তার অনুপস্থিতিতে গ্রহণ করার আবেদন কারণ সে অসুস্থতার কারনে বিদেশে  রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এ আবেদন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের অন্য আরেকটি মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে নতুন সাতজন সাক্ষী  জবানবন্দীসহ গ্রহনের আবেদন।  মাওলানা  নিজামীর পক্ষে আইনজীবী মিজানুল ইসলাম এ আবেদনের বিরোধীতা করে বলেন, তদন্ত শেষ হবার পর নতুন করে সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহনের কোন বিধান নেই। কাজেই এ আবেদন গ্রহণ করারও কোন সুযোগ নেই আইনে।
এসব আবেদন শুনানীনে চলে সকাল সাড়ে দশটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত। এরপর আড়াইটায় অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে  তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দী গ্রহণ শুরু হয়।
ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক, সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এবং বিচারপতি আনোয়ারুল হক বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। 


গোলাম আযমের পক্ষে ন্যাটোর জেনারেলসহ ২৯৩৯ সাক্ষীর তালিকা

মেহেদী হাসান, ১/৭/২০১২
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে ন্যাটোর একজন সাবেক জেনারেলসহ মোট দুই হাজার ৯৩৯ জন সাক্ষীর তালিকা জমা দেয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালে।  আজ সকালে আসামী পক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলাম এ তালিকা জমা দেন।

সাক্ষীর  তালিকায় ন্যাটোর সাবেক  কমান্ডার ইন চিফ (এলাইড ফোর্স নর্দার্ন রিজিয়ন) জেনারেল স্যার জ্যাক ডেভারেল এর নাম রয়েছে। এছাড়া আয়ারল্যান্ডের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (গ্যালওয়ে) আইন অনুষদের প্রফেসর উইলিয়াম এ সাবাজের নামও রয়েছে।

এ্যডভোকেট তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালের  সামনে সাংবাদিকদের  বলেন,  নিরাপত্তার  খাতিরে অন্য কোন সাক্ষীর নাম প্রকাশ করা যাচ্ছেনা। এ দুজন সাক্ষী বিদেশী এবং তাদের নিরাপত্তা বিঘিœত হবেনা ভেবেই আমরা তাদের নাম বললাম আপনাদের। অন্যান্য সাক্ষীদের বিষয়ে তাজুল ইসলাম বলেন,  খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা, দেশী বিদেশী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ, যুদ্ধাপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ, সামরিক আইন বিশেষজ্ঞরাও রয়েছেন।

ন্যাটোর সাবেক জেনারেল স্যার জ্যাক ডেভারেল এর বিস্তারিক পরিচয় দিয়ে তাজুল ইসলাম জানান তিনি বর্তমানে  আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে ডিফেন্স টিমের একজন সদস্য। তার জন্ম  বার্মিংহামে। তিনি ১৯৬৫ সালে কর্নওয়াল লাইট ইনফ্যান্ট্রিতে  (রয়াল মিলিটারি একাডেমী) কমিশনড প্রাপ্ত হন।
উইলিয়াম এ সাবাজের পরিচয় বিষয়ে তাজুল ইসলাম জানান তিনি বেলফাস্টের কুইন্স ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ছিলেন। এছাড়া সিয়েরলিওনে ট্রুথ এন্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের সদস্য ছিলেন।

আসামী পক্ষ থেকে সাক্ষীর যে তালিকা দেয়া হয়েছে তাতে  কিছু কিছু নাম সংক্ষিপ্ত আকারে লেখা রয়েছে। আজ দুপুরের বিরতির পর  ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম   এ বিষয়ে কয়েকজনের নামের প্রতি  ট্রাইব্যুনালে  দৃষ্টি আর্কষন করে বলেন, আমরা ইতোর্পূর্বে এভাবে  কিছু নামের তালিকা দেয়ায় অনেক গাল মন্দ  শুনেছি। কিন্তু এখন তারাই এভাবে নাম জমা দিয়েছেন। আমরা এটি গ্রহণ করবনা।  তখন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিজামুল হক বলেন,  গ্রহণ করবনা এটি বলিয়েননা। বলেন যে পুরো নাম লিখে  এদের বিষয়ে আরেকটি তালিকা দেন।
এরপর বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, সাক্ষীর সংখ্যা দেখেছেন? দুই হাজার  ৯০০! এরপর  জেয়াদ আল মালুম সাক্ষীদের সংক্ষিপ্ত নামের  বিষয়ে যে তালিকা  তার কাছে দিয়েছিলেন সেটি সজোরে সামনের টেবিলে রেখে তিনি বলেন “কোর্টের সঙ্গে মকারি!”

এ বিষয়ে তাজুল ইসলাম কোর্টের বাইরে বলেন, ১৯৭১ সালে সারা দেশে যত হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং অন্যান্য অপরাধ হয়েছে তার সব দায় চাপানো হয়েছে অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তার ব্যাপ্তি সারাদেশব্যাপী। সুতরাং তার বিরুদ্ধে তো সাক্ষী হওয়া দরকার ছিল তিন লাখ।

আজ গোলাম আযমের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী মুনতাসির মামুনের জবানবন্দী গ্রহণ এবং জেরা শুরু হয়েছে। আসামী পক্ষেরও সাক্ষীদের তালিকা এবং ডকুমেন্ট জমা  দেয়ার কথা ছিল। তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা ১২ খন্ডে মোট ছয় হাজার পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট জমা দিয়েছি। এছাড়া আরো কিছু ডকুমেন্ট প্রকৃয়াধীন রয়েছে। সেগুলো পরে জমা দেয়া হবে।

আসামী পক্ষে  ট্রাইব্যুনালে তাজুল ইসলাম ছাড়া  অ্যডভোকেট মিজানুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম,  মনজুর আহমদ আনছারি, ব্যারিস্টার এমরান এ সিদ্দিক, শিশির মো: মনির, আবু বকর সিদ্দিক, হাসানুল বান্না সোহাগ  প্রমুখ আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।

গোলাম আযমের পক্ষে বিদেশী সাক্ষী আনার বিষয়ে আপত্তি রাষ্ট্রপক্ষের

মেহেদী হাসান, ১৭/১০/২০১২
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে দু’জন বিদেশী সাক্ষী আনার বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আজ ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, অসদুদ্দেশে (ম্যালাফাইডি)  এবং বিচারকে বিলম্বিত করার জন্য আসামী পক্ষ থেকে এ ধরনের আবেদন জানানো হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের এ অভিযোগের বিষয়ে তীব্র বিরোধীতা করে আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এর মধ্যে কোথায় অসদুদ্দেশ্য আছে  তার একটি   উপাদান তারা দেখাক। সম্পূর্ণ আইনী  কাঠামোর মধ্যে এ আবেদন করা হয়েছে এবং ট্রাইব্যুনাল আইন আমাদের সে অধিকার দিয়েছে।   কোন আবেদন নিয়ে আসলেই তরা মুখস্ত বলে দিচ্ছে অসুদুদ্দেশ্যে আনা  হয়েছে। তাদের এ অভিযোগ শুনতে শুনতে আমরা খুবই  বিরক্ত।

অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে যে দুজন বিদেশী সাক্ষী আনার জন্য ট্রাইব্যুনালের প্রতি সমন জারির আবেদন জানানো হয়েছে তারা হলেন, ন্যাটোর সাবেক  কমান্ডার ইন চিফ (এলাইড ফোর্স নর্দার্ন রিজিয়ন) জেনারেল স্যার জ্যাক ডেভারেল এবং      আয়ারল্যান্ডের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (গ্যালওয়ে) আইন অনুষদের প্রফেসর উইলিয়াম এ সাবাজ।

গত ১ জুলাই অধ্যাপক গোলাম  আযমের পক্ষে ২ হাজার ৯৩৯ জন সাক্ষীর  তালিকা জমা দেয়া হয়। তার মধ্যে উক্ত দুই জন বিদেশী সাক্ষীও ছিলেন। এরপর গত ৯ অক্টোবার ট্রাইব্যুনাল আসামী পক্ষকে ১২ জন সাক্ষীর সংখ্যা নির্ধারন   করে দিয়ে আদেশ দেন। আসামী পক্ষ  তাদের ১২ জন সাক্ষীর  তালিকায়ও  উক্ত দুই বিদেশী সাক্ষীর নাম অন্তর্ভুক্ত করেন এবং তাদেরকে দেশে এসে সাক্ষ্য দেয়ার বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সমন জারির আবেদন করেন।  আসামী পক্ষের আবেদনে     উপরোক্ত বিদেশী দুজন সাক্ষীকে এক্সপার্ট উইটনেস বা বিশেষজ্ঞ সাক্ষী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং সেই হিসেবেই তাদের প্রতি সমন জারির আবেদন করা হয়েছে।
আবেদনে বলা হয় অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে নেতৃত্বের দায় (কমান্ড রেসপনসিবিলিটি) অভিযোগ আনা হয়েছে। স্যার জ্যাক ডেভারেল একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে এ বিষয়ে তার বিশেষজ্ঞ মতামত তুলে ধরবেন এবং তিনি একজন এক্সপার্ট বা বিশেষজ্ঞ সাক্ষী।  এছাড়া উইলিয়াম সাবাজ সার্বভৌমত্ব বিষয়ে তার মতামত তুলে ধরবেন।

গত মঙ্গলবার এ আবেদনের ওপর  শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। আজ বুধবার এ বিষয়ে আদেশের জন্য ধার্য্য করা ছিল। আজ সকালে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী বা চিফ প্রসিকিউটর  গোলাম আরিফ টিপু বলেন, তারা সাক্ষী হিসেবে আসতে পারেন কিন্তু এক্সপার্ট সাক্ষী হিসেবে নয়। তিনি  অভিযোগ করেন বিচার বিলম্বিত করার জন্য এ ধরনের আবেদন করা হয়েছে।
এসময় ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, তারা যদি তাদের মামলায় সহায়তার জন্য বিদেশী সাক্ষী আনেন তাহলে আপত্তি কোথায়।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের অপর প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম বলেন,  আসামী পক্ষের এ আবেদন  অসদুদ্দেশ্য প্রনোদিত।  এর মাধ্যমে তারা বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমকে একটি  খোরাক দেয়ার জন্য তারা এ আবেদন এনেছে। তারা  দেশে বিদেশে যে প্রচারনা চালাচ্ছেন তার সুবিধার জন্য তারা এটি করেছেন। তাছাড়া এ আবেদনের কোন ভিত্তি নেই। এ আবেদন বাতিল করা উচিত। এ আবেদন  মেইনটেইনবেল নয়।

জেয়াদ আল মালুম বলেন, গোলাম  আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগ হল বেসামরিক নেতৃত্বের দায়।  আসামী পক্ষ যে বিদেশ  সাক্ষী আনতে চাচ্ছেন তারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কি-না সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তারা সিভিল সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি বিষয়ে  বিশেষজ্ঞ কি-না তাও উল্লেখ করা হয়নি।  মামলার যে বিষয়বস্তু তাতে কোনভাবেই এটা ট্রাইব্যুনালের জন্য সহায়ক নয়।
 উইলিয়াম সাবাজের বিষয়ে তিনি বলেন, তার বই আমরাও পড়ি। তিনি  আন্তর্জাতিকভাবে একজন খ্যাতিমান আইনজ্ঞ তাতে আমাদের কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তা কিভাবে আমাদের এই মামলায় প্রয়োজনীয় এবং সহায়ক তা পরিষ্কার নয়।

এরপর ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগের জবাবে বলেন, তাদের মুখস্ত কথা শুনতে শুনতে আমরা বিরক্ত। সব কিছুতে তারা মুখস্ত বলে দিচ্ছেন  অসুদুদ্দেশ্য। কিন্তু কোথায় কিভাবে অসদুদ্দেশ্যে নিহিত আছে এ আবেদনের মধ্যে তার একটি উপাদান তিনি দেখাক। আমরা যদি বিচার মুলতবি চেয়ে আবদেন করতাম তাহলে এ অভিযোগ করলে মেনে নেয়া যেত। কিন্তু আমরা সম্পর্ণূ আইনী অধিকার বলে এবং আইনী কাঠামোর মধ্যে থেকে আবেদন করেছি। আর  তাকে তারা অসদুদ্দেশ্য বলে দিলেন।
এসময় ট্রাইব্যুনাল  প্রশ্ন করেন   কোন আবেদনকে কি প্রতিপক্ষ ম্যালাফাইডি আখ্যায়িত করতে পারেনা?
ব্যারিস্টার রাজ্জাক  বলেন, না  সব সময় পারেনা।
এরপর ট্রাইব্যুনাল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের প্রতি প্রশ্ন করেন, ট্রাইব্যুনাল মনে করলে যেকোন বিশেষজ্ঞকে যেকোন সময় ডেকে আনতে পারি। কিন্তু আপনারা কেন এক্সপার্ট সাক্ষী আনবেন? তারা কোন বিষয়ে আপনাদেরকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সাহায্য করবে? আসামী কোন আর্মি কমান্ডার নন। এখানে  আসামীর বিরুদ্ধে সিভিল সুপিরিয়র রেসপনসিবিলির অভিযোগ আনা হয়েছে। সেখানে  আর্মি কমান্ডার হিসেবে এসে তিনি কি করবেন?
জবাবে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি শুধুমাত্র আর্মিতেই হয়। বেসামরিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ অভিযোগ আনতে হলে তাকে রাষ্ট্রপ্রাধন হতে হবে যার  নিয়ন্ত্রন থাকবে আর্মির ওপর। যেমন   সশস্ত্র বাহিনী প্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি। প্রতিরক্ষা  মন্ত্রনালয প্রধানমন্ত্রীর হাতে।  এধরনের বেসামরিক ব্যাক্তির ক্ষেত্রে  বেসামিরক  নেতৃত্বের দায় চাপানো  যায় । কিন্তু  অধ্যাপক গোলাম আযম  এ ধরনের কোন    ক্ষমতায় ছিলেননা যাতে বলা যায়  আর্মির ওপর তার নিয়ন্ত্রন ছিল।
ব্যারিস্টার আব্দর রাজ্জাক বেলন, কমান্ড রেসপনসিবিলিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৯ সালে যখন উপসাগরীয় যুদ্ধ হল তখন তাতে যুক্তরাষ্ট্র  এবং যুক্তরাজ্য উভয় দেশ অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র বৃটেনকে বলেছিল তোমাদের আর্মিও আমাদের কমান্ডে থাকুক। কিন্তু  বৃটেন তাতে রাজি না হলে বলল আমাদের আর্মি আমাদের নেতৃত্বে থাকবে।
সেজন্য  এ বিষয়টির বিষয়ে  আমরা ন্যাটোর  সাবেক জেনারেল স্যার জ্যাক ডেভারেলকে আনতে চাচ্ছি।

শুনানী শেষে ট্রাইব্যুনাল বলেন আগামী কাল এ বিষয়ে আদেশ হবে।



রমজানে গোলাম আযমকে জামিন আবেদনের ওপর শুনানী অনুষ্ঠিত

১৭/৭/২০১২
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর কারাবন্দী অধ্যাপক গোলাম আযমকে রমজান মাসে জামিন আবেদন বিষয়ে আজ  শুনানী অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামীকাল  এ বিষয়ে আদেশের জন্য ধার্য্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল -১

জামিন আবেদনের শুনানীতে  ডিফেন্স টিমের প্রধান ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ১৯৭৮ সাল থেকে অধ্যাপক গোলাম আযম  রমজান মাসের শেষ দশ দিন এতেকাফ করে আসছেন। প্রতি রমজানে তিনি নিয়মিত তারাবী  নামাজ পড়েন। তিনি মনে করছেন এটাই হতে পারে তার জীবনের শেষ রমজান। রমজান মাসটি তিনি সুষ্ঠভাবে ইবাদত  বন্দেগীর মাধ্যমে কাটাতে চান। সে কারনে এ জামিন আবেদন।
 ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, নিতান্ত ধর্মীয় প্রেক্ষাপট থেকে আবেদনটি করা হয়েছে।

রমজান মাসের জামিন আবেদনের বিরোধীতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম বলেন, এ ধরনের জামিনের কোন বিধান নেই। দেশে এবং বিদেশে মিডিয়ার খোরাক জোগানোর জন্য এ ধরনের আবেদন করা হয়েছে।

১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল -১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক, সদস্য বিচারপতি আনোয়ারুল হক এবং বিচারপতি একেএমস জহির আহমেদ শুনানীর সময় উপস্থিত ছিলেন।
আজ  সোমবার জামিন আবেদনটি ট্রাইব্যুনালে ফাইল করা হয়। শুনানীতে  ডিফেন্স টিমে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, মিজানুল ইসলাম, মনজুর আহমদ  আনসারী, ব্যারিস্টার এমরান এ সিদ্দিকী, শিশির মো: মনির।




৪০ বছর পর কেন বিচার করা হচ্ছে তার যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখাতে পারেনি প্রসিকিউশন//

মেহেদী হাসান, ২৮/৩/১২
অধ্যাপক গোলাম আযমের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  আজ ট্রাইব্যুনালে বলেছেন,  ৪০ বছর পরে যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পূর্ণ নজিরবিহীন একটি ঘটনা।  নুরেমবার্গ থেকে শুরু করে প্রাক্তন যুগোশ্লাভিয়া, রুয়ান্ডা, সিয়েরালিওন, কম্বোডিয়া এবং হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে এর কোন নজির নেই। বাংলাদেশের েেত্র এই নজির বিহীন বিলম্বের যুক্তি সঙ্গত কারণ ট্রাইব্যুনালের সামনে ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্র পরে আইনজীবীদের ।   কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা এর পক্ষে  কোন যুক্তি সঙ্গত বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেনি। তারা যদি যুক্তি সঙ্গত কারণ দর্শাতে ব্যর্থ হন তাহলে এ বিচার কার্য চলতে পারে না।

জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমকে মামলা থেকে  অব্যাহতিদান  এবং তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের বিরোধীতা করে বক্তব্য উপস্থাপন শেষ করেছেন তার আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। গত ২৫ মার্চ তিনি প্রথম দিন বক্তব্য উপস্থাপন করেন। ঐদিন  বক্তব্য  উপস্থাপনের সময়  ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক জানতে চেয়েছিলেন, কম্বোডিয়াতে যুদ্ধ শেষ হওয়ার কতদিন পর বিচার শুরু হয়েছিল? উত্তরে আজ ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ট্রাইব্যুনালে জানান, কম্বোডিয়াতে যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৭৫ সালে এবং শেষ হয় ১৯৭৯ সালে। কিন্তু গৃহযুদ্ধ চলে দীর্ঘ ১৯ বছর । এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন বছরের মধ্যে ২০০১ সালে জাতিসংঘের সহায়তায় ট্রাইবুনাল গঠিত হয় এবং বিচার কার্য শুরু হয়।

জামায়াত ছাত্রসংঘকেও সহায়ক বাহিনী আখ্যা:
ব্যারিস্টার রাজ্জাক ট্রাইব্যুনালে বলেন, জামায়াতে ইসলামী এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘকেও পাকিস্তান আর্মির সহায়ক  বাহিনী হিসেবে দেখানো হয়েছে গোলম আযমের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জশিটে ।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, জামায়াতে ইসলামী,  ছাত্র সংঘতো দূরের কথা এমনকি রাজাকার বাহিনীও সহায়ক  বাহিনীর মধ্যে পরেনা। আইনে বর্নিত সহায়ক  বাহিনীর (অক্সুলিয়ারি ফোর্স) সংজ্ঞা উল্লেন করে তিনি বলেন, সহায়ক  বাহিনীকে  আর্মি   কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত, পরিচালিত হতে হবে । কিন্তু  রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়েছিল একটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট।   অর্ড্যন্যিান্সের   শুরুতে  

বলা হয়েছে এটি একটি ভলানটারি (স্বেচ্ছাসেবক) ফোর্স। এর প্রধান নির্বাহী একজন পরিচালক। তাকে  নিয়োগ দেন সরকার। আর্মি নয়। সুতরাং  এটি একটি সিভিলিয়ান ফোর্স।  তিনি বলেন জামায়াত এবং ইসলামী ছাত্র সংঘ কোন সহায়ক বাহিনী ছিলনা কখনো। জামায়াত একটি রাজনৈতিক দল এবং ইসলামী ছাত্রসংঘ ছিল ছাত্রদের একটি সংগঠন।

গোলাম আযমের একটি চিঠির ভিত্তিতে ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ায় ৩৮ জন  বন্দীকে  জেল থেকে বের করে হত্যার অভিযোগ বিষয়ে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, যে চিঠির ওপর ভিত্তি করে এ অভিযোগ আনা হল সে চিঠিটি নেই। চিঠি  যিনি বহন করে নিয়ে গেছেন বলে বলা  হল তিনিও জীবিত নেই। এমনকি চিঠি  যিনি পড়েছেন  তিনিও  জীবিত নেই। তাহলে কেমন করে প্রমান করা হবে যে, অধ্যাপক গোলাম আযম  চিঠি দিয়েছিলেন এবং চিঠিতে  ৩৮ জনকে হত্যার নির্দেশনা ছিল?
এ সময় ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি একেএম জহির আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটরদের বক্তব্য হল অধ্যাপক গোলাম আযম জামায়াত আমীর  ছিলেন। জামায়াতের লোকজন রাজাকার বাহিনী গঠন করেছে। জামায়াতের নেতা হিসেবে এসব বাহিনীর ওপর তার নিয়ন্ত্রন ছিল। তিনি পাকিস্তানী নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন। তাদের কাছে অস্ত্র দাবি করেছেন। স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন। সে হিসেবে তিনি অভিযুক্ত। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য বলেন।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন,  অধ্যাপক গোলাম আযম কর্তৃক রাজাকার বাহিনী গঠনের প্রশ্নই আসেনা। এটি গঠিত হয়েছিল সরকারি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে।  জামায়ত কখনো   আলবদর  আল শামসও গঠন করেনি।

অনুপস্থিত ৪৬ সাক্ষী বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য:
গত ২০ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে একটি দরখাস্ত দিয়ে আদালতে জানানো হয় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ৪৬ জন সাক্ষী হাজির করা তাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। তাই ঐ ৪৬ জন সাক্ষী বিভিন্ন সময়ে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী   দিয়েছেন তা  তাদের অনপস্থিতিতে আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহন করা হোক। এ আবেদন বিষয়ে আজ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ হায়দার আলী বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, হায়দার সাহেব, আবেদনটি নতুন ধরনের। তাই প্রথমে আপনি আবেদনটি  উপস্থাপন করেন। পড়ে শোনান।

সৈয়দ হায়দারি আলী বলেন, তালিকার এক নম্বরে থাকা উষারানী মালাকার  অসুস্থ, স্মরনশক্তি লোপ, ভ্রমনে মুত্যু ঝুকি রয়েছে।

তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা সুখরঞ্জন বালী চার মাস আগে  নিজ বাড়ি থেকে বের হবার পর নিখোঁজ।  তালিকার ৩ থেকে পাচ নম্বরে থাকা আশিষ কুমার মন্ডল, সুমীত রানী মন্ডল এবং সমর মিস্ত্রী  ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে নিখোঁজ। সম্ভবত তারা গোপনে ভারতে পালিয়ে গেছে।

তালিকায় ৬ থেকে ১৯ নম্বর মোট ১৪ জন সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। আসামীর পক্ষ অবলম্বনকারী পিরোজপুরের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক সাক্ষীদের বাড়িতে গিয়ে হুমকির

প্রেক্ষিতে ভয়ে ভীত হয়ে তারা আত্মপোগন করেছে।  এরা হল  সুরেষ চন্দ্র মন্ডল, গণেশ চন্দ্র সাহা, শহিদুল ইসলাম খান সেলিম, আইউব আলী হাওলাদার, গোপাল কৃষ্ণ মন্ডল, বজলুর রহমান, সিতারা বেগম, রানী বেগম, মো: মোস্তফা, আব্দুল লতিফ হাওলাদার, অনিল চন্দ্র মন্ডল, অজিত কুমার
শীল, খলিলুর রহমান শেখ এবং এছহাক আলী খান। উক্ত ১৯ জন সাক্ষী সম্পর্কে বলা হয়েছে তারা সকলেই  মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় বর্ণিত ঘটনার চাুস সাক্ষী।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের দরখাস্তে বলা হয়েছে ৪৬ জন  সাক্ষীকে  হাজির করা আদৌ সম্ভব নয়।  তালিকায় প্রথম ১৯ জন সাক্ষী হাজির করতে না পারা বিষয়ে বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ক্রমিক নং ২০ থেকে ৪৬ পর্যন্ত সাক্ষীদের নাম তিনি পড়ে শোনাননি।  এদের মধ্যে দুই তিনজনের নাম উচ্চারনের পর তিনি বলেন  এদের নাম আর পড়লামনা। আপনাদের কাছে আছে।
এরা কেন আসতে পারবেননা সে বিষয়ে দরখাস্তে  কোন কারণও উল্লেখ করা হয়নি। তালিকার ক্রমিক নং ২০ থেকে ৪৬ পর্যন্ত  সাক্ষীদের মধ্যে পাঁচজন অতি পরিচিত সাক্ষী রয়েছেন। এরা হলেন  ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির,  লেখক প্রফেসর জাফর ইকবাল (হুমায়ুন আহমেদের ভাই), খ্যাতিমান জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, পিরোজপুর সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন আহমেদের নামও রয়েছে।

তালিকায় থাকা প্রথম ১৯ জন সাক্ষীর মধ্যে  যেসব সাক্ষীদের সাঈদীর পক্ষ থেকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ করা হয়েছে সে বিষয়ে সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, প্রত্যেকের বাড়ি গিয়ে পিরোজপুরের অস্ত্রধারীরা খুন জখমের হুমকি দিয়েছে।
তিনি বলেন সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী জবানবন্দী দেয়ার পর থেকে নিখোঁজ। তাকে জীবিত পাওয়া যাবে কি-না  সন্দেহ। তার নিখোঁজ বিষয়ে থানায় জিডি করা হয়েছে। অন্য যারা নিখোঁজ তাদেরও খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা  আমরা নিশ্চিত নই।  যেহেতু তাদের খুঁজে  পাওয়া অনিশ্চিত এবং কখন পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা নেই তাই তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের পূর্বে দেয়া জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হোক।

এরপর সৈয়দ হায়দার  আলী  ২৩ মার্চ দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত ‘সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষী ঠেকাতে অপপ্রচারের কৌশল’ শীর্ষক খবরটি ট্রাইব্যুনালে পড়ে শোনান তার বক্তব্যের সমর্থনে। কালের কণ্ঠের ঐ খবরের মূল বিষয় হল মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে বাসুদেব নামে এক সাক্ষী হার্টএ্যাটাক করে মারা যাবার পর এটাকে পুঁজি করে এলাকায় অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য  দেয়ার কারনে তার মৃত্যু হয়েছে বলে সাঈদীর লোকজন এলাকায় ভয়ভীতি ছড়াচ্ছে এবং এ কারনে আর কোন সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে আসছেনা।
ঐ প্রতিবেদনে বলা হয় গত ৮ জানুয়ারি বাসুদেব সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার পর  ১৬ দিনের মাথায় হার্ট এ্যাটাক করে মারা যান।  তার আগে একজন সাক্ষী ধরে আনতে গিয়ে আব্দুল গনি নামে  একজন পুলিশ কনস্টেবল হার্টএ্যাটাক করে মারা যান।

বজলুর রহমান নামে আরেক সাক্ষী জানান, সাক্ষী দিতে ঢাকায় গিয়েছিলাম কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর দিতে পারিনি।  মানসে কয় সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে মোর শরীল ভাল থাকবেনা। সাক্ষী দিতে যাবার কথা মনে হইলেই শরীর দুর্বল হইয়া পরে।

আরো কয়েকজন অনিচ্ছুক সাক্ষীর উদ্ধৃতি  দেয়া হয়েছে রিপোর্টে।

ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, সাক্ষী তো সাক্ষ্য দেবে। ক্রস ইক্সামিনেশন ছাড়া সাক্ষীর কোন ভ্যালূ আছে?
বিচারপতি একেএম জহির আহমেদ বলেন, যাদের ঢাকায় নিয়ে আসলেন সাক্ষ্য দেয়ার জন্য  তাদের বেড়াতে যেতে দিলেন কেন? সৈয়দ হায়দার  আলী বলেন,  কোন মুক্ত মানুষকে আমরা আটকে রাখি কিভাবে।

আইনের ১৯ (২) ধারায়  রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করেছে ৪৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দী তাদের অনুপস্থিতিতে  গ্রহণ বিষয়ে। ১৯ (২) ধারায় বলা হয়েছে বিচার চলাকলে কোন ব্যক্তি মৃত হলে, তাকে হাজির করা  যদি  কালপেক্ষন এবং ব্যাবহুল হয় এবং ট্রাইব্যুনাল যদি মনে করেন এভাবে সময় এবং অর্থ ব্যায় করে কাইকে হাজির করা যুক্তিসঙ্গত নয় তাহলে মেজিস্ট্রেট বা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে উক্ত ব্যক্তিদের  প্রদত্ত জবানবন্দী আদালত  এভিডেন্স আকারে গ্রহণ করতে পারেন।

৪৬ জন অনুপস্থিত সাক্ষী সম্পর্কিত আবেদন পেশের শুরুতে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেন,  আইনের ১৯ (২) ধারা অনুযায়ী এ আবেদন করা হয়েছে কি-না সেটাই হল আসল কথা। তা না করে বললেই হবেনা যে, সাক্ষী আসে নাই অতএব তাদের জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে নিয়ে নেন।
বিচারপতি একেএম  জহির আহমেদ বলেন, যারা বেড়াতে গিয়ে  আর আসলনা, যারা নিখোঁজ রয়েছেন তারা কিভাবে আইনের ১৯ (২) ধারায় পরে? কাউকে  হাজির করা কালক্ষেপন বা ব্যয়বহুল বলতে বোঝায় কোন সাক্ষী যদি আমেরিকায় থাকে, তার পাসপোর্ট ভিসা পেতে যদি সমস্যা হয়,  তাকে আনতে যদি অতিরিক্ত সময় এবং অর্থ লাগে সেটা কালক্ষেপনের আওতায়  ধরা যায়। কিন্তু আইনে তো মিসিং বা নিঁেখাজ শব্দ নেই। যারা ভারতে পালিয়ে গেল, নিখোঁজ যাদের ডেবডিও পাওয়া যায়নি তাদের  কি হবে?

আব্দুল আলিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়া হয়েছে:
সাবেক মন্ত্রী আব্দুল আলিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বর্তমানে জামিনে থাকা  আব্দুল আলিমের জামিনের মেয়াদ ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ঐদিন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানী শুরুর জন্য নির্ধারন করা হয়েছে।

নিজামী এবং সালাউদ্দিন কাদেরের মামলার তারিখ পেছাল:
জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের বিরোধীতা করে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করার কথা ছিল গতকাল।   তার মামলার তারিখ আগামী ১  এপ্রিল  নির্ধারন করা হয়েছে।  সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত তিনি ট্রাইব্যুনালের হাযত খানায় ছিলেন। আজ মোট পাঁচটি মামলার কার্যক্রম থাকায় তার মামলার কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। তাই সারা দিন হাজতখানায় অপেক্ষ করেন তিনি। 

এদিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে আজ চার্জ গঠন বিষয়ে আদেশ দেয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল।  সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামকে  ট্রাইব্যুনাল  চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, আমাদের টিমে নতুন একজন সদস্য (বিচারপতি আনোয়ারুল হক) এসেছেন। তিনি এখনো সবকিছু  দেখে নেয়ার সুযোগ পাননি। তাই আমরা জনাব সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর চার্জ গঠনের অর্ডার দেয়ার জন্য আরেকটু সময় নিতে চাই। আগামী   বুধবার ৪ঠা এপ্রিল চার্জ গঠনের আদেশ দানের জন্য ধার্য্য করা হয়।

ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক প্রথমে মঙ্গলবার ৩ এপ্রিল  তারিখ নির্ধারন করলে ঐদিন ব্যক্তিগত অসুবিধার কথা জানান ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম। এসময় আদালতের ডকে থাকা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী উচ্চস্বরে বলেন, উনি না থাকলে অসুবিধা নেই। আমিতো থাকব। মঙ্গলবারই রাখেন। কোন  অসুবিধা নেই।

তখন বিচারপতি নিজামুল হক ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামকে বলেন,  আপনার অসুবিধার কথা বিবেচনা করে বুধবার ৪ তারিখই করা হল।  সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী আবারো উচ্চস্বরে বলেন, আমাকে ৪০০ দিন  বাইন্ধা রাখছেন।  আই এ্যাম এ বিগ ট্রাবল।

এ পর্যন্ত যে আটজনের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে তার মধ্যে  পাঁচজনকেই গতকাল ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। এরা হলেন অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মাওলানা সাঈদী এবং আব্দুল আলিম। এদের মধ্যে একমাত্র আব্দুল আলিম জামিনে মুক্ত আছেন। বাকীরা জেলে বন্দী।






জামায়াত আওয়ামী লীগের সাথে থাকলে তাদের বিচার করা হতনা

মেহেদী হাসান, ২৫/৩/১২
অধ্যাক গোলাম আযমের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, জামায়াতে ইসলাম যদি আজ  আওয়ামী লীগের সাথে জোটে থাকত তাহলে তাদের   বিচারের সম্মুখীন করা হতনা। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারনে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তাদেরকে শায়েস্তা করে  চিরতরে নির্মুল করার জন্য  ৪০ বছর  পর  মিথ্যা অভিযোগে আজ বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করানো হয়েছে।

অধ্যাপক গোলাম আযমকে মামলা থেকে অব্যাহতি এবং তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের বিরোধীতা বিষয়ে  যুক্তি উপস্থাপন করে তিনি আজ একথা বলেন। দিনব্যাপী যুক্তি উপস্থাপন করে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ট্রাইব্যুনালে  বলেন,  অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন যেসব অভিযোগ এনেছেন তার  পক্ষে কোন দালিলিক প্রমান নেই।  শুধুমাত্র পেপারকাটিংয়ের ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ আনা হয়েছে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  আদালতে ডকুমেন্ট উপস্থাপন করে বলেন,  বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অনেক উচ্চ পর্যায়ের নেতা অধ্যাপক গোলাম আযমসহ জামায়াতের সাথে অসংখ্য বৈঠক করেছেন। একসাথে রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন করেছেন বিভিন্ন ইস্যুতে। ১৯৯১ সালে জামায়াত  আওয়ামী লীগের প্রস্তাবে রাজি না হয়ে বিএনপিকে সমর্থন দেয়ায় তারা সরকার গঠছন করে। আবার জোটগত নির্বাচনের কারনে  ২০০১ সালে বিএনপি বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে।  তাই ক্ষমতার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী জামায়াতকে  নানা কৌশুলেও দুর্বল করতে না পেরে আজ তারা যুদ্ধাপরাধের কালিমা লেপনের নাটক মঞ্চস্থ  করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন আখ্যায়িত করে  ব্যারিস্টার রাজ্জাক
 বলেন,     বর্তমান সরকারী দল ১৯৭২-৭৫, ১৯৯৬-২০০১ সময়ে ও সরকার পরিচালনা করেছিল। কোন      
সময়ে অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। ১ আগষ্ট, ২০১০ তারিখেই প্রথম
আর্ন্তজাতিক অপরাধ তদন্তকারী সং¯হা তাঁর বিরুদ্ধে কথিত তদন্ত শুরু করে। যার ফলে ৪ জানুয়ারী,
২০১২ ইং তারিখে কথিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পত্র দাখিল করা হয়। ৪০ বছরের ও বেশী সময় পরে
একটি ফৌজদারী অভিযোগের সূচনা নজির বিহীন। এবং এটিই চূড়ান্তভাবে প্রমান করে যে এ বিচার
মূলত একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই।

তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের যে আইনের মাধ্যমে আজ জামায়াতসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে সে আইনটি করা হয়েছিল শুধুমাত্র ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের জন্য। বাংলাদেশীদের ঐ আইনের অধীনে বিচারের কোন উদ্দেশ্যই ছিলনা। এমনকি আইনটি পাশের জন্য সংসদে যখন বিল  আনা হয় তখন সেখানে ‘ইকুডিং এনি পারসন’ বলে যে  শষব্দগুলো  ছিল সেগুলো বাদ   দিয়ে বিল পাশ করা হয়।  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতেই ঐ শব্দগুলো বাদ দেয়া হয়। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন  বাংলাদেশীদের যাতে এই আইনের মাধ্যমে কোন অবস্থাতেই বিচার করা না হয় সেজন্য  বিল থেকে এসব  শব্দ বাদ দেয়া হয়।  আইনটি পাশের উদ্দেশ্য


যে শুধুমাত্র ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা ছিল সে বিষয়ে আইন পাশের সময় সংসদে তৎকালীন  আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জনধরসহ অন্যান্যদের বক্তব্য তুলে ধরেন আদালতে।

তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের আইনে বিচার করা অসম্ভব হওয়ায়  সরকার  ২০০৯ সালে তাতে কিছু সংশোধনী এনেছে। গোলাম আযমসহ অন্যান্য জামায়াত নেতাতের বিচারের উদ্দেশ্যেই ২০০৯ সালে  আইনটি সংশোধন করে ইন্ডিভিজুয়াল এবং গ্রুপ অব ইন্ডিভিজুয়ালস শব্দ যোগ করা হয়।
২০০৯ সালে মতায় এসেই তারা জামায়াতকে ধ্বংসের এজেন্ডা হাতে নেয়। বহু এজেন্ডার অন্যতম হল - এ ট্রাইবুনাল, জামায়াত নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে বিচার একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা, এটি প্রহসন, এর পুরো উদ্দেশ্যই রহস্যময়।   ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর জন্য প্রণীত আইন বেসামরিক রাজনৈতিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবহার বে-আইনী।

    ব্যারিষ্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, একথা ইতিহাসিকভাবে সত্য যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ প্রণীত হয়েছিল ১৯৫ জন তালিকাভুক্ত, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য। ১৯৭৪ সালের ফেব্র“য়ারীতে ভারত-পাকিস—ান- বাংলাদেশ এর মধ্যে স¤পাদিত একটি ত্রিপীয় চুক্তি স¤পাদনের মাধ্যমে ঐ ১৯৫ জন চিহ্নিত তালিকাভূক্ত যুদ্ধাপরাধীকে মা করা হয় এবং তাদের পাকিস—ানের কাছে হস—ান্তর করা হয়।
    ২০০৯ সালে সেই সমাপ্ত অধ্যায়ের পাতা আবারো উল্টানো শুরু হল স¤পূর্ন রাজনৈতিক মতলবে। বিরোধী পকে চিরতরে নির্মূলের উদ্দেশ্যে একটি আইনকে, বিচার প্রক্রিয়াকে, সর্বোপরি রাষ্ট্রয¤ত্রকে ব্যবহারের সব আয়োজন স¤পন্ন হল। আইনে কতিপয় সংশোধনী এনে মূল আইন প্রণয়ন কারীদের উদ্দেশ্যের বাইরে গিয়ে বেসামরিক - রাজনৈতিক নেতাদের হয়রানির জন্য এবং কেবলমাত্র রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল গঠন করা হল। যেখানে মূল অপরাধীদের মা প্রদর্শন করা হয়েছে। সেখানে নতুন সংজ্ঞা রচনা করে কতিপয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে হয়রানি করা চরম বে-আইনী, অসাংবিধানিক।

    ব্যারিষ্টার আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, তার বিচার প্রক্রিয়া শুরু, অভিযুক্তের গ্রেফতার ইত্যাদি বিষয়ে ও বক্তব্য উপ¯হাপন করেন। তিনি বলেন, পশ্চিমা বলয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হয় আগষ্ট ১৯৪৫ এ। আধুনিক ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধাপরাধ ট্রইবুনাল- নুরেমবার্গ এর যাত্রা শুরু হয় ২০ নভেম¦র ১৯৪৫ ইং তারিখে এবং এর সমাপ্তি হয় ১ অক্টোবর, ১৯৪৬ ইং তারিখে। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের তালিকা তৈরী করা হয় যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। অপরাধের ধরন-প্রকৃতি ইত্যাদি বিবরন ও যুদ্ধ চালাকালীন সময়ে প্রস্তুত করা হয়। এবং বিচারও শুরু করা হয় দ্রুত। টোকিও, যুগোশ্লাভিয়া, রুয়ান্ডা- সর্বত্র এ ধারা ল্য করা যায়। আর আমাদের আর্ন্তজাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল), ঢাকা প্রতিষ্ঠা লাভ করল ঘটনার ৪০ বৎসর পরে। তাও মূল আভিযুক্তদের মা করে নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়ার পর।
      রাজনৈতিক কারনেই শুধু এ দীর্ঘ বিলমে¦র পর অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ দাঁড়   
             করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অধ্যাপক আযমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ নামায় এমন কিছু নেই যাতে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি উক্ত আইনের অধীনে কোন অপরাধ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে কোন প্রাইমা-ফেসি কেইস প্রসিকিউশন দাঁড় করাতে পারনি। তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্পষ্ট। অপরাধের ধরনের কোন বিস—ারিত বর্ননা নেই। তাই ১৯৭৩ সালের আইনের ১৬ ধারার বিধানের লংঘন বলে এ অভিযোগ আইনতঃ অচল। দেশীয় ও আর্ন্তজাতিক আইনে প্রচলিত অভিযোগ সংক্রান্ত আইনে ও অধ্যাপক আযমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সমূহের একটি ও রনীয় নয়। পুরো অভিযোগ নামাই ক্রটিপূর্ণ, অস্পষ্ট, ভ্রমাÍক ও বে-আইনী।

    ব্যারিষ্টার রাজ্জাক বলেন, প্রসিকিউটর আনুষ্ঠানিক চার্জ এর ১০ নং অনুচেছদ-এ পাকিস—ানী সেনা বাহিনীর সদস্যদের কৃত অপরাধ গুলো জামায়াত, ইসলামী ছাত্র সংঘ, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর, আল্-সামস ও আল্ মুজাহিদ এর সহায়তায় করা হয়েছে বলে ১৯(৩) ধারার বিধান বলে সেসব- বিচারিক নোটিশে (লঁফরপরধষ হড়ঃরপব) নেযার প্রার্থনা করেছে। ব্যারিষ্টার রাজ্জাক বলেন একটি ঘটনাকে আর্ন্তজাতিক অপরাধ আইনে ‘কমন কলেজ’ হিসেবে ‘জুডিশিয়াল নোটিশে’ নিতে হলে ঐ ঘটনা ‘প্রতিষ্ঠিত’ বা ‘সাংঘাতিক ভাবে গর্হিত’ হিসেবে চিহ্নিত হতে হবে। প্রসিকিউশন এ আবেদন করেছে অথচ বর্ননায় এমন কোন কিছু দেখাতে পারেনি যে পাকিস—ানি সৈন্যদের সংঘটিত অপরাধ সমূহ সরাসরি জামায়াত, ইসলামী ছাত্র সংঘ বা শান্তি কমিটি দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। ঘটনার বিবৃতিতে প্রতীয়মান দূর্বলতা ঢাকার জন্যই প্রসিকিউশন আইনের অপ-প্রয়োগ করে উক্তরূপ বিষয় জুডিশিয়াল নোটিশে নেয়ার প্রার্থনা করেছে। প্রমানের দায় এডানোর জন্যই এ প্রচেষ্টা।
     অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সমূহের আইনগত, ঘটনাগত, যৌক্তিক কোন ভিত্তি নেই। তিনি কোন অপরাধ করেছেন- তা প্রমানের জন্য কোন নির্ভরযোগ্য স্যা প্রমান প্রসিকিউশনের দলিলাদিতে নেই। অনুমান, কথামালা, রচনা সমগ্র দিয়ে ফৌজদারী অপরাধের বিচার করা যায়না। কোন অপরাধের সহযোগী (এবেটর) হিসেবে প্রমানের জন্যও প্রসিকিউশনের হাতে কোন স্যা প্রমাণ নেই।    ব্যারিষ্টার আব্দুর রাজ্জাক পরিশেষে বলেন, প্রসিকিউশনের দাখিল করা ‘ফরমাল চার্জ আইনে কোন চার্জই নয়’ এটি কাল্পনিক, ভ্রমাÍক, ত্রুটিপূর্ণ। অতএব, তাঁর অব্যাহতির দরখাস— মঞ্জুর করে তাঁকে কথিত অপরাধ সমূহ থেকে অব্যাহতি দেয়া হোক।


ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক অধ্যাপক গোলাম আযমের রাজনৈতিক জীবনের চিত্র তুলে ধরে বলেন,  তিনি  ১৯৪৮-৪৯ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এর নির্বাচিত জিএস ছিলেন, সমগ্র ছাত্র সমাজের পে তিনি ২৭ নভেম¦র, ১৯৪৮ তারিখে পাকিস—ানের তৎকালীন প্রধানম¤ত্রীকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে স¥ারকলিপি প্রদান করেন। তিনি ১৯৫৪ সালে জামায়াতে যোগদান করেন।

জন্মলগ্ন থেকেই জামায়াত গণতানি¤ত্রক রাজনৈতিক ধারার সমর্থক হিসেবে কাজ করছে। ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে সামরিক শাসনের অবসানের পর পরই গণতাস্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত ও শিিক্তশালী করার জ্ঞ্য জামায়াত সমি¥লিত রাজনৈতিক শক্তি সৃষ্টির প্রয়াস চালায়।
অধ্যাপক গোলাম আযম পাকিস—ানের প্রেসিডেণ্টকে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন লাভকারী দল আওয়ামী লীগের কাছে মতা অর্পনের অনুরোধ জানান ১৭ মার্চ ১৯৭১ সালে । জামায়াত এবং অধাাপক আযম পাকিস—ানী সৈন্যদের বর্বরতার প্রতিবাদ করেন। অধ্যাপক আযম টিক্কা খান এবং ইয়াহিয়া খানের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে কথা বলেন।

ব্যারিষ্টার রাজ্জাক আরও বলেন, স¦াধীনতার পর সরকার অধ্যাপক আযমের নাগরিকত— বাতিল করলেও সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপীল বিভাগে তা টেকেনি। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবেই আছেন। চল্লিল বছরে তাঁর বিরুদ্ধে কোন মামলা, এজাহার দায়ের করা হয়নি।

১৯৮৩ থেকে ১৯৯০  দীর্ঘ ৭ বৎসর জামায়াত দুটি রাজনৈতিক জোট (আওয়ামী লীগ নেতৃত¦াধীন ও বিএনপি নেতৃত¦াধীন) এর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গণত¤—্র পূণরুদ্ধারের নে অবিস¥রনীয় ভূমিকা রাখে। এ আন্দোলন চলাকালে শেখ হাসিনা, তোফায়েল আহমদ, আব্দুস সামাদ আজাদ, আমীর হোসেন আমু এবং অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতৃবর্গ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম¥দ মুজাহিদ, কামরুজ্জামান ও আব্দুল কাদের মোল্লার সাথে বিভিন্ন মিটিং এ আলোচনায় অংশ গ্রহন করেন। ব্যাপক গণ আন্দোলনে ৬ ডিসেম¦র, ১৯৯০ তারিখে এরশাদ মিতা ছাড়তে বাধ্য হয়।

১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসন লাভ করে। এটি ছিল সরকার গঠনের জন্য গুরুত¦পূর্ন একটি ফ্যাক্টর। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু'দলই সরকার গঠনে জামায়াতের সহায়তা চায়। আওয়ামী লীগের তৎকালীন একজন প্রেসিডিয়াম মেম¦ার (বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য) জামায়াতের পে সমন¦য়ক আলী আহসান মোহাম¥দ মুজাহিদ এর সাথে দেখা করে জানান- আওয়ামী লীগকে সমর্থন করলে ৩টি মন্ত্রনালয়  ও অর্ধ ডজন মহিলা আসন দেয়া হবে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নীতি নির্ধারনী সভা মজলিশ-ই-শূরা দীর্ঘ আলোচনার পর আওয়ামী লীগের প্রস—াবে না বলার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। জামায়াতের সিদ্ধান্ত ক্রমেই বি.এন.পি কে সরকার গঠনে সমর্থন দেয়। তবে কোন ম¤—্রণালয় নেয়নি।

১৯৯১ সালের অক্টোবরে সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী অধ্যাপক গোলাম আযমের সাথে দেখা করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেণ্ট প্রার্থী হিসেবে জামায়েতের ভোট প্রার্থনা করেন। তবে জামায়াত বি.এন.পি. মনোনীত প্রেসিডেণ্ট প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে সমর্থন দেয়।
২০০১ এর নির্বাচনে জামায়াত ১৭টি আসন লাভ করে। বি.এন.পি নেতৃত¦াধীন সরকারে জামায়াত দুটি ম¤ত্রণালয়ের দায়িত¦ লাভ করে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন রাজাকার কোন সহায়ক বাহিনী নয়। সহায়ক বাহিনীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে তারা সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত নিয়ন্ত্রিত  হবে । কিন্তু রাজাকার বাহিনী পরিচালিত হত পরিচালক কর্তৃক যিনি সরকারি কর্মকর্তা।



আসামী পক্ষের কোন আইনজীবী যাননি ট্রাইব্যুনালে// গোলাম আযমের শুনানী পেছাল

মেহেদী হাসান, ১২/৩/১২
আজ আসামী পক্ষের কোন আইনজীবী যাননি ট্রাইব্যুনালে । ফলে আসামী পক্ষের দায়ের করা দুটি আবেদন খারিজ করে দেয়ার মাধ্যমে শেষ হয়ে যায় ট্রাইব্যুনালে কার্যক্রম। আসামী পক্ষের আইনজীবীদের কোর্টে না আসতে পারা বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল একটি আদেশে বলেছেন বাইরে  বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারনে হয়ত তারা  আসতে পারেননি।

জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগ বিষয়ে আর্গুমেন্ট পেশ করার কথা ছিল আসামী পক্ষের আইনজীবীদের। কিন্তু তাদের কেউ হাজির হননি  ।

আজকের  কার্যতালিকায় আসামী পক্ষের দায়ের করা দুটি আবেদনও। এর একটি হল  অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে শুনানী চার সপ্তাহের জন্য মুলতবি করা এবং অপরটি হল তদন্ত রিপোর্ট  কপি সরবরাহ করা বিষয়ে।

সকালে  আদালতের  কার্যক্রম শুরু হলে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জেয়াদ আল মালুমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ডিফেন্সের কেউ আসেনি। পুরো বেঞ্চ খালি । কি করা যায়?
জেয়াদ আল মালুম মতামত দিয়ে বলেন চার্জ ফ্রেম বিষয়ে অর্ডার দেয়া উচিত।

তখন বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, আসামী পক্ষের কেউ আসতে পারেননি। আমাদের স্টাফ আসতে পারেননি। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা এসব কি  বিবেচনা  করা উচিত নয়? পরে যদি তারা এসে বলে আমরা আর্গুমেন্ট করব তখন?
জেয়াদ আল মালুম বলেন, আবেদন দুটি বাতিল করেন মাই লর্ড।
তখন  বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, আপনি বাতিলের জন্য আবেদন করেন। তারপর আমরা বিবেচনা করে দেখব কি করা যায়।
তিনি বলেন, তদন্ত  কপি চেয়ে যে আবেদন করা হয়েছে আসামী পক্ষ থেকে  তা তো এমনিতেই বাতিল হয়ে যাবে। কারণ আগেও এ  বিষয়ে আবেদনের ওপর আদেশ হয়েছে।

এরপর বিচারপতি নিজামুল হক অপর দুই বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির এবং একেএম জহির আহমেদের সাথে পরামর্শ করেন। বেঞ্চ অফিসারকে ডাকেন আদেশ লেখার  ডিকটেশন নেয়ার জন্য। 
আদেশে তিনি বলেন, আজ অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে চার্জ হেয়ারিংয়ের জন্য নির্ধারিত ছিল। আসামী পক্ষের দুটি আবেদনও ছিল। এর একটি হল তদন্ত রিপোর্ট চেয়ে আবেদন এবং অপরটি হল শুনানী চার সপ্তাহ মুলতবির আবেদন।

কিন্তু  আসামী পক্ষের কোন কাউন্সিলর আজ ট্রাইব্যুনালে আসেননি। আমাদের ধারণা বাইরে বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করায় এবং এ কারনে উদ্ধুত টেনশনের  কারনে তারা হয়ত আসতে পারেননি। বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, আমি মনে করি একজন আইনজীবীর অন্তত আসা উচিত ছিল। তারা এসে তাদের আবেদনের পক্ষে কথা বললে তাদের চান্স দেয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারত।

এরপর বিচারপতি নিজামুল হক বলেন,  আমি এবং অপর বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির মনে করি আগামী কাল সোমবার ১৩ মার্চ চার্জশিট বিষয়ে শুনানীর জন্য ধার্য্য করা উচিত পুনরায় । কিন্তু বিচারপতি  একেএম জহির আহমেদ মনে করেন আবেদন সরাসরি বাতিল করে দেয়া উচিত  এবং  আগামী কাল চার্জ ফ্রেমিংয়ের জন্য ধার্য্য করা  উচিত।
তিনজনের দুজন যেহেতু আগামীকাল চার্জ হেয়ারিংয়ের জন্য ধার্য্য করা বিষয়ে একমত হয়েছি তাই আগামীকাল চার্জ শুনানীর জন্য ধার্য্য করা হল।
এরপর বিচারপতি জহির আহমেদ  বেঞ্চ অফিসারকে ডেকে আদেশ লেখার জন্য ডিকটেট করেন । তিনি বলেন,  আমি মনে করে তাদের আবেদনের পক্ষে ন্যূনতম সম্মান দেখিয়ে আসামী পক্ষের কাউকে না কাউকে আসা উচিত ছিল ।

আদেশ লেখার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম বলেন, বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারনে তারা আসতে পারেনি  এ কথাটি বাদ দেয়া হোক।
তখন বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, এ ঘটনাতো সব সময় ঘটেনা। আজ যদি সব কিছু স্বাভাবিক থাকত এবং তারা না আসতেন তাহলে এক কথা ছিল। কিন্তু একদিন যখন প্রশ্ন উঠবে কেন তারা আসতে পারেনি এবং কেন এটি স্বাভাবিকভাবে নেয়া হল তখন এর উত্তর কি হবে? তাই এটি উল্লেখ করা হল।

তখন রাষ্ট্রপক্ষের অপর আরেক আইনজীবী বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কথাটি বাদ দিয়ে যানবাহন সমস্যার কথাটি লেখা হোক। ট্রাইব্যুনাল বলেন, বিবেচনা করা হবে।  প্রসিকিউটর সাইফুল ইসলাম বলেন, কেউ কোথাও যে যাতায়াত করতে পারছেনা  বিষয়টি সেরকম নয়। মানুষ চলাফেরা করছে।

ট্রাইব্যুনালের প্রশ্ন দলের আমীর কমান্ডার ও সুপিরিয়র অফিসারের আওতায় পরে কিভাবে

মেহেদী হাসান, ৬/৩/১২
অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দায়ের করা চার্জশিটের ওপর আজ আর্গুমেন্ট পেশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।   অধ্যাপক গোলাম আযমের নেতৃত্বে, নির্দেশে এবং প্রত্যক্ষ মদদে পাক বাহিনী ও সহযোগী বাহিনী  ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে  মর্মে যুক্তি তুলে ধরেন তারা। এসময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে বলেন,  অধ্যাপক গোলাম আযম  তখন জামায়াতের আমীর ছিলেন । তার সুপিরিয়র স্টাটাস প্রমানের জন্য আর কিছু কি দরকার আছে?

এ বিষয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে  ট্রাইব্যুনালের অপর বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমকে প্রশ্ন করেন, আমাদের আইনে এনি কমান্ডার বা সুপিরিয়র অফিসারের কথা বলা আছে।  অধ্যাপক গোলাম আযম ছিলেন জামায়াতের আমীর। দলের আমীর হিসেবে তিনি কমান্ডার বা সপিরিয়র অফিসারের মধ্যে পরে কিভাবে বুঝিয়ে বলেন।

জেয়াদ আল মালুম তখন  বলেন, সামরিক বা বেসামরিক বিষয় নয়। কি অপরাধ সেটা বিষয়। কমান্ডার বা সুপিরিয়র কমান্ডার  শুধু আর্মড রেজিমেন্টের ক্ষেত্রে বোঝায় না। সামরিক বেসামরিক সবাইকে বোঝায়।  তিনি এ বিষয়ে জাতিসংঘের আইনের উদাহরন পেশ করেন। তখন বিচারপতি এটিএম ফজলে কবরি বলেন, আপনি বলতে চাইছেন বেসামরিক লোকও কমান্ডার বা সুপিরিয়র কমান্ডারের আওতায় পড়েব? জেয়াদ আল মালুম এবং রাষ্ট্রপক্ষের অন্য প্রসিকিউটররা তখন হ্যা সূচক জবাব দেন।

(যুদ্ধাপরাধ বিচারের লক্ষ্যে প্রণীত ১৯৭৩ সালের আইনের ৪ (২) ধারায় বলা হয়েছে “কোন  কমান্ডার বা  উর্দ্ধতন কর্মকর্তার আদেশ,  অনুমতি,  সম্মতি বা অংশগ্রহনের মাধ্যমে সেকশন -৩ ধারায় বর্ণিত অপরাধ সংঘটিত হয় অথবা এ ধরনের অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনা ও কর্মকান্ডের  সাথে জড়িত থাকে,  অথবা যদি তিনি তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে এবং শৃঙ্খলা রক্ষায়  ব্যর্থ হন  অথবা তার অধীনস্তদের অপরাধ দমনে ব্যর্থ হন এবং তার অধীনস্তরা যদি এ ধরনের অপরাধ করে থাকে,  অথবা যদি অপরাধ দমনে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন তাহলে তিনি অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হবেন। )

গোলাম আযমকে বাসা থেকে খাবার দেয়া যাবে
অধ্যাপক গোলাম আযমকে বাসায় রান্না করা খাবার সরবরাহ করা যাবে। আজ ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়ে আদেশ দেন।
১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত ১১ জানুয়ারি থেকে অধ্যাপক গোলাম আযম বন্দী আছেন  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যালে বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেলে। অধ্যাপক গোলাম আযমের স্ত্রী সৈয়দা আফিফা আযম এর আগে কারা  এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে দরখাস্ত করেন তাকে বাসা থেকে রান্না করা খাবার সরবরাহের আবেদন জানিয়ে। কিন্তু তার সে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। অবশেষে ট্রাইব্যুনালে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি আবেদন জানানোর পর শুনানী শেষে গতকাল এ আদেশ দেয়া হয়।
অধ্যাপক গোলাম আযমের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  আদালতে বলেন, গোলাম আযমের বয়স প্রায় ৯০ বছর। তিনি নানাবিধ রোগে আক্রান্ত। এ অবস্থায় তিনি হাসপাতাল থেকে  সরাবরাহ করা
খাবার ঠিকমত খেতে পারছেননা। ফলে  তার স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে  ওজন কমে যাচ্ছে।  তার মত বয়স্ক একজন লোকের বিশেষ যত্ম দরকার এবং  বাসা থেকে বিশেষ খাবার সরবরাহ করা দরকার । 

ট্রাইব্যুনাল তার আদেশে বলেন, অধ্যাপক গোলাম আযমের বয়স, অসুস্থতা বিবেচনা করে তাকে বাসা থেকে রান্না করা খাবার দেয়া যেতে পারে। অভিযুক্ত হননি এরূপ বন্দীর ক্ষেত্রে বাসা থেকে খাবার সরাবরাহ বিষয়ে আইনে কোন বাঁধা নেই। ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, তবে বাসার খাবার খাওয়ার পর তার স্বাস্থ্যের অবনতি হলে তার দায়দায়িত্ব হাসাপাতাল বা কারা কর্তৃপক্ষ নেবেনা।
তখন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, যেকোন মানুষ যেকোন সময় অসুস্থ হতে পারে বাসার খাবার খেয়েও। বাসায় অবস্থানকরা মানুষও অসুস্থ হয়।  একই মানের ভাল  খাবার খেয়ে  কারো পেটে সমস্যা হতে পারে আবার কারো কোন সমস্যা নাও হতে পারে। তাই  আদেশটি একটু পরিবর্তন করা হোক। তখন এ শর্ত নমনীয় করা হবে মর্মে আদালত আশ্বাস দেন।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যনা বিচারপতি নিজামুল হক অপর দুই বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির ও বিচারপতি একেএম জহির আহমেদ এর উপস্থিতিতে এ রায় দেন।

বাংলা নিউজের ওপর ক্ষোভ: গত রোববার ‘বুড়ো ঘোড়ায় দামি রেস, প্রসিকিউটরদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ’ শীর্ষক একটি খবর প্রকাশিত হয়। আজ  আদালতের কার্যক্রম চলাকালে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক ক্ষোভের সাথে বলেন, বাংলা নিউজের জাকিয়া হোসেন আছেন?  জাকিয়া হোসেন উঠে দাড়ালে তিনি  বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, আপনি সামনে আসেন। জাকিয়া হোসেন সামনে গেলে বিচারপতি নিজামুল হক তাকে অনেকটা ধমকের সাথে  জিজ্ঞেস করেন এই হেডলাইন কে লিখেছে? জাকিয়া বলেন, অফিসের লোক দিয়েছে। বিচারপতি নিজামুল হক ক্ষোভের সাথে  বলেন, অফিসের লোক  ডাকব?
এরপর বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, উই আর সরি টু সে দ্যাট দি হেলাইন ওয়াজ ভেরি মাচ রং। হেডলাইন ঠিক হয়নি। আপনার রিপোট ভাল হয়েছে। রিপোর্টে সমস্যা নেই। কিন্তু হেলাইন ঠিক হয়নি। ট্রইব্যুনালের  জাজ, প্রসিকিউটর এবং ডিফেন্সের মর্যাদা রক্ষা করে হেডলাইন লিখবেন।

এদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার চার্জ হেয়ারি আগামীকাল শুরু হবার কথা রয়েছে।