বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

দেলোয়ার শিকদার এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী আলাদা ব্যক্তি বলে স্বীকার করেছে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী- শুনানীতে আইনজীবী

মেহেদী হাসান, ১৩/২/২০১৪
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল শুনানীতে তার আইনজীবী  বলেছেন, দেলোয়ার শিকদার এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী যে এক ব্যক্তি নয় বরং, আলাদা ব্যক্তি তা স্বীকার করেছে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মধুসূদন ঘরামী। এ সাক্ষী জেরায় স্বীকার করেছেন দেলোয়ার শিকদার নামে পিরোজপুরে একজন কুখ্যাত রাজাকার ছিল এবং স্বাধীনতার পর  মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় লোকজন মিলে পিরোজপুরে তাকে হত্যা করতে পারে।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চে যুক্তি উপস্থাপনের মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান এ তথ্য তুলে ধরেন। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৪ নং অভিযোগ হোগলাবুনিয়া গ্রামে হিন্দু পাড়ায় আগুন দেয়া এবং শেফাল ঘরামীকে ধর্ষণ এর অভিযোগ বিষয়ে তিনি গতকাল যুক্তি পেশ করেন। যুক্তি উপস্থাপনে তাকে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান  বলেন, মাওলানা সাঈদীর পিতার নাম ইউসুফ সাঈদী। আর দেলোয়ার শিকদারের পিতার নাম রসুল শিকদার। ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মধুসূদন ঘরামীকে দেলোয়ার শিকদারের পিতার নাম রসুল শিকদার উল্লেখ করে নির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করা হয়েছিল । এর জবাবে তিনি স্বীকার করেছেন স্বাধীনতার পর সে পিরোজপুরে নিহত হয়ে থাকতে পারে। 

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ হল পূর্বে তার নাম ছিল দেলোয়ার শিকদার। স্বাধীনতার পর তিনি তার নাম পরিবর্তন করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ধারন করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের বেশ কয়েকজন সাক্ষীও  একই অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন বর্তমানে যে সাঈদীর বিচার হচ্ছে তিনিই ছিলেন ১৯৭১ সালে দেলোয়ার শিকদার।

অপর দিকে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালে তথ্য প্রমান  উপস্থাপন করে প্রমানের চেষ্টা করেছেন দেলোয়ার শিকদার নামে পিরোজপুরে একজন কুখ্যাত রাজাকার ছিল। তবে সে বর্তমানে আর বেঁচে নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার অপকর্মের কারনে যুদ্ধের পর সে জনরোষের মুখে পড়ে এবং মুক্তিযোদ্ধা ও জনতা মিলে তাকে মেরে ফেলে। নিহত সেই রাজাকার দেলোয়ার শিকদারের পিতার নাম রসুল শিকদার। আর  মাওলানা সাঈদীর পিতার নাম ইউসুফ সাঈদী এবং মাওলানা সাঈদীর ১৯৫৭ সালের দাখিল সনদেও তা লেখা রয়েছে। ১৯৫৭ সালের দাখিল সনদে মাওলানার নামও  দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী মর্মে লেখা রয়েছে। কাজেই মাওলানা সাঈদী জন্মের পর থেকেই এ নামে পরিচিত এবং তিনি কখনো দেলোয়ার শিকদার ছিলেননা।

ট্রাইব্যুনালে  রাষ্ট্রপক্ষের সবচেয়ে প্রবীণ ৮১ বছর বয়স্ক সাক্ষী মধুসূদন ঘরামীও জেরায় স্বীকার করেন দেলোয়ার শিকদার নামে পিরোজপুরে একজন রাজাকার ছিল।
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৪ নং অভিযোগ শেফালী ঘরামীকে ধর্ষণ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন তার স্বামী মধুসূদন ঘরামী। গতকাল আপিল বেঞ্চে এ ১৪ নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপনের সময় মধুসূদন ঘরামীর প্রসঙ্গ আসে।

আজ যুক্তি উপস্থাপনের শুরুতে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান প্রথমে ট্রাইব্যুনালের রায় থেকে ১৪ নং অভিযোগ পড়ে শোনান। এতে বলা হয়েছে মাওলানা সাঈদীর নেতৃত্বে হোগলাবুনিয়া গ্রামে হিন্দু পাড়ায় আক্রমন এবং এসময় শেফালী ঘরামী নামে একজন মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, মাওলানা সাঈদী শেফালী ঘরামীকে ধর্ষণ করেননি। তখন একজন বিচারপতি প্রশ্ন করেন, সে সেখানে ছিল কি-না। আরেকজন বিচারপতি বলেন, অভিযোগ হল আসামীর নেতৃত্বে তারা সেখানে গেছে। এসময় একজন বিচারপতি রায় থেকে একটি লাইন পড়ে শোনাতে বলেন অ্যাডভোকেট শাহজাহানকে যেখানে লেখা রয়েছে, তার টিমের সদস্যরা ঘরে আগুন দিয়েছে। অ্যাডভোকেট শাহজাহান লাইনটি পড়ে শোনান।

এরপর অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ট্রাইব্যুনালের রায়ে ১৪ নং অভিযোগে  মাওলানা সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের ১, ২, ৩ এবং     ২৩ নং সাক্ষীর ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু সাক্ষ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় রাষ্ট্রপক্ষের ১, ২ এবং তিন নং সাক্ষী হোগলাবুনিয়া গ্রামে  হিন্দু পাড়ায় আগুন দেয়া এবং শেফালী ঘরামীকে ধর্ষণ করা বিষয়ে  একটি কথাও বলেনি।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের ২৩ নং সাক্ষী মধুসূদন ঘরামী শেফালী ঘরামীর স্বামী এবং তিনি এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এরপর তিনি মধুসূদন ঘরামীর জবানবন্দী এবং জেরা থেকে পড়ে শোনান আদালতে।

মুধুসূদন ঘরামী তার জবানবন্দীতে বলেছেন, তার বড়ভাই নিকুঞ্জ ১৯৭০ সালের আগেই মারা গেছে। যখন সেনাবাহিনী নামে  এবং লুটপাট শুরু করে তার আগে মধুসূদন বিয়ে করেছেন। ফালগুন মাসে তিনি শেফালী ঘরামীকে বিয়ে করেছেন বলে জানান তার জবানবন্দীতে।
(মধূসূদন ঘরামী অসুস্থ হওয়ায় ট্রাইব্যুনালে সিকবেডে শুয়ে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। অন্যান্য সাক্ষীরা যেভাবে নিজ থেকে ঘটনা বর্ননা করেছেন তিনি সেভাবে বলেননি। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তাকে ঘটনা বিষয়ে প্রশ্নের মাধ্যমে জবানবন্দী গ্রহণ করেছিলেন তখন।)

মধূসূদনের বাড়িতে  রাজাকার বাহিনীর সাথে আর কারা এসেছিল এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তার কাছ থেকে নির্দিষ্ট করে জানতে চাইলে তিনি জবাব দিয়েছিলেন ‘আমি বাড়িতে ছিলামনা তখন। কারা এসেছিল জানিনা।  আমার স্ত্রী পরে আমাকে বলেছে তোমাকে  যে মুসলমান বানিয়েছে সে এসেছিল। ’
আরেক প্রশ্নের জবাবে মধুসূদন ঘরামী বলেন, ‘আমার স্ত্রী আমাকে আরো বলেছে যে, তাকে ধর্ষন করা হয়েছে। অসহ্য  যন্ত্রনা। আমি আর বলতে পারছিনা। আমার চিন্তা করনা। তুমি পালাও। ’

মুধসূদন ঘরামী তার জবানবন্দীতে  আরো জানান ‘আমাদের  বাড়িতে লুটপাটের চার পাঁচ মাস পরে অগ্রহায়ন মাসে আমার  স্ত্রীর  একটি  কন্যা সন্তান হয়। তার নাম সন্ধ্যা। সন্তান হবার পর আমার   স্ত্রীকে লোকজন গঞ্জনা করত। তখন আমি আমার    শ্যালক কার্তিক শিকদারকে বললাম   কি করবা? সে বলল ভারতে নিয়ে যাই। তখন আমার   স্ত্রী    ভারতে চলে যায়। তারপর আর তার সাথে দেখা হয়নি। এর পর আমি  আর বিয়ে করেননি।

মধুসূদনের জবানবন্দী থেকে এ পর্যন্ত পড়ে শোনানোর পর জেরা থেকে পড়ে শোনান অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান।  জেরা থেকে পড়ে শোনানোর শুরুতে অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং দেলোয়ার শিকদার যে এক ব্যক্তি নয় এবং আলাদা তা এ সাক্ষী স্বীকার করেছেন। তাছাড়া তিনি সাক্ষ্য দেয়ার সময় মাওলানা সাঈদীকে ডকে চিহ্নিত করতে পারেননি। তিনি বলেন, সাঈদী এবং শিকদার নাম বিষয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে। কিন্তু আজকে এ সাক্ষীর বরাতে এ বিষয়টি যতটুকু এসেছে তা তুলে ধরতে চাই।

ট্রাইব্যুনালে জেরায় মধুসূদনকে প্রশ্ন করা হয় ‘সেকেন্দার শিকদার, দানেস মোল্লা, সৈয়দ মো: আফজাল, দেলোয়ার শিকদার পিতা রসুল  শিকদার এরা রাজাকার বাহিনী গঠন করে’।
জবাবে মুধসূদন ঘরামী বলেন, ‘হ্যা’।
জেরায় তাকে আবার প্রশ্ন করা হয় ‘আপনার এলাকায় আরেকজন কুখ্যাত রাজাকার ছিল মোসলেম মাওলানা?
জবাবে মধুসূদন বলেন ‘হ্যা’। 
জেরায় আরেকটি প্রশ্ন ছিল ‘রাজ্জাক রাজাকার, দেলোয়ার শিকদার পিতা রসুল শিকদার। এদের অত্যাচারের কারনে স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা  এবং এলাকার লোকজন মিলে এদেরকে মেরে ফেলে।’
এর জবাবে সাক্ষী বলেন,  পিরোজপুরে হতে পারে।

এ পর্যায়ে অ্যাডভোকেট শহজাহান বলেন, মাওলানা সাঈদীর পিতার নাম ইউসুফ সাঈদী । আর ট্রাইব্যুনালে জেরার সময় মধুসূদনকে   সুষ্পষ্টভাবে দেলোয়ার শিকদার পিতা রসুল শিকদার উল্লেখ করে প্রশ্ন করা হয়েছে যে, ১৯৭১ সালে অত্যাচারের কারনে দেলোয়ার শিকদারকে মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকার লোকজন মিলে মেরে ফেলেছে।  জবাবে মধুসূদন বলেছেন দেলোয়ার শিকদারকে পিরোজপুর মেরে ফেলা হতে পারে।

এরপর অ্যাডভোকেট শাহজাহান মধূসূদনকে ট্রাইব্যুনালে  জেরার নিম্নের অংশ পড়ে শোনান  আদালতে।
আইনজীবী : আপনার স্ত্রী তো কোন মেম্বার চেয়ারম্যান, রাজাকার বা পিস কিমিটির লোকদের চিনতেননা।
সাক্ষী : না।
আইনজীবী : দেলোয়ার পরে নিজেকে শিকদার পরিচয় দিত। আগে শুনিনি এখন শুনছি সাঈদী-এ কথাগুলো আপনি ট্রাইব্যুনালে বলেছেন কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে বলেননি।
সাক্ষী : নাও বলতে পারি।
আইনজীবী : স্ত্রী বলে, তোমাকে যে মুসলমান বানায় সে এসেছিল, তুমি পালাও। একথাও আপনি বলেননি তদন্ত  কর্মকর্তার কাছে।
সাক্ষী : স্মরন নেই।
আইনজীবী : বাজারে মসজিদে বসে মুসলমান বানায় সেকথাও বলেননি  তদন্ত  কর্মকর্তার কাছে।
সাক্ষী : মনে নেই।
আইনজীবী : আপনার নাম আলী আশরাফ আর  কৃষ্ণ বাবুর নাম আলী আকবার রাখা হয় সেকথাও বলেননি।
সাক্ষী : স্মরন নেই।
আইনজীবী : কাশেম আলী হাওলাদার ওরফে কাশেম  মাস্টার আপনার একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলে যায় এবং সাত মাস জেল খাটে।
সাক্ষী : হ্যা।
আইনজীবী : কাশেম মাস্টার আপনার স্ত্রীকে ধর্ষন করে সে অভিযোগ আপনি করেন  এবং সে কারনে সে জেলে যায়।
সাক্ষী : সত্য নয়।
আইনজীবী : আপনার স্ত্রী শেফালী ঘরামী ভারতে চলে গেছে  আপনার সাথে বিরোধের কারনে।
সাক্ষী : সত্য নয়।
আইনজীবী : ২০১০ সালের পর থেকে আপনি  এবং আপনার বৌদী বয়স্ক ভাতা পান।
সাক্ষী : হ্যা।
আইনজীবী : আপনারা দুজন একান্নে/একপাকে খান।
সাক্ষী : হ্যা।
আইনজীবী : সাক্ষী দেয়ার জন্য কতদিন আগে ঢাকায় আসলেন?
সাক্ষী : ১৮/২০ দিন আগে অনুমান।
আইনজীবী : আপনি সুস্থ  অবস্থায়  ঢাকায় আসেন। এই মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য চাপে পড়ে আপনি অসুস্থ  হয়ে পড়েন।
সাক্ষী : প্রায় সুস্থ  অবস্থায় ঢাকায় আসি। পরে অসুস্থ  হই।

আজ যুক্তি উপস্থাপনের শুরুতে অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, আমি জ্বরে আক্রান্ত।  শুনানীতে অংশ নিতে কষ্ট হচ্ছে।  শুনানী মুলতবি করলে ভাল হয়। প্রধান বিচারপতি বলেন, শুরু করেন। তারপর দেখব। এরপর বিরতি পর্যন্ত যুক্তি উপস্থাপনের পর অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, আগামী রোববার আবার বলতে চাই। আজ মুলতবি করা হোক। আদালত  আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ এ মামলার কার্যক্রম মুলতবি ঘোষনা করেন।

রাষ্ট্রপক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিতি ছিলেন গিয়াসউদ্দিন মিঠু, তারিকুল ইসলাম, আবু বকর সিদ্দিক প্রমুখ।







বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল আবেদন শুনানী আজ অনুষ্ঠিত হয়নি

মাওলানা সাঈদীর আপিল আবেদন শুনানী আজ অনুষ্ঠিত হয়নি। আপিল বিভাগের আজকের শুনানীর তালিকায় মাওলানা সাঈদীর মামলাটি ছিল ৬৭ নং ক্রমিকে। তবে ৬৬ নং ক্রমিকে থাকা একটি হত্যা মামলার শুনানী শেষ করতেই একটা বেজে যায়। ফলে মাওলানা সাঈদীর আবেদনের শুনানী আজ হয়নি। এদিকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপিল আবেদন মামলায় এভিডেন্সের সারসংক্ষেপ আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল // রাষ্ট্রপক্ষের ডকুমেন্টেই উল্লেখ আছে বিশাবালীকে পিরোজপুর বলেশ্বর নদীর ঘাটে হত্যা করা হয়-শুনানীতে আইনজীবী

মেহেদী হাসান, ১১/২/২০১৪
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন শুনানীতে আজ  আলোচিত সুখরঞ্জন বালীর ভাই বিশাবালী হত্যার অভিযোগ খন্ডন করে আসামী পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে। অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ মাওলানা সাঈদীর  উপস্থিতিতে এবং নির্দেশে উমেদপুর গ্রামে বিশালীর বাড়ির সামনে নারকেল গাছের সাথে বেঁধে তাকে হত্যা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরাও তাদের জবানবন্দীতে একই তথ্য দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা একটি ডকুমেন্টেই দেখা যায় বিশাবালীকে পিরোজপুর বলেশ্বর নদীর ঘাটে হত্যা করা হয়েছে। এ থেকে প্রমানিত যে, বিশাবালীকে মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে হত্যা করা হয়নি।

মাওলানা সাঈদীকে ১০ নং অভিযোগ তথা বিশাবালী হত্যার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। গতকাল এ অভিযোগে যুক্তি উপস্থাপন ছাড়াও ১১ নং অভিযোগ তথা মাহবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়ি লুটের বিষয়ে যুক্তি পেশ শেষ হয়েছে। যুক্তি উপস্থাপনে অন্যান্য দিনের মত আজো অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহানকে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন।
প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।

বিশাবালী হত্যার অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি পেশ :
অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, বিশাবালী হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের এক নং সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদার  ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দীতে বলেছেন “২ জুন সকাল বেলা আমি নিজ বাড়িতে ছিলাম। স্বাক্ষী খলিলুর রহমান খুব ভোরে আমার বাড়ি এসে গোপনে জানিয়ে দেয় যে, আপনি এবং আপনার ঘরে যে আওয়ামী লীগ এর  নেতাকর্মী  এবং মুক্তিযোদ্ধারা আছে তাদের লিস্ট হয়েছে ধরার জন্য। আমি আমার ঘরে মুক্তিযোদ্ধা  ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের  আশ্রয় দিতাম  । আমি তাদেরকে অনেক দূরে নিয়ে রাখি। লোকদের কাছ থেকে জানতে পারি অনুমান সকাল ১০টায় পারের হাটের শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী দানশ আলী মোল্লা, সেকেন্দার শিকদার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মোমিন হাওলাদার, হাকিম  কাজী, হাবিবুর রহমান মুন্সী  পাক হানাদার বাহিনী সঙ্গে নিয় উমেদপুর গ্রামে  আমার বাড়ির  নিকটস্থ হিন্দু পাড়ায় আক্রমণ চালিয়েছে। চিত্ত রঞ্জন তালুকদার, জগৎ তালুকদার, বিশাবালী, শুকুরবালী, পনির মন্ডলসহ আরো অনেকের ২৫/৩০টি ঘর লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। প্রায় ১৫ লক্ষ  টাকার ক্ষতি সাধিত হয়।
বিশাবালী অসুস্থ  থাকায় তাকে ধরে ফেলে এবং একটি নারিকেল গাছের সাথে বেঁেধ মারমিট করে। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নির্দেশক্রমে বলে যে, ওটাকে যখন পেয়েছি ওটাকে গুলি কর। জনৈক রাজাকার গুলি করে বিশাবালীকে হত্যা করে।”

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, মাহবুবুর রহমান খলিলের কাছ থেকে ঘটনার দিন ভোরে খবর পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু  এই  খলিলুর রহমানের জন্ম সনদে   জন্ম তারিখ   লেখা রয়েছে  ১৯৭২ সালের ১৩ এপ্রিল।  ভোটার তালিকা এবং তার  কর্মস্থলের তথ্য বিবরনিতেও  জন্ম    তারিখ একই লেখা আছে।  কাজেই জন্ম সনদ অনুযায়ী ১৯৭১ সালে তার জন্মই হয়নি। কাজেই এরূপ ব্যক্তির কাছ থেকে খবর পাওয়ার কথা অসম্ভব । 
এছাড়া এক নং সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদারের এসএসসির নিবন্ধনে তার জন্ম তারিখ ছিল ২০ মার্চ ১৯৫৯ সাল। সে হিসেবে ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল ১২ বছর। এ তথ্য যে বিশ্বাসযোগ্য তার প্রমান হল তার বড় বোন মাতোয়ারা বেগমের জন্ম তারিখ ১৯/৭/১৯৫৭।

অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ এবং সাক্ষীদের দাবি বিশাবালীকে  উমেদপুরে তাদের বাড়ির সামনে একটি নারকেল গাছের সাথে বেঁধে মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে গুলি করে হত্যা করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষেরই দাখিল করা একটি ডকুমেন্টে দেখা যায় তাকে পিরোজপুর বলেশ্বর নদীর বেদিতে হত্যা করা হয়েছে।
এ বিষয়ক ডকুমেন্ট জমা দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের  এক নং সাক্ষী এবং মামলার বাদী মাহবুবুল আলম হাওলাদার। মাহবুুবুল আলম  জিয়ানগর থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে পিরোজপুর বলেশ্বর নদীর বেদিতে নিয়ে ১৯৭১ সালে যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের একটি তালিকা তৈরি করেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্যাডে তৈরি করা নিহতদের এ তালিকায় এক নং ক্রমিকে রয়েছে বিশাবালীর নাম। মাহবুবুল আলম হাওলাদার এ তালিকা তদন্ত কর্মকর্তাকে দিয়েছেন এবং রাষ্ট্রপক্ষ এ ডকুমেন্টের ওপর নির্ভর করেছে । কাজেই তাদের দাবি অনুযায়ী বিশাবালীকে পিরোজপুর বলেশ্বর নদীর বেদিতে হত্যা করা হয়েছে।

এরপর তিনি বিশাবালী হত্যার  অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের পাঁচ নং সাক্ষী মাহতাব উদ্দিনের সাক্ষ্য খন্ডন করেন। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালে মাহতাব বলেছেন ১৯৭১ সালে  ২ জুন উমেদপুরে অগ্নিসংযোগ এবং বিশাবালীকে হত্যার দিন তিনি পাড়েরহাট বাজারে গিয়েছিলেন এবং যাবার পথে এ ঘটনা দেখেছেন। অথচ তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় বলেছেন, ২ জুন তিনি পাড়েরহাট যাবার কথা তাকে বলেননি। কাজেই  সাক্ষী মাহতাবের কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর পাড়েরহাট না গেলে ঘটনা দেখার কথাও সত্য নয়।
জেরায় মাহতাব এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন তিনি ৪০ বছরেও বিশবালীর লাশ কোথায় গেল সে বিষয়ে খোঁজ নেননি এবং কোন রাজাকার তাকে গুলি করেছিল তাও জানার চেষ্টা করেননি।

এরপর অ্যাডভোকেট শাহজাহান  বিশাবালী হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের নবম সাক্ষী আলতাফ হোসেনের সাক্ষ্য খন্ডন করে যুক্তি পেশ করেন। নবম সাক্ষী তার জবানবন্দীতে বলেছেন, ১৯৭১ সালের ২ জুন মামার বাড়ি উমেদপুর গ্রামে যাই। যাবার পথে   রাস্তায় দাড়িয়ে দেখি  একদল পাক হানাদার বাহিনী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ আরো অনেক রাজাকার  উমেদপুর গ্রামে হিন্দু পাড়ায় ঢুকছে। এ ঘটনা দেখার জন্য রাস্তার পাশে ঝোপের আড়ালে চলে যাই। যাবার পর দেখি পাক হানাদার বাহিনী  এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী হিন্দু পাড়ার ঘরে ঢুকে মালামাল লুট করে। ১৮/২০টি ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ইতোমধ্যে বিশাবালীকে ধরে নারকেল গাছের সাথে বেঁধে রাজাকাররা মারিপট করে। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পাক হানাদার বাহিনীর সাথে কি যেন আলাপ আলোচান করল। তখন সাঈদী সাব বলে, শালাকে গুলি কর। এ কথা বলার পর একজন রাজাকার রাইফেল বা পিস্তল ঠিক বলতে পারবনা,  লম্বা লম্বা দেখেছি,  তা দিয়ে গুলি করে। গুলি করার  সাথে সাথে মা বলে চিৎকার  দেয়। আমি ভয়ে কাতর হয়ে  ঐ জঙ্গলের আরো গভীরে চলে যাই। এরপর মামার বাড়ি গিয়ে দুপুরে খেয়ে  অনেকের সাথে বিকালে পোড়াবাড়ি দেখতে যাই। লোকজনকে বলাবলি করতে শুনি লাশটা গেল কোথায়। অনেকে লক্ত টক্ত দেখতে পায়। আমিও রক্ত দেখি। লোকজনকে বলাবলি করতে শুনি ওকে খালে ফালাইয়া দিছে।”

অ্যাডভোকেটশ শাহজাহান বলেন, ট্রাইব্যুনালে জেরার সময় সাক্ষী আলতাফ হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয় ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পাক হানাদার বাহিনীর সাথে কি যেন আলাপ আলোচান করল। তখন সাঈদী সাব বলে, শালাকে গুলি কর। এ কথা বলার পর একজন রাজাকার রাইফেল বা পিস্তল ঠিক বলতে পারবনা,  লম্বা লম্বা দেখেছি,  তা দিয়ে গুলি করে। গুলি করার  সাথে সাথে মা বলে চিৎকার  দেয় । এরপর মামার বাড়ি গিয়ে দুপুরে খেয়ে  অনেকের সাথে বিকালে পোড়াবাড়ি দেখতে যাই। লোকজনকে বলাবলি করতে শুনি লাশটা গেল কোথায়। অনেকে লক্ত টক্ত দেখতে পায়। আমিও রক্ত দেখি। লোকজনকে বলাবলি করতে শুনি ওকে খালে ফালাইয়া দিছে ” একথাগুলো আপনি তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেছিলেন কি-না। সাক্ষী জানায় বলেছি।
কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার সময় প্রশ্ন করা হয় সাক্ষী উপরোক্ত কথাগুলো আপনাকে বলেছিল কি-না। তদন্ত কর্মকর্তা জানান সাক্ষী এ কথাগুলো তাকে বলেননি।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, এটাই হল ঘটনার মূল বিবরন।  আর একথাই তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দীতে বলেননি। অথচ ট্রাইব্যুনালে এসে তিনি এটা বলেছেন। কাজেই তার একথা বিশ্বাযোগ্য নয়।
সাক্ষী আলতাব হোসেনও বলেছেন বিশাবালীকে নারকেল গাছের সাথে বেধে কোন রাজাকার গুলি করেছিল তার নাম তিনি জানেননা এবং আজ পর্যন্ত জানারও চেষ্টা করেননি।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, বিশাবালী হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের তিনজন সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদার, মাহতাব উদ্দিন এবং আলতাফ হোসেন তিনজনের বাড়িই টেংরাখালি। আর বিশবালীর বাড়ি উমেদপুর। টেংরাখালি থেকে উমেদপুর থেকে টেংরাখালির দূরত্ব ২ কিলোমিটার। কাজেই দেখা যাচ্ছে বিশাবালীকে হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সব সাক্ষী অন্যগ্রামের।

বিশাবালী হত্যা বিষয়ে বিশাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালীকে আসামী পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আনা এবং ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে তাকে অপহরনের বিষয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য উপস্থাপন করতে চাইলে একজন বিচারপতি আপত্তি করে বলেন এটিতো মামলার কোন এভিডেন্স নয়। পরে  অ্যাডভোকেট শাজহানা আর এ বিষয়ে আগাননি।
তবে তিনি বলেন, সুখরঞ্জন বালী ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী এবং তাকে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে আনার জন্য সমন চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল ট্রাইব্যুনালে।

এরপর বিশাবালী হত্যা বিষয়ে আদালতের কিছু প্রশ্নের উত্তর পরবতীতে দেয়া হবে মর্মে এ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন অসমাপ্ত রেখে তিনি ১১ নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন।

১১নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি পেশ :
১১ নং অভিযোগ হল মাহবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে লুটপাট এবং তার বড় ভাই মজিদ হাওলাদারকে নির্যাতন। মাহবুবুল আলম হাওলাদার হলেন মামলার বাদী এবং রাষ্ট্রপক্ষের এক নং সাক্ষী।
মাহবুবুল আলম তার জবানবন্দীতে তাদের বাড়ি লুটের বিষয়ে বলেছেন, “আমি এর একটু পূর্বে যখন জানি যে, আমার বাড়ির নিকটস্থ হিন্দু পাড়ায় আক্রমণ চালিয়েছে তখন আমি দণি দিক দিয়ে হিন্দু পাড়ার নিকটস্থ রাস্তার দক্ষিনে একটু দূরে ঝোপের পাশে আরো অনেককে দেখে আমিও সেখানে স্থান নেই। যখনই গুলি করে আমিসহ ওখানে আরো যারা ছিল মাহতাব তালুকদার, লতিফ হাওলাদার  আরো অনেকে ওখান থেকে দৌড়ে অন্যত্র দূরে আড়ালে স্থান নেই। অনুমান ১২টায় এ হিন্দু পারা থেকে শান্তি কমিটির লোক ও কিছু রাজাকার আমার নিজ বাড়ির দিকে যেতে দেখি এবং আমার বাড়ির ভেতর গিয়ে আমার ভাই আব্দুল মজিদকে  চাপ সৃষ্টি করে। আমাকে ও আওয়ামী লীগ এর নেতাকর্মী মুক্তিযোদ্ধাদের তাদের সামনে  হাজির করতে বলে। আমার ভাই অস্বীকার করলে তার ওপর অত্যাচার চালানো হয়। এক পর্যায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে আলমিরা হতে ১০ ভরি ¯¦র্ণালঙ্কার নগদ ২০ হাজার টাকা, আমার মা যেখানে থাকত সেই ঘর থেকে দুই ভরি স্বর্ণালঙ্কার, প্রায় তিন লাখ টাকার মালামাল  এবং ঘরের আসবাবপত্র ফার্নিচার ভেঙ্গে চুরে প্রায় ৩০ হাজার টাকার ক্ষতি সাধন করে।”

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদার ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একজন অসহায় বেকর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘর নির্মানের জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে আবেদন করেন। মাওলানা সাঈদীর কাছ থেকে সেই আবেদনের জন্য সুপারিশ সংগ্রহ করেন। সেই আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন “ বর্তমান জিয়ানগর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসিতেছি। আমি স্বাধীনতা যুদ্ধের পর হইতে আর্থিক অসুবিধায় দিন যাপন করিতেছি। বর্তমানে আর্থিক একেবারে নি:সহায় হইয়া পড়িয়াছি। আমরা তিনভাই তখন একই ঘরে বসবাস করিতাম। ভাইরা আমার কারনে স্বাধীনতাবিরোধীরা ঘর পোড়াইয়া ফেলার আশঙ্কায়, অবস্থা বুঝতে পেরে ঘরখানা ভেঙ্গে আলাদাভাবে ঘর তোলে সেই থেকে তারা আলাদা থাকে। আমি সেই খালি পোতার উপর কোন প্রকার  ছাপড়া দিয়া ছেলে মেয়ে ও স্ত্রী পরিজন নিয়ে কোনমতে কষ্টে দিনযাপন করিতেছি। আজ পর্যন্ত ঘরখানা তৈরি করিতে পারানাই। বর্তমানে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায়। শেষ জীবনে একখানা ঘর নির্মান করিয়া পরিবার পরিজন নিয়া কালবৈশাখী ঝড়রে কবল থেকে সাময়িকভাবে ভালভাবে বাঁচতে চাই। তাই  একেবারে নিরূপায় হইয়া আপনার শরনাপন্ন হাইয়াছি। ”

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, এই দরাখস্ত থেকে এটা প্রমানিত যে, ১৯৭১ সালে তাদের বাড়ি লুট হয়নি এবয় আসলে ১৯৭১ সালে তার নিজের কোন বাড়িই  ছিলনা।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, মাহবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়ি লুটের অভিযোগ বিষয়ে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে একজন সাক্ষী উল্লেখ করেছেন। তিনি হলেন তিন নং সাক্ষী নুরুল হক হাওলাদার।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালে নুরুল হক হাওলাদার  তার জবানবন্দীতে বলেছেন, “টেংরাখালীর মাহবুব আলম হাওলাদার আমার ভগ্নিপতির আপন ভাগ্নে। আরেকদিকে তিনি আমার আপন ফুফাতো ভাইয়ের চাচাতো ভাই। সেই হিসাবেও তিনি আমারও ভাই। ফুফাতো ভাইয়ের ঘর ও মাহবুব আলম হাওলাদারের ঘর পাশাপাশি। ছোট বেলা থেকেই ঐ বাড়িতে আমাদের যাওয়া আসা ছিল। ৪০ বৎসরের মধ্যে আমি কোন দিন শুনি নাই যে, তাদের বাড়ি লুট হয়েছিল। আমি শুনি যে সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে তিনি একটি মামলা করেছেন। মামলা হওয়ার পরে আমি তার বড় ভাই বাতেন হাওলাদারের নিকট জিজ্ঞাসা করি, ভাইডি মাহবুব তো সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে কেস করল। বাতেন হাওলাদার উত্তরে বলে, ওকথা বলো না, বললে আমার লজ্জা করে, আমাদের বাড়িতে লুট হলে তো তোমরাও জানতা। আমাদের বাড়ি তো দূরের কথা টেংরাখালী গ্রামে কখনও রাজাকার বা পাক বাহিনী আসে নাই। তৎপর আমি আমার ফুফাতো ভাই আব্দুস সালাম হাওলাদারকে জিজ্ঞাসা করলে সে উত্তর দিল, ১৯৭১ সালে মাহবুব হাওলাদারের বয়স ১০/১১ বৎসর ছিল এবং সে প্রাইমারী স্কুলে পড়তো। ও বড় কোন স্বার্থের জন্য সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছে। আমাদের বাড়িতে কিংবা আশে পাশে কোন সাক্ষী পাবে না বিধায় দূরের সাক্ষী মেনেছে। সব মিলিয়ে ওর বাবার চার/পাঁচ বিঘা সম্পত্তি ছিল মাত্র। মাহবুবুল আলম হাওলাদারের ভাগে পড়ে এক/দেড় বিঘা সম্পত্তি। সে সম্পত্তি সে বিক্রি করে ফেলেছে এবং তার স্ত্রীর সম্পত্তিও বিক্রয় করে ফেলেছে। সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা করার পর সে এখন দোতলা বিল্ডিং তৈরি করেছে। একতলা শেষ হয়েছে। । ”
 শুনানী আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।

সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল // মমতাজ বেগমের মামলায় আসামীর তালিকায় নাম নেই মাওলানা সাঈদীর : শুনানীতে আসামীর আইনজীবী

মেহেদী হাসান,১০/২/২০১৪
বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় আলোচিত ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগ এবং তার স্ত্রী মমতাজ বেগম কর্তৃক ১৯৭২ সালে দায়ের করা মামলা বিষয়ে যুক্তি পেশ করেছে আসামী পক্ষ। আজ  এ বিষয়ে যুক্তি উপস্থান করে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম পিরোজপুরে ১৯৭২ সালে যে মামলা করেন তাতে তিনি মোট ১৩ জনকে আসামী করেন। কিন্তু সেই আসামীর তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। শুধু তাই নয়, মমতাজ বেগমের সে মামলার বিবরনে বলা হয়েছে ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবার নলবুনিয়া তার শশুর বাড়ি থাকা অবস্থায়। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি মাওলানা সাঈদীর পরামর্শে ৮ মে তাকে পাড়েরহাট বাজারে হত্যা করা হয়।

তিনি বলেন ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। তিনি যদি এর সাথে জড়িত থাকতেন তাহলে অন্তত মমতাজ বেগমের মামলায় তাকে তখন আসামী করা হত।
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।

শুনানীর সময় অ্যাডভোকেট শাহজাহান মমতাজ বেগমের মামলার সার্টিফায়েড কপি আদালতে পেশ করেন।
অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার বিচার চেয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ পিরোজপুর এসডিও বরাবর এ মামলা করেন।  পরে ১৬ জুলাই এ মামলাটি থানায় এজাহার হিসেবে পাঠানো হয়।

মামলার এজাহারে মমতাজ বেগম উল্লেখ করেছেন   তার স্বামী  ইব্রাহীম কুট্টি তার বাপের বাড়ি নলবুনিয়া থাকা অবস্থায় শান্তি কমিটির লোকজন এবং পাকিস্তান আর্মি গুলি করে  হত্যা করেছে। ঘটনার সময়কাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৭১ সালের ১  অক্টোবর ।

আর রাষ্ট্রপক্ষ চাজশিটে করেছে তাকে পাড়েরহাট বাজারে ১৯৭১ সালের হত্যা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরাও তাদের সাক্ষ্যে বলেছেন ইব্রাহীম কুট্টিকে পাড়েরহাট বাজার ৮ মে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে যে মামলা করেছেন তাতে ঘটনাস্থল এবং ঘটনার সময়কাল সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন দেখা যায়।
তিনি বলেন, মমতাজ বেগমের মামলায় আরো উল্লেখ আছে যে, ওই ঘটনার সময় তাদের বাড়ি থেকে তার ভাই সাহেব  আলীকে এবং তার মা সিতারা বেগমকেও ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পিরোজপুর। পরে তার মাকে ছেড়ে দেয়া হলেও তার ভাই সাহেব আলীকে আর ছাড়া হয়নি। তাকে পাকিস্তান পিরোজপুরে আর্মি গুলি করে হত্যা করে।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, মমতাজ বেগম  সে মামলায় মোট ১৩ জনকে আসামী করেছেন।  এরা হল  দানেশ মোল্লা,  আতাহার আলী, আশ্রাব আলী, আব্দুল মান্নান, আইউব আলী, কালাম চৌকিদার, রুহুল আমিন, আব্দুল হাকিম মুন্সি, মমিন উদ্দিন, সেকোন্দার আলী শিকদার, শামসুর রহমান এসআই, মোসলেম মাওলানা।  এছাড়া পাকিস্তান আর্মিকেও আসামী করা হয় মমতাজ বেগমের মামলায়। কিন্তু মমতাজ বেগমের মামলায় আসামীদের তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।
তিনি বলেন, পাড়েরহাটে ৮ মে’র ঘটনায় বারবার ঘুরে ফিরে দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার সিকদার, মোসমেল মাওলানা এদের নাম এসেছে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যে। মমতাজ বেগমের মামলায়ও তাদেরকেই আসামী করা হয়েছে।

এরপর অ্যাডভোকেট শাহজাহান মমতাজ বগেমের মামলার বিবরন পড়ে শোনান আদালতে। ১৯৭২ সালে দায়ের করা সে মামলার বিবরন নিম্নরূপ:
“ঘটনার বিবরন এই যে, বিবাদীগন পরষ্পর যোগাযোগে রাইফেল পিস্তল ছোরা লাঠি ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হইয়া আমার পিতার ঘর বেড়দিয়া আমার স্বামীর উপর গুলি করিয়া হত্যা করিয়া আমার শরীরে জখম করিয়া আমার মাতা ও ভ্রাতাকে ধরিয়া পিরোজপুর আনিয়া আমার মাতাকে ছাড়িয়া দিয়া আমার ভ্রাতা সিরাজুলকে গুলি করিয়া হত্যা করিয়াছে। আক্রোশের কারণ এই যে, আমি ও আমার স্বামী আমার স্বামীর বারিতে বাদুরা গ্রামে বাসবাস করিতেছিলাম। গত মে মাসে পাক সৈন্য এদেশে আসিয়া যখন অকারনে গুলি করিয়া মানুষ হত্যা করিতে থাকে তখন কতিপয় হিন্দু আমাদের সরনাপন্ন হওয়ায় আমরা তাহাদের আশ্রয় দেওয়ায় পাক সৈন্য ও তাহাদের দালালরা আমার স্বামীকে হত্যা করিতে খোঁজ করিতে থাকায় আমরা ভয়ে ভীত হইয়া আমরা পিত্রালয়ে বসবাস করিতেছিলাম। তথায় বিবাদীগন ক্রোধ করিয়া উক্তরুপ অত্যাচার করিয়াছে।

প্রকাশ থাকে যে, বর্তমানে আমি গর্ভবতী থাকায় আমার পিতা পারোরহাট আওমীলীগ অফিসে জানাইয়া কোন প্রতিকার পাইনাই। তাই এই দরখাস্ত করিতে বিলম্ব হইল।
সে মতে প্রার্থনা, আদালত দয়া করিয়া উক্ত ধারামতে উক্ত বিবাদীগনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট দিয়া ধৃত করাইয়া সুবিচার করিতে আজ্ঞা হয়। ইতি মমতাজ বেগম”

মামলার বিবরন পড়া শেষে অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের দাবি ১৯৭১ সালে আট মে ইব্রাহীমকে পাড়েরহাট বাজারে হত্যা করা হয়েছে। আর ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে মমতাজ বেগম তার আবেদনে উল্লেখ করেছেন তিনি তখন গর্ভবতী। ১৯৭১ সালের ৮ মে পাড়েরহাট ইব্রাহীম নিহত হলে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে তার গর্ভবতী থাকার কথা নয়। এথেকেও প্রমানিত যে ইব্রাহীম কুট্টি ১৯৭১ সালে আট মে পাড়েরহাট নিহত হয়নি। তাকে ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর তার শশুর বাড়ি নলবুনিয়া থাকা অবস্থায়ই হত্যা করা হয়েছে।  এর সাথে মাওলান সাঈদী কোন অবস্থাতেই জড়িত নন। থাকলে অন্তত মমতাজ বেগমের মামলায় তার নাম থাকত আসামী হিসেবে।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আমাদের এ ডকুমেন্টকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং একে অসত্য আখ্যায়িত করেছে।  তাদের উচিত ছিল পিরোজপুর থেকে পুলিশ কর্তৃপক্ষকে ডাকার ব্যবস্থা করে তাদের দাবি প্রমান করা। কিন্তু তারা তা করেনি। বরং  আমরা থানা থেকে এ মামলার নথিপত্র তলবের জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সে আবেদন খারিজ করে দিয়েছে।


ইব্রাহীম কুট্টি বিষয়ে গতকাল যুক্তি পেশের শুরুতে অ্যাডভোকেট শাহজাহান রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের পরষ্পরবিরোধী কয়েকটি তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ষষ্ঠ সাক্ষী মানিক পসারী বলেছেন তাকে পাড়েরহাট পুলের গোড়ায় গুলি করে হত্যা করা হয়।
সপ্তম সাক্ষী মফিজ উদ্দিন বলেছেন, পুল থেকে ২০/৩০ হাত দূরে নিয়ে তাকে গুলি দিয়েছে। অষ্টম সাক্ষী বলেছেন ব্রিজের উপর নিয়ে তাকে গুলি করা হয়েছে। চতুর্থ সাক্ষী সুলতান বলেছেন, তাকে থানার ঘাটে গুলি করা হয়েছে। এভাবে হত্যার ঘটনাস্থল সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরাই ভিন্ন ভিন্ন কথা বলেছেন। শুধু তাই নয় রাষ্ট্রপক্ষের একটি ডকুমেন্টেও আবার হত্যার ঘটনাস্থল সম্পর্কে আরেক রকম তথ্য রয়েছে। এ ডকুমেন্ট জমা দিয়েছিলেন এক নং সাক্ষী এবং মামলার বাদী মাহবুবুল আলম হাওলাদার। মাহবুুবুল আলম  জিয়া নগর থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে পিরোজপুর বলেশ্বর নদীর বেদিতে নিয়ে যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের একটি তালিকা তৈরি করেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্যাডে তৈরি করা নিহতদের এ তালিকায় অন্যান্যদের মধ্যে ইব্রাহীম কুট্টির নাম রয়েছে একেবারে শেষে। এখানে উল্লেখ আছে ইব্রাহীম কুট্টিকে নলবুনিয়া তার শুশুর বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে বলেশ্বর নদীর বেদিতে হত্যা করা হয়।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষই এ ডকুমেন্ট জমা দিয়েছে এবং তারা এ ডকুমেন্ট এর ওপর নির্ভর করেছে। তাদের ডকুমেন্টেই উল্লেখ আছে ইব্রাহীম কুট্টিকে নলবুনিয়ায় তার শশুর বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে।  যে দাবি করেছে মাওলানা সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীরা। মাওলানা সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীরা বলেছেন তাকে ১ অক্টোবার নলবুনিয়া থাকা অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে।
অ্যাডভোটেক শাহজাহান বলেন এটা পরিষ্কার যে, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী এবং ডকুমেন্টে ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থান উল্লেখ আছে। আর রাষ্ট্রপক্ষ যখন ঘটনা স্থল থেকে সরে যায় তখন আসলে তারা মামলা থেকেই সরে গেছে।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, মাওলানা সাঈদীর পক্ষে ১৭ তম সাক্ষী ভাগিরথীর ছেলে গণেশ চন্দ্র সাহা অষ্টম অভিযোগ ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগ বিষয়ে একটি কথাও বলেননি। কিন্তু তারপরও এ অভিযোগ প্রমানের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল রায়ে অন্যান্য সাক্ষীর সাথে গনেশ চন্দ্রের ওপর  নির্ভর করেছে ।

মানিক পসারীর বাড়িতে আগুন দেয়ার অভিযোগ বিষয়ে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, একুশের চোখ অনুষ্ঠানে এক সাক্ষাৎকারে মানিক পসারি বলেছেন তাদের বাড়িঘর পোড়ানোর কোন চিহ্ন এতদিন পর আর নেই। কিন্তু ট্রাইব্যুনালে তাদের বাড়ির পোড়া টিন কাঠ আলামত হিসেবে হাজির করা হয়েছে। একুশের চোখ সাক্ষাৎকারে তার বক্তব্য অনুসারে এসব আলামত মিথ্যা।

অষ্টম অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শেষে গতকাল দশম অভিযোগ বিশাবালী হত্যার অভিযোগ খন্ডন করে যুক্তি পেশ শুরু হয়েছে। শুনানী আগামীকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।

শুনানীতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান এবং  আসামী পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে গিয়াস উদ্দন মিঠু, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন, তারিকুল ইসলাম, আবু বকর সিদ্দিক উপস্থিত ছিলেন।

রবিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

বিচার চলাকালে মাওলানা একেএম ইউসুফের ইন্তেকাল

মেহেদী হাসান ও হাবিবুর রহমান, ৯/২/২০১৪
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির বিশিষ্ট হাদিশ বিশারদ মাওলানা একেএম ইউসুফ (৮৮) ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহী ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বন্দী প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ আজ সকাল সোয়া এগারটায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায়  শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি কাশিমপুর কারাগার-১ এ বন্দী ছিলেন।

মরহুমের পরিবার থেকে জানানো হয়েছে কাশিমপুর (গাজিপুর) কারাগারে  আজ  সকালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ সকাল পৌনে ১১টার দিকে তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে নিয়ে আসে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোয়া ১১টা তার  মৃত্যু হয়।

মাওলানা একেএম ইসুফের ছেলে একেএম মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন সকাল সাড়ে আটটার দিকে কারা কর্তৃপক্ষ তাদেরকে পিতার অসুস্থতার কথা জানায় । তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার কথা জানানো হয় এবং তারা হাসপাতালে অপেক্ষা করেন। তবে তাকে যখন হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় তখন তিনি অচেতন ছিলেন এবং তারা কেউ কোন কথা বলতে পারেননি। হাসপাতালের ডাক্তাররা তাদের জানিয়েছেন তার পিতা স্ট্রোক করেছিলেন।

মাহবুবুর রহমান জানান, তাকে প্রথমে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হলে সেখান থেকে আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) এ নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু আইসিইউতে কোন রুম খালি না থাকায় তাকে বারডেম অথবা ঢাকা মেডিক্যালে পাঠানোর পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু তিনি বন্দী থাকায় এ বিষয়ে প্রকৃয়া সম্পন্ন না করে তাকে তাৎক্ষনিকভাবে বারডেম বা ঢাকা মেড্যিকালে  পাঠানো সম্ভব ছিলনা। সবশেষে  তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালের  জরুরি বিভাগে রেখেই চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়া হয় এবং এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার চলছিল মাওলানা একেএম ইউসুফের। উভয় পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এ মামলার যুক্তি উপস্থাপনের জন্য ধার্য্য ছিল। গত বছর ১২ মে মাওলানা ইউসুফকে তার ধানমন্ডি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর নির্দেশে। পরে তার মামলাটি ট্রাইব্যুনাল -২ এ হস্তান্তর করা হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ তথা  মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারাধীন এবং বন্দী অবস্থায় এই প্রথম কোন জামায়াত নেতার মৃত্যু হল। পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে  মাওলানা ইউসুফ হোসপাতালে মৃত্যুর পর তার লাশ ময়না তদন্ত ছাড়া তারা ফেরত নিতে চায়। তখন কারা কর্তৃপক্ষ জানায় ময়না তদন্ত ছাড়া লাশ ফেরত নিতে হলে  ট্রাইব্যুনালের অনুমতি লাগবে। আসামী পক্ষে অ্যাডভোকেট গাজী এমএইচ তামিম এরপর দরখাস্ত নিয়ে যান ট্রাইব্যুনালে। ট্রাইব্যুনাল কারা কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনেই লাশ হস্তান্তর করার জন্য আদেশ দেন দুপুরের পর।

গাজী তামিম জানান, বৃদ্ধ বয়সে মাওলানা ইউসুফের স্বাভাবিক মৃত্যুহয়েছে উল্লেখ করে লাশের ময়না তদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার জন্য আমরা ট্রাইব্যুনালে একটি আবেদন করি। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আবেদনের বিরোধিতা করেন। এরপর ট্রাইব্যুনাল পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। 
 সোয়া ছয়টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে এখনো তারা লাশ বুঝে পাননি। জানজার সময় এবং স্থানও এখনো ঠিক করা হয়নি।


বিচার চলাকালে মৃত্যু :
মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ (একেএম) ইউসুফের মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আগামী ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি বুধ ও বৃহস্পতিবার মামলার শেষ ধাপে রাষ্ট্রপক্ষের (আর্গুমেন্ট) যুক্তি উপস্থাপনের দিন ধার্য রয়েছে। মাওলানা ইউসুফের মৃত্যুর পর মামলার কার্যক্রম কি হবে সে বিষয়ে প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনাল আইনে মরোনত্ত্বর বিচার করার সুযোগ নেই। অন্যদিকে গাজী তামিম জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপনের দিন ধার্য রয়েছে। আশাকরি ওই দিন ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজনীয় আদেশ দেবেন।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি আসামীপক্ষের একমাত্র ডিফেন্স সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন মাওলানা ইউসুফের বড় ছেলে একেএম মাহবুবুর রহমান। এর আগে মাওলানা ইউসুফের বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষের ২৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।
গত ৩০ জানুয়ারি মাওলানা ইউসুফের বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো: হেলাল উদ্দিনকে আসামীপক্ষের জেরা শেষে তিনজন ডিফেন্স সাক্ষী দেয়ার অনুমতি দেন ট্রাইব্যুনালঅ। গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনদিন ডিফেন্স সাক্ষীদের সাক্ষ্য দেয়ার দিন ধার্য করা হয়। মাওলানা একেএম ইউসুফকেও ওই তিনদিন ট্রাইব্যুনালে হাজির থাকতে হবে বলে মৌখিকভাবে জানিয়ে দেন ট্রাইব্যুনাল। 
৩০ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তার জেরা শেষে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান মাওলানা ইউসুফের সাথে কথা বলেন এবং শারীরিক অবস্থা জানতে চান। জবাবে মাওলানা ইউসুফ বলেন, শরীর ভালো না। এরপর বিচারপতি বলেন, ঠান্ডা কমেছে। ঠান্ডা ও অসুস্থতার কারণে আপনাকে সাতদিন ট্রাইব্যুনালে না আসার অনুমতি দিয়েছি। সামনে তিনদিন আসতে হবে। আপনার পক্ষে ডিফেন্স সাক্ষী সাক্ষ্য দেবে। আপনার শোনা জরুরী। জবাবে মাওলানা ইউসুফ বলেন, তারিখ একটু দেরিতে দেয়া যায় কি না।
এরপর বিচারপতি ওবায়দুল হাসান মাওলানা ইউসুফের কাছে জানতে চান মালেক মন্ত্রী সভায় আপনারা কতজন ছিলেন? জবাবে মাওলানা ইউসুফ বলেন, কতজন ছিলাম মনে নেই।
এরপর বিচারপতি প্রশ্ন করেন, আপনি কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন? জবাবে মাওলানা ইউসুফ বলেন, রাজস্বতে ছিলাম। এরপর ট্রাইব্যুনাল প্রশ্ন করেন, কত তারিখে ও কোথায় আপনারা আত্মসমার্পণ করেন? জবাবে মাওলানা ইউসুফ বলেন, ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে ১৪ ডিসেম্বর হতে পারে। হোটেল ইন্টারকন্টিডেন্টলে।
এরপর বিচারপতি প্রশ্ন করেন, পদত্যাগের জন্য ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত কেন অপেক্ষা করলেন না? জবাবে মাওলানা ইউসুফ বলেন, তখনকার পরিস্থিতির কারণে। ট্রাইব্যুনাল আরো জানতে চান, মালেক সাহেব দাতের ডাক্তার ছিলেন কি না? জবাবে মাওলানা ইউসুফ বলেন, মনে নেই। এরপর ট্রাইব্যুনাল বলেন, একটু কষ্ট হলেও আপনাকে আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে ট্রাইব্যুনালে আসতে হবে।
গত ১৫ জানুয়ারি মাওলানা একেএম ইউসুফকে প্রয়োজন ছাড়া মামলা চলাকালীন সময় ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেন ট্রাইব্যুনাল। ওইদিন শারীরিক অসুস্থতার কারণে আদালতে অনুপস্থিত থাকার জন্য মাওলানা ইউসুফের পক্ষে একটি আবেদন দায়ের করা হয়। আবেদনে বলা হয়, ইউসুফ সাহেব কাশিমপুর কারাগারে থাকেন। তার ওষুধপত্রও সেখানে থাকে। ঠান্ডার মধ্যে দীর্ঘ পথ যাতায়াত করতে যেয়ে তিনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তিনি দীর্ঘদিন থেকে অসুস্থ। অসুস্থ ব্যক্তির থেকে মামলা চলাকালীন সময় অনুপস্থিত থাকা ট্রাইব্যুনাল রুলস পারমিট করে।
গত ১ আগস্ট মাওলানা একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে একাত্তর সালে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়। তার বিরুদ্ধে ১৩টি অপরাধের ঘটনা আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ১২ মে ট্রইব্যুনালের আদেশে ধানমন্ডির বাসা থেকে মাওলানা একেএম ইউসুফকে গ্রেফতার করা হয়। গত ৮ মে মাওলানা একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। গত ২২ এপ্রিল মাওলানা একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে তদন্ত চূড়ান্ত করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।


জীবনী :
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী মাওলানা একেএম ইউসুফ  ১৯২৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে বাগেরহাট জেলার শরনখোলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ফাজিল পরীক্ষায় পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৫২ সালে তিনি কামিল পাশ করেন। এরপর তিনি হাদিশ বিষয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং মোমতাজুল মোহদ্দেসিন খেতাব লাভ করেন। খুলনা আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন মাদ্রাসায় তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন শিক্ষা জীবন শেষে। ৩৫ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে  মাওলানা একেএম ইউসুফ খুলনা এবং বরিশাল অঞ্চল থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পূর্বে তিনি প্রথমে ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত খুলনা জামায়াতের আমির,  পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি তিনবার জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল এর দায়িত্ব পালন করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি জামায়াতের নায়েবে আমির হিসেবে বহাল ছিলেন।
রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পাশাপাশি ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ চাষী কল্যাণ সমিতি।
মহাগ্রন্থ আল কোরআন কি ও কেন, দারসুল কোরআন, হাদিসের আলোকে প্রভৃতি গ্রন্থের লেখক। মাওলানা একেএম ইউসুফ একাধারে আরবি, ইংরেজি, উর্দু এবং ফার্সি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন।
মাওলানা ইউসুফ পাঁচ কন্যা ও তিন পুত্রের জনক ছিলেন।

মাওলানা ইউসুফ সম্পর্কে বড় ছেলের জবানবন্দী:
মাওলানা ইউসুফের বড় ছেলে একেএম মাহবুবুর রহমান গত ৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দীতে বলেছিলেন, ’৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমার পিতা মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হলে আমরা পরিবারের সদস্যরা ঢাকা মিন্টু রোডে একই সঙ্গে বসবাস করতাম। ’৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মালেক মন্ত্রী সভার পদত্যাগের পর রেডক্রস ঘোষিত নিরপেক্ষ এলাকা হোটেল ইন্টারকন্টিডেন্টালে আমার পিতাসহ আমরা পরিবারের সবাই আশ্রয়গ্রহণ করি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের চার বা পাঁচ দিন পরে রেডক্রস কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। এরপর আমরা এক থেকে দেড়মাস ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আমার পিতাসহ স্বপরিবারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে ছিলাম। একপর্যায়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী মালেক মন্ত্রী সভার আটককৃত সদস্যদের বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করে এবং বাংলাদেশ সরকার তাদের কারাগারে প্রেরণ করে।
১৯৭২ সালে আমার পিতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সে মামলায় তার যাবজ্জিবন কারাদণ্ড হয়। কিন্তু যেহেতু আমার পিতার বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের অভিযোগ ছিল না সেজন্য ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার আওতায় আমার পিতাকে ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বরের পূর্বে মুক্তি দেয়া হয়। আমার পিতা অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন সত্য কিন্তু কোন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। স্বাধীনতার ৪০ বছর পর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণদিত হয়ে ২০০৯ সাল থেকে আমার পিতার বিরুদ্ধে কিছু মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। তার একটি হল এই মামলার সাক্ষী লিয়াকত আলী খান কর্তৃক দায়েরকৃত মোড়লগঞ্জ থানার মামলা নং ২২ (৫) ২০০৯। আমার পিতার বিরুদ্ধে দালাল আইন ১৯৭২ এর অধীনে একটি মামলা হয়। এই মামলায় স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-৩ তাকে যাবজ্জিবন কারাদণ্ড দেয়। উক্ত দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আমার পিতা হাইকোর্টে আফিল দায়ের করেছিলেন। এই মামলায় কয়েকটি ঘটনা সংক্রান্ত যথাক্রমে বাগেরহাট, মোড়লগঞ্জ ও কচুয়া থানায় দায়ের করা হয়েছিল। সেখানে আসামী হিসেবে আমার পিতার নাম ছিল না।







বুধবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল আবেদন// পিরোজপুর মামলায় মফিজ উদ্দিন বলেছেন ইব্রাহীম কুট্টিকে কে মেরেছে দেখিনি, জানিওনা

মেহেদী হাসান, ৫/২/২০১৪
বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলায় একটি আলোচিত অভিযোগ হল ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যা। এ অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগে রাষ্ট্র পক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হল মফিজউদ্দিন পসারী। মফিজ উদ্দিন পসারী ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা  ঘটনায় মাওলানা সাঈদীকে সরাসরি জড়িত করে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দিয়েছেন। মফিজ উদ্দিন পসারী একজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবে ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা ঘটনার বিবরন দিয়েছেন । কিন্তু একই সাক্ষী পিরোজপুরে একটি মামলায় মেজিস্ট্রেট এর কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে বলেছেন ইব্রাহীম কুট্টিকে কে মেরেছে তা তিনি দেখেননি এবং জানেনওনা।

ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মাওলানা সাঈদীকে   মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল আবেদনে আজ এ বিষয়ে আসামী পক্ষ যুক্তি পেশ করেন।
প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহন করেন।
মাওলানা সাঈদীর পক্ষে যুক্তি পেশ করেন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান। মফিজ উদ্দিন পসারী পিরোজপুরে মেজিস্ট্রেট এর কাছে ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে যে জবানবন্দী দেন তা তিনি আদালতে পড়ে শোনান। ২০১০ সালে মফিজউদ্দিন কর্তৃক প্রদত্ত সে জবানবন্দীতে ঘটনার বিবরনে লেখা রয়েছে- ‘আমি ১৯৭১ সালে  মুুক্তিযুদ্ধের সময় মানিক পসারীর পিতা সইজুদ্দীন পসারীর বাড়িতে গরু মহিষ চড়ানোর কাজ করতাম। আমার সাথে ইব্রাহীমও কাজ করত। একদিন পাক বাহিনীর লোকজন, মিলিটারি, দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার সিকদার ও দেলোয়ার আসে। এসে সইজুদ্দিন ও রইজুদ্দিনকে খোঁজ করে। তাদেরকে না পেয়ে বাড়িঘরে আগুন দেয়। আমাকে ও ইব্রাহীমকে মিলিটারি, সেকেন্দার সিকদার ও দানেশ মোল্লা নিয়ে যায়। আমি রাতে পালায়ে আসি। ইব্রাহীমকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে শুনি ইব্রাহীম মারা গেছে। কিন্তু কে মেরেছে দেখিনি ও জানিনা।’

কিন্তু এই মফিজ উদ্দিন পসারী ২০১১ সালে ২৯ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার সময় ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা ঘটনার বিবরন দিয়ে বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমি  পিরোজপুর বাদুরা গ্রামে তার মামা সইজুদ্দীন পসারীর বাড়িতে কাজ করতাম।  আমার সাথে ঐ বাড়িতে কাজ করত ইব্রাহমী কুট্টি নামে আরেক লোক। ১৯৭১ সালের ৮ মে সকালে   গরু মহিষ  নিয়ে চরে যাই। সাথে ইব্রাহিম কুট্টিও ছিল। কিন্তু  আনুমানিক ১০/১১টার দিকে  চরে বসে বসে মামার বাড়িতে  বাড়িতে আগুন  এবং  ধোয়া দেখতে পাই। তারপর মামার বাড়ির দিকে ফিরে আসি। ১২/১৪ জন পাক আর্মি, ২০/২২ জন রাজাকার মামার বাড়ি যাচ্ছে দেখতে পাই। তার মধ্যে দিলু  শিকদার ছিল। আমরা পালাতে চাইলে পাক আর্মি ধরে ফেলে। দিলু শিকদার ইব্রাহীমের চুল ধরে বলে “শুয়ারের বাচ্চা যাচ্ছো কোথায়”। রাজাকার মবিন, রাজ্জাক আরো কয়েকজন আমাদের দুজনকে এক দড়িতে  বাঁধে।  এরপর রাজাকাররা ঘরে ঢুকে  লুটপাট করে এবং কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেকেন্দা শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মবিন, রাজ্জাক দিলু শিকদারসহ আরো অনেক রাজাকার   তেল ছিটিয়ে ঘরে আগুন দিতে বলে। তারপর আমাদের দুজনকে পারেরহট বাজারে নিয়ে যায়। বাজারের  মধ্যে ব্রিজের মাঝখানে নিয়ে ইব্রাহিমকে জিজ্ঞেস করে সইজুদ্দীন পসারী, মানিক পসারী কোথায় থাকে। তুই তো সইজুদ্দীনের বডি গার্ড । তুই জানিস তারা কোথায়। না বললে তোকে গুলি করব। এরপর  পুল থেকে নামিয়ে দিলু শিকদার (তাদের ভাষায় দিলু শিকদার মানে মাওলানা সাঈদী) সেকেন্দার শিকাদর উর্দুতে কি যেন বলল। আমি উর্দু বুঝিনা এবং কি বলেছিল তা  শুনতে পাইনি। এরপর ইব্রাহিমকে  দড়ি থেকে খুলে ছেড়ে দিল এবং আমাকে নিয়ে সামনের দিকে গেল।
তারপর গুলির  শব্দ শুনতে পাই। ইব্রাহিম মা বলে চিৎকার করে। পেছনে তাকিয়ে দেখি ইব্রাহিমকে গুলি করছে। সেনাবানিহনী লাথি মেরে লাশ নদীতে ফেলে দিল। তারপর আমাকে নিয়ে পারেরহাট রাজাকার ক্যাম্পে গেল।   সইজুদ্দীন পসারী এবং মানিক পসারীর নাম জানার জন্য অনেক অত্যাচার করল দানেশ আলী মোল্লা, সেকেন্দার শিকদার, দেলু শিকদার মবিন রাজাকার।  এর এক পর্যায়ে রাতে বাথরুমে যাবার কথা বলে বাইরে বের হই এবং পালিয়ে আসি।

পিরোজপুরে যে মামলায় মফিজউদ্দিন পসারী জবানবন্দী দিয়েছেন সেই মামলটি করেছিলেন মানিক পসারী ২০০৯ সালে। মানিক পসারীও মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন। মানিক পসারী মাফিজ উদ্দিন পসারীর মামাত ভাই এবং মফিজ উদ্দিন মানিক পসারীদের বাড়িতে থেকে কাজ করত। ঘটনার দিন ইব্রাহীম কুট্টির সাথে মফিজকেও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে মফিজ উদ্দিন, মানিক পসারীসহ রাষ্ট্রপক্ষের অন্যান্য সাক্ষীরা বলেছেন। অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, মানিক পসারী ট্রাইব্যুনালে তার সাক্ষ্যে মফিজ উদ্দিনের ওপর নির্যাতন বিষয়ে বলেছেন কিন্তু তিনি তাদের বাড়ির ঘটনা এবং ইব্রাহীম হত্যা বিষয়ে পিরোজপুরে যে মামলা করেছেন সেখানে মফিজ বিষয়ে বিষয়ে তিনি একটি কথাও উল্লেখ করেননি এবং মফিজকে সাক্ষীও করেননি।

আট নং অভিযোগ বিষয়ে আগের দিন উপস্থাপিত যুক্তির ধারাবাহিকতায় আজ সকালে   সাত নং সাক্ষী মফিজ উদ্দিন পসারীর সাক্ষ্য খন্ডন করে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান। মফিজ উদ্দিন পসারী কর্তৃক পিরোজপুরে এবং ট্রাইব্যুনালে প্রদত্ত জবানবন্দী তুলনা করে অ্যাডভোকেট শাহজাহান যুক্তি পেশ করেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মফিজ উদ্দিন যে জবানবন্দী দিয়েছেন তার একটি কথাও তিনি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে বলেননি।
সকালে মহিষ চড়াতে যাবার কথা, সকাল ১০/১১টার দিকে গরু আতালে নিয়ে আসার কথা, দেলু শিকদার কর্তৃক থাবা দিয়ে ইব্রাহীম কুট্টির চুল ধরে গালি দেয়ার কথা, তাকে ও ইব্রাহীম কুট্টিকে এক দড়িতে বেঁধে রাখা, মা বলে চিৎকার শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখি ইব্রাহীমকে গুলি দিছে এরপর লাথি মেরে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া, ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে দানেশ মোল্লা ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেয়ার ফলে  তার ঠোট কেটে যাওয়া এবং দাত ভেঙ্গে যাওয়া, প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়ার কথা বলার পর রাজ্জাক রাজাকার তাকে নিয়ে বাইরে যাওয়া এবং তখন নদী পার হয়ে পালিয়ে যাওয়া, এরপর ফজরের সময় মানিক পসারীর সাথে দেখা হওয়ার পর তাকে সব ঘটনা খুলে বলার কথা তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে বলেননি।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ইব্রাহীম কুট্টিকে পাড়েরহাটে হত্যার ঘটনা দেখার কথা তিনি পিরোজপুরেও বলেননি এবং এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকেও বলেননি।
এসময় একজন বিচারপতি বলেন, বরং পিরোজপুরে মেজিস্ট্রেট এর কাছে তিনি পজিটিভ জবানবন্দী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইব্রাহীম কুট্টিকে কে মেরেছে তা তিনি জানেননা। দ্যাট ইজ ভেরি ইমপরটেন্ট।
অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, চার্জে ঘটনার সময় উল্লেখ আছে ৩টা। কিন্তু মফিজ উদ্দিন বলেছেন ১০/১১টার দিকে তিনি মানিক পসারীর বাড়িতে ধোয়া উড়তে দেখেছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের ছয় নং সাক্ষী মানিক পসারী বলেছেন, ঘটনার দিন রাত দেড়টার দিকে মফিজ পালিয়ে তার কাছে আসে। তিনি তখন মফিজের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন। অপর দিকে মফিজ বলেছেন, রাতে পালিয়ে এসে মানিক পসারীর বাড়িতে কাউকে তিনি পাননি। জঙ্গলে বাকি রাত পার করেন। ফজরের সময় মানিক পসারী জঙ্গলে তার কাছে আসে দেখা করার জন্য। 

এরপর আট নং অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আট নং সাক্ষী মোস্তফা হাওলাদারের সাক্ষ্য খন্ডন করে যুক্তি পেশ করেন অ্যাডভোকেট শাহজাহান। তিনি বলেন, অন্য সাক্ষীরা বলেছেন ইব্রাহীম ও মফিজকে প্রথমে পাড়েরহাট বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ইব্রাহীমকে হত্যার পর মফিজকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু আট নং সাক্ষী বলেছেন প্রথমে দুজনকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় পরে কুট্টিকে পাড়েরহাট ব্রিজের কাছে আনা হয়।
জেরায় মোস্তফা হাওলাদারকে সাজেশন দিয়ে বলা হয় একই দড়িতে দুজনকে বাঁধা, লাথি মেরে ইব্রাহীমের লাশ নদীতে ফেলে দেয়ার কথা আপনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বলেননি। মোস্তফা হাওলদার জবাব দেন তিনি বলেছেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে জেরায় প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান একথা মোস্তফা হাওলাদার তাকে বলেননি।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের নয় নং সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে যুক্তি পেশ করা হয়। আট নং অভিযোগ বিষয়ে নয় নং সাক্ষী বলেছেন পাড়েরহাট ও আশপাশের এলাকায় যেসব লুটপাট, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে তা সবাই হয়েছে মাওলানা সাঈদীর নেতৃত্বে। ট্রাইব্যুনাল রায়ে নয় নং সাক্ষীর একথাটা আমলে নিয়েছে কিন্তু এই কথাটা আবার সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বলেননি।

এরপর রাষ্ট্রপক্ষের ১০ নং সাক্ষী বাসুদেব মি¯ির সাক্ষ্য বিষয়ে যুক্তি পেশ করা হয়। অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, সাক্ষী বলেছেন, সাক্ষীর তার জবানবন্দীতে জানিয়েছেন তার পিতা তখন মানিক পসারীর বাড়িতে কাঠ মিস্ত্রির কাজ করত। সেও তার পিতার সাথে যোগালীর কাজ করত। ঘটনার দিন খুব সকালে সে তার পিতার সাথে মানিক পসারীর বাড়িতে আসে। সাক্ষী জানায় সকাল আটটা/নয়টার দিকে আর্মি আসার ঘটনায় বাড়ির সব লোকজন  পালিয়ে যায়।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, সকাল আটটা/নয়টার দিকে বাড়ির সব লোকজন পালিয়ে গেল। ঘটনা ঘটল বিকাল তিনটায়। সাক্ষী দাবি করেছেন তিনি বাড়ি লুটপাট, আগুন দেয়া, ইব্রাহীম ও মাফিজকে বেঁধে নিয়ে যাওয়া এবং হত্যার ঘটনা দেখেছেন। এ ঘটনা দেখতে হলে তাকে তিনটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রশ্ন হল বাড়ির সব লোক যখন পালিয়ে গেল তখন একজন কাঠ মিস্ত্রি কেন সেখানে এত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন? এটা মানুষের স্বাভাবিক স্বভাবের বিরুদ্ধ আচরন এবং এটা অসম্ভব ও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তদুপরি তিনি একজন হিন্দু। তখনকার পরিস্থিতিতে পাকিস্তান আর্মি আসায় সবাই পালিয়ে গেল আর তিনি একজন হিন্দু যুবক হয়েও সেখানে অবস্থান করার দাবি সে সময়কার বাস্তবতার সাথে খাপ খায়না।
তাছাড়া বাসুদেব পিরোজপুর মামলায় একজন সাক্ষী এবং সেখানে তিনি তার জবানবন্দীতে বলেছেন ইব্রাহীমকে কে গুলি দিয়েছে তা তিনি দেখেননি। তিনি একথা শুনেছেন। সুতরাং এ সাক্ষী কোন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নয়।
রাষ্ট্রপক্ষের ১১ নং সাক্ষী আবদুল জলিল শেখ সাক্ষ্য দেয়ার এক বছর আগে থেকে একটি খামার একটি বাড়ি প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন। তার প্রথম স্ত্রীর নাম সখিনা। তৃতীয় স্ত্রীর নাম ফিরোজা। দ্বিতীয় স্ত্রী গোলেনুর তার বিরুদ্ধে যৌতুক মামলা করলে পরে সমঝোতা হয়। কিন্তু পরে গোলেনুর আবার স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে গলায় ছুরি চালিয়ে হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে। এ কারনে সে তখন সাত মাস হাজত খাটে। পরে আপস রফায় মামলা নিষ্পত্তি হয় বলে ট্রাইব্যুনালে জানিয়েছে সে।  সাক্ষী বিষয়ে এ তথ্য উপস্থাপনের সময় একজন বিচারপতি বলেন মামলা ফেস করা এবং হাজত বাস মানেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়। কারো বিরুদ্ধে মামলা থাকতেই পারে। কাজেই এসব বিষয় না বলাই ভাল।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ১১ নং সাক্ষী আবদুল জলিল শেখ বলেছেন তিনি মানিক পসারীর বাড়িতে আগুন দেয়ার দিন মানিক পসারীর ভাই আলমগীর শেখসহ অন্যান্যদের বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে দেখেছেন। কিন্তু মানিক পসারী জানিয়েছেন আলমগীর পসারী তার থেকে ৩০ বছরের ছোট। ১৯৭১ সালে মানিক পসারীর বয়স ছিল ২৭ বছর। সে হিসেবে আলমগীর পসারীর তখন জন্মই হয়নি। কাজেই তাকে দেখার কথা মিথ্যা।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে আট নং অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষের ১২ নং সাক্ষীর ওপরও নির্ভর করেছেন। কিন্তু ১২ নং সাক্ষী এমপি আবদুল আউয়াল আট নং অভিযোগ বিষয়ে কিছুই বলেননি। আট নং অভিযোগ প্রমানের ক্ষেত্রে কেন তার ওপরও  নির্ভর করল তা আমরা বুঝতে পারছিনা।

এরপর আট নং অভিযোগ প্রমানের ক্ষেত্রে আসামী পক্ষের যেসব সাক্ষীর ওপর ট্রাইব্যুনাল নির্ভর করেছেন তাদের বিষয়ে যুক্তি উপস্থান করা হয়। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে যে তিনজন সাক্ষী ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের সকলেই বলেছেন, ইব্রাহীমকে নলবুনিয়ায় তার শশুরবাড়ি থাকা অবস্থায় অক্টোবার মাসে রাজাকাররা হত্যা করে। তাকে জুন মাসে পাড়েরহাট হত্যা করা হয়নি।

আসামী পক্ষের ২ নং সাক্ষীর জবানবন্দী তিনি এসময় পড়ে শোনান আদালতে। ২ নং সাক্ষী  আব্দুর রাজ্জাক তার জবানবন্দীতে বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন আমাদের নলবুনিয়ায় একটা ঘটনাই ঘটেছে। আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি হঠাৎ একদিন শেষ রাত্রে একটা আওয়াজ হয়।  আমি অনুমান করলাম এটা গুলির আওয়াজ। তারপর দেখি যে, ফজরের টাইম হয়ে গেছে। আমি আযান দিয়া নামাজ পড়ি। নামাজ পড়ার পর উত্তরদিকে রাস্তার পাশে যাই কোথায় কি হয়েছে জানার জন্য। তখন গিয়ে দেখি উত্তর দিক থেকে সামনের খাল দিয়ে নৌকায় করে ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নিয়ে পাড়ের হাটের দিকে আসতেছে। নৌকায় কালাম চৌকিদার, আইয়ুব আলী চৌকিদার এবং হাকিম মুন্সিকে দেখি। এরপর দেখি আরও কয়েকজন লোক খালের পাড় দিয়ে উত্তর দিক থেকে আসতেছে। যে সব লোক আসতেছে তাদের মধ্যে দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার শিকদার, মোসলেম মাওলানা, রুহুল আমিন, মোমিন রাজাকার ছিল। আরও দেখি  উক্ত লোকেরা আজু হাওলাদারের বৌ এবং তার ছেলে সাহেব আলীকে বেঁধে নিয়ে আসতেছে এবং পাড়েরহাটের দিকে নিয়া যাচ্ছে। তারপর দিন শুনি আজু হাওলাদারের বৌ বাড়িতে আসে এবং সাহেব আলীকে পিরোজপুরে নিয়ে পাক সেনারা গুলি করে হত্যা করেছে।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেছেন, এ সাক্ষী ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছেন। ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগ প্রমানের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল তার ওপর নির্ভর করেছে কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সম্পর্ণ বিপরীত চিত্র বর্ননা করেছেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ চুপ থেকেছে। এসময় একজন বিচারপতি বলেন ইব্রাহীমকে যে হত্যা করা হয়েছে সেটা নেয়া হয়েছে এ সাক্ষীর মাধ্যমে। তখন অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ইব্রাহীমকে হত্যা করা হয়েছে কিন্তু হত্যার সময় এবং ঘটনাস্থল বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাথে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য তুলে ধরেছেন এ সাক্ষী। এ সাক্ষীর বক্তব্য থেকে এটা পরিস্কার যে ইব্রাহীমকে নলবুনিয়ায় হত্যা করেছে রাজাকার বাহিনী। পাড়েরহাটে তাকে হত্যা করা হয়নি। অক্টোবর মাসে তাকে নলবুনিয়ায় হত্যা করা হয়। জুন মাসে নয়। 
এরপর ইব্রাহীম হত্যা বিষয়ে আসামী পক্ষের ৭ এবং ১১ নং সাক্ষীর জবানবন্দীও পড়ে শোনানো হয় ।
সাত নং সাক্ষী  জামাল হোসেন ফকির বলেছেন আমার বাড়ি পিরোজপুর জেলার নলবুনিয়া গ্রামে অবস্থিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আমি আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাত্রের প্রথম ভাগে বিলে বড়শি পেতে আসি। রাত্রের শেষ ভাগে আমি নৌকা নিয়ে বড়শি তুলে বাড়ির কাছাকাছি আসলে বিশাল একটা শব্দ শুনতে পাই। শব্দ শুনে আমি খেয়াল করি আমার পাশ লাগানো আজহার আলী হাওলাদারের বাড়িতে কান্নাকাটির শব্দ শোনা যায়। আমি ঘরে চলে আসি। আমার আব্বা বলেন, আজহার মামার বাড়ি বড় একটা শব্দ শোনা গেছে এবং কান্নাকাটিরও শব্দ শোনা যাচ্ছে । চলো গিয়ে দেখে আসি। আজহার আলীর বাড়ির উঠানের মাঝ বরাবর পূর্ব দিকের গাছের আড়ালে গিয়ে দেখি ইব্রাহিম কুট্টির লাশ আইয়ুব আলী চৌকিদার, কালাম চৌকিদার, হাকিম মুন্সি, মান্নান ও আশরাফ আলী খালের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তার পিছে দানেশ মোল্লা, সেকান্দার শিকদার, মোসলেম মওলানা, রুহুল আমিন, মোমিনরা মিলে সাহবে আলীকে পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে তার মাকেসহ পাড়েরহাটে দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সামনে এগিয়ে দেখি ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নৌকায় তুলে পাড়েরহাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সাহেব আলীদের ঘরে চলে আসি। ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতেছে এবং তার হাত দিয়ে রক্ত বেয়ে পড়ছে। তার বোন রানী বেগম মমতাজের হাত বেঁধে দিচ্ছে দেখি। তখন আমি ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগমকে জিজ্ঞাসা করলাম, ফুফু তোমার কি হয়েছে? তখন মমতাজ বেগম উত্তর দেয় যে গুলিতে ইব্রাহিম কুট্টি মারা গেছে সেই গুলি তার হাতেও লেগেছে, লাঠি দিয়ে তার আব্বার গায়েও আঘাত করেছে। ঐখানে তখন পাড়া প্রতিবেশী অনেক লোকজন জমায়েত হয়। আমরা বাড়িতে চলে যাই। বিকালে শুনতে পাই যে, সাহেব আলী ও তার আম্মাকে পিরোজপুরে নিয়ে গেছে। ইব্রাহিম কুট্টির লাশ পাড়েরহাট বাদুরা পোলের সাথে নৌকায় বেঁধে রেখেছে। তারপরদিন বেলা এগারোটার দিকে শুনতে পাই যে, সাহেব আলীর আম্মা বাড়িতে ফিরেছে। তারপর আমরা তাদের বাড়িতে যাই। জিজ্ঞাসা করি বুয়া (সাহেব আলীর আম্মা) আপনি এসেছেন, সাহেব আলী চাচা কৈ। তারপর সে বলে যে, পিরোজপুর নিয়া সাহেব আলীকে মিলিটারীরা গুলি  করে মারছে।  এর কিছুদিন পরে দেশ স্বাধীন হয়। দেশ স্বাধীনের পাঁচ/ছয় মাস পর মমতাজ বেগম ভাই এবং স্বামী হত্যার মামলা করে।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে ১১ নং সাক্ষী গোলাম মোস্তাফা ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে  ট্রাইব্যুনালে বলেছেন : আমার নাম মোঃ গোলাম মোস্তফা, বয়স- ৬২ বছর । গ্রাম নলবুনিয়া, থানা জিয়ানগর, জেলা- পিরোজপুর। বর্তমানে আমি অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১ অক্টোবর আমার গ্রাম নলবুনিয়ায় আজাহার আলী হাওলাদারের বাড়িতে একটি ঘটনা ঘটে। ওইদিন ফজরের আজানের পূর্ব মুহূর্তে এক প্রচন্ড শব্দ শুনে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম থেকে উঠার পরেই মসজিদে আযান হলে মসজিদে নামায পড়তে যাই। নামাজের পরে মুসল্লিদের মধ্যে আলাপ আলোচনা হতে থাকে যে, আযানের পূর্বে কোথায় এই প্রচন্ড শব্দটি হলো। এই আলাপ আলোচনা করতে করতে আমরা মসজিদের সামান্য দূরে খালের পাড়ের রাস্তায় আসি। একটু পরেই দেখতে পাই যে, উত্তর দিক থেকে দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা, সেকেন্দার শিকদার, রুহুল আমীন, মোমিন আজহার আলী হাওলাদারের ছেলে সাবেহ আলী এবং তার মাকে  নিয়ে পাড়েরহাটের দিকে যাচ্ছে। তার ৫/৭ মিনিট পরে নৌকায় করে আইউব আলী  চকিদার, কালাম   চকিদার, হামিক মুন্সি, আব্দুল মান্নান, আশরাফ আল মিলে আজহার আল হাওলাদারের জামাই ইব্রাহীম কুট্টির লাশ নিয়ে যাচ্ছে।
এরপর আমরা কায়েকজন আজহার হাওলাদারের বাড়ি যাই। সেখানে  গিয়ে বাড়িভর্তি মানুষ এবং ঘরে কান্নার রোল শুনতে পাই। লোকজন বলাবলি করতেছে আজহার হাওলাদারের জামাইকে (ইব্রাহীম কুট্টি)  মেরে ফেলেছে। আজহাল আলীর  স্ত্রী এবং ছেলেকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে গেছে। আজাহরকেও মেরেছে। লোকজন বলল ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যার সময় তার স্ত্রী মমতাজের হাতেও গুলি লাগে। মমতাজকেও  জিজ্ঞাসা করায় সেও তাই জানাল।
এরপর আমরা সেখান থেকে চলে আসি, বিকালের দিকে শুনি সাহেব আলীকে এবং তার মাকে রাজাকাররা পিরোজপুরে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে গেছে। পরের দিন শুনি  সাহেব আলীর মা সেতারা বেগম ফিরে এসেছে এবং সাহেব আলীকে পাকিস্তানী বাহিনী পিরোজপুরে গুলি করে মেরেছে।  এরপর শুনেছি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে মমতাজ বেগম তার স্বামী ও ভাই হত্যার জন্য এস.ডি.ও বরাবরে একটি মামলা দায়ের করেছে।

এ পর্যন্ত যুক্তি উপস্থাপনের পর শুনানী আগামীকাল বৃহষ্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।  শুনানীতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যটর্নি জেনারেল এমকে আনোয়ার এবং আসামী পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন, আবু বকর সিদ্দিক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সোমবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

ডালিম হোটেল ঘটনার দিন ছাড়া আগে কখনো মীর কাসেম আলীকে দেখিনি-জেরায় সাক্ষী

দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান (এমসি) ও জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়েছে গতকাল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ তৃতীয় সাক্ষী নাসিরুদ্দিন চৌধুরীর জবানবন্দী গ্রহণ করার পর তাকে জেরা শুরু করেন আসামীপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম। আজ সাক্ষীর জেরা সম্পন্ন হয়েছে।
জেরায় সাক্ষী বলেছেন ডালিম হোটেলে ঘটনার দিন ছাড়া আগে কখনো মীর কাসেম আলীকে দেখিনি ।

সাক্ষ্যগ্রহণের সময় মীর কাসেম আলী ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় বসে সাক্ষ্য গ্রহণ দেখেন। তার পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম এবং অ্যাডভোকেট আবু বকর সিদ্দিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম ও সুলতান মাহমুদ সিমন।

জবানবন্দী (সংক্ষিপ্ত): জবানবন্দীতে সাক্ষী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১৭ বছর। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় আমি চট্টগ্রাম শহরে আমি ও আমার সহযোদ্ধাদের সাথে যুক্ত হয়ে যুদ্ধ করতে থাকি। তখন আমি শহরের আন্দরকিল্লার নাজির আহমেদ চৌধুরী রোডে আওয়ামী লীগ নেতা আজম নাসির উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করি। সেই বাড়ির নিকটে ছিল ডালিম হোটেল। যেটা ছিল আল-বদর বাহিনীর হেড কোয়াটার। আমার গোপন আস্থানার খবর কোনভাবে ফাঁস হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শেষ দিকে এক গভীর রাতে আল-বদর বাহিনীর সদস্যরা এসে আমার আশ্রয়স্থল ঘেরাও করে ফেলে এবং আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে চোখ বেধে মারতে মারতে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। একটি অন্ধকার কক্ষে আমাকে ঢুকিয়ে মারধোর করতে থাকে এবং আমার কাছ থেকে জানতে চায় অস্ত্রসস্ত্র এবং আমার সহযোদ্ধারা কোথায়। আমার কাছ থেকে কথা বের করতে না পেরে আল-বদর সদস্যরা কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। যাওয়ার আগে আমার চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর মীর কাসেম আলী অন্যান্য আল-বদর সদস্যদের নিয়ে আমার কক্ষে প্রবেশ করে। মীর কাসেম আলী আমাকে দেখিয়ে তার সঙ্গে আসা আল-বদর সদস্যদের বলে ওর কাছ থেকে কি এখনো কিছু আদায় করতে পারনি? ওকে আরো পেটাও’। এরপর আল-বদররা তাকে লাঠি, লোহার রড, ইলেকট্রিক তার এসব দিয়ে ইচ্ছেমতো পেটাতে থাকে। এক পর্যায়ে মীর কাশেম আলী নিজেই আমাকে জিজ্ঞাসা করে তোমার সহযোগীদের নাম কি? তাদের সেন্টার কোথায়, তাদের অস্ত্র কোথায়। আমি বলতে থাকি, আমি মুক্তযোদ্ধা নই। আমার কাছে কোন অস্ত্র নেই, আমি কিছু জানিনা। তখন তারা আমাকে পেটাতে পেটাতে রক্তাক্ত করে কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়।
৬ ডিসেম্বর আল-বদর সদস্যদের মুখে বলাবলি হচ্ছিল চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে বম্বিং হয়েছে। সেখানে মীর কাসেম আলী আহত হয়েছে। এই কথাটি যখন প্রচারিত হয় তখন আল-বদররা আমাকে ও অন্যান্য বন্দীদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
’৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যার দিকে আমরা অনুমান করতে পারি হোটেল নিস্তব্ধ। আল-বদরদের আনাগোনা চিল না। পরদিন ১৬ ডিসেম্বর সকাল বেলা দরজা ভেঙ্গে গেলে দেখি বাইরে অনেক লোক। তারা বলছিলেন আল-বদররা পলিয়ে গেছে আপনারা বেরিয়ে আসুন। তখন আমরা যারা বন্দী ছিলাম তারা বাইরের লোকদের সহায়তায় বেরিয়ে আসি।
জবানবন্দি শেষে আসামীপরে আইনজীবী মিজানুল ইসলাম সাক্ষীকে জেরা শুরু করে।

জেরা:
প্রশ্ন: আপনার জবানবন্দী মতে ৬ ডিসেম্বর মীর কাসেম আলী আহত হওয়ার পর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডালিম হোটেলে তাকে কখনো দেখেছেন?
উত্তর: আমি তাকে আমার কক্ষে কখনো দেখিনি।
প্রশ্ন: আপনি কি একই কক্ষে বন্দী ছিলেন, না বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কক্ষে আপনাকে রাখা হত?
উত্তর: ডালিম হোটেলের যে কক্ষে আমাকে প্রথম আটকে রাখা হয় সেখানেই সব সময় আমাকে থাকতে হত। তবে বিভিন্ন রুমে নিয়ে আমাকে নির্যাতন করা হত।
প্রশ্ন: আপনার বর্ণিত নির্যাতন ’৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত কি ছিল?
উত্তর: হ্যাঁ, ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল।
এ পর্যন্ত জেরার পর গতকাল জেরা মুলতবি করা হয়।


৩/২/২০১৪
ডালিম হোটেল ঘটনার দিন ছাড়া আগে কখনো মীর কাসেম আলীকে দেখিনি-জেরায় সাক্ষী

জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান (এমসি) মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় সাক্ষী নাসিরুদ্দিন চৌধুরীকে আসামীপক্ষের জেরা শেষ হয়েছে। আজ  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ সাক্ষীকে জেরা করেন মীর কাসেম আলীর আইনজীবী মিজানুল ইসলাম।
জেরায় সাক্ষী বলেন, ১৯৭১ সালে ডালিম হোটেলে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার আগে কখনো তিনি মীর কাসেম আলীকে দেখননি এবং ১৯৭১ সালের আগে মীর কাসেম আলীর সাথে তার কোন পরিচয়ও ছিলনা।

জেরা শেষে আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের চতুর্থ সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।
 জেরার সময় মীর কাসেম আলীকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। তার পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মিজানুল ইসলাম, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম এবং অ্যাডভোকেট আবু বকর সিদ্দিক ও অ্যাডভোকেট আসাদ উদ্দিন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, সুলতান মাহমুদ সিমন ও নুরজাহান মুক্তা।

জেরা:
প্রশ্ন: আপনি কখন থেকে ডালিম হোটেল চেনেন?
উত্তর: স্বাধীনতার দুই বা তিন বছর পূর্ব থেকে মহামায়া নামে ওই হোটেলটি দেখেছি।
প্রশ্ন: ডালিম হোটেলের মালিক হিন্দু সম্প্রদায়ের ছিলেন।
উত্তর: সত্য। এই হোটেলটির নাম ’৭১ সালের পূর্বে ছিল মহামায়া হোটেল।
প্রশ্ন: ডালিম হোটেলের মালিক বা তার পরিবারের সদস্যদের নাম বলতে পারবেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালের আগে ওই ডালিম হোটেলের নিকটবর্তী ইসলামী ছাত্রসংঘের কোন অফিষ ছিল কি না?
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: আপনি ভারতে যাওয়ার পূর্বে ডালিম হোটেলে কোন ক্যাম্প হয়নি।
উত্তর: সত্য।
প্রশ্ন: ভারতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ডালিম হোটেল ভবনটির মূল মালিকের দখলে ছিল কি?
উত্তর: বলতে পারব না।
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর ডালিম হোটেলটির মালিক বা তার পরিবারের সদস্যদের সাথে কি আপনার দেখা হয়েছে?
উত্তর: দেখা হয়নি।
প্রশ্ন: বর্তমানে ডালিম হোটেলের মালিকানায় কে আছেন বলতে পারবেন?
উত্তর: বলতে পারব না।
প্রশ্ন: কখন থেকে ডালিম হোটেল টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: কখন থেকে বলতে পারব না।
প্রশ্ন: এ মামলার সাক্ষী জামালউদ্দিন যিনি একজন লেখক, তাকে চেনেন?
উত্তর: চিনি।
প্রশ্ন: ডালিম হোটেলের নির্যাতিত আবদুল জব্বার নামে কোন ব্যক্তির নাম শুনেছেন?
উত্তর: শুনিনি।
প্রশ্ন: আনোয়ারার জামাল চৌধুরীকে আপনি চেনেন?
উত্তর: চিনতাম। তিনি শান্তি কমিটি বা রাজাকার বাহিনীর প্রধান ছিলেন।
প্রশ্ন: মতিউর রহমান নামে কোন রাজাকারের নাম শুনেছেন?
উত্তর: শুনিনি।
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালে ডালিম হোটেলটি মতিউর রহমান রাজাকারের দখলে ছিল। 
উত্তর: আমার জানা নেই।
প্রশ্ন: ডালিম হোটেল ভবনের মালিক দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভবন দখল করে রাখা ও মহিলাদের শ্লীলতাহানি করার অভিযোগে ওই রাজাকার মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনাকে আটক করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যাওয়া বা সেখানে অত্যাচর করা বা সেখানে মীর কাসেম আলীর সাহেবকে দেখার কথা অসত্য। 
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনি মীর কাসেম আলীকে কতদিন যাবৎ চিনতেন?
উত্তর: ডালিম হোটেল ছাড়া তার আগে অন্য কোথা মীর কাসেম আলী সাহেবকে আগে দেখিনি বা চিনতাম না।
প্রশ্ন: আপনি মীর কাসেম আলী সাহেবকে এই ট্রাইব্যুনালে দেখার আগে কখনোই দেখেননি।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনি কখন থেকে সাংবাদিকতা শুরু করেন?
উত্তর: ১৯৮০ সাল থেকে।
প্রশ্ন: বর্তমানে কোন পত্রিকায় কাজ করেন?
উত্তর: আমি দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক।
প্রশ্ন: আপনার মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা সম্পার্কে কখনো কোন স্মৃতিচারণমূলক বা সম্পাদকীয় লিখেছেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মামলা করার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেছেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: মীর কাসেম আলীর সঙ্গে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আপনার কোন পরিচয় ছিল না।
উত্তর: সত্য।
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালের পূর্বে বা পারে আপনি ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন?
উত্তর: কোন ছাত্রসংগঠনের নেতা ছিলাম না, ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম।
প্রশ্ন: বিএলএফ মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে গঠিত হয়?
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: বিএলএফ এর প্রধান কে ছিলেন?
উত্তর: প্রধান কেউ ছিল না। সারা দেশে চারজন আঞ্চলিক প্রধান ছিলেন। শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। 
প্রশ্ন: বিএলএফ এর ট্রেনিং কোথায় হয়েছিল?
উত্তর: আসাম রাজ্যের হাফনং-এ।
প্রশ্ন: বিএলএফ এর সঙ্গে গণবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী একই সঙ্গে ট্রেনিং নিয়েছিল?
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আজম নাসিরউদ্দিন সাহেব কি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: আজম নাসিরউদ্দিন সাহেবের বাড়ি ও ডালিম হোটেল কি একই মহল্লায়?
উত্তর: একই মহল্লায় কি না জানিনা, তবে ওই বাড়ি থেকে ডালিম হোটেলের দূরত্ব ৬০০ থেকে ৭০০ গজ।
প্রশ্ন: হাজারি গলি হচ্ছে ডালিম হোটেলের পিছনে?
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: হাজারি গলিটি একটি হিন্দু অধ্যুসিত এলাকা।
উত্তর: সত্য।
প্রশ্ন: এওয়াই খালেদ নামে কোন ব্যক্তিকে চেনেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: নবী চৌধুরী ওরফে মাহমুদুন নবী চৌধুরীকে চেনেন?
উত্তর: নবী চৌধুরীকে আমি চিনতাম। তিনি শান্তিকমিটি চট্টগ্রামের প্রধান ছিলেন। আমার জানা মতে তিনি পিডিপি করতেন।
প্রশ্ন: জসিম, টুনটু সেন এবং রনজিত দাশকে আপনি চেনেন বা দেখে ছেন?
উত্তর: আমি তাদেরকে দেখিনি এবং আটক হওয়ার আগেও তাদের নাম শুনিনি।
প্রশ্ন: আপনি ওই তিনজনের নাম ট্রাইব্যুনালে প্রথম বলছেন?
উত্তর: ট্রাইব্যুনালে প্রথম বললাম কিনা সঠিক করে বলতে পারছি না, আগেও বলতে পারি।
প্রশ্ন: এই মামলার সাক্ষী সৈয়দ মো: এমরান ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আপনার সাথে ডালিম হোটেল থেকে মুক্তি পাননি। তিনি চট্টগ্রাম কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন? 
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনি শোনা মতে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে অসত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন?
উত্তর: সত্য নয়।



আজ মাওলানা সাঈদীর আপিল আবেদনে যুক্তি উপস্থাপন হয়নি



৩/২/২০১৪
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদনের ওপর আজ যুক্তি উপস্থাপন হয়নি। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের শুনানীর তালিকায় আজ মাওলানা সাঈদীর আবেদন শুনানীর বিষয়টি ৭৩ নং ক্রমিকে ছিল। অন্যান্য মামলা পরিচালনায় দুপুর ১টা বেজে গেলে এ মামলার শুনানী আজ আর অনুষ্ঠিত হয়নি।

রবিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর মামলায় যুক্তি উপস্থাপন// পিরোজপুরের মামলায় মফিজ উদ্দিনকে নির্যাতনের কথা উল্লেখ নেই

মেহেদী হাসান, ২/২/২০১৪
বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন শুনানীতে আলোচিত ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন চলছে। ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যার অভিযোগ বিষয়ে মাওলানা সাঈদীকে ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।  ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ছয় নং সাক্ষীর সাক্ষ্য খন্ডন করে আজ যুক্তি উপস্থাপন করেছেন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।
অ্যাডভোকেট এসএম শাহাজাহন  শুনানীর শুরুতে বলেন, ছয় নং সাক্ষী মানিক পসারী বলেছেন তাদের বাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা তিনি বাড়ির পূর্ব পাশের জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে দেখেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের ১০ নং  সাক্ষী বলেছেন মানিক পসারীর বাড়িতে আগুন দেয়ার আগেই বাড়ির লোকজন বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, মানিক পসারী বলেছেন বাড়ির পাশে জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে তিনি তাদের বাড়িতে আর্মি এবং শান্তি কিমিটির লোকজন কর্তৃক লুটপাট চালানো, আগুন দেয়া এবং এরপর তাদের বাড়ির কাজের লোক ইব্রাহীম কুট্টি ও মফিজউদ্দিনকে ধরে এক দড়িতে বেঁধে পাড়েরহাট বাজারে নিয়ে যেতে দেখেছেন। জীবন বাঁচাতে বাড়ির পাশের জঙ্গলে আশ্রয় নিতে পারে যে কেউ। কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতে লুকিয়ে থেকে বাড়িতে ঘটে যাওয়া এতসব ঘটনা কারো পক্ষে দেখা সম্ভব কি-না তা আদালত বিবেচনা করবেন।
আইনজীবী বলেন, মানিক পসারী এ মামলায় সাক্ষী হবার বিনিময়ে একটি খামার একটি বাড়িসহ নানা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছে যা জেরায় বের হয়ে এসেছে।

অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা ঘটনার সাথে মফিজ উদ্দিন পসারীর ওপর নির্যাতনের ঘটনাও জড়িত।  ইব্রাহীম কুট্টি এবং মফিজ উদ্দিনকে মানিক পসারীর বাড়ি থেকে একই দড়িতে বেঁধে পাড়েরহাট বাজারে নিয়ে যাওয়া হয় মর্মে মানিক পসারীসহ রাষ্ট্রপক্ষের অন্যান্য  সাক্ষীরা বলেছেন। তাদের দাবি পাড়েরহাট বাজারে নিয়ে  ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যা করা হয় এবং মফিজ উদ্দিনকে নিয়ে যাওয়া হয় আর্মি ক্যাম্পে। সেখানে তাকে নির্যাতন করা হয়। কিন্তু এক পর্যায়ে তিনি রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।
মানিক পসারী ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুর জেলায় তাদের বাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা বিষয়ে একটি মামলা করেন। সে মামলার এজাহারে তাদের বাড়িতে আগুন দেয়া এবং লুটপাটের বিবরনের সাথে ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যার কথাও উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু পিরোজপুরের ওই মফিজ উদ্দিনকে নির্যাতনের বিষয়ে একটি কথাও উল্লেখ নেই ।  অথচ ইব্রাহীম কুট্টি এবং মফিজ তাদের বাড়িতে কাজ করত এবং তাদেরকে একই সাথে একই দড়িতে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মর্মে ট্রাইব্যুনালে দাবির করা হয়েছে।  কিন্তু একই ঘটনায় ইব্রাহীম ও মফিজ দুজন ভুক্তভোগী হলেও মফিজের ঘটনা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত পিরোজপুরের মামলায়। অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, অপরদিকে   মানিক পসারী ট্রাইব্যুনালে জেরায় এক প্রশ্নের জবাবে জানান ইব্রাহীম কুট্টির পিতার নাম গফুর শেখ। অপর দিকে পিরোজপুরে তিনি যে মামলা করেছেন তাতে তিনি ইব্রাহীম কুট্টির পিতার নাম লিখেছেন সইজুদ্দিন হালদার।

তাছাড়া ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মানিক পসারীর অভিযোগে উল্লেখ আছে তিনি জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে থেকে তাদের বাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা দেখেছেন কিন্তু পিরোজপুরে তিনি ২০০৯ সালে যে মামলা করেন তাতে জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে ঘটনা দেখার কথা উল্লেখ নেই। সেখানে শুধু পালিয়ে যাবার কথা উল্লেখ আছে।
এসময় আদালতের একজন বিচারপতি বলেন, মানিক পসারী কেন এতদিন পর পিরোজপুরে এ ঘটনায় মামলা করল সে বিষয়ে একটি কথাও উল্লেখ নেই।

এরপর আট নং অভিযোগ তথা ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাত নং সাক্ষী মফিজ উদ্দিনের সাক্ষ্য বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শুরুর কিছুক্ষন পর মামলার কার্যক্রম আজ সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
শুনানীর সময় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান, প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলীসহ আসামী পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন উপস্থিত ছিলেন।


বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল মামলায় ২টি অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থপান শেষ

মেহেদী হাসান, ৩০/১/২০১৪
বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন মামলায়  আজ তৃতীয় দিনের মত যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রমানিত আটটি অভিযোগের মধ্যে ছয় এবং সাত নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি পেশ শেষে গতকাল আট নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন অ্যাডভোকে এসএম শাহজাহান।
প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপির বেঞ্চ শুনানি গ্রহণ করেন।

সাত নং অভিযোগ যথা সেলিম খানের বাড়িতে আগুন দেয়া  বিষয়ে গতকাল বুধবার  যেখান থেকে যুক্তি উপস্থাপন মুলতবি হয় আজ সেখান থেকে যুক্তি পেশ  শুরু হয়। অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের আট নং সাক্ষী মোস্তফা হাওলাদারের একটি মামলায় সাজা হয় এবং পরে খালাস পান। সেলিম খানের বাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা তিনি খালের ওপর থেকে দেখার কথা ট্রাইব্যুনালে বললেও তদন্ত কর্মকর্তাকে তিনি তা বলেননি। তাছাড়া তিনি আরো বলেছেন সাঈদী সেলিম খানের বাড়ি দেখিয়ে দিয়েছে আগুন দেয়ার জন্য। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় বলেছেন একথাও তাকে মোস্তফা হাওলাদার বলেননি জবানবন্দীতে । তাছাড়া ১৫/১৬ বছর আগে সাঈদী নাম ধারনের কথাও তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে বলেননি বলে জেরায় স্বীকার করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

রাষ্ট্রপক্ষের ১২ নং সাক্ষী একেএম আউয়াল জবানবন্দীতে বলেছেন ‘শুনেছি দানেশ মোল্লা সেকেন্দার শিকদারের সাথে সাঈদী সাহেবও ছিলেন’। জেরায় তাকে প্রশ্ন করা হয় সাঈদী সাহেব থাকার যে কথা আপনি শুনেছেন বলে ট্রাইব্যুনালে বলেছেন তা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে বলেননি। তিনি জানান বলেছি। অপর দিকে তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় জানিয়েছেন ‘শুনেছি সাঈদী সাহেবও ছিলেন/ একথা এমপি আউয়াল তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে বলেননি।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, সাত নং অভিযোগ প্রমানের পক্ষে ট্রাইব্যুনাল আসামী পক্ষের তিনজন সাক্ষীর ওপরও নির্ভর করেছে। কিন্তু এর মধ্যে ৩ নং সাক্ষী সাত নং অভিযোগ বিষয়ে কিছুই বলেননি। ট্রাইব্যুনাল রায়ে ভুলক্রমে এটি করে থাকতে পারে। অরপর দিকে আসামী পক্ষের  ১৫ নং সাক্ষী সাত নং অভিযোগ বিষয়ে বলেছেন ঘটনার সময় সেলিম খান এবং তার পিতা নুরুল ইসলাম খান কেউ বাড়িতে ছিলেননা। ৭ মের আগেই সেলিম খান মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। কাজেই নুরুল ইসলামের ওপর  নির্যাতনের  অভিযোগ সত্য নয়। 
অ্যাডভোকেট এসএম শাহাজাহান বলেন, তাছাড়া সাত নং চার্জে  আগুন দেয়া এবং নির্যাতনের অভিযোগ থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষের কোন সাক্ষী নির্যাতন বিষয়ে কিছু বলেননি।
তিনি বলেন, এ ঘটনা বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ সেলিম খানকে ২০১২ সালের ১০ জানুয়ারি সেফ হাউজে এনে রাখে। ১১ এবং ১২ জানুয়ারি তাকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালে আনে কিন্তু সে রাজি না হওয়ায় ১২ জানুয়ারি তাকে গাড়িতে করে আজিমপুরে তার মেয়ের বাড়িতে পৌছে দেয়া হয়।
দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পড়ে শোনানোর সময় আদালত জানতে চান এর ভিত্তি কি। এসএম শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের সেফহাউজ ডায়েরিতে এ তথ্য রয়েছে।

এরপর তিনি আট নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। আট নং অভিযোগ ছিল মানিক পসারীর বাড়িতে আগুন দেয়া ও লুটপাটের  পর সেখান থেকে তাদের বাড়িতে কর্মরত ইব্রাহীম কুট্টি ও মফিজ উদ্দিনকে ধরে নিয়ে যাওয়ায়। এরপর ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যা করা হয় এবং মফিজ উদ্দিন নির্যাতনের পর পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষে মোট নয় জন যথা ২,৪,৬,৭,৮,৯,১০,১১, এবং ১২ নং সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।

এসএম শাহজাহান বলেন, চার্জে উল্লেখ আছে মানিক পসারীর বাড়ি আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে বিকাল তিনটায়। কিন্তু ২ নং সাক্ষী রুহুল আমিন নবিন বলেছেন তিনি ১১/১২টার দিকে জানতে পেরেছেন আগুন দেয়ার ঘটনা।
আইনজীবী বলেন, আসলে তিনি আগুন দেয়ার সময় ঘটনাস্থলে বা তার আশপাশেও ছিলেননা। রাষ্ট্রপক্ষের নবম সাক্ষী বলেছেন ৭ মে’র অনেক আগেই রুহুল আমিন নবিন এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এরপর দেশ স্বাধীনের পর ১৮ ডিসেম্বর পাড়েরহাট তিনি তাকে প্রথম দেখেন। এসএম শাহাজান বলেন, রুহুল আমিন নবিন মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নবম সাক্ষী তাকে আগে থেকেই চিনতেন। যারা মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন ২৫ মার্চের পর তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়াই স্বাভাবিক এবং রাষ্ট্রপক্ষের নবম সাক্ষী সে দাবিই করেছেন। কাজেই রুহুল আমিন নবিন আসলে ৭ মে’র ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেননা।
এরপর আট নং অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের চার নং সাক্ষীর সাক্ষ্য বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করে তিনি বলেন এ সাক্ষীর পরিচয় কি? ট্রাইব্যুালে জেরায় চতুর্থ সাক্ষী (সুলতান আহমেদ)  স্বীকার করেছেন কলা চুরির মামলায় জজ কোর্টে তার সাজা হয়েছে এবং এ মামলা বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া ট্রলার চুরির ২টি মামলা বরিশাল কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।
এ পর্যন্ত যুক্তি পেশের পর শুনানী আগামী রোববার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।
যুক্তি উপস্থাপনের সময় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান, আসামী পক্ষে গিয়াসউদ্দিন মিঠু, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন, তারিকুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৪

সাঈদী ৭১ সালে কিছু করলে দুটি বইয়ে অবশ্যই তার নাম থাকত-শুনানিতে বললেন বিচারপতি

মেহেদী হাসান, 29/1/2014
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন শুনানির সময় বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেছেন, সাঈদী ১৯৭১ সালে কিছু করে থাকলে দুটি বইয়ে অবশ্যই তার নাম থাকত। বই দুটি হল কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিক তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র এবং পিরোজপুর জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত পিরোজপুর জেলার ইতিহাস। এ বই দুটির কোথাও মাওলানা সাঈদীর নাম না থাকার বিষয়টিকে বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা খুবই সিগনিফিকেন্স (তাৎপর্যপূর্ণ) বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন ও মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে তার আইনজীবীরা  ডকুমেন্ট আকারে  ট্রাইব্যুনালে  জমা দিয়েছিলেন উক্ত বই দুটি। আজ  সুপ্রীম কোর্টের আপিল বেঞ্চে মাওলানা সাঈদীর আপিল আবেদন শুনানীর সময় এভিডেন্স হিসেবে প্রদর্শিত ওই  বই দুটি  বিষয়ে যুক্তি পেশ করেন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান। তিনি বলেন, বই দুটিতে বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার ন্যায়  পিরোজপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা, ক্ষতিগ্রস্তদের নাম, স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম এবং তাদের কর্মকান্ডের অনেক বিবরন রয়েছে। কিন্তু বই দুটির কোথাও মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। মাওলানা সাঈদী যদি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত থাকতেন তাহলে এ বই  দুটিতে অন্তত কোথাও না কোথাও মাওলানা সাঈদীর নাম থাকত।

তিনি বলেন, পিরোজপুর জেলা পরিষদ কর্তৃক পিরোজপুর জেলার ইতিহাস নামক বইতে পিরোজপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ননার পাশপাশি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি, স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, শান্তি কমিমিটির লোকজনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তুএস তালিকারও কোথাও মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। এমনকি এ বইয়ে পিরোজপুর জেলার কৃতি সন্তানদের নামের যে তালিকা রয়েছে সেখানে মাওলানা সাঈদীর ছবিসহ তার পরিচিতি রয়েছে যেখানে মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউদ্দিন, বেগম মতিয়া চৌধুরীসহ পিরোজপুর জেলার আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের নাম রয়েছে। এ বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০০৭ সালে যখন কোন রাজনৈতিক সরকার ছিলনা দেশে। তাছাড়া বইটি যারা সম্পাদনা করেছেন তাদের মধ্যে পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জামালুল হক মনুসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা জড়িত ছিলেন।

যুক্তি উপস্থাপনের এ পর্যায়ে বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, মাওলানা সাঈদী যদি ১৯৭১ সালে কিছু করত তাহলে এ দুটি বইয়ে অবশ্যই তার নাম থাকত। এটা খুবই সিগনিফিকেন্স (তাৎপর্যপূর্ণ) একটা বিষয়। এছাড়া পিরোজপুর জেলার ইতিহাস বইয়ে পিরোজপুরের কৃতি সন্তানদের তালিকায় অন্যান্যদের সাথে  তার নাম রয়েছে ছবিসহ। এটিও খুবই সিগনিফিকেন্স। বইটি সম্পাদনার সাথে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের নাম রয়েছে। তিনি জেলার সকল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিধিত্ব করেন। এটাও ইমপরটেন্ট একটা  বিষয়।

এসময় অপর বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, পিরোজপুর জেলার ইতিহাস বইয়ে জামায়াতের সম্পর্কেও আলোচনা রয়েছে। সেখানেও সাঈদীর নাম নেই। স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায়ও সাঈদীর নাম নেই। অথচ দানেশ মোল্লা সেকেন্দার শিকদার এদের নাম বারবার এসেছে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে।  কিন্তু সাঈদীর নাম একবারও আসেনি।
এসময় বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা পিরোজপুর জেলার ইতিহাস নামক বই থেকে কয়েকটি লাইন পড়ে শুনিয়ে বলেন, এখানে জামায়াত নেতা কাউখালির মাওলানা আব্দুর রহিমের নাম রয়েছে। কিন্তু মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।

তখন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র বইটি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের ওপর এটি খুবই অথেনটিক একটি বই। মাওলানা সাঈদী সাহেব যদি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী কাজের সাথে জড়িত থাকতেন তাহলে এ বইটি এবং পিরোজপুর জেলার ইতিহাস নামক বই যেখানে পিরোজপুরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিবরন রয়েছে এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের  কর্মকান্ড এবং তাদের নামের তালিকা রয়েছে সেখানে কোথাও না কোথাও তার নাম থাকত। তিনি বলেন পিরোজপুর জেলার ইতিহাস বইতে স্বাধীনতা বিরোধীদের  নামের তালিকায় দানেশ মোল্লা সেকেন্দার সিকদার, মোসলেম মাওলানা, সেকেন্দার কমান্ডার, সরদার সুলতান মাহমুদ, আবুদুল আজিজ মল্লিক, আশরাফ আলী, আজিজুল হকম দেলোয়ার মল্লিক, জিন্নাত আলী, সৈয়দ সালেহ আহমেদ, মানিক খন্দকার এদের নাম রয়েছে। কিন্তু এদের সাথে মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।

প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ আজ শুনানী গ্রহণ করেন। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ৬ নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তিপেশ শেষে ৭ নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তিপেশ শুরু হয়েছে। শুনানী আগামীকাল পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।

মাওলানা সাঈদীর মামলার তদ্বিরকারক মাসুদ সাঈদী বিকালে এ প্রতিনিধিকে বলেন, পিরোজপুর জেলার ইতিহাস বইটি সম্পাদনার সাথে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জামালুল হক মনু ছাড়াও আরো একজন জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জড়িত ছিলেন। তিনি হলেন, গৌতম রায় চৌধুরী। এছাড়া বইটি সম্পাদনার সাথে অধিকাংশ প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পিরোজপুর প্রতিনিধিরা জড়িত ছিলেন। পিরোজপুর জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি মনিকামন্ডলসহ পাঁচজন হিন্দু জড়িত রয়েছেন। এছাড়া পিরোজপুরের নামকরা অনেক আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার নেতৃবৃন্দ জড়িত ছিলেন বইটি প্রণয়নের সাথে। বইটিতে পিরোজপুর জেলার কৃতিসন্তানদের নামের যে তালিকা রয়েছে সেখানে শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন আহমেদ যিনি ১৯৭৭ সালে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন, সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদ, বেগম মতিয়া চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এমএনএ খিতিশ চন্দ্র মন্ডল ও এনায়েত হোসেনসহ অনেকের সাথে মাওলানা সাঈদীর নামও রয়েছে।
মাসুদ সাঈদী বলেন, হুমায়ূন আহমেদ এর ভগ্নিপতি অ্যাডভোকেট আলী হায়দার কর্তৃক বর্নিত হুমায়ূন আহমেদ এর পিত হত্যার ঘটনা, দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত ভাগিরথী হত্যার ঘটনা, মাছিমুপুর গণহত্যায় নিহত অনেক হিন্দু পরিবারের আত্মীয় স্বজন এর সাক্ষাৎকার  রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র বইটিতে। কিন্তু কেউই  পিরোজপুরের কোন ঘটনার সাথে মাওলানা সাঈদীর নাম উল্লেখ করেননি। 

আজ  মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ৬ নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শেষে ৭ নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয়েছে। ৬ নং অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ এবং আসামী পক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দী এবং জেরা উপস্থাপন করে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান প্রমান করার  চেষ্টা করেন যে, পাড়েরহাট ৭ মে ঘটনার সাথে মাওলানা সাঈদী জড়িত ছিলেননা।
তিনি বলেন, ৬ নং অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৮ জন সাক্ষী হাজির করেছে কিন্তু তাদের কেউই পাড়েরহাট বাজারের নন। কোন ভুক্তভোগীকে সাক্ষী হিসেবে আনা হয়নি। যারা আসছেন তারা কেউ ভুক্তভোগী নন। তিনি বলেন সাক্ষীদের কারো বাড়ি টেংরাটিলা, কারো বাড়ি চিথলিয়া, কারো বাড়ি হোগলাবুনিয়া এবং কারো বাড়ি পাড়েরহাট বাজার থেকে দেড় দুই মাইল দুরে অন্য গ্রামে।
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ৭ নং অভিযোগে বলা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সেলিম খানের বাড়িতে মাওলানা সাঈদীর দেখানো মতে লুটপাট শেষে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয় ।
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট শাহাজাহান বলেন, সেলিম খানের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে কিন্তু তাকে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হিসেবে হাজির করেনি। সাক্ষী হিসেবে হাজির করেছে দূরের লোক। রাষ্ট্রপক্ষের আট নং সাক্ষী বলেছেন তিনি খালের ওপারে দাড়িয়ে সেলিম খানের বাড়িতে ধোয়া উড়তে দেখেছেন। কাজেই তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেননা এবং তিনি যে  বলেছেন সাঈদীর দেখানো মতে আগুন দেয়া হয়েছে তাও সত্য নয়।

শুনানীতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান আসামী পক্ষে অ্যাডভোকেট গিয়াসউদ্দিন আহমেদ মিঠু, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন, অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল আবেদনে যুক্তি উপস্থাপন শুরু// সাক্ষীর বয়স এবং ঘটনা শুনে বিচারপতি বললেন আনবিলিভঅ্যাবল

মেহেদী হাসান, ২৮/১/২০১৪
বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন ও মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন মামলায় যুক্তি উপস্থাপন  শুরু হয়েছে। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চে আজ যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয়।  মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান যুক্তি পেশ শুরু করেছেন। এর আগে এ মামলায় এভিডেন্স ( জবানবন্দী, জেরা এবং রায়) পাঠ শেষ হয়।

প্রথম দিন একটি অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্য খন্ডন করে যুক্তি পেশ করা হয়েছে।

যুক্তি উপস্থাপনের শুরুতে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান মামলার সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে ২০টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের রায়ে তার বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে এবং দুটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়েছে। প্রমানিত আটটি অভিযোগ হল  ৬,৭,৮,১০,১১,১৪,১৬ এবং ১৯। ৮ এবং ১০ নং অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
এ পর্যায়ে আদালত বলেন, যে আটটি অভিযোগে তাকে সাজা প্রদান করা হয়েছে সে বিষয়ে যুক্তি পেশ করেন।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান ৬ নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি পেশ শুরু করে বলেন, এ অভিযোগে বলা হয়েছে ১৯৭১ সালের ৭ মে পিরোজপুর জেলার পাড়েরহাট বাজারে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আসে এবং মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী শান্তি কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে অভ্যর্থনা জানান। এরপর মাওলানা সাঈদীর দেখানো মতে পাড়েরহাট বাজারে আওয়ামী লীগ ও হিন্দুদের দোকানপাট ও বসতবাড়িতে আগুন দেয়।
এ ঘটনা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের  ১,২,৩,৪,৮,৯,১২ এবং ১৩ নং সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছে।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের এক নং সাক্ষী মাহবুবুল আলম ৬ নং অভিযোগ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, ‘মে মাসের প্রথম সপ্তায় পাক হানাদার বাহিনী পিরোজপুরে আসে। ৭ মে সকাল বেলা আমি নিজ বাড়িতেই ছিলাম। এবং লোকমুখে শুনতে পাই পাক হানাদার বাহিনী পাড়েরহাট আসিতেছে  এবং পাড়েরহাটের শান্তি কমিটির লোকেরা পাড়েরহাট রিক্সা স্ট্যান্ডে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে। আমি পাড়েরহাটে যাইয়া  রিক্সা স্ট্যান্ডের আড়ালে থেকে  গোপনে লক্ষ্য করিতেছি পাড়েরহাটের শান্তি কমিটির লোকের দাড়িয়ে আছে। কিছু পরে একেকটি রিক্সা করে ২৬টি রিক্সায় ৫২ জন পাক হানাদার বাহিনী রিক্সা স্ট্যান্ডে নামে। শান্তি কমিটির লোকেরা তাদের অভ্যর্থনা জানায়। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী উর্দুভাষা ভাল জানতেন বিধায় ক্যাপ্টেন ইজাজের সাথে কথা বলেন।  পরে বাজারের দিকে পাক হানাদার বাহিনী যেতে থাকে। শান্তি কমিটির লোকেরা বাজারের ভেতরের দিকে যায়।  মুক্তিযোদ্ধার পক্ষের আওয়ামী লীগ ও হিন্দু  সম্প্রদায়ের লোকদের দোকানঘর, বসতঘর ক্যাপ্টেন ইজাজকে দেখিয়ে দেয়। ক্যাপ্টেন ইজাজ লুটের নির্দেশ দেয়। লুটপাট শুরু হয়ে যায়। আমি অকুস্থল থেকে কিছু দূরে সরে যাই। পরে জানতে পারি ৩০ থেকে ৩১টি দোকান ঘরের মামামাল, বসতবাড়ি লুটপাট করে  সাঈদী সাহেবের নেতৃত্বে ভাগ বাটোয়ারা করে দেয়।’

অ্যাডভোকেট শাহাজাহন বলেন, সাধারনত পাকিস্তান আর্মি আসলে সে এলাকায় একটি ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হত। মানুষ জীবন নিযে পালাত। কিন্তু এ সাক্ষী বলেছেন তিনি আড়ালে থেকে গুনেছেন পাকিস্তান আর্মি একে একে  ২৬টি রিক্সা যোগে এসেছে এবং প্রতি রিক্সায় দুজন করে মোট ৫২ জন  সৈন্য ছিল। কোন একটি স্থানে লুকিয়ে থেকে ২৬ টি রিক্সা আসতে দেখা, তাতে ৫২ জন আর্মি গননা করা কি সম্ভব? তাছাড়া তিনি বলেলেন লুকিয়ে থেকে ঘটনা দেখেছেন। কাজেই মাওলানা সাঈর্দী কর্তৃক ক্যাপ্টেন ইজাজের সাথে উর্দতে কথা বলা তিনি শুনলেন কিভাবে?
এ পর্যায়ে বিচারপতি সুরেন্দ্রকুমার সিনহা বলেন, ইমপ্রব্যাবল (অভাবনীয়)।

অ্যাডভোকেট শাহজাহান এরপর বলেন, সাক্ষী মাহবুবুল আলমের  এসএসসি রেজিস্ট্রেশন ফর্মে জন্ম তারিখ লেখা রয়েছে ২০/৩/১৯৫৯। সে মোতাবেক ১৯৭১ সালের ২০ মার্চ তার বয়স ছিল ১২ বছর । ৭ মে তার বয়স দাড়ায় ১২ বছর ২ মাসের মতন।  রাষ্ট্রপক্ষের ১৩ নং সাক্ষী বলেছেন মাহবুবুল আলম স্বাধীনতার আগে স্কুল ছাত্র ছিলেন।
এ বয়সের একজন শিশু সাক্ষী বলেছেন, পাকিস্তান আর্মি আসার খবর শুনে তিনি আড়ালে অবস্থান করে পর্যবেক্ষন করেছেন,  রিক্সা এবং   সৈন্য সংখ্যা গননা করেছেন।
এ পর্যায়ে বিচারপতি সুরেন্দ্রকুমার সিনহা বলেন, আনবিলিভঅ্যাবল। এসময় অপর বিচারপতি এএইএম শামসুদ্দীন চৌধুরী বলেন, ১২ বছর বয়সে একজন অনেক ম্যাচিউরড হয়ে যায়।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের এক নং সাক্ষী মাহবুবুল আলম এ মামলায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন সাক্ষী। কারণ তিনি মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুরে মামলা করেছেন এবং পরে ট্রাইব্যুনালে তিনি অভিযোগ দায়ের করেছেন। তার  দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থা এবং মামলার কার্যক্রম শুরু হয়।

এরপর অ্যাডভোকেট শাহাজাহান মাহবুবুল আলম এবং রাষ্ট্রপক্ষের অন্যান্য সাক্ষীদের জেরা থেকে মাহবুবুল আলমের সাক্ষ্যকে অসত্য প্রমানের চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, সাক্ষী বলেছেন, ‘ লুটপাট শুরু হয়ে যায়। আমি অকুস্থল থেকে কিছু দূরে সরে যাই। পরে জানতে পারি ৩০ থেকে ৩১টি দোকান ঘরের মামামাল, বসতবাড়ি লুটপাট করে  সাঈদী সাহেবের নেতৃত্বে ভাগ বাটোয়ারা করে দেয়।’ কাজেই কাদের বাড়িঘর লুটপাট হয়েছে তা তার পক্ষে দেখা এবং বলা সম্ভব নয়। তাছাড়া জেরায় তিনি বলেছেন মাখন সাহার দোকান লুটের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেননা।

এরপর রাষ্ট্রপক্ষের দুই নং সাক্ষী রুহুল আমিন নবিন এর সাক্ষ্য খন্ডন করে যুক্তি পেশ করেন অ্যাডভোকেট শাহজাহান। এ  সাক্ষী ৬ নং অভিযোগ বিষয়ে বলেছেন, ‘৭ মে  পাড়েরহাটের শান্তি কমিটির  সেকেন্দার  আলী শিকদার, দানেস মোল্লা, মাওলানা মোসলেহউদ্দিন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেব সহ আরো কয়েকন পারের হাটে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য রিক্সা স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করতে থাকে। ২৬টি রিক্সাযোগে  প্রায় ৫২ জন পাক হানাদার বাহিনী পারের হাটে প্রবশে করে।  শান্তি কমিটির লোকজন পাক হানাদারদের নিয়ে পারেরহাট বাজারে  প্রবেশ করে  এবং  আওয়ামী লীগ ও হিন্দুদের বাড়িঘর দোকানপাট দেখিয়ে দেয়। শান্তি কমিটি ও রাজাকারদের দেখিয়ে দেওয়া ঘরগুলোতে   শুরু হয় লুটপাট।  পারের হাট বাজারের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মাখন  সাহার দোকানের মাটির নিচের লোহার সিন্দুক থেকে ২২ শের স্বর্ণ ও রূপা লুট করে। ৩০/৩৫টি দোকান ঘর লুটাপাট চালায়। ’

অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, জেরায় সাক্ষী বলেছেন, মাখন সাহার দোকানে গর্ত করার খবরটা তিনি শুনেছেন বিকালে। আর ৩০/৩৫টি দোকান লুটের খবর তিনি জানতে পেরেছেন সন্ধ্যায়। তার মানে ঘটনার সময় সে সেখানে ছিলনা এবং দেখেনওনি। তিনি শুনেছেন।
তাছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের ৯ নং সাক্ষী রুহুল আমিন নবিন সম্পর্কে বলেছেন ৭ মে’র অনেক আগে তিনি পাড়েরহাট ছেড়ে চলে গেছেন। ৯ নং সাক্ষী আরো বলেছেন, পাড়েরহাটে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে রুহুল আমিন নবিনের নাম তার মনে আছে। কাজেই  ৯ নং সাক্ষী যে দাবি করেছেন অর্থাৎ ৭ মে’র আগেই নবিন পাড়েরহাট ছেড়ে চলে গেছে এটা স্বাভাবিক। কারণ যারা মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজ করেছে ২৫ মার্চের পর তাদের এলাকায় না থাকাই স্বাভাবিক। কাজেই রুহুল আমিন নবিন ৭ মে পাড়েরহাট ছিলেননা এবং ওই দিন তিনি মাওলানা সাঈদীকে পাড়েরহাট দেখেছেন মর্মে যে ঘটনার বিবরন দিয়েছেন তা অসত্য।
তাছাড়া নুরুল হক মৌলভির যে মামুস স্টোরের সামনে  দাড়িয়ে তিনি ঘটনা দেখার কথা বলেছেন তা তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বলেননি বলে জেরায় তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

যুক্তি উপস্থাপন আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান, মাওলানা সাঈদীর পক্ষে গিয়াসউদ্দিন আহমেদ মিঠু, সাইফুর রহমান, তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন, তারিকুল ইসলাম, আবু বকর সিদ্দিক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৪

মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষীর জেরা

 ২৩.১.১৪
দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান (এমসি) ও জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষী মো: সানাউল্লাহ চৌধুরীকে আসামীপক্ষের জেরা শেষ হয়েছে। আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ সাক্ষীকে জেরা করেন মীর কাসেম আলীর পক্ষে আইনজীবী মিজানুল ইসলাম। দ্বিতীয় সাক্ষীর জেরা শেষে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। 
সাক্ষ্যগ্রহণের সময় মীর কাসেম আলীকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। তিনি আদালতের কাঠগড়ায় বসে সাক্ষ্য গ্রহণ দেখেন। তার পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মিজানুল ইসলাম, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন, মীর আহমদ বিন কাসেম, আসাদ উদ্দিন ও আবু বকর সিদ্দিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম ও সুলতান মাহমুদ সিমন।

জেরা:
প্রশ্ন: ডালিম হোটেল কখন থেকে চিনতেন?
উত্তর: স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকে।
প্রশ্ন: ডালিম হোটেল ভবনের কোন কোন তলা আবাসিক হোটেল ছিল?
উত্তর: দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা।
প্রশ্ন: ডালিম হোটেলের মালিক কে ছিল?
উত্তর: বলতে পারব না।
প্রশ্ন: ডালিম হোটেলের আশপাশে কোন বসতি ছিল কি না?
উত্তর: বসতি ছিল কি না বলতে পারব না, তবে দোকানপাট ছিল।
প্রশ্ন: টন্টুসেন, জসিম ও রঞ্জিত দাসকে ডালিম হোটেলে দেখার আগে চিনতেন কি না?
উত্তর: চিনতাম না।
প্রশ্ন: ডালিম হোটেলের আটক থাকা অবস্থায় নবী চৌধুরীর নাম শুনেছেন কি না?
উত্তর: শুনিনি। তবে পিডিপি নেতা নবী চৌধুরীকে আমি চিনতাম।
প্রশ্ন: তিনি কি স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন? 
উত্তর: বলতে পারব না।
প্রশ্ন: রাজাকার কমান্ডার মতিউর রহমান ওরফে মইত্যা গুন্ডার নাম শুনেছেন?
উত্তর: শুনিনি।
প্রশ্ন: ডালিম হোটেলে আপনি কোন পাকিস্তান আর্মি বা বিহারীদের দেখেছেন? 
উত্তর: দেখিনি।
প্রশ্ন: আটক অবস্থায় আপনাকে ডালিম হোটেলের কোন কোন রুমে রাখা হত?
উত্তর: নির্দিষ্ট কোন রুমে রাখত না, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রুমে রাখা হত।
প্রশ্ন: বাবুলকান্তি নাথ নামে কাউকে চেনেন?
উত্তর: এ নামে কাউকে চিনি বলে মনে পড়ছে না।
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত রাজাকাদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হয়।
উত্তর: রাজাকার ও আল-বদরদের বিরুদ্ধে মামলা হয় বলে শুনেছি।
প্রশ্ন: পেশকারের দায়িত্ব পালনকালে পাকিস্তান আর্মির বিরুদ্ধে কোন মামলা করতে দেখেছেন?
উত্তর: আমার নজরে আসেনি।
প্রশ্ন: ১৯৭২ সালে ডালিম হোটেলের মালিক মইত্যা গুন্ডা ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে হোটেল ভবন দখলে রাখা এবং সেখানে অবস্থান করে মহিলাদের শ্লীলতাহানী, লুটপাট সংগঠন প্রভৃতি অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছিল কি না?
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: আপনি এসএসসি কোন সালে পাস করেছেন?
উত্তর: ১৯৬২ সালে।
প্রশ্ন: কোন সালে চাকরিতে যোগদান করেন?
উত্তর: ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের চাকরিতে যোগদান করি।
প্রশ্ন: এসডিও অফিসে কোন সালে কাজ করেছেন?
উত্তর: ১৯৭৮ সাল থেকে ’৮২ সাল পর্যন্ত এডিশনাল এসডিও অফিসে পেসকার হিসেবে চাকরি করেছি।
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালে কোন পদে ছিলেন?
উত্তর: ’৭১ সালে ল্যান্ড অ্যাকুইজেশন শাখার অফিস সহকারী ছিলাম।
প্রশ্ন: অবসরের সময় কোন পদে ছিলেন?
উত্তর: ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় সহকারী হিসেবে কর্মরত অবস্থায় অবসর গ্রহণ করি।
প্রশ্ন: চাঁন্দগাও নামে চট্টগ্রামে কোন গ্রাম নেই।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালে চাঁন্দগাও ইউনিয়ন ছিল? 
উত্তর: ইউনিয়নও ছিল, গ্রামও ছিল।
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালে পাকিস্তান আর্মি চট্টগ্রাম শহরে কবে প্রবেশ করে?
উত্তর: ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করার চার বা পাঁচদিন পর।
প্রশ্ন: চট্টগ্রামের কোতয়ালী থানায় পাকিস্তান আর্মি কোথায় ছিল?
উত্তর: বলতে পারব না।
প্রশ্ন: জেলা প্রশাসনের নিকটবর্তী পাকিস্তান আর্মির ক্যাম্প কোথায় ছিল?
উত্তর: সার্কিট হাইজে অবস্থান করত, তবে সেখানে ক্যাম্প অফিস ছিল কিনা বলতে পারব না।
প্রশ্ন: চট্টগ্রাম আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসকের কার্যালয় কোথায় ছিল?
উত্তর: বলতে পারব না।
প্রশ্ন: শন্তি কমিটির অফিস কোথায় ছিল?
উত্তর: বলতে পারব না।
প্রশ্ন: জেলা আনসার অ্যাডজুটেন্ড কার্যালয় কোথায় ছিল?
উত্তর: স্মরণ নেই।
প্রশ্ন: জেলা অ্যাকাউন্টস অফিস ভবন কোথায় ছিল?
উত্তর: জেলা প্রশাসন ভবনেই ছিল।
প্রশ্ন: ’৭১ সালে অ্যাকাউন্টস অফিসে লুটপাট হয়?
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: মুক্তিযোদ্ধা, বিএলএফ বা অন্যকোন মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপক্ষ শক্তি কর্তৃক জেলা প্রশাসনের অফিস আক্রান্ত হয়েছিল কি না?
উত্তর: জানা নেই। 
প্রশ্ন: আপনি ১৯৭০-৭১ সালে জেলা প্রশাসন ভবনে কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের নেতা ছিলেন কি না?
উত্তর: ছিলাম না।
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর প্রধান কার্যালয় কোথায় ছিল?
উত্তর: রাজাকারদের প্রধান কার্যালয় কোথায় ছিল বলতে পারব না। আল-বদরদের প্রধান অফিস চিল আন্দর কিল্লাস্থ ডালিম হোটেল।
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক কে ছিলেন?
উত্তর: ২৬ মার্চের পর সম্ভবত হাসান আহমেদ জেলা প্রশাসক ছিলেন।
প্রশ্ন: আপনি জবানবন্দীতে মীর কাসেম আলী সম্পার্কে যে সকল বক্তব্য দিয়েছেন সে মর্মে কোন ঘটনা ঘটেনি।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: মীর কাসেম আলী ১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর থেকে দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামে থাকতেন না।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: মীর কাসেম আলী কোন সময় আল বদর কমান্ডার ছিলেন না?
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনি শেখানো মতে সাক্ষ্য দিয়েছেন?
উত্তর: সত্য নয়।

মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল শুনানী // এভিডেন্স পড়া শেষ ২৮ জানুয়ারি থেকে যুক্তি উপস্থাপন

21/1/2014
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন শুনানীতে আগামী ২৮ জানুয়ারি থেকে যুক্তি উপস্থাপন শুরু হবে। আজ এ মামলায় এভিডেন্স অর্থাৎ ট্রাইব্যুনালের রায় এবং উভয় পক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দী ও জেরা পড়ে শেষ করা হয়েছে। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান আজ আসামী পক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দী ও জেরা  পড়ে শোনানো শেষ করেন। এরপর আসামী পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে আগামী ২৮ জানুয়ারি যুক্তি উপস্থাপনের জন্য ধার্য্য করা হয়। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ মামলার শুনানী গ্রহণ করেন।

গত রোববার মাওলানা সাঈদীর পক্ষে এ মামলার শুনানী চার সপ্তাহ  মুলতবি রাখার আবেদন করা হয়। আজ মুলতবি আবেদনের পক্ষে শুনানীতে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, এ মামলা শুনানীর জন্য  দুজন সিনিয়র আইনজীবী নিযুক্ত করা হয়েছে। এদের একজন হলেন বাংলাদেশ বার এসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন। কিন্তু তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া অপর সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এ কারনে অন্তত চার সপ্তাহ সময় দরকার ।
আসামী পক্ষের এ আবেদনের বিরোধীতা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান। শুনানী শেষে আদালত এক সপ্তাহ মুলতবি করেন।
আসামী পক্ষ থেকে নয়া দিগন্তকে জানানো হয়েছে গত সোমবার মুলতবি আবেদন বিষয়ে শুনানী হবার কথা ছিল। সেজন্য গতকাল সিনিয়র আইনজীবী নজরুল ইসলাম, জয়নুল আবেদিন এবং নিতাই চন্ত্র রায় উপস্থিত ছিলেন।




বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৪

সাঈদীর আপিল শুনানী// সাফাই সাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরা পড়া শুরু

১৬/১/২০১৪
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদনের ওপর শুনানী অব্যাহত রয়েছে। প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ আজ শুনানী গ্রহণ করেন।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান সাক্ষীদের জবানবন্দী এবং জেরা পড়ে শোনাচ্ছেন আদালতে। গতকাল রাষ্ট্রপক্ষের শেষ সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার জেরা পড়ে শোনানো শেষ হয়েছে। এরপর মাওলানা সাঈদীর পক্ষে ছয়জন সাফাই সাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরা পড়ে শোনানো হয়েছে। এরপর আগামী রোববার পর্যন্ত মামলার কার্যক্রম মুলতবি করা হয়েছে।

শুনানীতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান, মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


সাঈদী সম্পর্কে আহমদ ছফা

সাঈদী সম্পর্কে দার্শনিক আহমদ ছফার মূল্যায়ন পড়ে আমি যারপরনাই পুলকিত হলাম। আমার সহকর্মী আলফাজ আনাম ভাইর রুমে ঢোকামাত্র আমাকে তিনি আহমদ ছফার লেখাটি ধরিয়ে দিয়ে বললেন পড়েন। পড়ে আমি হোহো করে হেসে উঠলাম। তাকে বললাম ফেসবুকে ছাড়েন। সে ছাড়ল। আমি শেয়ার করলাম। পড়ে কপি করে আমিও একটা স্টাটাস মারলাম। নিম্নে সাঈদী সম্পর্কে আহমদ ছফার মূল্যায়নটি পড়তে পারেন। পুলকিত হবেন আশা করি।

...............আমার বিচারে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোত্তম আশ্চর্য বস্তু হল হযরত মাওলানা আলহাজ্ব দেলোয়ার হোসেন সাঈদী। তাঁকে কি কারণে এ দুর্লভ সম্মানে ভূষিত করতে হল সেটা একটু ব্যাখ্যা করার দাবি রাখে। গত ফাল্গুনে আমি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখি আমার ভাতৃবধূ কে-টু সিগারেট পান করছেন এবং ক্যাসেটে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী সাহেবের মিলাদ শুনছেন। আমার বাবা-মা যদ্দিন বেঁচেছিলেন ওই মহিলাকে জোর করে একবারও নামাযের পাটিতে দাঁড় করাতে পারেননি। আমার ভাইও অনেক চেষ্টা করে ক্ষান্ত দিয়েছিলেন। আমি দেখলাম হযরত সাঈদী এই মহিলার অন্তরে ধর্মপিপাসা জাগ্রত করতে সক্ষম হয়েছেন। তারপরেও যদি তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি দিতে আমি রাজি না হই, নিজের উৎকৃষ্ট অংশের প্রতি আমি অবিচার করব। ভাবীর এই রূপান্তর দেখে আমি নিজেও হযরতের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছি। তার কারণ আছে। অন্য মাওলানার মিলাদ আমি শুনেছি। তাঁরা ধর্মকথা পুণ্যকথা বলেন। কিন্তু সেগুলো বোরিং লাগে। মাওলানা সাঈদীর ক্যাসেট যখন শুনলাম, বুঝতে পারলাম মিলাদ কাকে বলে। এখনে ধর্ম অর্থ মোক্ষ কাম সব মেলে। হযরত সাঈদী যদি গান করতেন, মাইকেল জ্যাকসনের কাছাকাছি পৌঁছুতেন। অভিনয় করলে ছবি বিশ্বাসকে ছাড়িয়ে যেতেন। নাচ করলে বুলবুল চৌধুরীর রেকর্ড ম্লান হয়ে যেত। নাচ গান অভিনয় এবং তার ওপর ধর্মকথা এই একের ভেতর চার তিনি সমন্বয় করেছেন। তাঁকে কি করে আমি সামান্য মানুষ বলব। সুতরাং বরণীয় স্মরণীয়দের তালিকায় আমি সাঈদী সাহেবকে একটা জায়গা দিয়ে বসে আছি
(ত্রি বঙ্গাশ্চর্য পরিচয় / আহমদ ছফা)নিকট ও দূরের প্রসঙ্গ, ১৯৯৫।

বুধবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল আবেদন শুনানী চলছে

১৫/১/২০১৪
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন শুনানী অব্যাহত রয়েছে। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ আজ শুনানী গ্রহণ করেন। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান তদন্ত কর্মকর্তার জেরা পড়ে শোনান ।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের যেসব সাক্ষীদের জবানবন্দী তাদের অনুপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে সে বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা পড়ে শোনানো হয়েছে আজ। সুখরঞ্জন বালী, গণেশচন্দ্র সাহা, উষারানী মালাকার, মমতাজ বেগম, সেতারা বেগম, রানী বেগম,  সুমতি রানী মন্ডল, আশিষ কুমার মন্ডল, সমর মিস্ত্রী, আইউব আলী, সেলিম খান প্রভৃতি সাক্ষী ছাড়াও ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার ঘটনা বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে যে জেরা করা হয়েছে তা পড়ে শোনা হয়েছে ।
শুনানীতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যটর্নি জেনারেল এমকে রেহমান, আসামী পক্ষে ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন প্রমুখ আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।

সোমবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৪

মাওলানা সাঈদীর আপিল শুনানী আবার শুরু

13/1/2014
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন শুনানী বেশ কিছুদিন পর আবার  শুরু হয়েছে। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ আজ  শুনানী গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দী ও জেরা পড়ে শোনানোর পর বর্তমানে তদন্ত কর্মকর্তার জেরা পড়ে শোনানো হচ্ছে এ মামলায়। তবে তদন্ত কর্মকর্তার জেরা পড়ে শোনানো শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার জেরা পড়ে শোনানো শেষ হলে মাওলানা সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দী ও জেরা পড়ে শোনানো হবে। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান জবানবন্দী ও জেরা পড়ে শোনাচ্ছেন। এসময় মাওলানা সাঈদীর পক্ষে অন্যান্য আইনজীবীর মধ্যে ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রপক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান।

মঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৪

আল্লাহর পরে প্রধানমন্ত্রী এরপর আমরা : বললেন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান

মেহেদী হাসান,
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেছেন, আল্লাহর পরে প্রধানমন্ত্রী এরপর আমরা।   আজ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা পরিচালনার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন।

ট্রাইব্যুনালে একটি মিস মামলার আদেশের জন্য ধার্য্য ছিল আজ। মামলার  একটি পক্ষ  হিসেবে  বাগেরহাট নোটারী পাবলিকের দুই আইনজীবী শেখ আবদুল ওয়াদুদ এবং শামীমা আক্তারের উপস্থিতে এ আদেশ প্রদানের কথা ছিল। কিন্তু তারা কেউ গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির ছিলেননা।

অবরোধের কারনে তারা আসতে না পারায় তাদের পক্ষে অ্যাডভোকেট গাজি এমএইচ তামিম সময় প্রার্থনা করেন। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ওনারা আসেননি কেন? ওনারা কোথায়?  এসময় গাজি তামিম হরতাল অবরোধ এবং নির্বাচনের পরের পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন এসব কারনে তারা আসতে পারেননি।
তখন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, এভাবে হয়না। আদালতে আইনজীবীরা আসছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে মামলার সাক্ষীরাও আসছে। গাড়ি ঘোড়া সব চলে । সবাই আসতে পারেন আর ওনারা পারেননা?  আসবেন, আমরা আসার ব্যবস্থা করলে আপনে আপনেই আসবেন। পরের  দিন  তারা আসতে না পারলে যেখানে যাবার সেখানে যেতে হবে তাদের। এর আগেও আমরা তাদের অনেক সুযোগ দিয়েছি।

এসময় গাজি তামিম বলেন তারা আসার জন্য চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পারেননি। হরতাল অবরোধে সারা দেশে বর্তমান কি অবস্থা বিরাজ করছে তা আপনারা জানেন মাইলর্ড।
তখন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বলেন, ওনারা চেষ্টা করলে আসতে পারতেন। চেষ্টা করলে ভেঙ্গে ভেঙ্গে আসতে পারতেন। আসলে ওনারা চেষ্টা করেননি। আমরা চেষ্টা করিয়ে দিলেই তারা আসবেন।


ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বলেন, এসব নাটক আর কতদিন চলবে? এসব বন্ধ করেন। এসব নাটক করে কি হবে? দেশে ইলেকশন হয়েছে।  সবকিছু চলছে। কোনকিছুতো থেমে নেই। তিনি বলেন,  আমরা অনেক সুযোগ দিয়েছি। এসব সুযোগ গ্রহণ করেন।  আমাদেরও সহ্য এবং ধৈর্য্যের একটা সীমা আছে। আমাদের ধৈর্য্যরে সে বাঁধ ভেঙ্গে দিবেননা। আমরা আর কত অপেক্ষা করব? আমাদের যদি আপনারা ক্ষেপিয়ে তোলেন এবং আমরাও যদি রাগের বশে তাদের বিরুদ্ধে কোন আদেশ দেই সে আদেশের  বিরুদ্ধে কোন আপিল করতে পারবেননা। কি তামিম সাহেব পারবেন কোন আপিল করতে?

ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান এরপর বলেন, দেখুন  আল্লাহর পরে প্রধানমন্ত্রী এরপর আমরা ।  আমরা কারো জন্য  আর অপেক্ষা করবনা। দেশ যেভাবে এগিয়ে যাওয়ার সেভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে।  আমাদেরও একইসাথে এগিয়ে যেতে হবে।

ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান গাজি তামিমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি তো ট্রাইব্যুনালে এসেছেন। আপনাকে তো আগুন, বোমা, হামলা, জামায়াত-শিবির, পুলিশ আওয়ামী লীগ কিছু করতে পারেনা। আপনি তো আসতে পারেন। তারা কেন আসতে পারছেনা? 

মিস মামলার প্রেক্ষাপট : জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের  সপ্তম সাক্ষী ছিলেন আসিয়া খাতুন ।

মাওলানা ইসুফের পক্ষে আইনজীবী গাজি এমএইচ তামিম দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, সাক্ষী আসিয়া খাতুন ২০১০ সালে মাওলানা উসুফের বিরুদ্ধে তার স্বামী হত্যার বিষয়ে অভিযোগ করে একটি মামলা করেন। সে মামলাটি ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।
গাজি তামিম বলেন, আসিয়া খাতুন ২০১০ সালের মামলায় মাওলানা ইউসফ সাহেবকে আসামী করলেও মামলা দায়ের করার তি/চার মাস পরে একটি এফিডেভিট করেন বাগেরহাট নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে। সে এফিডেভিটে  তিনি বলেন, তার স্বামী হত্যার সাথে  মাওলানা ইউসুফের কোন সম্পর্ক নেই। ভুল করে তার স্বামী হত্যায় মাওলানা ইউসুফকে আসামী করা হয়েছে।  আসামীর তালিকা থেকে মাওলানা ইউসুফের নাম বাদ দিয়ে তিনি এ এফিডিভিট করেন।

গাজি তামিম বলেন, গত ১৭ নভেম্বর আমরা স্বাক্ষীকে জেরার সময় তার এ এফিডেভিট তাকে আদালতে প্রদর্শন করি। তখন  তিনি বলেন এফিডেভিট এর ছবি তার কিন্তু তিনি এফিডিভিট এবং এর স্বাক্ষর অস্বীকার করেন। । তখন ট্রাইব্যুনাল এফিডেভিট বিষয়ে জানতে চান। আমারা ট্রাইব্যুনালকে আমাদের সংগৃহীত কপি জমা দিয়েছি। এপর বাগেরহাট নোটাারি পাবলিক এর যে আইনজীবী  এফিডেভিট করেন এবং যিনি এটি সনাক্ত করেছেন সেই দুই আইনজীবীকে  তলব করে আদেশ দেন এ বিষয়ে জানার জন্য। ৪ ডিসেম্বর প্রথম তাদের হাজিরের জন্য দিন ধার্য্য ছিল।

গাজি তামিম বলেন, হরতাল অবরোধের কারনে এর আগেও বেশ কয়েকবার তারা আসতে পারেননি। তবে পরবর্তীতে তারা দুজন পৃথকভাবে এসে আদালতে হাজিরা দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে, তাদের মাধ্যমে আসিয়া খাতুন এফিডেভিট করিয়েছেন। আজ  এ বিষয়ে আদেশ এর জন্য ধার্য্য ছিল।