রাজাকার থেকে যুদ্ধাপরাধী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রাজাকার থেকে যুদ্ধাপরাধী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৯ মে, ২০১৩

রাজাকার থেকে যুদ্ধাপরাধ// পর্ব-৭//উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ১৯৭৪ সালের ত্রিদেশীয় দিল্লী চুক্তি

মেহেদী হাসান
১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ভারত এবং পাকিস্তানেবর মধ্যে  ত্রিদেশীয় দিল্লী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।   চুক্তি অনুযয়ী বাংলাদেশে  ১৯৭১ সালের যুদ্ধে  গণহত্যা,   মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং  যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তাকে ক্ষমা করে বাংলাদেশ।  চুক্তিতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের বেদনায়ক  ঘটনার কারণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কাছে  ‘ক্ষমা কর এবং ভুলে যাও’ আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ তাদের বিচার না করে   ক্ষমা করে দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে  ভারতে আটক ৯২ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যসহ ৩০ লাখের উপরে বেসামরিক নাগরিক তখন তিন দেশে  আটকা পড়ে ছিল ।  ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পরপরই ১৯৭২ সালে ভারত- পাকিস্তানের মধ্যে সিমলা চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং চুক্তিতে   দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং  সম্প্রীতি  স্থাপনে সব ধরণের প্রতিশ্রুতির কথা ব্যক্ত করা হয় উভয় দেশের পক্ষ থেকে।   কিন্তু তার কোনটিই বাস্তবায়ন সম্ভব হয়না  বাংলাদেশকেন্দ্রিক যুদ্ধউত্তর সমস্যার সমাধান না হওয়ায় । যুদ্ধউত্তর সমস্যার সমাধান এবং তা নিয়ে তিন দেশের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিরসনে ১৯৭২ সাল থেকে  দফায় দফায় আলোচনাসহ নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয় এবং সবশেষে তা পূর্ণতা পায়  ১৯৭৪ সালের  ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে।  চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর দিল্লী, ইসলামাবাদ এবং ঢাকা থেকে তা  একযোগে প্রকাশ করা হয়।  ১৬ দফার  সেই চুক্তিটি এখানে অনুবাদ  তুলে ধরা হল। অনুবাদ : লেখক।


(১)     ১৯৭২ সালের ২ জুলাই ভারতের  প্রধানমন্ত্রী  এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের মধ্যে ঐতিহাসিক সিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।  উপমহাদেশে শান্তি এবং সমৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে  বিদ্যমান  দ্বন্দ্ব সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে পারষ্পরিক বন্ধুত্ব এবং সম্প্রীতি জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। এছাড়া এই চুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে যেকোন  বিবদমান বিষয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে  পারষ্পরিক তথা দ্বিপাক্ষিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে। 

(২)    বাংলাদেশের পক্ষ থেকে  সিমলা চুক্তিকে স্বাগত জানানো হয়েছে।  উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে প্রতিবেশী দেশদুটির মধ্যে  সমঝোতা চুক্তিকে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জোরাল সমর্থন জানান।

(৩)     ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ফলে যে মানবিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তা উপমহাদেশে বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে।  বাংলাদেশ  একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে তখনো ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে না পারায়  যুদ্ধউত্তর মানবিক সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছিলনা। এ সমস্যা সমাধানে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হিসেবে ভারত এবং পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছিল সবেচেয়ে বেশি  জরুরি।   বাংলাদেশকে নিয়ে ত্রিদেশীয় বৈঠক অনুষ্ঠানে প্রধান অন্তরায় ছিল পাকিস্তান কর্তৃক  বাংলাদেশকে তখনো একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়া।

(৪)      বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে আটকে পড়া দুই দেশের লক্ষ লক্ষ নাগরিকের প্রত্যাবর্তন এবং ভারতে আটক ৯২ হাজার সৈন্য ফেরত পাঠানোসহ নানাবিধ মানবিক সমস্যা সমাধানে ভারত এবং বাংলাদেশ একটি  জোরাল উদ্যোগ নেয় ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল।  এজন্য বাংলাদেশকে স্বীকৃতিজনতি  রাজনৈতিক সমস্যাকে  আপাতত পাশে সরিয়ে রাখা হয়। ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল দুই দেশের পক্ষ

থেকে একটি যৌথ ঘোষনা দেয়া হয়। তাতে বলা হয়, উপমহাদেশে উত্তেজনা কমিয়ে স্থায়ী  শান্তি ও সমৃদ্ধির  লক্ষ্যে দুই দেশ বন্ধুত্ব এবং সম্প্রীতি বজায় রেখে কাজ করে যাবে। দুই দেশ থেকে প্রস্তাব করা হয় যে, আটককৃত এবং আটকে পড়া  নাগরিকদের স্ব স্ব দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখা উচিত। তবে  বন্দী ঐসব পাকিস্তানী সৈন্য, যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ আছে তাদের বাংলাদেশে বিচারের  প্রয়োজন হতে পারে তাদের  ক্ষেত্রে এই মানবিক দৃষ্টিকোনের বিষয়টি প্রযোজ্য হবেনা।

(৫)    এই ঘোষনার আলোকে ভারত-বাংলাদেশ এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক  চলে।    বৈঠক শেষে ১৯৭৩ সালের ২৮ আগস্ট একটি সমঝোতায় আসে দেশ তিনটি। এবং  বাংলাদেশের সম্মতির  ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে  একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়  বিদ্যমান মানবিক সমস্যা সমাধানে।

(৬)      এই সমঝোতার ফলে ১৯৭৩ সালের  ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দেশের মধ্যে আটকে পড়া এবং বন্দী প্রত্যর্পন শুরু হয়। প্রায় ৩০ লাখ নাগরিক  তাদের স্ব স্ব দেশে ফেরার সুযোগ পায় তখন।   এর ফলে তিন দেশের মধ্যে  বিরাজমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং উপমহাদেশে শান্তির পথে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

(৭)     ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ায়    একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে সাথে নিয়ে তিনদেশের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পথ সুগম হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন, ভারতের বিদেশমন্ত্রী শরন সিং এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ আহমেদ সমমর্যাদা নিয়ে  ৫ এপ্রিল থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দিল্লীতে  বৈঠক করেণ এবং বৈঠকে তিন দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের অন্তরায় নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিশেষ করে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্বসহকারে স্থান পায়। এছাড়া পাকিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশী এবং বাংলাদেশ ও ভারতে  আটকে পড়া পাকিস্তানীদের স্ব স্ব দেশে ফেরত পাঠানোর চলমান প্রকৃয়া নিয়েও আলোচনা করা হয়। 

(৮)     ১৯৭৩ সালের ২৮ আগস্টের দিল্লী সমঝোতার আলোকে তিন দেশে আটকে পড়া নাগরিকদের স্ব স্ব দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি তিন মন্ত্রী  মূল্যায়ন করেণ এবং বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ শেষ  পর্যায়ে চলে আসায় তারা সন্তোষ প্রকাশ করেণ।

(৯)      আটকে পড়া জনগোষ্ঠীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বাকী কাজ দ্রুত এবং সন্তোষজন উপায়ে শেষ করতে আরো কিছু পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে একমত পোষন করেণ তিন  মন্ত্রী।

(১০)    ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয় ভারতে বন্দী এবং আটকে পড়া  বাদবাকী সৈন্য  ও নাগরিকদের  দিল্লী চুক্তির অধীনে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হবে।  ১৯৭৪ সালের এপ্রিলের মধ্যেই এ প্রত্যাবাসন কাজ শেষ করার ঘোষনা দেয়া হয়।  দুই দেশের মধ্যে চলমান ট্রেনে করেই একদিন পরপর  বাকী সাড়ে ৬ হাজার সৈন্য ও বেসামরিক নাগরিক পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। 

(১১)     পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয় পাকিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশীদের ফেরত পাঠানোর কাজ প্রায় শেষের পথে। বাকীদেরও শান্তিপূর্ণভাবে ফিরিয়ে আন  হবে।

(১২)    পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয় সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত,  কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে  চাকরি রত,  অথবা অন্য কোন কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের  যেসব নাগরিক  বাংলাদেশে আটকে পড়েছে তাদের পাকিস্তানে ফেরত আনার জন্য ছাড়পত্র প্রদান করা হয়েছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয় প্রথম তিন ক্যাটাগরিতে যারা পড়বে তারা সংখ্যায় যতই হোক সবাইকে ছাড়পত্র দেয়া হবে। যাদের দরখাস্ত বাতিল করা হবে সে বিষয়ে  তাদেরকে এর কারণ জানিয়ে ব্যাখ্যা দেয়া হবে। যাদের আবেদন গ্রহণ করা হবেনা তাদের  আপীল করার সুযোগ  পরবর্তীতে খোলা থাকবে।  এ জন্য কোন নিদির্ষ্ট সময় বেঁধে দেয়া হবেনা। পরবর্তীতে এ জাতীয় আবেদনের সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌছবে।

(১৩)     উপমহাদেশে  শান্তি এবং সমৃদ্ধির লক্ষ্যে  এবং তিন দেশের মধ্যে  আশু বন্ধুত্বপূর্ণ  সম্পর্ক ও সম্প্রীতি স্থাপনের লক্ষ্যে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়টি  নিয়ে তিন দেশের তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী  আলোচনা করেণ।  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বৈঠকে বলেন যে, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক আইন, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যাজনিত অপরাধ বিষয়ে যত আইন আছে তার সবগুলোর বিবেচনাতেই ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্য অপরাধী । ঐসব আইনে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যার সংজ্ঞায় যেসব অপরাধের নাম আছে এবং যারা ঐসব অপরাধ করবে তাদের যথাযথ আইনী প্রকৃয়ায়  বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে সারা বিশ্ব সর্বসম্মতভাবে একমত। আর ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্য ঐসব আইনে বর্ণিত অনেক অপরাধ করেছে।  পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব ঘটনাকে তার  সরকার কঠোরভাবে নিন্দা জানায়  এবং এ জাতীয় অপরাধ হয়ে থাকলে তার জন্য পাকিস্তান গভীরভাবে অনুতপ্ত।


(১৪)    তিন মন্ত্রী একমত হন যে,  উপমহাদেশে শান্তি ও অগ্রগতির স্বার্থে তিন দেশের মধ্যে যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে তার আলোকেই ১৯৫ জন সৈনিকের বিষয়টি  বিবেচনা করা উচিত। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর  আমন্ত্রনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শীঘ্রই বাংলাদেশ ভ্রমনে যাবার ঘোষনা দিয়েছেন  এবং   আপনার দেশের নাগরিকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার  আবেদন জানাবেন । একইভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী  পাকিস্তানীদের  প্রতি ক্ষমা  প্রার্থনার  আহবান জানিয়ে ঘোষনা দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের মানুষ   ক্ষমা করতে  জানে।  তাই নতুন করে আবার সবকিছু শুরু করার জন্য ১৯৭১ বাংলাদেশে যে   বর্বরতা এবং  ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ হয়েছে তা তিনি তার দেশের নাগরিকদের ভুলে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

(১৫)   ‘ক্ষমা করো এবং ভুলে যাও’  বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এই আবেদন এবং মনোভাবের  প্রেক্ষিতে  বাংলাদেশ সরকার ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধপারাধীর বিচার  না করে  ক্ষমা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে  বলে ঘোষনা করেণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।   অত:পর দিল্লী সমঝোতার আলোকে অন্যান্য যুদ্ধবন্দীদের সাথে এই ১৯৫ জন সেনাকর্মকর্তাদেরও  ভারত হতে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। 

(১৬)  ১৯৭১ সালের যুদ্ধউত্তর মানবিক সমস্যা সমাধানে  তিন দেশের এসব  চুক্তি এবং সমঝোতা ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে তিনমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেণ। তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী   একমত প্রকাশ করে বলেন যে, তিন দেশের দেশের ৭০ কোটি মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন এবং উপমহাদেশে শান্তি ও  অগ্রযাত্রার পথে তিনটি  দেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে মিলে মিশে কাজ করে যাবে। 

চুক্তিতে স্বাক্ষর করেণ:
ড. কামাল হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাংলাদেশ সরকার
সরদার শরণ সিং, বিদেশমন্ত্রী, ভারত সরকার
আজিজ আহমেদ, পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, পাকিস্তান সরকার।

সোমবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৩

রাজাকার থেকে যুদ্ধাপরাধ//পর্ব৬-বাংলাদেশে প্রথম সংবিধান সংশোধন করা হয় যুদ্ধাপরাধ বিচারকে কেন্দ্র করে

মেহেদী হাসান
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের  লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে ১৮ জুলাই সংসদের একটি আইন পাশ হয়। এর নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস (ট্রাইবিউনালস ) এ্যাক্ট ১৯৭৩’। আইনটি পাশের জন্য বাংলাদেশের সংবিধানের  সংশোধন করতে হয়েছিল। আইনটি পাশ হয় ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই। এর তিনদিন আগে ১৫ জুলাই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রথমবারের মত সংশোধন করা হয়। একটি আইন পাশ করতে সংবিধানে সংশোধনী আনার প্রয়োজন হয়েছিল কেন?

যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে এ পর্যন্ত দেশী বিদেশী যেসব সংস্থা এবং  আইনজ্ঞ  মতামত প্রদান করেছেন তাদের মতে ১৯৭৩ সালের আইনে এমন কিছু ধারা আছে যা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক।  সংবিধানে যে সর্বজনীন মৌলিক মানাবধিকারের ঘোষনা রয়েছে তা   ৭৩ সালের আইনে রহিত করা হয়েছে। সেজন্য ৭৩ সালের আইন পাশ এবং আইনটিকে সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানে সংশোধনী আনতে হয়েছিল। সংবিধান সংশোধন করে ৪৭ (ক) ও ৪৭ (৩ ) নামে দুটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়।  সংবিধান এবং আইনবিশেষজ্ঞদের মতে  এই ধারা দুটি সয়ং সংবিধানের ৩৫, ৩১, ৩৩ এবং ৪৪ ধারা   এবং সংবিধানের  মূল চেতনার পরিপন্থী ও সাংঘর্ষিক।  সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে মানবাধিকার বিষয়ক সংবিধানের বেশ কিছু ধারা অকার্যকর ঘোষনা করা হয়।

আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ স্টিভেন কে কিউসি, টবি ক্যাডম্যান,   বিচারপতি মাইকেল বেলফ,   বিশ্বে আইনজীবীদের সবচেয়ে বড় সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশন (আইবিএ), হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আরো বিভিন্ন  মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সংস্থা এবং আইনবিদদের মতে ১৯৭৩ সালের আইনে বাংলাদেশের সংবিধানে ঘোষিত কিছু মৌলিক অধিকার রহিত করা হয়েছে।  ৭৩ সালের  আইনে এমন কিছু ধারা আছে যা বাংলাদেশের সংবিধান এবং প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার সাথে সাংঘষিক। সেজন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে প্রণীত এ আইনকে যাতে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে না পারে এবং  আইনের অসাংবিধানিক  ধারাগুলোকে সুরক্ষার জন্য সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। 

কী আছে প্রথম সংবিধান  সংশোধনীতে?
সংবিধানে নতুনভাবে সংযোজিত  ৪৭ (৩) ধারায় বলা হয়েছে “ এই সংবিধানে যাহা বলা
হইয়াছে তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবাতা বিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক  আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা  বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক ফৌজদারীতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধান সংবলিত কোন
আইন বা আইনের বিধান সংবিধানের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য বা পরিপন্থী, এই কারণে বাতিল বা বেআইনী বলিয়া  গণ্য হইবেনা  কিংবা কখনো বাতিল বা বেআইনী হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবেনা।”

নতুভাবে সংযোজিত ৪৭ (ক) এ ১ ও ২ নামে দুটি উপধারা রয়েছে। ৪৭ ক (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে  “এই সংবিধানে যাহা বলা হাইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের  (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়,  এই সংবিধানের  অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবেনা।”

৪৭ ক (১) ধারায় বলা হয়েছে “যে বক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) ধারায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়, সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ, ৩৫ অনুচ্ছেদের (১) ও (৩) দফা, এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের অধীনে নিশ্চয়কৃত অধিকারসমূহ প্রযোজ্য ইবেনা। ”

বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে  বলা হয়েছে “অপরাধের দায়যুক্ত কর্মসংঘটনকালে বলবৎ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবেনা  এবং অপরাধ সংঘটনকালে বলবৎ সেই আইনবলে যে দন্ড দেওয়া যাইতে পারিত, তাহাকে তাহার অধিক বা তাহা হইতে ভিন্ন দণ্ড দেওয়া যাইবেনা।”
অর্থাৎ পূর্বে সংঘটিত অপরাধের জন্য পরে আইন করে শাস্তি দেয়া যাবেনা। সংবিধানের এই ৩৫ ধারাসহ  ৩১, ৩৩ এবং ৪৪ ধারায় বর্ণিত আরো কিছু মৌলিক  রহিত করা হয়েছে ১৯৭৩ সালের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে।

বিশেষজ্ঞদের মতে  সংবিধানে ৪৭ (ক) অনুচ্ছেদ সংযোজনের ফলে জুডিশিয়াল রিভিউর অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধের জন্য গঠিত আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যেতে পারবেনা অভিযুক্ত ব্যক্তি।    বাংলাদেশ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বিষয়ে যে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করা হয়েছে তাতে এই  জুডিশিয়াল রিভিউকে সংবিধানের মূল কাঠামো হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর  এই জুৃডিশিয়াল রিভিউর বিধান রাখা হয়নি ১৯৭৩ সালের আইনে। এছাড়া সংবিধান সংশোধন করে ১৯৭৩ সালের আইনকে প্রটেকশন দেয়ার ফলে ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিচারক নিয়োগ এবং রায় নিয়ে কোন আদালতে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবেনা।
যুক্তরাজ্য রানীর সাবেক কাউন্সেলর এবং  বিচারপতি মাইকেল জে বেলফ ১৯৭৩ সালের আইনে জুডিশিয়াল রিভিউ’র ক্ষমতা খর্ব করে  সংবিধানে যে প্রটেকশন দেয়া হয়েছে তাকে অসাংবিধানিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
যুগোশ্লাভিয়া এবং  রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনজীবী, যুক্তরাজ্যের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ স্টিভেন  কিউসি  বলেন,  ১৯৭৩ সালের আইন এবং এ আইনকে সুরক্ষার জন্য যে সংবিধান সংশোধন করা হল তার মাধ্যমে এই প্রথমবারের মত বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ‘অসাম্য’  প্রবর্তন করা হল।
১৯৭৩ সালের সংবিধানে নতুনভাবে সংযোজিত ৪৭  ক (১) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে  সংবিধানে অন্যান্য যেসব মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে তাও কেড়ে নেয়া হয়েছে  নির্দিষ্ট কিছু 

লোকের ক্ষেত্রে। যুদ্ধাপরাধের বিচার যাতে কেউ উচ্চ আদালতে  চ্যালেঞ্জ করতে না পারে তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে সংবিধানের এসব  ধারা সংযোজনের মাধ্যমে।
 ১৯৭৩ সালের সংবিধানে প্রথম যে সংশোধনী আনা হয়েছে তা যে বাংলাদেশের সযং ঐ সংবিধানেরই বিরোধী তা বোঝাতে স্টিভেন  ১৯৭২ সালের সংবিধানের  কয়েকটি ধারা উদাহরণ হিসেবে তুরে ধরেণ। যেমন , সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ২৭ অনুচ্ছেদে ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’ শিরোনামে  মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে পুনরায় উল্লেখ করে বলা হয়েছে “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।”
২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসামাঞ্জস্য  সকল  প্রচলিত আইন যতখানি অসামাঞ্জস্যপূর্ণ , এই সংবিধান প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হাইয়া যাইবে (১) । রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসামাঞ্জস্যপূর্ণ কোন  আইন প্রনয়ন  করিবেন না  এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত  যতখানি অসামাঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হাইয়া যাইবে (২)।
স্টিভেন বলেন, তথাপি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সংবিধানে যে প্রথম সংশোধনী আনা হয়  তাতে  সকল নাগরিক সমান- সাম্যের এই   আকাঙ্খা   রহিত করা হয়েছে।


পূর্বের  অপরাধের বিচার পরে আইন করে করা যায়না
বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে  বলা হয়েছে “অপরাধের দায়যুক্ত কর্মসংঘটনকালে বলবৎ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবেনা  এবং অপরাধ সংঘটনকালে বলবৎ সেই আইনবলে যে দন্ড দেওয়া যাইতে পারিত, তাহাকে তাহার অধিক বা তাহা হইতে ভিন্ন দণ্ড দেওয়া যাইবেনা।”
অর্থাৎ পূর্বে সংঘটিত অপরাধের জন্য পরে আইন করে শাস্তি দেয়া যাবেনা। অপরাধ সংঘটনের সময় বিদ্যমান আইনে যে শাস্তির বিধান থাকে পরে আইন করে তার চেয়ে বেশি শাস্তি দেয়া যায়না। সারা বিশ্বে আইনের মূলনীতি এটি।  বাংলাদেশের সংবিধানেও   নিশ্চয়তা রাখা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৩ সালের সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ৩৫ ধারায় ঘোষিত এ নিশ্চয়তা  অকার্যকর  ঘোষনা করা হয়েছে। কারণ অপরাধ সংঘটন হয়েছে ১৯৭১ সালে। আর অপরাধের বিচারের জন্য আইন করা হয়েছে ১৯৭৩ সালে। পূর্বের অপরাধ পরে  আইন করে বিচারের সুযোগ রাখার জন্য এ সংশোধনী আনা হয়।  আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতি বিরোধী এটি।

যেমন জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০০২ সাল থেকে কার্যকর হয়েছে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত বা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) ।  এ আদালতে ২০০২ সালের পূর্বে সংঘটিত কোন অপরাধের বিচার করা যাবেনা। ২০০৯ সালের  ডিসেম্বর মাসে আইসিসির প্রধান বিচারপতি স্যাং হুন সং বাংলাদেশ সফরের সময় বলেছেন, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা এবং সে সুযোগও নেই।  সরকারকে ডিঙ্গিয়ে ৩৮ বছর আগের বিষয় নিয়ে কাজ করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পরেনা।


এই সাইটের যেকোন লেখা, তথ্য উপাত্তা যেকেউ ব্যবহার, পুনমুদ্রন, পুন প্রচার, প্রকাশ করা যাবে; তবে শর্ত হল সূত্র হিসেবে Mehedy Hasan https//www.bangladeshwarcrimestrial.blogspot.com  উল্লেখ/লিঙ্ক  করতে হবে।


রবিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৩

রাজাকার থেকে যুদ্ধাপরাধ//পর্ব৫-দালাল আইনে সাজাভোগকারীর কি আবার বিচার হবে?

মেহেদী হাসান
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে  এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের জন্য  দালাল আইন প্রণয়ন করা হয়। স্বাধীনতা লাভের দেড় মাসের মধ্যে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ কোলাবোরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার নামে এ দালাল আইন  প্রণয়ন করা হয়। 

দালাল আইন প্রণয়নের সাথে সাথে সারা দেশে তখন ব্যাপক ধরপাকড় এবং  গ্রেফতার অভিযান  শুরু হয়ে যায়। ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৪১ হাজার দালাল গ্রেফতার হবার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মান্নান (৪ অক্টোবর, দৈনিক বাংলা) ।  তখনকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুল মালেক উকিল কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখা যায়  দালাল আইনে  লক্ষাধিক লোক গ্রেফতার  হয়।  তার মধ্যে ৩৭ হাজার ৪৭১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। অভিযুক্ত এ ৩৭ হাজারের মধ্য থেকে  ৩৪ হাজার ৬২৩ জনের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী প্রমান না থাকায় কোন মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়নি। ২ হাজার ৮৪৮ জনকে বিচারের জন্য সোপর্দ করা হয়। বিচারে ৭৫২ জনের শাস্তি হয় এবং বাকী এক লাখ বন্দীদের  বেকসুর  খালাস দেয়া হয়।

সারা দেশে ব্যাপকভাবে দালাল আইনে ধরপাকড়ের ফলে সদ্য স্বাধীন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে একটা  অস্থির পরিবেশ  সৃষ্টি হয়। ধরপাকড়দের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লোক থাকায় সরকারি কাজকর্মেও বিশৃংখলা এবং নৈরাজ্য দেখা দেয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরোধীতা করছে কিন্তু কোন অপরাধমূলক কাজে অংশ নেয়নি এমন  লোকদেরও বিভিন্ন  মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে গ্রেফতার চলতে থাকে। অসংখ্য লোক গ্রেফতার এড়াতে  আত্মপোগন করে। সব মিলিয়ে দেশে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যা একটি সদ্য স্বাধীন দেশ গড়ার পক্ষে বিরাট অন্তরায় হয়ে দেখা দেয়। নতুন করে হানাহানি, বিভক্তি, অনৈক্য এবং প্রতিহিংসা মাথচাড়া দিয়ে ওঠে।  বিভিন্ন মহল থেকে দালাল আইনের বিরুদ্ধে কথা ওঠে এবং এ আইন সংশোধনের  প্রস্তাব দেয়া হয়। এমনি পরিস্থিতিতে  আসে সাধারণ ক্ষমার বিষয়। দেশের সকল অনৈক্য বিভক্তি,  সন্দেহ মুছে ফেলে সবাইকে  একতাবদ্ধ হয়ে দেশ গড়ার কাজে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করেন।
১৯৭৩ সালের পয়লা ডিসেম্বর দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় এ বিষয়ে পরিবেশিত  খবরে বলা  হয় “সরকার দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত এবং বিচারাধীন সকল আটক ব্যক্তির প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করেছেন। তবে ধর্ষণ, হত্যা, অগ্নিসংযোগের অভিযোগে যারা সাজা ভোগ করছে কিংবা বিচারাধীন রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এ ক্ষমা প্রদর্শণ কার্যকর হবেনা। তৃতীয় বিজয় দিবস উৎসবে যাতে তারা শরীক হতে পারে সেজন্য ১৬ ডিসেম্বরের আগেই শেখ মুজিবুর রহমান তাদের মুক্তির ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র   মন্ত্রণালয়কে। যারা পলাতক তারা আদালতে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেই এ ক্ষমার আওতায় পড়বে।”
 ”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের নেতৃবৃন্দ বলছেন, বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করলেও হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সাথে জড়িতদের ক্ষমা করা হয়নি।  একথা সত্য। সাধারণ ক্ষমা ঘোষনায় বলা হয়েছে “ ধর্ষণ, হত্যা, অগ্নিসংযোগের অভিযোগে যারা সাজা ভোগ করছে কিংবা বিচারাধীন রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এ ক্ষমা প্রদর্শণ কার্যকর হবেনা।” তার মানে এসব অপরাধে অভিযুক্তদের তখন বিচার হয়েছে।  বিচারে কেউ সাজা ভোগ করেছ আর কেউ  অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছে।  তাহলে নতুন করে কি  আবার তাদের বিচার করা হবে যারা এসব অভিযোগে একবার বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন এবং সাজা ভোগ করেছেন অথবা অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছেন? যাদের বিরুদ্ধে  এসব অভিযোগের কোন প্রমান পাওয়া যায়নি    অর্থাৎ শুধুমাত্র পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করা হয়েছে।  কাউকে সাধারণ ক্ষমা এবং  গুরুতর অভিযুক্তদের বিচারের মাধ্যমে  বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে ১৯৭৩ সালেই। এরপর ৯১৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিলও করে দেয়া হয়। কারণ সাধারন ক্ষমা ঘোষনা এবং বাকী অভিযুক্তদের বিচার নিষ্পত্তি এবং সাজাভোগের পর এ আইনের আর কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়নি।
বর্তমানে যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হচ্ছে এদের কারো বিরুদ্ধে স্বাধনীতা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধের কোন অভিযোগ করা হয়েছে এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়না। এমনকি দুয়েক জন ছাড়া দালাল আইনেও কারো বিরুদ্ধে কোথাও কোন মামলা হয়নি এমনকি কারো বিরুদ্ধে জিডিরও কোন রেকর্ড নেই। মালেক সরকারের মন্ত্রী সভায় যোগ দেয়ার অভিযোগে  বর্তমানে অভিযুক্তদের  দুয়েকজনের  সাজা হয়েছিল। অথচ  সাজাভোগকারী এসব ব্যক্তিদেরও যুদ্ধাপারধীদের তালিকায় রাখা হয়েছে  ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচারের জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে যেখানে একজন লোক  বিচারের মাধ্যমে সাজা ভোগ করেছেন এবং আদালতের মাধ্যমে অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন  তাকে কি করে আবার একই অভিযোগে অভিযুক্ত করে পুনরায় বিচারের আয়োজন চলতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধে এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের জন্য হয়েছিল দালাল আইন। আর পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারের জন্য হয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) এ্যাক্ট। দুটি আইনের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন । দালাল আইনে এদেশীয় সহযোগীদের বিচার ফয়সালা হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী আইনে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়নি । তাদের সবাইকে ক্ষমা করা হয়।  এখন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের জন্য যে আইন হয়েছিল সেই আইনে এদেশীয় সহযোগীদের  বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একজনের বিচারের জন্য তৈরি আইনের মাধ্যমে অন্য আরেকজনের বিচারের  প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে ।

১৯৭৩ সালের যে আইনে এদেশীয় সহযোগীদের বিচার চলছে সে আইন নিয়ে দেশে এবং বিদেশে চলছে তীব্র সমালোচনার ঝড়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইন এবং মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গ সকলেই অভিমত ব্যক্ত করে বলেছেন ১৯৭৩ সালের ঐ আইন দিয়ে   ন্যায় বিচার সম্ভব নয়।


সাইটের যেকোন লেখা, তথ্য উপাত্তা যেকেউ ব্যবহার, পুনমুদ্রন, পুন প্রচার, প্রকাশ করা যাবে; তবে শর্ত হল সূত্র হিসেবে Mehedy Hasan https//www.bangladeshwarcrimestrial.blogspot.com  উল্লেখ/লিঙ্ক  করতে হবে।




শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৩

রাজাকার থেকে যুদ্ধাপরাধী-৪//১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমার পেক্ষাপট////১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, গণকণ্ঠ এবং সংবাদে যুদ্ধাপরাধ বিষযক প্রকাশিত খবর বিশ্লেষন

মেহেদী হাসান
১৯৫ জন  পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের  দিক থেকে বিবেচ্য বিষয় ছিল  পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের ¯ীকৃতি আদায় এবং  পাকিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশী সামরিক ও বেসামরিক নাগরিকদের ফিরিয়ে আনা। অন্যদিকে  ভারত  তখন পাকিস্তান ভাঙ্গতে পারার আনন্দে বিভোর।  যুদ্ধাপরাধের বিচার  নিয়ে আর বেশি ঘাটাঘাটি  করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে বিজয়কে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ঝুকি নিতে চায়নি  তারা ।  ভারতের সেনাবাহিনী এবং সোভিয়েত উইনয়নও তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পক্ষে ছিলনা।  তাছাড়া পাকিস্তান বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃতি না দেয়ায় পরাজয়ের প্রতিশোধ হিসেবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পুনরায় হামলার আশঙ্কাও  করেছিল ভারত। সর্বোপরি শত্রু রাষ্ট্রে পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে ভারত তখন এক প্রকার  বিরূপ পরিস্থিতির  মুখে পড়ে। সেসময়কার সংবাদপত্রের খবর বিশ্লেষন করলে এসব চিত্র  বেরিয়ে আসে।
পাকিস্তান বাংলাদেশকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত  স্বীকৃতি দেয়নি। পরাজিত  এবং ুব্ধ পাকিস্তান বাংলাদেশকে নিজের দেশ দাবি করে আবার যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিতে পারে এমন আশঙ্কা ছিল ভারত এবং বাংলাদেশ উভয়ের পক্ষ থেকে।
যেমন ১৯৭৩ সালের ২ এপ্রিল দৈনিক বাংলা পত্রিকার একটি  খবরের হেডলাইন “পিন্ডির যুদ্ধ উন্মাদনা এখনো শেষ হয়নি। আবার আঘাত হানতে পারে-  ভারতীয় সমর বিশেষজ্ঞদের অভিমত।”   প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে “ তাদের পক্ষ থেকে এখনো বিপদের আশঙ্কা রয়েছে । ভারতের দুর্বল  স্থানে আঘাত হানতে পারে। চন্ডীগড় থেকে ইউএনআই পরিবেশিত খবরে বলা হয় ফিল্ড মার্শাল মানকেশ আজ এখানে বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতের নিকট পরাজয়কে পাকিস্তান যে এখনো স্বীকার করতে পারেনি সে বিষয়ে তিনি একমত”।
১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল  ঢাকা দিল্লী যৌথ ঘোষনা বলা হয়- উপমহাদেশের বাস্তবতাকে স্বীকৃতিদানে ব্যর্থতার দরুণ  উপমহাদেশে বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির কাজে কোন অগ্রগতি হয়নি। পাকিস্তান এখনো বাংলাদেশের প্রতি শত্রুতা অব্যাহ রেখেছে। ভারতের প্রতিও সে শত্রুতা বহাল রেখেছে। (সূত্র দৈনিক বাংলা ১৮ এপ্রিল)

এমনকি  পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায় ছাড়াই ভারত পাকস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করার পক্ষপাতি ছিল। ১৯৭৩ সালের ২২ জানুয়ারি দৈনিক বাংলা পত্রিকায় এ মর্মে একটি খবর বের হয়। পাকিস্তানী সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎকারে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরন সিং বলেছেন “যদি ভারত-পাকিস্তান বাংলাদেশ সমঝোতা সম্ভব হয় তবে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকতি ছাড়াই যুদ্ধবন্দীদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তন সম্ভব।” অবশ্য নয়াদিল্লীতে অবস্থানরত বাসসের তখনকার প্রতিনিধি আতাউস সামাদের কাছে প্রদত্ত একটি সাক্ষাতকারে শরণ সিং এ কথা  অস্বীকার করেন। ২৪ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় এ খবর প্রচারিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ইন্দিরা গান্ধীর অন্য এক বিবৃেিত শরন সিং যে একথা বলেছিলেন তার সত্যতা ধরা পড়ে। ১৯৭৩ সালের ২৮ মে নয়াদিল্লীতে অস্ট্রেলীয় ব্রডকাস্টিং
করপোরেশনের সাথে সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, “বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনেকখানি ছাড় দিয়েছে। আগে স্বীকৃতি দিতে হবে সে শর্তও বাদ দিয়েছে” ।

যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে ভারতও তখন যে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে তাতে তাদের অবস্থান ছিল ছেড়ে দিতে পারলেই যেন বাঁচি অবস্থা। বিষয়টি সুরাহা করার জন্য মুসলিম বিশ্বসহ অনেক দেশ থেকে তাদের ওপর চাপ আসে।   ভারত বাংলাদেশ মিলে তাদের বিচারের উদ্যোগ নিলে  উপমহাদেশ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং অশান্তির দিকে পা বাড়াবে বলে মনে করে ভারত।

যুদ্ধবন্দীদের বিচারের বিষয়ে বাংলাদেশের সামনে প্রধানত তিনটি সমস্যার উদ্ভব হয়। প্রথমত পাকিস্তান থেকে স্বীকৃতি না পাওয়া, দ্বিতীয়ত পাকিস্তানে আটকে পড়া সামরিক ও বেসামরিক লোকদের ফেরত আনা এবং  তৃতীয়ত সৌদী আরবসহ  মুসলিম বিশ্ব থেকে স্বীকৃতি না পাওয়ার সমস্যা।
পাকিস্তান বাংলাদেশের  জাতিসংঘের  সদস্য হবার বিরুদ্ধে লবিং করছে বলে অভিযোগ করা হয় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে। এছাড়া পাকিস্তানে আটক বাংলাদেশী সেনা সদস্যদের প্রতি নির্মম আচরণের পথ বেছে নেয় পাকিস্তান। ১৯৭৩ সালে ১০ এপ্রিল খবর বের হয়- পাকিস্তান সরকার সেখানে আটক ৫ জন বাঙ্গালী সেনা অফিসারকে গুলি করে হত্যা করেছে। বাংলাদেশ যুদ্ধবন্দীদের বিচার করলে পাকিস্তানও সেখানে আটক বাংলাদেশীদের বিচার করবে বলে হুমকি দেয় ভুট্টো। ১৯৭২ সালে ২ জুলাই  ভারতের সিমলায় তিনি বলেন“ বাংলাদেশে পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌছব যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব হবেনা।
যুদ্ধবন্দীদের বিচারের জন্য ভারত যাতে পাকিস্তানী   সৈন্যদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর  না করে সেজন্য ভারতের কাছে  পাকিস্তান জোরালো লবিং করে আসছিল।
১৯৭৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, “ যুদ্ধাপরাধের দয়ে ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীর পরিকল্পিত বিচার বাতিল করা হইবে এই মর্মে  দৃঢ় আশ্বাসের বিনিময়ে তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করিবেন। এই প্রতিশ্রুতি কেবল বাংলাদেশকই দিতে হইবে এমন কোন কথা নয়। যেকোন দেশ এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।” সূত্র ইত্তেফাক, ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪)।

যুদ্ধাপরাযুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করার বিষয়টি যে ভারতের নিয়ন্ত্রনে ছিল সে বিষয়ে সাবেক সচিব আসাফ্  উদ্দৌলাহ  একটি  প্রবন্ধে লিখেছেন, “১৯৭৪ সালে মে মাসে দিল্লীর রাষ্ট্রপতি ভবনে  যখন মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তখন সেই ঐতিহাসিক সভায় যোগদানের সুযোগ আমার হয়েছিল।...... সে  সময় হঠাৎ করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার সরওয়ান সিং বঙ্গবন্ধুকে বললেন, লাহোরে তার ওআইসির সম্মেলনে যোগদান নিয়ে ভারতের জনমনে কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টি  হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভারত সরকার এরকম একটি সমঝোতায় পৌছায় যে, উভয় সরকার তাদের বৈদেশিক নীতি অনুসরনে একে অন্যের সাথে আলোচনা ও সমন্বয় সাধন করবে। সরওয়ান সিং জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে যোগদান করার বিষয়ে সেই সমন্বয় সাধন হয়নি। বঙ্গবন্ধু এর জবাবে ইন্দিরা গান্ধীকে বললেন, “আমিও তাহলে আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞেস করব। বাংলার জনমানুষকে  আমি জোরগলায় জসসভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম  পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে বাংলার মাটিতেই। অথচ আপনি ও ভুট্টো সিমলায় স্থির করলেন যে, চিহ্নিত ১৯৫ জন সহ সব পাকিস্তানী সৈনিককে বিনা বিচারে পাকস্তানে চলে যেতে দেয়া হবে। আর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হল আমাকে না জানিয়ে।” (সূত্র বিবেচনা ও বিদ্বেষ, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ৮ এপ্রিল ২০১০।

 সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীরে ক্ষমার পক্ষে অবস্থান নেয়।
১৯৭২ সালের ১৯  নভেম্বর  জুলিও কুরি শান্তি পদক লাভ  উপলক্ষে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে  বঙ্গবন্ধু ভুট্টোর উদ্দেশে বলেন  “গণহত্যাকারীরা প্রকাশ্যে মাফ চাও, বাঙ্গালী ক্ষমা করতেও পারে।” এ থেকে বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু তাদের মাফ করার  পক্ষেই ছিলেন। (সূত্র দৈনিক বাংলা ২০ নভেম্বর,৭২) ।


১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার জন্য ত্রিদেশীয় চুক্তি :
১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ভারত এবং পাকিস্তানেবর মধ্যে  ত্রিদেশীয় দিল্লী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।   চুক্তি অনুযয়ী বাংলাদেশে  ১৯৭১ সালের যুদ্ধে  গণহত্যা,   মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং  যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তাকে ক্ষমা করে বাংলাদেশ।  চুক্তিতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের বেদনায়ক  ঘটনার কারণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কাছে  ‘ক্ষমা কর এবং ভুলে যাও’ আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ তাদের বিচার না করে   ক্ষমা করে দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে  ভারতে আটক ৯২ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যসহ ৩০ লাখের উপরে বেসামরিক নাগরিক তখন তিন দেশে  আটকা পড়ে ছিল ।  ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পরপরই ১৯৭২ সালে ভারত- পাকিস্তানের মধ্যে সিমলা চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং চুক্তিতে   দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং  সম্প্রীতি  স্থাপনে সব ধরণের প্রতিশ্রুতির কথা ব্যক্ত করা হয় উভয় দেশের পক্ষ থেকে।   কিন্তু তার কোনটিই বাস্তবায়ন সম্ভব হয়না  বাংলাদেশকেন্দ্রিক যুদ্ধউত্তর সমস্যার সমাধান না হওয়ায় । যুদ্ধউত্তর সমস্যার সমাধান এবং তা নিয়ে তিন দেশের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিরসনে ১৯৭২ সাল থেকে  দফায় দফায় আলোচনাসহ নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয় এবং সবশেষে তা পূর্ণতা পায়  ১৯৭৪ সালের  ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে।  চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর দিল্লী, ইসলামাবাদ এবং ঢাকা থেকে তা  একযোগে প্রকাশ করা হয়। চুক্তিতে মোট   ১৬টি দফা ছিল। 

১৩ দফায় বলা হয় “উপমহাদেশে  শান্তি এবং সমৃদ্ধির লক্ষ্যে  এবং তিন দেশের মধ্যে  আশু বন্ধুত্বপূর্ণ  সম্পর্ক ও সম্প্রীতি স্থাপনের লক্ষ্যে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়টি  নিয়ে তিন দেশের তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী  আলোচনা করেণ।  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বৈঠকে বলেন যে, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক আইন, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যাজনিত অপরাধ বিষয়ে যত আইন আছে তার সবগুলোর বিবেচনাতেই ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্য অপরাধী । ঐসব আইনে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যার সংজ্ঞায় যেসব অপরাধের নাম আছে এবং যারা ঐসব অপরাধ করবে তাদের যথাযথ আইনী প্রকৃয়ায়  বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে সারা বিশ্ব সর্বসম্মতভাবে একমত। আর ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্য ঐসব আইনে বর্ণিত অনেক অপরাধ করেছে।  পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব ঘটনাকে তার  সরকার কঠোরভাবে নিন্দা জানায়  এবং এ জাতীয় অপরাধ হয়ে থাকলে তার জন্য পাকিস্তান গভীরভাবে অনুতপ্ত।

১৪ তম দফায় বলা হয় “তিন মন্ত্রী একমত হন যে,  উপমহাদেশে শান্তি ও অগ্রগতির স্বার্থে তিন দেশের মধ্যে যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে তার আলোকেই ১৯৫ জন সৈনিকের বিষয়টি  বিবেচনা করা উচিত। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর  আমন্ত্রনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শীঘ্রই বাংলাদেশ ভ্রমনে যাবার ঘোষনা দিয়েছেন  এবং   আপনার দেশের নাগরিকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার  আবেদন জানাবেন । একইভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী  পাকিস্তানীদের  প্রতি ক্ষমা  প্রার্থনার  আহবান জানিয়ে ঘোষনা দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের মানুষ   ক্ষমা করতে  জানে।  তাই নতুন করে আবার সবকিছু শুরু করার জন্য ১৯৭১ বাংলাদেশে যে   বর্বরতা এবং  ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ হয়েছে তা তিনি তার দেশের নাগরিকদের ভুলে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

১৫ তম দফায় বলা হয়-   ‘ক্ষমা করো এবং ভুলে যাও’  বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এই আবেদন এবং মনোভাবের  প্রেক্ষিতে  বাংলাদেশ সরকার ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধপারাধীর বিচার  না করে  ক্ষমা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে  বলে ঘোষনা করেণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।   অত:পর দিল্লী সমঝোতার আলোকে অন্যান্য যুদ্ধবন্দীদের সাথে এই ১৯৫ জন সেনাকর্মকর্তাদেরও  ভারত হতে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

চুক্তিতে স্বাক্ষর করেণ: ড. কামাল হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাংলাদেশ সরকার, সরদার শরণ সিং, বিদেশমন্ত্রী, ভারত সরকার এবং আজিজ আহমেদ, পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, পাকিস্তান সরকার।



এই সাইটের যেকোন লেখা, তথ্য উপাত্তা যেকেউ ব্যবহার, পুনমুদ্রন, পুন প্রচার, প্রকাশ করা যাবে; তবে শর্ত হল সূত্র হিসেবে Mehedy Hasan https//www.bangladeshwarcrimestrial.blogspot.com  উল্লেখ/লিঙ্ক  করতে হবে।




রাজাকার থেকে যুদ্ধাপরাধী-৩///বিচার নিয়ে দৃঢ প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও আসল যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করা হয়

মেহেদী হাসান
পাকিস্তানী ১৯৫ জন  সেনা কর্মকর্তার  বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই   ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস (ট্রাইবিউনালস ) এ্যাক্ট  আইন পাশ হয় সংসদে।

কিন্তু ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লীতে  ভারত-পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সাথে জড়িত এসব যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা ঘোষনা করা হয়।  চুক্তির ১৩, ১৪ এবং ১৫ দফায় বলা হয়েছে “পাকিস্তান স্বীয় সামরিক বাহিনীর অপরাধের নিন্দা জ্ঞাপন ও উহার জন্য  গভীর অনুশোচনা ও দুংখ প্রকাশ  করেছে।  ইসলামাবাদ সরকারের এই মনোভাব এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ‘ক্ষমা করো এবং ভুলে যাও’ আবেদনের প্রেক্ষিতে  বাংলাদেশ সরকার ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধপারাধীর বিচার  না করে  ক্ষমা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  অত:পর অন্যান্য যুদ্ধবন্দীদের সাথে তাদেরও ভারত হতে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হবে।  উপমাহাদেশে শান্তি,  স্থিতি এবং অগ্রগতির লক্ষ্যে  এ চুক্তি করা   হয়েছে।”

১৯৭৪ সালের ১২ এপ্রিল  দৈনিক ইত্তেফাক  পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম হল “ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া আমরা বিশ্বের  প্রশংসা অর্জন করিয়াছি-ড. কামাল হোসেন”। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে-“পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বলিয়াছেন,  বাংলাদেশের জনগণের উপর সামরিক বাহিনী যে অত্যাচার করিয়াছে পাকিস্তান সরকার সেজন্য দোষ স্বীকার করিয়া লইয়াছেন, ক্ষমার আবেদন জানাইয়াছেন। ঐ দেশের প্রধানমন্ত্রী সমগ্র বাঙ্গালী জাতির  কাছে ক্ষমা  চাহিয়াছেন। আমরা সুবিচার প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিয়াছিলাম, প্রতিহিংসা চাইনা। ক্ষমা চাওয়া হইয়াছে ক্ষমা দেওয়া হইয়াছে।”

পররাষ্ট্র  মন্ত্রী  বলিয়াছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করিলে তিনটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করা যায়। প্রথমত ইতিহাসে ইহার স্থান দেওয়া, দ্বিতীয়ত যে দেশের লোক এই অন্যায় করিয়াছে তাহা প্রমান করা এবং তৃতীয়ত আমাদের অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতির প্রমান দেওয়া। যেহেতু এ ব্যাপারে পাকিস্তান সরকার কোন চ্যালেঞ্জ করেনাই বরং সকল অন্যায় স্বীকার করিয়া নিয়াছে তখন আর বিচার করার সঙ্গত কোন কারণ নাই।  এতে কোন লাভ হইবে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করায় বাংলাদেশ বিশ্বের প্রশংসা অর্জন করিয়াছে। এর ফলে উপমহাদেশে স্বাভাবিকতা ফিরিয়া আসিবে। এটা সকলে চায়। দিল্লী চুক্তি সকলে গ্রহণ করিয়াছে।”

যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করা বিষয়ক ১৬ দফার ত্রিপাক্ষিক চুক্তির তিনটি মূল কপি  দিল্লী, ইসলামাবাদ এবং ঢাকা থেকে  একযোগে  পূর্ণ বিবরণসহ প্রকাশিত হয়। চুক্তি ১৩ দফায়  লেখা হয়েছে-“বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (ড. কামালা হোসেন) বলেন যে,  পাকিন্তানী  যুদ্ধাপরাধীরা  বিভিন্ন ধরণের অপরাধ যেমন যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার মত অপরাধ করেছে।”

পাকিস্তানী ১৯৫ জন সেনা কর্মকর্তার বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস (ট্রাইবিউনালস ) এ্যাক্ট পাশ করা হলেও তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়ে সেই আইনে এখন বিচার চলছে এদেশীয় লোকজনের .



এই সাইটের যেকোন লেখা, তথ্য উপাত্তা যেকেউ ব্যবহার, পুনমুদ্রন, পুন প্রচার, প্রকাশ করা যাবে; তবে শর্ত হল সূত্র হিসেবে Mehedy Hasan https//www.bangladeshwarcrimestrial.blogspot.com  উল্লেখ/লিঙ্ক  করতে হবে।
 

রাজাকার থেকে যুদ্ধাপরাধী-২ যুদ্ধাপরাধ থেকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ

মেহেদী হাসান
যুদ্ধাপরাধী এবং মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগী সম্পূর্ণ ভিন্ন  দুটি বিষয় । সেজন্য তাদের বিচারের  জন্য  দুটি পৃথক আইন হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সহযোগীদের বিচারের জন্য করা হয় দালাল আইন এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য করা হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালল) এ্যাক্ট। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে  যাদের চিহ্নিত  করা হয়েছিল তারা সকলেই (১৯৫ জন) ছিল পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা।

বর্তমান সরকার এদেশীয় সহযোগীদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। যুদ্ধপারধী বলতে যেহেতু পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের বোঝায় তাই  সরকার যুদ্ধাপরাধী শব্দের বদলে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ শব্দটি ব্যবহারের কৌশল নিয়েছে। কিন্তু মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী বলতেও  মূলত পাকিস্তানী ঐ সেনাকর্মকর্তাদেরই বোঝানো হয়েছে সবসময়।  অতীতে কখনোই পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগী বা পাকিস্তান সমর্থনকারীদের যুদ্ধাপরাধী বা মনাবতার বিরুদ্ধে অপরাধী হিসেবে অভিহিত করা হয়নি। এমনকি বর্তমানে যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের  তো নয়ই। ১৯৭৪ সালে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় চুক্তি, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা,  পাকিস্তানের হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট,  দালাল আইন, দালাল আইনে করা অসংখ্য মামলা এবং সেসময়কার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরা-খবর এর  স্বাক্ষর বহন করছে।  

যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করা বিষয়ক ১৯৭৪ সালে দিল্লীতে স্বাক্ষরিত ত্রিদেশীয়  চুক্তির   ১৩ দফায়  লেখা হয়েছে-“বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (ড. কামালা হোসেন) বলেন যে,  পাকিন্তানী  যুদ্ধাপরাধীরা  বিভিন্ন ধরণের অপরাধ যেমন যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার মত অপরাধ করেছে।”  চুক্তির এ ধারায়ও  মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী বলতে  পাকিস্তানী ঐ সেনাকর্মর্তাদের বোঝানো হয়েছে। বাংলাদেশী সহযোগীদের নয়।

১০ জুন  ১৯৭৪ সালের ইত্তেফাক পত্রিকার একটি  খবরের শিরোনাম হল “পাকিস্তান মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করিয়াছে: এ্যমনেস্টি  ইন্টারন্যাশনাল সম্মেলনে অভিমত। প্রতিবদেনে লেখা  হয়েছে-প্যারিসে
এ্যমনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল আয়োজিত নির্যাতনের অবসান সম্মেলনে এ অভিযোগ করা হয়েছে। সম্মেলনে বলা হয় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তান সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।

এছাড়া বাংলাদেশে পাকিস্তানের পরাজয়  এবং ভারতের কাছে পাকিস্তানী সৈন্যদের  আত্মসমর্পনের কারণ খুঁজে বের করতে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসেই  পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়। হামুদুর রহমান কমিশন প্রতিবেদনেও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তাদের চিহ্ণিত করা হয়েছে।
সুতরাং  যুদ্ধাপরাধীর পরিবর্তে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ শব্দ ব্যবহার করলেই যুদ্ধাপরাধের দায় একজনের ওপর থেকে অপরজনের ওপর বর্তাবে বিষয়টি এমন কি?


এই সাইটের যেকোন লেখা, তথ্য উপাত্তা যেকেউ ব্যবহার, পুনমুদ্রন, পুন প্রচার, প্রকাশ করা যাবে; তবে শর্ত হল সূত্র হিসেবে Mehedy Hasan https//www.bangladeshwarcrimestrial.blogspot.com  উল্লেখ/লিঙ্ক  করতে হবে।


রাজাকার থেকে যুদ্ধাপরাধী-১ যুদ্ধাপরাধী কে?///১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, গণকণ্ঠ এবং সংবাদে যুদ্ধাপরাধ বিষযক প্রকাশিত খবর বিশ্লেষন

মেহেদী হাসান
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে  মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দায়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়  স্বাধীনতা পরবর্তী  বাংলাদেশ সরকার। বেসামরিক নাগরিক হত্যা, ধর্ষন, লুটাপাট এবং  অগ্নিসংযোগের মত  মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়। তাদের বিচারের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বারবার বিভিন্ন জনসভায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে   দৃঢ  প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন ।  কিন্তু  ১৯৭৪ সালে তাদের সকলকে ক্ষমা করে দেয়া হয়।  কিন্তু কেন?

১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত দৈনিক  ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা. দৈনিক গণকণ্ঠ এবং দৈনিক সংবাদ  এ প্রকাশিত খবরের আলোকে  ১৯৫ জন যুদ্ধপরাধীদের ক্ষমার প্রেক্ষাপট, দালাল আইন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ  সেদিন কি বলেছিলেন তা  এখানে তুলে ধরা হল । এছাড়া সিমলা চুক্তি, ১৯৭৪ সালের ত্রিদেশীয় চুক্তি, হামুদুর রহমান কমিশন প্রতিবেদন প্রভৃতি থেকে দেখার চেষ্টা করা হবে আসল যুদ্ধাপরাধী কারা।

যুদ্ধাপরাধীদের  বাছাই  করার জন্য স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে  একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।   কমিটি বিচার বিশ্লেষন করে যুদ্ধাপারধীদের একটি তালিকা তৈরি করে। প্রথমে ৪০০ এবং পরে তা থেকে ১৯৫  জন যুদ্ধাপরাধীর  একটি চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে। এরা সকলেই ছিল পাকিস্তানী উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তা যারা বাংলাদেশে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল।  ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে  সরকার যুদ্বাপরাধী হিসেবে ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তার চূড়ান্ত তালিকা  তৈরি এবং তাদের বিচারের কথা ঘোষনা করে। ১৮  এপ্রিল দৈনিক  বাংলা পত্রিকায় এ বিষয়ে পরিবেশিত খবরে বলা হয়- “তদন্ত শেষে স্বাক্ষী প্রমানের ভিত্তিতে ১৯৫ জন ব্যক্তির বিচার অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত   হয়েছে।  তাদের   অপরাধের মধ্যে  রয়েছে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, জেনেভা কনভেনশনের ৩ নং ধারা লঙ্ঘন, নরহত্য, বলাৎকার ও বাড়িঘর পোড়ানো। ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাদের বিচার করবে। মে মাসের শেষের দিকে তাদের  ট্রাব্যুনালের সামনে হাজির করা হতে পারে।”
সরকারি এ প্রতিবেদনে যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পাকিস্তানী  ১৯৫ জন সেনাকর্মকর্তাদের।

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য এসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সে সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ যে দাবি এবং প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন তার কয়েকটি উদাহরণ  সে সময়ের সংবাদপত্র থেকে এখানে  তুলে ধরা হল।

দৈনিক বাংলায় ১৯৭২ সালের  ৩ জুলাই একটি খবরের  হেডলাইন হল “যুদ্ধবন্দীদের বিচার হবেই-কুষ্টিয়া জনসভায় বঙ্গবন্ধু।” ঐ বছর ৩০ নভেম্বর একই  পত্রিকার আরেকটি  খবরের শিরোনাম হল “হত্যা ধর্ষণ লন্ঠনকারী যুদ্ধাপরাধীদের রেহাই দেয়া হবেনা-পাবনার জনসভায় মনসুর আলী।”  খবরে লেখা হয় যোগাযোগমন্ত্রী ক্যাপ্টন মনসুর   আলী বলেন, পাকিস্তানী বর্বর সৈন্যরা এখানে মানবতা বিরোধী জঘন্যতম অপরাধেথ লিপ্ত হয়েছিল। মানবতার স্বার্থেই তাদের বিচার করা উচিত।

দৈনিক বাংলা, ৭ জুন ১৯৭২: “শীঘ্রই যুদ্ধাপরাধীদের প্রকাশ্যে বিচার করা হবে। কুয়লালামপুরে সাংবাদিকদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাদ আজাদ।”
১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক বাংলা পত্রিকার  আরেকটি  খবরের শিরোনাম হল “বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই- টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু।” একই বছর ঐ পত্রিকার  আরেকটি খবরের শিরোনাম হল “১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবেই-নয়া দিল্লীতে বঙ্গবন্ধু।” 
এভাবে ১৯৭২ এবং ১৯৭৩ সালের বিভিন্ন পত্রিকায় থেকে  যুদ্ধাপরাধীদের বিচার  বিষয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের অসংখ্য দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করার উদাহরণ দেয়া যায়।


এই সাইটের যেকোন লেখা, তথ্য উপাত্তা যেকেউ ব্যবহার, পুনমুদ্রন, পুন প্রচার, প্রকাশ করা যাবে; তবে শর্ত হল সূত্র হিসেবে Mehedy Hasan https//www.bangladeshwarcrimestrial.blogspot.com  উল্লেখ/লিঙ্ক  করতে হবে।