সাঈদী : আপিল শুনানী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাঈদী : আপিল শুনানী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আমত্যৃ জেল

মেহেদী হাসান, ১৭/৯/২০১৪
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তিনটি পৃথক অভিযোগে তাকে আমৃত্যু জেল, অপর  দুটি অভিযোগের একটিতে ১২ বছর এবং আরেকটিতে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

আলোচিত ইব্রাহিম কুট্টি হত্যাকান্ডে ১২ বছর জেল এবং বিশাবালী হত্যাকান্ডে আমৃত্যু জেল দেয়া হয়েছে। বিশাবালী হত্যার অভিযোগসহ আরো দুটি অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে আমৃত্যু কারান্দণ্ড  দেয়া হয়েছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ চূড়ান্ত এ রায় ঘোষনা করে আজ। 

রায়ে আসামী এবং রাষ্ট্রপক্ষ উভয়পক্ষের আবেদন আংশিকভাবে মঞ্জুর করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে মাওলানা সাঈদীকে মোট আটটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। এর মধ্যে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়। অপর ছয়টি অভিযোগে কোন সাজা  উল্লেখ করেনি ট্রাইব্যুনাল।
আসামী পক্ষ মাওলানা সাঈদীকে বেকসুর খালাস এবং রাষ্ট্রপক্ষ ছয়টি অভিযোগে সাজা উল্লেখের দাবি জানিয়ে আপিল আবেদন করেছিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে।

আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে আসামী পক্ষের আবেদন আংশিক গ্রহণ করে  মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে একটিতে আমত্যৃ জেল এবং আরেকটিতে ১২ বছর কারাদন্ড দেয়া হল।
অপরদিকে ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাজা উল্লেখ করা হয়নি এমন ছয়টি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে সাজা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনও আংশিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। অপর তিনটি অভিযোগ থেকে মাওলানা সাঈদীকে খালাস দেয়া হয়েছে।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ২০টি অভিযোগ আনে। আলোচিত ইব্রাহিম কুট্টির হত্যার অভিযোগ ছিল  আট নং অভিযোগ।  এ অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মুত্যুদন্ড দেয়। আপিল বিভাগের রায়ে এ অভিযোগে ১২ বছর কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। অপর দিকে বিশাবালীর অভিযোগটি ছিল ১০ নং অভিযোগ। এ অভিযোগেও ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল। আজকের রায়ে এ অভিযোগে আমৃত্য কারাদন্ড দেয়া হয়েছে।

অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন গ্রহণ করে যে তিনটি অভিযোগে সাজা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হল সাত, ১৬ এবং ১৯ নং অভিযোগ।
১৬ নং অভিযোগ হল  গৌরাঙ্গ সাহার তিন বোন মহামায়া, আনু এবং কমলা নামে তিন বোনকে অপহরন করে পাকিস্তানী সেনাদের হাতে তুলে দেয়ার অভিযোগ। এ অভিযোগে  আপিল বিভাগের রায়ে মাওলানা সাঈদীকে আমৃত্য জেল দেয়া হয়েছে। অপরদিকে  ১৯ নং অভিযোগ হল  মুক্তিযুদ্ধ চলাকলে ১০০ থেকে ১৫০ জন হিন্দুকে জোর করে ধর্মান্তরকরন। এ অভিযোগেও মাওলানা সাঈদীকে আমৃত্যু জেলা দেয়া হয়েছে।
সাত নং অভিযোগ ছিল শহিদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে আগুন দেয়া। এ অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
সাত, ১৬ এবং ১৯ নং অভিযোগে ট্রাইবু্যুনাল মাওলানা সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করলেও কোন সাজা উল্লেখ করেনি।  আপিল বিভাগর রায়ে  এ তিন অভিযোগের বিপরীতে সাজা  উল্লেখ করা হল।

এছাড়া আরো তিনটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল মাওলানা সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করলেও  সে তিনটি অভিযোগে আজকের  চূড়ান্ত রায়ে খালাস দেয়া হয়েছে।  এ অভিযোগ তিনটি হল  (৬) পাড়েরহাট বাজারে দোকানপাটে  লুটপাটে নেতৃত্ব প্রদান এবং অংশ নেয়া, (১১) মাহবুবুল আলম হাওলাদার বাড়িতে লুট এবং তার ভাইকে নির্যাতন  এবং (১৪)  ১৯৭১ সালে  হোগলাবুনিয়া এলাকায় হিন্দু পাড়ায় আক্রমন এবং শেফালী ঘরামী নামে একজন মহিলাকে রাজাকার কর্তৃক  ধর্ষনে সহায়তা এবং সেখানে উপস্থিত থাকা  ।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের  আপিল বেঞ্চ  সকালে মাওলানা সাঈদীর আপিল মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষনা করে। সকাল ১০টা পাঁচ মিনিটের সময় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে বেঞ্চের অপর চার বিচারপতি আদালত কক্ষে প্রবেশ করেন। ১০টা সাত মিনিটের সময় সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষনা শুরু করেন। তিন মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায় রায় ঘোষনা। এসময় আদালত কক্ষে বিপুল সংখ্যক আইনজীবী এবং সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
গত ১৬ এপ্রিল আপিল বিভাগে মাওলানা সাঈদীর আপিল মামলার  সমস্ত কার্যক্রম শেষে  রায় অপেক্ষমান ঘোষনা করা হয়। ঠিক পাঁচ মাস শেষে  চূড়ান্ত রায় ঘোষনা করা হল।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মাওলানা সাঈদীকে  মৃত্যুদন্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
ওই বছর ২৪ সেপ্টেম্বর আপিল শুনানী শুরু হয়। সাড়ে ছয় মাসেরও অধিক সময় পর আলোচিত এ মামলায় আপিল শুনানী শেষে রায় অপেক্ষমান ঘোষনা করা হয় গত  ১৬ এপ্রিল।

মাওলানা সাঈদীর আপিল মামলার শুনানীর জন্য প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে  পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ গঠন করা হয় তখন। বেঞ্চের  অপর চার বিচারপতি হলেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞ, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিক ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

ইবরাহীম কুট্টি ও বিশাবালী হত্যার অভিযোগ : মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগ বিষয়ে বলা হয়  ১৯৭১ সালের ৮ মে মাওলানা সাঈদীর  সাঈদীর নেতৃত্বে  পাকিস্তান আর্মি এবং শান্তি কমিটির লোকজন চিথলিয়া গ্রামে যায় এবং মানিক পসারীর বাড়ি লুট করে । এরপর মানিক পসারীর বাড়ি থেকে ইব্রাহীম কৃট্টি  এবং মফিজুল নামে দুজনকে  ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পাড়েরহাট বাজারে।  তারা ওই বাড়িতে কাজ করত। পাড়েরহাট বাজারে আনার পর  মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে পাকিস্তান আর্মি ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে হত্যা করে।

১০ নং যে অভিযোগ বিষয়ে চার্জ ফ্রেমিং অর্ডারে উল্লেখ করা হয়েছে   ১৯৭১ সালের ৬ জুন  সকাল ১০টার দিকে উমেদপুর গ্রামে সাঈদীর নেতৃত্বে ২৫টি ঘর আগুন  দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এসময় সাঈদীর নির্দেশে বিশাবালী নামে একজনকে নারকেল গাছের সাথে বেঁধে হত্যা করা হয়।

আপিল শুনানীর সময় আলোচিত ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে আসামী পক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করে জানায়  ইব্রাহিম কুট্টি ১৯৭১ সালে আট মে তার শশুরবাড়ি নলবুনিয়া থাকা অবস্থায় নিহত হয়েছে। এ বিষয়ে তার স্ত্রী মমতকাজ বেগম ১৯৭২ সালে মামলা করে ১৩ জনকে আসামী করে তাতে মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। মমতাজ বেগম এখনো জীবিত আছেন।

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরন : ২০১১ সালের ৭ ডিসেম্বর মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। এক বছরের মাথায় ২০১২ সালের  ৬ ডিসেম্বর  মামলার সমস্ত  কার্যক্রম শেষে রায়ের তারিখ অপেক্ষমান ঘোষনা করেন ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু স্কাইপ কেলেঙ্কারির জের ধরে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করেন ১১ ডিসেম্বর। এরপর মাওলানা সাঈদীসহ অন্যান্য মামলার পুনরায় বিচার দাবি করে দরখাস্ত করা হয় আসামী পক্ষ থেকে। সে আবেদন খারিজ হয়ে যায়। তবে মাওলানা সাঈদীর মামলায় পুনরায় যুক্তি  উপস্থাপন শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ১৩ জানুয়ারি পুনরায় যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয় এবং ২৯ জানুয়ারি  উভয় পক্ষের যুক্তি পেশ শেষ হলে  সেদিন পুনরায় রায়ের তারিখ অপেক্ষমান ঘোষনা করেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ের তারিখ অপেক্ষমান ঘোষনার এক মাসের মাথায় নির্দিষ্ট করে তারিখ ঘোষনা করলেন ট্রাইব্যুনাল।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত  মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ২০১০ সালের মার্চ মাসে  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গঠন করা হয়।  ট্রাইব্যুনালে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলাটিই ছিল প্রথম মামলা। তবে স্কাইপ কেলেঙ্করির কারনে  পিছিয়ে যায় এ মামলার রায় ঘোষনার বিষয়টি।

মানিক পসারী নামে এক লোক   পিরোজপুরের মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে  ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট  মাওলানা  দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ঘটনায় একটি মামলা করেন। এর কয়েক দিন পর ৯ সেপ্টেম্বর মাহবুবুল আলম নামে আরেক ব্যক্তি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আরেকটি নালিশ দায়ের করেন পিরোজপুর নালিশী আদালতে।

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুরে  মামলার বাদী মাহবুবুল আলম হাওলাদার  ২০১০ সালের ২০ জুলাই ঢাকায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে বিচার দাবী করেন।  এভাবে মাওলানা সাঈদীর বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের অধীনে আসে এবং  বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

এর আগে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া সংক্রান্ত একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয় মাওলানা সাঈদীকে। সেই থেকে তিনি বন্দী রয়েছেন।

মাওলানা সাঈদীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় : মাওলানা  দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১ তারিখ পিরোজপুরের সাঈদখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মওলানা ইউসুফ সাঈদী দেশের দণিাঞ্চলের সুপরিচিত ইসলামী চিন্তাবিদ ও বক্তা ছিলেন।
মাওলানা সাঈদী নিজ পিতার প্রতিষ্ঠিত দ্বীনি শিা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক শিা লাভ করার পর তিনি ১৯৬২ সালে মাদরাসা শিক্ষা শেষ করে গবেষণা কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
১৯৬৭ থেকে মাওলানা  সাঈদী বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এবং বিশ্বের বহু দেশে  মহাগ্রন্থ আল কুরআনের তাফসীর করেছেন।  তার ওয়াজ শুনে  অসংখ্য অনেক  হিন্দু  এবং অন্যান্য ধর্মের মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। কোরআন হাদিস এবং ইসলামের ওপর রচনা করেছেন অসংখ্য পুস্তক। পেয়েছেন নানা উপাধি, খ্যাতি ও  সম্মান। তার তাফসিরের অডিও ভিডিও পাওয়া যায় দেশে বিদেশে সর্বত্র।  দেশে বিদেশে তৈরি হয়েছে তার অগনিত ভক্ত অনুরাগী। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ মাওলানা সাঈদীর ওয়াজ মাহফিলে অংশ নিয়েছেন। বিশ্বের বহু দেশ থেকে নামকরা অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের  আমন্ত্রনে তিনি সেসব দেশ সফর করেছেন এবং  কোরআনের  তাফসির করেছেন।







মাওলানা সাঈদীর মামলায় চূড়ান্ত রায় কাল

মেহেদী হাসান, ১৬/৯/২০১৪
বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মোফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল মামলার  চূড়ান্ত রায় আগামীকাল ঘোষনা করা হবে। সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে আগামী কালের মামলার কার্যতালিকায় মাওলানা সাঈদীর আপিল মামলার রায় ঘোষনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। 

আগামী কালের মামলার কার্যতালিকায় এক নং ক্রমিকে রয়েছে এ মামলার রায় ঘোষনার বিষয়টি। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে একদিন আগেই  প্রকাশ করা হয়  পরবর্তী দিনের মামলার কার্যতালিকা।

গত ১৬ এপ্রিল আপিল বিভাগে মাওলানা সাঈদীর আপিল মামলার  সমস্ত কার্যক্রম শেষে  রায় অপেক্ষমান ঘোষনা করা হয়। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ আপিল মামলার বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মাওলানা সাঈদীকে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদন্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ১৯৭১ সালে হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটাপাট, নির্যাতন, ধর্ষণ, ধর্মান্তরকরনসহ ২০টি অভিযোগ আনে রাষ্ট্রপক্ষ। এর মধ্যে আটটি অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। দুটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।

মাওলানা সাঈদীর খালাস চেয়ে  ওই বছর ২৮ মার্চ আপিল বিভাগে আবেদন করে আসামি পক্ষ। যে ছয়টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে কিন্তু সাজা উল্লেখ করেনি ট্রাইব্যুনাল  সেগুলোতে সাজা উল্লেখ করার দাবি জানিয়ে একই দিন রাষ্ট্রপক্ষও আপিল আবেদন করে।
ওই বছর ২৪ সেপ্টেম্বর আপিল শুনানী শুরু হয়। সাড়ে ছয় মাসেরও অধিক সময় পর আলোচিত এ মামলায় আপিল শুনানী শেষে রায় অপেক্ষমান ঘোষনা করা হয় গত  ১৬ এপ্রিল।

মাওলানা সাঈদীর আপিল মামলার শুনানীর জন্য প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে  পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ গঠন করা হয়েছিল।  অপর চার বিচারপতি হলেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞ, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিক এবং বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

মাওলানা সাঈদীকে দুটি হত্যার অভিযোগে মুত্যুদণ্ড  দেয় ট্রাইব্যুনাল-১।  এ দুটি অভিযোগ হল ইব্রাহীম কুট্টি  এবং বিশাবালী হত্যার ঘটনা। মাওলানা সাঈদীর উপস্থিতিতে, নির্দেশে এবং সহযোগিতায়  তাদের হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। এ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমানতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় রায়ে।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মোট ২০টি অভিযোগে চার্জ গঠন হয়। এর মধ্যে আটটি অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনাল।  প্রমানিত আটটি অভিযোগের দুটি হত্যার অভিযোগ। দুটি  হত্যার অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির আদেশ দেয়ার কারনে বাকী ছয়টি অভিযোগ প্রমানিত হলেও তাতে কোন শাস্তির কথা উল্লেখ করেননি ট্রাইব্যুনাল। বাকী  যে ছয়টি অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ধর্মান্তরকরন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, অপহরন  প্রভৃতি।

১২টি অভিযোগ থেকে মাওলানা সাঈদীকে খালাস দেয়া হয় রায়ে। খালাস দেয়া অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের পিতা ফফজুর রহমানসহ পিরোজপুরের তিনজন সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগ, ভাগিরথী হত্যা এবং ভানুসাহাকে ধর্ষনের অভিযোগ।


যে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদন্ড : মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যে ২০টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয় তার মধ্যে আট নং অভিযোগে বলা হয় ১৯৭১ সালের ৮ মে মাওলানা সাঈদীর  সাঈদীর নেতৃত্বে  পাকিস্তান আর্মি এবং শান্তি কমিটির লোকজন চিথলিয়া গ্রামে যায় এবং মানিক পসারীর বাড়ি লুট করে । এখানে মানিক পসারীর বাড়িসহ ৫টি ঘর তারা কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় লুটপাটের পর। মানিক পসারীর বাড়ি থেকে ইব্রাহীম কৃট্টি  এবং মফিজুল নামে দুজনকে  ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরা দুজন  মানিক পসারীর বাড়িতে কাজ করত। মাওলানা সাঈদী এদের দুজনকে ধরে দড়ি দিয়ে বেঁধে পাড়েরহাট বাজারে নিয়ে যান  তার সাথে লোকজনের সহায়তায়। এরপর মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে পাকিস্তান আর্মি ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে হত্যা করে। মফিজকে  আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পর সে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের বেশ কয়েকজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। পালিয়ে আসা মফিজও সাক্ষ্য দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছেন  মফিজ এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী।  রায়ে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ  প্রমানিত হয়েছে উল্লেখ করে মাওলানা সাঈদীকে মুত্যৃ দণ্ড প্রদান করা হয়েছে।


অপর  ১০ নং যে অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে  সে বিষয়ে চার্জ ফ্রেমিং অর্ডারে উল্লেখ করা হয়েছে   ১৯৭১ সালের ৬ জুন  সকাল ১০টার দিকে উমেদপুর গ্রামে সাঈদীর নেতৃত্বে ২৫টি ঘর আগুন  দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এসময় সাঈদীর নির্দেশে বিশাবালী নামে একজনকে নারকেল গাছের সাথে বেঁধে হত্যা করা হয়।


মুত্যৃদন্ডের অভিযোগ দুটি নিয়ে বিতর্ক : রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ এবং সাক্ষীরা বলেছেন ইব্রাহীম কুট্টিকে ১৯৭১ সালের ৮ মে মানিক পসারীর বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পাড়েরহাট বাজারে মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। অপর দিকে ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম বর্তমানে জীবিত। তিনি ১৯৭২ সালে তার স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে পিরোজপুরে একটি মামলা করেছিলেন । সে মামলায় তিনি উল্লেখ করেন ১৯৭১ সালে ১ অক্টোবর তার বাবার বাড়িতে থাকা অবস্থায়  শান্তি কমিটির লোকজন তার স্বামী ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যা করে। এসময় তার মা সিতারা বেগম এবং ভাই সাহেব আলীকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তাকে মাকে ছেড়ে দেয়া হলেও তার ভাই সাহেব আলীকে পিরোজপুরে হত্যা করে পাকিস্তান আর্মি। ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম  মামলায় ১৩ জনকে আসামী করেন।  আসামীর তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। মামলার সেই ডকুমেন্ট আসামী পক্ষ হাজির করেন ট্রাইব্যুনালে। এছাড়া মাওলানা সাঈদীর  পক্ষে বেশ কয়েকজন সাক্ষীও  সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন ইব্রাহীম কুট্টিকে নলবুনিয়া তার শশুর বাড়িতে থাকা অবস্থায় হত্যা করা হয়।  মাওলানা সাঈদী এর সাথে জড়িত ছিলনা।

মামলার আপিল শুনানীতেও আসামী পক্ষের আইনজীবীরা এ বিষয়ে তথ্য প্রমান তুলে ধরে যুক্তি উপস্থাপন করে।

এছাড়া বিশাবালী হত্যার ঘটনা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিশাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালী ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। কিন্তু তিনি মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে গত বছর ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে অপহরনের শিকার হন।

অপর যে  ছয় অভিযোগ প্রমানিত : মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অপর যে ছয়টি অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হল (অভিযোগ নং ৬) পাড়েরহাট বাজারে দোকানপাটে  লুটপাটে নেতৃত্ব প্রদান এবং অংশ নেয়া, (৭) শহিদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে আগুন দেয়া, (১১) মাহবুবুল আলম হাওলাদার বাড়িতে লুট এবং তার ভাইকে নির্যাতন (১৪)  ১৯৭১ সালে  হোগলাবুনিয়া এলাকায় হিন্দু পাড়ায় আক্রমন এবং শেফালী ঘরামী নামে একজন মহিলাকে রাজাকার কর্তৃক  ধর্ষনে সহায়তা এবং সেখানে উপস্থিত থাকা  (১৬) গৌরাঙ্গ সাহার তিন বোন মহামায়া, আনু এবং কমলা নামে তিন বোনকে অপহরন করে পাকিস্তানী সেনাদের হাতে তুলে দেয়া এবং (১৯) মুক্তিযুদ্ধ চলাকলে ১০০ থেকে ১৫০ জন হিন্দুকে জোর করে ধর্মান্তরকরন। এসব অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে তবে শাস্তি প্রদান করা হয়নি।

খালাস ১২টি অভিযোগ : যে ১২টি অভিযোগ থেকে মাওলানা সাঈদীকে খালাস দেয়া হয়েছে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অভিযোগ হল  পিরোজপুরের পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান (হুমায়ূন আহমেদের পিতা), মেজিস্ট্রেট সাইফ মিজানুর রহামান  এবং এসডিও আব্দুর রাজ্জাককে হত্যার অভিযোগ। এছাড়া ১৯৭১ সালে পিরোজপুরে নির্মম হত্যার শিকার ভাগিরথীকে হত্যা এবং  ভানু সাহাকে ধর্ষনের  অভিযোগ থেকেও খালাস দেয়া হয় মাওলানা সাঈদীকে। এছাড়া মাছিমপুর বাস স্ট্যান্ডের পেছনে, মাসিমপুর হিন্দুপাড়া এবং ধোপপাড়া এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যাক হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দেয়া, লুটপাট করা, হিন্দুদের  অনেক হিন্দুকে এক দড়িতে বেঁধে হত্যঅ করা, হত্যার উদ্দেশে হিন্দুদের  পাকিস্তান বাহিনীর হাতে তুলে দেয়াসহ মোট ১২টি অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়েছে। এসব অভিযোগ প্রমানিত হয়নি বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।


মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরন :
২০১১ সালের ৭ ডিসেম্বর মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। এক বছরের মাথায় ২০১২ সালের  ৬ ডিসেম্বর  মামলার সমস্ত  কার্যক্রম শেষে রায়ের তারিখ অপেক্ষমান ঘোষনা করেন ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু স্কাইপ কেলেঙ্কারির জের ধরে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করেন। এরপর মাওলানা সাঈদীসহ অন্যান্য মামলার পুনরায় বিচার দাবি করে দরখাস্ত করা হয় আসামী পক্ষ থেকে। সে আবেদন খারিজ হয়ে যায়। তবে মাওলানা সাঈদীর মামলায় পুনরায় যুক্তি  উপস্থাপন শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১৩ সালের ১৩ ১৩ জানুয়ারি পুনরায় যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয় এবং ২৯ জানুয়ারি  উভয় পক্ষের যুক্তি পেশ শেষ হলে  সেদিন পুনরায় রায়ের তারিখ অপেক্ষমান ঘোষনা করেন ট্রাইব্যুনাল।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত  মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ২০১০ সালের মার্চ মাসে  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গঠন করা হয়।  ট্রাইব্যুনালে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলাটিই ছিল প্রথম মামলা। তবে স্কাইপ কেলেঙ্করির কারনে  পিছিয়ে যায় এ মামলার রায় ঘোষনার বিষয়টি।

মানিক পসারী নামে এক লোক   পিরোজপুরের মুখ্য বিচারিক আদালতে   ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট  মাওলানা  দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ঘটনায় একটি মামলা করেন। এর কয়েক দিন পর ৯ সেপ্টেম্বর মাহবুবুল আলম নামে আরেক ব্যক্তি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুর নালিশী আদালতে একটি নালিশী দরখান্ত দাখিল করেন।

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুরে  মামলার বাদী মাহবুবুল আলম হাওলাদার  ২০১০ সালের ২০ জুলাই ঢাকায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে বিচার দাবী করেন।  এভাবে মাওলানা সাঈদীর বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের অধীনে আসে এবং  বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

তদন্ত সংস্থা ১৪ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় এবং ৩/১০/২০১১ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে আদেশ দেয়া হয় ট্রাইব্যুনাল-১ এ।

এর আগে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া সংক্রান্ত একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয় মাওলানা সাঈদীকে।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ২৮ জন সাক্ষী হাজির করে। এর মধ্যে ঘটনার সাক্ষী ছিল ২০ জন  । বাকীরা জব্দ তালিকার এবং একজন তদন্ত কর্মকর্তা। রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৬৮ জন ঘটনার সাক্ষীর তালিকা জমা দিয়েছিল ট্রাইব্যুনালে।   ৬৮ জনের মধ্য থেকে হাজির করা হয়নি এমন ১৬ জন সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
অপরদিকে আসামী পক্ষে মোট ২০ জন সাক্ষীর তালিকা নির্ধারন করে দেন ট্রাইবু্যুনাল এবং তার মধ্য থেকে ১৭ জন সাক্ষী হাজির করে আসামী পক্ষ।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে মামলায়  ট্রাইব্যুনালে যেসব আইনজীবী অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম, তাজুল ইসলাম, মনজুর আহমেদ আনসারী, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন প্রমুথ।
অন্যদিকে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামালায় রাষ্ট্রপক্ষের নির্ধারিত আইনজীবী ছিলেন সৈয়দ  হায়দার আলী।

মাওলানা সাঈদীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় : মাওলানা  দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১ তারিখ পিরোজপুরের সাঈদখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মওলানা ইউসুফ সাঈদী দেশের দণিাঞ্চলের সুপরিচিত ইসলামী চিন্তাবিদ ও বক্তা ছিলেন।
মাওলানা সাঈদী নিজ পিতার প্রতিষ্ঠিত দ্বীনি শিা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক শিা লাভ করার পর তিনি ১৯৬২ সালে মাদরাসা শিক্ষা শেষ করে গবেষণা কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
১৯৬৭ থেকে মাওলানা  সাঈদী বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এবং বিশ্বের বহু দেশে  মহাগ্রন্থ আল কুরআনের তাফসীর করেছেন।  তার ওয়াজ শুনে   অনেক  হিন্দু  এবং অন্যান্য ধর্মের মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। কোরআন হাদিস এবং ইসলামের ওপর রচনা করেছেন অসংখ্য পুস্তক। পেয়েছেন নানা উপাধি, খ্যাতি ও  সম্মান। তার তাফসিরের অডিও ভিডিও পাওয়া যায় দেশে বিদেশে সর্বত্র।  দেশে বিদেশে তৈরি হয়েছে তার অগনিত ভক্ত অনুরাগী। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ মাওলানা সাঈদীর ওয়াজ মাহফিলে অংশ নিয়েছেন। বিশ্বের বহু দেশ থেকে নামকরা অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের  আমন্ত্রনে তিনি সেসব দেশ সফর করেছেন এবং  কোরআনের  তাফসির করেছেন।

আপিল বিভাগে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে এ মামলায় শুনানী পেশ শুরু করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। এরপর তার অনুপস্থিতিতে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান শুনানী পেশ এবং যুক্তি উপস্থাপন করেন। তাকে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন। এছাড়া এ মামলার আপিল শুনানীর সময় বিভিন্ন পর্যায়ে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন অংশগ্রহণ করেছেন।
আসামী পক্ষে অন্যান্য আইনজীবীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তাজুল ইসলাম, তারিকুল ইসলাম, মহিনুর ইসলাম, মতিয়ার রহমান, আবু বকর সিদ্দিক, মোসাদ্দেক বিল্লাহ। 





বৃহস্পতিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৪

সন্দেহাতীত অবস্থানে পৌছার সুযোগ কেন হাতছাড়া করা হল বোধগম্য নয়

মেহেদী হাসান,17/4/2014
ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা বিষয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগমের মামলার নথি পিরোজপুর থেকে তলবের আবেদন  করেছিল দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আইনজীবী। আদালত গতকাল বুধবার আবেদনটি খারিজ করে দেয়। একই সাথে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের দায়ের করা বরিশাল থেকে ১৯৭২ সালে গঠিত স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের নথি তলবের আবেদনও খারিজ করে দেয়া হয়েছে।

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আলোচিত একটি অভিযোগ হল ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা। এ অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর উপস্থিতিতে এবং নির্দেশে ১৯৭১ সালের ৮ মে পাড়েরহাট বাজারে তাকে পাকিস্তান আর্মি গুলি করে হত্যা করে। আর আসামি পক্ষের দাবি ইব্রাহিম কুট্টি ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর নলবুনিয়ায় তার শশুরবাড়ি থাকা অবস্থায় রাজাকারদের হাতে নিহত হয়। এ হত্যাকান্ডের সাথে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর কোন সম্পর্ক নেই। আসামি পক্ষ এ দাবির পক্ষে ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে পিরোজপুর আদালতে স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে যে মামলা করেন সেই মামলার এফআইআর বা মামলার প্রাথমিক অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। মমতাজ বেগমের সেই মামলায় তিনি পাকিস্তান আর্মিসহ মোট১৩ জনকে আসামি করেন । কিন্তু আসামির তালিকায় সাঈদীর নাম নেই। আসামি পক্ষের যুক্তি সাঈদী যদি এ ঘটনায় জড়িত থাকত তাহলে অন্তত মমতাজ বেগমের ওই মামলায় আসামির তালিকায় তার নাম থাকত।  শুধু তাই নয় মমতাজ বেগমের সেই মামলার বিবরনে ইব্রাহিম কুট্টি নিহত হবার ঘটনাস্থল  নলবুনিয়া এবং ঘটনার তারিখ ১ অক্টোবর ১৯৭১ সাল উল্লেখ আছে। আর রাষ্ট্রপক্ষের দাবি ইব্রাহিম কুট্টি ১৯৭১ সালের ৮ মে পাড়েরহাট বাজারে নিহত হয়। মমতাজ বেগমের মামলায় ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার ঘটনাস্থল এবং তারিখের সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য রয়েছে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে।

২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে আসামি পক্ষ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মমতাজ বেগমের মামলার এ ডকুমেন্ট জমা দেয় এবং ট্রাইব্যুনালে তা প্রদশীনী ‘এ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ তখন আসামি পক্ষের এ ডকুমেন্টকে জাল এবং মামলার প্রয়োজনে সৃজনকৃত বলে আখ্যায়িত করে। একে জাল আখ্যায়িত করার আগে তারা পিরোজপুর  গিয়ে এ মামলা বিষয়ে কোন খোঁজখবর নিয়েছিল কিনা এমন কোন দাবিও তারা করেনি। রাষ্ট্রপক্ষ এ ডকুমেন্টকে জাল আখ্যায়িত করার পর আসামি পক্ষ মমতাজ বেগমের মামলার জিআর বইয়ের একটি ফটোকপি ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে এবং পিরোজপুর থেকে জিআর বই তলবের আবেদন করে। ট্রাইব্যুনাল তাদের সে আবেদন খারিজ করে দেয়।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয় এবং তার মধ্যে একটি হল আলোচিত এ ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার অভিযোগ। ট্রাইব্যুনালের রায়ে আসামি পক্ষের দায়ের করা মমতাজ বেগমের মামলার ডকুমেন্ট বিষয়ে কোন আলোচনা করা হয়নি। 

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল শুনানীতেও অন্যতম আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয় ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা এবং মমতাজ বেগমের মামলা।
গত ৩ মার্চ প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নতেৃত্বে আপিল শুনানীর  সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম মমতাজ বেগমের মামলার ডকুমেন্ট বিষয়ে একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়েন।
আদালত তাকে প্রশ্ন করেন, আসামী পক্ষ মমতাজ বেগমের মামলার ডকমেন্ট সংগ্রহ করতে পারল আর আপনারা পারলেননা কেন? ১৯৭২ সালে আদৌ এ ধরনের কোন এফআইআর হয়েছিল কি-না? পিরোজপুরে অবশ্যই জিআর রেজিস্ট্রেশন বই আছে। আপনারা এটা চাইতে পারতেননা? আপনাদের অনেক বড় মেশিনারীজ আছে। তার মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন? আমরা যদি আসামী পক্ষের দায়ের করা এ ডকুমেন্ট গ্রহণ করি তাহলে অ্যাটলিস্ট আমরা বলতে পারি সাঈদী এ ঘটনায় জড়িত নয়।
আদালত আরো বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ মামলার শুনানী চলছে। আসামী পক্ষ অনেক আগে এ বিষয়ে যুক্তি পেশ করেছে। আপনারা অনেক সময় পেয়েছেন। এ দীর্ঘ সময়ে আপনারা চাইলে এ ডকুমেন্ট বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারতেন।

এরপর গত ১ এপ্রিল শুনানীর পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এ মামলার বিচার ৮ এপ্রিল পর্যন্ত মুলতবি চান। এরপর খবর বের হল মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় আলোচিত ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগমের মামলার নথির খোঁজে অ্যাটর্নি জেনারেল বরিশাল সফর করছেন। ৯ এপ্রিল অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম  দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সামনে দাবি করলেন পিরোজপুর এবং বরিশালে এ মামলার কোন কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছেনা। কাজেই আসামি পক্ষ মমতাজ বেগমের মামলার যে এফআইআর জমা দিয়েছে তা জাল, মিথ্যা এবং মামলার প্রয়োজনে সৃজনকৃত।  তিনি লিখিত আবেদন করে বলেন, আসামি পক্ষের দায়ের করা মমতাজ বেগমের মামলার এফআইআর যেন  বিবেচনায় না নেয়া হয়।
মমতাজ বেগমের মামলাকে জাল, মিথ্যা, সৃজনকৃত আখ্যায়িত করা এবং একে বিবেচনায় না নেয়ার আবেদনের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান যুক্তি ছিল পিরোজপুর এবং বরিশালে এ মামলার কোন কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছেনা। এরপর দ্বিতীয় প্রধান যুক্তি ছিল একটি মামলায় এফআইআরে সব আসামি বা মূল আসামির নাম নাও থাকতে পারে। মামলার তদন্ত শেষে যে চার্জশিট তৈরি হয় সেখানে মূল আসামির নাম থাকতে পারে। আসামি পক্ষ দাবি করেছে এ মামলার চার্জশিট হয়েছিল কিন্তু তারা সে চার্জশিট তুলতে পারেনি এবং জমাও দিতে পারেনি। তারা এফআইআর তুলতে পারল চার্জশিট কেন তুলতে পারলনা? তাছাড়া চার্জশিট হলে এফআইআর নির্ভরযোগ্য থাকেনা।

অবশেষে  গত ১৩ এপ্রিল মমতাজ বেগমের মামলার চার্জশিটের সার্টিফাইড কপি জমা দেয় আসামি পক্ষ। সেখানেও আসামির তালিকায় সাঈদীর নাম নেই। আসামি পক্ষ ১৩ এপ্রিল আবেদন চার্জশিট যেন বিবেচনায় নেয়া হয় সে মর্মে আবেদন করে। একই আবেদনে তারা পিরোজপুর থেকে মমতাজ বেগমের  মামলার জিআর বই তলবেরও আবেদন করে। গতকাল  ১৬ এপ্রিল আদালত র আবেদনটি খারিজ করে দেয়।

আমি মনে করি সকল  প্রশ্নের মীমাংসার জন্য আদালতের পিরোজপুর থেকে মমতাজ বেগমের মামলার নথি তলব করা উচিত ছিল। এটা তলব করলেই প্রমান হয়ে যেত আসামি পক্ষের  দাবি সত্য নাকি মিথ্যা। মমতাজ বেগমের মামলার যে এফআইআর তারা জমা দিয়েছে  জাল কিনা।  নথি তলব করলেই বোঝা যেত ১৯৭২ সালে মমতাজ বেগম নামে কোন মহিলা পিরোজপুর আদালতে এ ধরনের কোন মামলা করেছিলনা কিনা, এ ধরনের কোন মামলার অস্তিত্ব সেখানে আছে কি-না। আসামি পক্ষ জাল জালিয়াতি করেছে কি-না তাও প্রমানিত হত।  কিন্তু আবেদনটি খারিজ করে দেয়ায় বিষয়টি অমিমীমাংসিত থেকে গেল । সাঈদী সত্যিই ইব্রাহিম কুট্টি হত্যায় জড়িত কি-না এ বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমানের একটি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন আদালত সে সুযোগ  কাজে না লাগিয়ে আবেদন খারিজ করে দিল  এ জিজ্ঞাসা সবসময়ই মানুষের মনে থেকে যাবে বলেই মনে হচ্ছে।

আরেকটি মজার বিষয় হল  ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম এখনো জীবিত। তিনি ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার অভিযোগের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের এক নম্বর সাক্ষী হতে পারতেন। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ তাকে এ মামলায় সাক্ষী করেনি। মমতাজ বেগম জীবিত সেটা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও জানেন বলে জেরায় স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাকে তিনি সাক্ষী করেননি। তদন্ত কর্মকর্তা তদন্তকালে কখনো মমতাজ বেগমের কাছে যানওনি।

ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার অভিযোগ এবং এ বিষয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগমের মামলার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত এত আলোচিত একটি বিষয়ে পরিণত হলেও কোন পক্ষ থেকেই তাকে আদালতে হাজির করার কোন আবেদন কেউ করেনি। ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার সাথে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী জড়িত কিনা এবং তিনি ১৯৭২ সালে এ বিষয়ে কোন মামলা করেছিলেন কি-না তা সবই পানির মত পরিষ্কার হয়ে যেত তাকে হাজির করা গেলে। কারণ তিনি তার স্বামী হত্যার ঘটনায় একজন চাুস সাক্ষী। ঘটনার সময় তিনি তার স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন এবং তার হাতেও গুলি লেগেছে মর্মে মামলার বিবরনে বর্নিত আছে।




বুধবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিলের রায় যেকোনদিন// নথি তলব এবং চার্জশিট বিবেচনার আবেদন খারিজ

মেহেদী হাসান, ১৬/৪/২০১৪
বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মোফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল মামলার রায় যেকোন দিন ঘোষনা করা হবে। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ আজ রায় প্রদানের তারিখ অপেক্ষমান ঘোষনা করেন।

তাছাড়া পিরোজপুর এবং বরিশাল থেকে মমতাজ বেগমের মামলা সংক্রান্ত নথি তলবের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। একই সাথে আসামী পক্ষ থেকে দাখিল করা মমতাজ বেগমের মামলার চার্জশিট বিবেচনায় নেয়ার আবেদনও খারিজ হয়ে গেছে। 
সকালে উভয় পক্ষের আবেদন খারিজ করে দিয়ে রায় অপেক্ষমান ঘোষনা করেন আদালত।
গত মঙ্গলবার উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয় এ মামলার।

ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা বিষয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে পিরোজপুরে যে মামলা করেছিল সেই মামলার জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) বই তলবের আবেদন করে আসামী পক্ষ গত ১৩ এপ্রিল। একই আবেদনে  আসামী পক্ষ মমতাজ বেগমের মামলার চার্জশিট এর মূল সার্টিফাইড কপি জমা দিয়ে তা বিবেচনায় নেয়ার আবেদন করে। ফলে  নথি তবলবের আবেদন খারিজ এর সাথে চার্জশিট বিবেচনায় নেয়ার আবেদনও খারিজ হয়ে গেল।

রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম পিরোজপুর এবং বরিশাল ঘুরে এসে আদালতে বলেন, মমতাজ বেগমের মামলার কোন কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছেনা এবং আসামী পক্ষ মমতাজ বেগমের মামলার যে এফআইআর জমা দিয়েছে তা জাল। তিনি তা বিবেচনায় না নেয়ার আবেদন করেন। এরপর গত ১০ এপ্রিল  রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আবেদন করা হয় ১৯৭২ সালে গঠিত বরিশাল স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল এর রেজিস্টার বই তলবের জন্য। গতকাল সে আবেদনও খারিজ করে দেন আদালত।
মাওলানা সাঈদীর পক্ষ থেকে দায়ের করা মমতাজ বেগমের মামলার এফআইআর কপিকে জাল আখ্যায়িত করে তা বিবেচনায় না নেয়ার যে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ তাতে অন্যতম একটি যুক্তি ছিল আসামী পক্ষ এ মামলর চার্জশিট জমা দিতে পারেনি। এফআইআর এ নাম না থাকলেও চার্জশিটে আসামির নাম থাকতে পারে। এরপর গত ১৩ এপ্রিল আসামি পক্ষ চার্জশিট জমা দেয় এবং তা বিবেচনার আবেদন জানায়।

আদালত রায় ঘোষনার তারিখ অপেক্ষমান রাখার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনাল যে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে তা আমরা সঠিক মনে করি এবং আশা করছি সে রায় বহাল থাকবে। এছাড়া অপর যে ছয়টি অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে দোষীয় সাব্যস্ত করা হয়েছে কিন্তু সাজা উল্লেখ করা হয়নি সেগুলোতেও সাজার দাবি করেছি।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন আদালত থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, মিথ্যা মামলা দিয়ে দেলোয়ার শিকদারকে সাঈদী বানিয়ে সাজা দেয়া হয়েছে। আমরা ন্যায় বিচার দাবি করছি এবং তিনি মুক্তি পাবেন আশা করছি। আমরা বিশাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালীকে এনেছিলাম। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য ট্রাইব্যুনাল কম্পাউন্ড থেকে তাকে অপহরন করে নিয়ে গেল সাদা পোশাকের লোকজন। অপহরনের আগে সুখরঞ্জন বালী টিভিতে যে সাক্ষাতকার দিয়েছিল তার ভিডিও আমরা জমা দিয়েছি আপিল আদালদে। সেটি বিবেচনায় নেয়া হলে রাষ্ট্রপক্ষের মিথ্যাচার প্রমানিত হবে। সত্য বলতে চাওয়ার কারনে আজ সুখরঞ্জন বালীকে ভারতের কারাগারে জীবন কাটাতে হচ্ছে।

২০১৩ সালেল ২৮ ফেব্রুয়ারি মাওলানা সাঈদীকে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদন্ড দেয়। ১৯৭১ সালে হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটাপাট, নির্যাতন, ধর্ষণ, ধর্মান্তরকরনসহ ২০টি অভিযোগ আনে রাষ্ট্রপক্ষ। এর মধ্যে আটটি অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। দুটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।

মাওলানা সাঈদীর খালাস চেয়ে  ওই বছর ২৮ মার্চ আপিল বিভাগে আবেদন করে আসামি পক্ষ। যে ছয়টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে কিন্তু সাজা উল্লেখ করেনি ট্রাইব্যুনাল  সেগুলোতে সাজা উল্লেখ করার দাবি জানিয়ে একই দিন রাষ্ট্রপক্ষও আপিল আবেদন করে।
ওই বছর ২৪ সেপ্টেম্বর আপিল শুনানী শুরু হয়। সাড়ে ছয় মাসেরও অধিক সময় পর আজ আলোচিত এ মামলায় আপিল শুনানী শেষে রায় অপেক্ষমান ঘোষনা করা হল।

প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে এ মামলার শুনানীর জন্য গঠিত  পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চের অপর চার বিচারপতি হলেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞ, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিক এবং বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
মাওলানা সাঈদীর পক্ষে এ মামলায় শুনানী পেশ শুরু করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। এরপর তার অনুপস্থিতিতে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান শুনানী পেশ এবং যুক্তি উপস্থাপন করেন। তাকে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন। এছাড়া এ মামলার আপিল শুনানীর সময় বিভিন্ন পর্যায়ে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন অংশগ্রহণ করেছেন।
আসামী পক্ষে অন্যান্য আইনজীবীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তাজুল ইসলাম, তারিকুল ইসলাম, মহিনুর ইসলাম, মতিয়ার রহমান, আবু বকর সিদ্দিক, মোসাদ্দেক বিল্লাহ। 

মঙ্গলবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল শুনানী শেষ

মেহেদী হাসান, ১৫/৪/২০১৪
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল শুনানী শেষ হয়েছে। আলোচিত এ মামলায় আজ উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়। তবে রায় কবে ঘোষনা করা হবে সে বিষয়ে শুনানী শেষে আদালত কিছু উল্লেখ করেননি। পিরোজপুর এবং বরিশাল থেকে মমতাজ বেগমের দায়ের করা ১৯৭২ সালের মামলার নথি তলব করা বিষয়ে উভয় পক্ষের দুটি ভিন্ন আবেদন বিষয়ে আগামীকাল  আদেশ দেয়ার জন্য ধার্য্য করা হয়েছে।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ মামলাটির শুনানী গ্রহণ করেন। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান যুক্তি উপস্থাপন শেষ করে মাওলানা সাঈদীকে নির্দেষা দাবি করে তার মুক্তি দাবি করেন। এছাড়া বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশন এর সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন মাওলানা সাঈদীর পক্ষে দরখাস্তের শুনানী শেষে যুক্তি উপস্থাপনের সমাপনি টানেন। তিনি স্কাইপ সংলাপসহ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কিছু বিতর্কিত কর্মকান্ড তুলে  ধরে আদালতকে বলেন, এ ট্রাইব্যুনাল একটি পক্ষপাতমূলক আদালত । মাওলানা সাঈদীর মামলাটিকে ঐতিহাসিক মামলা উল্লেখ করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাছে তিনি ন্যায় বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, ৪০ বছর পরে শুরু হওয়া এ মামলা একদিন দেশে ইতিহাস হয়ে থাকবে।

ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার বিচার চেয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে পিরোজপুরে যে মামলা করেছিল সেই মামলার  চার্জশিট জমা দিয়েছে আসামি পক্ষ। মমতাজ বেগমের মামলার চার্জশিট বিবেচনায় নেয়া এবং পিরোজপুর থেকে ওই মামলার জিআর বই তলবের আবেদন করেছে আসামি পক্ষ। অপর দিকে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম পিরোজপুর এবং বরিশাল ঘুরে এসে বলছেন মমতাজ বেগমের মামলার কোন নথি পাওয়া যাচ্ছেনা। তিনি বরিশাল থেকে ১৯৭২ সালে গঠিত স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্টার বই তলবের আবেদন করেছেন। আগামীকাল  বুধবার এ বিষয়ে আদেশের জন্য ধার্য্য করেছেন আদালত।

চার্জশিট বিবেচনায় নেয়া  এবং জিআর বই তলবের আবেদনের ওপর শুনানী করেন মাওলানা সাঈদীর পক্ষে খন্দকার মাহবুব হোসেন। আবেদনের সাথে তারা মমতাজ বেগমের মামলার জিআর কপির  ফটোকপি জমা দিয়েছে। খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমরা ট্রাইব্যুনালে পিরোজপুর থেকে পাওয়া মমতাজ বেগমের মামলার জিআর বই জমা দিয়েছিলাম কিন্তু তা খারিজ করে দিয়েছে । গতকাল শুনানীর সময় আদালত জিআর বইর ফটোকপি নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেন। আদালত প্রথমে বলেন, এটা একটা ফটোকপি। সার্টিফাইড কপি নয়। তখন অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, আমরা সার্টিফাইড কপি চেয়েছিলাম কিন্তু দেয়নি। জিআর বই’র ফটোকপি কিভাবে সংগ্রহ করা হল আদালতের এ প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, সেটা আমার জানা নেই। তখন একজন বিচারপতি বলেন,  নিশ্চয়ই জিআর বই ফটোকপির জন্য বাইরে নিয়ে যেতে হয়েছে। যারা এটা করতে পারে তারা সবই পারে। জিআইর নথিতে বরিশাল স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের নম্বর না থাকা, কবে কিভাবে মামলাটি প্রত্যাহার হল, কে কিভাবে কোন ক্ষমতাবলে প্রত্যাহার কর, বাকেরগঞ্জ ডিসির কাছে কিভাবে গেল আদালত এসব বিষয়ে প্রশ্ন করলে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমাদের ডকুমেন্টটি সত্য না মিথ্যা সেটা প্রমানের জন্যই পিরোজপুর থেকে এ মামলার জিআর বই তলব করা উচিত এবং তার সাথে আমাদের এ কপি মিলিয়ে দেখা যাবে। তাহলেই সত্য মিথ্যা বের হয়ে যাবে। আর মূল বিষয় হল মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে এ ধরনের একটি মামলা করেছিল কি-না, এ ধরনের একটি মামলার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল কি-না, এফআইর এবং চার্জশিট হয়েছিল কিনা । এটা জানা গেলেই ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা বিষয়ে আমাদের দাবির সত্য  না মিথ্যা প্রমানিত হবে। সেজন্য পিরোজপুরের জিআর বই তলব করা দরকার।  আপনারা গোড়ায় হাত দেন। বরিশল ট্রাইব্যুনালে এ মামলা গিয়েছিল কিনা এবং সেখানে কি হয়েছিল তা পরের বিষয়। আগে জানা দরকার পিরোজপুরে আদৌ এ মামলা হয়েছিল কিনা। খন্দকার মাহবুব হোসেন বারবার বলেন, আপনারা দয়া করে গোড়ায় হাত দেন। এটাই আমাদের নিবেদন।

আজ অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানী পেশ করার পর একজন বিচারপতি বলেন,  মি. অ্যাটর্নি জেনারেল আমার স্পষ্ট মনে আছে আসামী পক্ষের দাখিল করা মমতাজ বেগমের মামলার এফআইআর গ্রহণ না করার যে আবেদন আপনারা দিয়েছেন তাতে আপনি বলেছেন এ  মামলার চার্জশিট আসামি পক্ষ জমা দেয়নি। আপনি বলেছিলেন  এফআইআরে আসামির নাম না থাকলেও চার্জশিটে থাকতে পারে। আপনি বারবার বলেছেন আসামি পক্ষ চার্জশিট জমা দিতে পারেনি। কিন্তু এখন তারা চার্জশিট জমা দেয়ার পর আপনি ভিন্ন যুক্তি দেখাচ্ছেন।

দরখাস্ত বিষয়ে শুনানী শেষে মাওলানা সাঈদীপর পক্ষে খন্দকার মাহবুব হোসেন আদালতের অনুমতি নিয়ে  ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা এবং সুখরঞ্জন বালি বিষয়ে কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, সুখরঞ্জন বালি ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। তারা তাকে আনতে পারলনা। আমরা তাকে আনলাম। এরপর তাকে ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে অপহরন করা হল। তাকে অপহরন করায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
এরপর তিনি সুখরঞ্জন বালীর একটি সাক্ষাৎকার পড়ে শোনান যেখানে সুখরঞ্জন বালি  বলেছেন, তিনি রাষ্ট্রপক্ষের শেখানোমত মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ তাকে ট্রাইব্যুনালে আনেনি। তিনি আগে থেকেই মাওলানা সাঈদীকে চিনতেন। তাদের বাড়ি আক্রমন এবং তার ভাই বিশাবালীকে ধরে নিয়ে যাবার ঘটনার সময় তাদের বাড়িতে যারা এসেছিল তাদের সাথে মাওলানা সাঈদী ছিলনা। থাকলে তিনি তাকে চিনতেন। কারণ মাওলানা সাঈদীকে তিনি আগে থেকেই চিনতেন। পাড়েরহাট বাজারে মাওলানা সাঈদীর শশুরের কাপড়ের দোকান ছিল । সেই সূত্রে আগে থেকেই তিনি তাকে চিনতেন।

এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে পক্ষপাতমূলক (বায়াজড) আখ্যায়িত করে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এ ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে বাইরের একজন লোকের সাথে ১৭ ঘন্টা স্কাইপ সংলাপ করেছেন এর চেয়ারম্যান। বিচার নিয়ে ২২৩টি ইমেইল আদান প্রদান করেছেন। বাইরে থেকে পাঠানো অনেক বিষয় তিনি হুবহু ট্রাইব্যুনালে পড়ে শুনিয়েছেন।

সকালে শুনানীর  শুরুতে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের দাবি মাওলানা সাঈদী স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার ইত্যাদি। কিন্তু আবার তারাই বলছে মাওলানা সাঈদী পাড়েরহাট বাজারে চট বিছিয়ে তেল নুন লবন মরিচ বিক্রি করত। এ ধরনের একজন লোক কি করে তাদের বর্নিত কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, মাওলানা সাঈদী যশোরে ছিলেননা বরং পিরোজপুরে ছিলেন এ মর্মে কোন সাজেশন তারা সাফাই সাক্ষীদের দেয়নি।
আদালতের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পিরোজপুর জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত পিরোজপুর জেলার ইতিহাস বইতে স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। দেলোয়ার হোসেন মল্লিক নামে এক লোকের নাম আছে। সেই বইয়ে পিরোজপুরের কৃতি সন্তানদের তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম আছে।

২০১৩ সালেল ২৮ ফেব্রুয়ারি মাওলানা সাঈদীকে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদন্ড দেয়। ১৯৭১ সালে হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটাপাট, নির্যাতন, ধর্ষণ, ধর্মান্তরকরনসহ ২০টি অভিযোগ আনে রাষ্ট্রপক্ষ। এর মধ্যে আটটি অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। দুটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।

মাওলানা সাঈদীর খালাস চেয়ে  ওই বছর ২৮ মার্চ আপিল বিভাগে আবেদন করে আসামি পক্ষ। যে ছয়টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে কিন্তু সাজা উল্লেখ করেনি ট্রাইব্যুনাল  সেগুলোতে সাজা উল্লেখ করার দাবি জানিয়ে একই দিন রাষ্ট্রপক্ষও আপিল আবেদন করে।
ওই বছর ২৪ সেপ্টেম্বর আপিল শুনানী শুরু হয়। সাড়ে ছয় মাসেরও অধিক সময় পর আজ আলোচিত এ মামলায় উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হল।
মাওলানা সাঈদীর পক্ষে এ মামলায় শুনানী পেশ শুরু করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। এরপর তার অনুপস্থিতিতে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান শুনানী পেশ এবং যুক্তি উপস্থাপন করেন। তাকে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন। এছাড়া এ মামলার আপিল শুনানীর সময় বিভিন্ন পর্যায়ে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন অংশগ্রহণ করেছেন।
আসামী পক্ষে অন্যান্য আইনজীবীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তাজুল ইসলাম, তারিকুল ইসলাম, মহিনুর ইসলাম, মতিয়ার রহমান, আবু বকর সিদ্দিক, মোসাদ্দেক বিল্লাহ। 


রবিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা ও ইব্রাহীম কুট্টি ইস্যু// অবশেষে মমতাজ বেগমের মামলার চার্জশিটও দাখিল করল আসামী পক্ষ

মেহেদী হাসান,১৩/৪/২০১৪
ইব্রাহিম কৃট্টি হত্যা বিষয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগমের ১৯৭২ সালে দায়ের করা মামলার চার্জশিট ( চার্জশিট নং ২৬, তারিখ ২৯/৯/৭২) আপিল বিভাগে জমা দিয়েছে আসামী পক্ষ। আজ শুনানী শেষে আপিল বিভাগে একটি দরখাস্তের সাথে এ মামলার মূল সার্টিফাইড কপি জমা দেয়া হয়। মমতাজ বেগমের মামলার সেই চার্জশিটেও মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।

এর আগে আসামী পক্ষ মমতাজ বেগমের মামলার এফআইআর কপি জমা দেয় ট্রাইব্যুনালে যেখানে ১৩ জন আসামীর মধ্যে মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আলোচিত অভিযোগ হল ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যা। এ অভিযোগে  ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে তার স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে পিরোজরে একটি মামলা করেছিলেন। সেই মামলায় তিনি মোট ১৩ জনকে আসামী করেন। কিন্তু আসামীর সেই তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। আসামী পক্ষ মমতাজ বেগমের দায়ের করা সেই মামলার এফআইআর নর্থির একটি সার্টিফাইড কপি ২০১১ সালে ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়। মামলার আপিল শুনানীর শেষ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম পিরোজপুর এবং বরিশাল সফর করেছেন। সফর শেষে গত ৯ এপ্রিল আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, পিরোজপুর এবং বরিশালের জেলাজজ আদালতে কোথাও এ মামলার কাগজ পাওয়া যায়নি। আসামী পক্ষ মমতাজ বেগমের মামলার নথি মর্মে যে ডকুমেন্ট জমা দিয়েছে তা জাল, মিথ্যা এবং মামলার প্রয়োজনে সৃজনকৃত। তাই এ কাগজ বিবেচনায় না নেয়ার লিখিত আবেদন করেন তিনি।

আসামী পক্ষের দায়ের করা এফআইআর কপিটিকে জাল আখ্যায়িত করা এবং এটি বিবেচনায় না নেয়ার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল এর পক্ষ থেকে যেসব যুক্তি আদালতে তুলে ধরা হয় তার মধ্যে অন্যতম একটি ছিল মমতাজ বেগমের দায়ের করা মামলার চার্জশিট বিষয়ক। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আসামী পক্ষ দাবি করেছে এ মামলায় চাজশিট হয়েছিল কিন্তু তারা সেই চার্জশিট জমা দেয়নি। একটি মামলার প্রাথমিক অভিযোগে সব বা মূল আসামীর নাম নাও থাকতে পারে। কিন্তু পরবর্তীতে চার্জশিটে মূল আসামীর নাম আসতে পারে বা অন্য আসামীর নাম যোগ হতে পারে। আসামী পক্ষ মামলার এফআইআর কপি যোগাড় করতে পারল আর চার্জশিট তারা জোগাড় করতে পারলনা? তারা কেন চার্জশিট তুলতে পারলনা?

এ প্রেক্ষিতে আসামী পক্ষ আজ মমতাজ বেগমের মামলর চার্জশিট দাখিল করল আদালতে। ১৯৭২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পুলিশ এ মামলর চার্জশিট দাখিল করে। মমতাজ বেগমের মামলার প্রাথমিক অভিযোগ বা  এফআইআরে ঘটনার  বিবরন, তারিখ এবং  ঘটনাস্থলের যে বিবরন রয়েছে তার সাথে মিল রয়েছে চার্জশিটে বর্নিত ঘটনা, ঘটনার তারিখ এবং ঘটনাস্থলের।  তবে এফঅইআরে যে ১৩ জনকে আসামী করা হয়েছে তা থেকে চারজনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তবে মাওলানা সাঈদী বা অন্য কোন নতুন আসামীর নাম এ ঘটনায় আর যুক্ত হয়নি চাজশিটে।

মমতাজ বেগমের মামলার চার্জশিটে ঘটনার বিবরন :
২ নং কলামে বর্নিত পলাতক  (১. দানেশ আলী মোল্লা ২. আশরাফ আলী ৩. আব্দুল মমিন হাওলাদার ৪. আব্দুল কালাম চৌকিদার, ৫. আবদুল হাকিম মুন্সি, ৬. মমিন উদ্দিন ৭. মোসলেম মাওলানা) এবং ৩ নং কলামে বর্নিত গ্রেফতারকৃত ( আইউব আলী ও  সুন্দর আলী) আসামীরা ১/১০/৭১ তারিখ রাইফেলসহ মমতাজ বেগমের ঘরে প্রবেশ করে তার স্বামী ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা করে, রাইফেলের গুলিতে মমতাজ বেগমের হাতে জখম হয়, তাদের বাড়ির জিনিসপত্র লুট করে, তার (মমতাজ বেগম) ভাই সাহেব আলী ওরফে সিরাজকে অপহরন করে পাকিস্তান আর্মির কাছে তুলে দেয় যারা তাকে পরে হত্যা করে। আসামীদের সবাই রাজাকার এবং দালাল। তদন্তে প্রাথমিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১ নং কলামে বর্নিত চারজনকে (আতাহার আলী হাওলাদার, রুহুল আমিন, সেকেন্দার আলী সিকদার এবং শামসুর রহমান) অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া যেতে পারে।

গত বৃহষ্পতিবার শুনানীর সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বরিশাল থেকে ১৯৭২ সালে  গঠিত স্পেশাল ট্রাইবুনালের রেজিস্ট্রার বই তলবের আবেদন করেন আদালতে। তখন আসামী পক্ষ থেকে মৌখিক আবেদন করে বলা হয় ১৯৭২ সালে পিরোজপুর থেকে মমতাজ বেগমের মামলার জিআর (জেনারেল রেজিস্ট্রার) বইও তলব করা হোক। আদালত তখন আসামী পক্ষকে লিখিত আবেদন করতে বলেন। আজ আসামী পক্ষ পিরোজপুর থেকে জিআর বই তলব এবং মমতাজ বেগমের মামলার চার্জশিট জমা দিয়ে তা বিবেচনায় নেয়ার জন্য একটি দরখাস্ত জমা দেয়।


পূর্বসূত্র :
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে এবং উপস্থিতিতে ইব্রাহীম কুট্টিকে পাড়েরহাট বাজারে  পাকিস্তানী সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করে। কিন্তু ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে যে মামলা করেন তাতে আসামীর তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। সেই মামলার ডকুমেন্ট আসামী পক্ষ ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে বিচার চলাকালে ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ তখন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করে আসামী পক্ষ মামলার প্রয়োজনে এ জাল দলিল তৈরি করেছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে তবে আসামী পক্ষের এ ডকুমেন্ট বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ করা হয়নি রায়ে।

গত ৩ মার্চ প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নতেৃত্বে আপিল শুনানীর  সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম মমতাজ বেগমের মামলার ডকুমেন্ট বিষয়ে একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়েন।
আদালত তখন তাকে প্রশ্ন করেন, আসামী পক্ষ মমতাজ বেগমের মামলার ডকুমেন্ট সংগ্রহ করতে পারল আর আপনারা পারলেননা কেন? ১৯৭২ সালে আদৌ এ ধরনের কোন এফআইআর হয়েছিল কি-না? পিরোজপুরে অবশ্যই জিআর রেজিস্ট্রেশন বই আছে। আপনারা এটা চাইতে পারতেননা? আপনাদের অনেক বড় মেশিনারীজ আছে। তার মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন? আমরা যদি আসামী পক্ষের দায়ের করা এ ডকুমেন্ট গ্রহণ করি তাহলে অ্যাটলিস্ট আমরা বলতে পারি সাঈদী এ ঘটনায় জড়িত নয়।
আদালত আরো বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ মামলার শুনানী চলছে। আসামী পক্ষ অনেক আগে এ বিষয়ে যুক্তি পেশ করেছে। আপনারা অনেক সময় পেয়েছেন। এ দীর্ঘ সময়ে আপনারা চাইলে এ ডকুমেন্ট বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারতেন।

এরপর গত ১১ মার্চ অ্যাটর্নি জেনারেল আসামী পক্ষের জমা দেয়া মমতাজ বেগমের মামলার মূল সার্টিফাইড কপি আপিল বিভাগের রেকর্ড রুম থেকে দেখার আবেদন করেন। গত ১ এপ্রিল শুনানীর পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এ মামলার বিচার ৮ এপ্রিল পর্যন্ত মুলতবি চান। এরপর খবর বের হল মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় আলোচিত ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগমের মামলার নথির খোঁজে অ্যাটর্নি জেনারেল বরিশাল সফর করছেন।

ইব্রাীহম কুট্টি হত্যার অভিযোগ : পাড়েরহাট বাজারের নিকটে সইজুদ্দিন পসারীদের  বাড়িতে কাজ করত ইব্রাহীম কুট্টি। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে বলা হয়েছে ১৯৭১ সালের ৮ মে মাওলানা সাঈদীসহ শান্তি কমিটির অন্যান্য লোকজনের নেতৃত্বে পাকিস্তান সৈন্যরা ওই বাড়িতে আক্রমন করে। এসময় ইব্রাহীম কুট্টি ও অপর আরেকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পাড়েরহাট বাজারে। পরে মাওলানা সাঈদীর উপস্থিতিতে এবং নির্দেশে পাকিস্তান সৈন্যরা তাকে গুলি করে হত্যা করে পাড়েরহাট বাজারে।

আসামী পক্ষের দাবি : আসামী পক্ষের দাবি ইব্রাহীম কুট্টিকে ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর নলবুনিয়ায় তার শশুরবাড়ি থাকা অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যার সাথে মাওলানা সাঈদী জড়িত নন। এ দাবির পক্ষে তারা ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগমের মামলার নথি জমা দিয়েছে আদালতে। মমতাজ বেগমের মামলায় ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে মোট ১৩ জন আসামী করা হয়। আসামীর তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। আসামী পক্ষের দাবি তিনি যদি এর সাথে জড়িত থাকতেন তাহলে অন্তত মমতাজ বেগমের মামলায় তাকে তখন আসামী করা হত।

মমতাজ বেগমের মামলার এফআইর-এ ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার বিবরন : স্বামী  ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার বিচার চেয়ে মমতাজ বেগম দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে পিরোজপুরে একটি মামলা করেন। সে মামলার বিবরনে মমতাজ বেগম উল্লেখ করেছেন   তার স্বামী  ইব্রাহীম কুট্টি তার বাপের বাড়ি নলবুনিয়া থাকা অবস্থায় শান্তি কমিটির লোকজন এবং পাকিস্তান আর্মি গুলি করে  হত্যা করেছে। ঘটনার সময়কাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৭১ সালের ১  অক্টোবর ।
মমতাজ বেগমের মামলায় আরো উল্লেখ আছে যে, ওই ঘটনার সময় তাদের বাড়ি থেকে তার ভাই সাহেব  আলী ওরফে সিরাজ এবং তার মা সিতারা বেগমকেও ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পিরোজপুর। পরে তার মাকে ছেড়ে দেয়া হলেও তার ভাই সাহেব আলীকে আর ছাড়া হয়নি। তাকে পাকিস্তান পিরোজপুরে আর্মি গুলি করে হত্যা করে।

মমতাজ বেগমের মামলার বিবরনে বলা হয়েছে ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবার নলবুনিয়া তার শশুর বাড়ি থাকা অবস্থায়। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের দাবির্  ৮ মে তাকে পাড়েরহাট বাজারে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের তথ্যের স¤পূর্ণ বিপরীত তথ্য রয়েছে মমতাজ বেগমের মামলার নথিতে।

মমতাজ বেগমের মামলায় ঘটনার বিবরন নিম্নরূপ :

“ঘটনার বিবরন এই যে, বিবাদীগন পরষ্পর যোগাযোগে রাইফেল পিস্তল ছোরা লাঠি ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হইয়া আমার পিতার ঘর বেড়দিয়া আমার স্বামীর উপর গুলি করিয়া হত্যা করিয়া আমার শরীরে জখম করিয়া আমার মাতা ও ভ্রাতাকে ধরিয়া পিরোজপুর আনিয়া আমার মাতাকে ছাড়িয়া দিয়া আমার ভ্রাতা সিরাজুলকে গুলি করিয়া হত্যা করিয়াছে। আক্রোশের কারণ এই যে, আমি ও আমার স্বামী আমার স্বামীর বারিতে বাদুরা গ্রামে বাসবাস করিতেছিলাম। গত মে মাসে পাক সৈন্য এদেশে আসিয়া যখন অকারনে গুলি করিয়া মানুষ হত্যা করিতে থাকে তখন কতিপয় হিন্দু আমাদের সরনাপন্ন হওয়ায় আমরা তাহাদের আশ্রয় দেওয়ায় পাক সৈন্য ও তাহাদের দালালরা আমার স্বামীকে হত্যা করিতে খোঁজ করিতে থাকায় আমরা ভয়ে ভীত হইয়া আমরা পিত্রালয়ে বসবাস করিতেছিলাম। তথায় বিবাদীগন ক্রোধ করিয়া উক্তরুপ অত্যাচার করিয়াছে।

প্রকাশ থাকে যে, বর্তমানে আমি গর্ভবতী থাকায় আমার পিতা পারোরহাট আওমীলীগ অফিসে জানাইয়া কোন প্রতিকার পাইনাই। তাই এই দরখাস্ত করিতে বিলম্ব হইল।
সে মতে প্রার্থনা, আদালত দয়া করিয়া উক্ত ধারামতে উক্ত বিবাদীগনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট দিয়া ধৃত করাইয়া সুবিচার করিতে আজ্ঞা হয়। ইতি মমতাজ বেগম”

মামলঅর নথি থেকে ঘটনার এ ব্বিরন আসামী পক্ষ থেকে আদালতে পড়ে শোনানো হয়েছে শুনানীর সময়।

মমতাজ বেগমের মামলার এফআইআর এ   আসামীর তালিকা :
মমতাজ বেগম  সে মামলায় মোট ১৩ জনকে আসামী করেছেন।  এরা হল  দানেশ মোল্লা,  আতাহার আলী, আশ্রাব আলী, আব্দুল মান্নান, আইউব আলী, কালাম চৌকিদার, রুহুল আমিন, আব্দুল হাকিম মুন্সি, মমিন উদ্দিন, সেকোন্দার আলী শিকদার, শামসুর রহমান এসআই, মোসলেম মাওলানা।  এছাড়া পাকিস্তান আর্মিকেও আসামী করা হয় মমতাজ বেগমের মামলায়। কিন্তু মমতাজ বেগমের মামলায় আসামীদের তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।

আপিল শুনানীর সময় মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম  শাহজাহান আদালতে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আমাদের এ ডকুমেন্টকে অসত্য এবং জাল আখ্যায়িত করেছে।  তাদের উচিত ছিল পিরোজপুর থেকে পুলিশ কর্তৃপক্ষকে ডাকার ব্যবস্থা করে তাদের দাবি প্রমান করা। কিন্তু তারা তা করেনি। বরং  আমরা থানা থেকে এ মামলার নথিপত্র তলবের জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সে আবেদন খারিজ করে দিয়েছে।

আসামী পক্ষ যেভাবে সংগ্রহ করল মমতাজ বেগমের মামলার নথি : মাওলানা সাঈদীর ছেলে   ও ১৩ তম সাফাই সাক্ষী মাসুদ সাঈদী ট্রাইব্যুনালে জেরায় বলেছেন, ‘তার বড় ভাই মরহুম রাফিক বিন সাঈদীকে মমতাজ বেগমের মা সিতারা বেগম মামলার মূল সার্টিফাইড কপি সরবরাহ করেন।’
মামলার বাদী মমতাজ বেগমের মা সিতারা বেগম ১৯৭২ সালে এ মামলার সার্টিফাইড কপি পিরোজপুর থেকে ইস্যু করান এবং সিতারা বেগম দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এ মামলার কপি সংরক্ষন করেছেন।

মমতাজ বেগমের মামলার ঘটনাপ্রবাহ :
মামলার নথি  ঘেটে দেখা যায় ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ মমতাজ বেগম পিরোজপুর এসডিও কোর্টে প্রথম এ মামলা করেন। তখন এসডিও ছিলেন একে আজাদ। ওই তারিখে এসডিও মামলাটি পিরোজপুর থানায় পাঠান।

বাদী মমতাজ বেগমের লিখিত অভিযোগ এসডিওর কাছ থেকে পাবার পর পিরোজপুর থানা ১৬/৭/১৯৭২ তারিখ বেলা ১টা ৩০ মিনিটের সময় অভিযোগটি এজাহার হিসেবে রেকর্ড করে। মামলা নং ৯। জিআর (জেনারেল রেজিস্ট্রার) নং ৩৭৮/৭২।

১৭/৭/১৯৭২ তারিখ সকাল ৮টায় থানা থেকে মামলাটি পিরোজপুর কোর্টে পাঠানো হয়। তখন থানার ওসি ছিলেন মেফতাউদ্দিন আহমেদ। তিনি নিজে মামলার তদন্ত শুরু করেন। মামলার এজাহারে ঘটনার তারিখ লেখা আছে ১/১০/১৯৭১। বাংলা ১৩ আশ্নিন ১৩৭৮।
২২ জুলাই ১৯৭২ এসডিও কোর্টে মামলাটি উত্থাপন করা হয়।

২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ পুলিশ এ মামলার চার্জশিট দাখিল করে।

৩ অক্টোবর ১৯৭২ এসডিও বরাবর চার্জশিট উপস্থাপন করা হয়।
মমতাজ বেগমের অভিযোগ অনুসারে  এ মামলার তদন্তকালে আসামীদের মধ্য থেকে ২ জনকে আটক করা হয়। এরা হল আইউব আলী চৌকিদার ও সুন্দর আলী দফাদার।

পুলিশের প্রতিবেদনে আসামীদের মধ্য থেকে যাদেরকে পলাতক দেখানো হয় তারা হল
১.    দানেশ মোল্লা
২.    আশরাফ আলী
৩.     আব্দুল মান্নান
৪.    কালাম চৌকিদার
৫.    আব্দুল হাকিম মুন্সি
৬.    মমিন উদ্দিন
৭.    মোসমেল মওলানা।

মামলা চলাকালে পলাতক আসামীদের মধ্য থেকে আরো ২ জনকে আটক করা হয়। ১৯৭২ সালের ৭ অক্টোবর আব্দুল মান্নান এবং ১৯৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মমিন উদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয় যা মেজিস্ট্রেট কোর্টে সংরক্ষিত জিআর বইতে ৩৭৮/৭২ জিআর কপি পর্যালোচনা করে দেখা যায়।
জিআর কপি পর্যালোচনা করে আরো দেখা যায় মমতাজ বেগমের দায়ের করা ওই মামলা থেকে আসামী আতাহার আল হাওলাদার, রুহুল আমিন সেকেন্দার শিকদার, শামসুর রহমান (তৎকালীন পিরোজপুর পুলিশ ফাঁড়ির এসআই) কে অব্যাহতি দেয় কোর্ট।

মমতাজ বেগমের দায়ের করা মামলাটি ২৭/১১/১৯৭২ সালে তৎকালীন এসডিও এমএ হাশেম মিয়া স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল জাজ বরিশাল প্রেরন করেন।
মামলার জিআর বইয়ে দেখা যায় ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ সালে মামলার কার্যক্রমের জন্য মামলাটি বাকেরগঞ্জ ডিসির কাছে পাঠানো হয়েছিল। জিআর বইয়ের ১৭ নং কলামে লেখা আছে-
ঔঁফরপরধষ ৎবপড়ৎফ ংবহঃ ঃড় উঈ ইধশবৎমড়হম ঢ়ৎড়ারফব ঃযরং সবসড় ঘড় ২৫৫ ঔঁফরপরধষ, ফধঃবফ ১৭/২/১৯৮১ ারফব ঃযরং পড়সঢ়ষঃ সপপ ঘড় ১৮৯/৮১.




বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল// রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ

মেহেদী হাসান, ১০/৪/২০১৪
বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মোফাসসিরে কুরআন  মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে আপিল শুনানীতে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আজ যুক্তি পেশ শেষ করেন। আগামী রোববার রাষ্ট্রপক্ষের পেশকৃত যুক্তির জবাব প্রদানের সুযোগ পাবে আসামি পক্ষ।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানীতে বলেন, ট্রইব্যুনাল সঠিকভাবেই মাওলানা সাঈদীর মৃত্যুদন্ড দিয়েছে এবং ট্রাইব্যুনাল কোন ভুল করেনি। তিনি আদালতের কাছে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে প্রদত্ত মৃত্যুদন্ডের রায় বহালের আবেদন করেন। এছাড়া মাওলানা সাঈদীকে ট্রাইব্যুনাল অপর যে ছয়টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে কিন্তু সাজা উল্লেখ করেনি সেগুলোতেও সাজা উল্লেখের দাবি জানান। 
আদালতের কার্যক্রম শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল তার অফিস কক্ষে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করে বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ট্রাইব্যুনালের রায় অবশ্যই বহাল থাকবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যুক্তি উপস্থাপন শেষে ১৯৭২ সালে গঠিত বরিশাল স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার বই তলবের আবেদন করেন। তখন মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান পিরোজপুর আদালত থেকে ১৯৭২ সালে দায়ের করা  মমতাজ বেগমের মামলার জিআর বই তলবেরও মৌখিক আবেদন করেন। প্রধান বিচারপতি তাকে লিখিত আবেদন জমা দিতে বলেন।
অ্যাডভোকেট শাহাজাহন বলেন, আগামী রোববার তিনি আবেদন জমা দেবেন। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন তার লিখিত জবাব আজ আদালতে জমা দিয়েছে আসামী পক্ষ। এর মধ্যে অপহরনের শিকার বিশাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালী এবং তার স্ত্রীর  সাক্ষাতকারের স্ক্রিপ্টও রয়েছে।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন। গতকাল শুনানীর শুরুতে আদালত আসামী পক্ষের দাখিল করা মমতাজ বেগমের মামলার মূল সার্টিফাইড কপি দেখেন। এসময় এ কপি বিষয়ে আদালত বেশ কিছু প্রশ্ন তোলেন।
কপিটি হাতে পাওয়ার পর প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি বলছিলেন ফটোকপির ওপর প্রদর্শনী মার্ক করা হয়েছে? এরপর তিনি নথিটি নেড়েচেড়ে দেখে বলেন, আপনার সাবমিশন সঠিক। ফটোকপির ওপর প্রদর্শনী মার্ক করা হয়েছে। ফটোকপির সাথে সার্টিফাইড কপি স্টাপলার মারা। ফটোকপির মধ্যে সার্টিফাইড কপি। সার্টিফাইড কপি এখানে আসল কি করে তাহলে?
এপর্যায়ে একজন বিচারপতি আসামী পক্ষের উদ্দেশে বলেন, এ নথি প্রদর্শন করার সময় সাক্ষী কি বলেছিল পড়ে শোনান। অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান ১১ তম সাফাই সাক্ষীর জবানবন্দী পড়ে শুনিয়ে বলেন, মমতাজ বেগমের মামলার জাবেদা নকল ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করা হল। এই সেই মূল সার্টিফাইড কপি যা প্রদর্শনী ‘এ’ হিসেবে চিহ্নিত হল।
তখন ওই বিচারপতি বলেন, সাক্ষীতো বলেছে মূল সার্টিফাইড কপি দাখিল করা হয়েছে এবং প্রদর্শনী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল ভুল করেছে। ট্রাইব্যুনাল ফটোকপির ওপর প্রদর্শনী মার্ক করেছে। ট্রাইব্যুনাল পরে প্রদর্শনী মার্ক করলে সেজন্য সাক্ষী দায়ী হবেনা।
প্রধান বিচারপতি তখন প্রশ্ন করেন ট্রাইব্যুনালে ডকুমেন্ট প্রদর্শনের নিয়ম কি। তখন আসামী পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন বলেন, আমরা সরাসরি হাতে হাতে ট্রাইব্যুনালের কাছে কপিটি দিয়েছি এবং তা সাফাই সাক্ষীর মাধ্যমে প্রদর্শনের পর প্রদর্শনী হিসেবে চিহ্নিত হয়। তিনি বলেন, অনেক অনেক ডকুমেন্টের মূল কপি আদালতে প্রদর্শন করে বলা হয়েছে এই হল এর ফটোকপি। পরে মূল কপির সাথে ফটোকপির মিল প্রমান সাপেক্ষে ফটোকপির ওপর প্রদর্শনী মার্ক করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল আইনে ফটোকপি গ্রহনের নিয়ম আছে।

আসামি পক্ষের দায়ের করা মমতাজ বেগমের মামলার নথি বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আসামি পক্ষ দাবি করেছে এ মামলার চার্জশিট হয়েছিল। চার্জশিট যদি হয় তাহলে এফআইআর আর নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়না। তারা বলেছে চার্জশিট হয়েছিল । তাহলে তারা চার্জশিট আনতে পারলনা কেন? তিনি বলেন, অনেক সময় এফআইআরে মূল আসামীর নাম নাও থাকতে পারে। পরে চার্জশিটে মূল আসামির নাম যোগ হতে পারে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা প্রথমে মূল আসামীদের নাম ছিলনা। পরে মূল আসামীর নাম যোগ হয়েছে।  ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
এসময় একজন বিচারপতি বলেন, চাজশিটে আসামীর নাম পরিবর্তন হলেও ঘটনাস্থল এবং ঘটনার তারিখ তো পরিবর্তন হবেনা (মমতাজ বেগমের মামলায় এবং আসামী পক্ষের অভিযোগে ঘটনাস্থল এবং ঘটনার তারিখ সম্পূর্ণ ভিন্ন  হিসেবে উল্লেখ আছে।)
মমতাজ বেগমের মামলার নথিকে জাল আখ্যায়িত করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ নথি তো বিবেচনায়ই আনা যেতে পারেনা।
একজন বিচারপতি প্রশ্ন করেন নথিটিতে সব পাতায় সিল আছে কি-না। তখন পরীক্ষা করে দেখা যায় কপিটির শেষের পাতায় সিল আছে। মাঝখানের পাতায় কর্তৃপক্ষের সিল নেই। আসামী পক্ষে অ্যাডভোকেট শাহজাহান তখন এভিডেন্স অ্যাক্ট পড়ে শুনিয়ে আদালতে বলেন, শেষ শুধু শেষ পৃষ্ঠায় সিল থাকারও নিয়ম আছে। তিনি এসময় চলতি বছর ইস্যু করা একটি  সার্টিফাইড কপি আদালতে দেখিয়ে  বলেন, এ কপিটিতে শুধু শেষের পাতায় কর্তৃপক্ষের সিল আছে। সব পাতায় নেই। আদালত তখন মন্তব্য করেন মাঝখানে যাতে নতুন পাতা কেউ যোগ করতে না পারে সেজন্য সব পাতায় সিল মারার নিয়ম করার হয়েছে।

মমতাজ বেগমের মামলার নথি জাল-অ্যাটর্নি জেনারেল

মেহেদী হাসান, ৯/৪/২০১৪
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে বলেছেন, আসামি পক্ষ ইব্রাহিম কুট্টি হত্য বিষয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগমের মামলার যে এফআইআর কপি জমা দিয়েছে তা জাল এবং মিথ্যা। বরিশাল সেশনজজ আদালত এবং পিরোজপুর থানায় এ মামলার মূল কপি পাওয়া যায়নি। আসামী পক্ষ মামলার প্রয়োজনে এ জাল কপি তৈরি করেছে। তাই মমতাজ বেগমের মামলার নথি হিসেবে   আসামী পক্ষের দাখিল করা এ এভিডেন্স  বিবেচনায় নেয়  উচিত হবেনা।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আজ আদালতে বলেন, ইব্রাহীম কুট্টির হত্যা বিষয়ে মামলার নথির খেঁজে তিনি দুই দফা বরিশাল এবং একবার পিরোজপুর সফর করেছেন। কিন্তু সেখানে এ মামলার কাগজ খুজে পাওয়া যায়নি।

মমতাজ বেগমের দায়ের করা মামলার এফআইআর নথির  সার্টিফাইড কপি আসামী পক্ষ ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছে। সেটি প্রদর্শনী ‘এ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে । এফআইআর নথির সার্টিফাইড কপি বা প্রদর্শনী ‘এ’ আমলে না নেয়ার জন্য গতকাল অ্যাটর্নি জেনারেল লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন আপিল বিভাগে। গতকাল যুক্তি উপস্থাপনের সময় তিনি এ আবেদন পড়ে শোনান।
আসামী পক্ষের দায়ের করা ১৯৭২ সালের মামলার কপি রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জাল মিথ্যা এবং সৃজনকৃত হিসেবে আখ্যায়িত করার পর আদালত মামলার মূল সার্টিফাইড কপি দেখতে চেয়েছেন। আগামীকাল তা আপিল বিভাগের রেকর্ড রুম থেকে আদালতে হাজির করার জন্য বলেছেন আদালত।

মাওলানা সাঈদীর মামলার নথির খোঁজে অ্যাটর্নি জেনারেল বরিশাল এবং পিরোজপুর সফর করেছেন মর্মে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রচারিহ হয়। তবে সাঈদীর মামলার নথির খোঁজে বরিশাল এবং পিরোজপর গেছেন একথা অস্বীকার করেন তিনি। কিন্তু আজ অ্যাটর্নি জেনারেল তার আবেদনে লিখিত আকারে জানান এ মামলার কাজে অর্থাৎ ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে মমতাজ বেগমের মামলার নথির খোঁজেই তিনি এ সফর করেছেন ।

ট্রাইব্যুনাল মাওলানা সাঈদীকে আটটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আজ এ আটটি অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শেষে দেলোয়ার শিকদার নাম প্রসঙ্গে যুক্তি পেশ করেন। এরপর তিনি আসামী পক্ষের দায়ের করা মমতাজ বেগমের মামলার ডকুমেন্ট বিষয়ে লিখিত আবেদন পেশ করেন এবং আদালতে তা পড়ে শোনান। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।

মমতাজ বেগমের নথি বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এর আবেদন :
আসামী পক্ষের দায়ের করা মমতাজ বেগমের মামলার এফআইআর কপি বা প্রদর্শনী ‘এ’ আদালত কর্তৃক বিবেচনায় না নেয়ার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল লিখিত আবেদন ১০টি যুক্তি তুলে ধরেছেন।
লিখিত আবেদনে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আসামী পক্ষের দায়ের করা কথিত এফআইআর কপি বিষয়ে তদন্তের জন্য তিনি গত ২৯/৩/২০১৪ তারিখে পিরোজপুর সফর করেন। পিরোজপুর এসপির তত্ত্বাবধানে থানার ওসির মাধ্যমে এ মামলার রেকর্ড খোঁজ হয় কিন্তু কোন রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালে বিচারচলাকালে আসামী পক্ষ দাবি করেছে  এ মামলার চার্জশিট হয়েছিল।  সে মোতাবেক এ চার্জশিট বরিশাল স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল যা ১৯৭২ সালে গঠিত হয় সেখানে পাঠানোর কথা। সেখানে চার্জশিট পাওয়া যেতে পারে এ লক্ষ্যে আমি বরিশাল যাই এবং জেলাজজ আদালতের রেকর্ডরুমে খোঁজ করি। কিন্তু রেকর্ড কিপার আমাদের জানায় স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের কেস নম্বর ছাড়া এ রেকর্ড পাওয়া যাবেনা। তাই আমি আমার সহকর্মী নিয়ে আবার বরিশাল যাই এবং ১/৪/২০১৪ ও ২/৪/২০১৪ তারিখ ১৯৭২ সালে পিরোজপুরে দায়ের করা ৯ নং মামলার নথি খোঁজ করা হয়। কিন্তু নেজারাত আমাদের জানায়  ওই তারিখের স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের কেস নাম্বার পাওয়া যাচ্ছেনা। স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ১৯৭২ এর  রেজিস্ট্রার  বইয়ে  ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত যেসব মামলার রেকর্ড রয়েছে তাতে পিরোজপুরে ১৯৭২ সালে দায়ের করা ৯ নং মামলার কোনকিছু নেই।

অ্যাটর্নি জেনারেল লিখিত আবেদনে বলেন, আসামী পক্ষ দাবি করেছে মমতাজ বেগমের মামলায় চার্জশিট হয়েছিল। সে হিসেবে স্বাভাবিকভাবে তাদের এ মামলার চার্জশিটও পাওয়ার কথা। কিন্তু এটা আশ্চর্য বিষয় যে, তারা এ মামলার চার্জশিটের কোন সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করতে পারেনি।
আাসামী পক্ষের দায়ের করা কপি থেকে দেখা যায় মমতাজ বেগম ২১/১০/১৯৭২ সালে মামলার সার্টিফাইড কপি লাভ করেন। মমতাজ বেগম কেন এ কপি সংগ্রহ করল এবং কেনই বা ২০১১ সাল পর্যন্ত এটা সংরক্ষন করল সে বিষয়ে কোন ব্যাখ্যা নেই। আসামী পক্ষ তাদের সমস্ত কাগজপত্র অভিযুক্তর ছেলে ও ১৩ নং সাফাই সাক্ষীর মাধ্যমে দাখিল করেছে কিন্তু এই কাগজটি ১১ নং সাফাই সাক্ষীর মাধ্যমে দাখিল করিয়েছে এবং প্রদর্শনী ‘এ’ মার্ক করা হয়েছে।  যেহেতু এটা জাল এবং বানানো তাই এটা ১৩ নং সাক্ষীর মাধ্যমে দাখিল করানো হয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম লিখিত আবেদনে আরো বলেন, এফআইআর এ কোন আসামীর নাম নাও থাকতে পারে বিভিন্ন কারনে। কিন্তু তদন্তের পর প্রকৃত আসামীদের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মমতাজ বেগমের মামলাটি সত্যি হলে এ মামলার একটি চার্জশিট আসামী পক্ষ অবশ্যই সংগ্রহ করতে পারত।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তাই নিম্নলিখিত কারনে প্রদর্শনী ‘এ’ বিবেচনায় নেয়া ঠিক হবেনা।

ক)    মূল এফআইআর কপি পিরোজপুর পুলিশ স্টেশন বা বরিশাল সেশন জজ আদালত কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা। কাজেই আসামী পক্ষের জমা দেয়া ডকুমেন্ট এর সত্যতা যাচাই করা যাচ্ছেনা।
খ)    আসামী পক্ষের দাবি এ মামলার চার্জশিট হয়েছিল। যেহেতু তারা এ মামলার চার্জশিট জমা দিতে পারেনি কাজেই মাওলানা সাঈদী  ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার সাথে জড়িত ছিলনা মর্মে আসামী পক্ষের দাবি সঠিক নয়।
গ)    কথিত এফআইআর এ ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার বিবরনের সাথে তারই তিনজন ঘণিষ্ঠ আত্মীয়ের বক্তব্যের সাথে মিল নেই।
ঘ)    ডকুমেন্টটি আইন অনুযায়ী দাখিল করা হয়নি।
ঙ)    একজন গ্রাম্য দরিদ্র মহিলা ১৯৭২ সালে  সার্টিফাইড কপিটি তোলেন বলে বলা হচ্ছে। গ্রামের একজন দরিদ্র মহিলার কাছে ৪০ বছর ধরে সংরক্ষিত কপিটি দেখতে এত নতুন হতে পারেনা।
চ)    কপিটিতে সেসময়কার ট্রাইব্যুনালের কোন সিল নেই এবং সার্টিফাইড কপির একটি ফটোকপিতে প্রদর্শনী  ‘এ’ মার্ক করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালে।
ছ)     অভিযোগের প্রতি পাতায় উপরে ডানদিকে বাদীর স্বাক্ষর থাকার কথা কিন্তু তা নেই।
জ)    অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত এবং বাদীর পূর্ণ ঠিকানা থাকতে হয়। কিন্তু তা নেই। 
ঝ)     ১৩ তম সাফাই স্বাক্ষীর বক্তব্য অনুযায়ী প্রদর্শনী ‘এ’ সিতারা বেগমের কাছে ছিল। ইব্রাহীমরে স্ত্রী মমতাজ বেগম তার মা সিতারা বেগমের কাছ থেকে নিয়ে ১৩ তম সাক্ষীর বড়ভাই রাফিক সাঈদীকে প্রদান করে। এরপর সে তা ১৩ তম সাফাই স্বাক্ষীকে দেয় ১৩ তম সাক্ষী আবার তা ১১ তম সাক্ষীকে দেয় যে কিনা জামায়াতের একজন নেতা। এ ডকুমেন্ট দাখিলের সময় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হয়েছে।
ঞ)    এসব কারনে আসামী পক্ষের দায়ের করা কপি প্রদর্শনী ‘এ’ মিথ্যা, জাল এবং মামলার প্রয়োজনে সৃজন করা হয়েছে। সে কারনে এটা বিবেচনায় নেয়া সটিক নয়।

অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি পেশ শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল শিকদার নাম প্রসঙ্গ এবং মমতাজ বেগমের মামলার নথি বিষয়ে যুক্তি পেশ করছিলেন। এ সময় একজন বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আসামী পক্ষের দায়ের করা মমতাজ বেগমের  মামলার নর্থির বিরুদ্ধে আপনি কি নিয়ে এসেছেন বলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল এরপর তার আবেদন থেকে পড়ে শোনান। এসময় আদালত বলেন, আপনি আমাদের কাছ থেকে সময় নিয়ে পটুয়াখালি বেড়াতে গিয়েছিলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমি এ মামলার কাজেই বরিশাল গিয়েছি। মমতাজ বেগমের মামলার নথিকে জাল আখ্যায়িত করে যুক্তি পেশের সময় একজন বিচারপতি বলেন, আপনি বলতে চাচ্ছেন মমতাজ বেগমের মামল ফেক?
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, হ্যা ফেক। কারণ ইব্রাহীম কুট্টির তিনজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় যথা তার শাশুড়ী সিতারা বেগম, শ্যালিকা রানী বেগম এবং শ্যালক মোস্তফা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছে তার সাথে মমতাজ বেগমের মামলার কথিত এফআইআর এ বর্নিত ঘটনার মিল নেই।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এ তিন সাক্ষীর   জবানবন্দী তাদের অনুপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
আদালত এসময় বলেন, আসামী পক্ষ ৪০ বছর আগে তোলা মামলার যে সার্টিফাইড কপি জমা দিয়েছে তা কোথায়? আসামী পক্ষ এবং রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জানানো হয় সেটা আপিল বিভাগের রেকর্ডরুমে জমা  আছে। প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন এসময় অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেন, সেটা নিয়ে আসলেননা কেন? আপনাদের না সেটা দেখার অনুমতি দিলাম?
এ পর্যায়ে আদালত বলেন, ৪০ বছর আগের কপিটি কেমন তা দেখা দরকার। আদালত কপিটি রেকর্ডরুম থেকে আগামীকাল আদালতে হাজির করার আদেশ দেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, তারা যে মূল সার্টিফাইড কপিটি জমা দিয়েছে তাতে প্রদর্শনী মার্ক করা হয়নি। প্রদর্শনী মার্ক করা হয়েছে ফটোকপির ওপর। আদালত বলেন, বলেন কি? এ পর্যায়ে একটা বেজে যাওয়ায় বিচার কার্যক্রম আগামীকাল  বৃহষ্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মিজানুল ইসলাম। মমতাজ বেগমের মামলার ডকুমেন্ট বিষয়ে আজ অ্যাটর্নি জেনারেল এর দাবি বিষয়ে তিনি দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল এর দাবি বিষয়ে আমরা লিখিত জবাব দেব। অ্যাটর্নি জেনালে বলেছেন, আমাদের জমা দেয়া কপিতে সেসময়কার ট্রাইব্যুনালের সিল নেই। কপিটি পিরোজপুর থেকে ইস্যু হয় ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর আগেই। কাজেই ট্রাইব্যুনালের সিল থাকবে কেমন করে। অ্যাটর্নি জেনারেল এর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমি বলছি তিনি কি করে এসব অযৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করলেন তা আমাদের বুঝে আসেনা। মমতাজ বেগমের মামলার জিআর কপি বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এর আবেদনে একটি কথাও নেই। আমাদের কাছে আছে জিআর কপি আছে এবং ট্রাইব্যুনালে তা আমরা জমা দিতে চেয়েছি কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সে আবেদন খারিজ করেছে। আমরা আরো আবেদন করেছিলাম পিরোজপুর থেকে মামলার জিআর কপি তলব করা হোক। তাও খারিজ হয়। আমরা চার্জশিট জমা দেইনি বলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। জিআর কপিতে মামলার চার্জশিট  হয়েছিল মর্মে উল্লেখ আছে।
মিজানুল ইসলাম বরেন, একজন গ্রাম্য মহিলা কেন সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করল এবং তা কেন এতদিন সংরক্ষন করল বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সে  মামলার বাদী। মমতাজ বেগমের  স্বামী, ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। নিহতরা সিতারা বেগমের সন্তান এবং জামাই। তারা এ কপি সংগ্রহ করে রাখবেনা তো কে রাখবে? তাদের কেন কোর্টে আনা হলনা? মমতাজ বেগম জীবিত থাকা সত্ত্বেও তদন্ত কর্মকর্তা কেন তার কাছে গেলনা এবং তাকে স্বাক্ষী করলনা?
কাজেই আমাদের ডকুমেন্ট জাল এ পর্যায়ে আর এ প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

শুনানীর সময় রাষ্ট্রপক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে আনোয়ার।
আসামী পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে  ছিলেন, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশন এর সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন, এসএম শাহজাহান, তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন, মহিনুর ইসলাম, মতিয়ার রহমান, মোসাদ্দেক বিল্লাহ।

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা বিষয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে একটি মামলা করেন পিরোজপুর আদালতে। সে মামলায় মমতাজ বেগম  ১৩  জনকে আসামী করেন।  আসামীর তালিকায়  মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। সে মামলার কপি ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় আসামী পক্ষ।



মঙ্গলবার, ৮ এপ্রিল, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল শুনানী অব্যাহত

৮/৪/২০১৪
এক সপ্তাহ মুলতবি থাকার পর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল শুনানী পুনরায় শুরু হয়েছে আজ। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৬ নং অভিযোগ গৌরাঙ্গসাহার তিন বোনকে পাকিস্তানী সেনাদের হাতে তুলে দেয়া বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। এরপর বিচার কার্যক্রম আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ৬, ৭, ৮, ১০, ১১ এবং  ১৪ নং অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়েছে। মাওলানা সাঈদীকে ট্রাইব্যুনাল মোট আটটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। এ অভিযোগগুলোর বিষয়েই আপিল শুনানী চলছে।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অন্যান্য আইনজীবীদের মধ্যে বাংলাদেশ  সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশন এর সভাপতি  খন্দকার মাহবুব হোসেন, এসএম শাহজাহান, ব্যারিস্টার তানভির আহেমদ আল আমিন, গিয়াসউদ্দিন মিঠু, তারিকুল ইসলাম,  মহিনুর ইসলাম, মতিয়ার রহমান, মোসদ্দেক বিল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।

রবিবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা ও ইব্রাহীম কুট্টি ইস্যু/// তিন বছর পর মমতাজ বেগমের মামলার নথির খোঁজে রাষ্ট্রপক্ষ

মেহেদী হাসান,  ৬/৪/২০১৪
মাওলানা দেলাওয়ার  হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে  আলোচিত ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা মামলার নথির খোঁজ করছে রাষ্ট্রপক্ষ। ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগমের ১৯৭২ সালে দায়ের করা  মামলার নথি আসামী পক্ষ জমা দিয়েছিল ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে। তিন বছরের মাথায় রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলার নথির খোঁজ করছে যখন ট্রাইব্যুনালে এ মামলার রায় হয়ে গেছে এবং আপিল বিভাগেও এ মামলার শুনানী একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা মামলার নথির খোঁজে পিরোজপুর এবং বরিশাল সফর করেছেন।  গত ২ এবং ৩ এপ্রিল বরিশাল জেলাজজ আদালতের রেকর্ড রুমে তিনি এ মামলার নথির খোঁজ করেছেন। এর আগে তিনি পিরোজপুর সফর করেন একই উদ্দেশে। তবে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে নির্দিষ্ট করে বলতে অস্বীকার করেছেন ঠিক কি কাজে তিনি বরিশাল গেছেন এবং কোন মামলার কাগজ পত্র খোঁজ করছেন। তবে স্থানীয় সাংবাদিকরা তাদের প্রতিবেদনে বরিশাল জেলাজজ আদালতের সূত্র এবং বিভিন্ন আইনজীবীদের বরাতে উল্লেখ করেছেন যে, ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা মামলার নথির খোঁজেই অ্যাটর্নি জেনারেল বরিশাল গেছেন।

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আলোচিত অভিযোগ হল ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যা। এ অভিযোগে  ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। বর্তমানে এ মামলার আপিল শুনানী শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আপিল শুনানীর এ পর্যায়ে আবারো ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা এবং তার স্ত্রী মমতাজ বেগম কর্তৃক ১৯৭২ সালে দায়ের করা মামলার ডকুমেন্ট আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে এবং উপস্থিতিতে ইব্রাহীম কুট্টিকে পাড়েরহাট বাজারে  পাকিস্তানী সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করে। কিন্তু ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে যে মামলা করেন তাতে আসামীর তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। সেই মামলার ডকুমেন্ট আসামী পক্ষ ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে বিচার চলাকালে ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ তখন অভিযোগ করে আসামী পক্ষ মামলার প্রয়োজনে এ জাল দলিল তৈরি করেছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে তবে আসামী পক্ষের এ ডকুমেন্ট বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ করা হয়নি রায়ে।

গত ৩ মার্চ প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নতেৃত্বে আপিল শুনানীর  সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম মমতাজ বেগমের মামলার ডকুমেন্ট বিষয়ে একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়েন।
আদালত তখন তাকে প্রশ্ন করেন, আসামী পক্ষ মমতাজ বেগমের মামলার ডকমেন্ট সংগ্রহ করতে পারল আর আপনারা পারলেননা কেন? ১৯৭২ সালে আদৌ এ ধরনের কোন এফআইআর হয়েছিল কি-না? পিরোজপুরে অবশ্যই জিআর রেজিস্ট্রেশন বই আছে। আপনারা এটা চাইতে পারতেননা? আপনাদের অনেক বড় মেশিনারীজ আছে। তার মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন? আমরা যদি আসামী পক্ষের দায়ের করা এ ডকুমেন্ট গ্রহণ করি তাহলে অ্যাটলিস্ট আমরা বলতে পারি সাঈদী এ ঘটনায় জড়িত নয়।
আদালত আরো বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ মামলার শুনানী চলছে। আসামী পক্ষ অনেক আগে এ বিষয়ে যুক্তি পেশ করেছে। আপনারা অনেক সময় পেয়েছেন। এ দীর্ঘ সময়ে আপনারা চাইলে এ ডকুমেন্ট বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারতেন।

এরপর গত ১১ মার্চ অ্যাটর্নি জেনারেল আসামী পক্ষের জমা দেয়া মমতাজ বেগমের মামলার মূল সার্টিফাইড কপি আপিল বিভাগের রেকর্ড রুম থেকে দেখার আবেদন করেন। আসামী পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে তিনি এ কপি দেখার অনুমতি পান। তবে আসামী পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে এখন পর্যন্ত তাদের কাউকে এ ডাকা হয়নি এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস থেকে। গত ১ এপ্রিল শুনানীর পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এ মামলার বিচার ৮ এপ্রিল পর্যন্ত মুলতবি চান। এরপর খবর বের হল মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় আলোচিত ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগমের মামলার নথির খোঁজে অ্যাটর্নি জেনারেল বরিশাল সফর করছেন।
ইব্রাীহম কুট্টি হত্যার অভিযোগ : পাড়েরহাট বাজারের নিকটে সইজুদ্দিন পসারীদের  বাড়িতে কাজ করত ইব্রাহীম কুট্টি। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে বলা হয়েছে ১৯৭১ সালের ৮ মে মাওলানা সাঈদীসহ শান্তি কমিটির অন্যান্য লোকজনের নেতৃত্বে পাকিস্তান সৈন্যরা ওই বাড়িতে আক্রমন করে। এসময় ইব্রাহীম কুট্টি ও অপর আরেকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পাড়েরহাট বাজারে। পরে মাওলানা সাঈদীর উপস্থিতিতে এবং নির্দেশে পাকিস্তান সৈন্যরা তাকে গুলি করে হত্যা করে পাড়েরহাট বাজারে।

আসামী পক্ষের দাবি : আসামী পক্ষের দাবি ইব্রাহীম কুট্টিকে ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর নলবুনিয়ায় তার শশুরবাড়ি থাকা অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যার সাথে মাওলানা সাঈদী জড়িত নন। এ দাবির পক্ষে তারা ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগমের মামলার নথি জমা দিয়েছে আদালতে। মমতাজ বেগমের মামলায় ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে মোট ১৩ জন আসামী করা হয়। আসামীর তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। আসামী পক্ষের দাবি তিনি যদি এর সাথে জড়িত থাকতেন তাহলে অন্তত মমতাজ বেগমের মামলায় তাকে তখন আসামী করা হত।

মমতাজ বেগমের মামলায় ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার বিবরন : স্বামী  ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার বিচার চেয়ে মমতাজ বেগম দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে পিরোজপুরে একটি মামলা করেন। সে মামলার বিবরনে মমতাজ বেগম উল্লেখ করেছেন   তার স্বামী  ইব্রাহীম কুট্টি তার বাপের বাড়ি নলবুনিয়া থাকা অবস্থায় শান্তি কমিটির লোকজন এবং পাকিস্তান আর্মি গুলি করে  হত্যা করেছে। ঘটনার সময়কাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৭১ সালের ১  অক্টোবর ।
মমতাজ বেগমের মামলায় আরো উল্লেখ আছে যে, ওই ঘটনার সময় তাদের বাড়ি থেকে তার ভাই সাহেব  আলী ওরফে সিরাজ এবং তার মা সিতারা বেগমকেও ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পিরোজপুর। পরে তার মাকে ছেড়ে দেয়া হলেও তার ভাই সাহেব আলীকে আর ছাড়া হয়নি। তাকে পাকিস্তান পিরোজপুরে আর্মি গুলি করে হত্যা করে।

মমতাজ বেগমের মামলার বিবরনে বলা হয়েছে ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবার নলবুনিয়া তার শশুর বাড়ি থাকা অবস্থায়। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের দাবির্  ৮ মে তাকে পাড়েরহাট বাজারে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের তথ্যের স¤পূর্ণ বিপরীত তথ্য রয়েছে মমতাজ বেগমের মামলার নথিতে।

মমতাজ বেগমের মামলায় ঘটনার বিবরন নিম্নরূপ :

“ঘটনার বিবরন এই যে, বিবাদীগন পরষ্পর যোগাযোগে রাইফেল পিস্তল ছোরা লাঠি ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হইয়া আমার পিতার ঘর বেড়দিয়া আমার স্বামীর উপর গুলি করিয়া হত্যা করিয়া আমার শরীরে জখম করিয়া আমার মাতা ও ভ্রাতাকে ধরিয়া পিরোজপুর আনিয়া আমার মাতাকে ছাড়িয়া দিয়া আমার ভ্রাতা সিরাজুলকে গুলি করিয়া হত্যা করিয়াছে। আক্রোশের কারণ এই যে, আমি ও আমার স্বামী আমার স্বামীর বারিতে বাদুরা গ্রামে বাসবাস করিতেছিলাম। গত মে মাসে পাক সৈন্য এদেশে আসিয়া যখন অকারনে গুলি করিয়া মানুষ হত্যা করিতে থাকে তখন কতিপয় হিন্দু আমাদের সরনাপন্ন হওয়ায় আমরা তাহাদের আশ্রয় দেওয়ায় পাক সৈন্য ও তাহাদের দালালরা আমার স্বামীকে হত্যা করিতে খোঁজ করিতে থাকায় আমরা ভয়ে ভীত হইয়া আমরা পিত্রালয়ে বসবাস করিতেছিলাম। তথায় বিবাদীগন ক্রোধ করিয়া উক্তরুপ অত্যাচার করিয়াছে।

প্রকাশ থাকে যে, বর্তমানে আমি গর্ভবতী থাকায় আমার পিতা পারোরহাট আওমীলীগ অফিসে জানাইয়া কোন প্রতিকার পাইনাই। তাই এই দরখাস্ত করিতে বিলম্ব হইল।
সে মতে প্রার্থনা, আদালত দয়া করিয়া উক্ত ধারামতে উক্ত বিবাদীগনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট দিয়া ধৃত করাইয়া সুবিচার করিতে আজ্ঞা হয়। ইতি মমতাজ বেগম”


মমতাজ বেগমের মামলার আসামীর তালিকা :

মমতাজ বেগম  সে মামলায় মোট ১৩ জনকে আসামী করেছেন।  এরা হল  দানেশ মোল্লা,  আতাহার আলী, আশ্রাব আলী, আব্দুল মান্নান, আইউব আলী, কালাম চৌকিদার, রুহুল আমিন, আব্দুল হাকিম মুন্সি, মমিন উদ্দিন, সেকোন্দার আলী শিকদার, শামসুর রহমান এসআই, মোসলেম মাওলানা।  এছাড়া পাকিস্তান আর্মিকেও আসামী করা হয় মমতাজ বেগমের মামলায়। কিন্তু মমতাজ বেগমের মামলায় আসামীদের তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।


আপিল শুনানীর সময় মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম  শাহজাহান আদালতে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আমাদের এ ডকুমেন্টকে অসত্য এবং জাল আখ্যায়িত করেছে।  তাদের উচিত ছিল পিরোজপুর থেকে পুলিশ কর্তৃপক্ষকে ডাকার ব্যবস্থা করে তাদের দাবি প্রমান করা। কিন্তু তারা তা করেনি। বরং  আমরা থানা থেকে এ মামলার নথিপত্র তলবের জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সে আবেদন খারিজ করে দিয়েছে।

আসামী পক্ষ যেভাবে সংগ্রহ করল মমতাজ বেগমের মামলার নথি : মাওলানা সাঈদীর ছেলে এবং ১৩ তম সাফাই সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে জেরায় বলেছেন, ‘তার বড় ভাই মরহুম রাফিক বিন সাঈদীকে মমতাজ বেগমের মা সিতারা বেগম মামলার মূল সার্টিফাইড কপি সরবরাহ করেন।’
মামলার বাদী মমতাজ বেগমের মা সিতারা বেগম ১৯৭২ সালে এ মামলার সার্টিফাইড কপি পিরোজপুর থেকে ইস্যু করান এবং সিতারা বেগম দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এ মামলার কপি সংরক্ষন করেছেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল এর বক্তব্য : ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা মামলার খোঁজে বরিশাল এবং পিরোজপুর সফর বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিষয়ে আজ বিকালে ফোনে কথা  হয় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের সাথে। তাকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার নথির খোঁজে বরিশাল এবং পিরোজপুর সফর করেছেন মর্মে খবর বের হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমি তাদেরকে বলিনি যে, আমি সাঈদীর মামলার কাজে এবং ইব্রাহীম কুট্টির হত্যা মামলার নথির খোঁজে বরিশাল এবং পিরোজপুর গিয়েছি। আমি অন্য একটি কাজে গিয়েছি।
কিন্তু স্থানীয় সাংবাদিকরা জেলাজজ সূত্র এবং আইনজীবীদের বরাত দিয়ে বলেছেন, আপনি এ মামলার কাজেই বরিশাল গেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, এটা তাদের অনুমান। তারা দেখেছে আমি দুইদিন জেলাজজ আদালতের রেকর্ডরুমে ছিলাম। সেকারনে তারা এটা বলেছে হয়ত।
তাহলে আমরা কি বলব যে, আপনি সাঈদীর মামলার কাজে নয় অন্য কোন মামলার কাজে বরিশাল গেছেন? জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, না আমি এটাও বলতে চাইনা। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাইনা।
আসামী পক্ষ তিন বছর আগে মমতাজ বেগমের মামলার ডকুমেন্ট জমা দিয়েছে। তখন রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কোন খোঁজ খবর নেয়নি কেন এবং এখন এতদিন পরেই বা কেন খোঁজ করছেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তারা আমার কলিগ। তাদের আমি কিভাবে সমালোচনা করব। আপনারা তো সবই বোঝেন ।

মাওলানা সাঈদীর মামলায় নিযুক্ত আইনজীবী মিজানুল ইসলাম বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল সাঈদীর মামলায় যুক্তি পেশ করছিলেন। তাই স্বাভাবিকভাবে অনুমান করা যায় তিনি এ মামলার কাজেই বরিশাল গেছেন। আমরা ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে মমতাজ বেগমের মামলার ডকুমেন্ট জমা দিয়েছি ট্রাইব্যুনালে। রাষ্ট্রপক্ষ তখন একে জাল বলে আখ্যায়িত করলেন। আমরা তখন সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে মামলার নথি তলবের আবেদন করলে রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরোধীতা করে। এখন তিন বছর পর কেন তারা এ মামলার নথির খোঁজ করছে সেটা আমাদের বোধগম্য নয়।

মমতাজ বেগমের মামলার ঘটনাপ্রবাহ :
মামলার নথি  ঘেটে দেখা যায় ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ মমতাজ বেগম পিরোজপুর এসডিও কোর্টে প্রথম এ মামলা করেন। তখন এসডিও ছিলেন একে আজাদ। ওই তারিখে এসডিও মামলাটি পিরোজপুর থানায় পাঠান।

বাদী মমতাজ বেগমের লিখিত অভিযোগ এসডিওর কাছ থেকে পাবার পর পিরোজপুর থানা ১৬/৭/১৯৭২ তারিখ বেলা ১টা ৩০ মিনিটের সময় অভিযোগটি এজাহার হিসেবে রেকর্ড করে। মামলা নং ৯। জিআর (জেনারেল রেজিস্ট্রার) নং ৩৭৮/৭২।

১৭/৭/১৯৭২ তারিখ সকাল ৮টায় থানা থেকে মামলাটি পিরোজপুর কোর্টে পাঠানো হয়। তখন থানার ওসি ছিলেন মেফতাউদ্দিন আহমেদ। তিনি নিজে মামলার তদন্ত শুরু করেন। মামলার এজাহারে ঘটনার তারিখ লেখা আছে ১/১০/১৯৭১। বাংলা ১৩ আশ্নিন ১৩৭৮।
২২ জুলাই ১৯৭২ এসডিও কোর্টে মামলাটি উত্থাপন করা হয়।

২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ পুলিশ এ মামলার চার্জশিট দাখিল করে।

৩ অক্টোবর ১৯৭২ এসডিও বরাবর চার্জশিট উপস্থাপন করা হয়।
মমতাজ বেগমের অভিযোগ অনুসারে  এ মামলার তদন্তকালে আসামীদের মধ্য থেকে ২ জনকে আটক করা হয়। এরা হল আইউব আলী চৌকিদার ও সুন্দর আলী দফাদার।

পুলিশের প্রতিবেদনে আসামীদের মধ্য থেকে যাদেরকে পলাতক দেখানো হয় তারা হল
১.    দানেশ মোল্লা
২.    আশরাফ আলী
৩.     আব্দুল মান্নান
৪.    কালাম চৌকিদার
৫.    আব্দুল হাকিম মুন্সি
৬.    মমিন উদ্দিন
৭.    মোসমেল মওলানা।

মামলা চলাকালে পলাতক আসামীদের মধ্য থেকে আরো ২ জনকে আটক করা হয়। ১৯৭২ সালের ৭ অক্টোবর আব্দুল মান্নান এবং ১৯৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মমিন উদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয় যা মেজিস্ট্রেট কোর্টে সংরক্ষিত জিআর বইতে ৩৭৮/৭২ জিআর কপি পর্যালোচনা করে দেখা যায়।
জিআর কপি পর্যালোচনা করে আরো দেখা যায় মমতাজ বেগমের দায়ের করা ওই মামলা থেকে আসামী আতাহার আল হাওলাদার, রুহুল আমিন সেকেন্দার শিকদার, শামসুর রহমান (তৎকালীন পিরোজপুর পুলিশ ফাঁড়ির এসআই) কে অব্যাহতি দেয় কোর্ট।

মমতাজ বেগমের দায়ের করা মামলাটি ২৭/১১/১৯৭২ সালে তৎকালীন এসডিও এমএ হাশেম মিয়া স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল জাজ বরিশাল প্রেরন করেন।
মামলার জিআর বইয়ে দেখা যায় ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ সালে মামলার কার্যক্রমের জন্য মামলাটি বাকেরগঞ্জ ডিসির কাছে পাঠানো হয়েছিল। জিআর বইয়ের ১৭ নং কলামে লেখা আছে-
Judicial record sent to DC Bakergong provide this memo No 255 Judicial, dated 17/2/1981 vide this complt mcc No 189/81.






বুধবার, ১২ মার্চ, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল // শুনানী ১ এপ্রিল পর্যন্ত মুলতবি

১২/৩/২০১৪
অবকাশকালীন ছুটির কারনে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।

অবকাশকালীন ছুটির আগে মার্চ মাসে আগামীকাল সুপ্রীম কোর্টের শেষ কার্যদিবস। আগামী পয়লা এপ্রিল পুনরায় বসবে কোর্ট। তবে আগামীকাল কোর্ট খোলা থাকলেও মাওলানা সাঈদীর বিচার কার্যক্রম আজ থেকেই মুলতবি করা হয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আজ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ১০ নং অভিযোগ বিশাবালী হত্যার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। বিশাবালী হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দী থেকে পড়ে শোনান তিনি। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।
সকালের সশনের শুনানী শেষে মাওলানা সাঈদীর বিচার কার্যক্রম অবকাশকালীন ছুটি চলা পর্যন্ত মুলতবি করেন কোর্ট।

মঙ্গলবার, ১১ মার্চ, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল /// মমতাজ বেগমের মামলার মূল কপি দেখতে চেয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল

মেহেদী হাসান, ১১/৩/২০১৪
মমতাজ বেগমের মামলার মূল কপি দেখতে চেয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আজ শুনানীর সময় তিনি আদালতের কাছে এ আবেদন করলে আদালত অনুমতি দেন। একজন বেঞ্চ অফিসার এবং আসামী পক্ষের একজন আইনজীবীর উপস্থিতিতে তিনি মামলার এ ডকুমেন্ট দেখতে পারবেন বলে জানিয়েছেন আদালত।

স্বামী ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার বিচার চেয়ে মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে পিরোজপুরে একটি মামলা করেছিলেন। সেই মামলার এজাহারের একটি সার্টিফাইড কপি  আসামী পক্ষ সংগ্রহ করে ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়। ট্রাইব্যুনালে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রায় হওয়ার পর এ মামলার  যাবতীয় কাগজপত্র আপিল বিভাগে জমা আছে প্রধান বিচারপতির অধীনে। এর মধ্যে আসামী পক্ষের জমা দেয়া মমতাজ বেগমের মামলার মূল সার্টিফাইড কপিও রয়েছে। রেকর্ড রুম থেকে সেই কপিটাই দেখতে চেয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

এদিকে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।
ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়।
এদিকে আজো শুনানীর সময় আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলকে প্রশ্ন করেন ১৯৭২ সালে মামলার এ সার্টিফাইড কপি কে কিজন্য তুলেছিল এবং কেন তা সে এতদিন  ধরে সংগ্রহে রাখল এবং সে তা আসামী পক্ষকেই বা কিভাবে দিল এ বিষয়ে জেরায় আপনারা কোন প্রশ্ন করেছিলেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এ বিষয়ে বিশদ জেরা হয়েছে। আসামী পক্ষের সাফাই সাক্ষীকে এ বিষয়ে জেরা করা হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। তিনি জেরা থেকে পড়ে শুনিয়ে বলেন, সিতারা বেগমের (মমতাজ বেগমের মা এবং ইব্রাহীম কুট্টির শাশুড়ী) কাছে মামলার এ সার্টিফাইড কপিটি ছিল। আসামী পক্ষের ১৩ নং সাক্ষী মাসুদ সাঈদী জেরায় বলেছেন তার বড়ভাই (মরহুম রাফিক বিন সাঈদী) সিতারা বেগমের কাছ থেকে এ কপি সংগ্রহ করেছেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল যুক্তি উপস্থাপনের শুরুতে বলেন, যদি ধরেও নেই এ ডকুমেন্ট সত্য তাহলে আমার ভিন্ন আর্গুমেন্ট আছে।
এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দী থেকে পড়ে শুনিয়ে আদালতে বলেন, তাকে যে পাড়েরহাট হত্যা করা হয়েছে এ নিয়ে কোন বিতর্ক নেই।

ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি মাওলানা সাঈদীর উপস্থিতিতে এবং পরামর্শে ১৯৭১ সালের ৮ মে তাকে পাড়েরহাট বাজারে হত্যা করা হয়।
অপরদিকে স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে মমতাজ বেগম পিরোজপুরে যে মামলা করেন তাতে মোট ১৩ জনকে আসামী করা হয়। আসামীর তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। ১৯৭২ সালে পিরোজপুর দায়ের করা মমতাজ বেগমের মামলায় বলা হয়েছে ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর ইব্রাহীম কুট্টি নলবুনিয়ায় তার শশুরবাড়ি  থাকা অবস্থায় নিহত হয়। ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যার সময় তার শ্যালক অর্থাৎ মমতাজ বেগমের ভাই সিহাব আলীকেও  ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। 

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে বর্নিত ঘটনাস্থল হল পাড়েরহাট এবং ঘটনা সংঘটনের সময় হল ১৯৭১ সালেল ৮ মে। অপরদিকে মমতাজ বেগমের মামলার এজাহারে বর্ণিত ঘটনাস্থল হল নলবুনিয়া এবং ঘটনা সংঘটনের সময় হল ১ অক্টোবর। ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ  এবং মমতাজ বেগমের মামলায় বর্নিত তথ্যে মিল নেই। শুধু তাই নয়, মমতাজ বেগম সে মামলায় তার স্বামী এবং ভাই হত্যার জন্য ১৩ জনকে আসামী করেন। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পাড়েরহাট এবং তার আশপাশের এলাকায় যত হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং অত্যাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে তার প্রতিটিতে যাদের নাম বারবার ঘুরেফিরে এসেছে তাদের সকলেই মমতাজ বেগমের মামলায় আসামী। কিন্তু মমতাজ বেগমের মামলায়  ১৩ আসামীর মধ্যে  মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।

মমতাজ বেগমের মামলার ১৩ আসামী হল  দানেশ মোল্লা,  আতাহার আলী, আশ্রাব আলী, আব্দুল মান্নান, আইউব আলী, কালাম চৌকিদার, রুহুল আমিন, আব্দুল হাকিম মুন্সি, মমিন উদ্দিন, সেকোন্দার আলী শিকদার, শামসুর রহমান এসআই, মোসলেম মাওলানা।  এছাড়া পাকিস্তান আর্মিকেও আসামী করা হয় মমতাজ বেগমের মামলায়।

আজ  শুনানীতে আসামী পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, অ্যাডভোটেক এসএম শাহজাহান, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন, তারিকুল ইসলাম প্রমুখ।


সোমবার, ১০ মার্চ, ২০১৪

সাঈদীর আপিল /// মমতাজ বেগমের মামলা নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলকে একের পর এক প্রশ্ন আদালতের

মেহেদী হাসান, ১০/৩/২০১৪
ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগ বিষয়ে শুনানীর সময়  মমতাজ বেগমের মামলার একটি ডকুমেন্ট নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম একের পর এক প্রশ্নের মুখোমখি হন। এসব প্রশ্নের যে জবাব তিনি দিয়েছেন তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যার অভিযোগের স্বপক্ষে আজ  যুক্তি পেশ করছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।

ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যার বিচার চেয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে পিরোজপুরে একটি মামলা করেছিলেন। সেই মামলায় মোট ১৩ জন আসামী ছিল। আসামীর তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। মমতাজ বেগমের সেই মামলার কাগজপত্র আদালতে জমা দিয়েছে আসামী পক্ষ। ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এ ডকুমেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় মামলার প্রয়োজনে এ জাল ডকুমেন্ট আসামী পক্ষ তৈরি করেছে।

আজ শুনানীর সময় মমতাজ বেগমের মামলার এ ডকুমেন্ট বিষয়ে আদালতের অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হয় রাষ্ট্রপক্ষ।
সকালের বিরতির পর আগের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে অ্যাটর্নি জেনারেল যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন । একজন বিচারপতি তখন তাকে প্রশ্ন করেন, আসামী পক্ষ মমতাজ বেগমের মামলার ডকমেন্ট সংগ্রহ করতে পারল আর আপনারা পারলেননা কেন? ১৯৭২ সালে আদৌ এ ধরনের কোন এফআইআর হয়েছিল কি-না? পিরোজপুরে অবশ্যই জিআর রেজিস্ট্রেশন বই আছে। আপনারা এটা চাইতে পারতেননা? আপনাদের অনেক বড় মেশিনারীজ আছে। তার মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন? আমরা যদি আসামী পক্ষের দায়ের করা এ ডকুমেন্ট গ্রহণ করি তাহলে অ্যাটলিস্ট আমরা বলতে পারি সাঈদী এ ঘটনায় জড়িত নয়।
এসময় অপর আরেক বিচারপতি বলেন, মমতাজ বেগমের সেই মামলায় মোসলেম মাওলানা, দানেশ আলী মোল্লা, সেকেন্দার শিকদার সবারই নাম আছে শুধু সাঈদীর নাম নেই।
অ্যাটর্নি জেনারেল এ পর্যায়ে বলেন, দোজ আর নট ট্রেসঅ্যাবল নাউ (এগুলো এখন পাওয়ার উপায় নেই)।
তখন বিচারপতি বলেন, ট্রাইব্যুনালে একথা বলতে পারতেন যে এগুলো এখন পাওয়া যায়না। তাহলেই তো শেষ হয়ে যেত। কিন্তু আপনারা শুধা জাল ডকুমেন্ট বলে সাজেশন দিয়ে ছেড়ে দিলেন? মমতাজ বেগমের এ ডকুমেন্ট বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের কোন ফাইন্ডিংস আছে? এসময় আসামী পক্ষের আইনজীবী এসএম শাহজাহান দাড়িয়ে বলেন, কোন ফাইন্ডিংস নেই।
এ পর্যায়ে একজন বিচারপতি বলেন, আপনারা ম্যারাথন আর্গুমেন্ট করছেন। অ্যাডভোকেট শাহজাহান সাহেব অনেক আগে এ বিষয়ে যুক্তি পেশ করেছেন। অনেক সময় পেয়েছেন আপনারা। এ দীর্ঘ সময়ে আপনারা চাইলে এ ডকুমেন্ট বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারতেন।
আরেকজন বিচারপতি বলেন, মমতাজ বেগমের মামলায় শুধু যে সাঈদীর নাম অনুপস্থিত তা নয়। বরং সেখানে ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ আছে ইব্রাহীম কুট্টিকে নলবুনিয়ায় হত্যা করা হয় অক্টোবর  মাসে।
আরেকজন বিচারপতি বলেন, ৭২ সালে কে এবং কেন এ মামলার সার্টিফাইড কপি তুলেছিল এবং (আসামী পক্ষ ১৯৭২ সালে ইস্যু করা   মামলার সার্টিফাইড কপি জমা দিয়েছে) কেনই বা সে এতদিন এ কপি সংগ্রহ করে রাখল এ বিষয়ে জেরায় আপনারা কোন প্রশ্ন করেছিলেন?

এসব প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বারবার বলার চেষ্টা করেন
মমতাজ বেগমের মামলার এ ডকুমেন্ট ছাড়া আসামী পক্ষের সব ডকুমেন্ট জমা দিয়েছে ১৩ তম সাফাই সাক্ষী। তিনি বলেন, এ ডকুমেন্ট রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তিসহকারে জমা নেয়া হয়েছে। এরপর তিনি এ ডকুমেন্ট বিষয়ে আসামী পক্ষের সাক্ষীর জেরা থেকে পড়ে শোনান । তিনি রাষ্ট্রপক্ষের সাজেশন পড়ে শুনিয়ে বলেন, মামলার প্রয়োজনে এ জাল ডকুমেন্ট সৃজন করা হয়েছে।

এ পর্যন্ত শুনানীর পর যুক্তি পেশ আগামীকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।

ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যার অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি মাওলানা সাঈদীর উপস্থিতিতে এবং পরামর্শে ১৯৭১ সালের ৮ মে তাকে পাড়েরহাট বাজারে হত্যা করা হয়।
অপরদিকে স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে মমতাজ বেগম পিরোজপুরে যে মামলা করেন তাতে বলা হয় ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর ইব্রাহীম কুট্টি নলবুনিয়ায় তার শশুরবাড়ি  থাকা অবস্থায় নিহত হয়। ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যার সময় তার শ্যালক অর্থাৎ মমতাজ বেগমের ভাই সিহাব আলীকেও  ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। 

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে বর্নিত ঘটনাস্থল হল পাড়েরহাট এবং ঘটনা সংঘটনের সময় হল ১৯৭১ সালেল ৮ মে। অপরদিকে মমতাজ বেগমের মামলার এজাহারে বর্ণিত ঘটনাস্থল হল নলবুনিয়া এবং ঘটনা সংঘটনের সময় হল ১ অক্টোবর। ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ  এবং মমতাজ বেগমের মামলায় বর্নিত তথ্যে মিল নেই। শুধু তাই নয়, মমতাজ বেগম সে মামলায় তার স্বামী এবং ভাই হত্যার জন্য ১৩ জনকে আসামী করেন। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পাড়েরহাট এবং তার আশপাশের এলাকায় যত হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং অত্যাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে তার প্রতিটিতে যাদের নাম বারবার ঘুরেফিরে এসেছে তাদের সকলেই মমতাজ বেগমের মামলায় আসামী। কিন্তু মমতাজ বেগমের মামলায়  ১৩ আসামীর মধ্যে  মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।

মমতাজ বেগমের মামলার ১৩ আসামী হল  দানেশ মোল্লা,  আতাহার আলী, আশ্রাব আলী, আব্দুল মান্নান, আইউব আলী, কালাম চৌকিদার, রুহুল আমিন, আব্দুল হাকিম মুন্সি, মমিন উদ্দিন, সেকোন্দার আলী শিকদার, শামসুর রহমান এসআই, মোসলেম মাওলানা।  এছাড়া পাকিস্তান আর্মিকেও আসামী করা হয় মমতাজ বেগমের মামলায়।

আজ  শুনানীতে আসামী পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, অ্যাডভোটেক এসএম শাহজাহান, গিয়াসউদ্দিন মিঠু, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন, মহিনুর ইসলাম, মতিয়ার রহমান প্রমুখ।


বৃহস্পতিবার, ৬ মার্চ, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল// ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এর যুক্তি উপস্থাপন

মেহেদী হাসান, ৬/৩/২০১৪
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অষ্টম অভিযোগ ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা ও মানিক পসারীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ লুটপাট বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এর যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেছেন গতকাল। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহন করেন।

ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে  যুক্তি উপস্থাপনের শুরুতে  অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের  জবানবন্দী এবং জেরা থেকে সংশ্লিষ্ট অংশ পড়ে শোনান আদালতে। এরপর তিনি এ অভিযোগের বিরুদ্ধে আসামী পক্ষের উপস্থাপিত যুক্তির জবাব দেন।

প্রথমে রাষ্ট্রপক্ষের ছয় নং সাক্ষী মানিক পসারীর  জবানবন্দী থেকে পড়ে শোনান তিনি। ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে মানিক পসারী ‘ইব্রাহিম আমাদের বাড়িতে কাজ করত। ১৯৭১ সালে ৮ মে পাক সেনাবাহিনী নিয়ে দেলোয়ার শিকদার বর্তমানে সাঈদী, সেকেন্দার শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা, রেজাকার  মবিন, হাকিম কারী, সোবহান মাওলানাসহ আরো অনেকে রেজাকার আমার বাড়িতে   প্রবেশ করে। তাদের আসতে দেখে আমি বাড়ির  পাশে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকি এবং সব ঘটনা  দেখতে  থাকি। তারা আমার বাড়িতে প্রবেশ করে আমার ফুফাত ভাই মফিজ উদ্দিন (  বাড়িতে কাজ করত)  এবং অপর কাজের লোক ইব্রাহিম কুট্টিকে আর্মিরা ধরে একই দড়িতে বাঁধে। তারপর ঘরে লুটপাট করে সোনাদানা দেলু শিকদার, সেকেন্দার শিকদার, মোসলেম মাওলানা নিয়ে যায়। লুটের পর দেলোয়ার শিকদারের নেতৃত্বে  রাজাকার বাহিনী ঘরে  কেরোসিন   ছিটায়। তারপর দেলোয়ার শিকদার ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়।  মফিজ ও ইব্রাহিম কুট্টিকে  বেঁধে পাড়েরহাট নিয়ে যাবার সময় আমি তাদের পেছনে পেছনে যেতে থাকি। তাকে পাড়েরহাট বাজারের মধ্যে  ব্রিজের ওপারে নিয়ে গেলে আমি  এপারে বসে তাদের লক্ষ্য করি। দেলোয়ার  হোসেন শিকদারকে আর্মির সাথে পরামর্শ করতে দেখি। তারপর দেলোয়ার হোসেন শিকদার, সেকেন্দার শিকদারের সাথে পরামর্শক্রমে পাক আর্মিরা  ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে। ইব্রাহিম চিৎকার মারে। তারপর লাশ নদীতে ফেলে দেয়।

এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল সপ্তম সাক্ষী মফিজউদ্দিন পসারীর জবানবন্দী থেকে পড়ে শোনান। ১৯৭১ সালের ৮ মে সকালে   গরু মহিষ  নিয়ে চরে যাই। সাথে ইব্রাহিম কুট্টিও ছিল। কিন্তু  আনুমানিক ১০/১১টার দিকে  চরে বসে বসে মামার বাড়িতে  বাড়িতে আগুন  এবং  ধোয়া দেখতে পাই। তারপর মামার বাড়ির দিকে ফিরে আসি। ১২/১৪ জন পাক আর্মি, ২০/২২ জন রাজাকার মামার বাড়ি যাচ্ছে দেখতে পাই। তার মধ্যে দিলু  শিকদার ছিল। আমরা পালাতে চাইলে পাক আর্মি ধরে ফেলে। দিলু শিকদার ইব্রাহীমের চুল ধরে বলে “শুয়ারের বাচ্চা যাচ্ছো কোথায়”। রাজাকার মবিন, রাজ্জাক আরো কয়েকজন আমাদের দুজনকে এক দড়িতে  বাঁধে।  এরপর রাজাকাররা ঘরে ঢুকে  লুটপাট করে এবং কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেকেন্দা শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মবিন, রাজ্জাক দিলু শিকদারসহ আরো অনেক রাজাকার   তেল ছিটিয়ে ঘরে আগুন দিতে বলে। তারপর আমাদের দুজনকে পারেরহট বাজারে নিয়ে যায়। বাজারের  মধ্যে ব্রিজের মাঝখানে নিয়ে ইব্রাহিমকে জিজ্ঞেস করে সইজুদ্দীন পসারী, মানিক পসারী কোথায় থাকে। তুই তো সইজুদ্দীনের বডি গার্ড । তুই জানিস তারা কোথায়। না বললে তোকে গুলি করব। এরপর  পুল থেকে নামিয়ে দিলু শিকদার (তাদের ভাষায় দিলু শিকদার মানে মাওলানা সাঈদী) সেকেন্দার শিকাদর উর্দুতে কি যেন বলল। আমি উর্দু বুঝিনা এবং কি বলেছিল তা  শুনতে পাইনি। এরপর ইব্রাহিমকে  দড়ি থেকে খুলে ছেড়ে দিল এবং আমাকে নিয়ে সামনের দিকে গেল।
তারপর গুলির  শব্দ শুনতে পাই। ইব্রাহিম মা বলে চিৎকার করে।
পেছনে তাকিয়ে দেখি ইব্রাহিমকে গুলি করছে।
এ পর্যায়ে একজন বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেন, আপনি যা পড়ে শোনাচ্ছেন এগুলো আসামীপক্ষ ইতোমেধ্য দুইবার আমাদের পড়ে শুনিয়েছে। আপনার এগুলো পড়ার দরকার নেই। আপনি টেকনিক্যাল পয়েন্ট আউট করেন।
তখন অ্যটর্নি জেনারেল ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে সংক্ষেপে অন্যান্য সাক্ষীদের জবানবন্দী থেকে পড়ে শোনান।
রাষ্ট্রপক্ষের অষ্টম সাক্ষী মোস্তফা হাওলাদার বলেছেন, ‘ রইজুদ্দীন সইজুদ্দীন পসারীর বাড়িতে দুজন লোক থাকত মফিজ উদ্দিন এবং ইব্রাহীম কুট্টি নামে। তারা চরে গিয়েছিল গরু চড়াতে।
তারা আগুন দেখে দৌড়ে আসে। এসময় দেলোয়ার শিকদার তাদের চাইপপা ধরে এবং মফিজ উবরাইয়া পরে যায়।  পাক আর্মি ধরে ইব্রাহিম কুট্টিকে। তাদের এক দাড়িতে বেঁধে পারেরহাট বাজারে নিয়ে যায়। তারপর মফিজকে পারেরহাট রাজাকার ক্যাম্পে আর ইব্রাহিমকে নেয়া হয় থানার ঘাটের দিকে। তারপর গুলির শব্দ শুনি। থানার ঘাটের কাছে ব্রিজের গোড়ায় ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে লাথি মেরে পানিতে ফেলে দেয়।’

দশম সাক্ষী বাসুদেব বলেছেন, ‘মে মাসের ৮ তারিখে পাঞ্জাবী আর্মি, রাজাকার, শান্তি বাহিনীর লোকজন মানিক পসারীর বাড়িতে আসে। তাদের আসতে দেখে বাড়ির লোকজন পালিয়ে যায়।  তারা বাড়িতে ঢুকল। ইব্রাহীম কুট্টি ও মফিজ উদ্দিন  মানিক পসারীর বাড়িতে কাজ করত। ওদের ধরে বেঁধে ফেলল। দিলু শিকদার, সেকেন্দার আলী শিকদার, মোসলেম মাওলানা, দানেশ আলী মোল্লা, রুহুল আমিন, হাকমি কারী মোমিন এদের দেখেছি তখন।  এদের চিনি। ওরা ধান চাউল সব লুটপাট করে নিয়ে  গেল ভাগ করে। আর দামি মালামাল নিল দিলু শিকদার।  এরপর দিলু আর অন্য রাজাকাররা মিলে ঘরে আগুন দিল। ইব্রাহীম আর মফিজকে নিয়ে রওয়ান দিল।  বাজারের ব্রিজের ওপর উঠল। তারপর দেলোয়ার সাঈদী হেগো লগে (পাক আর্মি) কি যেন বলল। আমরা আড়ালে বসে  দেখছি। ইব্রাহীমকে বাঁধন  খুলে ব্রিজ পার হয়ে ঘাটের দিকে নিয়ে গেল। মফিজকে নিয়ে গেল ক্যাম্পের দিকে। আর ইব্রাহীমকে গুলি দিয়ে ফেলে দেয়। তারপর আমরা দৌড়ে বাড়ি যাই।’

১১ তম সাক্ষী আব্দুল জলিল শেখ বলেছেন, ১৯৭১ সালের ৮ মে দেলোয়ার হোসেন দিলু,  দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার শিকদার, আরো কয়েকজন রাজাকার মিলে ১০/১৫   জনের  একটি দল এবং পাক সেনা মিলে আমাদের চিথলিয়া গ্রামে আসে। তাদের আসতে দেখে বাড়ির লোকজন আশপাশের জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। আমিও তাদের সাথে জঙ্গলে আশ্রয় নেই। দিলু রাজাকার, দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার শিকদার  কুট্টিকে   ধরে ফেলে। তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে উঠানে ফেলে রাখে। এরপর তারা ঘরের ভেতর ঢকে। ভেতরে ঢুকে ধান চাউল যা ছিল সব কিছু লাটপাট করে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়ে যায়। ঘরের মধ্যে থাকা টাকা পয়সা, সোনদানা মূল্যবান জিনিসপত্র রাজাকার ও পিস কমিটির লোকজন ভাগবাটোয়রা করে পকেটে করে নিয়ে যায়। এরপর দেলোয়ার, সেকেন্দার শিকদার  এবং দানেশ মোল্লা তিনজন মিলে ঘরে রাখা কেরোসিন ভাগ ভাগ করে  ঢেলে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন পরা ধইরা যাবার পর উঠানে নাইম্যা মফিজ ও কুট্টিকে লইয়া বাজারের দিকে রওয়ানা দেয়। আমরাও পেছনে পেছনে যাই। বাজারের ব্রিজ পারা হইয়া ওপারে যাইয়া কুট্টির বান ছেড়ে  । এরপর তাকে থানার ঘাটের দিকে নিয়ে গুলি করে। দেলোয়ারের ইশারায় আর্মি গুলি করে। এরপর মফিজকে নিয়ে রাজাকার ক্যাম্পে  যায়। তারপর আমরা বাড়ি চইল্লা আসি’

১২ তম সাক্ষী একেএমএ আউয়াল বলেছেন, ‘পাড়েরহাট এলাকা হিন্দু অধ্যূসিত এলাকা হওয়ায় ও ছাত্রলীগ আওয়ামীলীগের সমর্থকের সংখ্যাধিক্য থাকায় ঐ এলাকায় লুটপাট, অগ্নি সংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছিল। যুদ্ধকালীন সময় আমার নিজ ইউনিয়ন শংকরপাশার বাদুরা, চিথলিয়া গ্রামের  নুরুল ইসলাম, রইজ্দ্দুীন পসারী, সইজুদ্দিন পসারী, মানিক পসারীসহ  হিন্দু পাড়া  একদিনে একটানা পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও রাজাকাররা পুড়িয়ে দিয়েছিল ।  ঐ পোড়া বাড়িঘর আমি স্বাধীনতার পরে এসে দেখেছি।  দানেশ মোল্লা, সেকান্দার শিকদার, শুনেছি সাঈদী সাহেবও তাদের সাথে ছিলেন। ’

ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে তার শ্যালক মো: মোস্তফা, শ্যালিকা রানী বেগম এবং শাশুড়ী সিতারা বেগম তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী প্রদান করে তা ১৯ (২) ধারায় ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। তারা কেউ সাক্ষ্য দিতে ট্রাইব্যুনালে আসেনি। ১৯ (২) ধারায় গৃহীত তাদের জবানবন্দী আদালতে পড়ে শোনান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

তারা তিনজনই বলেছেন তারা জানতে পেরেছেন ইব্রাহীম কুট্টিকে মানিক পসারীর বাড়ি থেকে মাওলানা সাঈদীসহ অন্যান্যরা ধরে নিয়ে পাড়েরহাট বাজারে হত্যা করে । তারা তার লাশ আনার জন্য পাড়েরহাট বাজারে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদেরকে ভয় দেখানোর পর তারা ফিরে আসেন। তারা জানতে পেরেছেন ইব্রাহীম কুট্টির লাশ দুইদিন পর পানিতে ফেলে দেয়া হয়।

শুনানীর সময় একজন বিচারপতি প্রশ্ন করেন, এ তিন সাক্ষী বলেছেন, দুই দিন পর তার লাশ পানিতে ফেলে দেয়া হয়। অপরদিকে ট্রাইব্যুনালে কয়েক সাক্ষী বলেছেন গুলি করার পর লাশ লাথি মেরে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এ বিষয়ে আপনার জবাব কি।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ তিনজন সাক্ষী শোনা সাক্ষী। তারা শুনেছেন দুইদিন পর লাশ নদীতে ফেলা হয়েছে। তারা গিয়েছিল লাশ আনতে। ভয়ে চলে এসেছে। তখনকার যে পরিস্থিতি তাতে তার শাশুড়ীর পক্ষে সেখানে যাওয়া কি সম্ভব? তাছাড়া লাশ লাথি মেরে ফেলার পর তা কি তোলা যায়না আবার?
এসময় আরেকজন বিচারপতি বলেন আসামী পক্ষের অভিযোগ মানিক পসারীর অভিযোগে ইব্রাহীমের পিতার নাম দুই জায়গায় দুই রকম এসেছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এটা হতেই পারে। হয়ত ভুল হয়ে গেছে। অতিরিক্ত একটা ডকুমেন্টে যদি তার পিতার নাম আলাদা থাকতে পারে। কিন্তু মূল বিষয় হল ইব্রাহীম নিহত হয়েছে। কিন্তু মানিক পসারীর বাড়িতে প্রবেশের সময় সাঈদীর নাম আছে।  লুটপাট আগুন দেয়অম জঙ্গলে বসে ঘটনা দেখার বিষয়ে কোন ডিনায়াল দেয়নি আসামী পক্ষ।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে আসামী পক্ষের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হল তাকে নলবুনিয়ায় হত্যা করা হয়েছে।
এসময় একজন বিচারপতি বলেন, ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম যে মামলা করেছে তাতে মাওলানা সাঈদীকে আসামী করেনি। তাছাড়া ইব্রাহীমকে হত্যা বিষয়ে মমতাজ বেগমের বক্তব্যের সাথে তার বোন, মা এবং ভাইয়ের জবানবন্দীর মিল নেই।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ছয় নং সাক্ষী বিষয়ে আসামী পক্ষের অভিযোগ হল বাড়ি পোড়ানোর পর সে মামার বাড়ি ওঠে। ১৫ দিন পর নিজ বাড়িতে আসে। সে বাড়িতে ছিলনা। কাজেই বাড়ি পোড়ানো দেখল কি করে? তাছাড়া পিরোজপুর মামলায় সে মফিজের নাম বলেনি।
এ বিষয়ে আসামী পক্ষ তাকে জেরায় শুধু সাজেশন দিয়ে বলেছে সে সোনাদানা লুট এবং ইব্রাহীম ও মফিজকে একই দড়িতে বাঁধার কথা তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেনি। কিন্তু পুরো ঘটনার মধ্যে বাকী সবই রয়ে গেছে । সে বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়নি।
পুলের গোড়ায় নিয়ে ইব্রাহীমকে হত্যা, আগুন দেয়া, লুটপাট এবং তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া বিষয়ে সাজেশন দেয়া হয়নি। পুলের গোড়ায় নিয়ে দেলোয়ার শিকদার, সেকেন্দার শিকদার পাকিস্তান আর্মির সাথে কি যেন পরামর্শ করল তারপর ইব্রাহীমকে গুলি করল সাক্ষীর এ দাবি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সাত নং সাক্ষী মফিজ উদ্দিন পসারী বিষয়ে আসামী পক্ষের অভিযোগ পিরোজপুরের মামলায় সে বলেছেন, ইব্রাহীমকে কে মেরেছে তা সে দেখেনি। কে মেরেছে তা সে জানেনা। কাজেই ট্রাইব্যুনালে এসে সে দেখেছে মর্মে যে কথা বলেছে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
কিন্তু পিরোজপুর মেজিস্ট্রেট এর কাছে সে কি বলেছে বা না বলেছে সে বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়নি। আগে বলনি এখন কেন একথা বলছ এ মর্মে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়নি।
তাহলে আসলে বিষয়টি দাড়ায় কি? দাড়ায় যেম মানিক পসারীদের বাড়িতে আসার ঘটনা, ইব্রাহীম এবং মফিজকে ধরে নিয়ে যাওয়া, আগুন দেয়া, লুটপাট করাম উর্দুতে কি যেন বলা, গুলি করা মর্মে যেসব কথা সাক্ষীরা বলেছে তার সবই রয়ে গেল।

এছাড়া পিরোজপুরে সংঘটিত ১৯৭১ সালের ঘটনা নিয়ে দৈনিক জনকণ্ঠ এবং ভোরেরকাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদন যা রাষ্ট্রপক্ষ দাখিল করেছে তা থেকে পড়ে শোনান অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলেন বিচার শুরুর ১০ বছর আগে এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ প্রতিবেদনে ঘটনার যে বিবরন রয়েছে তার সাথে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনিত অভিযোগের মিল রয়েছে। বিচার শুরুর আগেই এসব খবর ছাপা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে আরো স্পষ্ট যে, এসব ঘটনা লোকজন জানত। এতে আরো প্রমানিত যে, ঘটনার সময় মাওলানা সাঈদী যশোরে ছিলনা। পিরোজপুরেই ছিল।
এসময় একজন বিচারপতি বলেন, জনকন্ঠের প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শর্ন মার্কের সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে হাজির করা উচিত ছিল। তাকে হাজির না করা প্রসিডিউরাল ভুল।
এছাড়া ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে রানী বেগম, সিতারা বেগম এবং মো; মোস্তফার জবানবন্দী ছাড়াও ১৯ (২) ধারায় আরো যাদের জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে সে বিষয়েও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।