মোবারক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মোবারক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

হাজী মো : মোবারক হোসেন এর বিরুদ্ধে নবম সাক্ষীর জবানবন্দী এবং জেরা সম্পন্ন

৪/৯/২০১৩
হাজী মো : মোবারক হোসেন এর বিরুদ্ধে আজ নবম সাক্ষীর জবানবন্দী এবং জেরা সম্পন্ন হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ।

জবানবন্দী :
আমার নাম ভানু বিবি, আমার বয়স আনুমানিক ৭০ বৎসর। আমার ঠিকানা-গ্রাম- টানমান্দাইল, থানা-আখাউড়া, জেলা-ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া।
আমি একজন গৃহিনী। সংগ্রামের বৎসরের ৫ই ভাদ্র তারিখ সকাল অনুমান ১০.০০/১১.০০ টার দিকে মোবারক আলী আমাদের বাড়ি এসে আমার শ্বশুর নূর বক্স হাজী, স্বামী এবং ভাসুর আবুল বাশারকে জানায় যে, আমাদের বাড়িতে শান্তি কমিটির মিটিং বসবে তোমরা সকলে উপস্থিত থাকবা, যদি না থাক তাহলে তোমাদের অসুবিধা হবে। বিকাল বেলায় আসরের সময় ১৩০/১৩৫ জন লোক মিটিং করে। মোবারক আলী, তার সাথের লোকজন এবং পাঞ্জাবীরা মিলে মিটিং শুরু করে, এক পর্যায়ে বাড়িতে থাকা গ্রামের লোকজনকে রশি দিয়ে বেঁধে নৌকায় উঠাইয়া গঙ্গা সাগর দিঘীর পাড় নিয়ে যায়। তারা আমার শ্বশুর, আমার ভাসুর, আমার স্বামী ও আমার দুই মামা শ্বশুরসহ বেঁধে গঙ্গা সাগর পাঞ্চাবীদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে তাদেরকে অনেক মার ধর করে এবং জিজ্ঞাস করে মক্কা শরীফ কে কে গিয়েছ হাত উঠাও। আমি আরো জানতে পারি যে, তাদের কিছু লোককে মসজিদে রাখে এবং কিছু লোককে গঙ্গা সাগর দিঘীর পশ্চিম পাড়ে নিয়ে তাদেরকে দিয়ে গর্ত করাইয়া গুলি করিয়া প্রায় ৩১ জনকে মেরে ফেলেছে। সেখানে আমার স্বামী ডাঃ আবু তাহের, আমার ভাসুর আবুল বাশার এবং মামা শ্বশুর গোলাম মাওলা ও গোলাম হাক্কানীকেও সেখানে মেরে ফেলে। আমার শ্বশুর যেহেতু মক্কা শরীফ গিয়েছিল সে কারণে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল। তিনি বাড়িতে ফিরে এসে জানায় যে, মোবারক আলীর জন্যই এসকল লোকগুলো মারা গিয়েছে। এ ঘটনার দুই/তিন দিন পূর্বে তিন লাখ পীর ব্রীজ ভাঙ্গায় আমার স্বামী এবং আমার ভাসুর সাহায্য করেছিল, তারা দুইজনেই আওয়ামী লীগ করতো। আমি অত্র মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট জবানবন্দী প্রদান করেছি।

জেরা ঃ
আমার স্বামী কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করেছে এবং কসবা এসে ডাক্তারী করেছে। কসবাতে আমার স্বামীর চেম্বার ছিল। কসবায় আমার স্বামীর চেম্বার এবং আমাদের বাড়ীর দূরত্ব আনুমানিক দুই মাইল। আমার প্রথম ছেলের পিতার নাম ডাঃ আবু তাহের। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় আমার প্রথম ছেলে শাহ আলম এর বয়স ছিল ১২ বৎসর। আমার ছোট ছেলে রফিকুর ইসলাম দক্ষিন আফ্রিকাতে থাকে। রফিকুল ইসলামের পিতার নাম সুরুজ মিয়া। সংগ্রামের পরের বৎসর আমি সুরুজ মিয়াকে বিয়ে করি। ১৯৭১ সালে কুমিল্লার কোন মেডিকেল কলেজ ছিল তাহা জানিনা, তবে আমার স্বামী কুমিল্লাতে ডাক্তারি পড়তো। আমার পিতার বাড়ি কুমিল্লা জেলার চকবাজারে। আমার স্বামীর ডাক্তারির সার্টিফিকেটসহ অন্যান্য দালিলিক প্রমানপত্র মুক্তিযুদ্ধের সময় কসবার পুড়াইয়া ফেলেছে। ১৯৭১ সালে আমরা কসবা থানার যে পাড়ায় থাকতাম সে পাড়ার নাম সাহাপাড়া। এটি একটি হিন্দুপাড়া ছিল। ঐ হিন্দু পাড়া সংগ্রামের সময় পুড়াইয়া দেয় নাই, তবে আমার স্বামীর ডাক্তারির চেম্বারসহ বাজার পুড়াইয়া দিয়েছিল। সেই বাজারের নাম আমি জানিনা। কয়টি দোকান পুড়াইছে তাহা আমি বলতে পারবনা। আমার স্বামী, আমার ভাসুর ও আমার শ্বশুর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষনের জন্য যায় নাই, তবে কসবা সদর থেকে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। আমার স্বামীর চেম্বারের পাশের দোকানটি কার ছিল তাহা আমি বলতে পারবনা। আমার স্বামী, শ্বশুড় এবং ভাসুর যে আওয়ামী লীগ করতো তাহা ১৯৭১ সালের পূর্বে কসবা এবং টানমান্দাইল এলাকার লোকেরা জানতো। আমার শ্বশুর বাড়ী টানমান্দাইল গ্রামে স্কুলের পূর্ব পাশে। সংগ্রামের সময় আমার শ্বশুড় বাড়ীর উত্তর দিকে কোন ঘর বাড়ি ছিলনা, তবে বর্তমানে আছে। পূর্ব দিকে ওহাব মাষ্টারের বাড়ি ছিল। পশ্চিম দিকে ঘর-বাড়ি ছিল অনেক দূরে। আমার শ্বশুর বাড়ির পশ্চিম দিকে কোন রাস্তা ছিল না নৌকাযোগে আসা যাওয়া করতো, তবে বর্তমানে চলাচলের রাস্তা আছে। এখন নৌকা অনেক দূর গিয়ে চলাচল করে। আমার শ্বশুড় বাড়ির পশ্চিম পাশে কোন নদী বা খাল ছিল না, তবে একটি ছড়া ছিল। আমার শ্বশুর বাড়ির পাশে একটি বাড়ি ছিল ওহাব মাষ্টারের বর্তমানে অনেক বাড়ি আছে। টানমান্দাইল থেকে তিনলাখপীর ব্রীজের দূরত্ব আনুমানিক একমাইল হবে। টানমান্দাইল থেকে তিনলাখপীর ব্রীজের মধ্যে অনেক গ্রাম আছে। ঐসব গ্রাম থেকে লোকজন আমাদের বাড়ির মিটিংয়ে এসেছিল। ঐসব গ্রামের লোকজনের নাম আমি বলতে পারবনা। যখন পাক আর্মিরা আসছিল তখন মিটিং চলছিল কিন্তু আমরা কোন চিৎকারের শব্দ শুনিনাই, ঐ মিটিংয়ে আমাদের বাড়িতে কোন মাইক লাগানো হয়নাই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গঙ্গাসাগর এলাকায় গিয়েছিলাম। সংগ্রামের সময় আমাদের প্রতিবেশীসহ অনেক লোক মারা গিয়েছে। রাজাকার জমশেদকে আমি চিনি না। আমাদের বাড়িতে ঘটনার দিন ১৩০/১৩২ জন পাকিস্তানী আর্মি ও বাঙ্গালী এসেছিল। ঐ বাঙ্গালিরা আর্মির সাথেও এসেছিল এবং রাজাকারদের সাথেও এসেছিল। তারা আমাদের বাড়িতে এক/দেড় ঘন্টা ছিল। তারা আমাদের বাড়িতে বন্দুক নিয়ে এসেছিল, রশি নিয়ে আসে নাই। আমার শ্বশুড়কে মারধর করে নাই, তবে আমার ভাসুরের ছেলেকে মারধর করেছে। গঙ্গাসাগর আমার শ্বশুড়কে নিয়ে মসজিদে রেখেছিল আর আমার স্বামী ও ভাসুরসহ অন্যান্যদেরকে কাচারি ঘরে রেখেছিল। আমার শ্বশুরকে জিজ্ঞাস করিনি যে, কতজন মসজিদে ছিল আর কতজন কাচারি ঘরে ছিল। আমি কাচারি ঘর দেখেছিলাম। কাচারি ঘর ও মসজিদ পাশাপাশি। আমার শ্বশুর ফেরত আসার কথা শুনে গ্রামের লোকেরা আসে নাই, তবে মামা শ্বশুর গোলাম কাদের এসেছিল। গঙ্গাসাগর দিঘীর পাড়ে কাচারি ঘরে যাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের মা বাবা আমার শ্বশুরের কাছে আসে নাই।
‘‘সংগ্রামের বৎসরের ৫ই ভাদ্র তারিখ সকাল অনুমান ১০.০০/১১.০০ টার দিকে মোবারক আলী আমাদের বাড়ি এসে আমার শ্বশুর নূর বক্স হাজী, স্বামী এবং ভাসুর আবুল বাশারকে জানায় যে, আমাদের বাড়িতে শান্তি কমিটির মিটিং বসবে তোমরা সকলে উপস্থিত থাকবা, যদি না থাক তাহলে তোমাদের অসুবিধা হবে” বা ‘‘ তারা আমার শ্বশুর, আমার ভাসুর, আমার স্বামী ও আমার দুই মামা শ্বশুরসহ বেঁধে গঙ্গা সাগর পাঞ্চাবীদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে তাদেরকে অনেক মার ধর করে এবং জিজ্ঞাস করে মক্কা শরীফ কে কে গিয়েছ হাত উঠাও” বা ‘‘আমার ভাসুর আবুল বাশার এবং মামা শ্বশুর গোলাম মাওলা ও গোলাম হাক্কানীকেও সেখানে মেরে ফেলে। আমার শ্বশুর যেহেতু মক্কা শরীফ গিয়েছিল সে কারণে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল। তিনি বাড়িতে ফিরে এসে জানায় যে, মোবারক আলীর জন্যই এসকল লোকগুলো মারা গিয়েছে। এ ঘটনার দুই/তিন দিন পূর্বে তিন লাখ পীর ব্রীজ ভাঙ্গায় আমার স্বামী এবং আমার ভাসুর সাহায্য করেছিল, তারা দুইজনেই আওয়ামী লীগ করতো”- একথাগুলো আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলিনাই, ইহা সত্য নহে।
আমি ভন্ডপীর দারু মিয়ার পরামর্শে ও আব্দুল হামিদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে অর্থের লোভে এই মিথ্যা মোকদ্দমায় মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান কররি, ইহা সত্য নহে। মোবারক আলী কখনও আমাদের বাড়িতে যায় নাই, ইহা সত্য নহে। মোবারক আলী পাকিস্তানিদের সাথে আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল।




রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০১৩

হাজী মোবারকের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ

১৪/৭/২০১৩
মানবতাবিরোধী অপরাধের বন্দী হাজী মো : মোবারকের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করা হয় আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ।

জবানবন্দী :
আমার নাম মোঃ আব্দুল মালেক, আমার বয়স-৬৭/৬৮ বৎসর। আমার ঠিকানা-গ্রাম-খড়মপুর (তিতাস নদীর দক্ষিণ পাড়), থানা ও জেলা-ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া।
আমি কৃষি কাজ করি। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ২৫/২৬ বৎসর। তখনও আমি কৃষি কাজ করতাম। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাস পরে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য ভারতের আগরতলায় চলে যাই। সেখানে থেকে ট্রেনিং গ্রহণ শেষে দেশে ফিরে আসি। আমাদের আঞ্চলিক কমান্ডার আবুল বাসারের নির্দেশে ভারত থেকে ট্রেনিং করে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের রাস্তাঘাট চিনিয়ে দিতাম এবং বাংলাদেশ থেকে যে সকল শরনার্থী ভারতে যেতো তাদের পৌঁছে দিতাম। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের নির্দেশে আমি সহ সিরাজ মিয়া, খাদেম হোসেন ও নূর মিয়া এই চারজন দায়িত্ব পালন করেছি। এইভাবে দায়িত্ব পালন করাকালে ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের ২৮/২৯ তারিখের দিকে রাজাকার মোবারক হোসেন, অন্যান্য রাজাকাররা এবং পাকিস্তানি সৈন্যরা এসে আমাদের বাড়ী ঘেরাও করে এবং আমাকে ধরে পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে ফেলে। আমাকে বেঁধে নিয়ে পাশে সিরাজ মিয়ার বাড়িতে যায় এবং সিরাজকেও একই ভাবে আটক করে বেঁধে ফেলে। তৎপর আমাদেরকে লঞ্চে উঠায়ে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া সদর থানায় নিয়ে রাত্রে রাখে। পরের দিন সকাল ৮.০০/৯.০০ টার দিকে পাকিস্তানি সৈন্য এবং রাজাকার মোবারক সহ আমাকে গাড়ীতে করে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া সরকারী কলেজে নিয়ে একটি রুমের মধ্যে আটক রাখে এবং মারপিট শুরু করে। ঐ রুমটি ছিল নির্যাতন রুম। মানুষজনকে ধরে এনে ঐ রুমের মধ্যে নির্যাতন করা হতো। আমাদেরকে ঐ রুমের মধ্যে বিদ্যুতের তার পেঁচায়ে মারতে থাকে, কতক্ষণ যাবত মারে তা জানি না, আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। অনেক সময় পরে আমার জ্ঞান ফিরলে দেখতে পাই আমি ও সিরাজ মিয়া ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলখানার মধ্যে আটক আছি। তিন/চারদিন পর আমি একটু সুস্থ হই। কয়েকদিন পরে আমি সহ প্রায় ত্রিশজনকে গাড়িতে উঠায়ে মেড্ডা টি,বি, হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আমাদেরকে নিয়ে রক্ত পরীক্ষা করে। আমি সহ আটজনের রক্ত সঠিক পায়। আমি সহ আটজনের নিকট থেকে রক্ত নেয়। রক্ত নেওয়ার পর আমাদেরকে জেলখানায় নেওয়ার পথে রাস্তায় আমার বড় ভাই আব্দুর রহমানের সংগে দেখা হয়। তিনি রাজাকার মোবারক ও পাকিস্তানি সৈন্যদের অনুরোধ করলে আমার সহিত আমার বড় ভাইয়ের কথা বলার সুযোগ দেয়। সেখানে আমার পরনের ছেড়া লুঙ্গিটা পাল্টিলেয় আমার ভাইয়ের ভাল লুঙ্গিটা আমাকে দিয়ে যায়। তৎপর আমাদেরকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলখানায় নিয়ে যায়। এর দুই/তিন দিন পর আমার সংগীয় সিরাজ মিয়া সহ ২০/২৫ জনকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়, ঐ গাড়িতে জায়গা না হওয়ায় আমাকে রেখে যায়। খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারি যে, সিরাজ মিয়া ঐ ২০/২৫ জনকে কুল্লিয়া খালে গুলি করে হত্যা করেছে। এর তিন/চার দিন পরে বুঝতে পারলাম দেশ স্বাধীন হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং মুক্তিযোদ্ধারা আমাদেরকে জেল থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসে। আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট আমি জবানবন্দী প্রদান করেছি। রাজাকার মোবারক অদ্য ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপস্থিত আছেন (সনাক্তকৃত)।
জেরাঃ-
আমি লেখাপড়া জানি না বিধায় কত তারিখে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বলতে পারব না, তবে ১৬ তারিখে দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমি ১৬ তারিখের পরে জেলখানা থেকে বের হয়েছি। (চলবে)
 

সোমবার, ৩ জুন, ২০১৩

হাজী মোবারকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী খোদেজা বেগমের জেরা


হাজী মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী খোদেজা বেগম জেরায় প্রশ্নের জবাবে যে উত্তর দেন তা নিম্নরূপ। গত ২৭ মে তার জবানবন্দী গ্রহণ করা হয় ট্রাইব্যুনাল-১ এ।

২৮/০৫/২০১৩
পুনরায় জেরা শুরু ঃ
০৩-০৫-২০০৯ তারিখে আসামী মোবারক ও জমশেদ মিয়ার বিরুদ্ধে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে, আমার পিতার হত্যার ব্যাপারে মামলা দায়ের করি। আমার দাখিলী নালিশী দরখাস্ত ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত হইতে তদন্তের জন্য থানায় প্রেরণ করা হয়েছে। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে আমার মামলার উকিল ছিলেন জনাব সৈয়দ তানভীর হোসেন। আমি অন্য কোন উকিল নিয়োগ করি নাই। আমার দাখিলী নালিশী দরখাস্তে সাক্ষী হিসাবে আমার ভাই, চাচাদের নাম আমি দিয়েছিলাম, অন্যদের নাম আমি দিই নাই। আমার ভাইয়ের নাম রফিকুল ইসলাম এবং চাচার নাম আব্দুল আহাদ। আব্দুর রউফ ও মেম্বার ঐ মামলায় সাক্ষী ছিলেন। আমি যে জমশেদ মিয়ার নামে কেইস করেছিলাম অদ্য তাকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দেখছি না। জমসেদ মিয়া এখনও জীবিত আছে। আমার দাখিলী নালিশী দরখাস্তে আমার বাপের বাড়ি টেংরাপাড়া একথা উল্লেখ করি কিনা তাহা আমার স্মরণ নাই। উল্লেখিত নালিশী দরখাস্তে ১৯৭১ সালে আমার স্মরণ নাই। (চলবে)

২৮/০৫/২০১৩ ইং ২.০০ মিঃ পুনরায় জেরা শুরু ঃ
আমার পিতা আব্দুল খালেক সাহেব মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তার আগে তিনি আনছার ছিলেন। আমার পিতা সেনাবাহিনীতে ছিলনা। আমার পিতা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছিলেন তাহা আমার জানা নাই, কারণ আমি আমার পিতার সংগে যুদ্ধ করতে যাই নাই, আমি শুনেছি আখাউড়া, রানীদিয়া, সরাইল বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেছেন। আমার পিতা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তৎমর্মে কাগজপত্র আমার নিকট আছে। সেই কাগজপত্র আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট প্রদান করিনাই, তবে গেজেট নম্বর দিয়েছি। আমি লেখাপড়া জানি না বিধায় ঐ গেজেটের মাস, তারিখ বলতে পারব না। ইহা সত্য নহে যে, আমার পিতা ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার রাজাকার কমান্ডার আবুল কালাম চৌধুরী আমার পিতাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় রাজাকার কমান্ডার আবুল কালাম চৌধুরী উপস্থিত থাকার কথা আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলি নাই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার বয়স ১৪/১৫ বৎসর ছিল তৎমর্মে কোন কাগজপত্র আমার নিকট নাই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার বয়স ৫/৬ বৎসর ছিল, ইহা সত্য নহে। আমাদের গ্রামের রাস্তার কোন নাম নাই। যে স্থান থেকে আমার পিতাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে বাকাইল ঘাটের দূরত্ব আনুমানিক দুই কিলোমিটার হবে। আমার প্রথম স্বামীর নাম ইসমাইল, গ্রাম- মজলিসপুর এবং দ্বিতীয় স্বামীর নাম হাসিম, গ্রাম-শিমরাইলকান্দি। ইসমাইল আমাকে তালাক দিয়েছিল কিনা তাহা আমি জানি না, কারণ তখন আমি ছোট ছিলাম। আমার স্বামী হাসিম মারা গেছেন। ইসমাইল বর্তমানে জীবিত আছে কিনা তাহা আমি জানি না। ১৯৭১ সালে বাকাইল ঘাট থেকে আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকের রাস্তার যেতে কাঁচা রাস্তা ছিল, রিক্সা, ভ্যান চলাচল করতো। আমার পিতাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরে ঘটনাস্থলে অনেক লোকজন জমায়েত হয়েছিল। যারা জমায়েত হয়েছিল তাদের মধ্যে কেউ বর্তমানে জীবিত নাই। ঘটনার দিন দৌড়িয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে সুহিলপুর ইউনিয়ন পরিষদ পৌছি। ঐ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কে ছিলেন তাহা আমার স্মরণ নাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের টেংরাপাড়ার মেম্বার ছিলেন ফুল মিয়া। টেংরাপাড়া গ্রামে ১৯৭১ সালে কতগুলি ঘরবাড়ি ও কতজন লোক ছিল তাহা আমি বলতে পারবনা, কারণ আমি গুনে দেখি নাই। আন্দাজে কেমনে বলব কতগুলি ঘরবাড়ি ছিল। মোবারক হোসেন রাজাকার কমান্ডার থাকা সংক্রান্তে কোন কাগজ আমার নিকট নাই, থাকার কথা নহে। আসামী মোবারক হোসেনের বাড়ি আমার বাড়ি থেকে কতদূর তাহা আমি বলতে পারব না। আমার বাড়ি থেকে মোবারক আলীর বাড়ি ৫৫ কিঃ মিঃ দূরে কিনা তাহা আমি আন্দাজ করে বলতে পারবনা। আমাদের পাড়ায় আমার পিতা ছাড়া তারা হলেন শমসের আলী, সিদ্দিক মিয়া, আব্দুল হেকিম, আহাদ মিয়া প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমার চাচা আহাদ মিয়া আমার পিতার সংগে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন মর্মে শুনেছি। রাজাকাররা আসার সংবাদ কেউ দেই নাই। ‘‘ রাস্তায় উঠলেই রাজাকাররা আমার বাবাকে ধরে  হাত বেঁধে মারপিঠ শুরু করে। তখন আমরা চিল্লা চিল্লি ও কান্নাকাটি করতে করতে তাদের পিছনে পিছনে যাই” এই কথা অসত্য, ইহা সত্য নহে। জিল্লুর রহমান নামে দুইজনকে আমি চিনি, তবে তাদের পিতার নাম আমি জানিনা। আমার নানীর বাড়ি বুধল, দাদীর বাপের বাড়ি বেলতলা। মুক্তিযুদ্ধের আগে আসামী মোবারক হোসেনের সংগে আমাদের কোন জায়গা জমি নিয়ে কোন গোলমাল ছিল না এবং তখন তাকে আমরা চিনতামওনা। আমার মা বা দাদীর নয়াদিল গ্রামে কোন ব্যবসা বাণিজ্য ছিলনা। আব্দুর রউফ ভূঁইয়া, পিতা-মৃত আবুল কাহার ভূঁইয়াকে স্বাধীনতা সংগ্রামের দুই/আড়াই বৎসর পরে চিনেছি, সে একজন রাজাকার ছিল। রাজাকার বাহিনী কখন গঠিত হয়েছিল তাহা আমি জানি না। আমার কোন জায়গাজমি নাই। স্বামীর দুই শতক জায়গা আছে সেখানে ঘর তুলে থাকি। আমি কোন ভাড়া ঘরে থাকিনা। ঘটনার দিন বাংলা কত তারিখ ছিল। ঐ সময় বাংলা কত সাল ছিল তাহা বলতে পারবনা। ঘটনাস্থলের উত্তর দিকে ঐ সময় স্কুল ছিল এবং অনেক দূরে ঘর বাড়ি ছিল ঘটনাস্থলের পূর্ব দিকে একটি পুকুর ছিল তার পূর্বে ঘর বাড়ি ছিল। ঐসময় পশ্চিম দিকে একটি বাড়ি ছিল। ঘটনাস্থল রাস্তার দুইপার্শে ঘটনার সময় ধানক্ষেতে কোন লোকজন কাজ করছিল না। সকলেই ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আমি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে আমার পিতাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার স্থান দেখিয়েছি। বাকাইল ঘাটে ১৯৭১ সালে একটি মাত্র চায়ের দোকান ছিল। ঐ ঘাটের পাশে একটি বাজার আছে। দক্ষিণ দিকে একটি হাই স্কুল আছে। উত্তর পূর্ব দিকে একটি  মন্দির আছে কিনা তাহা বলতে পারব না। বাকাইল ঘাটে ১৯৭১ সালে কোন নৌকা বাঁধা থাকতো না, তখন বাজার হওয়াতে নৌকা বাঁধা থাকে। ইহা সত্য নহে যে, ১৯৭১ সালে বাকাইল ঘাটে বাজার ছিল এবং সেখানে সবসময় অনেকগুলি নৌকা বাঁধা থাকতো। ১৯৭২, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে অনেক রাজাকারের শাস্তি হয়েছিল কিনা তাহা আমি জানি না। সুহিলপুর ইউনিয়ন পরিষদ আমি ঘটনার দিন ১৫/২০ জন রাজাকার দেখেছিলাম। ঐ সময় ঐ ক্যাম্পে পাকিস্তান আর্মিদের দেখেছিলাম। ঘটনার দিন আমি, আমার মা, দাদী সুহিলপুর রাজাকার ক্যাম্প যাওয়ার কথা অসত্য, ইহা সত্য নহে। ‘‘খালেক মাওলানাকে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য অনুরোধ করলে তিনি বলেন আজকে রাত হয়ে গেছে, আগামীকাল সকালে ক্যাম্পে গিয়ে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসবেন। পরদিন সকালে খালেক মাওলানার নিকট যাওয়ার পূর্বে লোকজন বলাবলি করছে যে, তিতাস নদীর পশ্চিম পাড়ে বাকাইল ঘাটে আমার বাবাকে গুলি করে করে হত্যা করে সেখানে লাশ ফেলে রাখা হয়েছে। তখন আমরা কান্নাকাটি করে বাকাইল ঘাটে গিয়ে দেখি আমার পিতার হাত, পা বাঁধা, কপালের ডান পাশে গুলি, মাথার খুলি উড়ে গেছে, বুকের ডান পাশে গুলির চিহ্ন এবং নাভির নীচে ও উপরে দুটি কাটা চিহ্ন অবস্থায় লাশ পড়ে আছে। তারপর আমার মা খালেক মাওলানার নিকট যায়। খালেক মাওলানা উল্লেখিত ক্যাম্প থেকে একটি সিøপ এনে আমাদের নিকট দিলে আমরা আমাদের পিতার লাশ নিয়ে এসে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করি” একথাগুলি অসত্য, ইহা সত্য নহে। আমার পিতার বাড়িতে আমার ভাই ও মা থাকেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা আমার মাকে ঘটনার বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, মা কি বলেছে তাহা আমি জানি না। মোবারক আলীকে মিথ্যা মামলার জড়ানো হয়েছে বিধায় আমি সাক্ষ্য দিবনা একথা তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট আমার মা বলেছে, ইহা সত্য নহে। দেশ স্বাধীনের পর থেকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে নালিশী দরখাস্ত দাখিল করার আগ পর্যন্ত আমার পিতার হত্যা সংক্রান্ত আমি কোন মামলা ইতিপূর্বে করি নাই। গ্রামের যে রাস্তা থেকে আমার পিতাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল সেই রাস্তা দিয়ে লোকজন চলাচল করে। আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশের বাড়ির মালিকের নাম শহীদ মিয়া। শহীদ মিয়ার মাতা জীবিত নাই। আমার পিতার আনছার বিভাগে চাকুরীর শেস কর্মস্থল ছিল উলছাপাড়া, সেখান থেকে পালিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। আমার পিতার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কে ছিলেন তাহা আমি জানি না। পিতা বাড়িতে আসার পর কোন জায়গা থেকে এসেছিলেন তাহা জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কিন্তু তিনি বলেন নাই। আমার বাবার বাড়ি টেংরাপাড়া একথা তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলি নাই, ইহা সত্য নহে। আমি আব্দুল হামিদ, পিতা মৃত আবুল কাহার ভূঁইয়াকে চিনি না। ‘‘ পালানোর সময় রাস্তায় উঠলেই রাজাকাররা আমার বাবাকে ধরে  হাত বেঁধে মারপিঠ শুরু করে” বা ‘‘তখন ক্যাম্পের একজন রাজাকার যার নাম আব্দুর রউফ আমার মা ও দাদীকে বলে যে ঐ খাবার আমার নিকট দিয়ে যান আমি খাইয়ে দিব। আব্দুর রউফ রাজাকার মা ও দাদীকে বলেছে উল্লেখিত ক্যাম্পের কমান্ডার আখাউরা থানার নয়াদিল গ্রামের মোবারক হোসেন, যাকে ধরলে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে নেয়া যাবে। তখন আমার মা ও দাদী বািড়তে ফিরে আমাদের আমাদের ঐ কথা জানায়। তখন আমার মা আমাদের বাড়ির পাশের খালেক মাওলানাকে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য অনুরোধ করলে তিনি বলেন আজকে রাত হয়ে গেছে, আগামীকাল সকালে ক্যাম্পে গিয়ে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসবেন” বা ‘‘যে সকল রাজাকাররা আমার পিতাকে ধরে  নিয়ে গিয়েছিল তাদের কারো নাম ঐসময় জানতাম না, দেখলে চিনবো। আমি শুনেছি আমার বাবাকে ধরে  নেওয়ার সময় রাজাকার কমান্ডার মোবারক হোসেন ও তার  সহযোগী রাজাকার জামশেদ ছিল” বা ‘‘তখন তার বয়স কম ছিল, দাড়ি ছিলনা” এই কথাগুলি আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলি নাই, ইহা সত্য নহে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান আর্মিদের ভয়ে আসামী মোবারক আলী দাড়ি রেখেছিল, ইহা সত্য নহে। ১৯৭১ সালে আসামী মোবারক হোসেন রাজাকার কমান্ডার ছিল না, ইহা সত্য নহে। আমি যখন আসামী মোবারক হোসেনকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় সনাক্ত করি তখন কাঠগড়ায় একজন ব্যক্তিই উপস্থিত ছিলেন। আমি একটি কুচক্রী মহলের ইন্দনে এবং অর্থের লোভে অসত্য সাক্ষ্য প্রদান করলাম, ইহা সত্য নহে। আমার কথিত সময়ে, কথিত স্থান থেকে আমার পিতাকে ধরে নিয়ে যাওয়া এবং তাকে হত্যা করার কথা অসত্য, ইহা সত্য নহে। (সমাপ্ত)

সোমবার, ২৭ মে, ২০১৩

হাজী মোবারকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ haji mobarak hossain pw2


মেহেদী হাসান,২৭/৫/২০১৩

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যুনালে আজ হাজী মোবারক হোসেন এর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী খোদেজা বেগমের জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়।

আমার নাম খোদেজা বেগম, আমার বয়স-৫৬ বৎসর। আমার ঠিকানা-গ্রাম শিমরাইল কান্দি,থানা ও জেলা ব্রাক্ষণবাড়িয়া।
আমার পিতার গ্রামের নাম ছাতিয়ান টেংরাপাড়া। আমি একজন গৃহিনী। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১৪/১৫ বৎসর। স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্ব থেকে আমার পিতা আনছার বিভাগে চাকুরী করতো। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার পিতা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার দাদা, দাদী এবং মা অসুস্থ থাকার খবর পেয়ে আমার পিতা ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের ৯ তারিখে রাত্রে বাড়িতে আসেন। ১৯৭১ সালের ১১ই নভেম্বর তারিখে আমার পিতা আমাদের এলাকায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং রাজাকাররা আসতেছে সেই খবর পেয়ে বাড়ির পশ্চিম পাশ দিয়ে পালানোর সময় রাস্তায় উঠলেই রাজাকাররা আমার বাবাকে ধরে  হাত বেঁধে মারপিঠ শুরু করে। তখন আমরা চিল্লা চিল্লি ও কান্নাকাটি করতে করতে তাদের পিছনে পিছনে যাই। তখন রাজাকাররা আমার বাবাকে ধরে  সুহিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের অফিসে নিয়ে যায় যেখানে রাজাকার ও আর্মির ক্যাম্প ছিল। ঐদিন আসরের পরে আমার আম্মা ও দাদী বাবার জন্য ভাত নিয়ে উল্লেখিত ক্যাম্পে যায়। তখন ক্যাম্পের একজন রাজাকার যার নাম আব্দুর রউফ আমার মা ও দাদীকে বলে যে ঐ খাবার আমার নিকট দিয়ে যান আমি খাইয়ে দিব। আব্দুর রউফ রাজাকার মা ও দাদীকে বলেছে উল্লেখিত ক্যাম্পের কমান্ডার আখাউরা থানার নয়াদিল গ্রামের মোবারক হোসেন, যাকে ধরলে আমার বাবাকে ঠাড়িয়ে নেয়া যাবে। তখন আমার মা ও দাদী বািড়তে ফিরে আমাদের  ঐকথা জানায়। তখন আমার মা আমাদের বাড়ির পাশের খালেক মাওলানাকে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য অনুরোধ করলে তিনি বলেন আজকে রাত হয়ে গেছে, আগামীকাল সকালে ক্যাম্পে গিয়ে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসবেন। পরদিন সকালে খালেক মাওলানার নিকট যাওয়ার পূর্বে লোকজন বলাবলি করছে যে, তিতাস নদীর পশ্চিম পাড়ে বাকাইল ঘাটে আমার বাবাকে গুলি করে করে হত্যা করে সেখানে লাশ ফেলে রাখা হয়েছে। তখন আমরা কান্নাকাটি করে বাকাইল ঘাটে গিয়ে দেখি আমার পিতার হাত,পা বাঁধা, কপালের ডান পাশে গুলি, মাথার খুলি উড়ে গেছে, বুকের ডান পাশে গুলির চিহ্ন এবং নাভির নীচে ও উপরে দুটি কাটা চিহ্ন অবস্থায় লাশ পড়ে আছে। তারপর আমার মা খালেক মাওলানার নিকট যায়। খালেক মাওলানা উল্লেখিত ক্যাম্প থেকে একটি শ্লিপ এনে আমাদের নিকট দিলে আমরা আমাদের পিতার লাশ নিয়ে এসে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করি। যে সকল রাজাকাররা আমার পিতাকে ধরে  নিয়ে গিয়েছিল তাদের কারো নাম ঐসময় জানতামনা, দেখলে চিনবো। আমি শুনেছি আমার বাবাকে ধরে  নেওয়ার সময় রাজাকার কমান্ডার মোবারক হোসেন  ও তার  সহযোগী রাজাকার জামশেদ ছিল। ঐসময় আমি তাদেরকে দেখেছিলাম। আমি যে রাজাকার কমান্ডার মোবারক হোসেনের কথা বলেছি তিনি অদ্য ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপস্থিত আছেন (সনাক্তকৃত)।  তখন তার বয়স কম ছিল, দাড়ি ছিলনা। আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট জবানবন্দী করেছি। আমি আমার পিতার হত্যার বিচার চেয়ে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেছিলাম।

জেরা : আজ একটি প্রশ্নের মাধ্যমে জেরা করা হয়। প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন
রাজাকার জামশেদের নাম আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলিনাই, ইহা সত্য নয়। (চলবে)



রবিবার, ২৬ মে, ২০১৩

হাজী মোবারকের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষীর জেরা

Mehedy Hasan
২১/৫/২০১৩
হাজী মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী দারুল ইসলাম জেরার সময় আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে যেসব উত্তর দিয়েছেন তা নিম্নরূপ :


মোছাঃ রীনা বেগম দায়েরকৃত আখাউড়া থানার মামলা নং-২৬, তারিখ ২৮/০৫/২০০৭ মামলায় ব্রাক্ষ্মণবাড়ীয়া দ্রুত বিচার আাদালতে পি ডব্লিউ-৪ হিসাবে আমি সাক্ষ্য প্রদান করিনাই বা আসামী মোবারক আলীও ঐ মামলায় খালাস পায়নাই। উল্লেখিত মামলায় মোবারক আলী আপিলে দায়রা জজ আদালত হইতে খালাস পান কিনা তাহা আমি জানিনা। আমি পশ্চিম পাকিস্তানে আর্টিলারী সেন্টার ক্যামেলপুরে ছিলাম। ১৯৭০ সালে ছুটিতে আসা পর্যন্ত আমার পোষ্টিং ওখানেই ছিল। আমার সি,ও, একজন পাঠান ছিলেন, তার নাম আমি জানিনা। পাকিস্তান আর্মিতে আমি নন কমিশন অফিসার ছিলাম। আমি কাস টেন পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। পাকিস্তান আর্মিতে নন কমিশন ল্যান্স নায়েকরা এককালীন ৩মাসের বেশী ছুটি পায়না, ইহা সত্য নহে। আমি  পাকিস্তান আর্মি রুলস পড়িনাই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমাকে সুবেদার আব্দুর সাত্তার সাহেব ইনটেলিজেন্সের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আব্দুর সাত্তার সাহেব বর্তমানে জীবিত নেই। সাব সেক্টর-২ এর দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন ক্যাপ্টেন আইনদ্দিন সাহেব যিনি পরবর্তীতে মেজর জেনারেল হিসেবে অবসর গ্রহন করেছেন। তিনি বর্তমানে জীবিত আছেন। (চলবে)

২২-০৫-২০১৩ ইং পুনরায় জেরা শুরু ঃ-
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছুটিতে নিয়ে পুর্ব পাকিস্তানে আসা সংক্রান্ত কোন দালিলিক প্রমান আমার নিকট এখন নাই। ইহা সত্য নহে যে, পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত কোন আর্মি সদস্য ছুটিতে থাকাকালীন সময়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে তাকে বেতন দেওয়া হতো না। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বেতন উত্তোলন সংক্রান্ত কোন দালিলিক প্রমান আমার নিকট এখন নাই। আমি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছুটিতে পূর্ব পাকিস্তান আসি নাই বা পূর্ব পাকিস্তান থেকে বেতন তুলি নাই, ইহা সত্য নয়। ইহা সত্য নয় যে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমি ইনটেলিজেন্স হাবিলদার ছিলাম না। ১৯৭১ সালে গংগাসাগর, আখাউড়া, পাহাড়পূর এবং ফকিরমুরা এলাকা এরিয়া কমান্ডার ছিলেন মেজর সেকান্দার। ইহা সত্য নহে যে, ১৯৭১ সালে উল্লেখিত এলাকায় ব্রিগেডিয়ার সাদউল্লা খান ২৩ বেলুচ রেজিমেন্ট, এরিয়া কমান্ডার ছিলেন। উল্লেখিত ব্রিগেডিয়ার সাদ উল্লা খান ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীদের তালিকায় ২৩ নং ক্রমিকে আছেন কিনা আমি জানি না। উল্লেখিত এলাকা সমূহে ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন মেজর মোঃ আব্দুল্লাহ খান, মেজর সাদেক নেওয়ার ও ক্যাপ্টেন জাবেদ ইকবাল, ইহা সত্য নয়। ব্রক্ষ্মণবাড়িয়ার মহকুমার পাকিস্তান আর্মিদের কয়টি ইউনিট ছিল তাহা আমার স্মরণ নাই। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া মহকুমার আর্মিদের ৪টি ইউনিটে লেঃ কর্নেল খিজির হায়াত খান ব্রিগেডিয়ার সাদ উল্লাহ এবং লেঃ কর্ণেল জায়েদী কমান্ডিং অফিসার ছিলেন কিনা তাহা আমার জানা নাই। ব্রক্ষ্মণবাড়িয়া কোন সালে জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায় তাহা আমার স্মরণ নাই। ১৯৭১ সালে ২রা আগষ্ট তারিখের পূর্বে বাংলাদেশে কোন রাজাকার ছিলনা, কিন্তু স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে পাকিস্তান আর্মিদের সাথে সহযোগিতামূলক কাজ করতো, তৎপূর্বে বাংলাদেশে আনছার ছিলনা। ইহা সত্য নহে যে, মোবারক আলী পাকিস্তান আর্মিদের সাথে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কাজ করতো একথা তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলি নাই। জেলা প্রশাসক ও মহকুমা প্রশাসকগণ রাজাকারদের নিয়োগ প্রদান করতেন, ইহা সত্য নহে। রাজাকাররা পাকিস্তান সরকার থেকে বেতন ভাতা পেত। রাজাকারদের বদলী এবং পদোন্নতি জেলা প্রশাসকগণ করতেন, ইহা সত্য নহে। ১৯৭১ সালে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া মহকুমার এস,ডি ও, কে ছিলেন তাহা আমি জানি না। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া মহকুমার সাবডিভিশনাল পুলিশ অফিসার কে ছিলেন তাহা আমি জানি না। আমি খবরের কাগজ ও বইপত্র পড়িনা, কারণ সময় পাইনা। ১৯৭১ সালে আগতলা সরকারের কোন পাশ আমার নিকট নাই, কারণ পাশের দরকার হতোনা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমি অনেকবার আগরতলা যাতায়াত করেছি এমন কথা আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলি নাই, ইহা সত্য নহে। ‘মুক্তিযুদ্ধে ব্রক্ষ্মণবাড়িয়া’ নামক বইটি আমি পড়ি নাই। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম তাহা কোন বই বা পত্রিকায় উল্লেখ নাই, ইহা সত্য নহে। মোবারক আলী পাকিস্তান আর্মিদের সংগে সম্পৃক্ত ছিল তাহা ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত কোন পেপার বা পত্রিকায় এই কথা ছাপা হয়েছিল কিনা তাহা আামি জানি না। আমি জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র কখনও পড়িনাই। জামায়াতে ইসলামীর ইউনিয়ন পর্যায়ে কোন রোকন হয়না, তবে নেতা হয়। হাজী মোবারক আলী কখনও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সহিত জড়িত ছিলনা তিনি আওয়ামীলীগ করতেন, ইহা সত্য নহে। ১৯৭১ সালে মোবারক আলী পাকিস্তানি আর্মিদের স্বেচ্ছাসেবক ছিল এমর্মে আমার নিকট কোন দালিলিক প্রমান নাই, তবে তিনি রাজাকার ছিলেন। মোবারক আলী রাজাকার ছিল এ মর্মে কোন দালিলিক প্রমান আমার নিকট নাই। মোবারক আলী কোন সময় স্বেচ্ছাসেবক বা রাজাকার ছিলেন না, ইহা সত্য নহে। ১৯৭১ সালে ব্রক্ষ্মণবাড়িয়া মহকুমার রাজাকার কমান্ডার কে ছিল তাহা আমার স্বরণ নাই। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার শান্তি কমিটির আহবায়ক কে ছিলেন তাহা আমি জানিনা। আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে ছিলাম এবং দেশ স্বাধীনের পর পালিয়ে এসেছি, ইহা সত্য নহে। আঃ হামিদ, পিতা আব্দুল কাহার ভূঁইয়ার প্ররোচনায় অর্থের প্রলোভনে আমি অত্র মামলায় সাক্ষ্য দিচ্ছি, ইহা সত্য নহে।
‘‘বর্তমানে আমি অবসরপ্রাপ্ত। ১৯৬৩ সালে আমি পাকিস্তান আর্মিতে ভর্তি হই। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি মুক্তিযোদ্ধার ইনটেলিজেন্স সার্ভিসে হাবিলদার ছিলাম। ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসের ৩০ তারিখে আমি ৪ মাসের ছুটি নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাড়ীতে আসি” বা  ‘‘ বেতন নিতে এসে জানলাম যে, ৭ই মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিবেন পল্টন ময়দানে” বা ‘‘ বাড়িতে যাওয়ার পর এ্যাডভোকেট সিরাজুল হক সাহেবের পরামর্শ অনুযায়ী আমি স্থানীয় ছেলে পেলেদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য ১লা এপ্রিল থেকে ১৪ই এপ্রিল পর্যন্ত ট্রেনিং প্রদান করি” বা ‘‘যুদ্ধে আমরা টিকতে না পারায় আমরা ভারতের আগরতলায় চলে যাই। আমি ভারতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিতাম এবং ট্রেনিং দেওয়ার পর দলে দলে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দেশে পাঠাতাম অপারেশনের জন্য। এপ্রিলের ২০ তারিখে আমি ভারত থেকে নিজ বাড়িতে আসি। ২১শে এপ্রিল তারিখ সকাল বেলা ই,পি,আর, এর ফেলে যাওয়া একটি লাইট মেশিনগান পাই। সেই মেশিনগান পাওয়ার পর আমি বাড়িতে আরও ৫/৬ জনকে যোগাড় করে তাদের নিয়ে পুনরায় ভারতে যাই এবং গোয়েন্দাগিরি করার জন্য মাঝে মধ্যে দেশে আসি” বা ‘‘ উল্লেখিত ব্যক্তিগণ সহ অন্যান্যরা রাজাকারের একটি দল গঠন করল” বা ‘‘২১শে আগষ্ট তারিখে জানতে পারি পাক সেনারা এবং রাজাকাররা এই মর্মে সন্দেহ করে যে, মান্দাইল গ্রামের সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধারা ঐ ব্রীজটি ভেঙ্গেছে। পরদিন ২২শে আগষ্ট সকাল ৯-০০ টার দিকে গংগাসাগর পাক সেনাদের ক্যাম্প থেকে জামসেদ, মুক্তা মিয়া ও মোবারক মান্দাইল গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খবর দেয় হাজি নূর বক্স এর বাড়িতে মিটিং হবে সেখানে যাওয়ার জন্য তাদেরকে বলে” বা ‘‘ ঐ বাড়িতে জমায়েত লোকজনদেরকে পাক সেনা ও রাজাকাররা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নৌকায় করে গংগাসাগর দীঘির পাড়ে পাক সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়” বা ‘‘সেখানে জমসেদ, মুক্তা মিয়া, মোবারক আলী, বজু মিয়া উপস্থিত থেকে উল্লেখিতভাবে মান্দাইল গ্রামের ২৬ জন এবং অন্যান্য গ্রামের ৭জন মোট ৩৩ জনকে বাছাই করে তাদেরকে দীঘির পশ্চিম পাড়ে নিয়ে যায়” বা ‘‘ দীঘির পশ্চিম পাড়ে উল্লেখিত ৩৩ জনকে দিয়ে গর্ত খোড়ায়” বা ‘‘ঐ সময় সেখানে মোবারক আলী, জমসেদ, মুক্তা মিয়া উপস্থিত ছিল। পরদিন ২৩শে আগষ্ট তারিখে ক্যাম্পে আটক রাখা বাকী লোকজনদেরকে নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। আর্মি ক্যাম্প থেকে যাদেরকে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে একজন আবুল বাশার যিনি ঈমামতি করেন তিনি জীবিত আছেন, তার নিকট থেকে আমি ঘটনার বিষয় জানতে পারি এবং আমি নিজেও গোয়েন্দা সূত্রে ঘটনার বিষয় জানতে পারি” বা ‘‘ ছাতিয়ান গ্রামের আব্দুল খালেক নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা তার অসুস্থ মাকে দেখার জন্য নিজ বাড়িতে গেলে মোবারক আলী ও তার সহযোগীরা তাকে ধৃত করে গুলি করে হত্যা করে”
তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলিনাই, ইহা সত্য নহে। ছাতিয়ান গ্রামের আব্দুল খালেকের মেয়ে খোদেজা বেগম কর্তৃক দায়েরকৃত মামলায় আমি সাক্ষী নাই। ইহা সত্য নহে যে, আমি তাবিজ কবজ করে জিন হাজির করে লোকজনকে প্রতারনা করে অর্থ উপার্জন করি। (সমাপ্ত) 


সোমবার, ২০ মে, ২০১৩

হাজী মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে আজ প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়।




হাজী মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে আজ  প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দী  গ্রহণ করা হয়।

Mehedy Hasan
আমার নাম মোঃ দারুল ইসলাম, আমার বয়স-৭৩ বৎসর। আমার ঠিকানা ঃ গ্রাম-বচিয়ারা, থানা-আখাউড়া, জেলা-ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া। বর্তমান ঠিকানা ঃ গ্রাম-গংগানগর, থানা-আখাউড়া, জেলা-ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া।
বর্তমানে আমি অবসরপ্রাপ্ত। ১৯৬৩ সালে আমি পাকিস্তান আর্মিতে ভর্তি হই। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি মুক্তিযোদ্ধার ইনটেলিজেন্স সার্ভিসে হাবিলদার ছিলাম। ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসের ৩০ তারিখে আমি ৪ মাসের ছুটি নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাড়ীতে আসি। মার্চ মাসে ঢাকায় আসি বেতন নেওয়ার জন্য। বেতন নিতে এসে জানলাম যে, ৭ই মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে আমি উদ্ভূদ্ধ হয়ে নিজ বাড়িতে যাই। বাড়িতে যাওয়ার পর এ্যাডভোকেট সিরাজুল হক সাহেবের পরামর্শ অনুযায়ী আমি স্থানীয় ছেলে পেলেদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য ১লা এপ্রিল থেকে ১৪ই এপ্রিল পর্যন্ত ট্রেনিং প্রদান করি। ১৬ই এপ্রিল তারিখে পাক সেনা বাহিনী আমাদের এলাকায় আসে এবং সেখানে আমাদের সাথে তাদের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে আমরা টিকতে না পারায় আমরা ভারতের আগরতলায় চলে যাই। আমি ভারতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিতাম এবং ট্রেনিং দেওয়ার পর দলে দলে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দেশে পাঠাতাম অপারেশনের জন্য। এপ্রিলের ২০ তারিখে আমি ভারত থেকে নিজ বাড়িতে আসি। ২১শে এপ্রিল তারিখ সকাল বেলা ই,পি,আর, এর ফেলে যাওয়া একটি লাইট মেশিনগান পাই। সেই মেশিনগান পাওয়ার পর আমি বাড়িতে আরও ৫/৬ জনকে যোগাড় করে তাদের নিয়ে পুনরায় ভারতে যাই এবং গোয়েন্দাগিরি করার জন্য মাঝে মধ্যে দেশে আসি। গংগাসাগর দীঘির উত্তর পাড়ে পাক সেনাদের ক্যাম্প ছিল। সেই ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিল মেজর সেকান্দার এবং আমাদের এলাকার কিছু লোকজন যেমন বজু মিয়া, আবরু মিয়া, মোবারক আলী, মুক্তা মিয়া এবং জমসেদ মিয়া ঐ ক্যাম্পে আর্মিদের সাথে থাকতো। মোবারক মিয়া পাকিস্তান আমলে ই,পি,আর, তর সোর্স হিসাবে কাজ করতো। উল্লেখিত ব্যক্তিগণ সহ অন্যান্যরা রাজাকারের একটি দল গঠন করল। ১৯শে আগষ্ট আমরা মান্দাইল গ্রামের লোকজনের সাহায্যে তিনলাখপীর স্থানে ব্রীজ ভাঙ্গার জন্য যাই এবং ব্রীজ ভাঙ্গা হয়। আমার সংগে ছিল সুবেদার গিয়াস উদ্দিন, নায়েব সুবেদার আব্দুল কাদির এবং মিন্টু মিয়া সহ প্রায় ১২০ জন। ব্রীজ ভেঙ্গে আমরা চলে আসি। ২১শে আগষ্ট তারিখে জানতে পারি পাক সেনারা এবং রাজাকাররা এই মর্মে সন্দেহ করে যে, মান্দাইল গ্রামের সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধারা ঐ ব্রীজটি ভেঙ্গেছে। পরদিন ২২শে আগষ্ট সকাল ৯-০০ টার দিকে গংগাসাগর পাক সেনাদের ক্যাম্প থেকে জামসেদ, মুক্তা মিয়া ও মোবারক মান্দাইল গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খবর দেয় হাজি নূর বক্স এর বাড়িতে মিটিং হবে সেখানে যাওয়ার জন্য তাদেরকে বলে। বেলা তিনটার দিকে হাজী নূর বক্সের বাড়িতে প্রায় ১৩০/১৩২ জন লোক জড়ো হয়। ঐ সময় গংগাসাগর ক্যাম্প থেকে পাক সেনারা নৌকা যোগে এসে হাজি নূর বক্স এর বাড়ি ঘেরাও করে। ঐ বাড়িতে জমায়েত লোকজনদেরকে পাক সেনা ও রাজাকাররা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নৌকায় করে গংগাসাগর দীঘির পাড়ে পাক সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পূর্ব পরিকল্পিত ভাবে কার বাবা, কার ভাই, কার আত্মীয় স্বজন মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে তাদের বাছাই করা হয়। সেখানে জমসেদ, মুক্তা মিয়া, মোবারক আলী, বজু মিয়া উপস্থিত থেকে উল্লেখিতভাবে মান্দাইল গ্রামের ২৬ জন এবং অন্যান্য গ্রামের ৭জন মোট ৩৩ জনকে বাছাই করে তাদেরকে দীঘির পশ্চিম পাড়ে নিয়ে যায়। বাকী লোকদেরকে পাক সেনাদের ক্যাম্পে আটক রাখে। দীঘির পশ্চিম পাড়ে উল্লেখিত ৩৩ জনকে দিয়ে গর্ত খোড়ায়। এরপর পাক সেনারা ঐ ৩৩জনকে ব্রাশ ফায়ার করে গুলি করে হত্যা করে ঐ গর্তে মাটি চাপা দেয়। ঐ সময় সেখানে মোবারক আলী, জমসেদ, মুক্তা মিয়া উপস্থিত ছিল। পরদিন ২৩শে আগষ্ট তারিখে ক্যাম্পে আটক রাখা বাকী লোকজনদেরকে নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। আর্মি ক্যাম্প থেকে যাদেরকে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে একজন আবুল বাশার যিনি ঈমামতি করেন তিনি জীবিত আছেন, তার নিকট থেকে আমি ঘটনার বিষয় জানতে পারি এবং আমি নিজেও গোয়েন্দা সূত্রে ঘটনার বিষয় জানতে পারি। গংগাসাগর ক্যাম্প থেকে রাজাকার বাহিনী গঠন করে মোবারক আলীকে রাজাকার কমান্ডার করে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার আনন্দময়ী কালি মন্দিরে পাঠায়। সেখানে গিয়ে মোবারক আলী ও তাহার সহ রাজাকাররা কালি মন্দিরে মূর্তি ভেঙ্গে লুটপাট করে কালিমন্দিরের নাম পরিবর্তন করে ‘‘রাজাকার মঞ্জিল” নাম দিয়ে সেখানে রাজাকার ক্যাম্প স্থাপন করে। সেখানে কিছুদিন থাকার পর মোবারক আলী অন্য রাজাকারের উপর ঐ ক্যাম্পের দায়িত্ব দিয়ে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার সুহিলপুর রাজাকার ক্যাম্পের কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। সুহিলপুর রাজাকার ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে মোবারক আলীর দায়িত্বে ঐ এলাকায় বেশ কিছু হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা সংঘটিত হয়। ছাতিয়ান গ্রামের আব্দুল খালেক নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা তার অসুস্থ মাকে দেখার জন্য নিজ বাড়িতে গেলে মোবারক আলী ও তার সহযোগীরা তাকে ধৃত করে গুলি করে হত্যা করে। আসামী মোবারক আলী ইউনিয়ন পর্যায়ের একজন রোকন ছিলেন এবং তিনি স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে জামায়াতে ইসলামীর একজন সদস্য ছিলেন। আমি যে মোবারক আলীর কথা বলেছি তিনি অদ্য ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপস্থিত আছেন (সনাক্তকৃত)। আমি অত্র মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট জবানবন্দী করেছি।



মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৩

মোবারক হোসেন নামে আরেক ব্যাক্তির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন ট্রাইব্যুনালে

মেহেদী হাসান, ২৩ এপ্রিল, ২০১৩
হাজি মো: মোবারক হোসেন নামে আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে  চার্জ গঠন করা হল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ। ১৯৭১ সালে হত্যা, নির্যাতন অপহরনসহ চার ধরনের মোট পাঁচটি মানবতা বিরোধী অভিযোগে তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হল। হাজি মো: মোবারক হোসেনের বাড়ি ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া জেলার  আখাউড়ায়। 

হাজী মো: মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়েছে সেগুলো হল  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থানাধীন টানমান্দাইল ও জাঙ্গাইল গ্রামে  ৩৩ জনকে হত্যা,  শহীদ আশুরঞ্জন দেবকে কালী বাড়ি রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা, শহীদ আব্দুল খালেককে ছাতিয়ান গ্রাম থেকে অপহরণ করে হত্যা, সদর থানার খাদেম হোসেন খানকে অপরহরণ করে নির্যাতন এবং  খরমপুর গ্রামে আব্দুল মালেক ও আমীর পাড়া  গ্রামের মো. সিরাজকে অপহরণ করে নির্যাতন।

চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ আজ  চার্জ গঠনের আদেশ পাশ করেন। আগামী ১৬ মে রাষ্ট্রপরে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

এ নিয়ে ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ট্রাইব্যুনাল-২ এ মোট ১০ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে পাঁচ জনের বিচার শেষ হয়েছে। তিনজনের বিরুদ্ধে রায় প্রদান করা হয়েছে।

হাজি মো: মোবারক হোসেন বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের অধীনে কারবন্দী রয়েছেন। চার্জ গঠন আদেশ উপলক্ষে গতকাল তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা  হয়। চার্জ গঠন আদেশ চূড়ান্তকরনের পূর্বে ট্রাইব্যুনাল তাকে প্রশ্ন করেন আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়ে শোনানো  হল। এ বিষয়ে আপনার মতামত কি? তখন  হাজি মোবারক হোসেন বলেন, আমি  সম্পূর্ণ নির্দোষ।  আমি কোন রাজাকার ছিলামনা। আমার গ্রামের একজন লোকও যদি প্রমান করতে পারে আমি রাজাকার ছিলাম তাহলে আমি আপিল করবনা ।
হাজি মোবারক হোসেন আরো বলেন, আমি জানতাম রাজাকারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন মুক্তিযোদ্ধারা কিন্তু আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে একজন রাজাকার।


হাজী মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার চিফ জুড়িশিয়াল মেজিস্ট্রেট এর কাছে অভিযোগ করেন খোদেজা বেগম নামে জনৈক মহিলা। অভিযোগ মতে  খোদেজা বেগমের পিতা   আব্দুল খালেক ছিলেন আনছার কমান্ডার ।   যুদ্ধের সময় তার পিতা গ্রামে আসার পর  তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যা ঘটনায় হাজী মোবারককে অভিযুক্ত করে খোদেজা বেগম মামলা করেন।

মামলা দায়েরের পর হাজী মোবারক হোসেন হাইকোর্টে  হাজির হয়ে প্রথমে ছয় মাসের জামিন পান। এরপর কয়েকবার জামিনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৪ জুলাই তাকে সংশ্লিষ্ট মেজিস্ট্রেট এর কাছে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দিলে তিনি  ঐ বছর ১৯ অক্টেবার   আত্মসমপর্ন করেন।  সেই থেকে তিনি বন্দী  ছিলেন। বন্দী থাকা অবস্থায় ২০১২ সালে তার মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ২০১২ সালের ১৫ জুলাই থেকে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। একই বছর ১৬ জুলাই তিনি  ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে জামিনে মুক্তি পান। সেই থেকে তিনি গত ১২ মার্চ পযন্ত মুক্ত ছিলেন। ১২ মার্চ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।