কাদের মোল্লা অ্যামিকাস কিউরি শুনানি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কাদের মোল্লা অ্যামিকাস কিউরি শুনানি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৪ জুলাই, ২০১৩

কাদের মোল্লা মামলায় আপিলের রায় যেকোনো দিন

২৩/৭/২০১৩
জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর দেয়া যাবজ্জীবন সাজার বিরুদ্ধে করা আপিলের চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয়েছে। মামলাটি এখন  রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ যেকোন দিন আপিল বিভাগ রায় ঘোষণা করবেন।
দীর্ঘ শুনানি গ্রহণ শেষে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতত্বাধীন আপিল বিভাগ আজ মঙ্গলবার মামলাটিকে রায়ের জন্য অপেক্ষমান হিসাবে ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

সকালে রাষ্ট্রপে সংক্ষিপ্ত শুনানি শেষ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আদালত থেকে বেরিয়ে মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, উভয়প মিলে মোট ৩৯ কার্যদিবস শুনানি করেছেন। আজ মঙ্গলবার  আদালত শুনানি শেষে দুটি আপিল আবেদন সিএভি (রায়ের জন্য অপেমান) রেখেছেন।

আদালতে দেয়া সমাপনী বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, আপিলে সমান সুযোগ দিয়ে আনা সংশোধনীকে কাদের মোল্লার েেত্র অকার্যকর বলেছেন আসামিপ। তারা বলছেন, এতে আসামির অধিকার খর্ব করা হয়েছে। আমরা বলেছি, এতে আসামির অধিকার খর্ব করা হয়নি। রাষ্ট্রেরও আপিল করার অধিকার রয়েছে। এটা সমতা আনার জন্য করা হয়েছে। এতে আসামির সংুব্ধ হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ, এ আইনের বিষয়ে সংবিধানে প্রোটেকশন দেয়া আছে। এটা বির্তকের উর্ধ্বে। এটা চ্যালেঞ্জযোগ্য নয়। প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাপারে তিনি বলেন, সার্বভৌম দেশ হিসেবে আমাদের আইনই প্রযোজ্য হবে। আন্তর্জাতিক আইন এখানে প্রযোজ্য নয়। সাজার বিষয়ে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালে ১, ২, ৩, ৫ ও ৬ নম্বর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি। আর কেন দেয়নি তাও রায়ে বলা হয়নি। সুতরাং, আমাদের আপিল মঞ্জুর হওয়া উচিত। এর আগে সোমবার আসামিপে শুনানি শেষ করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ছয়টি অভিযোগের মধ্যে দুটিতে তাকে যাবজ্জীবন, তিনটিতে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড এবং একটিতে খালাস দেয়া হয়। এ রায়ের প্রতিবাদে শাহবাগে শুরু হয় আন্দোলন। মূল আইনে সাজা বাড়াতে সরকার পক্ষের আপিলের বিধান না থাকলেও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আইন সংশোধন করে সরকারকে আপিলের সুযোগ দেয়া হয়। পরে সরকার ও আসামি দু-পক্ষই আপিল দায়ের করে। পরে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে গত তিন মার্চ আপিল করে সরকারপ। আপিলে কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ড চাওয়া হয়। এরপর চার মার্চ দণ্ডাদেশ থেকে খালাস চেয়ে আপিল  করে আসামিপ। গত ১ এপ্রিল থেকে আপিলের শুনানি শুরু হয়। আপিল শুনানিকালে আসামিপ দাবি করেন যে, আপিলের সমান সুযোগ রেখে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ সালের আইনের যে সংশোধনী আনা হয়েছে তা কাদের মোল্লার মামলার েেত্র প্রযোজ্য হবে না। কারণ, কাদের মোল্লার বিচার আইন সংশোধনের আগেই শেষ হয়েছে। এছাড়া ‘কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’ এই বিচারের েেত্র প্রযোজ্য হবে বলেও আসামিপরে আইনজীবীরা দাবি করেন।

এ আপিলের শুনানিকালে উত্থাপিত আইনি প্রশ্নের মিমাংসায় গত ২০ জুন সাত জন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেন আপিল বিভাগ। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-১৯৭৩ এর ক্ষেত্রে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে কি না? দ্বিতীয়ত, ২০১৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধন করে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে যে ভূতাপে কার্যকারিতা দেয়া হয়েছে, তা কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না? শুনানিতে অংশ নিয়ে আইনের সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলে মত দেন সংখ্যাগরিষ্ট অ্যামিকাস কিউরি। অ্যামিকাস কিউরিদের মধ্যে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল- ইসলাম, ব্যারিস্টার রফিক-উল- হক, সাবেক এটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ এবং ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি মত দেন যে, আইনের সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অন্যদিকে, সাবেক বিচারক টি এইচ খান,, সাবেক এটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফের মতে সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

বাংলাদেশের ১৯৭৩ সালের আইনে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ প্রশ্নে শুধুমাত্র ব্যারিস্টার রফিক-উল হক মত দেন তা প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের পক্ষে মত দেন। ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনালস আইনে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিফলন রয়েছে। মাহমুদুল ইসলাম বলেন, এ প্রশ্নে হ্যাঁ না উত্তর দেয়া কঠিন। সাধারণভাবে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে না। তবে দেশীয় আইনে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা থাকলে, শূন্যতা থাকলে অথবা ব্যাখ্যার জন্য প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক আইনের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। আজমালুল হোসেন কিউসি মত দেন, সাংঘর্ষিক না হলে আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইন প্রযোজ্য হবে। টি এইচ খানের মত, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে। তবে দেশীয় আইনের সাথে আন্তর্জাতিক আইন সাংঘর্ষিক হলে সেেেত্র দেশীয় আইন প্রাধাণ্য পাবে। এ এফ হাসান আরিফের মতে আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইন প্রযোজ্য হবে।

সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়-হাসান আরিফ///সাজা দেয়া হলে এটি দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে-আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী

২২/৭/২০১৩
মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর দেয়া যাবজ্জীবন সাজার বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি আজ শেষ করেছে আসামিপ। আগামীকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এ আপিলের শুনানি শেষ হবে।

শুনানি শেষে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, সরকারপক্ষ যে সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করেছে, সে সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে সাজা দেয়া অসম্ভব। এসব দুর্বল সাক্ষ্যপ্রমাণের উপর ভিত্তি করে যদি কাদের মোল্লাকে সাজা দেয়া হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সর্বশেষ সংশোধনী জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে মত দিয়েছেন আরেক অ্যামিকাস কিউরি এ এফ হাসান আরিফ। তিনি বলেন, ৫ ফেব্রুয়ারিতে ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লার মামলার রায় ঘোষণা করেছেন। ওই দিন তার শাস্তি চূড়ান্ত হয়। এরপর আনা সংশোধনী তার েেত্র প্রযোজ্য নয়। তবে আদালতে আপিল বিচারাধীন, দণ্ডসহ সব বিষয় পর্যালোচনা করার এখতিয়ার আদালতের রয়েছে। আজ  সোমবার আদালতের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ মত দেন সাবেক এই অ্যাটর্নি জেনারেল। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এই শুনানি গ্রহণ করেন। তার আগে সিনিয়র আইনজীবী ও রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক টি এইচ খানও বলেছেন, আইনের সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

হাসান আরিফ বলেন, অপর্যাপ্ত সাজার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপকে আপিলের সুযোগ দিয়ে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে আনা সংশোধনী বৈধ। তবে তা কাদের মোল্লার েেত্র প্রযোজ্য নয়। তাছাড়া প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের রীতি দেশীয় আইনের সাথে সাংঘর্ষিক না হলে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য তা অনুসরণ করা যেতে পারে।

সোমবার আসামিপে শেষ দিনের মতো শুনানি করেন ট্রাইব্যুনালে আসামীপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। এরপর মঙ্গলবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের সমন্বয়ক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান সাংবাদিকদের জানান, মঙ্গলবারই শুনানি শেষ করবেন রাষ্ট্রপ। আধা ঘণ্টার মতো শুনানি করবেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এরপরই আদালত আপিল মামলাটির রায়ের দিন ধার্য করতে পারেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

আজ  শুনানি শেষে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘৫ ফেব্রুয়ারি আবদুল কাদের মোল্লার রায় হয়ে যাওয়ার পর ১৮ ফেব্রুয়ারি আইনে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা আবদুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সুতরাং সরকার পক্ষ যে আপিল করেছে সে আপিল বাতিলযোগ্য এবং এটা বাতিল হওয়া উচিত। কিন্তু আদালতের ক্ষমতা আছে, আদালত ইচ্ছা করলে আবদুল কাদের মোল্লার শাস্তি বাড়াতে পারেন। সরকারের যে আপিল সে আপিল অকার্যকর, এটা চলতে পারে না। দ্বিতীয়ত আমরা বলেছি- আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে, যদি না বাংলাদেশের আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। ১৯৭৩ সালের আইনের কোনো বিধান আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। সুতরাং আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে। তৃতীয়ত- আদালতে সরকারপক্ষ যে সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করেছে, সে সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে সাজা দেয়া অসম্ভব। আমি আপনাদের বলছি, আদালতেও বলেছি, রাষ্ট্রপক্ষ যে সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করেছে, তার ভিত্তিতে আবদুল কাদের মোল্লাকে সাজা দেয়া অসম্ভব এবং তার বেকসুর খালাস পাওয়া উচিত। আমাদের আপিল গৃহীত হওয়া উচিত এবং সরকারের আপিল বাতিল হওয়া উচিত। তিনি বলেন, এসব দুর্বল সাক্ষ্যপ্রমাণের উপর ভিত্তি করে যদি কাদের মোল্লাকে সাজা দেয়া হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের আপিলের ভিত্তিতে কাদের মোল্লার শাস্তি বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সাজা বাড়াতে পারেন, সে ক্ষমতা আদালতের আছে, কিন্তু কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নয়। সাত জন অ্যামিকাস কিউরির পাঁচ জনই সংশোধিত আপিল আইন আবদুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ বলে মত দিয়েছেন- এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, সংখ্যা বড় বিষয় নয়, এখানে ন্যায্যতা দেখা হবে। আমাদের বক্তব্য সঠিক কিনা, আইনিভাবে গ্রহণযোগ্য কিনা, তা দেখার পর আদালত বিচার করবেন। এটা তাদের এখতিয়ার।

মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ছয়টি অভিযোগের মধ্যে দুটিতে তাকে যাবজ্জীবন, তিনটিতে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড এবং একটিতে খালাস দেয়া হয়। এ রায়ের প্রতিবাদে শাহবাগে শুরু হয় আন্দোলন। মূল আইনে সাজা বাড়াতে সরকার পক্ষের আপিলের বিধান না থাকলেও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আইন সংশোধন করে সরকারকে আপিলের সুযোগ দেয়া হয়। পরে সরকার ও আসামি দু-পক্ষই আপিল দায়ের করে। এ আপিলের শুনানিকালে উত্থাপিত আইনি প্রশ্নের মিমাংসায় গত ২০ জুন সাত জন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেন আপিল বিভাগ। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-১৯৭৩ এর ক্ষেত্রে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে কি না? দ্বিতীয়ত, ২০১৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধন করে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে যে ভূতাপে কার্যকারিতা দেয়া হয়েছে, তা কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না?

শুনানিতে অংশ নিয়ে আইনের সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলে মত দেন সংখ্যাগরিষ্ঠ অ্যামিকাস কিউরি। অ্যামিকাস কিউরিদের মধ্যে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, সিনিয়র অ্যাডভোকেট মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ এবং ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি মত দেন যে, আইনের সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অন্যদিকে, সিনিয়র অ্যাডভোকেট টি এইচ খান ও এ এফ হাসান আরিফের মতে সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। বাংলাদেশের ১৯৭৩ সালের আইনে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ প্রশ্নে শুধুমাত্র ব্যারিস্টার রফিক-উল হক মত দেন তা প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের পক্ষে মত দেন। ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনালস আইনে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিফলন রয়েছে। মাহমুদুল ইসলাম বলেন, এ প্রশ্নে হ্যাঁ না উত্তর দেয়া কঠিন। সাধারণভাবে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে না। তবে দেশীয় আইনে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা থাকলে, শূন্যতা থাকলে অথবা ব্যাখ্যার জন্য প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক আইনের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। আজমালুল হোসেন কিউসি মত দেন, সাংঘর্ষিক না হলে আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইন প্রযোজ্য হবে। টি এইচ খানের মত, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে। তবে দেশীয় আইনের সাথে আন্তর্জাতিক আইন সাংঘর্ষিক হলে সেেেত্র দেশীয় আইন প্রাধাণ্য পাবে। এ এফ হাসান আরিফের মতে আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইন প্রযোজ্য হবে।

অ্যামিকাস কিউরি শুনানী : আইনের সংশোধীন কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় : টি এইচ খান



২১/৭/২০১৩
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সর্বশেষ সংশোধনী জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রয়োগের প্রশ্নে দুই ধরনের মত দিয়েছেন সিনিয়র আইনজীবী টি এইচ খান ও ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ। লিখিত মতামতে রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক টি এইচ খান বলেন, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করে ৫ ফেব্রুয়ারি। তার মৃত্যুদণ্ড চেয়ে শাহবাগে আন্দোলন শুরু হয়। যে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালস আইনে সংশোধন আনা হয়। এ সংশোধনে যেকোন দণ্ডের বিরুদ্ধে সরকারকে আপিল দায়েরের সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এর আগেই কাদের মোল্লার মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়ে যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে এ সংশোধনী প্রয়োগের সুযোগ নেই। তবে তার সাথে দ্বিমত পোষন করে ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ট্রাইব্যুনালের যেকোন রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের জন্য ৩০ দিনের সময়সীমা রয়েছে। কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে এই সময়সীমার মধ্যেই আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে। এ কারণে এ সংশোধন তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতির বেঞ্চে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে শুনানিতে অংশ নিয়ে তারা এসব কথা বলেন। টি এইচ খানের পক্ষে তার লিখিত মতামত আদালতে উত্থাপন করেন অ্যাডভোকেট ফয়সাল এইচ খান।

অসুস্থতার জন্য আদালতে আসতে না পারার কারণে দুঃখ প্রকাশ করে লিখিত মতামতে টি এইচ খান বলেন, আদালত দুটি প্রশ্নের উত্তর চেয়েছেন। একটি ইস্যু হচ্ছে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনের ক্ষেত্রে   প্রচলিত  আন্তর্জাতিক  আইন প্রযোজ্য হবে কি না? শুধুমাত্র হ্যাঁ বা না এর মধ্যে এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। এটা প্রতিষ্ঠিত নীতি যে, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে বিভেদ দেখা দিলে দেশীয় আইনই প্রাধান্য পাবে। সাধারণত দেশীয় আদালত দেশীয় আইন অনুসরণ করেন। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে দেশীয় আইন পূর্ণাঙ্গ নয়, যেসব ক্ষেত্রে দেশীয় আইনে অস্পষ্টতা রয়েছে সেসব ক্ষেত্রে দেশীয় আদালত আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মিমাংসিত সিদ্ধান্ত অনুসরণ করবেন। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’র কোনো সংজ্ঞা নেই। বাংলাদেশের অন্য কোনো আইনেও এ অপরাধ সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল এবং আপিল বিভাগকে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ করতে হবে। তিনি বলেন, যদিও গত ১৮ ফেব্রুয়ারির আইনে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া হয়েছে। তবুও তা কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবেনা। কারণ, তার মামলার কার্যক্রম আগেই শেষ হয়েছে।

ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনালস আইনে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিফলন রয়েছে। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল আইনের সর্বশেষ সংশোধনীকে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া হয়েছে। আমাদের সংবিধানে কোথাও বলা নেই যে, আইনে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া যাবেনা। ট্রাইব্যুনাল আইনটিকে সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ দ্বারা সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। এ আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তির কোনো মৌলিক অধিকার নেই। অভিযুক্ত ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো রিটও দায়ের করতে পারেন না। এ আইন নিয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি আপিল বিভাগেও কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন না। সংবিধানে এক্ষেত্রে বাধা রয়েছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এ রায়ের প্রতিবাদে শাহবাগে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। মূল আইনে সাজা বাড়াতে সরকার পক্ষের আপিলের বিধান না থাকলেও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আইন সংশোধন করে সরকারকে আপিলের সুযোগ দেয়া হয়। পরে সরকার ও আসামী দু-পক্ষই আপিল দায়ের করে। এ আপিলের শুনানিকালে উত্থাপিত আইনি প্রশ্নের মিমাংসায় গত ২০ জুন সাত জন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেন আপিল বিভাগ। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-১৯৭৩ এর ক্ষেত্রে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে কি না? দ্বিতীয়ত, ২০১৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধন করে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে যে ভূতাপে কার্যকারিতা দেয়া হয়েছে, তা কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না?

এ বিষয়ে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ইতোমধ্যে সিনিয়র আইনজীবী রফিক-উল হক, এম আমীর-উল ইসলাম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম ও আজমালুল হোসেন কিউসি মত দিয়েছেন। আরো মতামত দিবেন আইনজীবী এ এফ হাসান আরিফ।

এ সময় আদালতে রাষ্ট্রপে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান ও কাদের মোল্লার পে আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক উপস্থিত ছিলেন।

রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০১৩

সংশোধিত আপিল আইন বৈধ/// কাদের মোল্লা মামলায় শুনানীতে আ্যমিকাস কিউরি ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি

মেহেদী হাসান
আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানীতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিযুক্ত ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি বলেছেন, সরকার পক্ষের জন্য আপিলের সুযোগ রেখে চলতি বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধ বিচার আইনে যে সংশোধনী আনা হয়েছে তা বৈধ। এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছেন, সরকার পক্ষ মৃত্যুদন্ডের আবেদন না করলেও কাউকে সর্বোচ্চ সাজা দেয়া বা সাজা থেকে খালাস দেয়ার এখতিয়ার আপিল বিভাগের রয়েছে। তাছাড়া ১৯৭৩ সালের আইনটিকে  বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৭ (৩) ধারায়  সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। কাজেই আইনে যে সংশোধনী আনা হয়েছে তা বৈধ।

আজ রোববার ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি তার মত পেশ করেন আপিল বিভাগে। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন। এ নিয়ে মোট চারজন অ্যামিকাস কিউরি সংশোধিত আপিল আইন আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে মত দিলেন।
১৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধিত আপিল আইন আব্দুল মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না এবং যুদ্ধাপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য কি-না এ দুটি বিষয়ে মতামত চেয়ে আপিল বিভাগ সুপ্রীম কোর্টের সাতজন বিশিষ্ট আইনবিদকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিযুক্ত করেন গত ২০ জুন।
ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি গত ১০ ফেব্রুয়ারি শুনানী পেশ শুরু করেন।
যুদ্ধাপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন বা কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’ প্রযোজ্য হবে কি-না  এ বিষয়ে  তিনি তার প্রথম দিনের শুনানীতে বলেছেন, শর্ত সাপেক্ষে প্রযোজ্য হবে।

ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ক্ষেত্রে পূর্বের বিধান ছিল- আসামী পক্ষ সাজার  বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আসামীকে সাজা দেয়া হলে রাষ্ট্রপক্ষ আর  আপিল করতে পারবেনা। ট্রাইব্যুনালের রায়ে যদি আসামীকে  খালাস দেয়া হয় শুধুমাত্র সেক্ষেত্রে সরকার পক্ষ বা অভিযোগকারী আপিল করার সুযোগ পাবে; অন্যথায় নয়। কিন্তু আব্দুল কাদের মোল্লাকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের পর তার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলন গড়ে  ওঠে।  সে প্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইবুনাল আইনের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয় সংসদে।  সংশোধিত আইনে বলা হয়- আসামী পক্ষের মত সরকার পক্ষও আপিলের সমান সুযোগ পাবে। অর্থাৎ শুধু খালাসের ক্ষেত্রে নয়, ট্রাইব্যুনালের যেকোন রায়ের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষও আপিল করতে  পারবে । আপিল সংক্রান্ত বিধান সংশোধনী বিষয়ে বলা হয়েছে-এ সংশোধনী ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে কার্যকর ছিল বলে ধরে নিতে হবে।
আইনের আপিল সংক্রন্তা ধারা সংশোধনের পর সরকার পক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের দাবি জানিয়ে আপিল আবেদন করে।
আপিল শুনানীতে  রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের কাছ থেকে অনেক আইনগত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে ।  এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হল- গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যে আইন সংশোধন করা হয়েছে  তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য কি-না।  এছাড়া অপর যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপিত হয়েছে তাহল- আদালত  এটর্নি জেনারেল এর কাছ থেকে জানতে চেয়েছেন- উপমহাদেশ বা ইংল্যান্ডের এমন কোন নিজর আছে কি-না যেখানে  রায় হবার পর এভাবে  আইন সংশোধন করে রিট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট কার্যকর করা হয়েছে।
কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এ বিষয়ে সন্তোষজনক জবাব না আসায় আপিল বিভাগ সুপ্রীম কোর্টের সাতজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে এ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেন এ বিষয়ে তাদের কাছ থেকে মতামত গ্রহনের জন্য।




বুধবার, ১০ জুলাই, ২০১৩

আ্যমিকাস কিউরি শুনানীতে ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি/// যুদ্ধাপরাধ বিচারে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন শর্তসাপেক্ষে প্রযোজ্য

মেহেদী হাসান, ১০/৭/২০১৩
আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানীতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিযুক্ত ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি বলেছেন, যুদ্ধাপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন বা কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’ প্রযোজ্য তবে একটা কিন্তু আছে। সেটি হল বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনের সাথে যেসব ক্ষেত্রে কাস্টমারি ইন্টারন্যাশল ল’য়ের অসঙ্গতি আছে বা সাংঘর্ষিক সেসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবেনা। সেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনই অনুসরন করতে হবে এবং বাংলাদেশের আইন প্রযোজ্য হবে। আদালদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’ আমাদের জন্য মানা বাধ্য নয় তবে সহায়তা (এইড) নেয়া যেতে পারে।

আজ  চতুর্থ অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি তার  বক্তব্য উপস্থাপন করেন। প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেনর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।

ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন আজ শুধুমাত্র কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’  যুদ্ধাপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না সে বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। সংশোধিত আপিল আইন  আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় প্রযোজ্য কি-না সে বিষয়ে তিনি আগামী রোববার তার বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। কারণ আব্দুল কাদের মোল্লা মামলার আপিল শুনানী আগামী রোববার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে ।

আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন শেষে ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৭৩ সালে যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ  আইনটি প্রণয়ন করা হয় তখন তা  বিশ্বে প্রচলিত বা প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতেই করা হয়েছে। আমাদের আইনটি প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনকে ধারন করে আছে। কাজেই প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনের সহায়তা নেয়া যেতে পারে কিন্তু  আমাদের আইনে যেসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রচলিত আইনের অসঙ্গতি আছে সেসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবেনা। তিনি বলেন, আমাদের আইনটিকে  সংবিধানে সুরক্ষা দেয়া আছে।
প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন  আমাদের দেশের যুদ্ধাপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য  হবে কি হবেনা এ বিষয়ে সাংবাদিকরা  নির্দিষ্ট করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দেশীয় আইন  এ বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যদিও তা কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’য়ের সাথে সাংঘর্ষিক হয়।
তিনি বলেন, বিচারের ক্ষেত্রে ফান্ডামেন্টাল ফেয়ারনেস নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল শুনানীর সময় রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, আসামী পক্ষে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, ব্যারিস্টার এহসান সিদ্দিক, অ্যাডভোকেট শিশির মো: মনির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিযুক্ত ব্যারিস্টার এম আমির-উল-ইসলাম অন্যান্য অনেক আইনজীবীর  মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।

মঙ্গলবার, ৯ জুলাই, ২০১৩

আরো এক অ্যামিকাস কিউরি সংশোধিত আপিল আইনের পক্ষে মত দিলেন

আপিলের বিধান সম্পর্কিত সংশোধিত আইন আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে মত দিলেন আরো একজন অ্যামিকাস কিউরি। তিনি হলেন সাবেক এটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম। তবে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন এই বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না সে বিষয়ে মাহমুদুল ইসলাম মত দিয়ে বলেছেন, আমাদের আইনের যেসব ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা এবং শূন্যতা রয়েছে সেসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

আব্দুল কাদের মোল্লার আপিল শুনানীর ক্ষেত্রে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিযুক্ত বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সাতজন বিশিষ্ট আইনজীবীর মধ্যে আজ  মাহমুদুল ইসলাম তার মত তুলে ধরেন । এরপর অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিযুক্ত আরেক আইনজীবী আজমালুল হক কিউসি  তার মত পেশ শুরু করেছেন। তিনি দশ মিনিটের মত সাবমিশন রাখার পর আদালত আজকের  মত মুলতবি করা হয়।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধিত আপিল আইন আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হিসেবে আখ্যায়িত করে মাহমুদুল ইসলাম   শুনানীতে বলেন, যুদ্ধাপরাধ আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান আছে। সরকার আপিল না করলেও কোর্ট ইচ্ছা করলে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে পারে। সেটা কোর্টের সহজাত ক্ষমতা। কাজেই সরকার সংশোধিত আইনের বলে মৃত্যুদন্ডের আবেদন করেছে তা সঠিক। তবে মাহমুদুল ইসলাম জোর দিয়ে বলেছেন, বিচারে অবশ্যই ফান্ডামেন্টাল ফেয়ারনেস দেখাতে হবে।

আব্দুল কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দাবি করে সরকার পক্ষ আপিল আবেদন করেছে। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের সাজার বিরুদ্ধে সরকার পক্ষের আপিলের বিধান ছিলনা আইনে। তাই গত ৫ ফেব্রুয়ারি রায় হবার পর ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধন করে সরকার পক্ষের জন্য আপিলের বিধান সংযোজন করা হয় এবং এ সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর বলে ভূতাপেক্ষতা প্রদান করা হয়।
রায় হয়ে যাবার পর আইন সংশোধন এবং সরকারের দায়ের করা আপিল নিয়ে শুনানীতে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হয় সরকার পক্ষ। এ অবস্থায় আপিল বিভাগ দুটি বিষয়ে মতামত গ্রহনের  জন্য গত ২০ জুন সাতজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেন। যে দুটি বিষয়ে তাদের মতামত জানতে চাওয়া হয় তা হল-১৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধিত আইন আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না এবং প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন বা কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’ এই বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না।
এ পর্যন্ত তিনজন অ্যামিকাস কিউরি তাদের মতামত আদালতের সামনে তুলে ধরেছেন।

সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৩

সংশোধিত আপিল আইন কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য বলে মত দিলেন দুই অ্যামিকাস কিউরি


মেহেদী হাসান
আব্দুল কাদের মোল্লার মামলাকে কেন্দ্র করে সংশোধিত আপিল আইন আব্দুল কাদের মোল্লার আপিলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে মত দিয়েছেন দুই অ্যামিকাস কিউরি। এরা হলেন বিশিষ্ট আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক ও ব্যারিস্টার এম আমিরুল ইসলাম। যুদ্ধাপরাধ আইনের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করে সরকার আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড দাবি করে যে আপিল আবেদন করেছে তা এ দুই আইনজীবীর মতে বৈধ।

আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানীতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিযুক্ত বিশিষ্ট আইনজীবীদের মতমত গ্রহণ আজ শুরু হয়েছে।  প্রথম দিন ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক ও ব্যারিস্টার এম আমিরুল ইসলাম এর মতামত গ্রহণ করা হয়।  প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক  আদালতে উপস্থিত না হয়ে তিনি   ২৫ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য পাঠান এবং তা আদালতের সামনে পড়ে শোনান অ্যাডভোকেট মো : ওয়াহিদউদ্দিন। এরপর ব্যারিস্টার এম আমিরুল ইসলাম তার ৫৫ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য পাঠ করা শুরু করেন।
প্রথম দিন যুক্তি পেশ শেষে ব্যারিস্টার এম আমিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের কাছে বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ আমাদের কাছে দুটি বিষয় জানতে চেয়েছিলেন। এর একটি হল ১৯৭৩ সালের আইন গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধন করে সরকার পক্ষকে আপিলের যে সুযোগ দেয়া হয়েছে তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি-না। আমি আমার বক্তব্যে ‘প্রযোজ্য হবে’ বলে মতামত তুলে ধরেছি।
আদালতের আরেকটি প্রশ্ন ছিল কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’ বা প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন এই বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি-না। আমি বলেছি- ‘প্রযোজ্য হবে’ । কারণ ১৯৭৩ সালের আইন বিদ্যমান প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনকে ধারন করেছে। একথা আইনে বলা আছে। বিশ্বে এখন পর্যন্ত রুয়ান্ডা, কম্বোডিয়াসহ যেসব দেশে যুদ্ধাপরাধ  বিচার হয়েছে এবং যুদ্ধাপরাধ বিচারকে কেন্দ্র করে যেসব আইন তৈরি হয়েছে তাও ধারন করবে আমাদের আইন। আমরা জেনেভা কনভেনশন সাক্ষর করেছি। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন আমরা ধারন করেছি।
অপর দিকে ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক এ  প্রশ্নে বলেছেন, কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল আইন বাংলাদেশের এ বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজন নেই।

১৮ ফেব্রুয়ারি আপিল সংশোধনী আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য হবে মতামত তুলে ধরে ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক তার লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন-“যুদ্ধবন্দী, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনে বর্নিত অন্যান্য অপরাধ বিচারের জন্য প্রণীত  আইনের যেকোন বিধান তা যদি বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হয়  তবে তাকে বেআইনী বা অবৈধ হওয়াকে থেক্ষে রক্ষার জন্য  বাংলাদেশের সংবিধানে ৪৭(৩) ধারায় সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে । এমনকি ২০১৩ সালের সংশোধিত আইনের ১(২) ধারা যদি বাংলাদেশের সংবিধানের  কোন বিধানের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হয় তবু একে অবৈধ বা বেআইনী বলা যাবেনা । কাজেই ৩০১৩ সালের সংশোধিত ১(২) ধারা সংবিধান কর্তৃক সুরক্ষিত, ২১ ধারা ১৪ জুলাই ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর বলে ধরে নিতে হবে। কাজেই ১৯৭৩ সালের আইনে নতুন যে ২১ ধারা সংযোজন করা হয়েছে তার মাধ্যমে সরকার আপিল করতে পারবে।”

এদিকে ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম আজ মঙ্গলবারও তার লিখিত বক্তব্য পেশ করা অব্যাহত রাখবেন।

ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ক্ষেত্রে পূর্বের বিধান ছিল- আসামী পক্ষ সাজার  বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আসামীকে সাজা দেয়া হলে রাষ্ট্রপক্ষ আর  আপিল করতে পারবেনা। ট্রাইব্যুনালের রায়ে যদি আসামীকে  খালাস দেয়া হয় শুধুমাত্র সেক্ষেত্রে সরকার পক্ষ বা অভিযোগকারী আপিল করার সুযোগ পাবে; অন্যথায় নয়। কিন্তু আব্দুল কাদের মোল্লাকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের পর তার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলন গড়ে  ওঠে।  সে প্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইবুনাল আইনের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয় সংসদে।  সংশোধিত আইনে বলা হয়- আসামী পক্ষের মত সরকার পক্ষও আপিলের সমান সুযোগ পাবে। অর্থাৎ শুধু খালাসের ক্ষেত্রে নয়, ট্রাইব্যুনালের যেকোন রায়ের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষও আপিল করতে  পারবে । আপিল সংক্রান্ত বিধান সংশোধনী বিষয়ে বলা হয়েছে-এ সংশোধনী ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে কার্যকর ছিল বলে ধরে নিতে হবে।
আইনের আপিল সংক্রন্তা ধারা সংশোধনের পর সরকার পক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের দাবি জানিয়ে আপিল আবেদন করে।
আপিল শুনানীতে  রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের কাছ থেকে অনেক আইনগত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে ।  এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হল- গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যে আইন সংশোধন করা হয়েছে  তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য কি-না।  এছাড়া অপর যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপিত হয়েছে তাহল- আদালত  এটর্নি জেনারেল এর কাছ থেকে জানতে চেয়েছেন- উপমহাদেশ বা ইংল্যান্ডের এমন কোন নিজর আছে কি-না যেখানে  রায় হবার পর এভাবে  আইন সংশোধন করে রিট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট কার্যকর করা হয়েছে।
কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এ বিষয়ে সন্তোষজনক জবাব না আসায় আপিল বিভাগ সুপ্রীম কোর্টের সাতজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে এ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেন এ বিষয়ে তাদের কাছ থেকে মতামত গ্রহনের জন্য।

অপর দিকে আসামী পক্ষ থেকে শুনানী পেশ করার সময় যুক্তি তুলে  ধরে বলা হয় গনহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দেশান্তারকরন, ইনহিউম্যান অ্যাক্ট, পারসিকিউশন প্রভৃতি আন্তর্জাতিক অপরাধের সংজ্ঞা বাংলাদেশের আইনে নেই। এসব অপরাধের সংজ্ঞা নিরূপন করা আছে আন্তর্জাতিক প্রচলিত আইনে। কাজেই গনহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রভৃতি অপরাধ  বলতে সত্যিকার অর্থৈ কি বোজায়  তা চিহ্নিতকরন এবং এ বিচারের ক্ষেত্রে প্রচালিত আন্তর্জাতিক আইন বা কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল প্রয়োগ করতে হবে।

শুনানীর সময় রাষ্ট্রপক্ষে অন্যান্যের মধ্যে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং আসামী পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক উপস্থিত ছিলেন।

রবিবার, ৩০ জুন, ২০১৩

অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ : কাদের মোল্লা মামলার আপিল শুনানী নতুন মোড় নিয়েছে



মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সাত বিশিষ্ট আইনবিদকে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেয়ার মধ্য দিয়ে আব্দুল কাদের মোল্লা মামলার আপিল শুনানী নতুন  পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।  ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ক্ষেত্রে পূর্বের বিধান ছিল- আসামী পক্ষ সাজার  বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আসামীকে সাজা দেয়া হলে রাষ্ট্রপক্ষ আর  আপিল করতে পারবেনা। ট্রাইব্যুনালের রায়ে যদি আসামীকে  খালাস দেয়া হয় শুধুমাত্র সেক্ষেত্রে সরকার পক্ষ বা অভিযোগকারী আপিল করার সুযোগ পাবে; অন্যথায় নয়। কিন্তু আব্দুল কাদের মোল্লাকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের পর তার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলন গড়ে  ওঠে।  সে প্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইবুনাল আইনের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয় সংসদে।  সংশোধিত আইনে বলা হয়- আসামী পক্ষের মত সরকার পক্ষও আপিলের সমান সুযোগ পাবে। অর্থাৎ শুধু খালাসের ক্ষেত্রে নয়, ট্রাইব্যুনালের যেকোন রায়ের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষও আপিল করতে  পারবে । আপিল সংক্রান্ত বিধান সংশোধনী বিষয়ে বলা হয়েছে-এ সংশোধনী ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে কার্যকর ছিল বলে ধরে নিতে হবে।
এই যে ২০১৩ সালে আইন করে বলা হল ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর ছিল বলে ধরে নিতে হবে একেই বলে রিট্রোসপেক্টিবভ ইফেক্ট বা ভূতাপেক্ষতা।

আইনের আপিল সংক্রন্তা ধারা সংশোধনের পর সরকার পক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের দাবি জানিয়ে আপিল আবেদন করে। এছাড়া  কাদের মোল্লাকে যে একটি অভিযোগ থেকে ট্রাইব্যুনাল খালাস দিয়েছে সেটিতেও সাজা দাবি করা হয়েছে সরকার পক্ষের আবেদনে।

আপিল শুনানীতে  রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের কাছ থেকে অনেক আইনগত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে ।  এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হল- গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যে আইন সংশোধন করা হয়েছে  তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য কি-না।  এছাড়া অপর যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপিত হয়েছে তাহল- আদালত  এটর্নি জেনারেল এর কাছ থেকে জানতে চেয়েছেন- উপমহাদেশ বা ইংল্যান্ডের এমন কোন নিজর আছে কি-না যেখানে  রায় হবার পর এভাবে  আইন সংশোধন করে রিট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট কার্যকর করা হয়েছে।

১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধনী করে সরকার পক্ষকে আপিলের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এ সংশোধনী আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে  প্রযোজ্য কি-না এ প্রশ্নের জবাব   পাবার জন্য আদালত আইনটি পাশের সময় সংসদ প্রসিডিংস   হাজির করতে বলেন রাষ্ট্রপক্ষকে। কিন্তু সংসদীয় প্রসিডিংস পর্যালোচনা করে দেখা যায় সংশোধনী আইনটি আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে  প্রযোজ্য   না-কি চলমান অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সে বিষয়ে আইনে যেমন কোন কিছু নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি তেমনি সংসদ প্রসিডিংসেও কিছু  উল্লেখ নেই।

মজার বিষয় হল আব্দুল কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল আইনের আপিলের ধারা সংশোধন করা হয়েছে  কিন্তু আইনের সংশোধনিটি আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে  কি-না সে বিষয়ে কোথাও কোন কিছু উল্লেখ করা হয়নি। আপিলের ধারা সংশোধনীতে বিরাট একটা ফাঁক বা দুর্বলতা রয়ে গেছে। এ বিষয়টি বেরিয়ে আসে আপিল শুনানীর সময়।

আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায়  আপিল  আবেদন শুনানীতে রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যুক্তি পেশ করছেন। শুনানীর সময়  আদালত তাকে প্রশ্ন করেন- আপনারা যে আইনের বলে আপিল আবেদন করেছেন তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না? কোন বিধান বলে আপনারা এই মামলার ক্ষেত্রে এ দরখাস্ত করেছেন।

তখন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জবাব দেন-এই যে ২০১৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল আইনের আপিলের ধারা সংশোধন করা হয়েছে এবং সরকার পক্ষকে আপিলের সুযোগ দিয়েছে। এ সংশোধনী বলে আমরা আপিল করেছি। আর সংশোধনী আইনে বলা  আছে আছে- ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে এ সংশোধনী কার্যকর বলে ধরে নেয়া হবে।

এসময় আদালত জানতে চান  ১৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধনী আইন পাশ  যে আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা  কোথায়  উল্লেখ আছে দেখান। এসময় আদালত আইনটি সংশোধনের  উদ্দেশ্য পড়ে শোনাতে বলেন এটর্নি জেনারেলকে। আইন পাশের উদ্দেশ্য পড়ে শোনানো হলে তাতে দেখা যায় আইনে যেমন এ বিষয়ে কোন কিছু বলা হয়নি তেমনি সংশোধনী আইন পাশের বিষয়েও আব্দুল কাদের মোল্লার মামলা বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ নেই। তখন প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সংশোধনী পাশের সময় এর উদ্দেশ্য নিয়ে  সংসদে কি আলোচনা হয়েছিল তা আছে আপনার কাছে? সংসদে এর উদ্দেশ্য নিয়ে কোন আলোচনা হয়েছিল না শুধু হাত তুলে হ্যা জয়যুক্ত হয়েছে বলে পাশ হয়েছিল? এটর্নি জেনারেল এসময় সংশোধনী আইন পাশের সময়কার সংসদীয় প্রসিডিংস উপস্থাপন করেন আদালতে।
কিন্তু তা পর্যালোচনা করে দেখা যায় তাতেও সংশোধনীটি পাশের ক্ষেত্রে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোন কিছু উল্লেখ নেই। আব্দুল কাদের মোল্লার রায় বের হবার পর সেক্ষেত্রে  সংশোধনী প্রযোজ্য হবে কি-না সে বিষয়ে কেউ কোন আলোচনাও পেশ করেননি সংসদে। তখন এমপিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন।

এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বিলটি পাশের ক্ষেত্রে সংসদের যে প্রসিডিংস উত্থাপন করেন আদালতে। তাতে  দেখা যায় মো : ফজলে রাব্বি মিয়া সংশোধনী প্রস্তাব বিল আকারে সংসদে উত্থোপন করেন। হুইপ আব্দুল ওয়াহাব  এর ওপর আলোচনা করেন। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সংশোধনী গ্রহনের জন্য স্পিকারের মাধ্যমে অনুরোধ জানান। এরপর কণ্ঠভোটে হ্যা জয়যুক্ত হয়েছে মর্মে বিলটি পাশ হয়। এছাড়া রাশেদ খান মেনন সংশোধনীতে ‘অর্গানাইজেশন’ শব্দটি যোগ করার জন্য প্রস্তাব করেন এবং এ বিষয়ে তিনি বক্তব্য রাখেন। তা এটর্নি জেনারেল পড়ে শোনান আদালতে। তাতে দেখা যায় রাশেদ খান মেনন জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছেন। তিনি বলেন,  ১৯৭১ সালে  জামায়াতে ইসলামী সিদ্ধান্ত নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছে।  আল বদর, আল শাসস, রাজাকার গঠন করে। আজো তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে চলেছে। তাই সংগঠন হিসেবে তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্য তিনি সংশোধনীতে ‘অর্গানাইজেশন’ শব্দ যোগ করার প্রস্তাব করেন। তার বক্তব্য পাঠ শেষ হলে প্রধান বিচারপতি বলেন, এসবতো বেখাপ্পা কথাবার্তা। অস্পষ্ট। এর মধ্যেতো সংশোধনী পাশের উদ্দেশ্য বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ নেই। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এবং বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়াও  একই ধরননের মন্তব্য করেন এসময়।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধ আইনটি পাশের ক্ষেত্রে সংসদে আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে কত সুন্দর  আলোচনা এবং বিতর্ক হয়। অনেক এমপি আইনের ক্ষেত্রে তাদের মতামত তুলে ধরেছিলেন। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরসহ অন্যরা  আইনটি বিষয়ে সংসদে কথা বলেছিলেন।
এসময় অপর বিচারপতি সুরেন্ত্র কুমার সিনহা  আফসোস করে বলেন, সেই সংসদ আর আজকের সংসদ; কোথায় এসে দাড়িয়েছে।
আদালতের নির্দেশে আইনটি পাশের  উদ্দেশ্য সম্পর্কে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ  এর বক্তব্য পড়ে শোনান এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সেখানে উল্লেখ আছে যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে ইন্টারন্যানশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যক্ট প্রণয়ন করা হয়। .....উক্ত অ্যাক্টের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠনক্রমে যুদ্ধাপরাধসহ মানবতাবিরোধী অপরাধেল সাথে জড়িতদের বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য পড়ে শোনানোর পর বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, এখানে ‘বিচার কার্যক্রম চলামান রয়েছে’ বলে একটি কথা আছে। এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মারাত্মক। তিনি বলেন, মিস্টার এটর্নি জেনারেল, এ থেকে যেটি স্পষ্ট তাহল ১৮ ফেব্রুয়ারির সংশোধনী ট্রাইব্যুনালের যেসব বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে সেক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।  এ মামলার ক্ষেত্রে নয়।

১৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধনী আব্দুল কাদের মোল্লা  মালার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না সে বিষয়ে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শেষমেষ তার  জবাবে বলেন- সংশোধনীটি আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।   ট্রাইব্যুনাল রায় প্রদানের পর  এ বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের সমান সুযোগ দিয়ে আইনের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে এ সংশোধনী কার্যকর হবে। আপনাদের ধরে নিতে হবে এই সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর আছে। কাদের মোল্লার রায় হবার আগে থেকেই অর্থাৎ ২০০৯ সাল থেকে  রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সমান সুযোগ ছিল বলে ধরে নিতে হবে। সেখানে কবে রায় হল এবং কবে  আইন সংশোধন হল এটা অপ্রাসঙ্গিক  বিষয়। কারণ সংশোধনীতে বলা হয়েছে এ সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর।

কিন্তু আদালত এটর্নি জেনারেল এর উদ্দেশে  বলেন, আপনার আবেদন গ্রহণ করা হলে আমাদেরকে আইন রিরাইট করতে হবে। আইন রিসেটেল এবং রিস্টাবলিশ করতে হবে।
আদালত আরো বলেন, মনে রাখবেন আমরা আজ  এ মামলায় এখান থেকে যে ব্যাখ্যা দেব তা আইন হয়ে যাবে।  ভবিষ্যতে এর অনেক প্রভাব আছে। সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তাই যা বলার সাবধানে বলবেন। আপনি রাষ্ট্রের এটর্নি জেনারেল। একই সাথে আপনি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক। এ বিষয় মাথায় রেখে সাবমিশন রাখবেন।

আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এর আগে তার সাবমিশনের বলেছিলেন,  ট্রাইব্যুনালের সাজার বিরুদ্ধে পূর্বে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ ছিলনা। কিন্তু ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধনের পর  রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের সুযোগ পেয়েছে এবং তারা মৃত্যুদন্ডের দাবি করে আবেদন করেছে। ১৮ ফ্রেবুয়ারি যদি আইনটি সংশোধন না হত তাহলে কাদের মোল্লার ফাঁসির কোন সুযোগ ছিলনা। আপিল বিভাগকে হয় ট্রাইব্যুনালের সাজা যাবজ্জীবন বহাল রাখতে হত না হয় কমাতে হত। কিন্তু যাবজ্জীবন বাড়িয়ে ফাঁসি দিতে পারতনা। ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধনের ফলে আসামীর অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায়কে কেন্দ্র করে আপিলের ধারা সংশোধন এবং এ নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের সুরাহাসহ অন্যান্য আইনগত বিষয়ে মতামত গ্রহনের জন্য অবশেষে গত ২০ জুন আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় সাতজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে  অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দিলেন সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ। 
সরকার পক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় আপিল আবেদন করে আরো একটি বিব্রতকর অবস্থার  মুখোমুখি হয়েছে।  বিশেষ করে আব্দুল কাদের মোল্লাকে যে অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল সে অভিযোগে শাস্তি দাবি করে আপিলের ক্ষেত্রে। আসামী পক্ষ যুক্তি পেশ করে বলেছে-খালাস দেয়া অভিযোগে শাস্তির দাবি চাইলে রাষ্ট্রপক্ষকে প্রমান করতে হবে ট্রাইব্যুনালের রায় সঠিক ছিলনা। ট্রাইব্যুনালের রায় ন্যায় এবং নীতিভ্রষ্ট । এখন এর জবাবে রাষ্ট্রপক্ষ কি বলবে? তারা কি বলবে ট্রাইব্যুনাল এ ক্ষেত্রে সঠিক রায় দেয়নি? তাহলে তো আর কিছুই রইলনা। কিন্তু তারা এর কোন জবাব দিতে পারছেনা। হ্যা বা না কিছুই বলার কোন উপায় নেই তাদের।

আরো বিষয় আছে। সেটা হল ট্রাইব্যুনালের আইনে বলা হয়েছে- আসামীকে সাজা দিলে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করতে পারবেনা। খালাস দিলে করতে পারবে।  এখন খালাস মানে কি সব অভিযোগ থেকে  বেকসুর খালাস না দুয়েকটি অভিযোগ থেকে খালাস এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয় রায়ের পরে।  একপক্ষের আইনজ্ঞদের মতে আসামীকে সব অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিলেই কেবল রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করতে পারবে। কিন্তু কোন একটি অভিযোগেও যদি ন্যুনতম কোন সাজা দেয় ট্রাইব্যুনাল তাহলে আর  রাষ্ট্রপক্ষ কোন আপিল করতে পারবেনা। কারণ কোন না কোন অভিযোগে আসামীকে সাজা দেয়া হয়েছে। আরেক পক্ষের আইনজ্ঞদের মতে একটি অভিযোগে যদি দণ্ড দেয় এবং একটি অভিযোগে যদি খালাস দেয় তাহলে খালাস দেয়া অভিযোগের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করতে পারবে। ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে ৫টি অভিযোগে দণ্ড দেয় এবং একটি অভিযোগে খালাস দেয়। একপক্ষের আইনজ্ঞরা মত দেন সরকার এ খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেনা এবং আরেক পক্ষের আইনজ্ঞরা বলেন সরকার এ খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। খালাস দেয়া অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকার আপিল করতে পারবে কি পারবেনা এ নিয়ে রায়ের পরপর প্রশ্ন দেখা দিলে দুই পক্ষের আইনজ্ঞদের কাছ থেকে  দুধরনের মতামত আসে। যহোক শেষ পর্যন্ত  সরকার খালাস দেয়া অভিযোগেও শাস্তি দাবি করে আপিল করেছে। আপিল বিভাগের শুনানীতে এ বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে কোর্টের পক্ষ থেকে। এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এ বিষয়ে ভারতের কয়েকটি রেফারেন্স পেশ করেছেন। এ বিষয়ে শুনানীর সময় বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেছেন, সাজার কোন সিঙ্গুলার পুলুরাল হয়না। সাজা মানে সাজা।
গত ২০ জন আদালতের কার্যক্রম শেষে ১৫ দিনের ছুটিতে চলে যায় হাইকোর্ট। আগামী ৭ জুলাই কোর্ট খোলার পর আবার আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী শুরু হবে। ৮ জুলাই থেকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত আইনজীবীদের শুনানী পেশ করার কথা রয়েছে। আব্দুল কাদের মোল্লার মামলা আপিল শুনানী শেষ পর্যায়ে ছিল। ২০ জুন কোর্ট ছুটিতে যাবার আগেই আশা করা হয়েছিল উভয় পক্ষের শুনানী শেষ হয়ে যাবে এবং চূড়ান্ত রায়ের তারিখ নির্ধারন করা   হতে পারে। কিন্তু ছুটির আগে শেষ কর্মদিবসে সাত অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগের মাধ্যমে মামলাটির শুনানী নতুন পর্যায় লাভ করেছে।

ট্রাইব্যুনালের আইনের ধারা সংশোধন করে ২ মাসের মধ্যে আপিল আবেদন নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়।  ৪ মার্চ আসামী পক্ষ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় রায়ের বিরুদ্ধে আসামী পক্ষ আপিল করে।  দুই মাস সময় পার হয়ে গেছে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে।  সম্প্রতি আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন দুই মাসের সময়সীমা মেনে চলতে আপিল বিভাগ বাধ্য নয়। সব মিলিয়ে বলা যায়  যুদ্ধাপরাধ মামলার আপিল শুনানী নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ : কাদের মোল্লা মামলার আপিল শুনানী নতুন মোড় নিয়েছে

মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সাত বিশিষ্ট আইনবিদকে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেয়ার মধ্য দিয়ে আব্দুল কাদের মোল্লা মামলার আপিল শুনানী নতুন  পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।  ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ক্ষেত্রে পূর্বের বিধান ছিল- আসামী পক্ষ সাজার  বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আসামীকে সাজা দেয়া হলে রাষ্ট্রপক্ষ আর  আপিল করতে পারবেনা। ট্রাইব্যুনালের রায়ে যদি আসামীকে  খালাস দেয়া হয় শুধুমাত্র সেক্ষেত্রে সরকার পক্ষ বা অভিযোগকারী আপিল করার সুযোগ পাবে; অন্যথায় নয়। কিন্তু আব্দুল কাদের মোল্লাকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের পর তার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলন গড়ে  ওঠে।  সে প্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইবুনাল আইনের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয় সংসদে।  সংশোধিত আইনে বলা হয়- আসামী পক্ষের মত সরকার পক্ষও আপিলের সমান সুযোগ পাবে। অর্থাৎ শুধু খালাসের ক্ষেত্রে নয়, ট্রাইব্যুনালের যেকোন রায়ের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষও আপিল করতে  পারবে । আপিল সংক্রান্ত বিধান সংশোধনী বিষয়ে বলা হয়েছে-এ সংশোধনী ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে কার্যকর ছিল বলে ধরে নিতে হবে।
এই যে ২০১৩ সালে আইন করে বলা হল ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর ছিল বলে ধরে নিতে হবে একেই বলে রিট্রোসপেক্টিবভ ইফেক্ট বা ভূতাপেক্ষতা।

আইনের আপিল সংক্রন্তা ধারা সংশোধনের পর সরকার পক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের দাবি জানিয়ে আপিল আবেদন করে। এছাড়া  কাদের মোল্লাকে যে একটি অভিযোগ থেকে ট্রাইব্যুনাল খালাস দিয়েছে সেটিতেও সাজা দাবি করা হয়েছে সরকার পক্ষের আবেদনে।

আপিল শুনানীতে  রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের কাছ থেকে অনেক আইনগত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে ।  এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হল- গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যে আইন সংশোধন করা হয়েছে  তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য কি-না।  এছাড়া অপর যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপিত হয়েছে তাহল- আদালত  এটর্নি জেনারেল এর কাছ থেকে জানতে চেয়েছেন- উপমহাদেশ বা ইংল্যান্ডের এমন কোন নিজর আছে কি-না যেখানে  রায় হবার পর এভাবে  আইন সংশোধন করে রিট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট কার্যকর করা হয়েছে।

১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধনী করে সরকার পক্ষকে আপিলের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এ সংশোধনী আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে  প্রযোজ্য কি-না এ প্রশ্নের জবাব   পাবার জন্য আদালত আইনটি পাশের সময় সংসদ প্রসিডিংস   হাজির করতে বলেন রাষ্ট্রপক্ষকে। কিন্তু সংসদীয় প্রসিডিংস পর্যালোচনা করে দেখা যায় সংশোধনী আইনটি আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে  প্রযোজ্য   না-কি চলমান অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সে বিষয়ে আইনে যেমন কোন কিছু নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি তেমনি সংসদ প্রসিডিংসেও কিছু  উল্লেখ নেই।

মজার বিষয় হল আব্দুল কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল আইনের আপিলের ধারা সংশোধন করা হয়েছে  কিন্তু আইনের সংশোধনিটি আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে  কি-না সে বিষয়ে কোথাও কোন কিছু উল্লেখ করা হয়নি। আপিলের ধারা সংশোধনীতে বিরাট একটা ফাঁক বা দুর্বলতা রয়ে গেছে। এ বিষয়টি বেরিয়ে আসে আপিল শুনানীর সময়।

আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায়  আপিল  আবেদন শুনানীতে রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যুক্তি পেশ করছেন। শুনানীর সময়  আদালত তাকে প্রশ্ন করেন- আপনারা যে আইনের বলে আপিল আবেদন করেছেন তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না? কোন বিধান বলে আপনারা এই মামলার ক্ষেত্রে এ দরখাস্ত করেছেন।

তখন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জবাব দেন-এই যে ২০১৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল আইনের আপিলের ধারা সংশোধন করা হয়েছে এবং সরকার পক্ষকে আপিলের সুযোগ দিয়েছে। এ সংশোধনী বলে আমরা আপিল করেছি। আর সংশোধনী আইনে বলা  আছে আছে- ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে এ সংশোধনী কার্যকর বলে ধরে নেয়া হবে।

এসময় আদালত জানতে চান  ১৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধনী আইন পাশ  যে আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা  কোথায়  উল্লেখ আছে দেখান। এসময় আদালত আইনটি সংশোধনের  উদ্দেশ্য পড়ে শোনাতে বলেন এটর্নি জেনারেলকে। আইন পাশের উদ্দেশ্য পড়ে শোনানো হলে তাতে দেখা যায় আইনে যেমন এ বিষয়ে কোন কিছু বলা হয়নি তেমনি সংশোধনী আইন পাশের বিষয়েও আব্দুল কাদের মোল্লার মামলা বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ নেই। তখন প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সংশোধনী পাশের সময় এর উদ্দেশ্য নিয়ে  সংসদে কি আলোচনা হয়েছিল তা আছে আপনার কাছে? সংসদে এর উদ্দেশ্য নিয়ে কোন আলোচনা হয়েছিল না শুধু হাত তুলে হ্যা জয়যুক্ত হয়েছে বলে পাশ হয়েছিল? এটর্নি জেনারেল এসময় সংশোধনী আইন পাশের সময়কার সংসদীয় প্রসিডিংস উপস্থাপন করেন আদালতে।
কিন্তু তা পর্যালোচনা করে দেখা যায় তাতেও সংশোধনীটি পাশের ক্ষেত্রে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোন কিছু উল্লেখ নেই। আব্দুল কাদের মোল্লার রায় বের হবার পর সেক্ষেত্রে  সংশোধনী প্রযোজ্য হবে কি-না সে বিষয়ে কেউ কোন আলোচনাও পেশ করেননি সংসদে। তখন এমপিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন।

এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বিলটি পাশের ক্ষেত্রে সংসদের যে প্রসিডিংস উত্থাপন করেন আদালতে। তাতে  দেখা যায় মো : ফজলে রাব্বি মিয়া সংশোধনী প্রস্তাব বিল আকারে সংসদে উত্থোপন করেন। হুইপ আব্দুল ওয়াহাব  এর ওপর আলোচনা করেন। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সংশোধনী গ্রহনের জন্য স্পিকারের মাধ্যমে অনুরোধ জানান। এরপর কণ্ঠভোটে হ্যা জয়যুক্ত হয়েছে মর্মে বিলটি পাশ হয়। এছাড়া রাশেদ খান মেনন সংশোধনীতে ‘অর্গানাইজেশন’ শব্দটি যোগ করার জন্য প্রস্তাব করেন এবং এ বিষয়ে তিনি বক্তব্য রাখেন। তা এটর্নি জেনারেল পড়ে শোনান আদালতে। তাতে দেখা যায় রাশেদ খান মেনন জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছেন। তিনি বলেন,  ১৯৭১ সালে  জামায়াতে ইসলামী সিদ্ধান্ত নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছে।  আল বদর, আল শাসস, রাজাকার গঠন করে। আজো তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে চলেছে। তাই সংগঠন হিসেবে তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্য তিনি সংশোধনীতে ‘অর্গানাইজেশন’ শব্দ যোগ করার প্রস্তাব করেন। তার বক্তব্য পাঠ শেষ হলে প্রধান বিচারপতি বলেন, এসবতো বেখাপ্পা কথাবার্তা। অস্পষ্ট। এর মধ্যেতো সংশোধনী পাশের উদ্দেশ্য বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ নেই। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এবং বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়াও  একই ধরননের মন্তব্য করেন এসময়।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধ আইনটি পাশের ক্ষেত্রে সংসদে আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে কত সুন্দর  আলোচনা এবং বিতর্ক হয়। অনেক এমপি আইনের ক্ষেত্রে তাদের মতামত তুলে ধরেছিলেন। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরসহ অন্যরা  আইনটি বিষয়ে সংসদে কথা বলেছিলেন।
এসময় অপর বিচারপতি সুরেন্ত্র কুমার সিনহা  আফসোস করে বলেন, সেই সংসদ আর আজকের সংসদ; কোথায় এসে দাড়িয়েছে।
আদালতের নির্দেশে আইনটি পাশের  উদ্দেশ্য সম্পর্কে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ  এর বক্তব্য পড়ে শোনান এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সেখানে উল্লেখ আছে যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে ইন্টারন্যানশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যক্ট প্রণয়ন করা হয়। .....উক্ত অ্যাক্টের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠনক্রমে যুদ্ধাপরাধসহ মানবতাবিরোধী অপরাধেল সাথে জড়িতদের বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য পড়ে শোনানোর পর বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, এখানে ‘বিচার কার্যক্রম চলামান রয়েছে’ বলে একটি কথা আছে। এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মারাত্মক। তিনি বলেন, মিস্টার এটর্নি জেনারেল, এ থেকে যেটি স্পষ্ট তাহল ১৮ ফেব্রুয়ারির সংশোধনী ট্রাইব্যুনালের যেসব বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে সেক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।  এ মামলার ক্ষেত্রে নয়।

১৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধনী আব্দুল কাদের মোল্লা  মালার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না সে বিষয়ে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শেষমেষ তার  জবাবে বলেন- সংশোধনীটি আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।   ট্রাইব্যুনাল রায় প্রদানের পর  এ বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের সমান সুযোগ দিয়ে আইনের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে এ সংশোধনী কার্যকর হবে। আপনাদের ধরে নিতে হবে এই সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর আছে। কাদের মোল্লার রায় হবার আগে থেকেই অর্থাৎ ২০০৯ সাল থেকে  রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সমান সুযোগ ছিল বলে ধরে নিতে হবে। সেখানে কবে রায় হল এবং কবে  আইন সংশোধন হল এটা অপ্রাসঙ্গিক  বিষয়। কারণ সংশোধনীতে বলা হয়েছে এ সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর।

কিন্তু আদালত এটর্নি জেনারেল এর উদ্দেশে  বলেন, আপনার আবেদন গ্রহণ করা হলে আমাদেরকে আইন রিরাইট করতে হবে। আইন রিসেটেল এবং রিস্টাবলিশ করতে হবে।
আদালত আরো বলেন, মনে রাখবেন আমরা আজ  এ মামলায় এখান থেকে যে ব্যাখ্যা দেব তা আইন হয়ে যাবে।  ভবিষ্যতে এর অনেক প্রভাব আছে। সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তাই যা বলার সাবধানে বলবেন। আপনি রাষ্ট্রের এটর্নি জেনারেল। একই সাথে আপনি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক। এ বিষয় মাথায় রেখে সাবমিশন রাখবেন।

আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এর আগে তার সাবমিশনের বলেছিলেন,  ট্রাইব্যুনালের সাজার বিরুদ্ধে পূর্বে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ ছিলনা। কিন্তু ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধনের পর  রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের সুযোগ পেয়েছে এবং তারা মৃত্যুদন্ডের দাবি করে আবেদন করেছে। ১৮ ফ্রেবুয়ারি যদি আইনটি সংশোধন না হত তাহলে কাদের মোল্লার ফাঁসির কোন সুযোগ ছিলনা। আপিল বিভাগকে হয় ট্রাইব্যুনালের সাজা যাবজ্জীবন বহাল রাখতে হত না হয় কমাতে হত। কিন্তু যাবজ্জীবন বাড়িয়ে ফাঁসি দিতে পারতনা। ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধনের ফলে আসামীর অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায়কে কেন্দ্র করে আপিলের ধারা সংশোধন এবং এ নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের সুরাহাসহ অন্যান্য আইনগত বিষয়ে মতামত গ্রহনের জন্য অবশেষে গত ২০ জুন আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় সাতজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে  অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দিলেন সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ। 
সরকার পক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় আপিল আবেদন করে আরো একটি বিব্রতকর অবস্থার  মুখোমুখি হয়েছে।  বিশেষ করে আব্দুল কাদের মোল্লাকে যে অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল সে অভিযোগে শাস্তি দাবি করে আপিলের ক্ষেত্রে। আসামী পক্ষ যুক্তি পেশ করে বলেছে-খালাস দেয়া অভিযোগে শাস্তির দাবি চাইলে রাষ্ট্রপক্ষকে প্রমান করতে হবে ট্রাইব্যুনালের রায় সঠিক ছিলনা। ট্রাইব্যুনালের রায় ন্যায় এবং নীতিভ্রষ্ট । এখন এর জবাবে রাষ্ট্রপক্ষ কি বলবে? তারা কি বলবে ট্রাইব্যুনাল এ ক্ষেত্রে সঠিক রায় দেয়নি? তাহলে তো আর কিছুই রইলনা। কিন্তু তারা এর কোন জবাব দিতে পারছেনা। হ্যা বা না কিছুই বলার কোন উপায় নেই তাদের।

আরো বিষয় আছে। সেটা হল ট্রাইব্যুনালের আইনে বলা হয়েছে- আসামীকে সাজা দিলে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করতে পারবেনা। খালাস দিলে করতে পারবে।  এখন খালাস মানে কি সব অভিযোগ থেকে  বেকসুর খালাস না দুয়েকটি অভিযোগ থেকে খালাস এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয় রায়ের পরে।  একপক্ষের আইনজ্ঞদের মতে আসামীকে সব অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিলেই কেবল রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করতে পারবে। কিন্তু কোন একটি অভিযোগেও যদি ন্যুনতম কোন সাজা দেয় ট্রাইব্যুনাল তাহলে আর  রাষ্ট্রপক্ষ কোন আপিল করতে পারবেনা। কারণ কোন না কোন অভিযোগে আসামীকে সাজা দেয়া হয়েছে। আরেক পক্ষের আইনজ্ঞদের মতে একটি অভিযোগে যদি দণ্ড দেয় এবং একটি অভিযোগে যদি খালাস দেয় তাহলে খালাস দেয়া অভিযোগের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করতে পারবে। ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে ৫টি অভিযোগে দণ্ড দেয় এবং একটি অভিযোগে খালাস দেয়। একপক্ষের আইনজ্ঞরা মত দেন সরকার এ খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেনা এবং আরেক পক্ষের আইনজ্ঞরা বলেন সরকার এ খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। খালাস দেয়া অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকার আপিল করতে পারবে কি পারবেনা এ নিয়ে রায়ের পরপর প্রশ্ন দেখা দিলে দুই পক্ষের আইনজ্ঞদের কাছ থেকে  দুধরনের মতামত আসে। যহোক শেষ পর্যন্ত  সরকার খালাস দেয়া অভিযোগেও শাস্তি দাবি করে আপিল করেছে। আপিল বিভাগের শুনানীতে এ বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে কোর্টের পক্ষ থেকে। এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এ বিষয়ে ভারতের কয়েকটি রেফারেন্স পেশ করেছেন। এ বিষয়ে শুনানীর সময় বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেছেন, সাজার কোন সিঙ্গুলার পুলুরাল হয়না। সাজা মানে সাজা।
গত ২০ জন আদালতের কার্যক্রম শেষে ১৫ দিনের ছুটিতে চলে যায় হাইকোর্ট। আগামী ৭ জুলাই কোর্ট খোলার পর আবার আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী শুরু হবে। ৮ জুলাই থেকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত আইনজীবীদের শুনানী পেশ করার কথা রয়েছে। আব্দুল কাদের মোল্লার মামলা আপিল শুনানী শেষ পর্যায়ে ছিল। ২০ জুন কোর্ট ছুটিতে যাবার আগেই আশা করা হয়েছিল উভয় পক্ষের শুনানী শেষ হয়ে যাবে এবং চূড়ান্ত রায়ের তারিখ নির্ধারন করা   হতে পারে। কিন্তু ছুটির আগে শেষ কর্মদিবসে সাত অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগের মাধ্যমে মামলাটির শুনানী নতুন পর্যায় লাভ করেছে।

ট্রাইব্যুনালের আইনের ধারা সংশোধন করে ২ মাসের মধ্যে আপিল আবেদন নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়।  ৪ মার্চ আসামী পক্ষ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় রায়ের বিরুদ্ধে আসামী পক্ষ আপিল করে।  দুই মাস সময় পার হয়ে গেছে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে।  সম্প্রতি আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন দুই মাসের সময়সীমা মেনে চলতে আপিল বিভাগ বাধ্য নয়। সব মিলিয়ে বলা যায়  যুদ্ধাপরাধ মামলার আপিল শুনানী নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৩

আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী সহায়তায় ৭ অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ


মেহেদী হাসান
আব্দুল কাদের মোল্লা মামালায় আপিল শুনানীতে সহায়তা  এবং মতামত গ্রহনের জন্য  বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সাতজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ গতকাল বৃহষ্পতিবার  এ নিয়োগ প্রদান করেন। এরা হলেন, সাবেক বিচারপতি  টি এইচ খান, সাবেক এটর্নি জেনারেল প্রবীন আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এএফ হাসান আরিফ, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি।

আজ  সকালে আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী শুরু হলে প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বলেন, আমরা এই মামলায়  অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।  তাদের কাছ থেকে ল’পয়েন্টে মতামত গ্রহণ করা হবে।

এরপর বিকালে এটর্নি জেনারেল অফিস থেকে সাতজন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগের কথা জানানো হয়েছে।

আজ রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী পেশ করেন। ১৫ দিনের জন্য  গ্রীস্মের ছুটিতে যাবার আগে আজই  ছিল শুনানীর শেষ দিন। তবে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানী শেষ হয়নি। ছুটি শেষে আগামী সাত জুলাই পুনরায় কোর্ট বসলে এটর্নি জেনারেল তার অসমাপ্ত শুনানী পেশ করবেন। এরপর অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত আইনজীবীদের মতামত গ্রহণ করবেন আদালত।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। রায়ের  বিরুদ্ধে আসামী এবং রাষ্ট্র উভয় পক্ষ থেকে আপিল করা হয়েছে। আপিল শুনানীতে  রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের কাছ থেকে অনেক আইনগত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে । বিশেষ করে ট্রাইব্যুনালের রায় হবার পর রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের সুযোগ দিয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যে আইন সংশোধন করা হয়েছে  তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য কি-না তা নির্দিষ্ট করে জানতে  চান আদালত। গত মঙ্গল এবং বুধবার এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানী পেশ করার সময় আদালতের কাছ থেকে  এ বিষয়ে অসংখ্য প্রশ্নের মুখোমুখি হন।

ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ক্ষেত্রে পূর্বের বিধান ছিল আসামী পক্ষ সাজার  বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আসামীকে সাজা দেয়া হলে রাষ্ট্রপক্ষ আর  আপিল করতে পারবেনা। ট্রাইব্যুনালের রায়ে যদি আসামীকে  খালাস দেয়া হয় শুধুমাত্র সেক্ষেত্রে সরকার পক্ষ বা অভিযোগকারী আপিল করার সুযোগ পাবে; অন্যথায় নয়। কিন্তু আব্দুল কাদের মোল্লাকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের পর তার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলন গড়ে  ওঠে।  সে প্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইবুনালের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয় সংসদে।  সংশোধিত আইনে বলা হয় আসামী পক্ষের মত সরকার পক্ষও আপিলের সমান সুযোগ পাবে। অর্থাৎ শুধু খালাসের ক্ষেত্রে নয়, ট্রাইব্যুনালের যেকোন রায়ের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষও আপিল করতে  পারবে ।
আইনের আপিল সংক্রন্তা ধারা সংশোধনের পর সরকার পক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের দাবি জানিয়ে আপিল আবেদন করে।
গত মঙ্গল এবং বুধবারের শুনানীর সময় আদালত সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চান ১৮ ফেব্রুয়ারির সংশোধনী আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না। আদালত এ প্রশ্নের জবাব   পাবার জন্য আইনটি পাশের সময় সংসদ প্রসিডিংস   হাজির করতে বলেন রাষ্ট্রপক্ষকে। কিন্তু সংসদীয় প্রসিডিংস পর্যালোচনা করে দেখা যায় সংশোধনী আইনটি আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে  প্রযোজ্য  না চলমান অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সে বিষয়ে আইনে যেমন কোন কিছু নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি তেমনি সংসদ প্রসিডিংসেও কিছু  উল্লেখ নেই।
আদালত এটর্নি জেনারেল এর কাছ থেকে জানতে চান- উপমহাদেশ বা ইংল্যান্ডের অন্তত একটি উদাহরন পেশ করুন যেখানে  রায় হবার পর আইন সংশোধন করে রিট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট কার্যকর করার নজির আছে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ এ নজির পেশ করত ব্যর্থ হয়।
১৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধনী এই মালার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না সে বিষয়ে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গত দুই দিনে তার জবাবে বলেন- প্রযোজ্য। তিনি বলেন,  ট্রাইব্যুনাল রায় প্রদানের পর  এ বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের সমান সুযোগ দিয়ে আইনের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে এ সংশোধনী কার্যকর হবে। আপনাদের ধরে নিতে হবে এই সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর আছে। কাদের মোল্লার রায় হবার আগে থেকেই অর্থাৎ ২০০৯ সাল থেকে  রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সমান সুযোগ ছিল বলে ধরে নিতে হবে। সেখানে কবে রায় হল এবং কবে  আইন সংশোধন হল এটা অপ্রাসঙ্গিক  বিষয়। কারণ সংশোধনীতে বলা হয়েছে এ সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর।
কিন্তু আদালত এটর্নি জেনারেল এর উদ্দেশে গত বুধবার বলেন, আপনার আবেদন গ্রহণ করা হলে আমাদেরকে আইন রিরাইট করতে হবে। আইন রিসেটেল এবং রিস্টাবলিশ করতে হবে।
আদালত আরো বলেন, মনে রাখবেন আমরা আজ  এ মামলায় এখান থেকে যে ব্যাখ্যা দেব তা আইন হয়ে যাবে।  ভবিষ্যতে এর অনেক প্রভাব আছে। সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তাই যা বলার সাবধানে বলবেন। আপনি রাষ্ট্রের এটর্নি জেনারেল। একই সাথে আপনি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক।

অবশেষে আজ   আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় আপিল বিভাগ অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দিলেন আইনী বিষয়ে তাদের মতামত গ্রহনের জন্য। অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ বিষয়ে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে কোট করে বিভিন্ন অনলাইনে পরিবেশিত খবরে বলা হয়- ১৯৭৩ সালের আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের যে সুযোগ দেয়া হয়েছে তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য কি-না সে বিষয়ে এমিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করবেন আদালত।

এটর্নি জেনারেল এর কাছে দৈনিক নয়া  দিগন্ত’র পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়- নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে  যেমন আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন বিষয়ে মতামত নেয়া হবে কি-না সে বিষয়ে সকালে কোর্ট তো নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। কোর্ট বলেছেন ল’পয়েন্টে মতামত নেয়া হবে। তাহলে আপিলের ধারা  সংশোধন বিষয়ে মতামত নেয়ার যে কথা আপনি বলেছেন তার ভিত্তি কি-। তখন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম  বলেন, আমি যেটা বলেছি সেটা আমার অনুমান।   আমি এখনো নিয়োগের অর্ডার কপি পাইনি।

এদিকে আজ  বৃহষ্পতিবার শুনানীর সময় আদালত এটর্নি জেনারেল এর কাছে জানতে চান যাবজ্জীবন কারাদন্ডের মেয়াদ কত বছর ।  এটর্নি জেনারেল বলেন,  আমৃত্য। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা  তার সাথে একমত পোষন করেন।
বাংলাদেশের ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৫৭ তে বলা হয়েছে যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের আইনের ক্ষেত্রে পেনাল কোর্ড এবং সিআরপিসি প্রযোজ্য নয়। অপর দিকে ট্রাইব্যুনালের আইনে যাবজ্জীবন সাজার  মেয়াদও উল্লেখ নেই। ফলে এ নিয়ে গতকাল প্রশ্ন তোলেন আদালত।
অপরদিকে এ বিচার দেশীয় আইনে করা যাবে বলে  মত দেন আদালত।
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ গতকাল শুনানী গ্রহণ করেন।