সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী : আর্গুমেন্ট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী : আর্গুমেন্ট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০১৫

আপিল বিভাগের রায় : সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড বহাল


মেহেদী হাসান ২৯/৭/২০১৫
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখা হয়েছে  দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগের রায়ে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ আজ এ রায় ঘোষনা করেন।

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুাল  (১) ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে চারটি অভিযোগে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এর সবগুলিই বহাল রাখা হয়েছে আপিল বিভাগের রায়ে। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের রায়ে তিনটি অভিযোগের প্রতিটিতে ২০ বছর এবং আরো দুটি অভিযোগে ৫ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। আপিল বিভাগের রায়ে ২০ বছর সাজা পাওয়া তিনটি অভিযোগের  একটি থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে । সব মিলিয়ে ট্রাইব্যুনাল মোট নয়টি অভিযোগে দণ্ড দিয়েছিল এবং সেখান থেকে একটি বাদে বাকী আটটি দণ্ড বহালা রাখা হয়েছে আপিল বিভাগের রায়ে।
সকাল নয়টায় আপিল বেঞ্চ সংক্ষিপ্ত রায় দেন। বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

নিয়ম অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে আসামী পক্ষ এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন  করতে পারবেন এবং রিভিউ রায়ই হবে সর্বশেষ রায়।  রিভিউ রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে সামনে  থাকবে আলোচিত ঘটনাবহুল  এ মামলার রায় কার্যকরের পর্ব।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে  চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া এবং বোয়ালিয়া থানায় হত্যা, গনহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, অপহরন, নির্যতান দেশান্তরকরনসহ মানবতাবিরোধী মোট ৩২টি অভিযোগ আনা হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। সেখান থেকে ২৩টি অভিযোগে চার্জ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৩টি অভিযোগের মধ্য থেকে ১৭টি অভিযোগের পক্ষে সাক্ষী হাজির করে । ১৭টি অভিযোগ থেকে  তাকে মোট ৯টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। বাকী আটটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া  হয়।

২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোরে গ্রেফতার করা হয় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে। ২০ ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধ অভিযোগে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

এখন পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধ মামলায়  মোট  তিনটি  মামলার চূাড়ান্ত  নিষ্পত্তি করা হয়েছে। সেগুলো হল আবদুল কাদের মোল্লা, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং  মুহম্মদ কামারুজ্জামান । এর মধ্যে আব্দুল কাদেরর মোল্লা ও মুহম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।  এছাড়া আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধেও আপিল মামলার রায় হয়েছে তবে এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রাকশ এবং তৎপরবর্তী রিভিউ  আবেদন বাকী রয়েছে।


মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৪ অভিযোগ : 
ট্রাইব্যুনালের রায়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে যে চারটি অভিযোগে মুত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে সেগুলো হল ৩, ৫, ৬ এবং ৮ নং অভিযোগ।
অভিযোগ-৩  :  রাষ্ট্রপক্ষের এ অভিযোগে বলা হয় ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে এবং নির্দেশে রাউজানের গহিরায় অবস্থিত কুন্ডেশ্বরী কমপ্লেক্স এর প্রতিষ্ঠাতা সমাজসেবক অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহকে পাকিস্তান আর্মি গুলি করে হত্যা করে।  সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজেও  তাকে গুলি করে । 

অভিযোগ-৫ :  এ অভিযোগ সম্পর্কে বলা হয় ১৯৭১ সালে ১৩ এপ্রিল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী কতিপয় অনুসারীদের নিয়ে রাউজানের সুলতানপুর গ্রামে  হামলা চালিয়ে  তিনজনকে গুলি করে হত্যা করে। 
অভিযোগ-৬  : ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে  রাউজানের ঊনসত্তরপাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালান হয়। এসময় ৫০ থেকে ৫৫ জন হিন্দুকে  ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়।
অভিযোগ-৮  :  ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর আহম্মদ তার পুত্র শেখ আলমগীরসহ তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য প্রাাইভেটকারযোগে চট্টগ্রামের রাউজান থেকে চট্টগ্রাম শহরে আসছিলেন। পথে হাটহাজারী থানার খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি তিন রাস্তার মোড়ে সকাল অনুমান ১১টার দিকে পৌঁছামাত্র আসামি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে থাকা পাকিস্তানি দখলদার সৈন্যরা তাদের প্রাাইভেট গাড়িটি অবরোধ করে শেখ মোজাফফর আহম্মেদ ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আটক করে স্থানীয় পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরে আর তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

আপিল বিভাগের আজকের  রায়ে মৃত্যুদণ্ডের সবগুলো সাজা বহাল রাখা হয়েছে।

২০ বছর করাদণ্ডের  ৩ অভিযোগ :
২, ৪ এবং ৭ নং অভিযোগে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ২০ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
অভিযোগ ২ :   ১৯৭১ সালের  ১৩ এপ্রিল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তান  সেনাবাহিনীর একদল সদস্য রাউজানের গহিরা  গ্রামের  হিন্দু  পাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালায়। এসময়  পঞ্চবালা শর্মা, সুনীল শর্মা, মতিলাল শর্মা ও দুলাল শর্মা  তিন চারদিন পর মারা যায়।

অভিযোগ ৪ : এ অভিযোগে বলা হয় ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী স্থানীয় সহযোগী এবং  পাকিস্তানি  সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত জগৎমলপাড়ায় অভিযান চালান। এসময় ৩২ জনকে হত্যা করা হয়।

অভিযোগ ৭ : ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল  সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানি সেনা সদস্য রাউজান পৌরসভা এলাকার সতীশ চন্দ্র পালিতের বাড়িতে  প্রবেশ করে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয।
আপিল বিভাগের রায়ে এ অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়েছে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে।

পাঁচ বছর কারাদান্ডের ২  অভিযোগ :
১৭ এবং ১৮ নং অভিযোগে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ১৭ নং অভিযোগে বলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ, সিরাজ ও ওয়াহেদ ওরফে ঝুনু পাগলাকে অপহরণ করে বন্দী করে রাখা হয়। ১৮ নং অভিযোগে বলা হয়েছে চট্টগ্রাম জেলার চান্দগাঁও থানার মোহারা গ্রামের  সালেহউদ্দিনকে অপহরণ করে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পারিবারিক বাসভবন গুড়সহিলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার গালে চড় মারেন।

আপিল বিভাগের রায়ে ১৭ এবং ১৮ নং অভিযোগের সাজা বহাল রাখা হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি :
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি পরিচিত নাম সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি পরপর ছয়বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি আলোচিত একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন।  ১৯৭৩ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার মৃত্যু হয়।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তৎকালীন পূর্ব  পাকিস্তান ক্যাডেট কলেজে (বর্তমানে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ) ভর্তি  হন ১৯৬০ সালে এবং সেখান থেকে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর  নটরডেম কলেজে ১৯৬৬ সালে ভর্তি হন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্নাসে ভর্তির পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি হন এবং সেখানে অধ্যয়ন শেষে ১৯৭১ সালে অক্টোবর মাসে লন্ডনের লিঙ্কন ইনে ভর্র্তি  হন ব্যারিস্টারি পড়ালেখার জন্য। তবে তা শেষ করেননি তিনি।  ক্যাডেট কলেজে ভর্তির আগে তিনি পাকিস্তানের বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাদিক পাবলিক স্কুলে পড়াশুনা করেন।

ছাত্রজীবনে তিনি সরাসরি কোন ছাত্রসংগঠনের সাথে জড়িত  না থাকলেও আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনে যোগদান করেন বলে ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দীতে জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ১৯৫৯ সালে ১৩ মার্চ  চট্টগ্রামের রাউজান থানায় জন্মগ্রহণ করেণ। দুই বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ২ ছেলে এবং এক কন্যা সন্তানের পিতা।





বুধবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৩

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রায় যেকোন দিন


মেহেদী হাসান , ১৪/৮/২০১৩
বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মামলায় যেকোন দিন রায় ঘোষনা করা হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (১)  এ মামলার সমস্ত  বিচার কার্যক্রম শেষ হলে আজ  রায় প্রদানের তারিখ অপেক্ষমান  ঘোষনা করা হয়।
যুক্তি উপস্থাপনের শেষে রাষ্ট্রপক্ষ সালাহউদ্দিন  কাদের চৌধুরীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে।

গত বছর ১৯ এপ্রিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। এক বছর চার মাসের মাথায় আলোচিত এ মামলার সমস্ত বিচার কার্যক্রম শেষ হল।

১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালে এই প্রথম কোন বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম শেষ হল এবং যেকোন দিন রায় ঘোষনা হতে পারে। ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোরে গ্রেফতার করা হয় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে  চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া এবং বোয়ালিয়া থানায় হত্যা, গনহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, অপহরন, নির্যতান দেশান্তরকরনসহ মানবতাবিরোধী অভিযোগ আনা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী মোট ৩২টি অভিযোগ দায়ের করে। সেখান থেকে ট্রাইব্যুনাল ২৩ টি অভিযোগে তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে। বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ১৭টি অভিযোগের পক্ষে সাক্ষী হাজির করে এবং যুক্তি পেশ করে। বাকী ছয়টি অভিযোগ তারা ছেড়ে দিয়েছে। ছয়টি অভিযোগ কেন ছেড়ে দেয়া হল সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানান সময়ের অভাবে তারা এসব অভিযোগের পক্ষে সাক্ষী হাজির করতে পারেনি।

১৭টি অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৪১ জন সাক্ষী হাজির করে। অপর দিকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে আসামী নিজেসহ মোট চারজন সাক্ষী হাজির করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস থেকে সেপ্টম্বর মাস পর্যন্ত উপরোক্ত থানাগুলোতে যেসব অপরধ সংঘটিত  হয়েছে তার অনেকগুলোতে  পাকিস্তান আর্মির সাথে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন এবং  নেতৃত্ব দিয়েছেন।

অপর দিকে আসামী পক্ষের দাবি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী সেসময় দেশেই ছিলেননা। তিনি পাকিস্তানে ছিলেন তখন। তাদের দাবি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ পাকিস্তান গমন করেন এবং ১৯৭৪ সালের ২০ এপ্রিল বাংলাদেশে আসেন। কাজেই অপরাধের সাথে তার সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নই আসেনা। যুক্তি পেশের শেষে আসামী পক্ষ দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ প্রমান করতে পারেনি। তারা তার বিরুদ্ধে সাজানো মিথ্যা সাক্ষী হাজির করেছে। তাই তারা আসামীর বেকসুর খালাস দাবি করেন।


বিচার কার্যাক্রম শেষে তিন সদস্যের  ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির রায় অপেক্ষমান ঘোষনা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এবং বিচারপতি আনোয়ারুল হক।
রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট জেয়াদ আল মালুম, সুলতান মাহমুদ সিমন এবং ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। অপর দিকে আসামী পক্ষে এ মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট আহসানুল হক হেনা,  ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট আল ফেসানী প্রমুখ।


সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনিত অভিযোগ :

অভিযোগ ১ :  ১৯৭১ সালের ৪ বা ৫ এপ্রিল রাত আনুমাণিক ৯টার পর মতিলাল চৌধুরী, অরুণ চৌধুরী, যোগেশ চন্দ্র দে ও পরিতোষ দাস, পাচক সুনীল প্রমুখকে  শহীদ মতিলাল চৌধুরীর চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালি থানার রামজন লেনের বাসভব থেকে অপরহন করে নিয়ে যাওয়া হয় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পাারিবারিক বাসভবন গুড়সহিলে। পরে এদের মধ্য থেকে ছয়জনের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। 

অভিযোগ ২ : ১৯৭১ সালের  ১৩ এপ্রিল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তান  সেনাবাহিনীর একদল সদস্য রাউজানের গহিরা  গ্রামের  হিন্দু  পাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালায়। অভিযান চালিয়ে নিরীহ নিরস্ত্র হিন্দুদের ডাক্তার মাখন লাল শর্মার বাড়িতে জড়ো করা হয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর সদস্যরা ব্রাশফায়ার করে । এসময়  পঞ্চবালা শর্মা, সুনীল শর্মা, মতিলাল শর্মা ও দুলাল শর্মা নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত মাখন লাল শর্মা  তিন চারদিন পর মারা যায়। 

অভিযোগ-৩  :  ১৩ এপ্রিল রাউজানের গহিরায় অবস্থিত কুন্ডেশ্বরী কমপ্লেক্স এর প্রতিষ্ঠাতা সমাজসেবক অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা করা হয়। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তান আর্মি তাকে  প্রথমে গুলি করে । পরে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজেও গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।

অভিযোগ-৪ :  ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী স্থানীয় সহযোগী এবং  পাকিস্তানি  সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত জগৎমলপাড়ায় অভিযান চালান। এসময় ৩২ জনকে হত্যা করা হয়।
অভিযোগ-৫ : ১৩ এপ্রিল বেলা আনুমাণিক একটার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী কতিপয় অনুসারীদের নিয়ে রাউজানের সুলতানপুর গ্রামে  হামলা চালান। এসময় তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

অভিযোগ-৬  : ১৩ এপ্রিল বিকেল ৪টা থেকে ৫টা নাগাদ  সালাউদ্দিন কাদের চৌধরিী হিন্দু জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার জন্য রাউজানের ঊনসত্তরপাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালান। এসময়  হিন্দু নর-নারীদের স্থানীয় তিীশ মহাজনের বাড়ির পেছনে পুকুর পাড়ে শান্তি মিটিংয়ের নামে একত্রিত করে এবং ৫০ থেকে ৫৫ জনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে।

অভিযোগ-৭ : ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল দুপুর আনুমাণিক ১২টার দিকে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানি সেনা সদস্য রাউজান পৌরসভা এলাকার সতীশ চন্দ্র পালিতের বাড়িতে  প্রবেশ করে। আসামীর নির্দেশে তাকে গুলি করে হত্যার পর লাশ কাপড়ে মুড়িয়ে পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়।


অভিযোগ-৮  :  ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল ।  চট্টগ্রমাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর আহম্মদ তার পুত্র শেখ আলমগীরসহ তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য প্রাইভেটকারযোগে চট্টগ্রামের রাউজান থেকে চট্টগ্রাম শহরে আসছিলেন। পথে হাটহাজারী থানার খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি তিন রাস্তার মোড়ে সকাল অনুমান ১১টার দিকে পৌঁছামাত্র আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে থাকা পাকিস্তানি দখলদার সৈন্যরা তাদের প্রাইভেট গাড়িটি অবরোধ করে শেখ মোজাফফর আহম্মেদ ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আটক করে স্থানীয় পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরে আর তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ-৯ : ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে এপ্রিলের মাঝামাঝি বোয়ালখালি থানার  কদুরখিল গ্রামে যাওয়ার সময় মুন্সীরহাটের শান্তি দেবকে ধরে নিয়ে হত্যা  করা হয়।


অভিযোগ-১০ :  ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল মানিক ধরের বাড়ি থেকে তার  জিপ গাড়ি ও ধান ভাঙ্গার কল লুট করে নিয়ে যায়।

অভিযোগ-১১ : ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল সকালবেলা বোয়ালখালী থানার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা শাকপুরা গ্রামে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে হিন্দুদের হত্যা করে। পরবর্তীতে শহীদদের মধ্যে ৫২ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ড ছাড়াও শাকপুরা এলাকায় যুদ্ধকালীন বিভিন্ন সময়ে আরও তিন শতাধিক লোককে হত্যা করা হয়, যাদের সেখানে মাটিচাপা দিয়ে সমাধিস্থ করা হয়েছে।

অভিযোগ-১২ : ১৯৭১ সালের  ৫ মে সকাল সাড়ে ১০টায় সালাহউদ্দিন কাদের  চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাউজান থানার জ্যোতিমল গ্রামে গুলি করে বিজয় কৃষ্ণ চৌধুরী রাখাল, বিভূতি ভূষণ চৌধুরী, হীরেন্দ্র লাল চৌধুরীকে হত্যা করে।

অভিযোগ-১৩  :  ১৯৭১ সালের ১৫ মে সন্ধ্যার সময় আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশে ঘাসিমাঝির পার এলাকায় ৬ জনকে গুলি করে হত্যা, ২ জনকে গুরুতর আহত এবং অন্তত ৫ মহিলাকে ধর্ষণ করে।


অভিযোগ-১৪ :  ১৯৭১ সালের ২০ মে বিকেল ৪টার দিকে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে তার সহযোগী কয়েকজন রাজাকার সদস্য পাকিস্তানি সেনা সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার পথেরহাটের কর্তার দীঘির পারে মোঃ হানিফের বাড়িতে যায়। তাকে অপরহন করে গুড়সহিলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ-১৫ :  ১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি শেখ মায়মুন আলী চৌধুরী তার ভাগ্নি জামাই মোস্তাক আহম্মেদ চৌধুরীর চট্টগ্রাম শহরের রহমতগঞ্জের বাসায় ছিলেন। আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে  শেখ মায়মুন আলীকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।

অভিযোগ-১৬ :  ১৯৭১ সালের ৭ জুন রাজাকার মাকসুদুর রহমান ও আসামির পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী পাকিস্তানি সেনা সদস্যদের সহযোগিতায় জামাল খান রোড থেকে ওমর ফারুককে ধরে নিয়ে গুড়সহিলে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

অভিযোগ-১৭ :  ১৯৭১ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যা আনুমাণিক সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার দিকে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার আরও ২/৩ জন সহযোগীসহ পাকিস্তান সেনা সদস্যরা চট্টগ্রাম জেলার কোতোয়ালি থানার হাজারী লেনের জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর পোড়োবাড়ি থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ, সিরাজ ও ওয়াহেদ ওরফে ঝুনু পাগলাকে অপহরণ করে বন্দী করে রাখা হয় দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত।

অভিযোগ-১৮ : ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে একদিন ভোর আনুমাণিক সাড়ে ৫টায় আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহচর মুসলিম লীগ নেতা শিকারপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মৃত শামসু মিয়া সহযোগী তিনজন রাজাকারসমেত চট্টগ্রাম জেলার চান্দগাঁও থানার মোহারা গ্রামে আব্দুল মোতালেব চৌধুরীর বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে তারা মোঃ সালেহউদ্দিনকে অপহরণ করে। পরে তাকে গুড়সহিলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার গালে চড় মারেন।

অভিযোগ-১৯ :  ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই রাত আনুমাণিক সাড়ে আটটায় হাটহাজারীর নেয়ামত আলী রোডের সাহেব মিয়ার বাড়ি (রজমান টেন্ডলের বাড়ি) ঘেরাও করে তার দু’ছেলে নুর মোহাম্মদ ও নুরুল আলমকে অপহরণ করা হয়। পরে তাদেরকে মুক্তিপনের বিনিময়ে ছাড়া হয়।


অভিযোগ-২০ : ১৯৭১ সালের  ২৭/২৮ জুলাই বিকেল ৩/৪টায় রাজাকার বাহিনী আকলাচ মিয়াকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাকে গুডসহিলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। সেখানে তার মৃত্যু ঘটে।

অভিযোগ-২১ : ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে  চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার বিনাজুরি গ্রামের ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক চৌধুরীকে অপরহ করে গুডসহিলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।


অভিযোগ-২২ :  ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষ দিকে এইচএসসি পরীা চলাকালীন রাত আনুমাণিক ৯টায় মোঃ নুরুল আনোয়ার চৌধুরীকে অপহরণ করা হয়। পরে মুক্তিপন আদায় করা হয়।

অভিযোগ-২৩ : এম সলিমুল্লাহকে গুড়সহিলে নিয়ে নির্যাতন।
।



মঙ্গলবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৩

১৯৭২ সালের মামলায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে গুলি করার অভিযোগ নেই

মেহেদী হাসান, ১৩/৮/২০১৩
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী যেসব অপরাধের অভিযোগে বিচার চলছে তার মধ্যে অন্যতম আলোচিত একটি অভিযোগ হল গহিরা কুন্ডেশ্বরী কমপ্লেক্স’র প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যাকান্ড। এ হত্যাকান্ড বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের  ২ জুন সাক্ষী বলেছেন, তারা দেখেছেন  সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশে পাকিস্তান আর্মি নূতন চন্দ্র সিংহকে গুলি করে প্রথমে। এরপর সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী  নিজেও তার  পিস্তল দিয়ে কয়েক রাউন্ড  গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।

কিন্তু নূতন চন্দ্র সিংহ’র ছেলে সত্যরঞ্জন সিংহ ১৯৭২ সালে তার পিতার হত্যা বিষয়ে একটি মামলা করেছিলেন এবং সেখানে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে গুলি করার কোন অভিযোগ নেই। সে মামলার এফআইর এ বলা হয়েছে পাকিস্তান আর্মি তিনটি গুলি করে তার পিতাকে হত্যা করে। এফআইআর এ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে তার পিতা নূতন চন্দ্র সিংহকে  হত্যার জন্য ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।

আজ  ট্রাইব্যুনাল-১ এ  মামলায় যুক্তি উপস্থাপনের সময় এ তথ্য তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম। তিনি একটি দরখাস্ত আকারে ১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারি দায়ের করা মামলার এফআইআর এর সার্টিফাইড কপি আদালতে পেশ করেন।

ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম দরখাস্তের শুনানীতে অংশ নিয়ে বলেন, ১৯৭২ সালে দায়ের করা মামলার এফআইআর এ নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যাকান্ড বিষয়ে কোন চাুস সাক্ষী বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ নেই। কিন্তু এই ট্রাইব্যুনালে  এ হত্যাকান্ড বিষয়ে চাুস সাক্ষী হাজির করা হয়েছে এবং এরা আসলে সাজানো সাক্ষী। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের মামলায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে গুলি করার কোন অভিযোগ না থাকলেও এ মামলায় আসামীর বিরুদ্ধে গুলি করার অভিযোগ  আনা হয়েছে। নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যার অভিযোগ বিষয়ে দুটি মামলার ম্যানার সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শুনানীর সময় ট্রাইব্যুনাল ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের কাছে জানতে চান আপনি যে ডকুমেন্ট জমা দিয়েছেন তার ওপর আপনি নির্ভর করেন কি-না। ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম বলেন, আমি এর ওপর নির্ভর করিনা। আপনাদের  পর্যালোচনার জন্য শুধু এ ডকুমেন্ট জমা দিয়েছি।

ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের পরে আসামী পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন অপর আইনজীবী আহসানুল হক হেনা।  তিনি বলেন, নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যেসব সাক্ষী হাজির করেছে তার মধ্যে দুজন সাক্ষী এ ঘটনা নিজ চোখে দেখেছেন বলে দাবি করেছেন। এদের একজন হলেন কুন্ডেশ্বরী বালিকা মহাবিদ্যালয়ের সেসময়কার অধ্যক্ষ গোপাল দাস এবং আরেকজন হলেন নূতন চন্দ্র সিংহ’র ভাইপো গৌরাঙ্গ সিংহ। গোপাল দাস নিজেকে চাুস সাক্ষী হিসেবে দাবি করে বলেছেন, কুন্ডেশ্বরীতে আর্মি আসার পর তিনি এবং ব্রজহরি বাবু ভয়ে ভীত হয়ে দোতলায় উঠে যান। ব্রজহরি বাবু দোতলায় ছোট্ট একটি কামরায় থাকতেন। সেখানে তারা আত্মপোগন করেন এবং ঘটনা অবলোকন করতে থাকেন।

আহসানুল হক হেনা আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, নূতন চন্দ্র সিংহ’র ছেলে প্রফুল্ল বাবু জেরায় বলেছেন তাদের বাড়িতে দোতলায় মোট নয়টি রুম ছিল। দুটি রুম তার, দুটি রুম অপর ভাই সত্যরঞ্জন বাবুর, দুটি রুম গৌরঙ্গ এবং ভূপতির ছিল। অপর তিনটি রুমের একটি রিডিং রুম, একটি গেস্টরুম এবং আরেকটি পূঁজার ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হত।

আহসানুল হক প্রশ্ন রেখে বলেন, গোপাল দাস যে বললেন ব্রজহরি দোতলায় একটি রুমে থাকতেন সেই রুমটি তাহলে কোথায়? এই ব্রজহরি কে? কি তার পরিচয়?
আহসানুল হক হেনা বলেন, এখানেই চমকের শেষ নয়। আরো চমক আছে। সেটা হল নূতন চন্দ্র সিংহ’র ভাইপো গৌরাঙ্গ সিংহ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়ার সময় বলেছেন, তিনি তার জবানবন্দীতে এ ঘটনা বিষয়ে যাদের নাম উল্লেখ করেছেন তাদের মধ্যে তিনি এং প্রফুল্ল বাবু ছাড়া আর কেউ জীবিত নেই। গৌরাঙ্গ সিংহ যাদের নাম বলেছিলেন তাদের  মধ্যে অধ্যক্ষ গোপল দাসেরও নাম বলেছিলেন এবং তার দাবি অনুযায়ী গোপাল দাস বর্তমানে মৃত। কিন্তু আমরা দেখলাম  গোপাল দাস নামে একজন চাুস সাক্ষী হাজির করা হল।  গোপাল দাস এখানে আসল কি করে?

আহসানুল হক হেনা বলেন, আসলে এ বিষয়ে সব সাক্ষীই ভুয়া। তারা শেখানো মতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে। তারা কেউই ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলনা। ঘটনা দেখেওনি।

আহসানুল হক হেনা বলেন, ২০০০ সালে স্মৃতিদীপ নামে একটি স্মরনিকা বের হয় যার সম্পাদক ছিলেন প্রফুল্ল চন্দ্র । সেখানে তিনি তার পিতা হত্যা বিষয়ে স্মৃতিচারন করেছেন কিন্তু তাতে তিনি কোথাও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নাম উল্লেখ করেননি।

আহসানুল হক হেনা বলেন, কুন্ডেশ্বরীর ঘটনা আমরা অস্বীকার করিনা। কিন্তু এ ঘটনার সাথে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী কোন অবস্থাতেই জড়িত নন। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা স্বীকার করেছেন ককটেল বানানোর জন্য কুন্ডেশ্বরী থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বোতল সরবরাহ করা হত কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয় থেকে। তাছাড়া কুন্ডেশ্বরীতে মুক্তি ফৌজ আশ্রয় নিয়েছে মর্মেও খবর ছিল পাকিস্তানী আর্মির কাছে। সেখানে ¯¦র্ণসহ অনেক সম্পদ থাকার খবর ছিল। এসব কারনে পাকিস্তান আর্মি সেখানে যেতে পারে এবং তারা নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা করেছে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ঘটনা স্থলে ছিলনা। তিনি বলেন, প্রফুল্ল বাবু স্বাীকার করেছেন তাদের বাড়ি থেকে ¯¦র্ণ এবং টাকা লুট হয়েছিল।

ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে তথ্য তুলে ধরে বলেন, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল কুন্ডেশ্বরীতে যখন হত্যাকান্ড ঘটে তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানে ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং ১৯৭৪ সালের ২০ এপ্রিল  দেশে ফেরেন। এর মাঝে তিনি কখনো বাংলাদেশে আসেননি। কাজেই ১৯৭১ সালের ১৩  এপ্রিল  কুন্ডেশ্বরীতে নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যাকান্ডের সময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিত থাকার প্রশ্নই আসেনা। তাকে  ঔদিন ঘটনাস্থলে যারা দেখেছেন বলে দাবি করেছেন তারা নির্জলা ডাহা মিথ্যাচার করেছেন।
আগামীকাল  বুধবার সকালে প্রথম একঘন্টার মধ্যে আসামী পক্ষকে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ জবাব প্রদান শেষে শেষ হবে এ মামলার কার্যক্রম।

সোমবার, ১২ আগস্ট, ২০১৩

জীবত মানুষকে মৃত বলে চালিয়ে দেয়ার অভিযোগ এবং জোছনা বালার ডায়েরি

মেহেদী হাসান ১২/৮/২০১৩
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মামলায় আজ আসামী পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করার জন্য নির্দেশ ছিল ট্রাইব্যুনালের। তবে আসামী পক্ষ সারা দিনেও যুক্তি উপস্থাপন শেষ করতে পারেনি এবং কাল মঙ্গলবার দুপুরের পূর্বে তাদের যুক্তি উপস্থান শেষ করার জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এরপর আর কোন অবস্থাতেই সময় বাড়ানো হবেনা বলে জানিয়ে দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

জীবিতকে মৃত বলে চালিয়ে দেয়ার অভিযোগ :
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনীত অভিযোগ খন্ডন করে  আজ তার পক্ষে যুক্তি উপস্থান করেন অ্যাডভোকেট আহসানুল হক হেনা। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুই নং অভিযোগ হল হাটহাজারিতে পাকিস্তান আর্মির সহায়তায় একই পরিবারের পাঁচজনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন হত্যাকান্ডের সময় বেঁচে যাওয়া বলে দাবিদার পরিবারের সদস্য সুনির্মল চন্দ্র  শর্মা ।
আহসানুল হক হেনা বলেন, সাক্ষী সুনির্মল চন্দ্র শর্মা বলেছেন  দানু চাচা মারা গেছেন। কিন্তু বাস্তবে দানু চাচা  জীবিত। তার জীবিত থাকার বিষয়ে এফিডেভিট জমা দিয়েছি আমরা। তার জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিয়েছি। আমরা তাকে আসামী পক্ষের সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে আনতেও চেয়েছিলাম এবং তালিকায় তার নামও জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সাক্ষীর সংখ্যা পাঁচ জন নির্ধারন করে দেয়ায় তাকে আমরা হাজির করিনি। জীবিত একজন লোককে সাক্ষী  মৃত বলে চালিয়ে দিলেন। সুতরাং এই সাক্ষীকে কতটা বিশ্বাস করা যায় তা আপনারা বিবেচনা করবেন। কোর্টে দানু চাচার এফিডেভিট পড়ে শোনানো হয় আসামী পক্ষ থেকে।
আহসানুল হক হেনা বলেন, তাছাড়া সাক্ষী সুনির্মল শর্মা সরকারী সুবিধাপ্রাপ্ত একজন লোক। তিনি এ সরকারের আমলে এপিপি হয়েছেন। চট্টগ্রাম কোর্ট ভবনে তার  কোন চেম্বারও নেই।
আহসানুল হক হেনা বলেন, যে দানু চাচা তাদের টুপি পড়াল, কলমা পড়াল সেই দানু চাচাকে  রাষ্ট্রপক্ষ হাজির করেনি। সুনির্মল বলল তাদের পরিবারের হত্যাকান্ড বিষয়ে তার ভাই বিমল সব জানে। কিন্তু বিমলকেও তারা সাক্ষী হিসেবে হাজির করেনি।
তিনি বলেন, এ ঘটনা বিষয়ে আরেক সাক্ষী সুবল বলেছেন, ঘটনার আগে সবাই পালিয়ে গিয়েছিল। দানু চাচাও বলেছে ঐ ঘটনার আগে প্রানের ভয়ে সবাই ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল। এ দুজনের কথার মিল রয়েছে। আমরাও বলেছি ঘটনার দিন সুনির্মলরা কেউ সেখানে ছিলনা।
সুনির্মল বলেছেন, ঘটনার এক ঘন্টা পরে বিমল ঘটনাস্থলে গিয়েছে। সুবলও বলেছে ঘটনার এক ঘন্টা পরে ঘটনাস্থলে গিয়েছে। কিন্তু সবুল বিমলকে দেখেনি সেখানে। তাদের কারোর সাথে কারোর কোন সাক্ষাৎ হলনা। সুনির্মল ও বিমল তাহলে কোথায় ছিল?
বিমলকে তদন্ত কর্মকর্তা কেন জিজ্ঞাসাবাদ করেনি? এটা রহস্যজনক।
তিনি বলেন, নূতন চন্দ্র সিংহ’র ছেলে প্রফুল্ল বাবুর অধীনস্ত বর্তমান কুন্ডেশ্বরীতে বসে এসব মিথ্যা গল্প রচনা করা হয়েছে।
সুনির্মল দাবি করেছেন লাইনে দাড়িয়ে ব্রাশ ফায়ার করার পূর্ব মুহুর্তে তাদের ডস দিয়ে তিনি কাত হয়ে পড়ে গেলেন এবং এভাবে তিনি বেঁচে গেলেন। অটোমেটিক ব্রাশ ফায়ারের হাত থেকে তার এই বেঁচে যাওয়ার কথা কি বিশ্বাসযোগ্য?  আসলে সে তখন ওখানে ছিলইনা।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে আট নং অভিযোগ হল আওয়ামী লীগ নেতা মোজাফফর এবং তার ছেলে  শেখ আলমগীরকে অপহরন করে হত্যা। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম সাক্ষী ছিলেন শহীদ শেখ আলমগীরের স্ত্রী উম্মে হাবিবা। এ ঘটনা বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করে  আহসানুল হক হেনা বলেন, উম্মে হাবিবা বলেছেন অপহরনের সময় তার স্বামী যে  গাড়িতে ছিলেন সেটি ছিল টয়োটা স্টারলেট। অথচ টয়োটা স্টারলেট গাড়ি উৎপাদন শুরু হয়েছে ১৯৭৩ সালে। তাহলে ১৯৭১ সালে তারা এ গাড়ি পেল কোথায়? উম্মে হাবিবা তার স্বামীর নাম লিখেছেন শহীদ শেখ আলমগীর। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তার দেবর শেখ মোর্শেদকে বিয়ে করেছেন। বর্তমানে তার স্বামী শেখ মোর্শেদ। অথচ তিনি স্বামীর নাম লিখেছেন শহীদ শেখ আলমগীর। শেখ আলমগীর ১৮৭১ সালে তার স্বামী ছিলেন। উম্মে হাবিবা পরবর্তীতে তার বিয়ের বিষয়টি পুরোপুরি গোপন করে গেছেন।
উম্মে হাবিবার স্বামীরা আট ভাই। উম্মে হাবিবা জানিয়েছেন অপহরনের সময় গাড়িতে তাদের সাথে তার ভাইয়ের ছেলে, চাচিসহ আরো অনেকে ছিল। তার ভাইয়ের ছেলে জীবিত, চাচী জীবিত। তাদেরসহ অন্য কোন ভাইকে, পরিবারের অন্য কোন সদস্যকে সাক্ষী করা হলনা। উম্মে হাবিবা যে সাক্ষ্য এখানে দিয়েছেন তার সমর্থনে পরিবারের অন্য কাউকে আনা হয়নি। তিনি যা বলেছেন তা পুরোটাই আসলে একটা  বানানো গল্প।
তিনি বলেছেন  চেকপোস্টে গিয়ে তাদের গাড়িটি গিয়ে অচল হয়ে যায়। এরপর আর্মির একটি গাড়ি তাদের গাড়িটিকে পেছন দিয়ে ধাক্কা দিলে তা আবার সচল হয়ে যায়। এরপর অপর কিছু আর্মি পেছন থেকে তাদের গাড়িটি থামাতে বলে। আমার প্রশ্ন হল গাড়িতে যে তার শশুর শেখ মোজাফফর এবং স্বামী শেখ আলমগীর আছে তা আর্মি পেছন থেকে দেখল কেমন করে? অচল গাড়ি ধাক্কা দিলে যদি সচল হয়ে যায় তাহলে দুনিয়াতে আর কোন মেকানিক দরকার ছিলনা।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী আনিসুজ্জামান বলেছেন, কুন্ডেশ্বরী ছাড়াও আশপাশের মুসলিম এবং বড়–য়া পাড়ায়ও গনহত্যা হয়েছে। কিন্তু তার কোন একটি ঘটনা বিষয়েও তদন্ত কর্মকর্তা কোন তদন্ত করলেননা কেন? আর এত বিশাল  এলাকা নিয়ে এতবড় গণহত্যা করা হল আর আসামী করা হল শুধুমাত্র সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে? অন্য আর কোন লোক এর সাথে জড়িত ছিলনা। তারা কোথায়? তাদের কাউকে কেন  আসামী করা হলনা?
তিনি বলেন, কোতয়ালী থানায় ১৯৭২ সালে ২৪টি মামলা হয়েছিল। তাতে অনেক পাকিস্তান আর্মি অফিসার আসামী ছিল। ২৪টি মামলার একটিতেও ঘটনাস্থল হিসেবে ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাড়ি গুড়স হিলের নাম  উল্লেখ করা হয়নি।
রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী সিরু বাঙ্গালী প্রসঙ্গে আহসানুল হক হেনা বলেন, সাক্ষী বলেছেন দুটি চাকমা মেয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে পাকিস্তান আর্মি তাকে গ্রেফতার করেছিল। সুতরাং তার চরিত্র সম্পর্কে এখান থেকে ধারনা পাওয়া যায়। তাছাড়া সাক্ষী বলেছেন, স্বাধীনতার পর ভারতীয় আর্মিও তাকে গ্রেফতার করেছিল।
সিরু বাঙ্গালী স্বীকার করেছেন তিনি কখনো কুন্ডেশ্বরী, সুলতানপুর জগৎমল্লপাড়া যাননি। তিনি এখানে  এসে যত গল্প বলেছেন তার সবই ক্যাপটেন করিমের কাছ থেকে শোনা বলে জানিয়েছেন। ক্যাপ্টেন করিম মৃত। সিরু বাঙ্গালী অনেককে হত্যার জন্য অনেকবার এম্বুশ করেছেন কিন্তু একবারও সফল হননি। প্রত্যেকবারই ব্যর্থ হয়েছেন।
আহসানুল হক হেনা বলেন, পাঁচ নং অভিযোগ বিষয়ে সাক্ষী অনিল বরন ১৯৭২ সালে মামলা করেছিলেন। কিন্তু তাতে ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী কোন মুল আসামী ছিলনা। এ মামলায় আরো যে ১৪ জন আসামী ছিল তাদের কেউ আজ ট্রাইব্যুনালে নেই কেন?
সাত নং অভিযোগ বিষয়ে সাক্ষী পরিতোষ পাল বলেছেন, তিনি  এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। অথচ তিনি ৭১ সালের আগে কখনো সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দেখেননি। তাহলে তিনি ঘটনার সময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে চিনল কি করে?

জোছনা বালার ডায়েরি :
জোছনা বালা নামে রাষ্ট্রপক্ষের একজন সাক্ষী মারা যাওয়ায় তার জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে ট্রাইব্যুনাল। সে বিষয়ে আসামী পক্ষ জোছনা বালার  একটি ডায়েরি   জমা দিয়েছে ট্রাইব্যুনালে এবং আজ যুক্তি উপস্থাপনের সময় তা পড়ে শোনানো হয়। ১৬/৪/২০১২ চট্টগ্রাম চিফ জুড়িশিয়াল মেজিস্ট্রেট এর কাছে তিনি ডায়েরি করেছেন। ২০১৩ সালে তিনি মারা যান। তিনি তার ডায়েরিতে বলেছেন,

ল্লখিত দরখাস্তকারী তার পুত্রের মাধ্যমে জানতে পারে যে, ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঢাকায় কে বা কারা মামলা করেছে এই ব্যাপারে মামলায় স্বাক্ষী দেওয়ার জন্য অত্র দরখাস্তকারীর নামেও লেখা হয়েছে বলে জানতে পারেন। বেশ কিছুদিন আগে ঢাকা থেকে কিছু লোক এসে তাকে সালাউদ্দিন চৌধুরীর ব্যাপারে বেশ কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞোস করে। ঢাকা থেকে আসার লোকগুলো কি কি কথা খাতায় লিখে কিন্তু কি লিখেছে তা আমাকে বলেনি এবং পড়েও শুনায়নি পরে ঐ লোকজন বলে যে, তারা যা যা বলে সে মোতাবেক অত্র দরখাস্তকারীকে ঢাকায় গিয়ে বলতে হবে বলে জানায় এবং ঢাকায় গিয়ে কি বলতে হবে তাহা যথাসময়ে অত্র দরখাস্তকারীকে জানানো হবে বলে জানায়। ঐদিন ঢাকা থেকে আসা লোকদেরকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বা তার পরিবারের বরুদ্ধে অত্র দরখাস্তকারী কোন ধরনের কোন কথা বলেনি তবুও পরে জানতে পারে যে, তাকে দিয়ে বলানো হবে যে, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ঘরবাড়ীতে এসে লোকজনদের বের করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহায়তায় অত্র দরখাস্তকারীর স্বামীসহ অনেক লোককে মেরে ফেলে। আরো বলানো হবে যে, সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী ঘর বাড়ীতে আগুন জ্বালিয়ে দেয় ইত্যাদি প্রকৃতপক্ষে সালাহ উদ্দিন কাদোর চৌধুরী স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কাউকে হত্যা করা বা ঘরবাড়ীতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া বা কাউকে গুলি করা এসব বিষয় সম্পর্কে অত্র দরখাস্তকারী আদৌ কোন ভাবে অবগত নহে। এই ব্যাপারে স্থানীয় ভাবে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে কোন ধরনের মিথ্যা স্বাক্ষী দেব না বলে জানানোর কারনে কিছু ব্যক্তি অত্র দরখাস্তকারীর ছেলের নিউ মার্কেটে অবস্থিত দোকানে এসে এবং সর্ব শেষ গত ১০/০৪/২০১২ইং তারিখ গ্রামের বাড়ীতে এসে বিভিন্ন ধরনের হুমকী দিয়ে যাচ্ছে। অজ্ঞাত পরিচয় লোকজন হুমকী দিয়ে বলতেছে যে, তাদের কথা অনুযায়ী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঢাকায় গিয়ে স্বাক্ষ্য প্রদান না করিলে তাকে এবং তার ছেলেকে চরম মূল্য দিতে হবে, ঘর বাড়ী লুট করা হবে এবং নাতি-নাতনীদেরকে এবং অপহরণ করা হবে। বর্তমানে আমি অজ্ঞাত পরিচয়ে সন্ত্রাসীদের হুমকীতে মারাত্মক ভাবে ভীত সন্তস্ত হইয়া পড়িয়াছি। আমি আশংঙ্কা করিতেছি যে, ঢাকায় গিয়ে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মিথ্যা স্বাক্ষ্য প্রদান না করিলে আমি ও আমার পরিবারের চরম সর্বনাশ হইবে। অজ্ঞাত পরিচয় লোকেরা আরো বলে যে, ঢাকায় গিয়ে তাদের শিখানো মতে স্বাক্ষ্য দিলে অনেক লাভ হবে বিষয়টি অত্র ডায়রীর মাধ্যমে আপনাকে অবগত করিলাম।
অতএব, বিনীত নিবেদন উপরোক্ত বিষয়খানা ন্যায় বিচারের স্বার্থে ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৪ ধারা অনুসারে সাধারন ডায়রী আকারে লিপিবদ্ধ করতঃ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে আপনার বিহিত মর্জি হয়।
তারিখ ঃ ১৬/০৪/২০১২
 বিশ্বেশ্বরের ডায়েরি : বিশ্বেশ্বরও ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের একজন সাক্ষী। তবে তিনিও রাষ্ট্রপক্ষে হাজির  হননি। তিনিও একটি ডায়েরি করেছেন চট্টগ্রাম চিফ জুড়িশিয়াল মেজিস্ট্রেট বরাবর এবং তাতে তিনিও একই অভিযোগ করেছেন। সেটিও আসামী পক্ষ জমা দিয়েছে ট্রাইব্যুনালে।  ডায়েরিটি নিম্নরূপ।
দরখাস্তকারীর নিকট বেশ কয়েক মাস আগে ঢাকা থেকে কিছু লোক আসে তাহারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিভিন্ন ঘটনাবলী নিয়ে অত্র দরখাস্তকারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ব্যাপারে বিভিন্ন খবরা-খবর জানার চেষ্টা করে। ঐ সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কিছু বর্বর কর্মকান্ডের কথা ঢাকা থেকে আসা লোকজনদেরকে বলি। ঢাকা থেকে আসা লোকজনেরা আমার কিছু কথা খাতায় লিখে নেয় কিন্তু কি লিখেছে আমি জানি না এবং আমাকে তারা বলেও নাই। পরবর্তীতে স্থানীয় ভাবে জানতে পারি যে, ঢাকায় সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে সরকার মামলা করেছে এজন্য ঢাকা থেকে লোকজন এসেছিল। ঢাকায় থেকে আসা লোকদেরকে আমি সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কোন হত্যাকান্ড, লুন্ঠন বা কোন অবৈধ কাজের সাথে জড়িত ছিল এ ধরনের কোন কথা অত্র দরখাস্তকারী বলেনি কারণ অত্র দরখাস্তাকরী যতদুর জানে এবং দেখেছে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার পরিবার স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়কে রক্ষা করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে এবং অনেককে আশ্রয় দিয়েছে। অত্র দরখাস্তকারী সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ব্যাপারে ঢাকায় গিয়ে স্বাক্ষ্য দিতে পারব না এটা প্রকাশ করায় কিছু অজ্ঞাত পরিচয় সন্ত্রাসী অত্র দরখাস্তকারীকে বিভিন্ন সময় অনুসরণ করতঃ নানা ভাবে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ব্যাপারে ঢাকায় গিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এলাকার লোকজনকে হত্যা করিয়াছে, ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে ইত্যাদি বলে স্বাক্ষী দিতে হবে বলে হুমকী দিতেছে। অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিরা আরো হুমকী দিচ্ছে যে, সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঢাকায় গিয়ে তাদের শিখানো মতে সাক্ষ্য না দিলে অত্র দরখাস্তকারী ও তার পরিবারকে চরম পরিনতি এমনকি ছেলে মেয়েদেরকে অপহরন করে হত্যা করা হবে।
৪।উল্লেখিত দরখাস্তকারী ভীত সন্তস্ত হয়ে বর্তমানে মানবেতর জীবন যাপন করিতেছে এবং সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও ফজলুল কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে কোন আদালতে তাহার পক্ষে কোন ধরনের সাক্ষ্য প্রদান, বক্তব্য প্রদান সম্ভব নয় এবং সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ও পাকিস্তান আমলে স্থানীয় লোকদেরকে অনেক বিপদ থেকে রক্ষা করিয়াছে বিধায় প্রতিপক্ষগণের এসব ভীতিমূলক অবৈধ কর্মকান্ডের ব্যাপারে অত্র ডায়েরী আকারে বিষয়টি আপনাকে অবগত করিলাম।
অতএব, বিনীত নিবেদন উপরোক্ত বিষয়খানা ন্যায় বিচারের স্বার্থে ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৪ ধারা অনুসারে সাধারন ডায়রী আকারে লিপিবদ্ধ করতঃ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে আপনার বিহিত মর্জি হয়।


আহসানুল হক হেনাকে যুক্তি উপস্থানে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট আল ফেসানী প্রমুখ।






বৃহস্পতিবার, ১ আগস্ট, ২০১৩

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মামলায় আসামী পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শুরু/// পিতার কারনে পুত্রের বিচার হচ্ছে

১/৮/২০১৩
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মামলায় আসামী পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আজ আসামী পক্ষে অ্যাডভোকেট আহসানুল হক হেনা যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন।

তিনি বলেন, পিতার উত্তরাধিকার হিসেবে আজ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে এই কোর্টের সামনে দাড় করানো হয়েছে। তার অপরাধ  তিনি ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে। ১৯৭১ সালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী কোন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিলেননা। তিনি আলবদর, আল শামস, রাজাকার, শান্তি কমিটি কোন কিছুর সাথে জড়িত ছিলেননা এবং এসব সংগঠনের কোন একটিরও তিনি সদস্য ছিলেননা কখনো।

অ্যাডভোকেট আহসানুল হক হেনা বলেন, ১৯৭৯ সাল থেকে আজ অবধি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে জনগন ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে। জনগন তার বিচার ১৯৭৯ সাল থেকে করে আসছে। আজ যার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সাল বিষয়ে মানবতাবিরোধী এসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেই তাকেই স্বাধীনতা যুদ্ধের কয়েক বছরের মাথায় ১৯৭৯ সাল থেকেই জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা শুরু করল। তার বিরুদ্ধে নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যাকান্ডের অভিযোগ। কিন্তু নূতন বাবুর ছেলে প্রফুল্ল চন্দ্র জেরায় স্বীকার করেছেন তাদের বাড়ির কেন্দ্র থেকেও কোনদিন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী হারেননি।

রাষ্ট্রপক্ষ থেকে যুক্তি উপস্থাপনের সময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি এবং গ্রুপ সদস্য হিসেবে অপরাধের সমান দায়ভার চাপানো হয়েছে। এর জবাবে আহসানুল হক হেনা বেলন, ধরা যাক একজন এসপি কোন আসামীকে ধরার জন্য একজন এসআই এবং দুজন হাবিলদার পাঠালেন রাতের বেলায়। পথে তাদের একজন পুলিশ রাস্তায় একজন সুন্দরী মহিলাকে পেয়ে  ধর্ষণ করল । এখন এ ধর্ষনের দায়ভার কি এসপির ওপচার চাপানো ঠিক হবে? এসপি সাহেব তো কাউকে ধর্ষনের নির্দেশ দেননি এবং এবং পথে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারেও তাও জানতেননা। কাজেই এভাবে কারো ওপর কমান্ড রেসপনিসিবিলিটি বা গ্রুপ মেম্বার হিসেবে সমান  দায় চাপানো যায়না। একটি গ্রুপ কর্তৃক সংঘটিত অপরাধের দায় সবার ওপর সমানভাবে চাপাতে চলে সবাই অপরাধটি সংঘটনের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করেছে তা প্রমান করতে  হয়। যেমন কয়েকজন মিলে কোন একটি হত্যাকান্ড পরিচালনা করলে সেখানে সবাইকে সমান অপরাধী সাব্যস্ত করতে হলে প্রমান করতে হবে কেউ নিহত ব্যক্তিকে ধরেছিল, কেউ লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে, কেউ লাথি মেরেছে, কেউ গলাটিপে ধরেছে বা সবাই মিলে চার দিক থেকে গুলি ছুড়েছে এসব। কিন্তু গ্রুপের কয়েকজন যদি হত্যাকান্ডে অংশ নেয় এবং একজন যদি পাশে দাড়িয়ে থাকে তাহলে পাশে দাড়িয়ে থাকা ব্যক্তির ওপর অপরাধের সমান দায়ভার চাপানো যায়না।


সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী আহসানুল হক হেনা অসুস্থ থাকায় দুপুর সাড়ে বারটা পর্যন্ত যুুক্তি উপস্থাপন চলে। আগামী রোববার পর্যন্ত শুনানী মুলতবি করা হয়েছে।

বুধবার, ৩১ জুলাই, ২০১৩

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ//উই আর নট স্টুডেন্ট

31/7/2013
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়েছে। আগামীকাল বৃহষ্পতিবার আসামীপক্ষে যুক্তি উপস্থান শুরু হবার কথা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আজ  রাষ্ট্রপক্ষে প্রথমে অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন সুলতান মাহমুদ সিমন। এরপর আইনী বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।

তুরিন আফরোজ সালহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জবানবন্দী তুলে ধরে বলেন, তার নিজের দেয়া জবানবন্দীতেই অনেক অসঙ্গতি এবং স্ববিরোধীতা রয়েছে। তিনি বলেছেন ১৯৬৯ সালে ঢাকায় তার বাসায় আইউব বিরোধী আন্দোলনে নিয়মিত বৈঠক হত । আজকের পরিচিত অনেক রাজনীতিবিদ সে বৈঠকে যোগ দিতেন। তিনি তার বাসা ও গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে সে আন্দোলনে ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৭১ সালের সাত মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স সমাবেশে যোগ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেছেন সাত মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষন যদি স্বাধীনতার ঘোষনা হয় তাহলে তিনিও স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সক্রিয় সমর্থক আইনগতভাবে।
ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, আমরা তার এ কার্যক্রম বিষয়ে কোন বিতর্ক  করছিনা। কিন্তু এ পর্যন্ত কার্যক্রমের পরে তিনি কি করলেন? ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পরে তিনি (তার দাবি অনুযায়ী) পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি জমালেন। আইউববিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় নেতা যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথে পশ্চিম পাকিস্তান পাড়ি দিলেন। বিদেশে গিয়েও অনেকে মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তান গিয়ে কি করলেন? তিনি আগস্টে সেখানে অনার্স পরীক্ষা শেষে বন্ধু বান্ধব মিলে পাকিস্তানের উত্তারাঞ্চলের পার্বত্য অঞ্চল মারিতে বেড়াতে গেলেন। দেশে তখন যুদ্ধ চলছে। এরপর সেপ্টেম্বরে বন্ধুবান্ধব মিলে গাড়িতে করে পাকিস্তান থেকে লন্ডন যাত্রা করলেন। কি রাজকীয় ভ্রমন।
ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, হতে পারে তিনি ১৯৬৯ সালে আইউব বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন কিন্তু পরে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তার প্রমান ফুটে ওঠে তারই দেয়া জবানবন্দী থেকে। আইউব বিরোধী আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানে অবস্থান ও কর্মকান্ড বিষয়ে তিনি যে জবানবন্দী দিয়েছেন তা  স্ববিরোধী এবং অসঙ্গতিতে পূর্ণ।
ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেছেন, তিনি বাই চয়েজ বাংলাদেশী নাগরিক। কিন্তু কখন এ বাইচয়েজ তিনি বাংলাদেশী নাগরিক হলেন? ১৯৭৪ সালে। ১৯৭৪ সালে তিনি বাংলাদেশে আসলেন। তিনি বলেছেন ১৯৭৩ সালে তার পিতা ঢাকা জেলখানায় মারা যান। তখনো তিনি বাই চয়েজ বাংলাদেশী নাগরিক হলেননা এবং বাংলাদেশেও আসলেননা। আসলেন ১৯৭৪ সালে।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে রাশিয়ার স্বঘোষিত বিতর্কিত  ধর্মযাজক রাশপুতিনের সাথে তুলনা করেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। তিনি  বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার জবানবন্দীতে উল্লেখ করেছেন   রাজনৈতিক বিচারের অংশ হিসেবে তিনি আজ এ ট্রাইব্যুনালের সামনে দণ্ডায়মান। তিনি মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং মুসলমান হবার কারনে তার আজ  এ বিচার হচ্ছে। কিন্তু তিনি যে নিজেকে মুসলমানদের প্রতিনিধি দাবি করছেন তা তার সার্বিক জীবন পর্যালোচনা করলে তার  এ দাবির সত্যতা মেলেনা। তিনি পাকিস্তানের সাদিক পাবলিক স্কুলে পড়েছেন। নামকরা এ স্কুলে অমুসলমানরাও পড়েন। নটরডেম কলেজে পড়েছেন তিনি। সেটা একটা মিশনারী স্কুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন তিনি যেখানে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের আলোচনা হয়। লন্ডনেও পড়েছেন তিনি।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের অভিযোগ তুলে ধরে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, এদেশে হিন্দুদের জন্মই আজন্ম পাপ। হিন্দু হবার কারনেই তাদের তখন নৃশংষ হত্যার স্বীকার হতে হয়। পেটের নিষ্পাপ শিশুও নারকীয় হত্যা থেকে রেহাই পায়নি। কারণ সে শিশু হিন্দুর পেটে ছিল। এটাই ছিল তার অপরাধ।
ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের  যুক্তি উপস্থাপনের জন্য তিনদিন সময় বেঁধে দিয়েছিল। গতকাল চতুর্থ দিনে তাদের যুক্তি উপস্থাপন অসমাপ্ত অবস্থায় শেষ হয়েছে। আজ আসামী পক্ষ যুক্তি উপস্থান  শুরু করবে এবং এরপর আবার রাষ্ট্রপক্ষ সুযোগ পাবে পরবর্তীতে।

উই আর নট স্টুডেন্ট : ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ তার যুক্তি উপস্থানের শুরুতে তার বক্তব্যের একটি লিখিত কপি ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের হস্তান্তর করেন। এসময় ট্রাইব্যুনাল সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এ পর্যন্ত আসামী পক্ষ যত দরাখাস্ত দিয়েছে তার সবই তারা দিয়েছে ইংরেজিতে। আর রাষ্ট্রপক্ষ যত  যা কিছু দিয়েছে সবই দিয়েছে বাংলায়। আমরা রায় লিখব ইংরেজিতে। আপনারা কি আমাদের সহযোগিতা করছেন না করছেনা?
এরপর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের বক্তব্যের সারাংশ বিষয়ে বলেন, এটা আপনি কি দিয়েছেন? উই আর নট স্টুডেন্ট। উই আর জাজেস  অব দিস ট্রাইব্যুনাল।  আমরা স্টুডেন্ট থাকা অবস্থায় এ ধরনের লেকচার শিট পেতাম কাসে। আপনি রাষ্ট্রপক্ষ থেকে প্রসিকিউটর হিসেবে আর্গমেন্ট এর জন্য দাড়িয়েছেন। আপনি আর্গুমেন্ট করবেন। কিন্তু যা দিয়েছেন তা লেকচারের জন্য  হতে পারে।
এরপর তিনি তার সারাংশের একটি শিরোনাম ‘প্যাটার্নস অব ক্রাইমস’ উল্লেখ করে বলেন এসব কি? একটা সিনোপসিসতো অন্তত দিবেন। অন্তত আপনার কাছে এটা আশা করেছিলাম।
ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, বাংলা এবং ইংরেজি দুটি ভাষা ব্যবহারের সুযোগ আছে। আর আমি আমার বক্তব্য  ইংরেজিতেই তৈরি করেছি।


মঙ্গলবার, ৩০ জুলাই, ২০১৩

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মামলায় যুক্তি উপস্থাপন অব্যাহত

৩০/৭/২০১৩
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন অব্যাহত রয়েছে। আদালতের বেঁধে দেয়া নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আজ তিনদিনের মাথায় তাদের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হবার কথা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ সময় প্রার্থনা করায় আগামীকাল বুধবারের মধ্যে তাদের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আনীত মোট ২৩ টি অভিযোগের মধ্যে আজ পর্যন্ত তারা ১৭টি অভিযোগের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ  করেছে। সকালে ট্রাইব্যুনালের (১) কার্যক্রম শুরু হলে সুলতান মাহমুদ সিমন আগের দিনের ধারাবাহিকতায় সপ্তম অভিযোগ থেকে যুক্তি পেশ শুরু করেন। দিনের শেষে ১৭ নম্বর অভিযোগ পর্যন্ত যুক্তি পেশ শেষ করেন। তবে এর মধ্যে ৯ম, ১৩, ১৫ এবং ১৬ নং অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির না করায় এসব অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি পেশ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বাকী অভিযোগগুলো বিষয়ে যুক্তি পেশ করা হয়েছে। আজ যেসব অভিযোগে যুক্তি পেশ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ৭ম-সতিশ চন্দ্র পালিত হত্যা, ৮ম- শেখ মোজাফফর আহমদ এবং তার ছেলে আলমগীরকে অপহরন ও হত্যা, ১০ম-মানিক ধরের বাড়ি লুটপাট, ১১ তম বোয়ালিয়া থানার শাখপুরা গ্রামে গনহত্যা তথা গুলি করে ৫২ জনকে হত্যা, ১২ তম-জগৎমল্লপাড়া গ্রামে গণহত্যা, ১৪ তম হানিফকে অপহরন করে গুডসহিলে নিয়ে নির্যাতন, এবং ১৭ তম অভিযোগ হল নিজামউদ্দিনসহ তিনজনকে ধরে নিয়ে গুডসহিলে নির্যাতন।
সুলতান মাহমুদ সিমন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং ১৯৭১ সালে প্রকাশিত ও সংরক্ষিত কিছু  ডকুমেন্ট  উপস্থাপন করে বলেন,  আসামীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হয়েছে। আসামীর নির্দেশে এবং উপস্থিতিতে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনা যে ঘটেছে তাতে কোন সন্দেহ নাই এবং এ বিষয়ে দলিলপত্র রয়েছে।

তরকারি বেশি রান্না হয়ে গেছে : আজ  সোয়া তিনটার দিকে রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ তম অভিযোগের পক্ষে যুক্তি উপস্থান শেষে  আরো সময় প্রার্থনা করলে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির বলেন, আপনাদের তরকারি বেশি রান্না হয়ে গেছে। ফলে কোনটায় লবন কম, কোনটায় তেল কেম, কোনটায় ঝাল বেশি হয়ে গেছে। অল্প আইটেম রান্না করলে সবগুলো আইটেম সুস্বাদু হত। রাষ্ট্রপক্ষ আনিত অধিকসংখ্যক অভিযোগের প্রতি লক্ষ্য করে তিনি এ মন্তব্য করেন।
এক্সটারমিনেশন মানে কি : আজ যুক্তি উপস্থাপনের সময় দুপুরের বিরতির হলে  ট্রাইব্যুনাল কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ এবং অন্যান্যরা। তখন ডকে দন্ডায়মান সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তুরিন আফরোজকে লক্ষ করে বলেন, এই তুরিন এক্সটারমিনেশন মানে কি? তখন তুরিন আফরোজ বা কেউ একজন পাশ থেকে বলেন, নির্মূল, নিশ্চিহ্নকরন। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, নির্মূলতো? আমার বিরুদ্ধে আপনারা নির্মূলের অভিযোগ এনেছেন। আর আপনি তো নির্মূল কমিটির সদস্য। এরপর আপনাকে নির্মূলের জন্য ধরা হবে। এরপর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাসলেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী।