কামারুজ্জামান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কামারুজ্জামান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৫

কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

মেহেদী হাসান, ১১/৪/২০১৫
 জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামানের  মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। আজ রাত ১০ টা  ৩০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রেীয় কারাগারে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে কামারুজ্জামানের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে রাত ১১টা ৪০ মিনিটে অ্যাম্বুলেন্স যোগে কড়া প্রহরায় কামারুজ্জামানের লাশ তার জন্মস্থান শেরপুরের বাজিতখিলার উদ্দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। একজন ডেপুৃটি জেলারের তত্ত্বাবধানে পাঁচ সদস্যের কারা কর্মকর্তরা তার লাশ নিয়ে শেরপুরের উদ্দেশে রওয়ানা হন।

সিনিয়র জেলসুপার ফরমান আলী রাত ১১টা ৪৩ মিনিটে কারাগার থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের বলেন, রাত ১০টা ৩০ মিনিটে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। তিনি প্রাণভিক্ষা চাননি।

কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড  কার্যকর বিষয়ক সরকারের নির্বাহী আদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিকাল পৌনে তিনটায় কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌছায়।
দণ্ড কার্যকর উপলক্ষে  সন্ধ্যার পর থেকে কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিপুল সংখ্যাক র‌্যাব, পুলিশ, ডিবি, কারারক্ষী এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা  সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। কারাগারের আশপাশের এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার পর থেকে পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে নির্দিষ্ট কয়েকটি রোডে পুলিশ, সাংবাদিক এবং প্রশাসনের যানবাহন ছাড়া সব গাড়ি এবং লোকজনকে বের হয়ে যেতে বলা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ঘিরে পুরো রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয় সন্ধ্যার পর থেক্ েগুরুত্বপূর্ণ সব পয়েন্টে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়।
বিকাল চারটার দিকে  কামারুজ্জামানের পরিবারের সদস্যরা কারাগারে আসা উপলক্ষে দুপুরের পর থেকেই  বিপুলসংখ্যক দেশী বিদেশী সাংবাদিক জড়ো হয়।

সন্ধ্যা সাতটার পরে কারাগারে একটি অ্যাম্বুলেন্স (ঢাকা মেট্রো-চ ৭৪-০১২৭) প্রবেশ করে ।
সন্ধ্যা ছয়টা ৪৫ মিনিটে আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখারুজ্জামান প্রবেশ করেন। সাতটার দিকে প্রবেশ করেন অতিরিক্ত আইজিপি কর্ণেল বজলুল কবির। সোয়া সাতটায় প্রবেশ করেন সহকারি সিভিল সার্জন আহসান হাবিব। এরপর প্রবেশ করেন লালবাগ জোনের ডিসি।

কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামি জানান,  দুপুর  সোয়া একটার দিকে ডেপুটি জেল সুপার তাদেরকে ফোনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসতে বলেন কামারুজ্জামানের সাথে দেখা করার জন্য।    বিকাল চারটা দশ মিনিটে কামারুজ্জামানের ২২ জন নিকট আত্মীয় কারাগারে প্রবেশ করেন। সাক্ষাত শেষে পাঁচটা ২০ মিনিটে তারা বের হয়ে আসেন।  কারাফটকের সামনে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের হাসান ইকবাল ওয়ামি জানান, তার বাবা প্রাণভিক্ষা চাননি। তিনি বলেছেন প্রাণ দেয়ার এবং নেয়ার মালিক  আল্লাহ। রাষ্ট্রপতির কাছে  প্রাণভিক্ষার কোন প্রশ্নই আসেনা।

এর আগে গত ছয় এপ্রিল রিভিউ আবেদন খারিজ হয়ে যাবার পর ওইদিনই কামারুজ্জামানের পরিবারের সদস্যদের কেন্দ্রীয় কারাগারে ডেকে আনে তার সাথে সাক্ষাতের জন্য। এ প্রেক্ষিতে ওইদিন রাতেই কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে মর্মে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে বিচারপতিদের স্বাক্ষরিত রায় কারাগারে না পৌছানোয় দণ্ড কার্যকর করা থেকে বিরত থাকে কর্তৃপক্ষ। এরপর আট এপ্রিল রিভিউ মামলার রায়ের কপিতে বিচারপতিদের স্বাক্ষর এবং তা ওইদিন কারাগারে পাঠানোর পর যেকোন সময় ফাঁসি কার্যকর হতে পারে মর্মে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বলা হতে থাকে। কারাগার সূত্র এবং সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় ফাঁসি কার্যকরের জন্য সব প্রস্ততি নিয়ে রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় নয় এপ্রিল কামারুজ্জামানের সাথে দেখা করেন তার আইনজীবীরা। সাক্ষাত শেষে অ্যাডভোকেট শিশির মো : মনির সাংবাদিকদের জানান, কামারুজ্জামান প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি-না সে বিষয়ে তিনি যথযথ কর্তৃপক্ষকে যথা সময়ে জানাবেন।
এরপর গত শুক্রবার সকালে কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেন দুজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। কামারুজ্জামানের প্রাণভিক্ষা বিষয়ে জানার জন্য  তারা কারাগারে যাচ্ছেন কি-না সাংবাদিকরা  কারা ফটকে জানতে চাইলে তারা এ বিষয়ে কোন কিছু জানাতে অস্বীকার করেন।


১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়  এর আগে  ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর  জামায়াতের আরেক সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।

গত ৬ এপ্রিল সোমবার  প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেন । গত ৮ এপ্রিল  রিভিউ রায়ের কপিতে স্বাক্ষর করেন চার বিচারপতি। এরপর গতরাতে কার্যকর করা হল তার মৃত্যুদণ্ড।

৬ এপ্রিল সোমবার রিভিউ আবেদন খারিজ হয়ে যাবার পরপরই কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখে কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষ। কামারুজ্জামানের পরিবারের সদস্যদের কাছে ওইদিন দুপুরের পর চিঠি পাঠানো হয় বিকেল পাঁচটার মধ্যে কারাগারে এসে দেখা করার জন্য। তখন খবর ছড়িয়ে পড়ে সেদিন রাতেই কার্যকর হচ্ছে মৃত্যুদন্ড । তবে বিচারপতিদের স্বাক্ষরিত  রিভিউ রায়ের কপি কারাগারে না পৌছায় কারা কর্তৃপক্ষ দণ্ড কার্যকর করা থেকে বিরত থাকে।

মুহম্মদ কামারুজ্জামানকে  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দুটি অভিযোগে  মৃত্যুদণ্ড দেয়। গত বছর ৩ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ডের একটি অভিযোগ বহাল রাখেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। মৃত্যুদণ্ডের আরেকটি সাজা বাতিল করে যাবজ্জীবন করেন।
গত ৬ এপ্রিল কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেন। এর  মাধ্যমে আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে গত বছর ৩ নভেম্বর যে রায় দিয়েছিলেন তা চূড়ান্তভাবে বহাল থাকে।


মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরন :
১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৩ সালের ৯ মে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। 

ট্রাইব্যুনালে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে  অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনালের রায়ে মোট পাঁচটিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেয়া  হয়।  দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং অপর আরেকটি অভিযোগে ২০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়।

নিয়ম অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষনার এক মাসের মধ্যে আসামী পক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করে। গত বছরের ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রেখে রায় দেন। আপিল বিভাগের সংখ্যাগষ্ঠি রায়ে একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। ট্রাইব্যুনালের দেয়া আরেকটি মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবন করা হয়। 
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।
৫ মার্চ আসামী পক্ষ রিভিউ আবেদন দায়ের করে আপিল বিভাগে। ৫ এপ্রিল শুনানী শেষে ৬ এপ্রিল  রিভিউ আবেদন খারিজ করে রায় দেন আপিল বিভাগ। ফলে ৩ নভেম্বর মুত্যুদণ্ড বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেয়া রায়  বহাল থাকে। ৮ এপ্রিল রিভিউ রায়ে স্বাক্ষর করেন চার বিচারপতি।


ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে পুলিশের দায়ের করা মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বছর ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।

কামারুজ্জামানের আপিল শুনানীর জন্য প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার  নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের  বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী।
আপিল  মামলায় কামারুজ্জামানের পক্ষে প্রধান আইনজীবী ছিলেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন। তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট শিশির মো : মনির।

কামারুজ্জামানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালে শেরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি  জিকেএম ইনস্টিটিউশন  থেকে চার বিষয়ে লেটারসহ প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন। ১৯৭২ সালে ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজে থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৭৩ (১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত) সালে তিনি ঢাকা আইডিয়াল কলেজ থেকে ডিস্ট্রিংশনসহ বিএ পাস করেন। এরপর  ১৯৭৬ সালে কামারুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে এমএ পাস করেন।

১৯৭৯ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে  এ দলের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাহিত হবার আগে তিনি দীর্ঘদিন দলের কেন্দ্রেীয় প্রচার সম্পাদকসহ অন্যান্য  গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। জামায়াতে যোগ দেয়ার আগে তিনি  ১৯৭৮-৭৯ সালে দ্বিতীয়বারের মত বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন।

মুহম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৮০ সাল থেকে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। দীর্ঘদিন তিনি দৈনিক সংগ্রমের নির্বাহিী সম্পাদক ছিলেন। গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত তিনি  সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কামারুজ্জামান এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তীতে  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ের আন্দোলনে লিয়াজো কমিটির একজন সদস্য ছিলেন।
একজন লেখক এবং সুবক্তা হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে।  তিনি স্ত্রী,  পাঁচ ছেলে, ও এক মেয়ে  রেখে গেছেন। 

লাশ দাফনের প্রস্তুতি :
কামারুজ্জামানের ইচ্ছা অনুযায়ী তার প্রতিষ্ঠিত বাজিতখিলা কুমরী এতিমখানার পাশে লাশ দাফনের প্রস্তুত চলছে। রাত ১১টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শেরপুর সংবাদদাতা জানান, কামারুজ্জামানের আত্মীয়স্বজনরা কবর খননের কাজ করছেন। নিরাপত্তার জন্য সেখানে দুই প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।












সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৫

রিভিউ আবেদন খারিজ : কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহাল

মেহেদী হাসান, ৬/৪/২০১৫
জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে।

আজ  আপিল বিভাগ কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয়া ।  এর ফলে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে আপিল বিভাগ  এর আগে যে রায় দিয়েছিল তা বহাল রইল।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ সকালে রিভিউ আবেদন খারিজ করে রায় দেন।

রিভিউ আবেদনের খারিজের মধ্য দিয়ে এ মামলার  সমস্ত বিচার কার্যক্রম শেষ হয়ে গেল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে আইনগত আর কোন বাঁধা নেই। আসামীর জন্য এখন সর্বশেষ  রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষার  আবেদনের একটি সুযোগ রয়েছে। তিনি যদি এ  আবেদন না করেন বা আবেদন করলেও রাষ্ট্রপতি  যদি তা নামঞ্জুর  করেন তাহলে ফাঁসি কার্যকর করার ক্ষেত্রে আর কোন বাঁধা থাকবেনা।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রায়ের পর সাংবাদিকদের বলেছেন, কামারুজ্জামান প্রাণভিক্ষার আবেদনের জন্য সময় পাবেন। যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তাকে আবেদন করতে হবে। তিনি আবেদন করলে  তা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসি কার্যকর করা যাবেনা। তবে আবেদন না করলে বা আবেদন নাকচ করা হলে  সেক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল আইনের ধারা মোতাবেক সরকার ফাঁসি কার্যকর করার সময় নির্ধারণ করবে। তিনি বলেন, ফাঁসি কার্যকরের জন্য সাত দিনের আগে নয় এবং  ২১ দিনের পরে নয় জেলকোডের এ নিয়ম তার জন্য প্রযোজ্য হবেনা। সরকার যখন চাইবে তখন তার ফাঁসি কার্যকর করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফাঁসির দিনক্ষন ঠিক করে তা জেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেবে এবং সে অনুযায়ী জেল কর্তৃপক্ষ ফাঁসি কার্যকরের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। 

প্রাণভিক্ষার আবেদন বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আপিল বিভাগ রিভিউ আবেদন খারিজের বিষয়টি কারাকর্তপক্ষ বরাবর পাঠাবে। কারা কর্তৃপক্ষ রিভিউ আবেদনের রায় আসামীকে পড়ে শোনানোর পর তার কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন বিষয়ে জানতে চাইবে। সেটা বিবেচনার জন্য তিনি কিছু সময় পেতে পারেন। তবে খুব বেশি দেরি করার সুযোগ নেই।

মুহম্মদ কামারুজ্জামানকে  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দুটি অভিযোগে  মৃত্যুদণ্ড দেয়। গত বছর ৩ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ডের একটি অভিযোগ বহাল রাখেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। মৃত্যুদণ্ডের আরেকটি সাজা বাতিল করে যাবজ্জীবন করেন।
আজ  রিভিউ আবেদন খারিজের মাধ্যমে আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ৩ নভেম্বর যে রায় দিয়েছিলেন তা বহাল রইল। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের অপর তিনটি অভিযোগের বিষয়ে আপিল বিভাগ পূর্বে যে রায় দেন তাও বহাল রইল গতকালের রায়ে।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পরদিন ১৯ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা ট্রাইব্যুনাল থেকে কারাগারে পাঠানো হয়।


কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও রায় :
ট্রাইব্যুনালে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত সাতটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনে।

এর মধ্যে ট্রাইব্যুনালের রায়ে মোট পাঁচটিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেয়া য় হয়।

নিম্নে এ পাঁচটি অভিযোগে ট্রাইবুন্যাল এবং আপিল বিভাগের রায় উল্লেখ করা হল।

১ নম্বর অভিযোগ : বদিউজ্জামানকে অপহরন করে আহমেদনগর আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা। এ হত্যার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কামারুজ্জামানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। আপিল বিভাগের রায়ে এ অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়েছে সর্বসম্মতভাবে।

২ নম্বর অভিযোগ : শেরপর কলেজের অধ্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক সৈয়দ আবদুল হান্নানকে প্রায় উলঙ্গ করে শহরে প্রদণি করানো এবং পেটানো হয়।  এ অভিযোগে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়। আপিল বিভাগে এ সাজা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে বহাল রাখা হয়েছে।

৩ নম্বর অভিযোগ : ১৯৭১ সালে কামারুজ্জামানের পরামর্শে পাকিস্তান আর্মি দেশীয় রাজাকার এবং আলবদর সদস্যদের সাথে নিয়ে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে অভিযান চালায়। অভিযানে ওই গ্রামে দেড়শতাধিক মানুষ নিহত হয় এবং অসংখ্য নারী ধর্ষনের শিকার হয়। এ গণহত্যার অভিযোগে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে এ সাজা বহাল রাখে। 

৪ নম্বর অভিযোগ : শেরপর মোস্তফাবাগ থেকে গোলাম মোস্তফাকে ধরে আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। এরপর তাকে কামারুজ্জামানসহ অন্যান্যরা মিলে একটি ব্রিজের কাছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এ অভিযোগে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে এ অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে যাবজ্জীবন দিয়েছে।  

৭ নম্বর অভিযোগ : মুক্তিযুদ্ধচলাকালে ময়মনসিংহ গোলাপজান রোডে টেপা মিয়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে টেপা মিয়া এবং তার ছেলে জহুরুল ইসলাম দারাকে ধরে জেলাপরিষদ ডাকবাংলায় অবস্থিত আলবদর ক্যাম্পে আনা হয়। পরেরদিন সকালে তারা দুজনসহ সাতজনকে ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর তীরে আনা হয়। এসময় টেপা মিয়া নদীতে ঝাপ দিয়ে রক্ষা পায় এবং বাকীদের হত্যা করা হয়। এ অভিযোগের সাথে সংশ্লিষ্টতার  ট্রাইব্যুনাল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় ।  আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে এ দণ্ড বহাল রাখা হয়।

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরন :
২০১৩ সালের ৯ মে কামারুজ্জামানকে ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। 
গত বছরের ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রেখে আদেশ দেন।
এরপর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

নিয়ম অনুযায়ী আসামীপক্ষ রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে গত ৫ মার্চ আপিল বিভাগে রিভিউ আবেদন দায়ের করে।
৫ মাচ রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল রিভিউ আবেদন খারিজ করে আদেশ দেন আপিল বিভাগ।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে পুলিশের দায়ের করা মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বছর ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।

কামারুজ্জামানের আপিল শুনানীর জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের  বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী।


কামারুজ্জামানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালে শেরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি  জিকে স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন। এরপর জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে আইএসসি’তে ভর্তি হন। ১৯৭২ সালে নাসিরাবাদ কলেজে থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৭৬ সালে কামারুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে এমএ পাস করেন।

১৯৭৯ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে  এ দলের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। জামায়াতে যোগ দেয়ার আগে তিনি ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রেীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
মুহম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৮০ সাল থেকে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। তিনি দৈনিক সংগ্রমের নির্বাহিী সম্পাদক ছিলেন। গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত তিনি  সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কামারুজ্জামান এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তীতে  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ের আন্দোলনে লিয়াজো কমিটির একজন সদস্য ছিলেন।
একজন লেখক এবং সুবক্তা হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে।  তার পাঁচ ছেলে রয়েছে।



রায়ের কপিতে স্বাক্ষর করেননি বিচারপতিরা


এদিকে আজ  সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার সৈয়দ আমিনুল ইসলাম জানান, বিচারাপতিরা রিভিউ’র রায়ে স্বাক্ষর করেননি। আজ মঙ্গলবার তারা স্বাক্ষর করতে পারেন।

সিনিয়র জেল সুপার বিকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের জানান, তারা এখনো রায়ের কপি পাননি। কপি পেলে আসামীকে তা পড়ে শোনানো হবে এবং তিনি প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন কি-না সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে। এরপর পরবর্তী করনীয় বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রিভিউ আবেদন সকালে খারিজ করে দেয়ার পর কারাকর্তৃপক্ষ  দুপুরের পর কামারুজ্জামানের পরিবারের সদস্যদের খবর দেয় বিকাল পাঁচটার মধ্যে কারাগারে আসার জন্য আসামীর সাথে সাক্ষাতের জন্য। কারা কর্তৃপক্ষও ফাঁসি কার্যকরের যাবতীয় প্রস্ততি সম্পন্ন করে রাখে। এসব কারনে  কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় রাতেই কার্যকর হতে পারে মর্মে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।



রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০১৫

কামারুজ্জামানের রিভিউ শুনানী শেষ কাল রায়

মেহেদী হাসান ,৫/৪/২০১৫
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদনের (পুনরায় বিবেবচনা)  রায় কাল।  রিভিউ আবেদনের ওপর আজ  উভয় পক্ষের শুনানী শেষ হয়েছে। শুনানী শেষে কাল  রায়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ রায় ঘোষনার এ তারিখ নির্ধারণ করেন। রিভিউ আবেদনই হল এ  মামলার সর্বশেষ ধাপ এবং তাই কালকের  এ রায় হল  চুড়ান্ত রায়।

মুহম্মদ কামারুজ্জামানের পক্ষে রিভিউ আবেদন শুনানী করেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানী করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

২০১৩ সালের ৯ মে কামারুজ্জামানকে ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। 
গত বছরের ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রেখে আদেশ দেন।
নিয়ম অনুযায়ী গত ৫ মার্চ আপিল বিভাগে রিভিউ আবেদন দায়ের করে আসামী পক্ষ।

কামারুজ্জামানের আপিল শুনানীর জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের  বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী।

রিভিউ  শুনানী :
ট্রাইব্যুনাল মুহম্মদ কামারুজ্জামানকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এ অভিযোগ দুটি হল ৩ নং অভিযোগ যথা সোহাগপুর গণহত্যা এবং ৪ নং অভিযোগ যথা শেরপুরে গোলাম মোস্তফা নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা।
আপিল বিভাগের রায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে একটি মুত্যুদুন্ডের অভিযোগ (সোহাগপুর গণহত্যা) বহাল রাখা হয়েছে।  মুত্যুদন্ডের  আরেকটি অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করা হয়েছে।

আজ রিভিউ আবেদন শুনানীতে অংশ নিয়ে খন্দকার মাহবুব হোসেন  বলেন,

তিন নং অভিযোগ যথা সোহাগপুর গণহত্যার ক্ষেত্রে মূলত তিনজন সাক্ষীর ওপর ভিত্তি করে মুতৃ্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ তিনজন সাক্ষী হল রাষ্ট্রপক্ষের ১১, ১২ এবং ১৩ নং সাক্ষী। এর মধ্যে ১১ নং সাক্ষী হাসনা বেগম শোনা কথার ভিত্তিতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন স্বাধীনতার পর তিনি মুরব্বীদের কাছে শুনেছেন সোহাগপুর গণহত্যার সাথে কামারুজ্জামান জড়িত ছিল।
১২ নং সাক্ষী হাফিজা বেওয়া নিজেকে প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন। তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু তিনি জেরায় বলেছেন স্বাধীনতার আগে তিনি কামারুজ্জামানকে চিনতেননা। স্বাধীনতার তিন/চার মাস পরে তিনি কামারুজ্জামানকে টিভিতে দেখেছেন।

১৩ নং সাক্ষী করফুলি বেওয়া। তিনিও বলেছেন তার স্বামী হত্যার সাথে কামারুজ্জামান জড়িত। কিন্তু জেরায় তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার পর তিনি কামারুজ্জামানকে তাদের বাড়ির উঠানে দেখেছেন। আগে চিনতেননা।

খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সাক্ষীরা যদি আসামীকে আগে না চিনে থাকে তাহলে তারা ঘটনাস্থলে আসামীকে সনাক্ত করল কিভাবে।

সোহাগপুর গণহত্যা বিষয়ে আসামী পক্ষ থেকে দুটি বই জমা দেয়া হয়েছিল । মুহম্মদ কামারুজ্জামানের আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের জানান, এ বই দুটিতে কামারুজ্জামানের নাম নেই। রাষ্ট্রপক্ষের ১১ এবং ১৩ নং সাক্ষীর সাক্ষাতকার রয়েছে। মামুনুর রশিদ নামে এক সাংবাদিক তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তারা কামারুজ্জামন সম্পর্কে কিছু বলেননি। কিন্তু বই দুটি ২০১১ এবং ২০১২ সালে প্রকাশিত বিধায় আপিল বিভাগের  রায়ে একে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রকাশিত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

শিশিুর মনির বলেন, তবে রিভিউ আবেদনের ক্ষেত্রে আসামী পক্ষ থেকে নতুন আরেকটি বই জমা দেয়া হয়েছে যা ১৯৭১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং ২০০৮ সালে সর্বশেষ সংস্করন বের হয়। মহিলা মুক্তিযোদ্ধা নামে এ বইটির লেখক ফরিদা আখতার।

আজ  এ বই থেকে কিছু তথ্য তুলে ধরে যুক্তি উপস্থাপন করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন।
তিনি আদালতে বলেন,এ বইটিতে ১৩ নং সাক্ষী করফুলি বেওয়ার  একটি সাক্ষাতকার রয়েছে যা ১৯৯৬ সালে গ্রহণ করা হয়েছে। এ সাক্ষাতকারে  করফুলি বেওয়া বলেছেন, তার স্বামী হত্যার সাথে সেনাবাহিনী জড়িত।
তাই খন্দকার মাহবুব হোসেন এ বিষয়টি পুনরায় বিবেচনার জন্য আদালতের প্রতি নিবেদন করেন।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, যে যুক্তিতে ৪ নং অভিযোগে  ট্রাইব্যুনালের দেয়া মুত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবন করা হয়েছে সে যুক্তিতে তিন নং অভিযোগ তথা সোহাগপুর গণহত্যার অভিযোগের সাজাও  পরিবর্তন করা যায়।
রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রিভিউ আবেদনের বিষয়ে শুনানীতে অংশ নিয়ে আদালতকে বলেন, আলবদর নেতা হিসেবে তখন মুহম্মদ কামারুজ্জামানের যে স্টাটাস ছিল সে কারনে সেখানকার আর্মি অফিসাররা তার কথা শুনে কাজ করত। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে শেরপুরে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত হিসেবে মুহাম্মদ কামারজ্জামানের নাম বিভিন্ন বই এবং পত্রিকায় এসেছে।

শুনানীতে খন্দকার মাহবুব হোসেনকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট শিশির মো : মনির।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে পুলিশের দায়ের করা মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।

বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

কামারুজ্জামানের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

মেহেদী হাসান, ১৮/২/২০১৫
জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন আপিল বিভাগ। আজ  দুপুরের পর রায়ের কপি প্রকাশ করা হয়।

রায় প্রকাশের দিন থেকে পরবর্তী  ১৫ দিনের মধ্যে আসামী পক্ষ এর বিরুদ্ধে রিভিউ (পুনরায় বিবেচনা) আবেদন করার সুযোগ পাবেন।

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১৩ সালের  ৯ মে  মুহম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন আসামী পক্ষ। আপিল শুনানী শেষে গত বছর ৩ নভেম্বর মুত্যদন্ড বহাল রেখে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রায় দেন আপিল বিভাগ। সে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি আজ  প্রকাশ করা হল।

বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা’র  (বর্তমানে প্রধান বিচারপতি) নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ মুহম্মদ কামারুজ্জামানের শুনানী গ্রহণ করেন। বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন বিচারপতি মো : আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচম শামসুিদ্দন চৌধুরী।

চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ  সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল রেখে রায় দেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কামারুজ্জামানকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়।  গত ৩ নভেম্বরের রায়ে  আপিল বেঞ্চ এর মধ্যে একটি অভিযোগে ( ৩ নং অভিযোগ সোহাগপুর গণহত্যা)  তার মৃত্যুদণ্ড সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে বহাল রাখেন। মৃত্যুদন্ডের আরেকটি শাস্তি  বাতিল করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
ট্রাইব্যুনালে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মোট সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে  পাঁচটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা  দেয় ট্রাইব্যুনাল। ৩ এবং ৪ নং অভিযোগে  মৃত্যুদণ্ড, ১ এবং ৭ নং অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং ২ নম্বর অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।
আপিল বিভাগের রায়ে ২ এবং ৭ নং অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত  সাজা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে বহাল রাখা হয়। ১ নং অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়।
আপিল বিভাগের রায়ে যে অভিযোগে মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা হয়েছে সেটিতে মুহম্মদ কামারুজ্জামানকে সর্বসম্মতভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং  মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে। আর মৃত্যুদন্ডের যে সাজা বাতিল করে যাবজ্জীবন করা হয়েছে সেটিতে কামারুজ্জামানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে।

গতকাল কামারুজ্জামানের মৃত্যুদন্ডের যে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে সেটি মোট ৫৭৭ পৃষ্ঠার। এর মধ্যে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখেছেন ১৮৮ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যে রায় লিখেছেন তার সাথে একমত পোষন করেছেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। বিচারপতি এএইচএম শামসুিদ্দন চৌধুরীও  বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সাথে সম্পূর্ণ একমত পোষন করেছেন। তবে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বিষয়ে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার যে মূল্যায়ন তার সাথে তিনি ভিন্নমত পোষন করে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি।

অপরদিকে বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা চারটি অভিযোগের ক্ষেত্রে বেঞ্চের অপর তিন বিচারপতির সাথে ভিন্নমত পোষন করে ভিন্ন রায় দিয়েছেন। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগ থেকে তিনি মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে সম্পূর্ণ খালাস দিয়েছেন। একটি অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন।


১ নং অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কামারজ্জামানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল। আপিল বিভাগ এ অভিযোগ থেকে কামারুজাম্মানকে খালাস দিয়েছেন। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এ অভিযোগ থেকে খালাস দিয়ে যে রায় লিখেছেন সে বিষয়ে বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা সম্পূর্ণ একমত পোষন করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে তিনি নতুন করে কিছু লেখেননি। অপর যে চারটি অভিযোগের ক্ষেত্রে তিনি ভিন্নমত পোষন করে ভিন্ন রায় দিয়েছেন সেক্ষেত্রে তিনি তার ব্যাখ্যা এবং মূল্যায়ন  তুলে ধরেছেন।

সব মিলিয়ে  বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা মোট চারটি অভিযোগ থেকে কামারুজ্জামানকে খালাস দিলেন। একটি অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছেন।

৫৭৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে ১৮৮ থেকে ৪৫৬ পৃষ্ঠা পর্যন্ত রায় লিখেছেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা।


কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও রায় :

১ নম্বর অভিযোগ : বদিউজ্জামানকে অপহরন করে আহমেদনগর আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা। এ হত্যার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কামারুজ্জামানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। আপিল বিভাগের রায়ে এ অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়েছে সর্বসম্মতভাবে।

২ নম্বর অভিযোগ : শেরপর কলেজের অধ্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক সৈয়দ আবদুল হান্নানকে প্রায় উলঙ্গ করে শহরে প্রদণি করানো এবং পেটানো হয়।  এ অভিযোগে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়। আপিল বিভাগে এ সাজা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে বহাল রাখা হয়েছে।
বিচরপতি  আবদুল ওয়াহহাব মিঞা এ অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছেন আসামীকে।

৩ নম্বর অভিযোগ : ১৯৭১ সালে কামারুজ্জামানের পরামর্শে পাকিস্তান আর্মি দেশীয় রাজাকার এবং আলবদর সদস্যদের সাথে নিয়ে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে অভিযান চালায়। অভিযানে ওই গ্রামে দেড়শতাধিক মানুষ নিহত হয় এবং অসংখ্য নারী ধর্ষনের শিকার হয়। এ গণহত্যার অভিযোগে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে এ সাজা বহাল রেখেছে।
বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা এ অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছেন।

৪ নম্বর অভিযোগ : শেরপর মোস্তফাবাগ থেকে গোলাম মোস্তফাকে ধরে আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। এরপর তাকে কামারুজ্জামানসহ অন্যান্যরা মিলে একটি ব্রিজের কাছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এ অভিযোগে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে এ অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে যাবজ্জীবন দিয়েছে।  
বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা এ অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েচেন।

৭ নম্বর অভিযোগ : মুক্তিযুদ্ধচলাকালে ময়মনসিংহ গোলাপজান রোডে টেপা মিয়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে টেপা মিয়া এবং তার ছেলে জহুরুল ইসলাম দারাকে ধরে জেলাপরিষদ ডাকবাংলায় অবস্থিত আলবদর ক্যাম্পে আনা হয়। পরেরদিন সকালে তারা দুজনসহ সাতজনকে ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর তীরে আনা হয়। এসময় টেপা মিয়া নদীতে ঝাপ দিয়ে রক্ষা পায় এবং বাকীদের হত্যা করা হয়। এ অভিযোগের সাথে সংশ্লিষ্টতার  ট্রাইব্যুনাল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় ।  আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে এ দণ্ড বহাল রাখা হয়।
বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা এ অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছেন।

রিভিউ আবেদন
গত বছর ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ থেকে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্দে চূড়ান্ত রায় প্রকাশের পর পরই রিভিউ আবেদন এবং তার ফাঁসি কার্যকর নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ক্রামগতভাবে দাবি করা হয় কামারুজ্জামান রিভিউর সুযোগ পাবেননা। এমনকি আইনমন্ত্রী ফাঁসি কার্যকরের জন্য জেল কর্তৃপক্ষকে প্রস্তুতির নির্দেশে দিয়েছেন বলেও জানান গণমাধ্যমে।
এ বিতর্ক চলা অবস্থায় ২৫ নভেম্বর আপিল বিভাগ আব্দুল কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। এতে বলা হয় আাপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ বা পুনরায় বিবেচনার জন্য  আবেদন করার সুযোগ পাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দন্ডিতরা।

রায়ে বলা হয়েছে রিভিউ আবেদন সমর্থনীয় (মেনটেনঅ্যাবল)। রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবেনা।


কামারুজ্জামানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালে শেরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি  জিকে স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন। এরপর জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে আইএসসি’তে ভর্তি হন। ১৯৭২ সালে নাসিরাবাদ কলেজে থেকে এইচএসসি পাস করেন। কামারুজ্জামান গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ ঢাকা কিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে এমএ পাস করেন। গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত তিনি  সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি দৈনিক সংগ্রমের নির্বাহিী সম্পাদক ছিলেন। 

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে পুলিশের দায়ের করা মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বছর ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।




সোমবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৪

কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহাল// আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়

মেহেদী হাসান  ০৩/১১/২০১৪
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামানের  মৃত্যুদণ্ড বহালা রাখা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ  সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল রাখেন।

বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ আজ মুহম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় ঘোষনা করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কামারুজ্জামানকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। আজ আপিল বেঞ্চ এর মধ্যে একটি অভিযোগে ( ৩ নং অভিযোগ সোহাগপুর গণহত্যা)  তার মৃত্যুদণ্ড সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে বহাল রাখেন। মৃত্যুদন্ডের আরেকটি শাস্তি  বাতিল করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া  হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মোট সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে  পাঁচটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা  দেয় ট্রাইব্যুনাল। ৩ এবং ৪ নং অভিযোগে  মৃত্যুদণ্ড, ১ এবং ৭ নং অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং ২ নম্বর অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।
আজ আপিল বিভাগের রায়ে ২ এবং ৭ নং অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত  সাজা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে বহাল রাখা হয়। ১ নং অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়।
আপিল বিভাগের রায়ে যে অভিযোগে মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা হয়েছে সেটিতে মুহম্মদ কামারুজ্জামানকে সর্বসম্মতভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং  মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে। আর মৃত্যুদন্ডের যে সাজা বাতিল করে যাবজ্জীবন করা হয়েছে সেটিতে কামারুজ্জামানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে।

গত বছর ৯ মে ১৯৭১ সালে হত্যা, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে মুহম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়  ট্রাইব্যুনাল-২।

মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে আপিল করে আসামী পক্ষ।  গত ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল শুনানী শেষে রায় ঘোষনা অপেক্ষমান রাখা হয়।

গত বছর ১৭ সেপ্টেম্বর  জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ মৃত্যুদন্ডের চূড়ান্ত রায় ঘোষনা করেন।
আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় গত বছর ৫ ডিসেম্বর । পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর রিভিউ আবেদন করা যাবে কি যাবেনা এ নিয়ে বিতর্ক চলা অবস্থায় ১০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার রাত ১২টার পর ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি নেয়া হয় এবং সরকার ও জেল কর্তৃপক্ষ থেকে ঘোষনাও দেয়া হয়। ওই দিনই  রাত সোয়া দশটায় সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ফাঁসি কার্যকর পরের দিন বুধবার সকাল দশটা পর্যন্ত স্থগিত করে আদেশ দেন। ১২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয়ার পর রাতে কার্যকর করা হয় আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি।

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও রায় :
রাষ্ট্রপক্ষের আনিত অভিযোগে এবং ট্রাইব্যুনালের রায়ে মুহম্মদ কামারুজ্জামানকে আলবদর বাহিনীর প্রধান সংগঠক এবং তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ হিসেবে শেরপুরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, আলবদর এবং রাজাকার বাহিনী কর্তৃক স্বাধীনতাপন্থী লোকজনকে হত্যা, নির্যাতন, অপহরন গুম, ধর্ষনসহ বিভিন্ন ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় আনা হয়েছে কামারুজ্জামানের ওপর।  শেরপুরে সংঘটিত বিভিন্ন ধরনের  মানবতাবিরোধী কর্মকান্ড তার পরামর্শ এবং  সহযোতিায়  পরিচালিত হত বলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে উল্লেখ করা হয়।

মুহম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনিত সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি অভিযোগে সাজা দেয়। এ পাঁচটি অভিযোগ বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল এবং আপিল বিভাগের সাজা এখানে উল্লেখ করা হল।

১ নম্বর অভিযোগ : বদিউজ্জামানকে অপহরন করে আহমেদনগর আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা। এ হত্যার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কামারুজ্জামানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। আপিল বিভাগের রায়ে এ অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়েছে।

২ নম্বর অভিযোগ : শেরপর কলেজের অধ্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক সৈয়দ আবদুল হান্নানকে প্রায় উলঙ্গ করে শহরে প্রদণি করানো এবং পেটানো হয়।  এ অভিযোগে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়। আপিল বিভাগে এ সাজা বহাল রাখা হয়েছে।
৩ নম্বর অভিযোগ : ১৯৭১ সালে কামারুজ্জামানের পরামর্শে পাকিস্তান আর্মি দেশীয় রাজাকার এবং আলবদর সদস্যদের সাথে নিয়ে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে অভিযান চালায়। অভিযানে ওই গ্রামে দেড়শতাধিক মানুষ নিহত হয় এবং অসংখ্য নারী ধর্ষনের শিকার হয়। এ গণহত্যার অভিযোগে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে এ সাজা বহাল রেখেছে।
৪ নম্বর অভিযোগ : শেরপর মোস্তফবাগ থেকে গোলাম মোস্তফাকে ধরে আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। এরপর তাকে কামারুজ্জামানসহ অন্যান্যরা মিলে একটি ব্রিজের কাছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এ অভিযোগে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে এ অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে যাবজ্জীবন দিয়েছে।  
৭ নম্বর অভিযোগ : মুক্তিযুদ্ধচলাকালে ময়মনসিংহ গোলাপজান রোডে টেপা মিয়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে টেপা মিয়া এবং তার ছেলে জহুরুল ইসলাম দারাকে ধরে জেলাপরিষদ ডাকবাংলায় অবস্থিত আলবদর ক্যাম্পে আনা হয়। পরেরদিন সকালে তারা দুজনসহ সাতজনকে ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর তীরে আনা হয়। এসময় টেপা মিয়া নদীতে ঝাপ দিয়ে রক্ষা পায় এবং বাকীদের হত্যা করা হয়। এ অভিযোগের সাথে সংশ্লিষ্টতার  ট্রাইব্যুনাল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় ।  আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে এ দণ্ড বহাল রাখা হয়।




মুহম্বদ কামারুজ্জামানের আপিল শুনানীর জন্য বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের আপিল বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিয়া, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিক ও বিচারপতি এএইচএম শাসসুদ্দীন চৌধুরী।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে পুলিশের দায়ের করা মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বছর ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।

কামারুজ্জামানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালে শেরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি  জিকে স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন। এরপর জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে আইএসসি’তে ভর্তি হন। ১৯৭২ সালে নাসিরাবাদ কলেজে থেকে এইচএসসি পাস করেন। কামারুজ্জামান গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ ঢাকা কিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে এমএ পাস করেন। গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত তিনি  সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি দৈনিক সংগ্রমের নির্বাহিী সম্পাদক ছিলেন। 



বৃহস্পতিবার, ৫ জুন, ২০১৪

কামারুজ্জামানের আপিল শুনানী শুরু

 ৫/৬/২০১৪
জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে আপিল শুনানী শুরু হয়েছে। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহণ করেন।

শুনানীর শুরুতে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদিন অভিযোগ গঠন আদেশ পড়ে শোনান। এরপর সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী নজরুল ইসলাম অভিযোগ পড়ে শোনাতে শুরু করেন। প্রথম দিন মুহম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে  এক নং অভিযোগ বদিউজ্জামান হত্যাকান্ড বিষয়ে দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্য পড়ে শোনান। এরপর শুনানী আগামী রোববার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।

শুনানীর সময় মুহম্মদ কামারুজ্জামানের পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে আদালতে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রীম কোর্ট বার কাউন্সিলের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট শিশির মো: মনির এবং   শাহীনুর ইসলাম । 

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত বছর ৯ মে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদন্ড দেয়।

ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৭টি অভিযোগ এনেছিল। এর মধ্যে তাকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং আরেকটি অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।   অপর দুটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয় ট্রাইব্যুনালের রায়ে।

মঙ্গলবার, ২০ মে, ২০১৪

কামারুজ্জামানের শুনানী ৩ জুন পর্যন্ত মুলতবি

২০/৫/২০১৪
জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামানের আপিল আবেদন শুনানী আগামী ৩ জুন পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। আজ এ মামলার শুনানীর জন্য ধার্য্য ছিল। তবে প্রস্তুতির জন্য আসামী পক্ষ বিচার কার্যক্রম পাঁচ সপ্তাহ মুলতবি চেয়ে আবেদন করলে আদালত ৩ জুন পর্যন্ত মুলতবি করেন।

বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানীর এ পরবর্তী তারিখ ধার্য্য করেন। মুহম্মদ কামারুজ্জামানের পক্ষে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিশেনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন আবেদনের পক্ষে শুনানী করেন। এসময় আসামী পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, শিশির মো: মনির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা।

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত বছর ৯ মে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদন্ড দেয়। একই বছর ৬ জুন মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের পক্ষ থেকে মৃত্যুদন্ড খালাস চেয়ে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়।

রবিবার, ১৮ মে, ২০১৪

কামারুজ্জামানের আপিল শুনানীর জন্য বেঞ্চ গঠন

 ১৮/৫/২০১৪
জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের আপিল আবেদন শুনানীর জন্য বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি মো : ঈমান আলী ও বিচারপতি এএইএম শামসুদ্দীন চৌধুরী। প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এ বেঞ্চ গঠন করেন।

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মুহম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় গত বছর ৯ মে। গত বৃহষ্পতিবার ১৫ মে প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ আজ ১৮ মে আপিল আবেদন শুনানীর জন্য ধার্য্য করেন। সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের ১ নং কোর্টের আজকের কার্যতালিকায় দেখা যায়  বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চে মুহম্মদ কামারুজ্জামানের  আপিল শুনানীর জন্য নির্ধারন করা হয়েছে। তবে মামলাটি কার্যতালিকার শেষে থাকায় গতকাল শুনানী হয়নি।

এর আগে জামায়াতের অপর দুই নেতা আবদুল কাদের মোল্লা এবং মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে গঠিত পৃথক দটি আপিল বেঞ্চ নিষ্পত্তি করেছেন। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল শুনানীর জন্য গঠিত বেঞ্চে প্রধান বিচারপতি ছাড়া  অপর চার সদস্য ছিলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী।
এর আগে আবদুল কাদের মোল্লার আপিল শুনানীর জন্য গঠিত বেঞ্চে প্রধান বিচারপতি ছাড়া অপর চার সদস্য ছিলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আবদুল ওয়াহব মিঞা, বিচারপতি  সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি এএইচএম শামদ্দীন চৌধুরী।

সুপ্রীম কোর্টের রেজিস্ট্রার একেএম শামসুল ইসলাম বলেন, আগের দুটি আপিল  যে দুটি আপিল বেঞ্চ শুনানী গ্রহন করেছে তা আলাদা দুটি বেঞ্চ ছিল। এখন মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের আপিল শুনানীর জন্য প্রধান বিচারপতি নতুন বেঞ্চ গঠন করেছেন।

এদিকে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মামলার আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেছেন, মামলার প্রস্তুতির জন্য পাঁচ সপ্তাহের মুলতবি চেয়ে আবেদন জমা দেয়া হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার, ১৫ মে, ২০১৪

কামারুজ্জামানের আপিল শুনানী ১৮ মে

১৫/৫/২০১৪
জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামানের আপিল আবেদন শুনানী আগামী ১৮ মে থেকে শুরু হবে। প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ আজ শুনানীর এ তারিখ ধার্য্য করেন।

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত বছর ৯ মে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদন্ড দেয়। একই বছর ৬ জুন মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের পক্ষ থেকে মৃত্যুদন্ড খালাস চেয়ে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। আজ আপিল বিভাগের  কার্যতালিকায় মুহম্মদ কামারুজ্জামানের আপিল শুনানীর তারিখ নির্ধারনের  আদেশের জন্য ধার্য্য ছিল। আদেশের সময় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং আসামী পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে  সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৭টি অভিযোগ এনেছিল। এর মধ্যে তাকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং আরেকটি অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।   অপর দুটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয় ট্রাইব্যুনালের রায়ে।

ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ট্রাইব্যুনাল-২ মিলিয়ে এ পর্যন্ত দেয়া ৯টি মামলার রায়ের  মধ্যে দুটি মামলার আপিল আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। এ দুটি হল জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা ও নায়েবে আমির  মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী । আপিল বিভাগের রায়ের পর গত ১২ ডিসেম্বর আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন শুনানী গত ১৬ এপিল শেষ হয় এবং রায় অপেক্ষমান রাখা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ৯ মে, ২০১৩

এটি একটি ন্যায়ভ্রষ্ট রায়-ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক


মেহেদী হাসান, ৯/৫/২০১৩
মুহম্মদদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায়কে ন্যায়ভ্রষ্ট রায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, এ রায়ে আমরা স্তব্ধ, বিস্মিত এবং শঙ্কিত। প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড তো দূরে থাকÑ কোনরূপ সাজা দেয়ারই কোনো সুযোগ নেই বলে আমরা মনে করি। সম্পূর্ণ মিথ্যার ওপর এই মামলাটি দাঁড়িয়ে আছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মুহম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষনার পর নিজ বাসভবনে সংবাদ মাধ্যমের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিকৃয়ায় তিনি আসামী পক্ষ থেকে একথা বলেন।

প্রেস ব্রিফিংয়ে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, স্বীকৃত মতে ১৯৭১ সালে কামারুজ্জামান ছিল একজন ১৯ বছরের  তরুণ। নুরেমবার্গ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যুদ্ধপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাদের যত বিচার হয়েছে তার কোথাও এরকম একজন তরুণকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। নুরেমবার্গ থেকে শুরু করে পরবর্তী ৭টি প্রধান যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের কোথাও এরকম একজন তরুণের কাঁধে এ ধরনের মারাত্মক অপরাধের দায় চাপানো হয়েছিল, তার কোনো নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। যুদ্ধাপরাদের বিচারের ইতিহাসে এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা।
আমরা মনে করি কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে দায় চাপানোর একমাত্র কারণ হচ্ছে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতা এবং এসিসটেন্ট সেক্রেটারি জেনারেল।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ রায়ে আমরা শোকস্তব্ধ, বিস্মিত এবং আতঙ্কিত। প্রসিকিউশন স্পষ্টতই এ মামলা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ মামলার তারকা চিহ্নিত সাক্ষী মোহন মুন্সি তার জবানবন্দির বিভিন্ন অংশে স্ববিরোধী বক্তব্য প্রদান করে আলোচিত হয়েছেন। তিনি তার জবানবন্দিতে সোহাগপুর হত্যাকাণ্ড ও গোলাম মোস্তফা হত্যাকাণ্ডের ৩টি ভিন্ন ভিন্ন তারিখ উল্লেখ করেছেন। প্রসিকিউশনের সাক্ষিরা এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যা এমনকি ট্রাইব্যুনালের বিচারকগণও অসম্ভব বলে মনে করেছেন। সাক্ষীরা এক দিকে বলেছে ওই সময় কামারুজ্জামান ছিল একজন তরুণ অন্য দিকে তারা বলেছে তিনি পাকিস্তান আর্মি অফিসারদেরকে নির্দেশ দিতেন এবং নিয়ন্ত্রণ করতেন, যা আধুনিক যুগের সামরিক নেতৃত্বের কাঠামোর মধ্যে অসম্ভব ব্যাপার। সেনাবাহিনীর মেজর, কর্নেল, বিগ্রেডিয়ার জেনারেলরা ১৯ বছরের একজন ছাত্রের নির্দেশ মেনে চলত এটা কি করে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে?

তিনি বলেন,  প্রসিকিউশনের কিছু সাক্ষি তাদের নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেছেন অথচ তথ্য প্রমাণে তারা যে “ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা” তা প্রমাণিত হয়েছে এবং একই সাথে তাদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ততার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়েছে। সরকার পক্ষের প্রতিটি সাক্ষী একইভাবে বিতর্কিত এবং অবিশ্বাসযোগ্য। উপরন্তু প্রসিকিউমন পক্ষের মামলা ব্যাপকভাবে শোনা সাক্ষীর ওপর নির্ভরশীল।  প্রমাণ্য অন্যান্য তথ্যাদি ছাড়া এই ধরনের শোনা সাক্ষী  নির্ভর মামলা প্রসিকিউশন অভিযোগের অসারতা ও দুর্বলতা প্রমাণ করে। এটা মেনে নেয়া কষ্টকর যে একটি আদালত এমন সব দুর্বল, স্ববিরোধী এবং অবিশ্বাসযোগ্য, শোনা  সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে সাজা প্রদান করতে পারে।
উপরন্তু এই মামলার পদ্ধতিগত ত্রুটি এই রায়কে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। প্রসিকিউশন পক্ষের ১৮ জন সাক্ষীকে সাক্ষ্য দেয়ার অনুমতি দেয়া হলেও আসামী পক্ষের সাক্ষী সংখ্যা ৫ জনে বেধে দেয়া হয়। তদন্ত সংস্থা এবং প্রসিকিউশন দেড় বছর সময় নিয়ে এই মামলাটি সাজিয়েছিল অথচ ডিফেন্স পক্ষকে তাদের মামলার প্রস্তুতি এবং জবাব দেয়ার জন্য সময় দেয়া হয় মাত্র ৪ সপ্তাহ। ট্রাইব্যুনাল জোরপূর্বক প্রসিকিউশন পক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার জেরা মাঝ পথে থামিয়ে দিয়েছিলেন।
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে নেয়ার আদেশ প্রদান করেছিলেন বহুল আলোচিত বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে গঠিত একটি বেঞ্চ যার সততা ও নিরপেক্ষতা আমার দেশ ও ইকোনমিস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত স্কাইপ   কেলেঙ্কারির কারণে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। স্কাইপ কেলেঙ্কারির দায় নিয়ে বিচারপতি নিজামুল হক তার পদ থেকে সরে দাড়ানোর পর এ মামলা আর কোনমতেই চলতে পারেনা।

তিনি বলেন, আসামী পক্ষ মনে করে প্রসিকিউশনের উপস্থাপতি সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কখনই এরকম রায় হতে পারে না। এটা একটা ন্যায়ভ্রষ্ট রায়।  এ রায়টি দেশের সুপ্রীম কোর্টের রায়ের মানের অনেক নিইে শুধুই নয়  বরং এই ধরনের অপরাধের জন্য প্রতিষ্ঠিত যেকোনো আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের মানেরও  অনেক নিচে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য আমাদের হাতে অনেক শক্তিশালী কারণ এবং গ্রাউন্ড রয়েছে। তাই আমরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।

প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্যান্যের মধ্যে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম উপস্থিত ছিল।

কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড


মেহেদী হাসান ও হাবিবুর রহমান ৯/৫/২০১৩
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে জনাকৃর্ণ ট্রাইব্যুনাল কক্ষে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।

মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, অন্য দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং আরেকটি অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।  রাষ্ট্রপক্ষ আনীত সাতটি অভিযোগের মধ্যে অপর দুটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান,  সদস্য বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক মোঃ শাহিনুর ইসলাম বেলা সোয়া ১১টা থেকে দুপুর ২টা ৫ মিনিট পর্যন্ত প্রায় তিন ঘণ্টা সময় ধরে রায় ঘোষণা করেন।

রায় ঘোষণার পরপরই  কাঠগড়ায় থাকা  মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্যে বলেন, এটা রং জাজম্যান্ট।  ইতিহাস কাউকে মা করবে না ।  সবাইকে একদিন কাঠগড়ায় দাড়াতে হবে।

মুহম্মদ কামারুজ্জামানকে যেসব অভিযোগে সাজা প্রদান করা হয়েছে সেগুলো সবই মুলত উর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ে প্রদান করা হয়েছে । এসব অপরাধ তার জ্ঞাতসারে সংঘটিত হওয়া, অপরাধের সাথে তার যোগসাজস, সহযোগিতার বিষয়টি রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক  অভিযোগের সাথে সরাসরি  তার  সংশ্লিষ্টতা ছিলনা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে  ইসলামীর  মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অবস্থান এবং কর্মকান্ডের বিষয়ে দীর্ঘ কলেবরে বর্ননা করা হয়েছে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রদত্ত রায়ে। সে সমেয় জামায়াতের বিভিন্ন কর্মকান্ডও তুলে ধরা  হয়েছে।

রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা বা এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রায় ঘোষনার পর তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, জাতি আজ সস্তি পেয়েছে। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অপর দিকে আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার  আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন এটা একটা ন্যায়ভ্রষ্ট রায়।

মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রায় ঘোষনা উপলক্ষে গতকাল ট্রাইব্যুনালে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সকাল থেকেই ট্রাইব্যুনালের সামনে ভিড় করতে থাকেন সাংবাদিক এবং বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সময় সোচ্চার ভূমিকায় অবর্তীন ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতা কর্মীরা। আদালতের কার্যক্রম   শুরুর আগেই ট্রাইব্যুনালের সামনে ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতাকর্মীরা। রায় ঘোষনার পর তারা উল্লাস প্রকাশ করেন।

যে দুই অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড: কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগের মধ্যে সোহাগপুর হত্যাকাণ্ড ও গোলাম মোস্তফা হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। 
সোহাগপুর হত্যাকাণ্ড: ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই আলবদর ও রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। এঘটনায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আনা এই অভিযোগে কামারুজ্জামান কামারুজ্জামানকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করে।
গোলাম মোস্তফা হত্যা: ১৯৭১ সালের ২৩ আগস্ট আলবদর সদস্যরা গোলাম মোস্তফাকে ধরে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে আল-বদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায়ও কামারুজ্জামানকে অভিযুক্ত করে শাস্তি প্রদান করা হয়। সোহাগপুর হত্যাকাণ্ড ও গোলাম মোস্তফা হত্যার ঘটনায় কামারুজ্জামানকে দোষী প্রমাণিত করে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেন ট্রাইব্যুনাল।

দুই অভিযোগে যাবজ্জীবন: মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে বদিউজ্জামান ও দারাসহ অজ্ঞাত ছয়জন হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে।
 বদিউজ্জামান হত্যা: ১৯৭১ সালের ২৯ জুন সকালে শেরপুরের ঝিনাইগাতী থানার রামনগর গ্রামের আহম্মেদ মেম্বারের বাড়ি থেকে বদিউজ্জামানকে অপহরণ করে নির্যাতন করে পরদিন হত্যা করা হয়। কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লখ করা হয়।
 দারাসহ অজ্ঞাত ছয়জন হত্যা: মুক্তিযুদ্ধকালে ২৭ রমজান ময়মনসিংহের গোলাপজান রোডের টেপা মিয়া ও তার বড় ছেলে জহুরুল ইসলাম দারাকে ধরে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় আলবদর ক্যাম্পে নেয়া হয়। পরদিন ওই দু’জনসহ সাতজনকে আলবদররা গুলি করলে টেপা মিয়ার পায়ে লাগে। তিনি পালাতে সম হন। অন্য ছয়জনকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায়ও কামারুজ্জামানে বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
এক অভিযোগে ১০ বছর সাজা: প্রিন্সিপাল হান্নানকে নির্যাতনের ঘটনায় কামারুজ্জামানকে ১০ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে।  মুক্তিযুদ্ধে সময় শেরপুর কলেজের অধ্য সৈয়দ আবদুল হান্নানকে মাথা ন্যাড়া করে চুনকালি মাখিয়ে পুরো শহর ঘোরানো হয়। এঘটনায় কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। 
দুই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি: রায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আনা পাঁচ ও ছয় নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি উল্লেখ করে কামারুজ্জামানকে ওই দুই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়।
কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় শেরপুরের চকবাজার থেকে লিয়াকত আলী ও মুজিবুর রহমানকে অপহরণ করে বাঁথিয়া ভবনের রাজাকার ক্যাম্পে নির্যাতনের পর থানায় চার দিন আটকে রাখা হয়। এ ঘটনায় কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে আলবদর সদস্যরা টুনু ও জাহাঙ্গীরকে ময়মনসিংহের জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। টুনুকে সেখানে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। জাহাঙ্গীরকে পরে ছেড়ে দেয়া হয়। এ দু’টি অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় কামারুজ্জামানকে এর থেকে খালাস দেয়া হয়েছে।
রং জাজমেন্ট, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না: রায় ঘোষণার পুরো সময় মুহাম্মদ কামারুজ্জামান শান্ত ছিলেন। তিনি ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় বসে রায় শোনেন। রায় ঘোষণা শেষ হওয়ার সাথে সাথে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বলেন, ‘রং জাজমেন্ট, রং জাজমেন্ট (এটা অবিচার ও অনায্য রায়)। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না। সবাইকে একদিন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। এর পরই পুলিশ কামারুজ্জামানকে কাঠগড়া থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়।
হরতালের কারণে কামারুজ্জামানের পক্ষে সিনিয়র কোন ডিফেন্স আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হননি। ছয় বা সাতজন জুনিয়র আইনজীবী রায়ের উপস্থিত ছিলেন।
তবে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, প্রসিকিউশনের সদস্য, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতা সদস্যরা ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পর প্রসিকিউটরা পরস্পর কোল্লাকুলি করেন। ট্রাইব্যুনালের বাইরে এসে অনেকে শ্লোগান দেয়। এসময় বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল তাদের লাইভ মন্তব্য প্রচার করে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবার বয়স ছিল ১৮ বছর, তিনি এইচএসসির ছাত্র ছিলেন: কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন বড় ছেলে হাসান ইকবাল। রায়ের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ’৭১ সালে আমার বাবার বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি তখন এইচএসসির ছাত্র ছিলেন। যুদ্ধের সময় তিনি বাড়িতে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে তিনি ছাত্রসংঘের রাজনীতি করেন। রায়ে তাকে বলা হয়েছে তিনি পুরো ময়মনসিংহ অঞ্চলের আল-বদরের চীফ ছিলেন। তার বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি প্রমাণ হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রিন্সিপাল হান্নান জিবিত আছেন। তার সাক্ষ্য না নিয়েই আদালত তাকে নির্যাতনের মামলায় বাবাকে ১০ বছর সাজা দিয়েছে। বদিউজ্জামান হত্যার ঘটনায় তার পরিবার একটি মামলা করেছে, সেখানে তো বাবার নাম নেই। ওই অভিযোগেও তাকে সাজা দেয়া হয়েছে। এখানে রাষ্ট্রপক্ষ যেভাবে বলেছে রায়ে সেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা বিচার পায়নি। এই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা অপিল করব।
অন্যদিকে রায় ঘোষনার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এ রায়ে আমরা সস্তি প্রকাশ করছি। আমরা মনে করি, এর মাধ্যমে একাত্তর সালে জামায়াতে ইসলাম ও তাদের সহযোগী বাহিনী আলবদর, আল শামস, শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনীর ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের চতুর্থ ও তৃতীয় ফাঁসির রায়: গত ২১ জানুয়ারি মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন একই ট্রাইব্যুনাল। গত ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা করে। সব মিলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ এর এটি চতুর্থ রায়। আর কামারুজ্জামানের রায় ঘোষণার মধ্যদিয়ে ট্রাইব্যুনাল তৃতীয় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করল।
এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের মামলার শেষ ধাপে গত ১৭ এপ্রিল যুক্তি উপস্থাপন সমাপ্ত ঘোষণা করে রায়ের জন্য রাখেন ট্রাইব্যুনাল-১।

নজিরবিহীন  নিরাপত্তাবলয়: মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালের চারপাশে গতকাল সকাল থেকে নিরাপত্তাবলয় সৃষ্টি করা হয়। ট্রাইব্যুনালের ভিতরে ও বাইরে নিয়োগ করা হয় বিপুল সংখ্যক সশস্ত্রর‌্যাব-পুলিশের পাশাপাশি এলিট ফোর্স। হাইকোর্ট সংলগ্ন কদমফোয়ারা এলাকা পুলিশের গাড়ি দিয়ে ব্যরিগেট সৃষ্টি করে ট্রাইব্যুনালমুখী সব যানবহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। শিক্ষাভবনের বিপরীতপাশে সশস্র র‌্যাব সদস্য নিয়োগ করা হয়। হাইকোর্টের মাজারগেটে ম্যাশিনগান স্থাপন করা হয়। এখানে ভারি অস্ত্র নিয়ে বিপুল সংখ্যাক পুলিশ, র‌্যাব, ডিবি ও গোয়েন্দা সদস্যরা অবস্থান নেয়।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ট্রাইব্যুনালের মূল প্রবেশপথ সুপ্রিমকোর্টের গেটে অবস্থান নেয় সোয়াত বাহিনীর সদস্যরা। আর র‌্যাব-পুলিশ সদস্যরা শিশু একাডেমীর সামনে দিয়ে ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় গেটসহ সংলগ্ন এলাকা, শিা ভবন, কদম ফোয়ারা, পুরোনো হাইকোর্ট ও দোয়েল চত্ত্বরসহ পুরো এলাকায় অবস্থান করে।
জানা গেছে, ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় ১০ প্লাটুন পুলিশ, র‌্যাব ও আর্মড ফোর্স মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলও। ট্রাইব্যুনালের ভেতর ও বাইরে ৫০টির বেশি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

মামলার বিবারণ: গত ১৬ এপ্রিল কামারুজ্জামানের মামলার শেষ ধাপে রাষ্ট্র ও আসামী পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন সমাপ্ত করে রায়ের জন্য অপেমাণ (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত বুধবার রায়ের তারিখ ঘোষণা করা হয়।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগের পুলিশের দায়ের করা মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।
২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় রাষ্ট্রপক্ষ। ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে পুনরায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। গত বছরের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-১।
এরপর ১৬ এপ্রিল কামারুজ্জামানের মামলাটি প্রথম ট্রাইব্যুনাল থেকে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ১৬ মে আসামিপ এবং ২০ মে রাষ্ট্রপরে আইনজীবীরা কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করেন।
গত বছরের ৪ জুন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে হত্যা, নির্যাতন, দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) আব্দুর রাজ্জাক খানসহ রাষ্ট্রপরে মোট ১৮ জন সাী স্যা দেন।
অন্যদিকে কামারুজ্জামানের পে গত ৬ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত মোট ৫ জন ডিফেন্স সাী স্যা দিয়েছেন। তারা হচ্ছেন মোঃ আরশেদ আলী, আশকর আলী, কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল, বড় ভাই কফিল উদ্দিন এবং আব্দুর রহিম। তাদের জেরা সম্পন্ন করেছেন রাষ্ট্রপ।
গত ২৪ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত এবং ১৬ এপ্রিল ৫ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে ৩ থেকে ১৬ এপ্রিল ৪ কার্যদিবসে আসামিপে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন কামারুজ্জামানের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী।

মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের পরিচিতি: নাম মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। পিতার নাম মরহুম ইনসান আলী সরকার। স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- কুমড়ী মুদিপাড়া, ইউনিয়ন- বাজিতাখিলা, থানা ও জেলা- শেরপুর। বর্তমান ঠিকানা, বাড়ী-১০৫, রোড-৪, ব্লক-এফ, সেকশন-১১, সাংবাদিক আবাসিক এলাকা, পল্লবী।  কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে কামারুজ্জামান জিকে স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন। তারপর জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে আইএসসি’তে ভর্তি হন। ১৯৭২ সালে কামারুজ্জামান নাসিরাবাদ কলেজে থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে ২য় বিভাগে পাশ করে। কামারুজ্জামান ঢাকা কিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে এমএ পাস করেন। তিনি সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সম্পাদক। কামারুজ্জামান বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল  ।




বুধবার, ৮ মে, ২০১৩

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলার রায় আগামীকাল//মাওলানা ইউসুফ’র বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিল//এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে ৩০ জুনের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ


মেহেদী হাসান, ৮/৫/২০১৩, বুধবার, ঢাকা :

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সম্পর্কিত মামলার রায় আগামীকাল প্রদান করা হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আজ রায়ের এ তারিখ ঘোষনা করেন।

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে সাত অভিযোগ:
১. বদিউজ্জামান হত্যা: ১৯৭১ সালের ২৯ জুন সকালে শেরপুরের ঝিনাইগাতী থানার রামনগর গ্রামের আহম্মেদ মেম্বারের বাড়ি থেকে বদিউজ্জামানকে অপহরণ করে নির্যাতন করে পরদিন হত্যা করা হয়। এঘটনায় কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়।
২. প্রিন্সিপাল হান্নানকে নির্যাদন: মুক্তিযুদ্ধে সময় শেরপুর কলেজের অধ্য সৈয়দ আবদুল হান্নানকে মাথা ন্যাড়া করে চুনকালি মাখিয়ে পুরো শহর ঘোরানো হয়। এঘটনায়ও কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়।
৩. সোহাগপুর গণহত্যা: ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই আলবদর ও রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং নারীদের ধর্ষণ করে। এঘটনায় জড়িত উল্লেখ করে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়।
৪. গোলাম মোস্তফা হত্যা: ১৯৭১ সালের ২৩ আগস্ট আলবদর সদস্যরা গোলাম মোস্তফাকে ধরে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে আল-বদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়।
৫. লিয়াকত-মুজিবুরসহ অজ্ঞাত ৮ জনকে হত্যা: মুক্তিযুদ্ধকালে রমজান মাসের মাঝামাঝি সময়ে শেরপুরের চকবাজার থেকে লিয়াকত আলী ও মুজিবুর রহমানকে অপহরণ করে বাঁথিয়া ভবনের রাজাকার ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। পরে দু’জনসহ ১৩ জনকে ঝিনাইগাতীর আহম্মেদনগর সেনা ক্যাম্পে পাঠানো হয়। পাকিস্তান আর্মিরা লিয়াকত, মুজিবুরসহ ৮ জনকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনায়ও কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়।
৬. টুনু হত্যা: ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে টুনু ও জাহাঙ্গীরকে ময়মনসিংহের জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে টুনুকে সেখানে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। জাহাঙ্গীরকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। এঘটনায় কামারুজ্জামানকে অভিযুক্ত করা হয়।
৭. দারাসহ ছয় হত্যা: মুক্তিযুদ্ধকালে ২৭ রমজান ময়মনসিংহের গোলাপজান রোডের টেপা মিয়া ও তার বড় ছেলে জহুরুল ইসলাম দারাকে ধরে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় আলবদর ক্যাম্পে নেয়া হয়।  পরদিন ওই দু’জনসহ সাতজনকে আলবদররা গুলি করলে টেপা মিয়ার পায়ে লাগে। তিনি পালাতে সম হন। অন্য ছয়জনকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায়ও কামারুজ্জামানকে অভিযুক্ত করা হয়।

মামলার বিবারণ: ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগের পুলিশের দায়ের করা মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।
২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় রাষ্ট্রপক্ষ। ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে পুনরায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। গত বছরের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-১।
এরপর ১৬ এপ্রিল কামারুজ্জামানের মামলাটি প্রথম ট্রাইব্যুনাল থেকে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ১৬ মে আসামিপ এবং ২০ মে রাষ্ট্রপরে আইনজীবীরা কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করেন।
গত বছরের ৪ জুন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে হত্যা, নির্যাতন, দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) আব্দুর রাজ্জাক খানসহ রাষ্ট্রপরে মোট ১৮ জন সাী স্যা দেন।
অন্যদিকে কামারুজ্জামানের পে গত ৬ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত মোট ৫ জন ডিফেন্স সাী স্যা দিয়েছেন। তারা হচ্ছেন মোঃ আরশেদ আলী, আশকর আলী, কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল, বড় ভাই কফিল উদ্দিন এবং আব্দুর রহিম। তাদের জেরা সম্পন্ন করেছেন রাষ্ট্রপ।
গত ২৪ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত এবং ১৬ এপ্রিল ৫ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে ৩ থেকে ১৬ এপ্রিল ৪ কার্যদিবসে আসামিপে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন কামারুজ্জামানের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী।


মাওলানা ইউসুফ’র বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিল :
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা একেএম ইউসুফ এর বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। রাষ্ট্রপক্ষ (প্রসিকিউশন) থেকে today  ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার এর কাছে ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠ^ানিক অভিযোগ  জমা দেয়া হয়েছে।

ফরমাল চার্জে মাওলানা ইউসুফের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্মান্তরকরন, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ১৫ ধরনের অভিযোগ  আনা হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী ফরমাল চার্জ দাখিলের পর   এটি আমলে নেয়া হবে কি-না সে বিষয়ে আদেশ দিবেন ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগ আমলে নেয়া হলে  চার্জ গঠনের জন্য শুনানীর দিন ধার্য্য করা হবে। এরপর চার্জ গঠনের আদেশ দেয়া হবে।

এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে ৩০ জুনের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে  চূড়ান্ত তদন্ত  প্রতিবেদন বা ফরমাল চার্জ জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।   তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর আরো দুই মাস সময় চাওয়া হয়। এ প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল ৩০ জুনের মধ্যে ফরমাল চার্জ দাখিলের নির্দেশ দেন।

ট্রাইব্যুনাল সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এবং বিচারপতি আনোয়ারুল হক গতকাল এ তারিখ নির্ধারন করে আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির  অনুপস্থিত ছিলেন।

গত বছর ২২ আগস্ট এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১  গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর  ওইদিনই তাকে  তাকে তার মগবাজারস্থ বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। সেই থেকে তিনি বন্দী রয়েছেন। গতকাল তাকে ট্রাইব্যুনালের হাজত খানায়  আনা হয় তবে বিচার কক্ষে হাজির করা হয়নি।

মঙ্গলবার, ২ অক্টোবর, ২০১২

ঘটনার তিন দিন পর এলাকার মুরব্বীদের কাছে জানতে পারি কামারুজ্জামানসহ অন্যান্য রাজাকাররা গ্রামে হত্যাযজ্ঞ চালায়।




১/১০/২০১২
জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে দশম সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়েছে আজ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়।

জবানবন্দী :
আমার নাম জালাল উদ্দিন। বয়স ৬২ বছর। গ্রাম সোহাগপুর, উপজেলা নলিতাবাড়ি, জেলা শেরপুর।
১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই সকাল অনুমান সাতটা বা সাড়ে সাতটার দিকে পাকিস্তান  সেনা বাহিনীর সদস্যরা আলবদর, রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে সোহাগপুর গ্রামে ঢোকে। আমি তখন দৌড়িয়ে আড়ালে লুকিয়ে থাকি। তারপর প্রচন্ড গুলির শব্দ  শুনতে পাই। কিছুন পর গুলির শব্দ বন্ধ হলে বাহির হয়ে দেখি দুই জায়াগায় মোট ১৫টি লাশ পড়ে আছে। সেখানে আমার বাবা সফির উদ্দিন, আমার  জেঠা  কিতাব আলী, আমার মামাতো ভাই মোহম্মদ আলী, মমিন মিয়া, কটুম উদ্দিন, রেজাত আলী, ইমান আলীর লাশও ছিল। পরে গর্ত করে তাদের গনকবর দেই।

ঘটনার তিন দিন পর এলাকার লোকজনদের নিকট থেকে জানতে পারি ঘটনার দিন ২৪৫জন লোককে হত্যা করা হয়েছিল। গ্রামের মুরব্বিরা জানায়, বকা বুড়া, নসা, কাদির ডাক্তার এরা রাজাকার ছিল। এদের প্রধান ছিলেন কামারুজ্জামান। তারা পাক সেনাদের নিয়ে এসে গ্রামে এই হত্যাযঞ্জ চালায়। কামারুজ্জামান শেরপুর জেলা ভিত্তিক একজন রাজাকারের নেতা ছিলেন। উনার কথায় রাজাকাররা উঠাবসা করতো।

১৯৭১ সালে সোহাগপুর গ্রামে আরো হত্যাকান্ড ঘটে। ওই গ্রামের কেদার নাথের বাড়ী আল-বদর, রাজাকাররা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং ওই বাড়ীর সর্বমোট ৫জনকে হত্যা করে তারা। শেরপুর জেলায় নলিতাবাড়ীতে আল-বদর, রাজাকার ও পাক সেনাদের একটি ক্যাম্প ছিল। শেরপুর ডাকবাংলোয় একটি ক্যাম্প ছিল। এই কামারুজ্জামান সাহেবকে একাত্তরের পর অনেক দেখেছি। তিনি অনেক মিটিং সমাবেশ করেছেন।         


বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১২

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অষ্টম সাক্ষীর জেরা///পিতার হত্যাকারীকে চেনা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা নেননি সাক্ষী।

১৯/৯/২০১২
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের অষ্টম সাক্ষী মো. জিয়াউল ইসলামের জেরা । সাক্ষী জবানবন্দীতে বলেছিলেন তার পিতা শহীদ নুরুল ইসলামকে ’৭১ সালে তৈয়ব ও রব্বানী নামে দুই আল-বদর সদস্য অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে আল-বদর সদস্যরা তাকে হত্যা করে। এ বিষয়ে জেরায় সাক্ষী বলেন, তৈয়ব ও রব্বানীকে আমি মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে চিনতাম। তাদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের পর দেখাও হয়েছে। তবে তৈয়ব ও রব্বানীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেইনি।

আন্তর্জাতক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ সাক্ষীকে জেরা করেন ডিফেন্স কাউন্সেল কফিল উদ্দিন চৌধুরী। তাকে সহায়তা করেন কামারুজ্জামানের আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক ও অ্যাডভোকেট শিশির মনির। জেরায় সাক্ষী স্বীকার করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার  বাবার দোকানের ডানদিকে ছিল রব্বানীর দোকান যে তার  বাবাকে ধরে আল-বদর ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিল।

জেরায় সাক্ষী স্বীকার করেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম অর্ন্তভুক্ত করে।  ৭২ হাজার ৭৫০ টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় এবং অবৈধভাবে বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগে সাক্ষী ও তার স্ত্রীর নামে বিদ্যুৎ বিভাগ ২০০৪ সালে মামলা করে।


জেরা (সংক্ষিপ্ত):
প্রশ্ন: ’৭১ সালে আপনার পিতাকে অপহরণকারী তৈয়ব ও রব্বানীকে চেনেন?
উত্তর: তৈয়ব ও রব্বানী নামে দুই আল-বদর সদস্যকে আমি মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে চিনতাম। তাদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের পর দেখাও হয়েছে।
প্রশ্ন: তৈয়ব ও রব্বানীর বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছেন?
উত্তর: নেইনি।
প্রশ্ন: ময়মনসিংহ জেলার আল-বদর কমান্ডার কে ছিলেন?
উত্তর: জানি না।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর আপনি যখন দেশে ফিরে আসেন তখন স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকায় কামারুজ্জামানের নাম পেয়েছেন?
উত্তর: তালিকা করা আমার দায়িত্ব নয়।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর থেকে (বর্তমান সরকার আসার আগ পর্যন্ত) পিতা হত্যার বিচার চেয়ে কামারুজ্জামানকে অভিযুক্ত করে কোথাও কোন অভিযোগ করেছেন কিনা?
উত্তর: পিতার হত্যার বিচার চেয়ে লিখিতভাবে কামারুজ্জামানকে অভিযুক্ত করে এই ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করেছি।
সাক্ষীর এ জবাবের পরই প্রসিকিউটর নুর জাহান বেগম মুক্তা বলতে থাকেন সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন তাকে-ই তিনি লিখিত অভিযোগ বলে মনে করেছেন। এ সময় জেরাকারী আইনজীবী কফিল উদ্দিন চৌধুরী প্রসিকিউশনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা এমন মন্তব্য করে ঠিক করেননি। আমি প্রশ্ন করার আগেই আপনারা জবাবটা দিয়ে দিচ্ছেন। ওই সময় ডিফেন্স কাউন্সেল ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক দাড়িঁয়ে ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মাই লর্ড  উনি (প্রসিকিউটর নুর জাহান মুক্তা) বারবারই এমন করেছেন, সাক্ষিকে উত্তর বলে দিচ্ছেন। এ সময় প্রসিকিউটর নুর জাহান মুক্তা আদালতকে বলেন,  সে আমকে চোখ রাঙিয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলেছেন। এ বিষয় নিয়ে কিছু সময়ের জন্য প্রসিকিউটর ও ডিফেন্সের সদস্যরা উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল উভয়পক্ষকে থামিয়ে দেন এবং পুনরায় জেরা শুরু হয়।

প্রশ্ন: আপনি কি এই মামলার  অভিযোগকারি? 
উত্তর: হ্যাঁ, এই মামলার অভিযোগকারী আমি নিজেই।
প্রশ্ন: ’৭১ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল তখন আপনার বাবার হত্যার মামলা (অভিযোগ) করেননি কেন?
উত্তর: সময় পাইনি। 
প্রশ্ন: আপনার যে বন্ধু আপনার বাবা হত্যার ঘটনা বলেছিলেন সেই বন্ধুর নাম কি?
উত্তর: ওই বন্ধুর নাম বলতে পারব না।
প্রশ্ন: ’৭১ সালে আপনি কখন ভারতে যান এবং কখন ফিরে আসেন?
উত্তর: ’৭১ সালের এপ্রিল মাসে আমি ভারতে যাই এবং ’৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ফিরে আসি।
প্রশ্ন: আপনি কত দিন বিস্ফোরক ট্রেনিং নেন?
উত্তর: তিন দিন।
প্রশ্ন: আপনি বিস্ফোরকের ট্রেনিং নেন বলেছেন, বিস্ফোরকের পাওয়ার কে কি বলা হয়?
উত্তর: বলতে পারব না।
প্রশ্ন: বিস্ফোরকের ট্রেনিং নেয়ার সময় আপনাদের ব্রিজের কোন অংশ বা কতটুকু উড়িয়ে দেয়ার কথা বলা হত?
উত্তর: অংশ বলতে পাব না, ব্রিজ উড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
এপর সাক্ষী বলেন, মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে এতো প্রশ্ন করলে বাবা হত্যার বিচার চাই না।
প্রশ্ন: বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহারের সময় সোজাসুজি না আড়াআড়ীভাবে বসাতেন?
উত্তর: ৪০ বছর পর সঠিক মনে নেই বিস্ফোরক সোজাসুজি না, আড়াআড়িভাবে বসাতে হত।
প্রশ্ন: কাজী মতিউর রমানকে চেনেন?
উত্তর: চিনি, তিনি আমার বন্ধু এবং তিনি ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন। 
প্রশ্ন: কাজী মতিউর রমানের মেয়েকে অপহরণেল অভিযোগে আপনার ও আপনার ছেলের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় কখন আপনার নাম অন্তর্ভূক্ত হয়েছে?
উত্তর: যখন থেকে তালিকা হয় তখন থেকে।
প্রশ্ন: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় আপনার নাম অর্ন্তভুক্ত করে।
উত্তর: সত্য।
প্রশ্ন: ময়মনসিংহ জেলা কমান্ডার নাজির উদ্দিন আহমেদসহ ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা ২০০৯ সালের ১১জুন মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ডে এক আবেদনে আপনাকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা গণ্য করে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে আপনার নাম কর্তনের আবেদন করেন।
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: ওই অভিযোগের উপর ভিত্তি করে মুক্তিযোদ্ধ কেন্দ্রীয় কমান্ড তালিকা (অভিযোগ) এর প্রথম পর্যায়ে আপনার নাম অন্তর্ভূক্ত করে।
উত্তর: অভিযোগ করেছে তবে এ বিষয়ে আমার জানা নেই।
প্রশ্ন: আপনি সব সময় আওয়ামী লীগ পন্থী ও বর্তমান আপনার এলাকার সংসদ সদস্য মতিউর রহমান আপনার চাচা হয়।
উত্তর: শতভাগ সত্য।
প্রশ্ন: আপনার পিতা হত্যার বিষয়ে স্বাধীনতার ৪২ বছর পর কামারুজ্জামানকে জড়িয়ে যেসব কথা বলেছেন তা মিথ্যা, ষড়যন্ত্রমূলক ও বানোয়াট।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনি যেহেতু একজন বিতর্কিত মুক্তিযোদ্ধা তাই  বিতর্ক থেকে নিজেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এমপির পরামর্শে এ মামলার আসামীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দিচ্ছেন।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: কামারুজ্জামান ’৭১ সালে আল-বদর স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন না, তিনি তখন এইচএসসির ছাত্র ছিলেন মাত্র।  
উত্তর: সত্য নয়।

রিপোটার : হাবিবুর রহমান

সোমবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১২

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সপ্তম সাক্ষী বলল যে কামারুজ্জামানের কথা বল্লাম সে কোন কামারুজ্জামান তা এমুহুর্তে বলতে পারব না।


(মিছবাহুর রহমানের নিউজটা একটু নিচের দিকে দেখেন দয়া করে। )

১৭/৯/২০১২
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আজ  রাষ্ট্রপক্ষে দুই জন সাক্ষী জবানবন্দী দিয়েছেন। তারা হলেন সপ্তম সাক্ষী মো. লিয়াকত আলী, অষ্টম সাক্ষী  সাক্ষী মো. জিয়াউল ইসলাম।

আজ  আন্তর্জাতক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ সপ্তম সাক্ষী মো. লিয়াকত আলী জবানবন্দীতে বলেন, ’৭১ সালে শেরপুর এলাকায় আল-বদর ও রাজাকারদের কর্মকান্ড এ মুহুর্তে বলতে পারব না। পকিস্তান আর্মিদের কাছ থেকে মুক্ত হওয়ার পর সামনে দেখি কামরান, পিছনে কামারুজ্জামানকে দেখি বলে মনে হল। যে কামারুজ্জামানের কথা বল্লাম সে কোন কামারুজ্জামান তা এমুহুর্তে বলতে পারব না।

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সপ্তম সাক্ষীর জবানবন্দী (সংক্ষিপ্ত):
সাক্ষী মো. লিয়াকত আলী জবানবন্দীতে বলেন, ’৭১ সালে ভারত থেকে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে শেরপুরের নালিতাবাড়িতে আসি। এরপর নালিতাবাড়িতে ঘেরাও এরমধ্যে পড়ে শেরপুরে চলে আসি। শেরপুরে যে বাড়িতে ছিলাম সেই বাড়ি আল-বদররা ঘেরাও করে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। আমার পিতার চেষ্টায় ইনেসপেক্টর কবির সাহেবের মাধ্যমে আমাকে পুলিশের হেফাজতে দেয়া হয়। এরপর দুইদিন থানায় থাকার পর আমার সাথে আরো দুইজনকে আহম্মদ নগর আর্মি ক্যাম্পে চালান দেয়। এরপর একদিন ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের পিছনে একটি গর্তের মধ্যে আমাদের দাঁড় করিয়ে একজন ক্যাপ্টেন কলমা পড়াতে বলেন। এরপর তিনি আমাদের গুলি করতে নির্দেশ দেন। এসময় মেজর রিয়াজ আসে এবং আমাদের তিনজনের নাম ধরে ডাকেন। আমরা গর্ত থেকে উঠে আসি। সেখান থেকে বেশ কিছু দুর আসার পর আমাদের চোখের বাধন খুলে দেয়। সামনে দেখি কামরান, পিছনে কামারুজ্জামানকে দেখি বলে মনে হল। তারপর আমরা চলে আসি। শেরপুর আসার পর দেশ স্বাধীন হয়।

এরপর প্রসিকিউটরের এক প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন, যে কামারুজ্জামানের কথা বললাম সে কোন কামারুজ্জামান তা এখন বলতে পারব না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ’৭১ সালে শেরপুরে আল-বদর রাজাকারদের কর্মকাণ্ড এই মুহুর্তে বলতে পারব না। জবানবন্দী দেয়ার পর সাক্ষী কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না করায় মাত্র ১০ মিনিটে আসামী পক্ষের জেরা শেষ হয়ে যায়।
সাক্ষীকে জেরা করেন, ডিফেন্স কাউন্সেল কফিল উদ্দিন চৌধুরী।

অষ্টম সাক্ষীর জবানবন্দী (সংক্ষিপ্ত):

জবানবন্দীতে রাষ্ট্রপক্ষের অষ্টম সাক্ষী মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আমার বাবার সঙ্গে কোন যোগাযোগ ছিল না। ১০ ডিসেম্বর ’৭১ আমরা ময়মনসিংহ শহর মুক্ত করি। শহরে যখন ঢুকি হালুয়াঘাটে এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়। সে আমাকে বলে তোর আব্বাকে পাকিস্তন সেনারা মেরে ফেলেছে। ময়মনসিংহে বাড়িতে এসে আমার মাকে বাবার কথা জিজ্ঞাসা করি। মা বলেন, ’৭১ সালের নভেম্বর মাসে ময়মনসিংহ কোতয়ালী থানার সম্মুখে অবস্থিত জেলাপুরষদের ডাকবংলোয় আল-বদর ক্যাম্পে বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। ময়মনসিংহ বড় মসজিদের ইমাম সাহেবের ছেলে আল-বদর তৈয়ব ও রব্বানী বাবাকে ধরে নিয়ে য়ায়। আমার আত্মীয় স্বজনরা বাবাকে ছাড়ানোর জন্য যোগাযোগ ও চেষ্টা করায় বাবাকে ছেড়ে দিবে বলে আমার পরিবারকে আশ্বাস্থ করা হয়। একপর্যায়ে ক্যাম্পে থাকা লোকজন বলে, তাকে ছাড়া যাবে না। কারণ কামারুজ্জামানের হুকুম নেই। ওই সময় পরিবারের সদস্যরা আল-বদর ক্যাম্পে যেতে ভয় পেত। ’৭১ সালের ২৩ সভেম্বর শহর থেকে পাঁচ মাইল দুরে খালের পাশে বাবাকেও সঙ্গে অন্য একজনকে যাকে অনেকে কেনেডী বলে ডাকত তাদের বেনেট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যা করে লাশ বদর বাহিনীর লোক খালের পাশে ফেলে আসে। পরদিন সকালে স্থানীয় লোকজন বাবার মৃতদেহ চিনতে পারে। তারা আমাদের বাড়িতে খবর দেয়। পরিবারের লোকজন আব্বার লাশ বাড়িতে নিয়ে আসে এবং পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের একটি চিঠি দেন এবং আর্থিক সহায়তা করেন। তখন মামলা করার সুযোগ না থাকায় ও সংসার তছনছ থাকায় মামলা করতে পারিনি।

জবানবন্দী শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর আসামী পক্ষের জেরার দিন ধার্য করেন।

সোমবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১২

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ষষ্ঠ সাক্ষীর জেরা শেষ:


10/9/2012
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ষষ্ঠ সাক্ষী ডা. হাসানুজ্জামানকে আসামী পক্ষের জেরা শেষ হয়েছে। আন্তর্জাতক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ গতকাল সাক্ষীকে জেরা করেন কামারুজ্জামানের আইনজীবী  কফিল উদ্দিন চৌধুরী। জেরা শেষে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সপ্তম সাক্ষীর জবানবন্দী দেয়ার দিন ধার্য করা হয়েছে। 
জেরা:
প্রশ্ন: স্বাধীনতার পরে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে দালাল আইনে মামলা হওয়া বা স্বাধীনতা বিরোধীদের যে তালিকা হয়েছিল তাতে কামারুজ্জামানের নাম অন্তর্ভূক্তি সংক্রান্ত কোন কাগজ আপনি আদালতে দেখাতে পারবেন?
উত্তর: আদালতে দেখাতে পারব না।
প্রশ্ন: কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আপনার বা আপনার পরিবারের দায়েরকৃত কোন অভিযোগের কাগজ আদালতে দেখাতে পারবেন?
উত্তর: কাগজ আমি দেখাতে পারব না।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর কামারুজ্জামান সাংবাদিকতা করেছেন এবং তিনি একজন জামায়াতে ইসলামীর নেতা?
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: আপনার ভাইকে পাকিস্তান আর্মির কাছে ধরিয়ে দিতে আপনার শ্বশুর গোষ্টির নিয়ন্ত্রিত রাজাকারা ভূমিকা রেখেছে জানতে পেরে পুনরায় ঝামেলায় জড়াবার আশঙ্কায় আপনার ভাইয়ের মৃত্য আপনাদের পরিবারের কেউ আনতে যায়নি।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: যেহেতু আপনার শ্বশুর গোষ্টির প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে আপনার ভাইকে হত্যা করানো হয়, সেজন্য তারও আপনার ভাইয়ের লাশ গ্রহণ করতে যায়নি?
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনি আপনার ভাইয়ের সঙ্গে বাড়িতে সময় কাটানোর জন্য দেশের বাড়িতে গিয়ে কতদিন ছিলেন?
উত্তর: মনে নেই।
প্রশ্ন: আপনি ’৭১ সালে গ্রামের বাড়িতে যেয়ে ভাইয়ের সাঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কথা জবানবন্দীতে বলেছেন এটা অসত্য। আপনি দ্বিতীয় শ্বশুর বাড়ি পুরান ঢাকার প্রতাপ সেন লেনের বাড়িতে থাকতেন, যেখানে সোহেলার সঙ্গে আপনার সম্পার্ক ছিল এবং যিনি পরে আপনার দ্বিতীয় স্ত্রী হয়।  
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: ’৭১ সালের ২৯ জুন আহমদ নগর স্কুল ক্যাম্পে আপনার ভাইয়ের রেকি করার জন্য আপনার শ্বশুর বাড়িতে যাওয়া, তাকে আল-বদর কর্তৃক ধরে নিয়ে যাওয়া যা আপনি চাচা শ্বশুর সৈয়দুর রহমান, মকবুল হোসেন ও ভায়রা জামশেদের কাছে শুনেছেন বলে জবানবন্দীতে বলেছেন তা অসত্য।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: প্রকৃত পক্ষে আপনার ভাই কোন দিন কোথায় কিভাবে মারা গেছেন তা আপনারা জানে না?
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার শালিকা রাশেদার বিয়ে হয় ১৯৬৯ সালে। 
উত্তর: হতে পারে। স্বাধীনতার আগে বিয়ে হয়।
প্রশ্ন: আপনার অপর শালিকা সাজেদার বিয়ে হয় ’৭১ সালে আপনার ভাই মারা যাওয়ার ৪/৫ মাস পরে।  
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: সাজেদার এখন তিন ছেলে ও দুই মেয়ে, বড় ছেলে উজ্জল বিবাহিত ও সিঙ্গাপুরে থাকে?
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: ’৭১ সালে কামারুজ্জামান আল-বদর বা স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন না। 
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: ’৭১ সালে কামারুজ্জামান এইচএসসির ছাত্র ছিলেন। 
উত্তর: হতে পারে।
প্রশ্ন: কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকাল্ডের সাথে জড়িত এমন অভিযোগ ছিল না, তিনি ’৭১ সালে এইচএসসির ছাত্র ছিলেন এবং নিজ এলাকায় ছিলেন। এরপর বিএ ও এমএ পাস করেন ও স্বাভাবিক জিবন যাপন করেন। 
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: কামারুজ্জামান একজন সাংবাদিক ও জামায়াত নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের দেশীয় স্বার্থ বিরোধী কর্মকাণ্ড ও অতি ভারতীয় নীতির বিরোধীতা করায় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধাপরাধের মামলা সৃষ্টি করা হয়েছে। 
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনি আওয়ামী লীগ ঘরনার লোক হিসেবে, আওয়ামী লীগের এই অন্যায় কর্মের সহযোগিতা করার জন্য মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: কামারুজ্জামান রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার ও নির্দোষ।
উত্তর: সত্য নয়।

দালাল আইনে গ্রেফতার হয় সাক্ষীর শ্বশুর/সাক্ষীর পরিবার এবং মাতৃকুলও স্বাধীনতা বিরোধী দাবী আইনজীবীর// সাক্ষীর বলেন সত্য নয়

৯/৯/২০১২
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ষষ্ঠ সাক্ষী ডা. হাসানুজ্জামানকে আজ দ্বিতীয় দফায় জেরা করা হয় ।  জেরায় সাক্ষী স্বীকার  করেন  তার শ্বশুর আহমদ আলী মেম্বার মুক্তিযুদ্ধের পর দালাল আইনে গ্রেফতার হয়ে জেলে গিয়েছিলন। সাক্ষীর পরিবার, শ্বশুর পক্ষ এবং নানার পরিবারের সবাই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানপন্থি ছিল এবং স্বাধীনতা বিরোধী ছিল বলে আসামী পক্ষের আইনজীবী দাবি করলে সাক্ষী বলেন, সবাই ছিল না ।  পরে বলেন এটা সত্য নয়।

এর আগে সাক্ষী জবানবন্দীতে  ১৯৭১ সালে নিহত তার ভাই বদিউজ্জামানকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আখ্যায়িত করলেও গতকাল জেরায় স্বীকার করেন সে  মুক্তিযোদ্ধ ছিল না।

জেরায় আইনজীবী বলেন, ’৭১ সালে সাক্ষী ডা. হাসানুজ্জামানের  শালিকা সাজেদা বেগমের সঙ্গে তার ভাই নিহত বদিউজ্জামানের সম্পর্ক ছিল। সাক্ষীর শ্বশুর বাড়ির কাছে আহমদনগর স্কুলে পাক আর্মি ক্যাম্প থাকায় বদিউজ্জামান সেনাবাহিনীর নজরে আসে এবং সেনাবাহিনী তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বদিউজ্জামান পাকিস্তান নৌ বাহিনীর সদস্য জানার পরে সেনা ক্যাম্পেই তাকে হত্যা করা হয়। এছাড়া বদিউজ্জামানের হত্যার পেছনে শ্বশুর পক্ষের হাত আছে এই ধারণায় সাক্ষী হাসানুজ্জামান দীর্ঘ ১২ বছর  শ্বশুর বাড়িতে যাননি। আসামিপক্ষের এসব প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন, এটা সত্য নয়।

আসামী পক্ষের আইনজীবী সাক্ষীকে  প্রশ্ন করেন, আপনার বৃদ্ধ বাবা মাকে এই মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আটকে রেখেছেন। এছাড়া কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দেয়া নিয়ে পারিবারিক বিরোধ হয় এবং সাক্ষীর দুই ভাই আসাদুজ্জামান ও আনিসুজ্জামান বাড়ী থেকে রাগ করে চলে যান। জবাবে সাক্ষী বলেন,  সত্য নয়।

আন্তর্জাতক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ সাক্ষীকে জেরা করেন মুহাম্মদ  কামারুজ্জামানের আইনজীবী  কফিল উদ্দিন চৌধুরী।


জেরা:
প্রশ্ন: কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দেয়া নিয়ে আপনাদের পরিবারে বিরোধ হয় এবং আপনার দুই ভাই আসাদুজ্জামান ও আনিসুজ্জামান বাড়ি থেকে রাগ করে চলে গেছেন। 
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার বৃদ্ধ বাবা মাকে এই মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আটকে রেখেছেন।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার শ্বশুর আহমদ আলী মেম্বর এলাকার একজন প্রভাবশালী মুসলীম লীগ নেতা ছিলেন।
উত্তর: জানিনা।
প্রশ্ন: আপনার শ্বশুর এলাকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন এবং তার পরিবারের উদ্যোগে আহমদ নগর স্কুলে পাকিস্তান আর্মি ক্যাম্প স্থাপন করে। 
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার চাচা শ্বশুর সৈয়দুর রহমান, মকবুল হোসেন, ভায়রা ভাই জামশেদসহ শ্বশুর পরিবারের সবাই পাকিস্তানপন্থি ছিল এবং স্বাধীনতা বিরোধী ছিল। 
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর আপনার শ্বশুর দালাল আইনে দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেলে ছিল। 
উত্তর: হতে পারে।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর আপনার চাচা শ্বশুর এবং ভায়রা ভাইসহ শ্বশুর পরিবারের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে পালাতক ছিল।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার চাচা সাইদুল হক?
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: আপনার চাচা এলাকার রাজাকার সংগঠক এবং রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন। 
উত্তর: আমি জানি না।
প্রশ্ন: আপনার চাচার বিরুদ্ধে দালালী আইনে মামলা হয় এবং স্বাধীনতার পর তিনি পালাতক ছিলেন। 
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: আপনার পুরো পরিবার ছিল পাকিস্তান পন্থী ও স্বাধীনতা বিরোধী?
উত্তর: পুরো পরিবার নয়।
প্রশ্ন: আপনার নানার পরিবারও স্বাধীনতা বিরোধী ছিল। 
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার ভাই ছুটিতে এসে আপনার শ্বশুর বাড়িতে বিভিন্ন অযুহাতে থাকতেন। 
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার শালিকা সাজেদা বেগমের সঙ্গে আপনার ভাই নিহত বদিউজ্জামানের সম্পর্ক ছিল। 
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার বিয়ে নিয়ে শ্বশুরের সঙ্গে প্রতারণা করার কারণে আপনার ভাইয়ের সঙ্গে শালিকার  সম্পর্ক সুনজরে দেখেননি আপনার শ্বশুরের পরিবার। 
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার ভাই বদিউজ্জামান দীর্ঘদিন আপনার শ্বশুর বাড়িতে থাকার কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নজরে আসে এবং পাক সেনাবাহিনী তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং অপনার ভাই পাকিস্তান নৌ বাহিনীর সদস্য জানার পর হত্যা করে। 
উত্তর: এটা সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার ভাই হত্যার পেছনে শ্বশুর পক্ষের হাত আছে এই ধারণা করে আপনি ও আপনার পরিবারের কেউ দীর্ঘ ১২ বছর শ্বশুর বাড়িতে যাননি।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার ভাই হত্যার জন্য কখন মামলা করেন?
উত্তর: স্বাধীনতার পর কোর্ট কাচারীর কাজ শুরু হলে।
প্রশ্ন: কোন থানায় মামলা করেন?
উত্তর: সম্ভবত নলিতাবাড়ী থানায় মামলা দায়ের করি।
প্রশ্ন: ওই মামলায় কতজনকে আসামী করেছেন?
উত্তর: ১১ জনকে।
প্রশ্ন: কামারুজ্জামান বাদে বাকী আসামীদের নাম ঠিকানা বলতে পারবেন?
উত্তর: পারব না। তারা কোন এলাকার তাও বলতে পারব না। 
প্রশ্ন: মামলা দায়েরের কতদিন পরে তার খোঁজ নিতে যান?
উত্তর: এক মাস পরে।
প্রশ্ন: যে কোর্টে গিয়েছিলেন তা জজ কোর্ট না ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট?
উত্তর: বলতে পারব না।
প্রশ্ন: আপনার দায়ের করা মামলা নম্বর কত ছিল?
উত্তর: বলতে পারব না।
প্রশ্ন: মামলার খোঁজ নিয়েছেন এর সমর্থনে ইনফরমেশন স্লিফ দেখাতে পারবেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: আপনার দায়েরকৃত মামলার খোজ না পাওয়ার পর আপনি পুনরায় অভিযোগ এনে আজ পর্যন্ত আপনি বা আপনার পরিবারের কোন সদস্য আপনার ভাই হত্যার অভিযোগে মামলা করেছেন?
উত্তর: না করিনি।
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন হওয়ার পর আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ ভাই হত্যার বিচার দাবি করে কোন আবেদন করেছেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের সময় কামারুজ্জামান কি করতেন?
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: যুদ্ধের সময় কামারুজ্জামান আপনাদের এলাকায় ছাত্র হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে না অন্যকোন পেশায় নিয়জিত ছিলেন কি না বলতে পারবেন?
উত্তর: বলতে পারব না কারণ আমি তখন ঢাকায় ছিলাম।
প্রশ্ন: আপনার ছোটভাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: আপনি এলাকার আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা এবং কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর পক্ষে কাজ করছেন।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: মতিয়া চৌধুরীর সাথে সুসম্পর্ক থাকায় তার পরামর্শে আপনি কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিচ্ছেন?
উত্তর: সত্য নয়।

শুক্রবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১২

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ সাক্ষীর পুনরায় জেরা

৬/৯/২০১২
জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে গত ৩/৯/২০১২ তারিখ  ষষ্ঠ সাক্ষী ডা. মো. হাসানুজ্জামান জবানবন্দী প্রদান করেন ট্রাইব্যুনাল-২ এ।  সেদিন তার আংশিক জেরা হয়।
আজ বৃহষ্পতিবার  সাক্ষী ডা. মো. হাসানুজ্জামানকে পুনরায়  জেরা  করেন আইনজীবী কফিল উদ্দিন চৌধুরী। আজকের জেরা এখানে তুলে  ধরা হল।

প্রশ্ন: আপনি দুই বিয়ে করেছেন?
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: প্রথম বিয়ে করেছেন কবে?
উত্তর: ১০ মে ১৯৬৮ ।
প্রশ্ন : স্ত্রীর নাম?
উত্তর :  নাম আছিয়া বেগম
প্রশ্ন : তিনি জীবিত আছেন বর্তমানে?
উত্তর : আছেন।
প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিয়ে কবে করেন এবং স্ত্রীর নাম কি?
উত্তর: ১৯৮২ নালে, স্ত্রীর নাম সোহেলা পারভিন।
প্রশ্ন : দ্বিতীয় স্ত্রীর বাপের বাড়ী কোথায়?
উত্তর : রাজধানীর পুরান ঢাকার প্রতাপ দাস লেনে।
প্রশ্ন: ডেন্টাল কলেজে পড়া অবস্থায় সোহেলা পারভিনদের বাড়িতে লজিং থাকতেন?
উত্তর: হ্যাঁ। জগন্নাথ কলেজে এইচএসসিতে পড়াকালীন সময় থেকে তাদের বাড়িতে লজিং থেকেছি।
প্রশ্ন: সোহেলা পারভিনদের বাড়িতে লজিং থাকাকালে তার সাথে সম্পর্ক ছিল এবং সোহেলা পারভিনের সাথে বিয়ের কথা হয়?
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: সোহেলা পারভিনের সাথে সম্পর্কের বিষয় গোপন করে প্রথম স্ত্রী আছিয়ার পিতার অর্থ বিত্তের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আছিয়াকে বিয়ে করেন?
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: ’৭১ সালে আপনার শ্বশুর বাড়ি আহমদ নগর গ্রামে কয়বার গিয়েছিলেন?
উত্তর: এক বারও যাইনি।
প্রশ্ন: আপনার প্রথম স্ত্রী তখন কোথায় থাকত? 
উত্তর: আমাদের বাড়িতে থাকত।
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার স্ত্রী একবারও বাপের বাড়িতে গিয়েছেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: যে ভাই মারা যান তিনি নৌ বাহিনীতে কবে যোগদেন?
উত্তর: ১৯৬৯ বা ’৭০ সালে।
প্রশ্ন: তিনি কবে ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন?
উত্তর: ’৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে।
প্রশ্ন: ২৯ জুন যেদিন আপনার ভাই আপনার শ্বশুরবাড়িতে যান সেদিন আপনি বাড়িতে ছিলেন?
উত্তর: আমি ও আমার স্ত্রী নানা বাড়িতে যাই।
প্রশ্ন: আপনার ভাই আপনার শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার বিষয় আপনাকে জানিয়ে ছিল?
উত্তর: আমার ছোটভাই কাউকে কিছু না বলে গোপনে আমার শ্বশুর বাড়িতে যায়।
প্রশ্ন: আপনার ভাই স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করছিলেন তা রাজাকার, আল-বদর বা সাধারণ মানুষ কেউ জানত?
উত্তর: জানি না।
প্রশ্ন: ২৯ জুন পর্যন্ত আপনার ভাই বাড়িতে থাকত না অন্য কোথাও থাকত?
উত্তর: বাড়িতে থাকত, মাঝে মধ্যে নানী বাড়িতে যেত।
প্রশ্ন: আপনার ভাই কোন সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ করেছে?
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: ২৯ জুনের আগে আপনার ভাই কয়টি ক্যাম্প রেকি করে?
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: আপনার ভাই কোন অপারেশনে গিয়েছিল কি না?
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: আপনাদের বাড়ি থেকে ভারতের মেঘালয় রাজ্য কত দূরে?
উত্তর: চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার হবে।
প্রশ্ন: আপনাদের পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধে যাননি?
উত্তর: আমাদের পরিবারের কেউ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যাননি।
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনাদের বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নি সংযোগ হয়নি?
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার শ্বশুর বাড়ি স্বাধীনতা বিরোধীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়নি?
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার শ্বশুর বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আসত?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের সময় এলাকায় সংগ্রাম পরিষদ হয়েছিল জানেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: আপনার এলাকার মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমান তালুকদারের নাম শুনেছেন?
উত্তর: শুনেছি।
প্রশ্ন: আপনার শ্বশুর বাড়ির লোকেরা যুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে না বিপক্ষে ছিল?
উত্তর: কোন পক্ষে ছিল না।
প্রশ্ন: আপনার নানা বাড়ির কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি?
উত্তর: হ্যাঁ।




মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১২

সাক্ষী বললেন কামারুজ্জামানকে চিনি না, কখনো দেখিওনি


৩/৯/২০১২
গতকাল সোমবার ৩/৯/২০১২ তারিখ  ট্রাইব্যুরাল-২ এ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে জবানবন্দী দেন ষষ্ঠ সাক্ষী ডা. মো. হাসানুজ্জামান। জবানবন্দীতে হাসানুজ্জামান বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে কামারুজ্জামানকে চিনি না এবং কখনো দেখিওনি, পত্রিকায় তার ছবি দেখেছি।

কামারুজ্জামানের আইনজীবী মোহাম্মদ কফিল উদ্দিন চৌধুরী সাক্ষীকে জেরা করেন।

অন্যদিকে ট্রাইব্যুরাল-২ এ গতকাল জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে নবম সাক্ষী মোঃ আমির হোসেন মোল্লাকে দ্বিতীয় দিনের মতো জেরা করা হয়। জেরায় সাক্ষী শিকার করেন হাইকোর্টের বিচারপতি এএফএম আলী আসগারের জমি দখল করার অভিযোগে গত ৪ এপ্রিল রাজধানীর পল্লবী থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন আছে। এছাড়া ৭০ এর নির্বাচনে মিরপুরের জামাতে ইসলামীর প্রার্থী গোলাম আযমের পক্ষে প্রচারণার জন্য আমির হোসেন মোল্লা ৭০ টাকা নেন মর্মে আসামী পক্ষের এক প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন এটা সত্য নয়। এ কাদের মোল্লার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান তরফদার সাক্ষীকে জেরা করেন।

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ সাক্ষীর জবানবন্দী (সংক্ষিপ্ত):
ষষ্ঠ সাক্ষী ডা. মো. হাসানুজ্জামান জবানবন্দীতে বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে কামারুজ্জামানকে চিনি না এবং দেখিওনি, পত্রপত্রিকায় তার ছবি দেখেছি। আমার শ্বশুরবাড়ী রামনগর গ্রামে আহমদ নগর স্কুলে পাকিস্তান বাহিনীর একটি বড় ক্যাম্প ছিল। ’৭১ সালের ২৯ জুন আমার ভাই বদিউজ্জামান সেই ক্যাম্প র‌্যাকি করার জন্য আমার শ্বশুর বাড়ি যান। অনুমানিক রাত ১১টায় ১০ বা ১১ জনের একটি দল আমার শ্বশুরের ঘরের সামনে ভাই ভাই বলে ডাকে। নিজেদের মুক্তিবাহিনীর লোক বলে পরিচয় দেয়। আমার ছোটভাই মুক্তিযোদ্ধ নাম শুনে অতিউৎসাহে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ও তাদের সঙ্গে কথা বলে। আমার ভাই তাদেরকে পাকিস্তান বাহিনীর ক্যাম্প দেখিয়ে দেয়। কিন্তু তারা ধমক দিয়ে আমার ভাইকে সঙ্গে নিয়ে যায়। তাকে সারা রাত অমানুসিক নির্যাতনের পর পরদিন সকালে ঝিনাইগাতী শেরপুর সড়কে দাঁড়করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। পাকিস্তান আর্মির সদস্যরা আমার ভাইয়ের লাশ টেনে হিচড়ে সড়কের পাশে একটি কাঠের পুলের নীচে পানিতে ফেলে দেয়। স্বাধীনতার পর আমি শ্বশুর বাড়িতে যাই। আমার চাচা শ্বশু সৈয়দুর রহমান আমাকে বলেছেন, সেই দিন তিনি কামারুজ্জামানকে চিনতে পেরেছেন।


জেরা:
প্রশ্ন: কামারুজ্জামানকে অভিযুক্ত করে আপনাদের পরিবারের কেউ মামলা করেছে এমন কোন কাগজ দেখাতে পারবেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: আপনার বাবা মা যে হত্যা মামলা করেছিলেন সেই মামলার কপি দেখেছেন?
উত্তর: কোন দিন দেখিনি।
প্রশ্ন: ওই মামলায় কামারুজ্জামানের নাম না থাকায় আপনি সত্য গোপন করার জন্য মামলার কাগজপত্রের কথঅ গোপন করছেন? 
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর আপনার এলাকার স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে? 
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর নয়ানীবাড়ীতে মুক্তিযোদ্ধ ক্যাম্প হয়েছিল এবং ওই ক্যাম্পে স্বাধীনতা বিরোধীদের লিস্ট করা হয়েছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল, আপনি জানেন?
উত্তর: জানি না। আমি বাজিদখিলা ক্যাম্প ছাড়া অন্য ক্যাম্পে কখনো যাইনি।
প্রশ্ন: মুক্তিযোদ্ধ এমদাদুল হক হিরার নাম শুনেছেন?
উত্তর: এমদাদুল হক হিরা নামে একজন মুক্তিযোদ্ধ সংগঠক ছিলেন।
প্রশ্ন: মুক্তিযোদ্ধা এমদাদুল হক হিরার বাড়ি লুটপাট করার অভিযোগে ১৫০ বা ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, জানেন?
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: ওই মামলায় কামারুজ্জামানের নাম না থাকায় আপনি মামলা সম্পার্কে না জানার কথা বলছেন?
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: পত্রিকার প্রতিবেদন এবং এলাকার মানুষ জানে কলেজে পরীক্ষা দেয়ার সময় আপনার ভাইকে পাকিস্তান আর্মিরা ধরে নিয়ে যায়। এ বিষয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে এবং এলাকার মানুষ আপনার ভাই সম্পার্কে এটাই জানে। এ বিষয়ে আপনি অসত্য বলছেন?
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার ভাই অপহরণ হওয়া সম্পার্কে যে সময় ও স্থানের কথা উল্লেখ করেছেন এবং কামারুজ্জামানের নির্দেশের কথা বলেছেন তা সত্য নয়। 
উত্তর: ইহা সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনার ভাইকে কোন দিন কোথা থেকে অপহরণ করা হয় তা আপনি জানেন না এজন্য অপহরণেল দিনের কথা বলতে পারেননি।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার সময় আপনার এলাকার চেয়ারম্যান কে ছিলেন?
উত্তর: বলতে পারব না।
প্রশ্ন: ’৭১ সালে আপনি যে স্কুলে পড়তেন সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক কে ছিলেন?
উত্তর: বলতে পারব না।
প্রশ্ন: আপনার বাবা মারা গেছেন কোন সালে?
উত্তর: এ মুহুর্তে মনে নেই।
প্রশ্ন: আপনার মা এসএসসি পাস করেছিলেন কি না বলতে পারবেন?
উত্তর: না, তবে তিনি পড়া লেখা করেছেন।
প্রশ্ন: কামারুজ্জামান স্বাধীনতা বিরোধী আল বদর রাজাকার কিছুই ছিলেন না।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর কামারুজ্জামান স্বাধীনভাবে চলাচল করেন এবং এলাকা থেকে ’৭২ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দেন?
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: যুদ্ধকালীন সময় কামারুজ্জামান গ্রামের বাড়িতে ছিলেন?
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনি আপনার ভাই হত্যা সম্পার্কে অসত্য বলছেন?
উত্তর: সত্য নয়।

আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে নবম সাক্ষী আমির হোসেন মোল্লাকে জেরা:
প্রশ্ন: আপনার বিরুদ্ধে হাইকোর্টের বিচারপতি এএফএম আলী আসগারের জমি দখল করার অভিযোগে দায়ের করা মামলা চলমান আছে?
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: বিচারপতি এএফএম আলী আসগারের জমি কি এখনো আপনার দখলে আছে?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: ওই সম্পত্তি আনবিক শক্তি কমিশন গৃহ নির্মাণ সমবায় সমিতির ৭৫ নং প্লট।
উত্তর: হ্যাঁ, আমি ওই সমিতির সভাপতি। 
প্রশ্ন: আপনি বাড়ি ও মসজিদ মাদ্রাসা করে অধিগ্রহণ করা জমি দখল করে আছেন?
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: ২০০১ সালের ১৪ ডিসেম্বর দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার সংবাদ প্রকাশিত হয়, আপনি এলাকায় লাটভাই হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত, কুখ্যাত চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, মাদকদ্রব্য ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী এবং বিশাল সরকারি সম্পত্তি দখলকারী মোল্লা বাহিনীর প্রধান আমির হোসেন মোল্লা। ওই সংবাদ দৈনিক আজকের কাগজেও প্রকাশিত হয়।
উত্তর: জানা নেই।
প্রশ্ন: একই তারিখে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায়, ‘অর্ধশত মামলার আসামী লাট ভাই গ্রেফতার’ শীর নামে সংবাদ প্রকাশিথ হয়।
উত্তর: হতে পারে। এসব সংবাদ করা হয়েছে আমাকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।
প্রশ্ন: আপনি এক সময় ওয়ার্ড কমিশনার ছিলেন?
উত্তর: ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের সময় আমাকে ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
প্রশ্ন: ২০০১ সালের ২১ এপ্রিল সফুরা হক আপনার বিরুদ্ধে জিডি করেন যে তৎকালিন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির লোক হয়ে তার জমি দখলে নেয়ার জন্য হুমকি দেন?
উত্তর: জিডির বিষয় জানি না। আমি কখনো বিএনপি করিনি।
প্রশ্ন: বিচারপতি এএফএম আলী আসগারের জমি দখল করার মামলায় কোন তারিখে জেলে যান?
উত্তর: মনে নেই।
প্রশ্ন: ’৭০ এর নির্বাচনে মিরপুর থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিলেন গোলাম আযম?
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: গোলাম আযমের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা করার জন্য ওই সময় ৫০ টাকা নিয়েছেন?
উত্তর: সত্য নয়।

আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী সাইদুর রহমানের জবানবন্দী:
বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষী মো. সাইদুর রহমান গতকাল ট্রাইব্যুনাল-এ আংশিক জবানবন্দী দিয়েছেন। আজ মঙ্গলবার আবার তার বাকি জবানবন্দী গ্রহণ করা হবে। জবানবন্দীতে সাইদুর রহমান বলেন, আক্কেলপুরের জাতীয় পরিষদ সদস্য মুজিবুর রহমান আক্কেলপুরীর নেতৃত্বে আমরা ২৬ মার্চ আক্কেলপুর সংগ্রাম পরিষদ গঠন করি। পাক বাহিনীর আক্রমণ থেকে নিজেদের রা করতে আমরা স্বাধীনতাকামী কিছু যুবককে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশিণ শুরু করি। আমরা বিভিন্ন এলাকা যেমন নওগাঁ ইপিআরের ব্যাটালিয়ান হেডকোয়ার্টারের কমান্ডার মেজর নাজমুল হক, বগুড়ার সংগ্রাম কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট গাজীউল এবং সৈয়দপুরের অবস্থিত থার্ড বেঙ্গলের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন আনোয়ারের সঙ্গে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি জানানোর জন্য আমরা সার্বনিক যোগাযোগ রাখতাম।