শুক্রবার, ২১ জুন, ২০১৩

হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট

 

 হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট
মেহেদী হাসান

ভূমিকা:
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের কারণ খুঁজে বের করতে পাকিস্তান সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে।  যুদ্ধের পরপরই ১৯৭১ সালের  ২৬ ডিসেম্বর  প্রেসিডেন্টের আদেশে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে  এ কমিশন গঠন করা হয়। ২১৩ জন প্রত্যদর্শী সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তার স্ব্যাগ্রহণ শেষে ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে কমিশন তাদের  প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়। । কমিশনের এ প্রতিবেদন পাকিস্তান সরকার কখনো জনসম্মুখে প্রাকাশ করেণি।

১৯৭৪ সালে  ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের মধ্যে যুদ্ধবন্দী  হস্তান্তর বিষয়ক ত্রিদেশীয় চুক্তি স্বারের আগ পর্যন্ত  লে. জেনারেল নিয়াজীসহ সকল পাকিস্তানী উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা ভারতে  বন্দী ছিলেন।  এসব সেনা কমকর্তা পাকিস্তানে ফেরত আসার আগেই হামুদুর রহমান কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। ১৯৭৪ সালে ত্রিদেশীয় চুক্তির পর পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তারা দেশে ফেরত আসার পর ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল নিয়াজী,  ইস্টার্ন কমান্ডের  রাজনৈতিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীসহ মেজর জেনারেল জমশেদ, রিয়ার এডিমরাল শরিফ, এয়ার কমোডোর ইনামসহ ৭২  শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার  স্ব্যা গ্রহণ করে তদন্ত  কমিশন। এর ভিত্তিতে কমিশন নতুন করে ৫৪ পৃষ্ঠার আরেকটি সাপ্লিমেন্টারী প্রতিবেদন তৈরি করে এবং  ১৯৭৪ সালের ২৩ অক্টোবর এ প্রতিবেদন জমা দেয় । এই প্রতিবেদনটি জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়।    জেনারেলদের  নিজ  স্ব্যা  এবং জেনারেলদের বিরুদ্ধে তাদের  অধীনস্ত সেনা অফিসাররা যে স্ব্যা দিয়েছে কমিশনের কাছে তার  ভিত্তিতে প্রণীত  সাপ্লিমেন্টারি প্রতিবেদনের সার অংশ তুলে ধরা হল। ব্রিগেডিয়ার এবং তদুর্ধ্ব সেনা কর্মকর্তাদের  স্ব্যা  গ্রহণ করে কমিশন। (৫৪ পৃষ্ঠার ইংরেজি সাপ্লিমেন্টারি প্রতিবেদনটির ভিত্তিতে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।)

মূল বক্তব্য:
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার বীজ বপিত হয়। যে সামরিক কর্মকর্তাদের পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধের জন্য পেরণ করা হয়েছিল তারা পশ্চিম পাকিস্তানে থাকতেই নানা বিতর্কিত এবং নৈতিকতা বিরোধী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তারা মদ, নারী, জমি, বাড়ি, দুর্ণীতি এবং সম্পদ অর্জনের দিকে ঝূকে পড়ে। সামরিক কর্মকর্তাদের ব্যারাক ছেড়ে যখন রাজনৈতিক ময়দানে পাঠানো হয় তার ফলে যা হবার তাই হয়েছিল। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অঙ্গনে থাকার ফলে এবং  লোভ লালসার সাথে জড়িয়ে পড়ায়  সামরিক পেশাদারিত্ব এবং দতা হারিয়ে ফেলে তারা।  এ জাতীয় একটি বাহিনীকে পাঠানো হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধের জন্য। দেশ রা এবং যুদ্ধ জয়ের কোন উন্নত কৌশল তারা প্রণয়ন করতে পারেনি। পাশ্চিম পাকিস্তানে থাকতে এসব সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেসব গুরুতর অভিযোগ ছিল পূর্ব পাকিস্তানে এসেও তারা একই অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। যুদ্ধের জন্য যেসব লজিষ্টিক সাপোর্ট দরকার অর্থাৎ ময়াদনে থাকার ব্যবস্থা, খাদ্য সরবরাহ এবং যুদ্ধযানের জন্য তেল ও অন্যান্য সামগ্রীর সুষ্ঠু সরবারের কোন  ব্যবস্থা না করেই সৈনিকরা মাঠে নেমে পড়ে যুদ্ধের জন্য। টিক্কা খানকে এসব সমস্যার কথা বলা হলে তিনি বলেছিলেন, “পূর্ব পাকিস্তানে কি কোন গুরু ছাগল নেই?” অর্থাৎ মানুষের বাড়ি ঘর, দোকান পাট লুটপাট করে খাদ্য তেল সংগ্রহ করার আদশে দেন তিনি। এছাড়া উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা লুটাপাট, নির্বিচারে মানুষের বাড়িঘর, হাটাবাজার জ্বালাও পোড়াও এবং নারী ভোগে মেতে ওঠে।  লে. জেনারেল নিয়াজী করাচী এবং শিয়ালকোটে জিওসি থাকা অবস্থায় সঈদা নামে এক মহিলার কাছে  যাতায়াত করতেন । সাঈদা একটি পতিতালয় পরিচালনা করতেন এবং সে  সেনা কর্মকর্তাদের সে সময়ে নারী সাপ্লাইয়ের কাজ করত। নিয়াজী পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ করতে এসেও  একই কাজে লিপ্ত হয়। তার অধীনস্তরা তার বিরুদ্ধে  স্ব্যা প্রদানকালে বলেছেন, সে ছিল একজন র্ধষক। এছাড়া সে পাকিস্তান এয়ার লাইন্সের মাধ্যমে পশিচ্ম পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সম্পদ পাচারে লিপ্ত ছিলেন। উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এমনকি তাদের স্ত্রীরা পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বর্ণালঙ্কার, মূল্যবান আসপাবপত্র, অর্থ পাচারে লিপ্ত ছিল। । পাকিস্তানে পাচারকৃত এসব সম্পত্তি অনেক সেনা কর্মকর্তাদের বাসা থেকে উদ্ধারও করা হয়েছে পরবর্তীতে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তারা যখন এ ধরণের অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে তখন এর প্রভাব পড়ে অধীনস্তদের ওপরও। এবং হয়েছিলও তাই। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে এসব কর্মকর্তারা পূর্ব পাকিস্তানকে  নিজের দেশ মনে না করে শত্র“ দেশ মনে করে নির্বিচারে নৈরাজ্য চালিয়েছে এখানে। পূর্ব পাকিস্তানকে রার কোন চেষ্টা তারা করেনি।  যুদ্ধ জয়ের কোন উন্নত চিন্তা পরিকল্পনা তাদের ছিলনা।
প্রতিবেদনে  স্পষ্ট  করে  বলা  হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পনের কোন পরিস্থিতি ছিলনা। আত্মসমপর্ণের কোন নির্দেশও  পাকিস্তান সেনা সদরদপ্তর তেকে নিয়াজীকে দেয়া হয়নি। নিয়াজী পূর্ব পাকিস্তানের সেসময়কার পরিস্থিতি  সম্পর্কে সেনাসদরে ভুর তথ্য পাঠিয়ে সেনা কর্তৃপকে বিভ্রান্ত করেছিলেন যাতে আত্মসমপর্ণের  অনুমতি পাওয়া যায়।  নিয়াজীর অধীনে  থাকা বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ডের কমান্ডারাও নিয়াজীকে ভুল তথ্য দিয়েছে এবং তাকে যুদ্ধ কৌশল নির্ধারণ এবং করণীয় বিষয়ে সঠিক পরামর্শ ও  বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেণি। কোন কোন কমান্ডার নিয়াজীর অনুমতি ছাড়াই ক্যান্টনমেনট্ গুটিয়ে ঢাকায় চলে এসেছে।   ভারতের আগ্রাসন বিষয়ে  ব্রিগেডিয়ার জিএম বাকির সিদ্দিকীকে রাওয়ালপিন্ডিতে একটি কনফারেন্সে খুব ভাল করে  বুঝিয়ে দেয়া  হয়েছে কিস্তু তিনি এ  বিষয়ে নিয়াজীকে ঢাকা গিয়ে অবহিত করেণনি।
ভারত আক্রমনের পর কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায় যুদ্ধকে আরো দীর্ঘায়িত করা যা সে বিষয়ে তাদের কোন পরিকল্পনা ছিলনা। প্রতিবেদনে ১৬ ডিসেম্বর আতসমপর্নের ঘটনা পাকস্তিানের সেনাবহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে  আখ্যায়িত করা হয়েছে । যুদ্ধাপরাধের সাথে লিপ্ত হবার দায়ে অভিযুক্ত করে জেনারেল নিযাজীসহ সকল উচ্চ পদস্থ সেনাকর্মকতাদের কোর্ট মার্শাল এবং  অনেকের প্রকাশ্য বিচারের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এছাড়া যুদ্ধের  সময় মুক্তিবাহনী এবং আওয়ামী লীগের লোকজনের বিহারীদের নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ করা,  হিন্দুদের সম্পত্তি দখল এবং জোরপূর্বক অনেককে যুদ্ধে নামতে বাধ্য করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আগস্ট সেপ্টেম্বরের দিকে যুদ্ধ অনেকটা থিতিয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এটি  পানি বন্যার সময়। এছাড়া  মুক্তিবাহনীর পে দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন ছিল। এ বিষয়টি ভারত উপলব্ধি  করে যুদ্ধ আর দীর্ঘায়িত করা উপযুক্ত হবেনা এবং পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নিতে পারে ভেবে তারা সরাসরি হস্তেেপর পরিকরল্পনা নেয় এবং  ১৯৭১ সালের আগস্টে ভারত-সোভিয়েত  চুক্তি হবার পর নভেম্বরে বাংলাদেশে সরারি আক্রমন করে ভারত।   

  
অধ্যায় ১
মদ, নারী, বাড়ি, জমি এবং দুর্ণীতি আসক্ত উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তার শুধু যে যুদ্ধের ইচ্ছাই  হারিয়ে ফেলেছিল তাই নয়  বরং এ ধরণের জটিল মুহুর্তকে মোকাবেলার জন্য যে ধরণের পেশাদারিত্ব থাকা দরকার ছিল তাও তাদের ছিলনা। প্রত্যদর্শীরা সাক্ষ্য  প্রদানকালে জোর দিয়ে বলেছেন এ ধরণের নৈতিকতা  বিরোধী জীবনে জড়িযে পড়া সেনাবাহিনীর পক্ষে বিজয় অর্জন করা সম্ভব ছিলনা।

কমিশনের সামনে উপস্থাপিত তথ্যা প্রমান বিশ্লেষন শেষে কমিমশন এই সিদ্ধান্তে  উপনীত হয়েছে যে, ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর থেকেই  উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের নৈতিক অধপতনের যাত্রা শুরু হয়। এরপর আবার ১৯৬৯ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া খঅনের সামরিক শাসন  চাপিয়ে দেয়ার ফলে অধপতনের এ মাত্রা  আরো বেগবান হয়। বিপুল সংখ্যক  উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তা শুধু  বিশাল পরিমান জমি, প্রতিপত্তি, বাড়ি দখল করেই  ান্ত হয়নি বরং তারা অনৈতিক এবং অনচারপূর্ণ জীবন যাপনের  সাথে জড়িয়ে ফেলে নিজেদের। ফলে তাদের পেশাদারিত্ব যেমন ধ্বংস হয় তেমনি ধ্বংস হয়েছে নেতৃত্বের গুনাবলী।
     মূল প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময়  লে. জেনারেল নিয়াজীসহ অন্যান্য সেনাকর্মকর্তাদের বিদ্ধুদ্ধে অভিযোগ বিষয়ে তাদের বক্তব্য নেয়ার সুযোগ ছিলনা । কারণ তখনো তারা ভারতে যুদ্ধথবন্দী  হিসেবে বন্দী ছিলেন। ভারত থেতে ফেরত আসার পর আমরা নিয়াজীসহ অন্যদেরাছে এ বিষয়ে জবাব তলব করি।

সামরিক  শাসনের প্রভাব:
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সামরিক অভিযানের ফলে বেসরমারিক শাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানের বেসরমারিক শাসনের বোঝা অর্পিত হয় সেনা বাহিনীর ওপর। প্রধান সচিব, আইজিপিসহ আরো বেশ কিছু বেসামরিক কর্মকর্তাদের পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিসন্তানে পাঠানো সত্ত্বেও বেসরমারিক শাসনের ওপর সামরিক কর্তৃত্ব বাড়তেই থাকে।
আইজিপি এম এ কে চৌধুরী’র (স্বাী নম্বর ২১৯) মতে মার্চের পর পূর্ব পাকিস্তানে আইন শৃঙ্খলাসহ যাবতীয় বিষয় চলে যায় সামিরক আইন কর্তৃপ লে. জেনারেল নিয়াজীর নিয়ন্ত্রনে। এমনকি একটি কনফারেন্সে পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেলকেও আসতে অনুমিত দেয়নি সামরিক আইন কর্তৃপ। বেসামরিক প্রশাসন সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। বাঙ্গালী অফিসারদের নির্বিচারে গ্রেফতার করা হয় তাদের ওপর অবিশ্বাসজনিত কারণে। এমনিক তাদের গ্রেফতারের আগে গর্ভনেরর বা  তাদের উপরস্থ অফিসারদের অনুমতিও  নেয়া হতনা।

ড.  এম এ মালেকের নেতৃত্বে একটি  পূর্ণ মন্ত্রীসভা গঠন করেও বেসামরিক প্রশাসন কার্যকর করা যায়নি।  জেনারেল নিয়াজীর বেসামরিক প্রশাসনের প্রতি কোন শ্রদ্ধা ছিলনা এবং  সামরিক মতার অপব্যবহারের রাজনৈনিত পরিণতি কি হতে পারে সে সম্পর্কেও তার কোন ধারণা ছিলনা।
  বেসামরিক প্রশাসনের ওপর তখন সামরিক কর্তৃত্বের মাত্রা বোঝা যায় ঢাকার  অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার মোহাম্মদ আশরাফের (স্বাী নম্বর ২৭৫) স্ব্যা থেকে। তিনি বলেন, “নতুন মন্ত্রী সভার প্রথম বৈঠকে দেখলাম গভর্নরের পাশে খুব আড়ম্বরের সাথে বসে আছেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। যদিও তিনি মন্ত্রী সভার কোন সদস্য নন।”
এভাবে  পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক কর্তৃত্ব সম্পূর্ণরুপে সামরিক কর্মকর্তাদের হাতে চলে যাওয়া এখানে একটি চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। যুদ্ধরত একটি সামরিক বাহিনী যখন  বেসামরিক কাজে জড়িয়ে  পড়ে তখন তাদের  পেশাদাত্বি  থাকবেনা এটিই স্বাভাবিক। তারা লিপ্ত হয় নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে।


পূর্ব পাকিস্তানে ২০৩ (এ) ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার সলিমুল্লার স্ব্যা অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরে সামরিক বাহিনী বেসামরিক কাজে জড়িত থাকার ফলে তারা পেশাদারিত্ব হারিয়ে ফেলে। পূর্ব পাকিস্তান নৌবাহিনীর ফাগ কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল শরীফের (স্বাী নম্বর ২৮৩) মতে “ ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার বীজ বপিত হয়। রাজনীতির পাঠ রপ্ত করতে গিয়ে তারা তখন সৈনিকের প্রাথমিক পাঠ ভুলে যায়।”  কমিশনের সামনে স্বাী প্রদানকালে একই মত ব্যক্ত করেছেন কমোডোর মালিক, ব্রিগেডিয়ার কাশিম, কর্নেল মনসুরুল মালিক, কর্ণেল ইজাজ আহমেদ  প্রমুখ। সামরিক আইন জারির দায়িত্ব পালন এবং বেসামরিক প্রশাসন চালাতে গিয়ে তারা যেমন দুণীতিতে জড়িয়ে পড়ে তেমনি হারিয়ে ফেলে পেশাদারিত্ব।
আওয়ামী বিদ্রোহীদের  মোকাবেলায় ২৫ মার্চ রাতে সেনাবাহিনী সারা প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট ছাড়াই। ফলে  প্রাথমিক অবস্থায় খাদ্য সামগ্রীসহ অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সাধারণ মানুষের দোকন পাট এবং বাড়িঘর লুটপাট করে সংগ্রহ করতে থাকে তারা।  পরবর্তীতে এটি তাদের একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। পরে যখন  লজিস্টিক সাপোটের আয়োজন সম্ভব ছিল তখনো তারা এভাবে জিনিসপত্র সংহ্রহ করত।   সাধারণ মানুষের  দোকান থেকে তেল এবং অন্যান্য খাদ্য সমাগ্রী  লুটপাটের সময় সেনাবহিনী তার কোন রেকর্ড রাখেনি ।  পরিসিস্থতি সাভাবিক হলে তাদের তিপুরণ প্রদানের কোন চিন্তা এবং পরিকল্পনা ছাড়াই এসব লুটপাট করা হয়।  জিনিসপত্র সংগ্রহের কোন নীতিমালা এবং নিয়মনীতি এবং রেকর্ড না রাখার কারণে অফিসার থেকে শুরু করে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যেও এ লুটপাটের প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে। তারা  ঢালাওভাবে  ইচ্ছামত এসব অপকর্ম করতে থাকে।  শেষ পর্যন্ত এটি একটি গণলুটপাটে পরিণত হল। যুদ্ধের  প্রয়োজন ছাড়াও অফিসারা   ব্যক্তিগত স্বার্থে  দামী জিনিসপত্রও লুটপাট শুরু করে।

 যুদ্ধের শুরুতে উর্ধ্বতন সেনা  অফিসারদের সম্মতি ছিল এ লুটপাটে। লে. জেনারেল নিয়াজী টিক্কা খানের কাছ থেকে দায়িত্ব নিয়ে প্রথম দিনই তিনি মন্তব্য করলেন, “র‌্যশন সঙ্কটের একি অভিযোগ আমি শুনছি?      পূর্ব পাকিস্তানে কি কোন গরু ছাগল নেই? যার  যা দরকার  যেমন করে পার নিয়ে নাও । বার্মায় তো আমরা এটিই করেছি।” নিয়াজী কমিশনের কাছে স্ব্যা প্রদানের সময় এ জাতীয়  কথা অস্বীকার করেণ। তবে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী এটি প্রমানসহ উপস্থিত করেছেন। এছাড়া অন্যান্য অফিসাররাও এ বিষয়ে নিয়াজীর বিরুদ্ধে স্ব্যা দিয়েছেন। লে. কর্ণেল বুখারী বলেছেন, তাদেরকে এমনকি লিখিত অনুমতি  দেয়া হয়েছে এ বিষয়ে।


অবশ্য পরবর্তীতে এভাবে লুটপাটের বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং ব্যারাকে  অভিযান চালিয়ে সেনা অফিসারদের  কর্তৃক লুটকৃত জিনিপত্র উদ্ধারও করা হয়। উদ্ধারকৃত এসব জিনিসপত্রের মধ্যে স্বর্ণ, ঘড়ি, এসি, টিভি, টাইপরাইটারসও আরো বিভিন্ন জিনিসপত্র ছিল।  অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ বব্যবস্থা গ্রহণেরও উদ্যোগ নেয়া হয কিন্তু তা আর শেষ করা যায়নি পরাজয় ঘনিয়ে আসার কারণে।

 লে. জেনারেল নিয়াজী:   পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পর  নিয়াজীকে প্রথমে শিয়ালকোটের জিওসি  পরে, পরে লাহোরের জিওসি এবং সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করায় হয়। এ দুই প্রদেশে দায়িত্ব পালনকালে সে অর্থ, জমি দখল  এবং নারী সম্ভোগে জড়িয়ে   পড়ে। লাহোর গুলবাগে  সাঈদা বুখারী নামে এক মহিলার  সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সাঈদা ‘সিনোরিটা হোম’ নামে একটি পতিতালয় চালাত। এ মহিলা অন্যান্য সেনাকর্মকর্তাদের সাথেও  যোগাযোগ রাখত দালাল হিসেবে।   নিয়াজী শিয়ালকোটে থাকা  অবস্থায় শামিনী ফেরদৌস নামে আরেক মহিলার  কাছে যাতায়াত করত। সেও সাঈদার মতই একজন  পতিতালয় পরিচালনাকারী । পূর্ব পাকিস্তানে দায়িত্ব লাভের পর নিয়াজীর এ কুখ্যাতি ব্যাপক আকার  ধারণ করে। এমনকি রাতে সে যেসব জায়গায় যাতায়াত করত সেই একই স্থানে যাতায়াত করত তারই অধীনস্ত  জুনিয়র সেনা কর্মকর্তারা। স্বাী  আব্দুল কাইউম আরিফ, মনোয়ার হোসেন, আব্দুল হাফিজ, মেজর সাজ্জাদুল হক, স্কোয়াড্রন লিডার ওয়াহিদ, লে. কর্ণেল হালিজ আহমেদসহ আরো অনেকে তার বিরুদ্ধে এ স্ব্যা দিয়েছে। অবাধ যৌন  সম্ভোগে জড়িয়ে পড়া ছাড়াও সে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে প্যান চোরাচালন করত। এজন্য সে পাকিস্তান এয়ারলাইন্স ব্যবহার করত। 

নিয়াজীর বিরুদ্ধে অবধা যৌনাচারের এমনসব ভয়ঙ্কর অভিযোগ কমিশনের সামনে পেশ  করা হল যা বর্ণনাতীত। শুধু মাত্র কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার একটি  মন্তব্য তুলে ধরতে চাই এখানে। লে. কর্ণেল মনসুরুল হক,   নেভী কমান্ডার এ এ খান,  ব্রিগেডিয়ার আই আর শরীফ,  কমান্ডার মোহাম্মদ আশরাফ, লে. কর্ণেল আজিজ আহমেদ খান বলেন, “সৈনিকরা বলত নিয়াজী নিজেই যখন একজন ধর্ষক তখন সাধারণ সৈনিকদের থামাবেন কি করে?”  শিয়াল কোট এবং লাহোরেও তার   সম্পর্কে এ কথা প্রচলিত ছিল।

 মেজর জেনারেল কাজী আব্দুল মজিদ খান এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীও নিয়াজীর বিরুদ্ধে প্যান রপ্তানীর অভিযোগ করেছেন। মেজর জেনারেল আব্দুল মজিদের মতে ব্রিগেডিয়ার আসলাম নিয়াজী এবং সিনিয়র পুলিশ সুপার  দিলজান ঢাকায় নিয়াজীর সাথে  ফাগ স্টাফ হাউজে বাস করত। তারা নিয়াজীকে প্যান রপ্তানীতে সহায়তা করত।  মেজর এস এস হায়দার এবং ব্রিগেডিয়ার আতা মোম্মদের মতে নিয়াজীর এক পুত্র এমনকি ইন্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ বাকির সিদ্দিীকও নিয়াজীর প্যান রপ্তানীর দোসর ছিলেন। রাও ফরমান আলী বলেছেন, “প্যান রপ্তানীতে সাহায্য না করায় নিয়াজী আমার ওপর ুব্ধ ছিলেন। পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের ব্রিগেডিয়ার হামিদউদ্দীন আমার কাছে অভিযোগ করেছিলেন  প্যান রপ্তানীর জন্য বিমানের  অবৈধ ব্যবহার বিষয়ে।”
যৌনতাসহ এসব বিষয়ে  জেনারেল নিয়াজীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি  অস্বীকার করে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে দাযিত্ব পালনকালে আমি ধর্মের প্রতি অনেক বেশি অনুরক্ত হয়ে পড়ি যা আগে ছিলামনা।” প্যান রপ্তানীর কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, বরং ব্রিগেডিয়ার হামিদ উদ্দীন এবং এয়ার লাইন্সের অন্যান্য কর্মকর্তারা এ কাজে জড়িত ছিল।   
সামরিক ও বেসামরিক  মহল থেকে নিয়াজীর বিরুদ্ধে যে পরিমান অভিযোগ এসেছে তাতে কমশিন এসব অভিযোগ সত্য বলে মনে করে। তবে সরকার চাইলে এ বিষয়ে আরো তদন্ত করতে পারে। এ নিয়ে  আরো গভীরে যাওয়া কমিশনের কাজ নয়।

মেজর জেনারেল জমশদে:
মেজর জেনারেল জমশেদের স্ত্রী ১৬ ডিসেম্বর সকালে পাকিস্তান ফেরার পথে   সোনা নিয়ে আসেন সাথে করে। জমেশেদের বিরুদ্ধে অর্থ লুটপাটেরও  অভিযোগ করেছেন কর্ণেল বশির, কণেল রশিদসহ অনেকে। ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর হেলিকপ্টারযোগে আসা কয়েকজন সেনা অফিসারদের মধ্যে তিনি অর্থ বিতরণও করেছেন।

এছাড়া ব্রিগেডিয়ার জেহানজেব আরবাব, লে. কর্ণেল মুজাফফর আলী খান, লে. কর্ণেল বাশারাত, লে. কর্ণেল তাজ, লে. কর্ণেল তোফায়ে, মেজর মাদাদ হোসেনসহ আরো অনেকের  বিরুদ্ধে আর্থিক  লুটপাটের অভিযোগ করেছেন মেজর জেনারেল নজর শাহ, মেজর জেনারেল আনসারী, ব্রিগেডিয়ার বাকির। এসব কর্মকর্তা এবং তাদের ইউনিট ব্যাপক আর্থিক লুটপাটের সাথে জড়িত ছিল। সিরাজগঞ্জের ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ১ কোটি ৩৫ লাখ রুপী   লুট করা হয় মেজর মাদাদের নেতৃত্বে।

আওয়ামী লীগের  বিরুদ্ধে বর্বরতার অভিযোগ:
বিহারীসহ যেসব পাশ্চিম পাকিস্তানী  লোকজন ফেরত আসতে পেরেছে তারা আওয়ামী বাহিনীর বর্বরতার  বিষয়ে স্ব্যা দিয়েছে। সাংবাদিক কুতুব উদ্দীন আজিজ তার “ব্লাড এন্ড টিয়ারস” বইয়ে বিহারীদের নির্মম নিয়াতনের বিবরণ দিয়েছেন। তার বইয়ে এক থেকে ৫ লাখ বিহারী নিহত হবার কথা উল্লেখ আছে। এছড়া  আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিবাহিণীর বিরুদ্ধেও লুটপাট এবং ধর্ষনের  অভিযোগ রয়েছে ।


পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ:
ক. ১৯৭১ সালের ২৫ এবং ২৬ মার্চ মাত্রক্তরিক্ত সৈন্য এবং অস্ত্রের ব্যবহার
খ. দেশের অভ্যন্তরে নির্বিচারে বর্বর হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ পরিচালনা করা। যুদ্ধের শুরুতে এবং শেষ দিকে বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিকদের হত্যা করা এবং গণকবর দেয়া।
গ. নিরস্ত্রীকরণ অথবা বিদ্রোহ দমনের নামে ইস্ট বেঙ্গল  রেজিমেন্ট, ইস্ট  পাকিস্তান রাইফেলস ইস্ট পাকিস্তান পুলিশের বাঙ্গালী অফিসারদের হত্যা।
ঘ. ব্যাবসায়ী, বেসামরিক নাগরিক, শিল্পপতিদের হত্যা,  বাড়ি থেকে নিখোঁহ হয়ে যাওয়া
ঙ. প্রতিশোধ এবং  নির্যাতনের  অংশ হিসেবে পূব পাকিস্তানের নারীদের নির্বিচারে ধর্ষন।
চ. পরিকল্পিতভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের হত্যা করা।

লে. জেনারেল নিয়াজী এসবের জন্য তার পূর্ববর্তী কমান্ডার লে. জেনারেল  টিক্কা খানকে দায়ী করেছেন। তার মতে “সেনাবাহিনীর বাড়াবাড়ির ফলে মানুষ আর্মির বিরুদ্ধে ভীষনভাবে েেপ গিয়েছিল।  ২৫ মার্চ রাতের ঘটনাসহ শুরুে দিকে সেনাবাহিনীর বর্বরতার ফলে  যে তি হয়েছে তা আর  পূরণ করা সম্ভব হয়নি।  সামরিক শাসক ‘চেঙ্গিস খান’ এবং  ‘কসাই’ উপাধি লাভ করে পূর্ব পাকিস্তানে।

  পূর্ব পাকিস্তান গভর্ণর এর উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর মতে “ধর্ষন, লুটপাট এবং  নির্যাতন  খুবই সাধারণ বিষয়ে পরিনত হল। এসবের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ এবং জনগণের  মন জয় করার বিষয়ে আমি একটি নির্দেশিকা তৈরি করলাম। জেনারেল টিক্কা খানের স্বারিত এ নির্দেশিকা ইস্টার্ন কমান্ডের কাছে পাঠানো হল। কিন্তু তার এ নির্দেশ অগ্রাহ্য করা হল। সামরিক বাহনীর বাড়াবাড়ি এবং নির্যাতনকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেয়া হল।”
 ব্রিগেডিয়ার তাসকীনুদ্দীনের মতে “ অনেক জুনিয়র অফিসার নিজ হাতে আইন তুলে নিলেন। প্রকাশ্য জনসম্মুখে  তারা  মানুষকে  জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করত। পাকিস্তান  সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ল। সেপ্টে¤র অক্টোবরে ধুমঘাটে অফিসাররা   বাংলাদেশীদের প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করত।
  মেজর জেনারেল নজর শাহ, ব্রিগেডিয়ার আব্দুল কাদির খান  কমিশনকে বলেছেন,  বাঙ্গালীদের বিনা বিচারে হত্যা করা হত। মানুষকে তুলে  এনে হত্যা করা হত। লে. কর্ণেল বোখারি বলেছেন, রংপুরে একটি ঘটনায় ২ জন বাঙ্গালী অফিসার এবং ৩০ জন সাধারণ মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হল। অন্যান্য স্টেশনেও এ জাতীয় ঘটনা ঘটতে পারে। লে. কর্ণেল নাঈম বলেছেন, ২৫ মার্চ রাতে সাধারণ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং এতে জনগণ  সেনাবাহিনীর প্রতি সম্পূণ বিরুপ হয়ে পড়ে।

লে. কর্ণেল মনসুরুল হক কমিশনকে বলেন, “উর্ধ্বতন কর্তপেরে অনুমতি ছাড়াই মুক্তিবাহনী বা আওয়ামী লীগের কর্মী ধরা পড়লে বিনা বিচারে হত্যা করা হত। নির্বিচার হত্যা এবং লুটপাট পাকিস্তানের শত্র“র সংখ্যাই কেবল বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে নিরব যে জনসধারণ ছিল তাদের সমর্থনও হারায় পাকিস্তান।”  বর্বরতার একটি উদাহরণ  দিয়ে তিনি বলেন, “২৭ এবং ২৮ মার্চ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ফিল্ড রেজিমেন্ট লে. জেনারেল ইয়াকুব মালিকের ্একটি মাত্র অঙ্গুলি নির্দেশে ১৭ জন বাঙ্গালী অফিসার এবং ৯১৫ জন সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হল। জেনারেলসহ সাধারণ সৈনিকদের মধ্যেও বাঙ্গালীদের সম্পর্কে প্রচন্ড ঘৃনা কাজ করত। হিন্দুদের নির্মুলের জন্য মৌখিক নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

সেনাবহিনী যখন দেশের অভ্যন্তরে  অগ্রসর হল তখন অতি নির্মমভাবে শরহ বন্দর গ্রাম জালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করতে করতে অগ্রসর হল। ঢাকার অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার মোহাম্মদ আশরাফ কমিশনে স্ব্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, সামরিক অভিযানের ফলে বাঙ্গালীরা নিজ দেশেই পরবাসী হয়ে গেল। সকলেরই  জীবন, সম্মান, সম্পদ অনিরাপদ হয়ে পড়ল-তা সে যত বড় সম্মানীত ব্যক্তিই হোক  না কেন। পূর্ব পাকিস্তানে আইনের শাসন বলতে তখন কিছু ছিলনা। মানুষকে ঘর থেকে তুলে  আনা হত সন্দেহবশত হত্যা এবং নির্যাতন করা হত। সেনাবাহিনীর তালিকায় কারোর নাম উঠলে তার আর রার কোন উপায় ছিলনা। সেনা গোয়েন্দায় যারা কাজ করত তারা এখানকার ভাষা, সংস্কৃতি এবং বাঙ্গালীদের আবেগ অনুভূতি সম্পর্কে সম্পূণ অজ্ঞ ছিল। 
ব্রিগেডিয়ার ইকবালুর রহিম অভিযোগ কর বলেন, “জেনারেল গুল হাসান তার অধীনস্ত সৈনিকদের বলত “আজ তুমি কতজন বাঙ্গালী হত্যা করলে ?”
লে. কর্ণেল আজিজ স্বাী দিতে গিয়ে বলেন, “ব্রিগেডিয়ার আরবাব আমাকে জয়দেবপুরের সব ঘরবাড়ি ধ্বংস করতে বললেন। আমি এ নির্দেশ পালন করেছি। জেনারেল নিয়াজী আমার ঠাকুরগাও এবং বগুড়া ইউনিট পরিদর্শন করেছেন। সে আমাদের জিজ্ঞেস করল তোমরা কতজন হিন্দু হত্যা করেছ।  হিন্দুদের হত্যার বিষয়ে মে মাসে আমাদের লিখিত নিদের্শ দেয়া হয়।

 বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ :

মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর মতে “ডিসেম্বরের ৯ অথবা ১০ তারিখ  পূর্ব পাকিস্তানের উপ  সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জমশেদ আলী আমাকে  পিলখানা হেডকোয়ার্টারে  ডেকে পাঠালেন। আমি  পিলখানায় গিয়ে দেখতে পেলাম বেশ কিছু গাড়ি সেখানে পার্ক করা আছে।   মেজর জেনারেল জমশেদ আলী একটি গাড়িতে উঠছেন। আমাকে তার সাথে  যাওয়ার জন্য বললেন। আমি গাড়িতে উঠলাম। তিনি লে. জেনারেল নিয়াজীর কাছে যাচ্ছেন। পথে যেতে যেতে আমাকে জানালেন  নির্দিষ্ট কিছু  লোকজনকে গ্রেফতারের  পরিকল্পনা করেছেন তারা। বিষয়টি নিয়ে  নিয়াজির সাথে আলোচনা করতে হবে।  আমি তাকে একাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিলাম। নিয়াজির কাছে যাবার পরও আমি তাকে এ বিষয়ে বারণ করলাম। নিয়াজী চুপ করে রইলেন। জমশেদও কোন কথা বললেননা। এর পর আমি  হেডকোয়ার্টার থেকে চলে আসার পর কি পদপে তারা নিয়েছিল তা আর  জানতে পারিনি। তবে এ বিষয়ে  আর কোন পদপে নেয়া হয়নি বলে আমি মনে করি।”

 এ বিষয়ে নিয়াজীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি বলেন, কমান্ডাররা তার কাছে দু®কৃতিকারী, মুক্তিবাহিনীর প্রধানদের একটি তালিকা সরবরাহ করেছিল। কিন্তু কোন  বুদ্ধিজীবীর কোন তালিকা তিনি সংগ্রহ করেণনি এবং কোন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা বা গ্রেফতারেরও কোন হুকুম দেননি কাউকে।
  মেজর জেনারেল জমশেদ অবশ্য এ বিষয়ে  ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ঢাকায় একটি গণঅভ্যুত্থানের আশঙ্কা করছিলেন জেনারেল নিয়াজী। সেজন্য তিনি ডিসেম্বরের ৯ এবং ১০  তারিখ আমাকে বুদ্ধিজীবীদের তালিকা থেকে কাউকে গ্রেফতার করার দরকার আছে কিনা তার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বলেন। বিভিন্ন  আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সামরিক কর্তৃপ  এবং গোয়েন্দা সংস্থার কাছে  আগে থেকেই তাদের তালিকা ছিল।  ডিসেম্বরের ৯ এবং ১০ তারিখ ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি কনফারেন্সে এ তালিকা সরবরাহ করা হয় এবং তালিকায় দুই থেকে তিন হাজার লোকের নাম ছিল। আটকের জন্যই এদের তালিকা করা হয়েছিল।  কিন্তু  ভারতের আক্রমন  এবং ঢাকার তখনকার পরিস্থিতিতে  এ বিষয়ে আর অগ্রসর হওয়ার কোন সুযোগ পায়নি সামরিক কর্তৃপ এবং বিষয়টি পরিত্যক্ত ঘোষনা করা হয়।

    বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগের সাথে সরাসরি জড়িত  এই তিন কর্মকর্তার স্বা্েযর ভিত্তিতে কমিশন এটা মনে করে যে,  ভারতের  সাথে  যুদ্ধের  শেষ পর্যায়ে পাকিস্তান আর্মি যখন  বিপর্যস্ত এবং আত্মসমর্পনের   প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন তাদের পে  এ ধরণের একটি   অপারেশন পরিচালনা করার পে প্রতিষ্ঠিত কোন তথ্য প্রমান আমাদের নেই। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের  বুদ্ধিজীবীদের  গ্রেফতার  বা হত্যা  করেছে এ মর্মে বাংলাদেশ সরকারের কাছে  যদি কোন তথ্য  প্রমান থাকে এবং তারা যদি তা সরবরাহ না করে  তাহলে পাকিস্তান  সেনাবহিনীর  বিরুদ্ধে  বুদ্ধিজীবী  হত্যার  এই অভিযোগ যেরকর্ডভুক্ত করা  কমিশন সঠিক  মনে করেনা।  তবে পাকিস্তান  আর্মির  কমকর্তারা এটা আশঙ্কা  করেছিলেন যে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সেখানে ভারতীয়  আর্মির  সহায়তায়  আওয়ামী লীগ   এবং মুক্তিবাহিনী একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটবার চেষ্টা করছিল। সেজন্য আওয়ামী লীগ  এবং  মুক্তিবাহিনীর নেতাদের  গ্রেফতারের বিষয়েও  আলোচনা হয়েছে। কিন্তু  সেসময়ে বিদ্যামন পরিস্থিতি সেটি আর বাস্তবায়ন  সম্ভব হয়নি।

  নির¯ী¿করনের সময় বাঙ্গালী অফিসার এবং সৈনিক নিধনের অভিযোগ:

৫৩ ফিল্ড রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্ণেল ইয়াকুবের বিরুদ্ধে  অভিযোগ  তিনি ১৯৭১ সালে  মার্চ মাসে  কুমিল্লা  ক্যান্টনমেন্টে   নিরস্ত্রীকরণ  অভিযানের সময় ১৭ জন বাঙ্গালী অফিসার এবং আরো ৯১৫ জন সৈনিক হত্যা করেণ। এ  বিষয়ে তার কাছে কৈফিয়ত তলব করা হলে তিনি যথারীতি তা অস্বীকার  করেন। একই অভিযোগ রয়েছে  রংপুর সেনাক্যাম্পেও। সেখানকার কমান্ডিং অফিসর ব্রিগেডিয়ার সগিরও  তার বিরুদ্ধে বাঙ্গালী অফিসার এবং সৈনিক নিধন অভিযোগ অস্বীকার করেণ।  তারা দুজনেই পাকিস্তান আর্মিরও য়তির  বিষয়ে উল্লেখ করেণ অভিযান পরিচালনার সময়। কমিশন মনে করে এ বিষয়ে পাকিস্তান আর্মির  আরো গভীরভাবে বিষয়টি তদন্ত  করা দরকার।

৩০ লাখ বাঙ্গালী  হত্যা এবং ২ লাখ ধর্ষনের অভিযোগ বিষয়ে:
বাংলাদেশের প থেকে পাকিস্তান আর্মির বিরুদ্ধে যে ত্রিশ লাখ মানুষ হত্যা এবং ২ লাখ নারী র্ধর্ষনের অভিযোগ করা হয়  কমিশন এটিকে নিছক বাড়াবাড়ি, কল্পকাহিনী ছাড়া আর কিছু মনে করেনা। আর্মি হেডকোয়াটার্র থেকে ২৬ হাজার মানুষ হত্যার তথ্য  সরবরাহ করা হয়েছে কমিশনের কাছে। এ তথ্য সঠিক মনে করে কমিশন।  আর্মি হেডকোয়ার্টারে পূর্ব পাকিস্তান থেকে  নিয়মিত যে প্রতিবেদন পাঠানো হত তার ভিত্তিতে এ সংখ্যা নির্ধারিত  হয়েছে।  কমিশন মনে করে বিশ্ব সম্প্রদায়ের  সহানুভূতি পাবার জন্য ঢাকা ৩০ লাখ  হত্যার গল্প প্রচার করছে ।  কমিশন এও মনে করে  পাকিস্তান সেনাবাহিনী যেমন  অপরাধ করেছে পূর্বপাকিস্তানে  তেমনি আওয়ামী লীগ, মুক্তি বাহিনী এবং ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীরাও  পূর্বপাকিস্তানে অনেক  হত্যা, ধর্ষন, লুটাপাট  এবং অপরাধমূলক কার্মকান্ডের সাথে জড়িত ।

১৯৫ যুদ্ধাপরাধী প্রসঙ্গে
ঢাকা কর্তৃপ পাকিস্তানী ১৯৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে  তালিকাভুক্ত করেছে। তিন বছর থেকে ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের নাম বিশ্ব শুনে আসছে। তবে সে তালিকা কমিশন পায়নি। তাই  এ বিষয়ে কমিশন তাদের অভিযুক্ত করে  কোন সিদ্ধান্ত নিতে  চায়না। তবে কমিশনের কাছে যেসব তথ্য আছে তাতে পাকিস্তানে ২৫ মার্চ অপারেশন এবং পরবর্তীতে যুদ্ধের সময় যেসব  নিষ্ঠুরতা চালানো হয়েছে তার জন্য জেনারেল ইয়াহিয়া খান, মেজর জেনারেল পীরজাদা, মেজর জেনারেল উমর, লে. জেনারেল মিঠঠাকে দায়ী মনে করে কমিশন। ২৫ মার্চ অপারেশন পরিকল্পনায় মিঠঠা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে কমিশনের কাছে প্রমান   আছে। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সাথে অন্যান্য উল্লিখিত সেনা কর্মকর্তারা সরাসরিজ জড়িত অপারেশন পরিকল্পনায়।  ২৫ মার্চের  দুর্ভাগ্যজনক অপারেশনের তারিখ ঠিক  করে জেনারেল ইয়াহিয়া গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেণ। জেনারেল মিঠঠা সেখানে রয়ে যান অপারেশন পরিচালনার  জন্য। এছাড়া মেজর জেনারেল টিক্কা খান, মেজার জেনারেল রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল খাদিম হোসেনও এ অপারেশন পরিকল্পনার সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন।

৭ মার্চ লে. জেনারেল ইয়াকুব খানের কাছ থেকে লে জেনারেল টিক্কা খান দায়িত্ব বুঝে নেন এবং ২৫ মার্চের এ   অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব তার ওপর  অর্পিত হয়। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তানের কমান্ডার  এবং সামরিক  আইন প্রশাসক ছিলেন। ৭  এপ্রিল টিক্কা খানের কাছ থেকে এ দায়িত্ব  অর্পিত হয় লে. জেনারেল নিয়াজীর ওপর।
এটা ঠিক যে জেনারেল টিক্কা খান বাড়াবাড়ি, হত্যা,  ধর্ষন বেং জ্বালাও পোড়াওয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি  এসব অপারাধের  জন্য দায়ীদের  শাস্তির  আওতায় আনার জন্য  কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছেলেন । কিন্তু  পরবর্তীতে জেনারেল নিয়াজির কাজকর্ম এবং  সেনা অফিসারদের সাথে  তার কথাবার্তা  ধর্ষন এবং হত্যায় উৎসাহ যুগিয়েছে বলে কমিশনের কাছে প্রমান আছে।
সুতরাং যুদ্ধের সময় যেসব বাড়াবিড়র অভিযোগ পাওয়া গেছে তার জন্য সরাসরি এসব কর্মকর্তা দায়ী। এসব   সেনা কর্মকর্তারা শুধু সামরিক আইনেই অপরাধী নয় বরং সাধারণ ফৌজদারি অপরাধেও তারা অভিযুক্ত। পাকিস্তান সেনা আইনে যে সব অপরাধের জন্য  শাস্তির বিধান আছে তার আওতায়ও এসব অপরাধের জন্য তাদের  শাস্তি দেয়া যেতে পারে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায়:
পূর্ব পাকিস্তানে দায়িত্বরত সেনা কর্মকর্তারা  দায়িত্বপালনে ইচ্ছকৃতভাবে যে অবহেলা উদাসীনতা এবং অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে,   সাহসিকতার সাথে শত্র“র মোকাবেলা না করে শারিরীক ও মানসিক দেউলিয়াপনার শীকার হয়ে যে কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছে এবং সর্বোপরি আত্ম সমর্পনের কোন পরিস্থিতি না হওয়া সত্ত্বেও  এবং যুদ্ধের সমস্ত রশদ, পর্যাপ্ত সৈন্য সংখ্যা থাকা সত্ব্ওে  ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমপর্নের মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইতিহাসে যে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করেছেন তার জন্য দায়ীদের অবশ্যই বিচার করা উচিত। তাদেরকে শুধুমাত্র বরখাস্ত করলে চলবেনা।  সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব  শৃঙ্খলা এবং ভবিষ্যতের এ জাতীয় কোন ঘটনার পুনরাবৃত্তিরোধে তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত বলে কমিশন মনে করে। 


কমিশনের  বিশ্লেষন মতে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমপর্ণের মত কোন পরিস্থিতি ছিলনা। আরো কমপে ১৫ দিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মত সমস্ত আয়োজন ছিল। এবং যুদ্ধকে র্দীঘসুত্র করতে পারলে ফলাফল অন্য রকম হতে পারত। কিন্তু  ভারতের আক্রমনের মুখে করণীয় নির্ধারণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন সেনা কর্মকর্তারা । তাছাড়া লে. জেনারেল নিয়াজী আত্মসমপর্ন, অস্ত্র সমপর্ণের যে আনুষ্ঠানিক  আয়োজন করেছেন তা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায়।  জেনারেল অরোরাকে গর্ড অব অনার  এর আয়োজনের কোন দরকার ছিলনা।  যুদ্ধত্রে পরিত্যাগ,  যুদ্ধকালে উপরস্থ সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশ অমান্য, উদাসীনতা, কাপপুরুষতা,  দায়িত্বে অবহেলা, দুর্গ পরিত্যাগ, ঢাকাকে নিরাপত্তাহীন করা এবং দেশের অষন্ডতা রায় চূড়ান্ত অবহেলা ও তাচ্ছিল্যসহ যেসব কাজ পাকিস্তান সেনাবাহিনী করেছে তার সবিকছুর জন্যই  সেনা কর্মকর্তাদেও বিচার হওয়া উচিত এবং পাকিস্তানে সেনা আইনে  শৃঙখলা ভঙ্গের জন্য বিচারের ব্যবস্থা আছে।

যে কারণে  তাদের  বিরুদ্ধে  ব্যবস্থা নিতে  হবে :
জেনারেল নিয়াজী: পূর্ব পাকিস্তানে  ভারতীয়  আগ্রাসনের  বিষয়ে পাকিস্তান আর্মি সদরদপ্তর থেকে সমস্ত তথ্য তাকে সরবরাহ করা হয়েছে। তাছাড়া ১৯৭১ সালের  আগস্টে সোভিয়েত-ভারত চুক্তি, ভারতীয় বিমান, নৌ এবং স্থল বাহিনী  বাংলাদেশে  আগ্রাসন চালানোর সমস্ত প্রস্তুতি তখন প্রকাশ্যেই চলছিল। কিন্তু  এতসব সত্ত্বেও জেনারেল নিয়াজী ভারতের  আগ্রাসন মোকাবেলায় কোন  যুদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেণনি। সম্পূর্ণ উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছেন জেনেশুনে  ইচ্ছাকৃতভাবে। ভারতীয়  আগ্রাসন মোকাবেলায় এবং পূর্ব পাকিস্তান রায়  তাকে  সর্বাত্মক নির্দেশনা প্রদান সত্তেও তিনি সে দায়িত্ব পালন করেণনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অনেকগুলো ঘাটি পুরোপুরি অত  থাকা সত্ত্বেও তিনি ভারতের কাছে ১৬ ডিসেম্বর  আত্মসমর্পণ করেণ যদিও তখন  পর্যন্ত  আত্মসমর্পনের কোন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তাকে  আত্মসমপর্ণেও কোন নির্দেশনাও দেয়া হয়নি।

ঢাকা রায়  কোন  উন্নত  সমর পরিকল্পনা যেমন তিনি  গ্রহণ করতে পারেণনি তেমনি  একজন জেনারেলসুলভ নেতৃত্ব এবং দায়িত্বও তিনি পালন করতে পারেণনি। পাকিস্তান  সদরদপ্তর থেকে আরো  সৈন্য  সরবরাহ করার আশ্বাস দেয়া সত্ত্বেও ঢাকা রিজার্ভ সৈন্যের ৫৩ রেজিমেন্ট তিনি গুটিয়ে ফেললেন  তাড়িঘড়ি করে। নিয়াজী  উদ্দেশ্যমূলক  এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পাকিস্তান সদরপপ্তরে  পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ  পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল  তথ্য  পাঠিয়ে  বিভ্রান্ত  করেছেন। পাকিস্তান  সদরদপ্তরের  নিষেধাজ্ঞা  সত্ত্বেও অজ্ঞাত কারণে তিনি অনেক অত  যুদ্ধাস্ত্র  ভারতীয়  বাহিনীর কাছে হস্তান্তর    করেণ  আত্মসপর্ণের সময়।
জেনারেল নিয়াজীর  যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাব,   জেনারেল অরোরাকে ঢাকায় গার্ড অব অনার প্রদান এবং ভারতীয়  প্রস্তাব মত প্রকাশ্যে  আনুষ্ঠানিকভাবে   আত্ম সমর্পণে  অনুষ্ঠানে  রাজি হয়ে তিনি  পাকিস্তান সেনাবাহিনীর  ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করেছেন।
 জেনারেল নিয়য়াজীর মত পদমর্যাদার একজন সেনাকর্মকর্তা  যখন বেপরোয়া যৌন অনৈতিকতায় এবং  চোারচালানের সাথে  যুক্ত  হয় তখন তার অধীনস্তদের ওপর আর কেনা নেতৃত্ব থাকেনা এবং তাদের ওপরও  এর প্রভাব পড়ে। ভারতের  জবদলপুরে  ভারতীয় হেয়াজতে    থাকা  অবস্থায়  যুদ্ধে  পরাজয়ের বিষয়ে তিনি মিথ্যা গল্প সাজান এবং তার অধীনস্তদের সে মোতাবেক  প্রভাবিত করেণ যাতে তারা দেশে গিয়ে ভুল ব্যাখ্যা দেয়। জেনারেল নিয়াজীর অধীনস্তদের স্বা্েযর ভিত্তিতে এটা প্রমানতি হয়েছে যে কমিশনের কাছেও জেনারেল নিয়াজী মিথ্যা  স্ব্যা  দিয়েছেন সার্বিক পরিস্থিতি বিষয়ে। এসব অপরাধে  তার  বিচার হওয়া উচিত বলে মনে করে কমিশন।

মেজর জেনারেল জমশেদ, সাবেক জিওসি ৩৬ ডিভিশন, ঢাকা
মেজর জেনারেল জমশেদ তার ওপর অর্পিত  দায়িত্ব পালনে অবহেলা  এবং ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি সমস্যাদি সুষ্ঠুভাবে চিহ্নিত করে,  কি কি লজিস্টি সার্পোট দরকার সে বিষয়ে সঠিকভাবে নিয়াজীকে অবহিত করেণনি এবং উপযুক্ত কোন যুদ্ধ পরিকল্পনা প্রণয়নে তাকে সহায়তা করেণনি। কোন  চিন্তা পরিকল্পনা ছাড়া   আকস্মিকভাবে তিনি  ৯৩ ডিভিশনকে জামালপুর থেকে ঢাকায় গুটিয়ে আনেন। অথচ ঢাকার  প্রতিরার জন্য জামালপুরের এই দুর্গ খুবই কার্যকরী ছিল কৌশলগতভাবে। তিনি জামালপুর ডিভিশন প্রত্যাহার করায় শত্র“পে খুব সহজে কোন বাঁধা ছাড়া ঢাকা দখলের  সুযোগ পায়।  জেনারেল নিয়াজীর মত তিনিও  দায়িত্ব পালনে  ইচ্ছাকৃতভাবে চরম অবহেলা এবং উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছেন।  যুদ্ধ  করার মত কোন মানসিক দৃঢ়তা তাদের আদৌ ছিলনা। সম্পূর্ণ কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছেন তারা। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

মেজর জেনারেল রহিম খান, সাবেক জিওসি
তিনি চাঁদপুর ডিভিশনের দায়িত্বে ছিলেন। তিনিও সেখান থেকে তার দুর্গ গুটিয়ে এনেছিলেন  তবে এেেত্র তিনি নিয়াজিীর অনুমতি নিয়েছিলেন। এই সেনাকর্মকতা স্বেচ্ছায় কমিশনের সামনে এসে তার অবস্থানের বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তার  দায়িত্ব পালনে কোন অবহেলা ছিল কিনা সে বিষয়ে আরো তদন্ত করা দরকার। তবে নিম্নলিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তার কোর্ট মার্শাল হওয়া উচিত বলে মনে করে কমিশন। 

শত্র“পরে হুমকির কারণে তিনি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার  কারণে চাঁদপুর  থেকে ডিভিশনটি গুটিয়ে আনেন ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১। এর মাধ্যমে  নৌপথে ভারতের ঢাকা  আগ্রাসন সহজ করে দেন।  তিনি নিয়াজীর কাছে নিরাপত্তা দাবি করেছিলেন। যুদ্ধরত একজন সেনা কর্মকর্তার এ কাজ  কাপুরুষতার চরম দৃষ্টান্ত ছাড়া আর কিছূ নয়। এটি সম্পূর্ণ অসৈনিক আচরণ।
মুক্তিবাহিনী কর্তৃক হামলায় তার ডিভিশনের ১৪ জন নৌসেনা নিহত হওয়া, ভারতীয় বিমান বাহিনীর হামলার আশঙ্কার করণে তিনি সেখান থেকে ডিভিশনটি গুটিয়ে আনার জন্য পীড়াপীড়ি করছিলেন।
আতঙ্কিত এই সেনা অফিসার যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সব যন্ত্রপাতি ফেলে আকস্মিকভাবে  চাঁদপুর ক্যাম্প গুটিয়ে সেখান  থেকে এক প্রকার পলায়ন করেণ এবং তার অধীনস্ত সেনা কর্মকর্তাদের জীবনের নিরাপত্তার কথাও ভাবেননি। সেনা ক্যাম্প  গুটানোর বিষয়ে তিনি সবাইকে ঠিকমত অবহিতও  না করেই যোগাযোগের সিগনাল এবং যন্ত্রপাতি পরিত্যক্ত করেণ। ফলে  ক্যাম্পের  বাইরে অবস্থানকারী অনেক  জুৃনিয়র সেনা অফিসার সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তিনি চাঁদপুর থেকে চলে আসা বিষয়ে এবং সেখানকার বাস্তব অবস্থা  সম্পর্কে আর্মি সদরদপ্তরকে অবহিত না করে প্রকৃত সত্য গোপন রেখেছেন। ফলে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে তার ভূমিকা কি ছিল তা ভাল করে না জেনে তাকে পরবর্তীতে আবার সেনা কর্তৃপ চিফ অব জেনারেল অর্মি অফিসার করে। 

ব্রিগেডিয়ার জিএম বাকির সিদ্দিকী, সিওসি, ইস্টার্ণ কমান্ড, ঢাকা
 চিফ অব স্টাফ  জিএম বাকির ইচ্ছকৃতভাবে পাকিস্তান সদর দফতরে ভুল বার্তা পাঠিয়েছিলেন যাতে আত্মসমর্পনের অনুমতি পাওয়া যায়। দায়িত্ব পালনে কোন মেধা, দতা, দৃঢ়তার পরিচয় না দিয়ে কিভাবে যুদ্ধের  ইতিটানা যায় সে চিন্তায় তারা ছিলেন বিভোর। রাওয়ালপিন্ডিতে  একটি কনফারেন্সে ভারতীয় আগ্রাসন পরিকল্পনা বিষয়ে তাকে খুব ভাল করে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি তা জেনারেল নিয়াজিকে অবগত করেণনি। তিনিও অজ্ঞাত কারণে  আত্মসমর্পনের পর মূল্যবান যুদ্ধাস্ত্র  ভারতীয় বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এর বিনিময়ে তিনি ভারতের হাতে বন্দী থাকা অবস্থায় কোলকাতায় শপিং করতে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন হয়ত। অন্য কোন সেনা কর্মকর্তাকে এ সুযোগ দেয়া  হয়নি ভারতে। তার সাথে ভারতীয় কর্তৃপ খুবই বন্ধুসুলভ আচরণ করে বলে কমিশনের কাছে তথ্য আছে।

ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ  হায়াত
 শত্রুসেনার গৌরীপুর আক্রমন মোকাবেলায় তিনি কোন পাল্টা  আক্রমন করেণনি। ফলে সাতটি ট্যাঙ্ক ধংসসহ বিপুল য়তি হয় পাকিস্তানপওে  এবং যশোর ডিভিশন অরতি হয়ে পড়ে। শত্র“প  যাশোর  প্রতিরাব্যুহ ভেঙ্গে ফেলেছে  এমন একটি খবরের ভিত্তিতে তিনি যশোর ডিভিশন পরিত্যক্ত  ঘোষনা করেন ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।  তথ্যটি সত্য কিনা সেটি যাচাইয়েরও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেণনি তিনি।   যশোর  দুর্গের সমস্ত  অত রশদ তিনি     শত্র“পরে কাছে তুলে দেন। আর তার ইউনিটের সৈন্যরা ঐ রাতে নিজেদের মত করে কোন নির্দেশনা  ছাড়াই সারারাত যুদ্ধ পরিচালনা করেছে।
চাঁদপুর এবং ত্রিপুরার মাঝে মুজফফরগঞ্জ রার জন্য তাকে  প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান সত্ত্বেও তিনি কোন পরিকল্পনা করেণনি এটি রার। ফলে ২৩ পাঞ্জাব কন্টিনজেন্ট ১১ ডিসেম্বর ভারতীয় ইউনিটের কাছে  আত্মসমর্পনে বাধ্য হয়। তাদের কাছে খাদ্য ও গোলাগুলি ছিলনা।  কুমিল্লার লাকসাম  দুর্গ থেকে মাত্র  তিন কিলোমিটার দূরে ৪শ সৈন্য নিয়ে তিনি ভারতীয় বাহিনীর কাছে  আত্মসপর্ন করেণ। অথচ লাকসাম দুর্গে চার হাজার সৈনিক এবং অনেক যুদ্ধাস্ত্র  মজুদ ছিল। এসব যুদ্ধাস্ত্র তিনি ভারতীয় বাহিনীর হাতে তুলে দেন। দুগেরও  বাইরে তার এ আত্মসপর্নের কথা দুর্গের সৈনিকরা জানতেও পারেনি ঠিকমত।


  ব্রিগেডিয়ার  আব্দুল কাদের, ব্রিগেডিয়ার মনজুর আহমেদসা আরো অনেক সেনা কর্মকতা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ঠিকমত পালন করেণনি। 

কমিশন তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে আত্মসপর্নের কোন হুকুম নিয়াজীকে পাকিস্তান সদরদপ্তর থেকে দেয়া হয়নি। শুধু এটুকু অনুমতি দেয়া ছিল যে, যদি তিনি তার বিবেচনায় মনে করেণ  আতম্সমপর্ণের  কোন বিকল্প নেই তবেই কেবল তিনি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে  পারেন।
কমিশন উল্লেখ করেছেন মুল প্রতিবেদনে ১৯৪৭ থেকে ৭১ পর্যন্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির পোপট,  পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হওয়ার পেছনে সামরিক শাসন জারির ভূমিকা, আওয়ামী লীগ ও পিপলস পাটিরও ভূমিকা  এসব কিছুরই বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা করা হয়েছে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের প্রোপটে।


প্রকাশ্য  বিচার:
কমিশনের মতে  জেনারেল ইয়াহিয়া, জেনারেল আব্দুল হামিদ খান, লে. জেনারেল পীরজাদা, লে জেনারেল গুল হাসান এবং মেজর জেনারেল মিঠঠা খানের প্রকাশ্যে বিচার করা উচিত ১৯৭১ সালের কলঙ্কজনক অধ্যায়ের  জন্য।
   


এই সাইটের যেকোন লেখা, তথ্য উপাত্তা যেকেউ ব্যবহার, পুনমুদ্রন, পুন প্রচার, প্রকাশ করা যাবে; তবে শর্ত হল সূত্র হিসেবে Mehedy Hasan https//www.bangladeshwarcrimestrial.blogspot.com  উল্লেখ/লিঙ্ক  করতে হবে।


বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৩

আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী সহায়তায় ৭ অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ


মেহেদী হাসান
আব্দুল কাদের মোল্লা মামালায় আপিল শুনানীতে সহায়তা  এবং মতামত গ্রহনের জন্য  বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সাতজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ গতকাল বৃহষ্পতিবার  এ নিয়োগ প্রদান করেন। এরা হলেন, সাবেক বিচারপতি  টি এইচ খান, সাবেক এটর্নি জেনারেল প্রবীন আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এএফ হাসান আরিফ, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি।

আজ  সকালে আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী শুরু হলে প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বলেন, আমরা এই মামলায়  অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।  তাদের কাছ থেকে ল’পয়েন্টে মতামত গ্রহণ করা হবে।

এরপর বিকালে এটর্নি জেনারেল অফিস থেকে সাতজন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগের কথা জানানো হয়েছে।

আজ রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী পেশ করেন। ১৫ দিনের জন্য  গ্রীস্মের ছুটিতে যাবার আগে আজই  ছিল শুনানীর শেষ দিন। তবে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানী শেষ হয়নি। ছুটি শেষে আগামী সাত জুলাই পুনরায় কোর্ট বসলে এটর্নি জেনারেল তার অসমাপ্ত শুনানী পেশ করবেন। এরপর অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত আইনজীবীদের মতামত গ্রহণ করবেন আদালত।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। রায়ের  বিরুদ্ধে আসামী এবং রাষ্ট্র উভয় পক্ষ থেকে আপিল করা হয়েছে। আপিল শুনানীতে  রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের কাছ থেকে অনেক আইনগত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে । বিশেষ করে ট্রাইব্যুনালের রায় হবার পর রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের সুযোগ দিয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যে আইন সংশোধন করা হয়েছে  তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য কি-না তা নির্দিষ্ট করে জানতে  চান আদালত। গত মঙ্গল এবং বুধবার এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানী পেশ করার সময় আদালতের কাছ থেকে  এ বিষয়ে অসংখ্য প্রশ্নের মুখোমুখি হন।

ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ক্ষেত্রে পূর্বের বিধান ছিল আসামী পক্ষ সাজার  বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আসামীকে সাজা দেয়া হলে রাষ্ট্রপক্ষ আর  আপিল করতে পারবেনা। ট্রাইব্যুনালের রায়ে যদি আসামীকে  খালাস দেয়া হয় শুধুমাত্র সেক্ষেত্রে সরকার পক্ষ বা অভিযোগকারী আপিল করার সুযোগ পাবে; অন্যথায় নয়। কিন্তু আব্দুল কাদের মোল্লাকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের পর তার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলন গড়ে  ওঠে।  সে প্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইবুনালের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয় সংসদে।  সংশোধিত আইনে বলা হয় আসামী পক্ষের মত সরকার পক্ষও আপিলের সমান সুযোগ পাবে। অর্থাৎ শুধু খালাসের ক্ষেত্রে নয়, ট্রাইব্যুনালের যেকোন রায়ের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষও আপিল করতে  পারবে ।
আইনের আপিল সংক্রন্তা ধারা সংশোধনের পর সরকার পক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের দাবি জানিয়ে আপিল আবেদন করে।
গত মঙ্গল এবং বুধবারের শুনানীর সময় আদালত সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চান ১৮ ফেব্রুয়ারির সংশোধনী আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না। আদালত এ প্রশ্নের জবাব   পাবার জন্য আইনটি পাশের সময় সংসদ প্রসিডিংস   হাজির করতে বলেন রাষ্ট্রপক্ষকে। কিন্তু সংসদীয় প্রসিডিংস পর্যালোচনা করে দেখা যায় সংশোধনী আইনটি আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে  প্রযোজ্য  না চলমান অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সে বিষয়ে আইনে যেমন কোন কিছু নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি তেমনি সংসদ প্রসিডিংসেও কিছু  উল্লেখ নেই।
আদালত এটর্নি জেনারেল এর কাছ থেকে জানতে চান- উপমহাদেশ বা ইংল্যান্ডের অন্তত একটি উদাহরন পেশ করুন যেখানে  রায় হবার পর আইন সংশোধন করে রিট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট কার্যকর করার নজির আছে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ এ নজির পেশ করত ব্যর্থ হয়।
১৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধনী এই মালার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না সে বিষয়ে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গত দুই দিনে তার জবাবে বলেন- প্রযোজ্য। তিনি বলেন,  ট্রাইব্যুনাল রায় প্রদানের পর  এ বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের সমান সুযোগ দিয়ে আইনের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে এ সংশোধনী কার্যকর হবে। আপনাদের ধরে নিতে হবে এই সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর আছে। কাদের মোল্লার রায় হবার আগে থেকেই অর্থাৎ ২০০৯ সাল থেকে  রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সমান সুযোগ ছিল বলে ধরে নিতে হবে। সেখানে কবে রায় হল এবং কবে  আইন সংশোধন হল এটা অপ্রাসঙ্গিক  বিষয়। কারণ সংশোধনীতে বলা হয়েছে এ সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর।
কিন্তু আদালত এটর্নি জেনারেল এর উদ্দেশে গত বুধবার বলেন, আপনার আবেদন গ্রহণ করা হলে আমাদেরকে আইন রিরাইট করতে হবে। আইন রিসেটেল এবং রিস্টাবলিশ করতে হবে।
আদালত আরো বলেন, মনে রাখবেন আমরা আজ  এ মামলায় এখান থেকে যে ব্যাখ্যা দেব তা আইন হয়ে যাবে।  ভবিষ্যতে এর অনেক প্রভাব আছে। সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তাই যা বলার সাবধানে বলবেন। আপনি রাষ্ট্রের এটর্নি জেনারেল। একই সাথে আপনি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক।

অবশেষে আজ   আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় আপিল বিভাগ অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দিলেন আইনী বিষয়ে তাদের মতামত গ্রহনের জন্য। অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ বিষয়ে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে কোট করে বিভিন্ন অনলাইনে পরিবেশিত খবরে বলা হয়- ১৯৭৩ সালের আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের যে সুযোগ দেয়া হয়েছে তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য কি-না সে বিষয়ে এমিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করবেন আদালত।

এটর্নি জেনারেল এর কাছে দৈনিক নয়া  দিগন্ত’র পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়- নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে  যেমন আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন বিষয়ে মতামত নেয়া হবে কি-না সে বিষয়ে সকালে কোর্ট তো নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। কোর্ট বলেছেন ল’পয়েন্টে মতামত নেয়া হবে। তাহলে আপিলের ধারা  সংশোধন বিষয়ে মতামত নেয়ার যে কথা আপনি বলেছেন তার ভিত্তি কি-। তখন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম  বলেন, আমি যেটা বলেছি সেটা আমার অনুমান।   আমি এখনো নিয়োগের অর্ডার কপি পাইনি।

এদিকে আজ  বৃহষ্পতিবার শুনানীর সময় আদালত এটর্নি জেনারেল এর কাছে জানতে চান যাবজ্জীবন কারাদন্ডের মেয়াদ কত বছর ।  এটর্নি জেনারেল বলেন,  আমৃত্য। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা  তার সাথে একমত পোষন করেন।
বাংলাদেশের ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৫৭ তে বলা হয়েছে যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের আইনের ক্ষেত্রে পেনাল কোর্ড এবং সিআরপিসি প্রযোজ্য নয়। অপর দিকে ট্রাইব্যুনালের আইনে যাবজ্জীবন সাজার  মেয়াদও উল্লেখ নেই। ফলে এ নিয়ে গতকাল প্রশ্ন তোলেন আদালত।
অপরদিকে এ বিচার দেশীয় আইনে করা যাবে বলে  মত দেন আদালত।
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ গতকাল শুনানী গ্রহণ করেন।


বুধবার, ১৯ জুন, ২০১৩

কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী//এটর্নি জেনারেল এর প্রতি আদালত : আপনার আবেদন গ্রহণ করলে আইন রিরাইট করতে হবে


mehedy hasan
আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানীর সময় এটর্নি জেনারেল এর প্রতি লক্ষ্য করে আদালত বলেন, আপনার আবেদন গ্রহণ করা হলে আমাদেরকে আইন রিরাইট করতে হবে। আইন রিসেটেল এবং রিস্টাবলিশ করতে হবে।
আদালত আরো বলেন, মনে রাখবেন আমরা আজ  এ মামলায় এখান থেকে যে ব্যাখ্যা দেব তা আইন হয়ে যাবে।  ভবিষ্যতে এর অনেক প্রভাব আছে। সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তাই যা বলার সাবধানে বলবেন। আপনি রাষ্ট্রের এটর্নি জেনারেল। একই সাথে আপনি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক। সাবমিশন রাখার সময় এ বিষয় মনে রাখবেন। 

রাষ্ট্রপক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আপিল আবেদন করেছে। ট্রাইব্যুনালের সাজার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ ছিলনা পূর্বে। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন রায় প্রদানের পর শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনের দাবির ফলে   গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আইনের আপিলের ধারা সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষকেও আপিলের সুযোগ দেয়া হয়। এ সংশোধনের ফলে রাষ্ট্রপক্ষ ফাঁসির দাবিতে আবেদন করেছে । আজ বুধবার  রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল তার দাবির পক্ষে যুক্তি পেশ করার সময়  দেশের সর্বোচ্চ আপিল আদালত তাকে উদ্দেশ্য করে একথা বলেন।

গতকালের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আজ বুধবার শুনানীতে এটর্নি জেনারেল  মাহবুবে আলম  বলেন, আদালতের প্রশ্ন হল ট্রাইব্যুনাল আইনের চতুর্থ সংশোধনী কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য কি-না। এ প্রশ্নে আমার জবাব হল- প্রযোজ্য। ট্রাইব্যুনাল রায় প্রদানের পর  এ বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের সমান সুযোগ দিয়ে আইনের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে এ সংশোধনী কার্যকর হবে। আপনাদের ধরে নিতে হবে এই সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর আছে। কাদের মোল্লার রায় হবার আগে থেকেই অর্থাৎ ২০০৯ সাল থেকে  রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সমান সুযোগ ছিল বলে ধরে নিতে হবে। সেখানে কবে রায় হল এবং কবে  আইন সংশোধন হল এটা অপ্রাসঙ্গিক  বিষয়। কারণ সংশোধনীতে বলা হয়েছে এ সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর।

এটর্নি জেনারেল বলেন,  সংবিধানের ৪৭ ধারা মোতাবেক ১৯৭৩ সালের আইন সংরিক্ষত একটি আইন। এ আইনকে চ্যালেঞ্জ করা যাবেনা। সে হিসেবে আইনের চতুর্থ সংশোধনীও চ্যালেঞ্জ করা যাবেনা। তিনি বলেন, এই আইন চ্যালেঞ্জ করা যাবেনা। চ্যালেঞ্জ করলে আইনের উদ্দেশ্য ফ্রাসট্রেট হয়ে যাবে।

এটর্নি জেনারেল এর এ সাবমিশনের জবাবে আদালত বলেন, আমরা কোন আইন বা সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করছিনা। আমরা সিম্পল জানতে চাচ্ছি  ১৮ ফেব্রুয়ারি যে সংশোধনী হয়েছে তা  কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না।
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বলেন,  এই সংশোধনী বিশেষ করে এই মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না তা বলেন।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, এই সংশোধনীতেতো কোন দণ্ড দিচ্ছেন না, বরং রাষ্ট্রপক্ষকে  আপিলের পাওয়ার দিচ্ছেন।

বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা গতকালের মত আজো প্রশ্ন করেন, ভারতীয় উপমহাদেশে বা ইংল্যান্ডে যেকোন একটি সিঙ্গেল বেঞ্চ  এর একটি উদাহরন দেখান যেখানে রায় হবার পর এ ধরনের আইন সংশোধন করে রিট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট কার্যকর করা হয়েছে।
এসময় এটর্নি জেনারেল বলেন, পৃথিবীর কোথাও বাংলাদেশের মত ৩০ লাখ লোক মারা যায়নি, এত লোক ধর্মান্তরিত, দেশান্তরিত হয়নি এবং এত লোক ইজ্জত হারায়নি।
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, এরকম হলে আসামী ন্যায় বিচার পাবেননা। ইমশোনাল হবেননা।
বিচারপতি ওয়াহহাব মিয়া বলেন, ১৯৭১ সালে কি হয়েছিল তা কি আমরা জানিনা? আমরা কি বিদেশ থেকে এসেছি? আমরা যদি ইমশোনাল হয়ে যাই তাহলে কি ন্যায় বিচার হবে?
এর এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ঠিক আছে আপনি কন্টিনিউ করেন। আমরা কম ইন্টারফেয়ার করব।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, কি বলেন আপনি? আমরা কি প্রশ্ন করবনা? আমরা কি কিয়ার হবনা? মনে করেন আমরা আসামীকে ফাঁসি দিয়ে দিলাম। তাহলে এর বিরুদ্ধে আসামীর আপিলের সুযোগ কোথায়? কারণ ট্রাইব্যুানালের রায়ের বিরুদ্ধে তারা এখানে এসেছে আপিল নিয়ে। ট্রাইব্যুনালতো তাকে ফাঁসি দেয়নি। এখন আমরা ফাঁসি দিলে তারা পরে আর আপিলের সুযোগ কোথায় পাবে? আর রাষ্ট্রপক্ষেরওতো আগে আপিলের সুযোগ ছিলনা।

সাবমিশনের এক পর্যায়ে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, মাইলর্ড, আসামীর ক্ষেত্রে এখানে ইননোসেন্ট শব্দ ব্যবহার হবে কেন?
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বলেন, আমাদের এখানে তো ইননোসেন্ট হিসেবে একটা সাবমিশন আছে।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া এটর্নি জেনারেলকে বলেন, তাহলে আপনারা আপিলের বিধান না রাখলেই পারতেন। ট্রাইব্যুনালই সব, বলে দিলে পারতেন। মিস্টার এটর্নি জেনারেল, মনে রাখবেন আমাদের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রাখতে হবে। আমরা আজ এখানে যে ব্যাখ্যা দেব তাই আইন। ভবিষ্যতে এর অনেক প্রভাব থাকবে। তাই যা বলার সাবধানে বলবেন।
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এটর্নি জেনারেল এর উদ্দেশে বলেন,  আপনার আবেদন গ্রহণ করতে হলে ইউ হ্যাব টু রিরাইট দি ল’, রিসেটেল দি ল’ এন্ড  রিস্টাবলিশ দি ল’।

বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, আপনি রাষ্ট্রের একজন এটর্নি জেনারেল। সেই সাথে রাষ্ট্রের একজন নাগরিক। কাজেই সে হিসেবে সাবমিশন রাখবেন।

আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এর আগে তার সাবমিশনের বলেছিলেন,  ট্রাইব্যুনালের সাজার বিরুদ্ধে পূর্বে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ ছিলনা। কিন্তু ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধনের পর  রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের সুযোগ পেয়েছে এবং তারা মৃত্যুদন্ডের দাবি করে আবেদন করেছে। ১৮ ফ্রেবুয়ারি যদি আইনটি সংশোধন না হত তাহলে কাদের মোল্লার ফাঁসির কোন সুযোগ ছিলনা। আপিল বিভাগকে হয় ট্রাইব্যুনালের সাজা যাবজ্জীবন বহাল রাখতে হত না হয় কমাতে হত। কিন্তু যাবজ্জীবন বাড়িয়ে ফাঁসি দিতে পারতনা। ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধনের ফলে আসামীর অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।
আইন সংশোধন, আসামীর অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নিয়ে গতকাল এবং আজো বিতর্ক চলে শুনানীতে।

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে  চার নং অভিযোগ কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর হত্যাকান্ড থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। এর বিরুদ্ধেও সাজা দাবি করে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছে।  এ আপিলের সুযোগ আছে কিনা- আদালতের এ প্রশ্নের জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, সুযোগ আছে।






মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৩

ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য কি-না সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই // আইন পাশে এমপিদে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন প্রধান বিচারপতির

মেহেদী হাসান
আব্দুল কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল আইনের আপিলের ধারা সংশোধন করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রপক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চা শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আপিল আবেদন করেছে। কিন্তু আইনের সংশোধনিটি আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে  কি-না সে বিষয়ে কোথাও কোন কিছু উল্লেখ নেই।  এমনকি সংশোধনী পাশের সময় এ বিষয়ে সংসদের আলোচনায়ও কোন কিছু উল্লেখ করা হয়নি। আজ  মঙ্গলবার আপিল আবেদন শুনানীর সময় সংশোধনী আইনের এ অস্পষ্টতা নিয়ে দীর্ঘ  বিতর্ক চলে। আইনটি পাশের উদ্দেশ্য বিষয়ে সংসদের আলোচনায় এ বিষয়ে কোন কিছু না থাকায় প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

রায় হয়ে যাবার পর  আইন সংশোধন করে রিট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট কার্যকর করা বিষয়েও রাষ্ট্রপক্ষকে নজির পেশ করতে বলেন আদালত। 

ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ক্ষেত্রে পূর্বের বিধান ছিল আসামী পক্ষ সাজার  বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আসামীকে সাজা দেয়া হলে রাষ্ট্রপক্ষ আর  আপিল করতে পারবেনা। ট্রাইব্যুনালের রায়ে যদি আসামীকে পুরোপুরি খালাস দেয়া হয় শুধুমাত্র সেক্ষেত্রে সরকার পক্ষ বা অভিযোগকারী আপিল করার সুযোগ পাবে; অন্যথায় নয়। কিন্তু আব্দুল কাদের মোল্লাকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের পর তার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলন গড়ে  ওঠে।  সে প্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইবুনালের আপিল সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করা হয় সংসদে।  সংশোধিত আইনে বলা হয় আসামী পক্ষের মত সরকার পক্ষও আপিলের সমান সুযোগ পাবে। অর্থাৎ শুধু খালাসের ক্ষেত্রে নয়, ট্রাইব্যুনালের যেকোন রায়ের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষও আপিল করতে  পারবে ।
আইনের আপিল সংক্রন্তা ধারা সংশোধনের পর সরকার পক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের দাবি জানিয়ে আপিল আবেদন করে। এছাড়া  কাদের মোল্লাকে যে একটি অভিযোগ থেকে ট্রাইব্যুনাল খালাস দিয়েছে সেটিতেও সাজা দাবি করা হয়েছে সরকার পক্ষের আবেদনে।
আজ  আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায়  আপিল  আবেদন শুনানীর সময় যুক্তি পেশ করছিলেন রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এসময় আদালত তাকে প্রশ্ন করেন আপনারা যে আইনের বলে আপিল আবেদন করেছেন তা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না। কোন বিধান বলে আপনারা এই মামলার ক্ষেত্রে এ দরখাস্ত করেছেন।

তখন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জবাব দেয়ার চেষ্টা করেন  এই মামলার ক্ষেত্রে ২০১৩ সালের সংশোধনী আইন  প্রযোজ্য এবং আইনের সংশোধনীতে বলা  আছে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে এ সংশোধনী কার্যকর বলে ধরে নেয়া হবে।
এসময় আদালত জানতে চান  ১৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধনী আইন পাশ  যে আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা  কোথাও উল্লেখ আছে কি-না।  এসময় আদালত আইনটি সংশোধনের  উদ্দেশ্য পড়ে শোনাতে বলেন এটর্নি জেনারেলকে। আইন পাশের উদ্দেশ্য পড়ে শোনানো হলে তাতে দেখা যায় আইনে যেমন এ বিষয়ে কোন কিছু বলা হয়নি তেমনি সংশোধনী আইন পাশের বিষয়েও আব্দুল কাদের মোল্লার মামলা বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ নেই। তখন প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সংশোধনী পাশের সময় এর উদ্দেশ্য নিয়ে  সংসদে কি আলোচনা হয়েছিল তা আছে আপনার কাছে? সংসদে এর উদ্দেশ্য নিয়ে কোন আলোচনা হয়েছিল না শুধু হাত তুলে হ্যা জয়যুক্ত হয়েছে বলে পাশ হয়েছিল? এটর্নি জেনারেল এসময় সংশোধনী আইন পাশের সময়কার সংসদীয় প্রসিডিংস উপস্থাপন করেন আদালতে।
কিন্তু তা পর্যালোচনা করে দেখা যায় তাতেও সংশোধনীটি পাশের ক্ষেত্রে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোন কিছু উল্লেখ নেই। আব্দুল কাদের মোল্লার রায় বের হবার পর সেক্ষেত্রে  সংশোধনী প্রযোজ্য হবে কি-না সে বিষয়ে কেউ কোন আলোচনাও পেশ করেননি সংসদে। তখন এমপিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন।

এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বিলটি পাশের ক্ষেত্রে সংসদের যে প্রসিডিংস উত্থাপন করেন তাতে  দেখা যায় মো : ফজলে রাব্বি মিয়া সংশোধনী প্রস্তাব বিল আকারে সংসদে উত্থোপন করেন। হুইপ আব্দুল ওয়াহাব  এর ওপর আলোচনা করেন। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সংশোধনী গ্রহনের জন্য স্পিকারের মাধ্যমে অনুরোধ জানান। এরপর কণ্ঠভোটে হ্যা জয়যুক্ত হয়েছে মর্মে বিলটি পাশ হয়। এছাড়া রাশেদ খান মেনন সংশোধনীতে ‘অর্গানাইজেশন’ শব্দটি যোগ করার জন্য প্রস্তাব করেন এবং এ বিষয়ে তিনি বক্তব্য রাখেন। তা এটর্নি জেনারেল পড়ে শোনান আদালতে। তাতে দেখা যায় রাশেদ খান মেনন জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছেন। তিনি বলেন,  ১৯৭১ সালে  জামায়াতে ইসলামী সিদ্ধান্ত নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছে।  আল বদর, আল শাসস, রাজাকার গঠন করে। আজো তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে চলেছে। তাই সংগঠন হিসেবে তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্য তিনি সংশোধনীতে ‘অর্গানাইজেশন’ শব্দ যোগ করার প্রস্তাব করেন। তার বক্তব্য পাঠ শেষ হলে প্রধান বিচারপতি বলেন, এসবতো বেখাপ্পা কথাবার্তা। অস্পষ্ট। এর মধ্যেতো সংশোধনী পাশের উদ্দেশ্য বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ নেই। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এবং বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়াও  একই ধরননের মন্তব্য করেন এসময়।
এসময় সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রধান বিচারপতি   মো : মোজাম্মেল হোসেন বলেন,  এই যে, বলা হয় শুধু হাত তোলা ছাড়া কোন কাজ নেই.........। আজকের পত্রিকায় যে  হেডলাইন আছে....।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধ আইনটি পাশের ক্ষেত্রে সংসদে আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে কত সুন্দর  আলোচনা এবং বিতর্ক হয়। অনেক এমপি আইনের ক্ষেত্রে তাদের মতামত তুলে ধরেছিলেন। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরসহ অন্যরা  আইনটি বিষয়ে সংসদে কথা বলেছিলেন।
এসময় অপর বিচারপতি সুরেন্ত্র কুমার সিনহা  আফসোস করে বলেন, সেই সংসদ আর আজকের সংসদ; কোথায় এসে দাড়িয়েছে।
আদালতের নির্দেশে আইনটি পাশের  উদ্দেশ্য সম্পর্কে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ  এর বক্তব্য পড়ে শোনান এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সেখানে উল্লেখ আছে যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে ইন্টারন্যানশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যক্ট প্রণয়ন করা হয়। .....উক্ত অ্যাক্টের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠনক্রমে যুদ্ধাপরাধসহ মানবতাবিরোধী অপরাধেল সাথে জড়িতদের বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য পড়ে শোনানোর পর বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, এখানে ‘বিচার কার্যক্রম চলামান রয়েছে’ বলে একটি কথা আছে। এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মারাত্মক। তিনি বলেন, মিস্টার এটর্নি জেনারেল, এ থেকে যেটি স্পষ্ট তাহল ১৮ ফেব্রুয়ারির সংশোধনী ট্রাইব্যুনালের যেসব বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে সেক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।  এ মামলার ক্ষেত্রে নয়।

বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এটর্নি জেনারেলকে বারবার একটি প্রশ্ন করেন-রায় বের হবার পর আইন সংশোধন করে রিট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট কার্যকর করা হয়েছে এমন একটি নজির দেখান। কিন্তু এটর্নি জেনারেল তা দেখাতে পারেননি।
আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে আদালতের পক্ষ থেকে প্রশ্ন আসে আসামীর অধিকার ুন্ন হওয়া বিষয়ে। কারণ ট্রাইব্যুনালের আইনে ফাঁসির বিধান থাকলেও আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়া হয়নি। দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন।  তাই ফাঁসির উদ্দেশে আইন সংশোধন করা হলে আসামীর অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন আসে। বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া এটর্নি জেনারেলকে বলেন আপনার দরখাস্ত গ্রহণ করা হলে তো আসামীকে ফাঁসি দিতে হয়।
এটর্নি জেনারেল বলেন, আমাকে আপিলের একটা সুযোগ দেয়া  হয়েছে আইন সংশোধন করে। সেখানে আসামীর অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন আসবে কেন?
২০১৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালের আইনের সংশোধনী  আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি-না সে বিষয়ে দুর্বলতা, অস্পষ্টতা বিষয়ে  বিতর্ক চলাকালে আদালত বিরতিতে চলে যান গতকাল। দুপুর ১২টায় আবার কোর্ট বসে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন অনুপস্থিত থাকায় আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার শুনানী আজ আর হয়নি।
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানী গ্রহণ করেন।






বুধবার, ১২ জুন, ২০১৩

কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী//এটর্নি জেনারেলকে একের পর এক প্রশ্ন আদালতের

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত  যাবজ্জীবন কারাদান্ডের বিরুদ্ধে আপিল শুনানী অব্যাহত রয়েছে। আজ আসামী পক্ষের  শুনানীর জবাব দিচ্ছিলেন  রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা বা এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। জবাব প্রদানের সময় একের পর এক নানামুখী প্রশ্নের মুখোমুখি হন এটর্নি জেনারেল। প্রশ্নের জবাব প্রদানে এটর্নি জেনারেলকে  সহায়তা না করায় কোর্টে উপস্থিত অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল, ডেপুটি এটর্নি জেনারেলদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন  দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায়ের বিভিন্ন অসঙ্গতি, দুর্বল  দিক তুলে ধরে অনেক অভিযোগ উত্থাপন করেন আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।  এটর্নি জেনারেল এর কাছে এসব অভিযোগের জবাব  দাবি করেন কোর্ট। এটর্নি জেনারেল কোর্টের  বিভিন্ন প্রশ্নের এবং আসামী পক্ষের অভিযোগের জবাব প্রদানের সময় রায়ের কপি, ফরমাল চার্জসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট থেকে পাতা উল্টিয়ে রেফারেন্স দেয়ার চেষ্টা করেন।  প্রথম বেঞ্চে তখন  তিনজন অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এবং আরো কয়েকজন ডেপুটি এটর্নি জেনারেলসহ  এটর্নি জেনারেল অফিসের  ছয় থেকে সাতজন  আইন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তারা এটর্নি জেনারেলকে প্রশ্নের জবাব প্রদানে কোন সহায়তা করছিলেননা। তখন প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ অন্যান্য বিচারপতিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাদের প্রতি। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ওনারাতো সব জেনারেল। ওনারা কি সহায়তা করবেন। এটর্নি জেনারেলকে সহায়তা করতে হলে  বিগ্রেডিয়ার, কর্নেল, লে, লে কর্নেল এবং ক্যাপ্নে লাগবে। তিনি এটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, জবাব দিতে এত সময় লাগলে তো চলবেনা। কেউ তো আপনাকে কোন রেফারেন্স দিয়ে হেল্প করেনা। আপনাকে আমরা এত সময় দেব কেন? তিনি অন্যন্যা সরকারি আইন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন শুধু ম্যাটেরিয়াল এক্সিবিট হয়ে লাভ নেই।
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা  বলেন, আপনার টিম এসব কালেক্ট না করে আসলে কেমনে হবে?
বিচারপতি আব্দুল  ওয়াহহাব মিয়া বলেন,  ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাহেব যখন সাবমিশন রাখেন তখন তার জুনিয়ররা তার সাথে সাথে তাল মিলিয়ে একের পর পাতা উল্টায় বিভিন্ন ডকুমেন্ট থেকে। তাকে রেফারেন্স দিয়ে সহায়তা করেন। ভুল হলে কানে কানে আবার বলে দেয়। আপনারা এরকম পারেননা?

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আসামী পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের সময় এর আগে বলেছেন,  এইডিং, এ্যাবেটিং এবং কমপ্লিসিটি বিষয়ে কাউকে সাজা দিতে হলে রাষ্ট্রপক্ষকে প্রমান করতে হবে যে, অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে আসামী আব্দুল কাদের মোল্লার সারকমসটেনশিয়াল কন্ট্রিবিউশন বা যথার্থ অবদান ছিল।  তিনি বলেন,  অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে আব্দুল কাদের মোল্লার সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্টতা ছিল এটি রাষ্ট্রপক্ষ  পক্ষ প্রমান করতে পারেনি। অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে সাবসটেনশিয়াল কন্ট্রিবিউশন না থাকলে  এইডিং, এ্যাবেটিং এবং কমপ্লিসিট এর অভিযোগে সাজা দেয়া যায়না।
এইডিং, এ্যাবেটিং, কমপ্লিসিটি এবং সারকমসটেনশিয়াল কন্ট্রিবিউশন কি সে বিষয়ে রেফারেন্স হিসেবে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক রুয়ান্ডার লরেন স্যামেঞ্জার মামলার রেফারেন্স দিয়েছিলেন।
আজ যুক্তি পেশের সময় এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম লরেন স্যামেঞ্জা মামলার বেশ বড় একটি ডকুমেন্ট বঁধাই করে বিচারপতিদের সরবরাহ করেন।
এরপর বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া এটর্নি জেনারেলকে প্রশ্ন করেন, এটি আপনি কেন দিলেন সে বিষয়ে তো কিছু বললেননা। এটি দিয়ে আপনি কি বোঝাতে চান?  এটা কেন দিলেন আমরাতো তা কিছু বুঝলামনা। ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাহেব এ বিষয়ে কি সাবমিশন রেখেছিলেন এবং কি বলতে চেয়েছিলেন?
তখন এটর্নি জেনারেল বলেন, ওনারা যে কি বোঝাতে চেয়েছিলেন তা আমিও বুঝিনি। তখন বিচারপতি এবং কোর্টে উপস্থিত অনেকের মাঝে হাসির সৃষ্টি হয়।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব  মিয়া বলেন, আপনি আপনাকে হেল্প করছি মি. এটর্নি জেনারেল। ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাহেব বলতে চেয়েছিলেন, অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে আব্দুল কাদের মোল্লার সাবসটেনশিয়াল কন্ট্রিবিউশন ছিলনা। সাবসটেনশিয়াল কন্ট্রিবিউশন না থাকলে কাদের মোল্লাকে সাজা দেয়া যাবেনা এই ছিল তার সাবমিশন। এখন আপনি এর জবাব দেন।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  আসামী পক্ষে  যুক্তি পেশের সময় রাষ্ট্রপক্ষের চার নম্বর সাক্ষী কাজী রোজীর সাক্ষ্য বিষয়ে নানা অসঙ্গতি এবং বৈপরীত্য তুলে ধরে বলেছিলেন, তার সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়।
এটর্নি জেনারেল আজ যুক্তি পেশের সময় বলেন, তার সাক্ষ্য অবশ্যই বিশ্বাস যোগ্য। সে একজন ন্যাচারাল সাক্ষী। এসময় বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী প্রশ্ন করেন, আসামী পক্ষ বলেছেন, সাক্ষী শোনা কথা বলেছেন। সাক্ষী কার কাছ থেকে শুনেছেন তা প্রকাশ করা হয়নি। সাক্ষী কার কাছ থেকে শুনেছে সে সোর্স প্রকাশ করতে বাধ্য কিনা?
এটর্নি জেনারেল বলেন, অবশ্যই সাক্ষী সোর্স প্রকাশ করতে বাধ্য নন।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, তাছাড়া আসামী পক্ষের অভিযোগ একটি শোনা কথা  আরেকটি শোনা কথাকে সহায়তা করতে পারেনা।  কবি মেহেরুন্নিসা ছিলেন অ্যকশন কিমিটির সেক্রেটারি। আর কাজী রোজী ছিলেন সভানেত্রী। তাই কাজী রোজী কবি মেহেরকে নিয়ে যে বই লিখেছেন তাতে তো বিস্তারিতভাবে থাকা দরকার ছিল স্বাভাবিকভাবে। আব্দুল কাদের মোল্লার নাম সেখানে নেই কেন।
এসময়  আরো  দুয়েকজন বিচারপতি প্রশ্ন করেন আব্দুল কাদের মোল্লার নাম তার বইয়ে নেই। এটি ছিল আসামী পক্ষের দাবি।
এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আব্দুল কাদের মোল্লার নাম বইতে  উল্লেখ  করলে লেখকের জীবনের হুমকি ছিল।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন,  তদন্ত কর্মকর্তার কাছে  এসব বলেননি কেন তিনি?
তখন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কবি মেহেরকে নিয়ে কাজী রোজীর বইটি ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়েছে এবং তখন আব্দুল কাদের মোল্লা জেলে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যুক্তি পেশের সময় বলেছিলেন  আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় চার্জ গঠন  এবং বিচার শুরুর পরও তদন্ত পরিচালিত হয়েছে যা আইনবিরোধী। তারা তিনজন সাক্ষী পরবর্তীতে অতিরিক্ত সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ বিষয়ে আদালত জানতে চাইলে এটর্নি জেনারেল বলেন, আইনের ৯(৪) এবং রুলের ৪৬ (এ) অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল অতিরিক্ত তিনজন সাক্ষী অন্তর্ভুক্ত করেছে।

প্রধান বিচারপতি  মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে আজ  আপিল শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। শুনানী আগামীকাল পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।






বৃহস্পতিবার, ৬ জুন, ২০১৩

আব্দুল কাদের মোল্লা মামলা/// আসামী পক্ষের আপিল শুনানী শেষ রাষ্ট্রপক্ষের জবাব প্রদান শুরু

মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আসামী পক্ষের আপিল শুনানী আজ শেষ হয়েছে।  আসামী পক্ষের শুনানী শেষে রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম   তার জবাব প্রদান শুরু করেছেন।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল  হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ  শুনানী গ্রহণ করেন।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আজ শুনানীর শেষ পর্যায়ে তিনটি  দফা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন আব্দুল কাদের মোল্লা হাক্কা গুন্ডা, আক্তার গুন্ডাসহ বিহারী গুন্ডাদের  কালপাবল এসোসিয়েশন ছিল বলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়টি তারা জুড়িশিয়াল নোটিশের মাধ্যমে আমলে নিয়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে বিহারী গুন্ডাদের দোসর হিসেবে বর্নিত করা হয়েছে। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন,   ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত কোন ঘটনাকে আদালত জুড়িশিয়াল নোটিশে নিতে পারে। তা প্রমানের দরকার হয়না। যেমন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের ঘটনা আদালত জুড়িশিয়াল নোটিশে নিতে পারে। এটা নতুন করে প্রমানের দরকার হয়না। কিন্তু আব্দুল কাদের মোল্লা বিহারী গুন্ডাদের দোসর ছিল এবং তাদের সাথে অপকর্মে অংশ নিয়েছে এটা প্রমান করা ব্যাতিরেকে কি করে আদালত জুড়িশিয়াল নোটিশে নিতে পারে?  আব্দুল কাদের মোল্লা  বিহারী গুন্ডাদের দোসর হিসেবে বিভিন্ন অপকর্ম করেছে তা তো কোন প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। কিন্তু জুড়িশিয়াল নোটিশের সুযোগ নিয়ে ট্রাইব্যুনাল এটি করেছে। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন এটা  অবৈধ।
এরপর তিনি বলেন,  ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে আলুবদী হত্যাকান্ড এবং হযরত আলী পরিবারকে হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ এ অভিযোগে ফাঁসির দাবি করেছে।  রাষ্ট্রপক্ষের এখন প্রমান করতে হবে ট্রাইব্যুনাল যে যাবজ্জীবন রায় দিয়েছে তা একটি  পারভারস বা ন্যায়ভ্রষ্ট রায়। এটি প্রমান না করে তারা এ দাবি করতে পারেনা। একই ভাবে  ঘাটার চর  হত্যাকান্ড অভিযোগ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষ এ অভিযোগে শাস্তি দাবি করে আপিল করেছে। এ ক্ষেত্রেও তাদের প্রমান করতে হবে যে,  ট্রাইবু্যুনাল এ ক্ষেত্রেও ন্যায়ভ্রষ্ট রায় দিয়েছে।
তিনি বলেন, হযরত আলী হত্যাকান্ডে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মোমেনা বেগমকে পুনরায় পাঁচটি প্রশ্নের জেরা করার জন্য রিকলের আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সে আবেদন খারিজ করে দিয়েছে।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মোমেনা বেগম তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন সেখানে তিনি  তার পিতা এবং পরিবারের লোকজনের হত্যাকান্ড বিষয়ে আব্দুল কাদের মোল্লার নাম বলেননি। তিনি বলেছেন- বিহারীরা এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে এবং তাদের তিনি চিনতেন। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার  কাছে মোমেনা বেগমের এ জবানবন্দী আমলে নেয়ার  ব্যবস্থা করা হোক।

ঘাটার চর ঘটনা এবং আদালতের প্রশ্ন এটর্নি জেনারেলের কাছে : চার নং অভিযোগ কেরানীগঞ্জের ঘাটার চর হত্যাকান্ড  থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে শুনানী পেশের সময় এটর্নি জেনারেলকে আদালত কয়েকটি প্রশ্ন করেন। সে  প্রশ্নে যাবার আগে ঘাটার চর ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট সাক্ষীর জবানবন্দী বিষয়ে জেনে নেয়া দরকার।
ঘাটার চর ঘটনার অভিযোগ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বিবরন : ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর আব্দুল কাদের মোল্লা   ৬০-৭০ জন রাজাকার আল বদর বাহিনী নিয়ে ঘাটার চরে হামলা চালায়। এসময় তারা ওসমান গনি এবং গোলাম মোস্তফা নামে দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। এছাড়া দুটি গ্রামে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষ হত্যা করে।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষে তিন জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের একজন হলেন আব্দুল মজিদ পালোয়ান। তিনি  বলেছেন ২৫ নভেম্বর সকালে তাদের গ্রামের উত্তর দিক থেকে গুলি  আসতে লাগল। তিনি ঘটনা জানার জন্য যেদিক থেকে গুলি আসতে লাগল সেদিকেই অগ্রসর হন।
বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব  মিয়া  এটর্নি জেনারেলকে প্রশ্ন করেন আর্মি আসা এবং গুলির আসার শব্দে সবাই যাচ্ছে একদিকে আর সাক্ষী যাচ্ছে যেদিক থেকে গুলি আসচে সেদিকে। এটা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব কি-না। সেসময় সাক্ষীর বয়স কত ছিল?
এটর্নি জেনারেল বলেন ১৬। বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, ১৫/১৬ বছরের একটি ছেলের পক্ষে আর্মি আসার খবর পেয়ে সেখানে দাড়িয়ে থাকা এবং গুলি যেদিক থেকে আসছে সেদিকে  এগিয়ে যাওয়া কি সম্ভব?
এটর্নি জেনারেল বলেন, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা । তাছাড়া যুদ্ধ তখন শেষ পর্যায়ে। তাই এটা সম্ভব ছিল।

বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, আসামী পক্ষের আইনজীবী দাবি করেছেন আপনারা যে মৃত্যুদণ্ড এবং খালাস দেয়া অভিযোগে শাস্তি দাবি করেছেন তার পক্ষে প্রমান করতে হবে যে, ওই বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের রায় পারভারস ছিল। সাধারনত রায় পারভারস না হলে আমরা হস্তক্ষেপ করিনা।
এ পর্যায়ে আজকের মত শুনানীর শেষ হয়।
আসামী পক্ষে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে যুক্তি  উপস্থাপনে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, অ্যাডভোকেট শিশির মো : মনির, অ্যাডভোকেট সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ ।




বুধবার, ৫ জুন, ২০১৩

কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী/// ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগম বলেছেন তিনি হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী কিন্তু জল্লাদখানা ডকুমেন্টে লেখা রয়েছে তিনি ঘটনার ২ দিন আগে শশুর বাড়ি চলে যান


মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যে দুটি  অভিযোগে  যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান  করা হয়েছে তার মধ্যে একটি অভিযোগ হল মিরপুরে কালাপানি লেনে হযরত আলী,  তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীকে হত্যা ও    মেয়েদের ধর্ষনের ঘটনা।

এ ঘটনায় বেঁচে যায় হযরতী আলী লস্করের   বড় মেয়ে মোমেনা বেগম। মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে এসে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন এ ঘটনা বিষয়ে । ট্রাইবু্যুনালে মোমেনা বেগম বলেছেন ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং ধর্ষনের ঘটনা দেখেছেন। তিনি নিজেও  শারিরীক লাঞ্ছনার শীকার হন এবং এক পর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন। একই সাক্ষী মোমেনা বেগম  তাদের  পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং ধর্ষনের ঘটনা সম্পর্কে  ২০০৭ সালে মিরপুর  জল্লাদখানা যাদুঘর (মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর এর অংশ) কর্তৃপক্ষের  কাছে বিবরন দেন। মোমেনা বেগমের  বরাত দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ এ ঘটনা বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। সে প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়  মোমেনা বেগম   ঘটনার দুই  দিন আগে  শশুরবাড়ি চলে যাওয়ায় প্রানে বেঁচে যান।

কোর্টে তিনি বললেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন আর মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত বক্তব্যে দেখা যায় তিনি ঘটনার দুই দিন আগে শশুর বাড়ি চলে যান।

আব্দুল কাদের মোল্লাকে  ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদান্ডের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন শুনানীর সময় আজ  ৬ নং অভিযোগ তথা হযরত আলী পরিবারের হত্যাকান্ডের বিষয়ে যুক্তি পেশ করেন আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।    এ ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হযরত আলীর মেয়ে মোমেনা বেগমের ট্রাইব্যুনালে প্রদত্ত জবানবন্দী এবং জল্লাদ খানা যাদুঘরে রক্ষিত ডকুমেন্ট পড়ে শোনান তিনি।

প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।

৬ নং অভিযোগ হযরত আলী হত্যাকান্ড : ৬ নং অভিযোগ হযরত আলী হত্যাকান্ড বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগমের  জবানবন্দীর আজ আদালতে পড়ে শোনান ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। ঘটনাটি সংক্ষেপে নিম্নরূপ : ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঘটনা ঘটে। মোমেনা বেগমরা তখন মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের  ৫ নং কালাপানি লেনে ২১ নম্বর বাসায় থাকতেন। মোমেনা বেগম কোর্টে সাক্ষ্য দিয়ে  ঘটনা বিষয়ে বলেন, সন্ধ্যার সময় তার পিতা হযরত আলী হন্তদন্ত হয়ে  ঘরে আসলেন এবং  বললেন কাদের মোল্লা তাকে মেরে ফেলবে। কাদের মোল্লা এবং তার বিহারী সাগরেদ আক্তার গুন্ডা তার পিতাকে হত্যার জন্য ধাওয়া করছে। তার পিতা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এরপর তারা বাইরে বোমা ফাটাল। দরজা খোলার জন্য গালিগালাজ করল। তার মা দাও  হাতে নিয়ে দরজা খুলল। তারা ঘরে ঢুকে গুলি করে হত্যা করল তার মাকে। কাদের মোল্লা তার পিতাকে কলার ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গেল। তার সঙ্গীরা তার বোন খাদিজা এবং তাসলিমাকে জবাই করল। দুই বছরের ভাইকে আছড়িয়ে হত্যা করে।
মোমেনা জানায় সে এবং তার  ১১ বছর বয়স্ক অপর বোন আমেনা খটের নিচে আশ্রয় নেয় ঘটনার সময়। আমেনা ভয়ে চিৎকার দেয়ায় তাকে খটের নিচ থেকে টেনে বের করে জামাকাপড় ছিড়ে ফেলে এবং এক পর্যায়ে তার কান্না থেমে যায়।  এক পর্যায়ে তাকেও টেনে বের করে এবং ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এক পর্যায়ে সে জ্ঞান হারায় এবং জ্ঞান ফিরে পেটে প্রচন্ড ব্যর্থা অনুভব করে। তার পরনের প্যাণ্ট ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পান তিনি। পরে এক  ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং তাদের সেবার মাধ্যমে কিছুটা সুস্থ হন। পরে তার শশুর খবর পেয়ে তাকে এসে নিয়ে যান।

মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত ডকুমেন্টে যা রয়েছে :
মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত  পাম্প হাউজে  এনে ১৯৭১ সালে বিহারীরা বাঙ্গালীদের হত্যা করত। হত্যার পর তাদের লাশ ফেলে দিত পানির ট্যাংকি এবং পার্শবর্তী ডোবায়। ১৯৯০ দশকে  এখানকার বধ্যভূমিটি আবিষ্কার হয় এবং  অসংখ্য শহীদদের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এরপর পাম্প হাউজটিকে  জল্লাদখানা যাদুঘর করা হয় এবং এটি বর্তমানে মুুক্তিযুদ্ধ যাদু ঘরের অংশ।  জল্লাদখানায় ১৯৭১ সালে যাদের হত্যা করা হয়েছে যাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাদের পরিবারে অনেক আত্মীয় স্বজনকে খুঁজে বের করে বিভিন্ন  সময়ে তাদের সাক্ষাতকার  বক্তব্য রেকর্ড করে তা যাদুঘরে সংরক্ষন করে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ।
হযরত আলী হত্যাকান্ডসহ আরো অনেক হত্যাকান্ড বিষয়ে  শহীদ পরিবারের আত্মীয় স্বজনদের  সাক্ষাতকার,  লিখিত বক্তব্যের মূল কপি, অডিও ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। এছাড়া লিখিত  বক্তব্যের ডুপ্লিকেট কপি সংরক্ষিত আছে মিরপুর জল্লাদখানা যাদুঘরে। 

যে হযরত আলী হত্যাঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে সেই ঘটনার একটি বিবরন রক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে। হযরত আলীর বেঁচে যাওয়া একমাত্র মেয়ে মোমেনা বেগমের বরাত দিয়েই সে ঘটনার বর্ননা  লিপিবদ্ধ এবং সংরক্ষন করা হয়েছে।  মোমেনা বেগমের সাক্ষাতকার গ্রহনের মাধ্যমে এ ঘটনার বিবরন তারা সংগ্রহ করে।    মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে রক্ষিত সে ডকুমেন্টে  লেখা আছে ঘটনার দুই দিন আগে মোমেনা বেগম তার শশুর বাড়ি চলে যান।

হযরত আলী হত্যাকান্ড বিষয়ে তার মেয়ে মোমেনা বেগমের সাক্ষাতকার যাদুঘর কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে ২৮/৯/২০৭  তারিখ। তিনি তখন তাদের কাছে ঘটনার যে বিবরন দেন তা নিম্নরূপ।

‘ঘটনার বিবরণ : ১৯৭১ সালে মিরপুরের কালাপানি এলাকায় বিহারিদের সঙ্গে কিছু বাঙালি পরিবারও বাস করতো। ৭ মার্চ এর পর থেকে দেশের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে কিছু কিছু বাঙালি পরিবার এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। অনেকের অন্যত্র যাওয়ার অবস্থা ছিল না ফলে এলাকায় রয়ে গেলেন। যে কয়েকটি পরিবার অন্যত্র যেতে পারলেন না তাদের মধ্যে একটি হযরত আলী লস্কর-এর পরিবার।
হযরত আলী লস্কর ছিলেন একজন দর্জি/খলিফা। মিরপুরেই তার দোকান ছিল। সকলে যখন এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন তখন হযরত আলী লস্করকেও তারা চলে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর যাওয়ার জায়গা ছিল না। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হয়ে গেলে ২৬ মার্চ সকাল সাতটার দিকে বিহারিরা হযরত আলী লস্কর-এর বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং তাকে ধরে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরই তারা তাঁর স্ত্রী, দুই কন্যা ও শিশু পুত্রকে ধরে নিয়ে যায় এবং সকলকে এক সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করে পাশের বাড়ির কুয়োতে সব লাশ ফেলে যায়। বিহারিরা তার দ্বিতীয় কন্যা আমেনা বেগমকে ঘরের ভতর সারাদিন আটকে রেখে ধর্ষণ করে। পরে তাকেও হত্যা করে সেই কুয়োতে ফেলে। হযরত আলীর বড় মেয়ে মোমেনা বেগম মাত্র দুইদিন আগে শ্বশুরবাড়িতে চলে যাওয়ায় একমাত্র সেই প্রানে বেঁচে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত আলী স্ত্রী সে সময় অন্তঃসত্বা ছিল।
কয়েকদিন পরই এ খবর হযরত আলীর বড় মেয়ে মোমেনা বেগম জানতে পারেন। কিন্তু মিরপুরের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে তিনি বাড়ি আসতে পারলেন না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজ বাড়িতে এসে তিনি আর কিছুই অবশিষ্ট পেলেন না। ভগ্নহৃদয়ে ফিরে গেলেন শ্বশুরবাড়িতে।”

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে বলেছেন তিনি ঘটনার তিন বছর পর পর্যন্ত পাগল ছিলেন। তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হত। তিনি তার পিতার হত্যার ঘটনা দেখেননি। ঘটনার দিন তার পিতাকে ধরে নিয়ে যেতে দেকেছেন। কিন্তু কারা কিভাবে হত্যা করেছে তা তিনি দেখেননি। তিনি কামাল নামে একজনের কাছে শুনেছেন তার পিতার হত্যার ঘটনা।

আজ  ছয় নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপনের পূর্বে   পাঁচ নং অভিযোগ তথা আলুবদি অভিযোগ বিষয়ে অসমাপ্ত বক্তব্য পেশ করেন। এ ঘটনা বিষয়ে ৯ নং সাক্ষী আমির হোসেনর সাক্ষ্য এবং তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যের মধ্যে গরমিল তুলে ধরেন। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাক্ষী বলেছেন তিনি ১৯৭০ সালে আব্দুল কাদের মোল্লাকে  চিনতেন। ঘটনার দিন আব্দুল কাদের মোল্লাকে তিনি রাইফেল হাতে দাড়িয়ে থাকতে দেখেছেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় বলেছেন এ কথা সাক্ষী তাকে বলেননি।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাক্ষী আমির হোসেন মোল্লা বলেছেন তিনি ঘটনার দিন গ্রামের উত্তর পশ্চিম পাশে কচুরিপানার মধ্যে  লুকিয়ে থেকে ঘটনা দেখেছেন। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ঘটনার বিবরন অনুযায়ী পাকিস্তান আর্মি আসে  গ্রামের পশ্চিম দিক থেকে। আব্দুল কাদের মোল্লা আসে পূর্ব দিক থেকে। আর সাক্ষী ছিল গ্রামের উত্তর পশ্চিম পাশে কচুরিপানার মধ্যে। এভাবে কি কারো পক্ষে গ্রামের মধ্যে ঘটনা দেখা যায়?
এছাড়া ষষ্ঠ সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা বলেছেন তিনি ঝোপের মধ্যে  চারফিট গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থেকে দেকেছেন  ঘটনা। গ্রামের চারদিকে তখন ধানক্ষেত। সাক্ষীর কথা অনুযায়ী সে  ধানক্ষেত ছিল মানুষের সমান লম্বা। এভাবে গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থেকে ধান ক্ষেতের মাথার ওপর দিয়ে ঘটনা দেখা  এবং মানুষ চেনা কি করে সম্ভব হতে পারে>
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের সাবমিশন হল এ দুজন সাক্ষী বিশ্বাসযোগ্য নয় কোন অবস্থাতেই।
শুনানী শেষে অ্যাডভোটেক শিশির মো : মনির  সাংবাদিকদের জানান সাক্ষী আমির হোসেন মোল্লার বিরুদ্ধে তারা ১১টি মামলার রেকর্ড সংগ্রহ করেছেন। হাইকোর্টের একজন বিচারকের জমিদখলসহ তার বিরুদ্ধে আরো অনেক দখল, লুটপাটের মামলা হয়েছে। ইনকিলাবসহ বিভিন্ন পত্রিকায় তার অপরাধ বিষয়ে লিড নিউজ হয়েছে। সাক্ষী এলাকায় লাটভাই নামে পরিচিত।

যুক্তি উপস্থাপনে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, শিশির মো : মনির, সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ।

মঙ্গলবার, ৪ জুন, ২০১৩

আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী/// আলুবদি হত্যাকান্ড বিষয়ে যুক্তি পেশ শুরু

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত সাজা বিষয়ে আসামী পক্ষের  আপিল শুনানী চলছে।   আজ পাঁচ নং অভিযোগ তথা  মিরপুরে  আলুবদি হত্যাকান্ড বিষয়ে  যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেছেন আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ  শুনানী গ্রহণ করেন।

আব্দুল কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল-২ যে দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন কারদন্ড প্রদান করেছে তার মধ্যে একটি হল মিরপুরের আলুবদি  গ্রামে গণহত্যার  ঘটনা। আব্দুল  কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এটি ছিল পাঁচ নং অভিযোগ।

৫ নং অভিযোগ : ট্রাইব্যুনালের রায়ে  আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ৫ নং অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরন তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়- ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল  সাড়ে চারটার সময় আব্দুল কাদের মোল্লার  সদস্যরা (মেম্বারস)  পাকিস্তান আর্মি সাথে নিয়ে মিরপুর পল্লাবীর  আলুবদি গ্রামে নিরীহ বেসামরিক লোকজনের ওপর আক্রমন পরিচালনা করে । আক্রমনের অংশ হিসেবে তারা নির্বিচারে গুলি চালায় এবং এতে ৩৪৪ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়। এ গণহত্যায় সহায়তার অভিযোগে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

৫ নং অভিযোগ বিষয়ে  রাষ্ট্রপক্ষ দুই জন সাক্ষী হাজির করে। তারা হলেন  ৬ নং সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা এবং ৯ নং সাক্ষী আমির হোসেন মোল্লা। তারা দাবি করেছেন তারা এ গনহত্যা তারা দেখেছেন এবং আব্দুল কাদের মোল্লা মূল নায়ক হিসেবে এতে অংশগ্রহণ করে। তারা সে সময় ওই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন ।
অপর দিকে এ ঘটনা বিষয়ে আসামী পক্ষের একজন সাক্ষী হল আলতাফ উদ্দিন মোল্লা। আলতাফ উদ্দিন মোল্লা আবার রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লার ছোট ভাই।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  আজ উক্ত তিনজন সাক্ষীর জবানবন্দী এবং জেরা পড়ে শোনান আদালতে। এরপর রায় থেকে কিছু ফাইন্ডিংস তুলে ধরেন। এরপর তিনি ৬ নং  সাক্ষী সফিউদ্দিন মোল্লা এবং তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যের গরমিল তুলে ধরেন।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ৬ নং সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা ট্রাইব্যুনালে বলেছেন- তিনি ১৯৭০ সালে আব্দুল কাদের মোল্লাকে চিনতেন। তার দাবি আব্দুল কাদের মোল্লা তখন গোলাম আযমের নির্বাচনের পক্ষে কাজ করেছেন। অন্যদিকে সাক্ষী নিজে আরেক প্রার্থী জহির উদ্দিন জালালের পক্ষে কাজ করেছেন কর্মী হিসেবে। সেই হিসেবে তিনি আব্দুল কাদের মোল্লাকে চিনতেন।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাক্ষীকে জেরায় প্রশ্ন করা হয়-১৯৭০ সালে আব্দুল কাদের  মোল্লাকে চেনার কথা কি আপনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে বলেছিলেন?
সাক্ষী  উত্তর দিয়েছেন-বলেছি।
তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার সময় প্রশ্ন করা হয় সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা ১৯৭০ সালে আব্দুল কাদের মোল্লাকে চিনত একথা কি আপনাকে বলেছিল? তদন্ত কর্মকর্তা জনান-না বলেননি।

তাছাড়া সাক্ষীকে প্রশ্ন করা হয় আপনি যে প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছিলেন সে কি বাঙ্গালী না অবাঙ্গালী ছিলেন। তার উত্তর তিনি দিতে পারেননি। এছাড়া নির্বাচনী এরিয়ার কথাও তিনি বলতে পারেননি।

সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, তিনি দেখেছেন ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল ঘটনার সময় আব্দুল কাদের মোল্লা রাইফেল হাতে দাড়িয়ে ছিল এবং নিজে গুলি করেছে।
জেরায় তাকে প্রশ্ন করা হয় একথা আপনি তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেছিলেন কি-না। সে জবাব দেয়-বলেছি। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় জানান  আব্দুল কাদের মোল্লাকে রাইফেল হাতে দাড়িয়ে থাকতে দেখার কথা সাক্ষী তাকে  বলেননি।
সাক্ষী বলেছেন তিনি ফজরের আজানের সময় ঝোপের মধ্যে চার ফিট একটি গর্তের মধ্যে থেকে এ ঘটনা দেখেছেন।
সাক্ষী আরো বলেছেন তিনি দেখেছেন আব্দুল কাদের মোল্লা আর্মির সাথে উর্দুতে কথা বলেছেন। কিন্ত দূরে থাকায় তিনি তা শুনতে পাননি।
শুনানী শেষে আসামী পক্ষের অপর আইনজীবী শিশির মো : মনির সাংবাদিকদের জানান, আমরা আগামীকাল বুধবার আদালতে স্কেচ ম্যাপ দিয়ে দেখাব ঝোপের মধ্যে চারফিট গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থেকে হত্যাকান্ডের  স্থান এবং ঘটনা দেখা কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে আজ যুক্তি উপস্থাপনে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, শিশির মো : মনির, সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ।



সোমবার, ৩ জুন, ২০১৩

হাজী মোবারকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী খোদেজা বেগমের জেরা


হাজী মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী খোদেজা বেগম জেরায় প্রশ্নের জবাবে যে উত্তর দেন তা নিম্নরূপ। গত ২৭ মে তার জবানবন্দী গ্রহণ করা হয় ট্রাইব্যুনাল-১ এ।

২৮/০৫/২০১৩
পুনরায় জেরা শুরু ঃ
০৩-০৫-২০০৯ তারিখে আসামী মোবারক ও জমশেদ মিয়ার বিরুদ্ধে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে, আমার পিতার হত্যার ব্যাপারে মামলা দায়ের করি। আমার দাখিলী নালিশী দরখাস্ত ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত হইতে তদন্তের জন্য থানায় প্রেরণ করা হয়েছে। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে আমার মামলার উকিল ছিলেন জনাব সৈয়দ তানভীর হোসেন। আমি অন্য কোন উকিল নিয়োগ করি নাই। আমার দাখিলী নালিশী দরখাস্তে সাক্ষী হিসাবে আমার ভাই, চাচাদের নাম আমি দিয়েছিলাম, অন্যদের নাম আমি দিই নাই। আমার ভাইয়ের নাম রফিকুল ইসলাম এবং চাচার নাম আব্দুল আহাদ। আব্দুর রউফ ও মেম্বার ঐ মামলায় সাক্ষী ছিলেন। আমি যে জমশেদ মিয়ার নামে কেইস করেছিলাম অদ্য তাকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দেখছি না। জমসেদ মিয়া এখনও জীবিত আছে। আমার দাখিলী নালিশী দরখাস্তে আমার বাপের বাড়ি টেংরাপাড়া একথা উল্লেখ করি কিনা তাহা আমার স্মরণ নাই। উল্লেখিত নালিশী দরখাস্তে ১৯৭১ সালে আমার স্মরণ নাই। (চলবে)

২৮/০৫/২০১৩ ইং ২.০০ মিঃ পুনরায় জেরা শুরু ঃ
আমার পিতা আব্দুল খালেক সাহেব মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তার আগে তিনি আনছার ছিলেন। আমার পিতা সেনাবাহিনীতে ছিলনা। আমার পিতা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছিলেন তাহা আমার জানা নাই, কারণ আমি আমার পিতার সংগে যুদ্ধ করতে যাই নাই, আমি শুনেছি আখাউড়া, রানীদিয়া, সরাইল বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেছেন। আমার পিতা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তৎমর্মে কাগজপত্র আমার নিকট আছে। সেই কাগজপত্র আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট প্রদান করিনাই, তবে গেজেট নম্বর দিয়েছি। আমি লেখাপড়া জানি না বিধায় ঐ গেজেটের মাস, তারিখ বলতে পারব না। ইহা সত্য নহে যে, আমার পিতা ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার রাজাকার কমান্ডার আবুল কালাম চৌধুরী আমার পিতাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় রাজাকার কমান্ডার আবুল কালাম চৌধুরী উপস্থিত থাকার কথা আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলি নাই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার বয়স ১৪/১৫ বৎসর ছিল তৎমর্মে কোন কাগজপত্র আমার নিকট নাই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার বয়স ৫/৬ বৎসর ছিল, ইহা সত্য নহে। আমাদের গ্রামের রাস্তার কোন নাম নাই। যে স্থান থেকে আমার পিতাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে বাকাইল ঘাটের দূরত্ব আনুমানিক দুই কিলোমিটার হবে। আমার প্রথম স্বামীর নাম ইসমাইল, গ্রাম- মজলিসপুর এবং দ্বিতীয় স্বামীর নাম হাসিম, গ্রাম-শিমরাইলকান্দি। ইসমাইল আমাকে তালাক দিয়েছিল কিনা তাহা আমি জানি না, কারণ তখন আমি ছোট ছিলাম। আমার স্বামী হাসিম মারা গেছেন। ইসমাইল বর্তমানে জীবিত আছে কিনা তাহা আমি জানি না। ১৯৭১ সালে বাকাইল ঘাট থেকে আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকের রাস্তার যেতে কাঁচা রাস্তা ছিল, রিক্সা, ভ্যান চলাচল করতো। আমার পিতাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরে ঘটনাস্থলে অনেক লোকজন জমায়েত হয়েছিল। যারা জমায়েত হয়েছিল তাদের মধ্যে কেউ বর্তমানে জীবিত নাই। ঘটনার দিন দৌড়িয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে সুহিলপুর ইউনিয়ন পরিষদ পৌছি। ঐ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কে ছিলেন তাহা আমার স্মরণ নাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের টেংরাপাড়ার মেম্বার ছিলেন ফুল মিয়া। টেংরাপাড়া গ্রামে ১৯৭১ সালে কতগুলি ঘরবাড়ি ও কতজন লোক ছিল তাহা আমি বলতে পারবনা, কারণ আমি গুনে দেখি নাই। আন্দাজে কেমনে বলব কতগুলি ঘরবাড়ি ছিল। মোবারক হোসেন রাজাকার কমান্ডার থাকা সংক্রান্তে কোন কাগজ আমার নিকট নাই, থাকার কথা নহে। আসামী মোবারক হোসেনের বাড়ি আমার বাড়ি থেকে কতদূর তাহা আমি বলতে পারব না। আমার বাড়ি থেকে মোবারক আলীর বাড়ি ৫৫ কিঃ মিঃ দূরে কিনা তাহা আমি আন্দাজ করে বলতে পারবনা। আমাদের পাড়ায় আমার পিতা ছাড়া তারা হলেন শমসের আলী, সিদ্দিক মিয়া, আব্দুল হেকিম, আহাদ মিয়া প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমার চাচা আহাদ মিয়া আমার পিতার সংগে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন মর্মে শুনেছি। রাজাকাররা আসার সংবাদ কেউ দেই নাই। ‘‘ রাস্তায় উঠলেই রাজাকাররা আমার বাবাকে ধরে  হাত বেঁধে মারপিঠ শুরু করে। তখন আমরা চিল্লা চিল্লি ও কান্নাকাটি করতে করতে তাদের পিছনে পিছনে যাই” এই কথা অসত্য, ইহা সত্য নহে। জিল্লুর রহমান নামে দুইজনকে আমি চিনি, তবে তাদের পিতার নাম আমি জানিনা। আমার নানীর বাড়ি বুধল, দাদীর বাপের বাড়ি বেলতলা। মুক্তিযুদ্ধের আগে আসামী মোবারক হোসেনের সংগে আমাদের কোন জায়গা জমি নিয়ে কোন গোলমাল ছিল না এবং তখন তাকে আমরা চিনতামওনা। আমার মা বা দাদীর নয়াদিল গ্রামে কোন ব্যবসা বাণিজ্য ছিলনা। আব্দুর রউফ ভূঁইয়া, পিতা-মৃত আবুল কাহার ভূঁইয়াকে স্বাধীনতা সংগ্রামের দুই/আড়াই বৎসর পরে চিনেছি, সে একজন রাজাকার ছিল। রাজাকার বাহিনী কখন গঠিত হয়েছিল তাহা আমি জানি না। আমার কোন জায়গাজমি নাই। স্বামীর দুই শতক জায়গা আছে সেখানে ঘর তুলে থাকি। আমি কোন ভাড়া ঘরে থাকিনা। ঘটনার দিন বাংলা কত তারিখ ছিল। ঐ সময় বাংলা কত সাল ছিল তাহা বলতে পারবনা। ঘটনাস্থলের উত্তর দিকে ঐ সময় স্কুল ছিল এবং অনেক দূরে ঘর বাড়ি ছিল ঘটনাস্থলের পূর্ব দিকে একটি পুকুর ছিল তার পূর্বে ঘর বাড়ি ছিল। ঐসময় পশ্চিম দিকে একটি বাড়ি ছিল। ঘটনাস্থল রাস্তার দুইপার্শে ঘটনার সময় ধানক্ষেতে কোন লোকজন কাজ করছিল না। সকলেই ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আমি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে আমার পিতাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার স্থান দেখিয়েছি। বাকাইল ঘাটে ১৯৭১ সালে একটি মাত্র চায়ের দোকান ছিল। ঐ ঘাটের পাশে একটি বাজার আছে। দক্ষিণ দিকে একটি হাই স্কুল আছে। উত্তর পূর্ব দিকে একটি  মন্দির আছে কিনা তাহা বলতে পারব না। বাকাইল ঘাটে ১৯৭১ সালে কোন নৌকা বাঁধা থাকতো না, তখন বাজার হওয়াতে নৌকা বাঁধা থাকে। ইহা সত্য নহে যে, ১৯৭১ সালে বাকাইল ঘাটে বাজার ছিল এবং সেখানে সবসময় অনেকগুলি নৌকা বাঁধা থাকতো। ১৯৭২, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে অনেক রাজাকারের শাস্তি হয়েছিল কিনা তাহা আমি জানি না। সুহিলপুর ইউনিয়ন পরিষদ আমি ঘটনার দিন ১৫/২০ জন রাজাকার দেখেছিলাম। ঐ সময় ঐ ক্যাম্পে পাকিস্তান আর্মিদের দেখেছিলাম। ঘটনার দিন আমি, আমার মা, দাদী সুহিলপুর রাজাকার ক্যাম্প যাওয়ার কথা অসত্য, ইহা সত্য নহে। ‘‘খালেক মাওলানাকে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য অনুরোধ করলে তিনি বলেন আজকে রাত হয়ে গেছে, আগামীকাল সকালে ক্যাম্পে গিয়ে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসবেন। পরদিন সকালে খালেক মাওলানার নিকট যাওয়ার পূর্বে লোকজন বলাবলি করছে যে, তিতাস নদীর পশ্চিম পাড়ে বাকাইল ঘাটে আমার বাবাকে গুলি করে করে হত্যা করে সেখানে লাশ ফেলে রাখা হয়েছে। তখন আমরা কান্নাকাটি করে বাকাইল ঘাটে গিয়ে দেখি আমার পিতার হাত, পা বাঁধা, কপালের ডান পাশে গুলি, মাথার খুলি উড়ে গেছে, বুকের ডান পাশে গুলির চিহ্ন এবং নাভির নীচে ও উপরে দুটি কাটা চিহ্ন অবস্থায় লাশ পড়ে আছে। তারপর আমার মা খালেক মাওলানার নিকট যায়। খালেক মাওলানা উল্লেখিত ক্যাম্প থেকে একটি সিøপ এনে আমাদের নিকট দিলে আমরা আমাদের পিতার লাশ নিয়ে এসে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করি” একথাগুলি অসত্য, ইহা সত্য নহে। আমার পিতার বাড়িতে আমার ভাই ও মা থাকেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা আমার মাকে ঘটনার বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, মা কি বলেছে তাহা আমি জানি না। মোবারক আলীকে মিথ্যা মামলার জড়ানো হয়েছে বিধায় আমি সাক্ষ্য দিবনা একথা তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট আমার মা বলেছে, ইহা সত্য নহে। দেশ স্বাধীনের পর থেকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে নালিশী দরখাস্ত দাখিল করার আগ পর্যন্ত আমার পিতার হত্যা সংক্রান্ত আমি কোন মামলা ইতিপূর্বে করি নাই। গ্রামের যে রাস্তা থেকে আমার পিতাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল সেই রাস্তা দিয়ে লোকজন চলাচল করে। আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশের বাড়ির মালিকের নাম শহীদ মিয়া। শহীদ মিয়ার মাতা জীবিত নাই। আমার পিতার আনছার বিভাগে চাকুরীর শেস কর্মস্থল ছিল উলছাপাড়া, সেখান থেকে পালিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। আমার পিতার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কে ছিলেন তাহা আমি জানি না। পিতা বাড়িতে আসার পর কোন জায়গা থেকে এসেছিলেন তাহা জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কিন্তু তিনি বলেন নাই। আমার বাবার বাড়ি টেংরাপাড়া একথা তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলি নাই, ইহা সত্য নহে। আমি আব্দুল হামিদ, পিতা মৃত আবুল কাহার ভূঁইয়াকে চিনি না। ‘‘ পালানোর সময় রাস্তায় উঠলেই রাজাকাররা আমার বাবাকে ধরে  হাত বেঁধে মারপিঠ শুরু করে” বা ‘‘তখন ক্যাম্পের একজন রাজাকার যার নাম আব্দুর রউফ আমার মা ও দাদীকে বলে যে ঐ খাবার আমার নিকট দিয়ে যান আমি খাইয়ে দিব। আব্দুর রউফ রাজাকার মা ও দাদীকে বলেছে উল্লেখিত ক্যাম্পের কমান্ডার আখাউরা থানার নয়াদিল গ্রামের মোবারক হোসেন, যাকে ধরলে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে নেয়া যাবে। তখন আমার মা ও দাদী বািড়তে ফিরে আমাদের আমাদের ঐ কথা জানায়। তখন আমার মা আমাদের বাড়ির পাশের খালেক মাওলানাকে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য অনুরোধ করলে তিনি বলেন আজকে রাত হয়ে গেছে, আগামীকাল সকালে ক্যাম্পে গিয়ে আমার বাবাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসবেন” বা ‘‘যে সকল রাজাকাররা আমার পিতাকে ধরে  নিয়ে গিয়েছিল তাদের কারো নাম ঐসময় জানতাম না, দেখলে চিনবো। আমি শুনেছি আমার বাবাকে ধরে  নেওয়ার সময় রাজাকার কমান্ডার মোবারক হোসেন ও তার  সহযোগী রাজাকার জামশেদ ছিল” বা ‘‘তখন তার বয়স কম ছিল, দাড়ি ছিলনা” এই কথাগুলি আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলি নাই, ইহা সত্য নহে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান আর্মিদের ভয়ে আসামী মোবারক আলী দাড়ি রেখেছিল, ইহা সত্য নহে। ১৯৭১ সালে আসামী মোবারক হোসেন রাজাকার কমান্ডার ছিল না, ইহা সত্য নহে। আমি যখন আসামী মোবারক হোসেনকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় সনাক্ত করি তখন কাঠগড়ায় একজন ব্যক্তিই উপস্থিত ছিলেন। আমি একটি কুচক্রী মহলের ইন্দনে এবং অর্থের লোভে অসত্য সাক্ষ্য প্রদান করলাম, ইহা সত্য নহে। আমার কথিত সময়ে, কথিত স্থান থেকে আমার পিতাকে ধরে নিয়ে যাওয়া এবং তাকে হত্যা করার কথা অসত্য, ইহা সত্য নহে। (সমাপ্ত)

কাদের মোল্লা মামলায় আপিল শুনানী তালেব হত্যা বিষয়ে ফরমাল চার্জ, সাক্ষী এবং তদন্ত কর্মকর্তার পরষ্পর বিরোধী তথ্য


মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত সাজা বিষয়ে আসামী পক্ষের  আপিল শুনানী অব্যাহত রয়েছে। আজ সোমবারও তিন নং অভিযোগ সাংবাদিক আইনজীবী  খন্দকার আবু তালেব হত্যার বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

যুক্তি উপস্থাপনের সময় ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  খন্দকার আবু তালেব হত্যা ঘটনা বিষয়ে সাক্ষী, তদন্ত কর্মকর্তা এবং ফরমাল চার্জ থেকে  পরষ্পর বিরোধী বিষয়গুলো  তুলে ধরেন।  তিনি আদালতকে দেখান যে, তালেব  হত্যার ঘটনার বিবরনে ফরমাল চার্জ এবং সাক্ষীদের দেয়া সাক্ষ্যে পরষ্পর বিরোধী তথ্য রয়েছে। যেমন ফরমাল চার্জে ঘটনা বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে মিরপর ১০ নং বাস স্ট্যান্ড থেকে  আবু তালেবকে কাদের মোল্লা অন্যান্য আলবদর, রাজাকার এবং বিহারী দৃস্কৃতকারীরা ধরে  দড়ি দিয়ে বেঁধে মিরপুর জল্লাদখানায় নিয়ে হত্যা করে। অপর দিকে এ ঘটনা বিষয়ে  রাষ্ট্রপক্ষের যে দুজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা বলেছেন খন্দকার আবু তালেব বাসায় ফেরার পথে ইত্তেফাকের  প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা বিহারী আব্দুল হালিম তাকে বিহারীদের হাতে তুলে দেয়। আব্দুল হালিম মিরপুরে  বাসায় পৌছে দেয়ার নাম করে তার গাড়িতে  খন্দকার আবু তালিবকে তোলে এবং তাকে কাদের মোল্লা/বিহারীদের হাতে তুলে দেয়।

আব্দুল কাদের মোল্লাকে যে তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে  কারাদণ্ড প্রদান করেছে ট্রাইব্যুনাল-২  তার মধ্যে একটি হল খন্দকার  আবু তালেব হত্যার অভিযোগ।
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের  আপিল বেঞ্চ শুনানী  গ্রহণ করেন আজ।

তালেব হত্যা বিষয়ে সাক্ষী, তদন্দ কর্মকতা এবং ফরমাল চার্জের গরমিল তুলে ধরে আজ ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যে যুক্তি তুলে ধরেন তা নিম্নরূপ।

৩ নং অভিযোগ : আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জের তিন নং অভিযোগ খন্দকার আবু তালেব হত্যার ঘটনা বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে -১৯৭১ সালে ২৯ মার্চ সাংবাদিক আইনজীবী খন্দকার আবু তালেব তার মিরপুর ১০ নং সেকশনে অবস্থিত বাসা থেকে  আরামবাগ যাচ্ছিলেন। তিনি মিরপুর ১০ নং বাস স্ট্যান্ডে পৌছার পর ইসলামী ছাত্র সংঘ নেতা  আব্দুল কাদের মোল্লা অন্যান্য আল বদর সদস্যা, রাজাকার  এবং দৃষ্কৃতকার এবং বিহারীদের সাথে নিয়ে তাকে ধরে ফেলে।  তারা খন্দকার আবু তালেবকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মিরপুর জল্লাদখানা পাম্প হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে সেখানে হত্যা করা হয়।

ফরমাল চার্জ থেকে পড়ে শোনানোর পরে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আবু তালেবের ছেলে  ৫ নং সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসানের সাক্ষ্য পড়ে শোনান।

সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান  ট্রাইব্যুনালে বলেছেন- ২৫ মার্চ ইত্তেফাক অফিস গুড়িয়ে দেয়ার  খবর শুনে তার পিতা খন্দকার আবু তালেব সেখানে যান তার সহকর্মীদের অবস্থা জানতে। তিনি সেখানে কিছু মৃতদেহ দেখতে পান। ২৯ মার্চ তিনি তাদের মিরপুর বাসায় আসছিলেন তার গাড়ি এবং টাকা নেয়ার জন্য। কিন্তু মিরপুর যাবার পথে ইত্তেফাকের প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা  অবাঙ্গালী আব্দুল হালিমের সাথে দেখা হয় তার। আব্দুল হালিম  তাকে পৌছে দেয়ার নাম করে তার গাড়িতে ওঠান এবং আব্দুল কাদের মোল্লার কাছে নিয়ে যান। এরপর মিরপুর ১০ জল্লাদ খানায় তার পিতাকে আব্দুল কাদের মোল্লা হত্যা করে।  এসময় আব্দুল কাদের মোল্লার সাথে আক্তার গুন্ডা এবং আরো অবাঙ্গালী দুস্কৃতকারীরা ছিল।

সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান জেরায় জানান, তিনি তার পিতার একসময়কার  সহকর্মী  অ্যাডভোকেট খলিল  এর কাছ থেকে শুনেছেন যে, ইত্তেফাকের প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা আব্দুুল হালিম  তার পিতাকে তার গাড়িতে করে নিয়ে গিয়ে কাদের মোল্লা এবং তার সহযোগীদের হাতে তুলে দিয়েছে। জেরায় তিনি আরো বলেন, তাদের অবঙ্গালী  ড্রাইভার নিজাম তাকে বলেছেন যে,  আব্দুল হালিম তার পিতাকে আব্দুল কাদের মোল্লা এবং তার সঙ্গীদের হাতে তুলে দিয়েছে।


এ ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের আরেক সাক্ষী হলেন আব্দুল কাইউম। তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি মিরপুরের বাসিন্দা এবং  খন্দকার আবু তালেবের বন্ধু ছিলেন। তিনি বলেছেন-  ফারুক খানের (তার কলিগ) কাছে তিনি শুনেছেন যে, স্থানীয় আক্তার গুন্ডা, বিহারী এবং কাদের মোল্লা তালেব সাহেবকে হত্যা করেছে মিপুর ১০ জল্লাদ  খানায়। এছাড়া  তালেব সাহেবের  ড্রাইভার নিজামের কাছ থেকেও তিনি  শুনেছেন যে, খন্দকার আবু তালেব মিরপুরে তার বাসায় আসার পথে ইত্তেফাকের অবাঙ্গালী হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা   আব্দুল হালিম তাকে  বিহারীদের হাতে তুলে দেয় যারা তাকে মিরপুর ১০ জল্লাদখানায় হত্যা করে।

খন্দকার  আবু  তালেবকে  ধরে নিয়ে যাওয়া বিষয়ে  রাষ্ট্রপক্ষেরই  এ বিপরীতধর্মী তথ্য তুলে ধরে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন,    খন্দকার আবু তালেবের ছেলে খন্দকার আবুল আহসান এবং  অপর সাক্ষী আব্দুল কাইউম দুজনেই বলেছেন, ইত্তেফাকের বিহারী হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা আব্দুল হালিম  আবু তালিবকে বাসায় পৌছে দেয়ার নাম করে  তার নিজের গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যায় এবং বিহারীদের হাতে তুলে দেয়া হয়। তিনি বলেন,   তিন পক্ষের পরষ্পর বিরোধী তথ্যের কোনটা আপনারা বিশ্বাস করবেন? তাছাড়া দুজন সাক্ষীই শোনা কথা বর্ননা করেছেন। অপর দিকে জেরায় তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন আক্তার গুন্ডাম হাক্কা গুন্ডা এবং কাদের মোল্লা আবুল তালেবকে হত্যা করেছে একথা -১০ নং সাক্ষী আব্দুল কাইউম  তার কাছে বলেননি।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক  বলেন, তাছাড়া জল্লাদখানা যাদুঘর কর্তৃপক্ষের  দুই ভাইবোন যথা খন্দকার আবুল আহসান এবং সখিনা বেগম তাদের পিতা আবু তালেব হত্যা বিষয়ে যে জবানবন্দী দিয়েছেন সেখানেও তারা কেউই আব্দুল কাদের মোল্লার নাম উচ্চারন করেননি।  জল্লাদখানা যাদুঘর কর্তৃপক্ষও  এ ঘটনা বিষয়ে উল্লেখ করেছে অবাঙ্গালী বিহারীরা আবু তালেবকে হত্যা করেছে।
কাজেই আবু তালেব হত্যা বিষয়ে আব্দুল কাদের মোল্লা কোন অবস্থাতেই জড়িত নন।

আজ যুক্তি উপস্থাপনে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট শিশির মো : মনির। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, অ্যাডভোকেট সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ।