শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৩

আব্দুল কাদের মোল্লার রায় পর্যালোচনা


পর্যালোচনা১:
ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগমের জবানবন্দী এবং মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে রক্ষিত ডকুমেন্টে যা রয়েছে


মেহেদী হাসান
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যে দুটি  অভিযোগে  যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান  করা হয়েছে তার মধ্যে একটি অভিযোগ হল মিরপুরে কালাপানি লেনে হযরত আলী,  তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীকে হত্যা ও    মেয়েদের ধর্ষনের ঘটনা।
এ ঘটনায় বেঁচে যায় হযরতী আলী লস্করের   বড় মেয়ে মোমেনা বেগম। মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে এসে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন এ ঘটনা বিষয়ে । একই সাক্ষী মোমেনা বেগম তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং ধর্ষনের ঘটনা বিষয়ে ২০০৭ সালে মুক্তিযুদ্ধ যাদঘর কর্তৃপক্ষের কাছে জবানবন্দী দিয়েছেন। ট্রাইবু্যুনালে মোমেনা বেগম বলেছেন ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং ধর্ষনের ঘটনা দেখেছেন। তিনি নিজেও  লাঞ্ছনার শীকার হন এবং এক পর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন। অপর দিকে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে  কাছে  তিনি  ঘটনার বর্ননা দিয়ে বলেছেন ঘটনার দুই দিন আগে তিনি শশুরবাড়ি চলে যাওয়ায় প্রানে বেঁচে যান। কোর্টে তিনি বললেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন আর মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত বক্তব্যে দেখা যায় তিনি ঘটনার দুই দিন আগে শশুর বাড়ি চলে যান।
ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে (রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিচার পরিচালনা)  মোমেন বেগমের  সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় ট্রাইব্যুনালে।  ফলে সেসময় মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য সংবাদ মাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশিত হয়নি। তবে মোমেনা বেগম কোর্টে যে জবানবন্দী দিয়েছেন তা আব্দুল কাদের মোল্লার রায়ে  বর্ননা করা হয়েছে বিস্তারিতভাবে।

ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগমের  জবানবন্দীর উদ্ধৃতি দিয়ে রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঘটনা ঘটে। মোমেনা বেগমরা তখন মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের  ৫ নং কালাপানি লেনে ২১ নম্বর বাসায় থাকতেন। মোমেনা বেগম কোর্টে সাক্ষ্য দিয়ে  ঘটনা বিষয়ে বলেন, সন্ধ্যার সময় তার পিতা হযরত আলী হন্তদন্ত হয়ে  ঘরে আসলেন এবং  বললেন কাদের মোল্লা তাকে মেরে ফেলবে। কাদের মোল্লা এবং তার বিহারী সাগরেদ আক্তার গুন্ডা তার পিতাকে হত্যার জন্য ধাওয়া করছে। তার পিতা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এরপর তারা বাইরো বোমা ফাটাল। দরজা খোলার জন্য গালিগালাজ করল। তার মা দাও  হাতে নিয়ে দরজা খুলল। তারা ঘরে ঢুকে গুলি করে হত্যা করল তার মাকে। কাদের মোল্লা তার পিতাকে কলার ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গেল। তার সঙ্গীরা তার বোন খাদিজা এবং তাসলিমাকে জবাই করল। দুই বছরের ভাইকে আছড়িয়ে হত্যা করে।
মোমেনা জানায় সে এবং তার  ১১ বছর বয়স্ক অপর বোন আমেনা খটের নিচে আশ্রয় নেয় ঘটনার সময়। আমেনা ভয়ে চিৎকার দেয়ায় তাকে খটের নিচ থেকে টেনে বের করে জামাকাপড় ছিড়ে ফেলে এবং এক পর্যায়ে তার কান্না থেমে যায়।  এক পর্যায়ে তাকেও টেনে বের করে এবং ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এক পর্যায়ে সে জ্ঞান হারায় এবং জ্ঞান ফিরে পেটে প্রচন্ড ব্যর্থা অনুভব করে। তার পরনের প্যকণ্ট ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পান তিনি। পরে এক  ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং তাদের সেবার মাধ্যমে কিছুটা সুস্থ হন। পরে তার শশুর খবর পেয়ে তাকে এসে নিয়ে যান।
রয়ে মোমেনা বেগমের বরাদ দিয়ে তাদের পরিবারের ঘটনার    বর্ননা করা হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত চিত্র এটি।
মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত ডকুমেন্টে যা রয়েছে :
হযরত আলী হত্যাকান্ডসহ আরো অনেক হত্যাকান্ড বিষয়ে  শহীদ পরিবারের আত্মীয় স্বজনদের  সাক্ষাতকার,  লিখিত বক্তব্যের মূল কপি, অডিও ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। এছাড়া লিখিত  বক্তব্যের ডুপ্লিকেট কপি সংরক্ষিত আছে মিরপুর জল্লাদখানা যাদুঘরে।  মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত  পাম্প হাউজে  এনে ১৯৭১ সালে বিহারীরা বাঙ্গালীদের হত্যা করত। হত্যার পর তাদের লাশ ফেলে দিত পানির ট্যাংকি এবং পার্শবর্তী ডোবায়। ১৯৯০ দশকে  এখানকার বধ্যভূমিটি আবিষ্কার হয় এবং  অসংখ্য শহীদদের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এরপর পাম্প হাউজটিকে  জল্লাদখানা যাদুঘর করা হয় এবং এটি বর্তমানে মুুক্তিযুদ্ধ যাদু ঘরের অংশ।  জল্লাদখানায় ১৯৭১ সালে যাদের হত্যা করা হয়েছে যাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাদের পরিবারে অনেক আত্মীয় স্বজনকে খুঁজে বের করে বিভিন্ন  সময়ে তাদের সাক্ষাতকার  বক্তব্য রেকর্ড করে তা যাদুঘরে সংরক্ষন করে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ।
যে হযরত আলী হত্যাঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে সেই ঘটনার একটি বিবরন রক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে। হযরত আলীর বেঁচে যাওয়া একমাত্র মেয়ে মোমেনা বেগমের বরাত দিয়েই সে ঘটনার বর্ননা  লিপিবদ্ধ এবং সংরক্ষন করা হয়েছে।  মোমেনা বেগমের সাক্ষাতকার গ্রহনের মাধ্যমে এ ঘটনার বিবরন তারা সংগ্রহ করে।    মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে রক্ষিত সে ডকুমেন্টে  লেখা আছে ঘটনার দুই দিন আগে মোমেনা বেগম তার শশুর বাড়ি চলে যান।

হযরত আলী হত্যাকান্ড বিষয়ে তার মেয়ে মোমেনা বেগমের সাক্ষাতকার যাদুঘর কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে ২৮/৯/২০৭  তারিখ। তিনি তখন তাদের কাছে ঘটনার যে বিবরন দেন তা নিম্নরূপ।  ‘ঘটনার বিবরণ : ১৯৭১ সালে মিরপুরের কালাপানি এলাকায় বিহারিদের সঙ্গে কিছু বাঙালি পরিবারও বাস করতো। ৭ মার্চ এর পর থেকে দেশের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে কিছু কিছু বাঙালি পরিবার এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। অনেকের অন্যত্র যাওয়ার অবস্থা ছিল না ফলে এলাকায় রয়ে গেলেন। যে কয়েকটি পরিবার অন্যত্র যেতে পারলেন না তাদের মধ্যে একটি হযরত আলী লস্কর-এর পরিবার।
হযরত আলী লস্কর ছিলেন একজন দর্জি/খলিফা। মিরপুরেই তার দোকান ছিল। সকলে যখন এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন তখন হযরত আলী লস্করকেও তারা চলে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর যাওয়ার জায়গা ছিল না। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হয়ে গেলে ২৬ মার্চ সকাল সাতটার দিকে বিহারির হযরত আলী লস্কর-এর বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং তাকে ধরে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরই তারা তাঁর স্ত্রী, দুই কন্যা ও শিশু পুত্রকে ধরে নিয়ে যায় এবং সকলকে এক সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করে পাশের বাড়ির কুয়োতে সব লাশ ফেলে যায়। বিহারিরা তার দ্বিতীয় কন্যা আমেনা বেগমকে ঘরের ভতর সারাদিন আটকে রেখে ধর্ষণ করে। পরে তাকেও হত্যা করে সেই কুয়োতে ফেলে। হযরত আলীর বড় মেয়ে মোমেনা বেগম মাত্র দুইদিন আগে শ্বশুরবাড়িতে চলে যাওয়ায় একমাত্র সেই প্রানে বেঁচে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত আলী স্ত্রী সে সময় অন্তঃসত্বা ছিল।
কয়েকদিন পরই এ খবর হযরত আলীর বড় মেয়ে মোমেনা বেগম জানতে পারেন। কিন্তু মিরপুরের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে তিনি বাড়ি আসতে পারলেন না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজ বাড়িতে এসে তিনি আর কিছুই অবশিষ্ট পেলেন না। ভগ্নহৃদয়ে ফিরে গেলেন শ্বশুরবাড়িতে।”

রায়ের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে মোমেনা বেগম তার পিতামাতা এবং ভাইবোনকে হত্যার ঘটনাটি যে স্বচক্ষে দেখেছেন তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হয়েছে। তার বয়স ছিল তখন ১৩ বছর এবং অলৌকিকভাবে সে বেঁচে যায়। তাকে অবিশ্বাস করার কোন কারণ নেই। রায়ে মোমেনা বেগমের জবানবন্দী বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।


আসামী পক্ষ থেকে দৈনিক নয়া দিগন্তকে জানানো হয়েছে মোমেনা বেগমের যে জবানবন্দী মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে রক্ষিত রয়েছে তা  তারা ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছিলেন।  ট্রাইব্যুনাল তখন তা  নথিভুক্ত করে জানিয়েছিলেন বিষয়টি তারা রায়ের সময় বিবেচনা করবেন। তবে রায়ে এ ডকুমেন্ট বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। রায়ে আসামী পক্ষের দাবি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আসামী পক্ষ দাবি করেছে মোমেনা বেগম  হযরত আলী লস্করের মেয়ে নন। তিনি যে হযরত আলী রস্করের মেয়ে সে মর্মে রাষ্ট্রপক্ষ তা তিনি কোন  ডকুমেন্ট হাজির করেনি। তাছাড়া জেরায় আসামী পক্ষ মোমেনা বেগমের যেসব দুর্বল বিষয়    বরে করে আনে তাও উল্লেখ করা হয়নি রায়ে।
আসামী পক্ষ কর্তৃক মোমেনা বগমের জেরার পর্যালোচা করে রায়ে  বলা হয়েছে, জেরায় এক প্রশ্নের জবাবে মোমেনা বেগম জানান, পাকিস্তান আর্মি এবং বিহারীদের সাথে যে বাঙ্গালী এসেছিল তিনি বাংলায় কথা বলছিলেন এবং তার বাবার কলার ধরে যিনি  নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি হলে কাদের মোল্লা। তিনি   খাটের নিচে লুকিয়ে থেকে এ ঘটনা দেখেন। কাদের মোল্লা যে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তা এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে রায়ে মন্তব্য করা  হয়েছে।
রায়ে বলা হয়েছে মোমেনা বেগমের মা বাবা ভাই বোনকে কাদের মোল্লা নিজে হত্যা করেছে  চার্জে সে অভিযোগ করা হয়েছে বলে মনে হয়না। তবে রায়ে বলা হয়েছে কাদের মোল্লার উপস্থিতিতে, সহায়তায় এবং নৈতিক সমর্থনে এ হত্যার ঘটনা ঘটে। মানবতা বিরোধী এ ধরনের হত্যা ঘটনা  ব্যক্তি সরাসরি ঘটিয়েছে তা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন  হয়না।

রায়ে আরো বলা হয়েছে এ ঘটনায় একজনমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী   জীবিত সাক্ষী এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলেন মোমেনা বেগম। তার এভিডেন্সেকে পাশ কাটানো যায়না বা সন্দেহ পোশন করা যায়না।   

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মোট ছয়টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা  হয় এবং এর মধ্যে পাঁচটি অভিযোগে কারাদান্ড প্রদান করা হয় আব্দুল কাদের মোল্লাকে।  দুটি   হযরত আলী হত্যা ঘটনাটি ছিয় ছয় নম্বর অভিযোগ এবং এ অভিযোগসহ আরো একটি অভিযোগে যাবজ্জীবন প্রদান করা হয়। হযরত আলী আওয়ামী লীগ করার কারনে এবং স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়ার কারনে  আব্দুল কাদের মোল্লা বিহারী এবং আর্মিদের সাথে নিয়ে তাকেসহ পরিবারের লোকজনকে হত্যা করে মর্মে অভিযোগ করা হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে।


রায় পর্যালোচনা২ :
এক নং চার্জ পল্লব হত্যার ভিত্তি শোনা কথা
কাদের মোল্লা ব্যক্তিগতভাবে কোন অপরাধ ঘটাননি


মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে গত পাঁচ  তারিখ মঙ্গলবার রায় ঘোষনা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। আব্দুল কাদের মোল্লাকে যে পাঁচটি অভিযোগে কারাদণ্ড প্রদান করা হয় তার মধ্যে অন্যতম একটি হল ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে  মিরপুর বাংলা কলেজের ছাত্র পল্লব হত্যা ঘটনা। এ হত্যা ঘটনার সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার সংশ্লিষ্টতার   অভিযোগে তাকে  ১৫ বছরের জেল দেয়া হয়েছে।

রায়ে পল্লব হত্যার ঘটনা বিশ্লেষন করে উল্লেখ করা হয়েছে এ হত্যা ঘটনার অভিযোগের ভিত্তি হল শোনা কথা।  ট্রাইব্যুনালের হাতে  যা এসেছে তাতে দেখা যায় আব্দুল কাদের মোল্লা  ব্যক্তিগতভাবে কোন অপরাধ সংঘটন করেছেন এমন অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত নন।

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মোট ছয়টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়। একটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দিয়ে পাঁচটি অভিযোগে তাকে  কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। ১৩২ পৃষ্ঠার রায়ে  ছয়টি অভিযোগ  সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হয়েছে। তারপর প্রত্যেকটি অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের যেসব সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন তা বিশ্লেষন করা হয়েছে। এরপর আসামী পক্ষের সাক্ষীর সাক্ষ্য বিশ্লেষন করা হয়েছে। এ ছাড়া অভিযোগের পক্ষে দুই পক্ষের উপস্থাপিত যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে সংক্ষিপ্ত আকারে।  কোন অভিযোগে কেন আসামীকে দন্ডিত করা হল, সাক্ষীর সাক্ষ্য কেন, কতটুকু মাত্রায় গ্রহণ করা হল তা ব্যাখ্যা বিশ্লেষন করে দণ্ড ঘোষনা করা হয়েছে রায়ে।

রায়ে পল্লব হত্যার ঘটনা : আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এক নং চার্জ ছিল পল্লব হত্যার ঘটনা।   এ অভিযোগটি বিশ্লেষনের শুরুতে রায়ে ঘটনাটি সংক্ষিপ্ত আকারে  তুলে ধরা হয়েছে।   এতে  উল্লেখ করা হয় আব্দুল কাদের মোল্লার নির্দেশে মিরপুর বাংলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে নওয়াবপুর থেকে জোর করে আব্দুল কাদের মোল্লার কাছে ধরে আনা হয়। তারপর আব্দুল কাদের মোল্লার সাঙ্গপাঙ্গরা  পল্লবকে  মিরপুর ১২ নম্বর থেকে ১ নং  শাহআলী মাজার পর্যন্ত টেনে  নিয়ে যায়।  এরপর তাকে আবার মিরপুর ১২ নং ঈদগাহ মাঠে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাকে গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এরপর কাদের মোল্লার সহযোগী আক্তার গুন্ডা এবং অন্যারা মিলে  পল্লবকে ৫ এপ্রিল হত্যা করে। পল্লাব হত্যায় কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে হত্যাকান্ড ঘটানোর অপরাধ হিসেবে  মানবাতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয় চার্জে।  অথবা হত্যা ঘটানোয় সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।

সাক্ষী : রায়ে বলা হয় পল্লব হত্যা ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের দুজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এদের একজন হলেন শহিদুল হক মামা এবং সৈয়দ আব্দুল কাইউম। অপর দিকে আসামী পক্ষে  এ ঘটনায় সাক্ষ্য দিয়েছেন পল্লবের ভাবী সাহেরা খাতুন। সাহেরা  খাতুন ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। তবে তিনি রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য  না দিয়ে আসামীর পক্ষে সাক্ষ্য  দিয়েছেন।

সাক্ষী পর্যালোচনা : রায়ে বলা হয় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী  শহিদুল হক মামা পল্লবকে হত্যার জন্য আব্দুল কাদের মোল্লা নির্দেশ দিয়েছেন তা দেখননি। অথবা পল্লবকে যে কাদের মোল্লার কাছে নিয়ে আসা হয়েছে তাও দেখেননি। জেরায় সাক্ষী বলেছেন,  তিনি জনতা এবং যাদেরকে তিনি চিনতেন তাদের কাছে পল্লবকে জোর করে ধরে আনা, নির্যাতন করা এবং হত্যার ঘটনা শুনেছেন ।
রাষ্ট্রপক্ষের অপর সাক্ষী আব্দুল কাইউমও বলেছেন তিনি শুনেছেন কাদের মোল্লা  বাংলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে হত্যা করেছে।
সাক্ষী শহিদুল হক মামা যদিও শোনা কথা বলেছেন তবু তিনি একজন ন্যাচারাল সাক্ষী। অন্যথায় তিনি বাড়িয়ে বলতে পারতেন  যে, তিনি দেখেছেন আব্দুল কাদের মোল্লা পল্লবকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছে। তার যদি কোন অসৎ উদ্দেশ্য থাকত তাহলে তিনি  বলতে পারতেন যে, তিনি ওই ঘটনা নিজের চোখে দেখেছেন। কিন্তু তিনি তা বলেননি। তা  না বলে তিনি এ ঘটনায় কিভাবে, কাদের পরিকল্পনায়  ঘটানো হয়েছে সে বিষয়ে বলেছেন। তিনি বলেছেন তিনি জনতার কাছে এবং যাদেরকে তিনি চেনেন এমন অনেকের কাছে এ ঘটনা শুনেছেন।

রায়ে সাক্ষী সাক্ষী শহিদুল মামা সম্পর্কে  বিস্তারিতভাবে  তুলে ধরা হয়েছে ট্রাইব্যুনালে প্রদত্ত তার জবানবন্দীর ভিত্তিতে। এতে  বলা হয় সাক্ষী শহিদুল হক মামা একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং মিরপুরের স্থানীয় বাসিন্দা।  সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে বলেছেন,  আব্দুল কাদের মোল্লা বিহারীরা, আক্তার গুন্ডা, হাক্কা গুন্ডা, আব্বাস চেয়ারম্যান, হাশিম হাসবি, নেহাল গোলাম আযমের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারনায় অংশ নিয়েছে এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে স্লোগন দিত।
রায়ে  বলা হয় আব্দুল কাদের মোল্লা যদিও একজন বাঙ্গালী ছিলেন কিন্তু স্থানীয় আক্তার গুন্ডা এবং বিহারী গুন্ডাদের সাথে তার ঘণিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সাক্ষী শহিদুর হক মামা বলেছেন ২৫ মার্চের আগেই  ছয় দফা এবং ১১ দফা আন্দোলনের সময় তিনি জামায়াতের আব্দুল কাদের মোল্লাসহ কনভেনশন মুসলিম লীগের  নেতা কর্মীদের দ্বারা  প্রতিরোধ এবং আক্রান্ত হয়েছেন। এসব কারনে আব্দুল কাদের মোল্লা এবং বিহারী গুন্ডা ও আক্তার গুন্ডাদের সাথে  সাক্ষী শহিদুল হক মামার সাথে  আগে থেকেই বিরোধ ছিল। ২৫ মার্চ রাতে মিরপুরেও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। সাক্ষী শহিদুল হক মামা রাতে শাহ আলী মাজারে আশ্রয় নেন। সকালে মাজার থেকে বের হয়ে আসার পর তিনি ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পান এবং কাদের মোল্লাসহ অন্যান্যরা তাকে ধাওয়া দেয়।
রায়ে বলা হয় জেরায় এসব বিষয়  প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় রয়ে গেছে।

সাক্ষী মূল্যায়ন : রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামী পক্ষের  বিজ্ঞ আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন বেনামী শোনা কথার কোন বিচারিক মূল্য নেই। জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেছেন আইনে শোনা কথা গ্রহণযোগ্য।

অভিযোগের ভিত্তি শোনা কথা : রায়ে বলা হয়েছে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এক নং অভিযোগ পল্লব হত্যার অভিযোগের ভিত্তি হল শোনা কথা। সোনা কথাকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের ডিসক্রিশন, আইনে প্রদত্ত বৈধতা, পারিপার্শিক পরিস্থিতি, সাক্ষীর গ্রহণযোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট ঘটনা ছাড়াও  সার্বিক বিষয়ে আসামীর সংশ্লিষ্টতা প্রভৃতি বিষয় বিশ্লেষন করা হয়েছে এ পর্যায়ে। রায়ে বলা হয় যেহেতু টেকনিক্যাল রুল অব  এভিডেন্স ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয় এবং পারিপার্শিক পরিস্থিতি, বিহারী গুন্ডা, আক্তার গুন্ডার সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার   ঘনিষ্ঠতা ছিল তাই  প্রভৃতি বিবেচনায় শোনাকথাকে সাক্ষ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়েছে। 
রায়ে বলা হয় সেসময়  সেখানে যে  ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করে তাতে কোন বাঙ্গাীর পক্ষে এ  হত্যা ঘটনা, জোর করে পল্লবকে কাদের মোল্লার কাছে ধরে আনা  বা কাদের মোল্লা কর্তৃক পল্লবকে হত্যার নির্দেশ দেয়ার ঘটনা দেখা সহজ ছিলনা। সাক্ষীর মতে মিরপুরে তখন ৯০ ভাগ মানুষ ছিল বিহারী। সামান্য যে দশ ভাগ বাঙ্গালী ছিল তারা ছিল  ভয়ে ভীত। হঠাৎ  করে বিহারী গুন্ডা, স্বাধীনতা বিরোধী বাঙ্গালী যারা জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রসংঘের সাথে জড়িত ছিল তারা  পাকিস্তান আর্মির সাথে মিলে স্বাধীনতা যুদ্ধ’র শুরুতে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির অবতারনা ঘটায় তাতে বাঙ্গালীরা ত্রাসের মধ্যে ছিল সেখানে। তাই সাক্ষী শহিদুল হক মামা লোকজনের কাছে পল্লব হত্যার ঘটনা শুনেছেন বলে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাকে উড়িয়ে দেয়া যায়না। কোন চাুস সাক্ষী নেই বলে তার সাক্ষ্যকে অস্বীকার করা যায়না।
তাছাড়া দীর্ঘ ৪১ বছর পর এ বিষয়ে  জীবিত সাক্ষী  নাও পাওয়া যেতে পারে এবং সেসময়কার ভয়াবহ পরিস্থিতির কারনে এ ঘটনা কারো পক্ষে  দেখা সম্ভব নাও হতে পারে। সাক্ষী শহিদুল হক মামা একজন মিরপুরের স্থানীয় বাসিন্দা এবং তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িত। তাই তার পক্ষে আব্দুল কাদের মোল্লা এবং অন্য যারা পাকিস্তানপন্থী কার্যক্রম পরিচালনা করেছে তাদেরকে চেনা সম্ভব বলে বিশ্বাস করা যায়।


আসামী পক্ষের সাক্ষী সম্পর্কে রায়ে যা বলা হয়েছে : পল্লবের ভাবী সাহেরা ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী।  কিন্তু তিনি  রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে   আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দিয়ে উল্টো ট্রাইব্যুনালে এসে কাদের মোল্লার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন।  তিনি পল্লবের আপন ভাবী। এ সাক্ষী  সম্পর্কে রায়ে বলা হয়েছে, তিনি একজন ম্যানেজড সাক্ষী। অর্থাৎ আসামী পক্ষ তাকে ম্যানেজ করে নিয়ে এসেছে। সত্য প্রকাশ না করার জন্য, রাষ্ট্রপক্ষের  অভিযোগকে মিথ্যা প্রমানের জন্য এবং আসামীকে সুবিধা পাইয়ে দেয়ার  মেকানিজমের অংশ হিসেবে তাকে আনা হয়।

রায়ে আরো বলা হয় সাক্ষী সাহেরা জেরায় এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, তিনি আব্দুল কাদের মোল্লার নাম জীবনেও শোনেননি। যদি এটা সত্য হয় তাহলে কাদের মোল্লা তখন এ  ঘটনার সাথে জড়িত ছিল  বা ছিলনা এ বিষয়েও তার কিছু জানানর কথা নয়। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রসংঘের সাথে সংশ্লিষ্টতা, স্থানীয় বিহারী, স্বাধীনতা বিরোধী, বাঙ্গালী বিরোধীদের সাথে সম্পর্ক এবং স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কর্মতৎপরতার  সাথে জড়িত থাকার কারনে ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চ লাইট পরিচালনার আগে থেকেই  কাদের মোল্লা পরিচিত ছিলেন। কাজেই জীবনে একবারও আব্দুল কাদের মোল্লার নাম না শোনার কথা মিথ্যা হিসেবে পরিগনিত।
এমনিভাবে আরো কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছে কেন আসামী পক্ষের সাক্ষী বিশ্বাসযোগ্য নয় সে বিষয়ে। রায়ে বলা হয়েছে যেহেতু এ সাক্ষী  সত্যকে গোপন করে আসামীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসেছেন তাই তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দী প্রদানের কথাও অস্বীকার করেছেন।  নি:সন্দেহে  এ সাক্ষী সত্য গোপন করেছেন বিশেষ করে ঘটনার সাথে আসামীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে। অন্যদিকে তার সাক্ষ্য রাষ্ট্রপক্ষের শোনা কথাকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। 


রায়ে বলা হয়েছে, আব্দুল কাদের মোল্লার সাথে স্থানীয় বিহারী এবং স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর  ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত। রায়ে উদাহরন পেশ করে বলা হয়েছে যেসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে তার সাথে অভিযুক্তর সরাসরি সম্পৃক্ত বা জড়িত থাকতে হবে  বিষয়টি এমন নয়। প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমান, পারিপাশ্বির্ক পরিস্থিতি এবং ঘটনা বিশ্লেষন করে আমরা পেয়েছি যে, আব্দুল কাদের মোল্লা এবং তার বিহারী সহযোগীরা মিলে বেসামরিক নাগরিক পল্লব হত্যা পরিকল্পনা করেছে।     নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের ওপর আক্রমনের অংশ হিসেবে পল্লবকে হত্যা করা হয়। পল্লবকে যেখন হত্যা করা হয় তখন সেখানে আসামীকে উপস্থিত থাকতে হবে এমনটি অপরিহার্য নয়। রায়ে বলা হয়, তার নৈতিক সমর্থনে, জ্ঞাতসারে এবং পরিকল্পনায় এ হত্যা ঘটনা ঘটে, যদিও ঘটনাস্থলে তিনি উপস্থিত ছিলেননা।  কারণ পল্লব ছিল স্বাধীনতার পক্ষের।  বেসারিমক নাগরিকদের  বিরুদ্ধে পরিচালিত পরিকল্পিত আক্রমনের অংশ হিসেবে পল্লবকে হত্যা করা হয়। তাই এটি একক হত্যাকান্ড হলেও আইনে বর্নিত মানবতা বিরোধী অপরাধ হিসেবেও গন্য এটি।

রায়ের শেষ দিকে উল্লেখ করা হয়েছে  ট্রাইব্যুনালের কাছে যেসব বিষয় উত্থাপিত হয়েছে তাতে অভিযুক্ত আব্দুল কাদের মোল্লা ব্যক্তিগতভাবে কোন অপরাধ সংঘটন করেছেন সে মর্মে কোন অভিযোগ তার বিরুদ্ধে নেই। বরং যেটি প্রমানিত হয়েছে সেটি হল মিরপুরে স্বাধীনতা বিরোধী বিহারী গুন্ডাদের সাথে তার যোগসাজস ছিল। অপরাধ সংঘটনের আগে থেকেই তাদের সাথে তার এ  সম্পর্ক ছিল।
আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায়ে এক নং চার্জ বা পল্লব হত্যার ঘটনাটি প্রায় ১৮ পৃষ্ঠা জুড়ে বিশ্লেষন করা হয়েছে।

আব্দুল কাদের মোল্লার পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী যা বলেছেন : পল্লবের ভাবী সাহেরা ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। কিন্তু গত ২ ডিসেম্বর তিনি ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে   আব্দুল কাদের মোল্লার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে চমক সৃস্টি করলেন। সাহেরা সেদিন ট্রাইব্যুনালে বলেন, তার দেবর পল্লবকে আব্দুল কাদের মোল্লা নয় বরং আক্তার গুন্ডা এবং বিহারীরা হত্যা  করে। সাহেরা কর্তৃক  আব্দুল কাদের মোল্লার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার ঘটনাটি রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু তিনি কি বলেছিলেন তা উল্লেখ করা হয়নি।  বরং   তাকে ম্যানেজড সাক্ষী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে রায়ে।
সাক্ষী সাহেরা  ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দীতে যা বলেছিলেন তা এখানে তুলে ধরা হল।
আমার নাম মোছা ঃ সাহেরা। স্বামী মৃত ফজর আলী। আমার বয়স আনুমানিক ৬০ বছর। বাসা ১১ নং তালতলা বস্তি, থানা পল্লবী। আমার স্বামী ফজর আলীরা ৫ ভাই ছিলেন। বড় ভাসুরের নাম সেকেন্দার, মেজো ফজর আলী (আমার স্বামী), মন্টু, টুনটুনি ও আব্বাস। আমার শ্বশুরের নাম মৃত মানিক সরকার, শ্বাশুড়ির নাম গোলেহার। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমরা সাভারে ছিলাম। সাভারে যাওয়ার আগে মিরপুর ১২ নম্বরে থাকতাম। ঐ বাসায় আমার শ্বাশুড়ি, ভাসুর, দেবর, আমি, আমার স্বামীসহ সবাই একত্রে বাস করতাম। ১২ নম্বর মুসলিম বাজার ছিল আমাদে বাসার ঠিকানা। টুনটুনির নামই পল্লব। পল্লব তখন মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমার বড় ছেলে ফারুক ৫ মাস বয়সের ছিল। আমার ও আমার স্বামীর ভোটার আই ডি কার্ড আমার কাছে আছে। পল্লবকে ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় আক্তার গুন্ডা আর বিহারীরা হত্যা করেছে। যুদ্ধের পর সাভার থেকে আমরা আবার মিরপুরে ফিরে আসি। মুসলিম বাজারের ঈদগা মাছে টুনটুনি ওরফে পল্লবকে আক্তার গুন্ডা ও বিহারীরা হত্যা করে। আমি শুনেছি আমার দেবর মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য ভারত যাচ্ছিল তখন নবাবপুর থেকে তাকে ধরে নিয়ে আসে এবং মুসলিম বাজারে তাকে হত্যা করে। আমি জনগণের কাছ থেকে শুনেছি পল্লবের হত্যাকান্ডের ঘটনা। ইতিপূর্বে এই মামলার ঘটনার ব্যাপারে আমি কারো কাছে কোন জবানবন্দী দেইনি।


রায় পর্যালোচনা-৩ :
কবি মেহেরুন্নেসা হত্যার অভিযোগের ভিত্তিও শোনা কথা//
কাদের মোল্লা হত্যাকান্ডে সশরীরে অংশ নেননি//
মেহেরুন্নেসার ঘরেও  প্রবেশ করেননি


মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে  যে তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম আলোচিত একটি ঘটনা হল মিরপুরে কবি মেহেরুন্নেসা হত্যাকান্ড।
কবি মেহেরুন্নেসা হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে আব্দুল কাদের মোল্লাকে  দন্ডিত করে প্রদত্ত রায়ে  বলা হয়েছে  অভিযুক্ত কাদের মোল্লা কবি মেহেরুন্নেসার ঘরে  নিজে প্রবেশ করেননি হত্যাকান্ডের সময় । হত্যাকান্ডে কাদের মোল্লা নিজে সশরীরে অংশগ্রহণও করেননি। তবে  যারা এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তাদেরকে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে ঘটনাস্থলে নিয়ে গেছেন এবং  এ  কাজে তার নৈতিক সমর্থন ছিল। কাদের মোল্লা নিজে এ অপরাধে অংশ নিয়েছেন সে মর্মে প্রমান নেই।
রায়ে আরো বলা হয়েছে এ হত্যাকান্ডের অভিযোগের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ তিনজন শোনা সাক্ষীর ওপর নির্ভর করেছে। অর্থাৎ  অভিযোগের ভিত্তি হল সাক্ষীদের শোনা কথা। 

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ছয়টি অভিযোগ আনে। এর মধ্যে পাঁচটি অভিযোগে অভিযুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত পাঁচ ফেব্রুয়ারি  মঙ্গলবার রায় প্রদান করেন। দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং তিনটিতে ১৫ বছর করে কারাদন্ড প্রদান করা হয়। একটিতে খালাস  দেয়া হয়। ছয়টি অভিযোগের মধ্যে কবি মেহেরুন্নেসা হত্যার অভিযোগটি ছিল দ্বিতীয় অভিযোগ।  ১৩২ পৃষ্ঠার রায়ে পাঁচটি অভিযোগে  কাদের মোল্লাকে দন্ডিত করা এবং একটিতে খালাস দেয়া বিষয়ে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।  প্রত্যেকটি অভিযোগের সার সংক্ষেপ তুলে ধরে উভয় পক্ষের  সাক্ষীদের সাক্ষ্য,  যুক্তি বিশ্লেষন করাসহ কেন কোন প্রেক্ষাপটে  অভিযুক্তকে দণ্ড  প্রদান বা খালাস দেয়া হয়েছে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দুই নং অভিযোগ কবি মেহেরুন্নেসা হত্যার অভিযোগে কাদের মোল্লাকে দন্ডিত করা বিষয়ে রায়ে যে ব্যাখ্যা  বিশ্লেষন করা হয়েছে তা  শিরোনামসহ তুলে ধরা হল  ।

২ নং অভিযোগ : ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ আব্দুল কাদের মোল্লা তার সহযোগীদের নিয়ে মিরপুর ৬ নং সেকশনে নিজ ঘরে  থাকা অবস্থায় স্বাধীনতাপন্থী কবি মেহেরুননিসা, তার মা এবং দুই ভাইকে হত্যা করে। এ হত্যায় আব্দুল কাদের মোল্লা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ এবং হত্যাকান্ড ঘটানোয় সহায়তার অভিযোগ আনা হয় যা আইনে বর্নিত মানবতা বিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য।

সাক্ষী : রাষ্ট্রপক্ষ কবি মেহেরুন্নেসা হত্যাকান্ড বিষয়ে তিনজন সাক্ষী হাজির করে।  রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীর সাক্ষ্য বিশ্লেষন করে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে কবি মেহেরুন্নেসা  এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার অভিযোগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষ শোনা সাক্ষীর ওপর নির্ভর করেছে। রাষ্ট্রপক্ষের ২, ৪ এবং ১০  নং সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে তাদের সাক্ষ্যে বলেছেন তারা  জানতে পেরেছেন  আব্দুল কাদের মোল্লা এবং তার বিহারী সহযোগী আক্তার গুন্ডা এবং অন্যান্যরা এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। তারা এ ঘটনা  দেখেছেন তা দাবি করেননি।
আসামী নিজে ঘরে প্রবেশ করেনি এটি যদি সত্য ধরে নেয়া  হয় তাহলে যে অর্থ দাড়ায় তাহল আসামী নিজে এ বর্বর হত্যাকান্ড  ঘটানোর ক্ষেত্রে  সশরীরে অংশগ্রহণ করেননি।

সাক্ষ্য পর্যালোচনা : রাষ্ট্রপক্ষের ২ নং সাক্ষী শহিদুল হক মামা ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, আব্দুল কাদের মোল্লা, হাসিব হাশমি, আব্বাস চেয়ারম্যান, আক্তার গুন্ডা, হাক্কা গুন্ডা, নেহাল এবং অন্যান্যরা মিলে ২৭ মার্চ কবি মেহেরুন্নেসা, তার দুই ভাই এবং মাকে করে হত্যা করে। জেরায় তার এ দাবি অস্বীকার করা হয়েছে। জেরায় তিনি আবারো বলেছেন তিনি এ ঘটনা জনতার কাফেলার কাছ থেকে শুনেছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের চার নং সাক্ষী কাজী রোজী আরেকজন শোনা সাক্ষী। তিনি ট্রাইব্যুনালে বলেছেন যে, ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি জানতে পেরেছেন  আব্দুল কাদের মোল্লা এবং তার সহযোগীরা কবি মেহেরুন্নেসা, তার দুই ভাই এবং মাকে   হত্যা করেছে তাদের ঘরে প্রবেশ করে। এর পরের বাক্যেই তিনি বলেছেন, আব্দুল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে দুর্বৃত্তরা এ হত্যাকান্ড পরিচালনা করে; কিন্তু  আব্দুল কাদের মোল্লা নিজে কবি মেহের এর  ঘরে  প্রবেশ করেছিল কি-না তা বলতে পারেননি সাক্ষী। দুই দিন পরে তিনি অবাঙ্গালী গুলজার এবং আরেকজন বিহারীর  কাছ থেকে ঘটনা বিষয়ে জানতে পারেন।

উপরোক্ত দুই সাক্ষীর বক্তব্য জেরায় নির্দিষ্টভাবে অস্বীকার করা হয়নি। উপরোক্ত শোনা কথার ভিত্তিতে আমরা একটি জিনিস পেয়েছি তা হল আব্দুল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে একটি দুর্বৃত্ত দল কবি মেহেরুননিসার ঘরে আক্রমন পরিচালনা করে। এ বিষয়টি আসামী পক্ষ জেরার মাধ্যমে দূর করতে পারেনি।  আসামী নিজে ঘরে প্রবেশ করেনি এটি যদি সত্য ধরে নেয়া  হয় তাহলে যে অর্থ দাড়ায় তাহল আসামী নিজে এ বর্বর হত্যাকান্ড  ঘটানোর ক্ষেত্রে  সশরীরে অংশগ্রহণ করেননি; যদিও তিনি  দুর্বৃত্তদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে নেতৃৃত্ব দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন চার নং সাক্ষী।

রায়ে প্রশ্ন  করা হয়েছে  কবি মেহেরুন্নেসা এবং তার পরিবারকে কেন টার্গেট করা হল? এর ব্যাখ্যায় রায়ে বলা হয় চার নং সাক্ষী কাজী রোজী জানিয়েছেন যে,  মিরপুরে বাঙ্গালীদের দুর্দশা দূর করার জন্য তারা একটি অ্যাকশন কমিটি গঠন করেছিলেন যার সদস্য ছিলেন কবি মেহেরুন্নেসা। ২৫ মার্চ  সকালে তারা একটি মিটিং করেন এবং বাসায় ফেরার পর  তিনি জানতে পারেন যে, তার এবং কবি মেহেরের ওপর আক্রমন  করা হবে। তিনি মেহেরকে সতর্ক করে ছিলেন বাসায় না থাকার ব্যাপারে।   তিনি (চার নং সাক্ষী) নিজে মিরপুর ছেড়ে গিয়েছিলেন।
রায়ে বলা হয় এ বিষয়টি জেরায় সম্পূর্ণভাবে থেকে গেছে। তাই এটা পরিস্কার যে, স্বাধীনতাপন্থী, প্রগতিশীল  নাগরিক হওয়ায় এবং বাঙ্গালীদের দুর্দশা লাঘবে উদ্যোগী হওয়ায়  ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চ লাইট  শুরুর পরপরই আব্দুল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে  কবি মেহের এবং তার পরিবারের ওপর আক্রমন চালানো হয়।

রায়ে বলা হয় ২নং সাক্ষীর বর্ননা থেকে এটা  প্রতিষ্ঠিত যে, আব্দুল কাদের মোল্লা ১৯৭০ এর নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী গোলাম আযমের পক্ষে প্রচারনায় অংশ নিয়েছে সক্রিয়ভাবে। তাই আমরা নির্ভুলভবে এ সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, স্থানীয় বিহারী আক্তার গুন্ডা, হাক্কা গুন্ডা, নেহাল গুন্ডা এবং অন্যান্যা বিহারী  গুন্ডারা আব্দুল কাদের মোল্লার সার্বক্ষনিক সঙ্গী ছিল।

অভিযুক্ত আব্দুল কাদের মোল্লা কবি মেহেরুন্নেসা হত্যাকান্ড ঘটাননি বরং অন্য  কোন এক কাদের মোল্লা এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে আসামী পক্ষ থেকে  চার নং সাক্ষীকে জেরার সময় সাজেশন দেয়া হয় । সাক্ষী তা অস্বীকার করেন।  আসামী পক্ষের এ সাজেশন থেকে এটা প্রমানিত যে, কাদের মোল্লা নামে একজন  দুর্বৃত্ত এ ঘটনার সাথে জড়িত রয়েছে। কিন্তু সেই কাদের মোল্লা যে বর্তমানে অভিযুক্ত  আব্দুল কাদের মোল্লা নয় এ মর্মে আসামী পক্ষ কোন প্রমান হাজির করতে পারেনি। কাজেই এ কুকর্মে সহকারি হিসেবে আব্দুল কাদের মোল্লার জড়িত থাকার   পক্ষে প্রমান হিসেবে শোনা সাক্ষী ২ এবং ৪ এর দাবি যথেষ্ট  নিশ্চয়তা প্রদান করে।

এ ঘটনার ব্যপারে রাষ্ট্রপক্ষের আরেক সাক্ষী (১০ নং) হলেন সৈয়দ আব্দুল কাইউম। তিনি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, তিনি জানতে পেরেছেন যে,  অবাঙ্গালীরা কবি মেহেরুননিসা এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে।

সাক্ষ্য মূল্যায়ন এবং প্রাপ্তি :
এখানে মূলত উভয় পক্ষের যুক্তি তুলে  ধরে রায়ে বলা হয় আসামী পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী জনাব  আব্দুর রাজ্জাক এ নং অভিযোগ সম্পর্কে যা বলেছেন এ ক্ষেত্রেও তাই বললেন। তিনি বলেন, ইসলামী ছাত্র সংঘ এবং আল বদর কোন সহযোগী বাহিনী ছিলনা। কাজেই তিনি এর সদস্য থাকলেও বলা যায়না তিনি কোন পাকিস্তান আর্মির সহযোগী সংস্থার সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালে শুধুমাত্র রাজাকার বাহিনীকে গেজেটের মাধ্যমে আর্মির কমান্ডের অধীনে  সহযোগী সংস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।  আব্দুল কাদের মোল্লা সেসময় কোন রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন এ কথা রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেননি।  তিনি দাবি করেন  তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ প্রমানিত হয়নি।

আসামী পক্ষের অপর বিজ্ঞ আইনজীবী আব্দুস সোবহান তরফদার যুক্তি উপস্থাপন করে বলেছেন, অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ তিনজন সাক্ষী হাজির করেছে এবং তিনজনই বলেছেন তারা এ ঘটনা শুনেছেন।  তাছাড়া আব্দুল কাদের মোল্লা এ কাজে সহায়তা করেছে মর্মে কোন প্রমানও রাষ্ট্রপক্ষ হাজির করতে পারেনি।
আব্দুস সোবহান তরফদার বলেন, চুতর্থ সাক্ষী কাজী রোজী ‘শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা’ নামে একটি বই লিখেছেন যা এখানে প্রদর্শন করা হয়েছে। বইটি ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়েছে।  কাজী রোজী তার নিজের লেখা এ বইয়ে কবি মেহেরুন্নেসা হত্যা ঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লা সম্পর্কে কিছুই  উল্লেখ করেননি। এমনকি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তিনি যে জবানবন্দী দিয়েছেন তাতেও এ ঘটনা বিষয়ে আব্দুল কাদের মোল্লা বিষয়ে কিছু বলেননি তিনি।
তিনি বলেন, শোনা কথার কোন মূল্য নেই। তাছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের ১০ নং সাক্ষী সৈয়দ আব্দুল কাইউম বলেছেন, কবি মেহেরুন্নেসাকে  মিরপুরের স্থানীয় অবাঙ্গালীরা হত্যা করেছে।

জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, ২ এবং ৪ নং সাক্ষীর শোনা কথা সম্পূর্ণরুপে নির্ভরযোগ্য এবং পারিপার্শিক অবস্থার প্রেক্ষিত বিবেচনায়  তাদের সাক্ষ্যের বিচাররিক মূল্য রয়েছে। তিনি বলেন, সহযোগী বাহিনীর সদস্য না হলেও ‘ইন্ডিভিজুয়াল’ হিসেবে ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে বিচারের আওতায় আনা যায় যদি দেখা যায় তিনি আইনের ধারা অনুসারে অপরাধ করেছেন।
রায়ে বলা হয়, ১৯৭২ সালের আইনে শোনা কথা (হেয়ারসে এভিডেন্স) গ্রহণযোগ্য। যদি এর বিচারকি মূল্য থাকে তবে তার ওপর ভিত্তি করে কাজ করার এখতিয়ার  রয়েছে ট্রাইব্যুনালের।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অপারেশস সার্চ লাইট শুরুর পরপরই ২৭ মার্চ দুর্বৃত্তরা কবি মেহেরুন্নেসার পরিবারের ওপর হামলা করে এটা প্রমানিত  এবং তিনি যে তার ঘরে নির্মম হত্যার শীকার হন তা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই।

আসামী পক্ষ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের জেরায় এটাও প্রমান করতে পারেনি যে, এটা ছিল একটি বিচ্ছিন্ন হত্যাকান্ড, কোন পরিকল্পিত  এবং সিসটেমেটিক আক্রমনের অংশ নয়। কাজেই  ঘটনার বিষয়বস্তু, ঘটনা এবং ঘটনার পারিপার্শিকতা বিবেচনায় এটা প্রমানিত যে, এটা ছিল মানবতা বিরোধী একটি অপরাধ।

২ নং সাক্ষী শহিদুল হক মামার সোনা কথার সাক্ষ্য থেকে এটা প্রমানিত হয়েছে যে, ২৭ মার্চ আব্দুল কাদের মোল্লা, হাসিব হাশমিম আব্বাস চেয়ারম্যান,ত হাক্কা গুন্ডা, আক্তার গুন্ডা, নেহাল এবং তাদের সহযোগীরা  কবি মেহেরুন্নেসা, তার মা এবং দুই ভাইকে হত্যা করে। জেরায় আসামী পক্ষ এটি অস্বীকার  করেছে কিন্তু দুর্বল করতে পারেনি। সাক্ষী শহিদুল হক মামা জনতার কাফেলা (ম্যাস পিপল)  থেকে এ হত্যার ঘটনা শুনেছেন। আসামী পক্ষ এটা দুর্বল করতে পারেনি। তাছাড়া তখন সেখানে যে ভয়ানক পরিস্তিতি বিরাজ করে তাতে কোন বাঙ্গালীর পক্ষে এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করা স্বাভাবিক এবং সম্ববপর ছিলনা। কাজেই জনতার কাফেলা থেকে শোনাটাই স্বাভাবিক এবং সম্ভবপর। কাজেই  ঘটনা পরম্পরা, ঘটনার ধারাবাহিকতা এবং স্থানীয় বিহারীদের সাথে অভিযুক্ত আব্দুল কাদের মোল্লার যোগসাজ সব বিবেচনা করলে  ২ নং সাক্ষীর শোনা সাক্ষ্য বিবেচনায় নেয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

চার নং সাক্ষী কোজী রোজীর সোনা সাক্ষ্য বিবেচনা করা যাক এবার। তিনি ধারণা করেছিলেন যে, তার এবং কবি মেহেরুন্নেসার ওপর আক্রমনের নির্দেশ দেয়া হতে পারে কারণ তারা অ্যকশন কিমিটর সাথে জড়িত ছিলেন যে কমিটি মিরপুরের দুর্দশাগ্রস্ত বাঙ্গালীদের সহায়তার জন্য গঠন করা হয়েছিল। এ ঘটনা অবিকৃত রয়েছে। এটা ইতোমধ্যে প্রমানিত হয়েছে যে, স্থানীয়  বিহারী আক্তার গুন্ডা, নেহাল গুন্ডা, হাক্কা গুন্ডা এবং অন্যান্য বিহারী গুন্ডারা আব্দুল কাদের মোল্লার সঙ্গী ছিল । কাদের মোল্লা   এ গ্যাংদেরকে অপরাধ স্থলে নিয়ে যাবার ব্যাপারে নেতৃত্ব দিয়েছিল। চার নং সাক্ষী থেকে আমরা আরো প্রমান পেয়েছি যে আব্দুল কাদের মোল্লা নিজে মেহেরুন্নেসার ঘরে প্রবেশ করেনি।

রায়ে বলা হয় এ থেকে আমরা নির্দিধায় একথা বলতে পারি যে, অপরাধ স্থলে গ্যাংদের নিয়ে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং অপরাধ সংঘটনের সাথে অভিযুক্তের  যোগসাজসের বিষয়টি এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের হাতে যে তথ্য প্রমান এসেছে তাতে আমরা  যা  পেলাম সেটি হল আব্দুল কাদের মোল্লা দুর্বৃত্তদের  নিরস্ত্র বেসামরিক ভিকটিম (মেহেরুন্নেসা) এর  ঘরে নিয়ে যাবার নেতৃত্ব দিয়েছে কিন্তু অভিযুক্ত আব্দুল কাদের মোল্লা নিজে এ অপরাধে অংশ নিয়েছেন সে মর্মে প্রমান নেই। কাজেই চার নং সাক্ষীর শোনা সাক্ষ্য, ঘটনার পারিপার্শিকতা, বিহারী দুর্বৃত্তদের সাথে সম্পর্ক এটা নির্দেশ করে যে, এ বর্বর এ  ঘটনার সাথে তার একটা লিংক ছিল।
সেকশন ৩(২) ধারা অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে হত্যা সংঘটনের জন্য আসামীকে সশরীরে ঘটনা স্থলে উপস্থিত থাকতে হবে তা প্রতিষ্ঠার করার প্রয়োজন নেই রাষ্ট্রপক্ষের। এ ধরনের অপরাধ সংঘঠনের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি যদি যেকোনভাবে প্রমানিত হয় তাহলে এর দায় দায়িত্ব হিসেবে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের দায় বর্তায় ।

আসামী পক্ষ দাবি করেছে চতুর্থ সাক্ষী কাজী রোজী বিশ্বাসযোগ্য নয়  কারণ তিনি কোর্টে এসে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার  তার নিজের লেখা বই ‘শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা’ বর্নিত তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক।
সাক্ষী শীকার করেছেন যে, তিনি তার বইয়ে কারো নাম উল্লেখ করেননি কারণ তখন দুর্বত্তদের বিচারের কোন ব্যবস্থা ছিলনা। তিনি আরো বলেছেন দুর্বৃত্তদের ভয়ে তিনি দায়ীদের নাম  উল্লেখ করেননি। এখন যেহেতু বিচারের  উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাই তিনি আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে রায়ের ব্যাখ্যায় বলা হয় কারো মৌখিক সাক্ষ্য পূর্বের বর্ননার সাথে হুবহু মিল নাও হতে পারে। পুর্বের সাক্ষাতকারে তাকে যে প্রশ্ন করা হয়েছিল বিচারের সময় তাকে তা থেকে  ভিন্ন প্রশ্নও করা হতে পারে।  এবং কোর্টে যখন তাকে নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় তখন সে অতিরিক্ত তথ্য প্রদান করতে পারে। তাছাড়া সম্ভাব্য ভয়ের কারনে তাকে এটি থেকে বিরত রাখতে পারে বলে অনুমান করা যায়। এটা অনস্বিকার্য যে, উপযুক্ত পরিবেশ পরিস্থিতি এবং সুপ্রতিষ্ঠিত  ঐকমত্যের অভাবের কারনে ১৯৭১ সালে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের  অপরাধীদের বিচারের কাজ  কয়েক দশক ধরে থেমে ছিল। এ সময়ের মধ্যে পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দল স্বাধীন বাংলাদেশে  তাদের অবস্থান  আবার চাঙ্গা করতে সক্ষম হয়েছে কোন বাঁধা ছাড়াই।
সে কারনে একজন স্বাধীনতাপন্থী ব্যক্তি হিসেবে ঝুকি এবং ভয়ের কারনে  চতুর্থ সাক্ষী তার বইয়ে সবকিছু বর্ননা করেননি  যে বই  তিনি তার সাক্ষ্য দেয়ার পূর্বে লিখেছেন। তাছাড়া বইয়ে শুধুমাত্র দুর্বৃৃত্তদের নাম নির্দিষ্ট করে  উল্লেখ না করা এবং বইয়ে কোন কিছু বাদ রাখার কারনে তিনি কোর্টে শপথ নিয়ে যা বলেছেন তা  টিকবেনা তা নয়।
অপরাধীদের নেতৃত্ব নিয়ে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া নি:সন্দেহে অপরাধ সংঘটনের একটি অংশ এবং এটি  অপরাধ সংঘটনে  নৈতিক সমর্থন, উৎসাহ যোগানোর  শামিল। অভিযুক্ত সশরীরে অপরাধ সংঘটনে অংশ নেননি শুধুমাত্র এ কারনে তাকে এর দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া যায়না যেহেতু অভিযুক্ত কর্তৃক নেতৃত্ব দিয়ে অপরাধীদের অপরাধ স্থলে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে  অপরাধ সংঘটনের ব্যাপারে নৈতিক সমর্থন এবং উৎসাহ যুগিয়েছে।
সুতরাং সরাসরি সাক্ষ্য নেই এ কারনে শোনা সাক্ষীকে  পাশকাটিয়ে রাখা যায়না।

রায় পর্যালোচনা-৪ :
ফরমাল চার্জ, রায় এবং সাক্ষীদের বর্ননায় ঘটনার গরমিল//
সাংবাদিক  আবু তালেব হত্যার অভিযোগের ভিত্তিও শোনা কথা


মেহেদী হাসান
আব্দুল কাদের মোল্লাকে যে তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড  প্রদান করা হয়েছে তার মধ্যে একটি হল সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যার ঘটনা। এ ঘটনায়ও আব্দুল কাদের মোল্লাকে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে দুজন সাক্ষীর শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে।
অপর দিকে  খন্দকার আবু তালেব হত্যার ঘটনা বিষয়ে একটি ক্ষেত্রে বিরাট গরমিল রয়েছে ফরমাল চার্জ  ও   রায়ে বর্নিত ঘটনার বিবরন এবং সাক্ষীদের জবানবন্দীর মধ্যে। ফরমাল চার্জ এবং রায়ে খন্দকার আবু তালেবকে হত্যার যে বিবরন তুলে ধরা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে মিরপর ১০ নং বাস স্ট্যান্ড থেকে  আবু তালেবকে কাদের মোল্লা অন্যান্য আলবদর, রাজাকার এবং বিহারী দৃস্কৃতকারীদের নিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে মিরপুর জল্লাদখানায় নিয়ে হত্যা করে। অপর দিকে এ ঘটনা বিষয়ে  রাষ্ট্রপক্ষের যে দুজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা বলেছেন খন্দকার আবু তালেব ইত্তেফাক থেকে মিরপুর বাসায় ফেরার পথে ইত্তেফাকেরই  প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা বিহারী আব্দুল হালিম তাকে বিহারীদের হাতে তুলে দেয়। আব্দুল হালিম মিরপুরে পৌছে দেয়ার নাম করে তার গাড়িতে  খন্দকার আবু তালিবকে তোলে এবং তাকে কাদের মোল্লা/বিহারীদের হাতে তুলে দেয়।
খন্দকার আবু তালেবের ছেলে খন্দকার আবুল আহসান  ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার পিতার হত্যা বিষয়ে। কিন্তু তিনি ট্রাইব্যুনালে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার সাথে বিস্তর গরমিল রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত ডকুমেন্টের সাথে। সেখানে খন্দকার আবুল আহসান কর্তৃক বর্নিত তার পিতার হত্যার ঘটনার বর্ননায় দেখা যায় সেখানে আব্দুল কাদের মোল্লার নামই উল্লেখ করা হয়নি।

গত  পাঁচ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-২ আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায় দেন।   তিন নং অভিযোগে আব্দুল কাদের মোল্লাকে কারাদণ্ড প্রদান বিষয়ে রায়ে বর্নিত বিশ্লেষন, মূল্যায়ন এবং যুক্তি নিম্নে তুলে ধরা হল।

৩ নং অভিযোগ : ১৯৭১ সালে ২৯ মার্চ সাংবাদিক আইনজীবী খন্দকার আবু তালেব তার মিরপুর ১০ নং সেকশনে অবস্থিত বাসা থেকে  আরামবাগ যাচ্ছিলেন। তিনি মিরপুর ১০ নং বাস স্ট্যান্ডে পৌছার পর ইসলামী ছাত্র সংঘ নেতা  আব্দুল কাদের মোল্লা অন্যান্য আল বদর সদস্যা, রাজাকার  এবং দৃষ্কৃতকার এবং বিহারীদের সাথে নিয়ে তাকে ধরে ফেলে।  তারা খন্দকার আবু তালেবকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মিরপুর জল্লাদখানা পাম্প হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে সেখানে হত্যা করা হয়। একজন বেসামরিক ব্যক্তির হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণ এবং সহাতার কারনে তার বিরুদ্ধে আইনে বর্নিত মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে । 

সাক্ষী :  রায়ে বলা হয় এ অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ দুই জন সাক্ষী হাজির করেছে। এদের মধ্যে একজন হলেন খন্দকার আবু তালেবের ছেলে খন্দকার আবুল আহসান (৫ নং সাক্ষী) এবং অপর আরেকজন সাক্ষী হলেন  খন্দকার আবু তালেবের বন্ধু সৈয়দ আব্দুল কাইউম (১০ নং সাক্ষী)।  তারা তখন মিরপুরে থাকতেন। তাদের দুজনেই এ হত্যাকান্ডের কথা শুনেছেন, দেখেননি।

সাক্ষ্য বিশ্লেষন : সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান  ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, ২৫ মার্চ ইত্তেফাক অফিস গুড়িয়ে দেয়ার  খবর শুনে তার পিতা খন্দকার আবু তালেব সেখানে যান তার সহকর্মীদের অবস্থা জানতে। তিনি সেখানে কিছু মৃতদেহ দেখতে পান। ২৯ মার্চ তিনি তাদের মিরপুর বাসায় আসছিলেন তার গাড়ি এবং টাকা নেয়ার জন্য। কিন্তু মিরপুর যাবার পথে ইত্তেফাকের প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা  অবাঙ্গালী আব্দুল হালিমের সাথে দেখা হয় তার। আব্দুল হালিম  তাকে পৌছে দেয়ার নাম করে তার গাড়িতে ওঠান এবং আব্দুল কাদের মোল্লার কাছে নিয়ে যান। এরপর মিরপুর ১০ জল্লাদ খানায় তার পিতাকে আব্দুল কাদের মোল্লা হত্যা করে।  এসময় আব্দুল কাদের মোল্লার সাথে আক্তার গুন্ডা এবং আরো অবাঙ্গালী দুস্কৃতকারীরা ছিল।

সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান জেরায় জানান, তিনি অ্যাডভোকেট খলিল  এর কাছ থেকে শুনেছেন যে, ইত্তেফাকের প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা আব্দুুল হালিম  তার পিতাকে তার গাড়িতে করে নিয়ে গিয়ে কাদের মোল্লা এবং তার সহযোগীদের হাতে তুলে দিয়েছে। জেরায় তিনি আরো বলেন, তাদের অবঙ্গালী  ড্রাইভার নিজাম তাকে বলেছেন যে,  আব্দুল হালিম তার পিতাকে আব্দুল কাদের মোল্লা এবং তার সঙ্গীদের হাতে তুলে দিয়েছে।

রায়ে বলা হয়, সাক্ষী  খন্দকার আবুল আহসান এর জবানবন্দী এবং জেরা বিশ্লেষন করলে দেখা যায়  তার পিতাকে গাড়িতে করে আব্দুল হালিম কর্তৃক নিয়ে যাওয়া এবং আব্দুল কাদের মোল্লা ও তার সহযোগীতের হাতে তুলে দেয়ার ঘটনা বিষয়ে সাক্ষী যে শোনা কথা বলেছেন তার বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে। তিনি যাদের কাছ থেকে তার পিতাকে তুলে নেয়ার ঘটনা শুনেছেন সেই অ্যাডভোকেট খলিল এবং নিজাম  ড্রাইভার কেউ জীবিত নেই।
সাক্ষী বলেছেন, তিনি নিজে তার পিতার হত্যার ঘটনা দেখেননি এবং তখনকার পরিস্থিতিতে সীমিত কিছ বাঙ্গালী  লোক ছাড়া এটা দেখা সম্ভব ছিলনা। এটা থেকে তখনকার  ভয়াবহ পরিস্থিতি বোঝা যায় এবং  খন্দকার আবু তালেবকে হত্যার ঘটনা দেখা বিষয়ে সরাসরি সাক্ষী পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে বলে রায়ে  বলা হয়।
রায়ে বলা হয় সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান আরো জানান যে, তিনি তাদের ড্রাইভার নিজামের কাছে শুনেছেন ১৯৭০ এর নির্বাচনে পরাজয়ের পর কাদের মোল্লার নির্দেশে মিরপুরে মুসলিম বাজার, শিয়ালবারি, জল্লাদখানায় হত্যাকান্ড চালানো হয়।
১০ নং সাক্ষী সৈয়দ আব্দুল কাইউম মিরপুরের  বাসিন্দা এবং খন্দকার আবু তালেবের বন্ধু ছিলেন। সৈয়দ আব্দুল কাইউম ২৩ মার্চ হামলায় আহত  হন এবং তাকে  ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে  ভর্তি করানো নয়।   চিকিৎসা শেষে ২৭ মার্চ তিনি গ্রামের বাড়ি চলে যান। সৈয়দ  আব্দুল কাইউম বলেছেন জুন মাসে ফারুক খান তাকে তার গ্রামের বাড়ি নাসির নগরে দেখতে আসেন।  ফারুক খানের কাছে তিনি শুনেছেন যে, স্থানীয় আক্তার গুন্ডা, বিহারী এবং কাদের মোল্লা তালেব সাহেবকে হত্যা করেছে মিপুর ১০ জল্লাদ  খানায়। এছাড়া  তালেব সাহেবের  ড্রাইভার নিজামের কাছ থেকেও তিনি  শুনেছেন যে, খন্দকার আবু তালেব মিরপুরে তার বাসায় আসার পথে ইত্তেফাকের অবাঙ্গালী হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা   আব্দুল হালিম তাকে  বিহারীদের হাতে তুলে দেয় যারা তাকে মিরপুর ১০ জল্লাদখানায় হত্যা করে।

সাক্ষ্য মুল্যায়ন : রায়ে বলা হয় খন্দকার আবু তালেবকে মিরপুর ১০ জল্লাদখানায় হত্যার ঘটনা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। ৫ নং সাক্ষীর সাক্ষ্য থেকে এটা প্রমানিত যে, খন্দকার আবু তালেব ২৯ মার্চ ইত্তেফাক এর অবাঙ্গালী একাউনট্যান্ট আব্দুল হালিমের  গাড়িতে করে মিরপুরে তার বাসায় আসছিলেন। তাকে আব্দুল কাদের মোল্লার হাতে তুলে দেয়ার  ঘটনা অস্বীকার করেছে আসামী পক্ষ। কিন্তু আক্তার গুন্ডা এবং স্থানীয় বিহারী কর্তৃক তাকে হত্যার  বিষয়টি অবিকৃত রয়ে গেছে।
আসামী পক্ষ ৫ নং  সাক্ষীর শোনা কথার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে সাক্ষী কর্তৃক তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত  স্টেটমেন্ট এবং কোর্টে প্রদত্ত জবানবন্দীর মধ্যে   পার্থক্য রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় বলেছেন, অবাঙ্গী  আব্দুল হালিম  কর্তৃক খন্দকার আবু তালেবকে গাড়িতে করে নিয়ে আসা  এবং আব্দুল কাদের মোল্লা ও তার সহযোগীতের  হাতে তুলে দেয়ার কথা তার কাছে বলেননি।
আসামী পক্ষ  আরো যুক্তি উপস্থাপন করেছে যে,  সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান এবং সৈয়দ আব্দুল কাইউম দুজনেই বলেছেন যে, তারা আবু তালেবকে আব্দুল কাদের মোল্লার হাতে  তুলে দেয়ার ঘটনা ড্রাইভার নিজামের কাছে শুনেছেন।  কিন্তু সাক্ষী আব্দুল কাইউমও তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এ কথা বলেননি।
বরং এখানে যে বই প্রদর্শন করা হয়েছে (কবি মেহেরুন্নেসার ওপর লিখিত কাজী রোজীর বই)  তাতে দেখা যায় সৈয়দ আব্দুল কাইউম বলেছেন,  আবু তালেবকে বিহারীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।
কাজেই আবু তালেবকে আব্দুল হালিম কর্তৃক মিরপুরে নিয়ে আসা তাকে বিহারী কর্তৃক হত্যার ঘটনা আসামী পক্ষও অস্বীকার করছেনা। কিন্তু  শোনা সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান তার পিতাকে তুলে দেয়ার বিষয়ে  কোর্টে যা বলেছেন তার সাথে অমিল রয়েছে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে  প্রদত্ত স্টেটমেন্টে। কাজেই আসামী পক্ষের দাবি  আবু তালেবকে বিহারীদের হাতে তুলে দেয়ার সাথে কাদের মোল্লার কোন সংযোগ ছিলনা এবং তিনি এ বিষয়ে কোন ভূমিকা পালন করেননি।

আসামী পক্ষ  যুক্তি তুলে ধরে আরো বলে, ১০ নং সাক্ষী সৈয়দ আব্দুল কাইউম এ ঘটনা প্রথম শুনেছেন ১৯৭১ সালে ফারুক  খানের কাছে এবং এরপর তিনি তা শুনেছেন ১৯৭২ সালে  বিহারী নিজাম ড্রাইভারের কাছ থেকে। তিনি বলেছেন ফারক খানের কাছে তিনি শুনেছেন আবু তালেবকে  বিহারী,  আক্তার গুন্ডা এবং কাদের মোল্লা হত্যা করেছে মুসলিম বাজারে। কিন্তু ড্রাইভার নিজাম যেটা বলেছে তা হল বিহারীরা এবং আক্তার গুন্ডা আবু তালেবকে হত্যা করেছে ।  তার এ কথার সাথে মিল রয়েছে কাজী রোজীর লেখা বইয়ের তথ্যের সাথে। কাজেই কোনটা সত্য এ প্রশ্ন আসামী পক্ষের। 
আসামী পক্ষের দাবি পরষ্পর বিরোধী শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে আসামীকে দোষী সাব্যস্ত করা যায়না।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন যে, ৫ নং সাক্ষী তাকে বলেছেন  তিনি তার পিতাকে আব্দুল হালিমের গাড়িতে করে নিয়ে আসার ঘটনা অ্যাডভোকেট খলিলের কাছ থেকে শুনেছেন। কাজেই এটা পরষ্পর বিরোধী হতে পারেনা।
রায়ে বলা হয়েছে, সকল ফৌজদারি কেসে  মানুষের সাধারন পর্যবেক্ষন, সময়ের ব্যবধানে স্মৃতি লোপ পাওয়া,   শোকাবহ ঘটনার কারনে মানসিক পীড়ন প্রভৃতি কারনে সাক্ষীদের সাক্ষ্যে গোলযোগ ঘটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কাজেই ছোটখাট বৈপরিত্য, অসামাঞ্জস্য এবং অমিলের কারনে পুরো বিষয়কে  বাতিল করা যায়না।

ঘটনার দিন আবু তালেবকে  আব্দুল হালিম কর্তৃক গাড়িতে করে নিয়ে আসা, তাকে  বিহারীদের হাতে তুলে দেয়া এবং জল্লাদখানায় হত্যার ঘটনা  অবিতর্কিত অবস্থায় রয়ে গেছে। ৫ এবং ১০ নং সাক্ষীর শোনা কথা বিশ্বাসযোগ্য, প্রাসঙ্গিক  বলে মনে হয় এবং  এর বিচারকি মূল্য রয়েছে।

রায়ে বলা হয় ২ নং সাক্ষীর (শহিদুর হক মামা) কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি আব্দুল কাদের মোল্লার সহযোগী কারা ছিল এবং তাদের সাথে তার কিরকম যোগসাজস ছিল; বিশেষ করে স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে । এটা প্রমানিত যে, ২৫ মার্চ এর আগে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মিরপুর এলাকায় সংঘটিত বিভিন্ন  ধরনের বর্বরতার   ঘটানোর ক্ষেত্রে  আব্দুল কাদের মোল্লার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল  স্থানীয় বিহারী আক্তার গুন্ডা, হাক্কা  গুন্ডা, নেহাল, আব্বাস চেয়ারম্যান, হাসিব হাশমি।   ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চ লাইট শুরুর চার দিনের মাথায় ২৯ মার্চ আবু তালেব হত্যার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বিহারী গুন্ডাদের সাথে কাদের মোল্লার ঘনিষ্ঠতা, তার ভূমিকা এবং কর্মকান্ড বিষয়ে ২ নং সাক্ষীর কাছ থেকে আমরা পরিস্কার বর্ননা পেয়েছি। কাজেই আবু তালেব হত্যায় আব্দুল কাদের মোল্লা সহযোগীতার বিষয়টি  খুবই প্রাসঙ্গিক।
উপরোক্ত প্রমানাদি এবং ৫ নং সাক্ষীর সাক্ষ্য  একত্র করলে দেখা যায় যায় যে, আব্দুল কাদের মোল্লা, আক্তার গুন্ডা এবং কিছু অবাঙ্গালী দৃস্কৃতকারী জল্লাদখানায় ছিল যখন খন্দকার আবু তালেবকে হত্যা করা হয়।  এ ঘটনায়  আব্দুল কাদের মোল্লার সহযোগিতার বিষয়টি  ভালভাবে প্রমানিত। কাজেই আমরা নিশ্চিত যে, ৫ নং সাক্ষীর শোনা কথার বিচারিক মূল্য রয়েছে, এটা বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রাসঙ্গিক।

রায়ে  বলা হয়েছে মিরপুরে ১০ ভাগ বাঙ্গালী ছিল।  নিজ বাঙ্গালীদের সহযোগিতার বদলে আব্দুল কাদের মোল্লা সব  সময় বাঙ্গালী বিদ্বেষী  বিহারী গুন্ডা বিশেষ করে আক্তার   গুন্ডা, হাক্কা গুন্ডা, নেহাল এদের সাথে থাকত কেন? তার এ সহযোগিতা বিহারীদের স্বাধীনতাপপন্থী বাঙ্গালী নিধনে  উৎসাহ যোগিয়েছে।
রায়ে বলা হয় পারিপার্শ্বিক বিষয় সরাসরি সাক্ষ্যের তুলনায় কম মূল্য বহন করেনা। উপরে যে সাক্ষ্য বিশ্লেষন করা হয়েছে তাতে আবু তালেব হত্যার ঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লার জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমান করে।  আক্রমনের বিষয় এবং ধরন থেকে এটা বোঝা যায় যে, এটি ছিল নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমনের একটি অংশ। খন্দকার আবু তালেব ছিলেন একজন  স্বাধীনতাপন্থী নাগরিক। কাজেই এ হত্যার ঘটনা একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ।
আমরা আগেই বলেছি যে, অপরাধ ঘটানোর সময় অভিযুক্ত’র সশরীরে হাজির থাকতে হবে  বিষয়টি এমন  নয়। যদি এটা দেখা যায় যে, তিনি এ   ঘটনা  ঘটার বিষয়ে জ্ঞাত তাহলে বলা যায় তার এতে অংশগ্রহণ রয়েছে।

জল্লাদখানা যাদুঘরের ডকুমেন্টে  যা রয়েছে : 
শহীদ খন্দকার আবু তালেব, পল্লব হত্যাকান্ড  এবং হযরত আলী হত্যাকান্ডসহ আরো অনেক হত্যাকান্ড বিষয়ে  শহীদ পরিবারের আত্মীয় স্বজনদের  সাক্ষাতকার,  লিখিত বক্তব্যের মূল কপি, অডিও ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। এছাড়া লিখিত  বক্তব্যের ডুপ্লিকেট কপি সংরক্ষিত আছে জল্লাদখানা যাদুঘরে।  মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত  পাম্প হাউজে  এনে ১৯৭১ সালে বিহারীরা বাঙ্গালীদের হত্যা করত। হত্যার পর তাদের লাশ ফেলে দিত পানির ট্যাংকি এবং পার্শবর্তী ডোবায়। ১৯৯০ দশকে  এখানকার বধ্যভূমিটি আবিষ্কার হয় এবং  অসংখ্য শহীদদের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এরপর পাম্প হাউজটিকে  জল্লাদ খানা যাদুঘর করা হয় এবং এটি বর্তমানে মুুক্তিযুদ্ধ যাদু ঘরের অংশ।  জল্লাদখানায় ১৯৭১ সালে যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের পরিবারে অনেক আত্মীয় স্বজনকে খুঁজে বের করে বিভিন্ন  সময়ে তাদের সাক্ষাতকার  বক্তব্য রেকর্ড করে তা যাদুঘরে সংরক্ষন করে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ।

সেখানে শহীদ  সাংবাদিক    খন্দকার আবু তালেব  সম্পর্কে তার ছেলে খন্দকার  আবুল আহসানের  বক্তব্য রেকর্ড করা আছে যিনি ট্রাইব্যুনালেও সাক্ষ্য দিয়েছেন। সে রেকডে দেখা যায় খন্দকার আবুল আহসান তার পিতার হত্যার ঘটনার সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার নামই উল্লেখ করেননি।
এই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়ার আগে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর  কর্তৃপক্ষের কাছে খন্দকার আবুল আহসান  কর্তৃক  আবু তালেব হত্যা  ঘটনার যে বিবরন উল্লেখ করা হয়েছে তা নিম্নরূপ। 

‘আজ দীর্ঘ ছত্রিশ বছর ‘আব্বা’ বলে সম্বোধন করার সমস্ত পথ পাকিস্তানি হায়েনারা বন্ধ করে দিয়ে করেছে এতিম, মাকে করেছেন উন্মাদিনী, পাগল ও বিধবা। একজনের অনুপস্থিতি একটা পরিবারের সহায়-সম্বলহীন করে দেয় তার জ্বলন্ত সাক্ষী এই শহীদ খন্দকার আবু তালেবের পরিবার।

আমার বাবা ছিলেন কর্মমুখী, দায়িত্বশীল, পরোপকারী এবং স্বাধীনচেতা একজন মানুষ জ্ঞানচর্চা, তার পছন্দের বিষয় ছিল। আমাদের ভাই-বোনের সাথে তাঁর আচরণ ছিল বন্ধুসুলব। আমাদেরকে উৎসাহ দিতেন। কিন্তু বাবাকে হারানোর পর আমাদের সে রকম সুযোগ হয়নি ভালভাবে পড়ালেখা। আমাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত কষ্টের। যুদ্ধের সময় দেশে মা ও ভাই-বোনকে টাকা পাঠাতাম ঢাকায়-- বিক্রি করে। আমাদের পরনে কাপড় পর্যন্ত ছিল না। আর্থিক দৈন্যের কারণে গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে লেখা করতে হয়েছে। বড় ভাইও অনেক কষ্ট করেছেন। স্বাধীনতার পর পরই তিনি প্রথমে গণ--- ৭৪ সালে দৈনিক অবজারভারে চাকরি করে সংসারের ভরণ-পোষণ করেছেন। কষ্ট করতে করতে উন্মাদিনী মা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। আর্থিক দৈন্য না কাটলেও আমরা বেঁচে আছি।
কারো কাছে আমাদের কিছু চাওয়ার নেই। সকল শহীদ পরিবারের মতো শহীদদের স্বপ্ন--- দেশই আমাদের একান্ত কাম্য।’


রায় পর্যালোচনা৫
আলুবদি হত্যাকান্ড এবং যাবজ্জীন কারাদণ্ড  বিষয়ে রায়ে যা বলা হয়েছে


মেহেদী হাসান
আব্দুল কাদের মোল্লাকে যে দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন কারদন্ড প্রদান করা হয় তার মধ্যে একটি হল মিরপুরের আলুবদি  গ্রামে গণহত্যার  ঘটনা। আব্দুল  কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এটি ছিল পাঁচ নং অভিযোগ। এ ঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লাকে কারাদণ্ড প্রদান বিষয়ে রায়ে উভয় পক্ষের সাক্ষীর সাক্ষ্য  বিশ্লেষন, ঘটনার বিবরন,  মুল্যায়ন  প্রভৃতি শিরোনামে  যা বলা হয়েছে  তা নিম্নে তুলে ধরা হল।


৫ নং অভিযোগ : রায়ে  আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ৫ নং অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরন তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়- ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল  সাড়ে চারটার সময় আব্দুল কাদের মোল্লার  সদস্যরা (মেম্বারস)  পাকিস্তান আর্মি সাথে নিয়ে মিরপুর পল্লাবীর  আলুবদি গ্রামে নিরীহ বেসামরিক লোকজনের ওপর আক্রমন পরিচালনা করে । আক্রমনের অংশ হিসেবে তারা নির্বিচারে গুলি চালায় এবং এতে ৩৪৪ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়। এ গণহত্যায় সহায়তার অভিযোগে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

সাক্ষী : রায়ে বলা হয়েছে এ অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ দুই জন সাক্ষী হাজির করেছে। তারা হলেন  ৬ নং সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা এবং ৯ নং সাক্ষী আমির হোসেন মোল্লা। তারা দাবি করেছেন তারা এ গনহত্যা দেখেছেন এবং আব্দুল কাদের মোল্লা মূল নায়ক হিসেবে এতে অংশগ্রহণ করে। তারা সে সময় ওই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

৬ নং সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা : এ সাক্ষী জানিয়েছেন তার বয়স তখন ১৯ বছর ছিল। ২৪ এপ্রিল সকালে হেলিকপ্টারের শব্দ শুনে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি দেখলেন গ্রামের পশ্চিম পাশে নদীর ধারে হেলিকপ্টার নামছে। এরপর নির্বিচারে গুলির শব্দ শুনে ভয়ে ভীত হয়ে দৌড়ে গ্রামের মধ্যে চলে আসলেন । এখানে সেখানে অনেক মৃতদেহ দেখলেন তিনি। গ্রামের উত্তর দিকে ঝোপের  নিচে  লুকিয়ে থাকলেন এরপর । সেখান থেকে তিনি দেখলেন   গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে  পাকিস্তান আর্মি গ্রামবাসী এবং ধানকাটা কৃষকদের ধরে আনছে। এরপর তিনি আরো দেখলেন আব্দুল কাদের মোল্লা, তার বিহারী দুস্কৃতকারী সহযোগী এবং পাকিস্তান আর্মি পূর্ব দিক থেকে গ্রামবাসী এবং ধানকাটা কৃষকদের ধরে নিয়ে আসছে এবং তাদের সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করছে।
একটু পরে সাক্ষী দেখলেন আব্দুল কাদের মোল্লা পাকিস্তান আর্মিদের সাথে উর্দু ভাষায় কথা বলছেন। তবে তিনি তা ঠিকমত শুনতে পাননি। এরপর  ধরে আনা লোকজনের ওপর গুলি শুরু হল এবং আব্দুল কাদের মোল্লা নিজেও গুলি করে রাইফেল দিয়ে। এভাবে তারা ৩৬০/৩৭০ জনকে হত্যা করে । এর মধ্যে ৭০/৮০ জন ছিল ধানকাটা কৃষক। তার মধ্যে একজন ছিল সাক্ষীর নিজের চাচা নবিউল্লাহ। সকাল ১১টা পর্যন্ত চলে এ  আক্রমন। এসময় তারা লুটপাট এবং গ্রামের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে।

ঘটনা বিশ্লেষন করে রায়ে মন্তব্য করা হয়েছে, সাক্ষী কর্তৃক এ ঘটনা দেখা, পাকিস্তান আর্মির উপস্থিতিতে  আব্দুল কাদের মোল্লাকে রাইফেল হাতে গুলি করতে দেখার  ঘটনা সাক্ষী মিথ্যা বলছে তার কোন কারণ আমরা দেখছিনা।
প্রশ্ন হল কাদের মোল্লাকে সে তখন চিনল কিভাবে। তিনি কি তাকে আগে থেকে চিনতেন? সাক্ষী বলেছেন তিনি তখন ছাত্রলীগ করতেন এবং ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট জহির উদ্দিনের পক্ষে প্রচারনায় অংশ নিয়েছেন। আব্দুল কাদের মোল্লা তখন ছাত্রসংঘের নেতা ছিলেন এবং জামায়াতে ইসলামীর দাড়িপাল্লা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারনা করেছেন।  ২ এবং ৫ নং সাক্ষীও এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন।  ৫ নং সাক্ষী বলেছেন আব্দুল কাদের মোল্লা তখন মিরপুর দুয়ারিপাড়ায় থাকতেন। এ থেকে বোঝা যায় সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা  ঘটনার আগে থেকেই আব্দুল কাদের মোল্লাকে চিনতেন।
রায়ে বলা হয় রাষ্ট্রপক্ষের ৯ নং সাক্ষী   আমির হোসেন মোল্লা বলেছেন আলুবদি গ্রামে প্রায় ৪০০ লোক হত্যার ঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লা সরাসরি অংশ নিয়েছেন। ৫ নং সাক্ষীও একথা বলেছেন।
 ৯ নং সাক্ষী তখন আলুবদি গ্রামে থাকতেন এবং তিনি  একজন মুক্তিযোদ্ধা। ৯ নং সাক্ষী আমির হোসেন মোল্লা বলেছেন আব্দুল কাদের মোল্লা ছাত্রসংঘের ৭০/৮০ জন লোকজন নিয়ে বিহারীদের প্রশিক্ষন দিয়েছে পাকিস্তান রক্ষার নামে। এ থেকেও বোঝা যায় তিনিও আগে থেকেই আব্দুল কাদের মোল্লাকে চিনতেন।

এ সাক্ষী বলেছেন ২৪ এপ্রিল ফজরের সময়  গ্রামের পশ্চিম পাশে তুরাগ নদীর তীরে  হেলিকপ্টার নামে। পূর্ব পাশ থেকে ১০০/১৫০  জন  বিহারী এবং বাঙ্গালী নিয়ে আব্দুল কাদের মোল্লা গ্রামে  প্রবেশ করে নির্বিচারে গুলি চালায়। এরপর তারা ৬৪/৬৫ জন গ্রামবাসীকে ঘর থেকে ধরে এনে গ্রামের উত্তর পাশে লাইনে দাড় করায়। ৩০০/৩৫০ জন ধানকাটা কৃষক যারা গ্রামে আসছিল ধানকাটার জন্য তাদেরও ধরে একই স্থানে  লাইনে দাড় করিয়ে গুলি চালায়।
৯ নং সাক্ষী বলেছেন তিনি দেখেছেন সেখানে আব্দুল কাদের মোল্লা রাইফেল হাতি দাড়িয়ে ছিল। আক্তার গুন্ডার হাতেও রাইফেল ছিল। তারাও  পাঞ্জাবীদের (পাকিস্তান আর্মি) সাথে গুলি চালায়। সেখানে প্রায় ৪০০ লোক মারা যায়। সাক্ষী জেরায় বলেছেন তিনি আক্তার গুন্ডাকে চিনতেন এবং তাকে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারির পর জেলে পাঠানো হয়েছিল। জেরায় তিনি আরো বলেন তিনি এবং তার পিতা গ্রামের পশ্চিম-উত্তর পাশে লুকিয়ে থেকে এ ঘটনা দেখেন। এ ঘটনায় তাদের ২১ জন আত্মীয় স্বজন প্রাণ হারায়।

মূল্যায়ন : রায়ে বলা  হয় আসামী পক্ষের আইনজীবী আব্দুস সোবহান বলেন,  রাষ্ট্রপক্ষের ৬ এবং ৯ নং সাক্ষীর সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য নয় কারণ তাদের দুই জনের তথ্যে গরমিল রয়েছে।  তারা ওই সময় গ্রামেও ছিলনা। ৬ নং সাক্ষীকে ওই দিন খুব সকালে সাভারের বিরুলিয়া পাঠিয়েছিলেন তার চাচা  নবিউল্লা।  আসামী পক্ষের ৫ নং সাক্ষী আলতাফ উদ্দিন মোল্লা ট্রাইব্যুনালে একথা বলেছেন। আলতাফ উদ্দিন মোল্লা রাষ্ট্রপক্ষের ৬ নং সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লার ছোটভাই। (শফিউদ্দিন মোল্লা রাষ্ট্রপক্ষে এবং তার ছোট ভাই আলতাফ উদ্দিন মোল্লা আব্দুল কাদের মোল্লার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালে)।

আসামী পক্ষের আইনজীবী দাবি করেছেন ৯  নং সাক্ষীর কথা বিশ্বাসযোগ্য নয় কারণ তার বিরুদ্ধে অসংখ্য ফৌজদারি মামলা ছিল।
রায়ে মন্তব্য করা হয় সিভিল এবং ক্রিমিনাল কেসে জড়িত থাকলেই একজন যে খারাপ চরিত্রের অধিকারী তা বোঝায় না এবং এ কারনে তার শপথসহ সাক্ষ্য উড়িয়ে দেয়া যায়না।
তাছাড়া ৬ নং সাক্ষীর ছোট ভাই আলতাফ উদ্দিন মোল্লা যিনি আসামী পক্ষের হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি তখন  ওই গ্রামে ছিলনা এবং তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর।
রায়ে বলা হয় ২৫ মার্চ গনহত্যার মাত্র এক মাসের মাথায় মিরপুরের এ ঘটনা ঘটে। পাকিস্তান আর্মি হাজার মাইল দূর থেকে এখানে আসে। গ্রাম সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা না থাকা স্বাভাবিক । গ্রামের কোথায় কি রয়েছে তাও তারা জানতনা।   পাকিস্তান সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনীর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কখন কিভাবে এবং কোন গ্রুপকে আক্রমন করতে হবে  সে বিষয়েও তাদের ধারণা ছিলনা। স্বাভাবিকভাইে স্থানীয় পাকিস্তানপন্থী লোকজনই তাদেরকে এ কাজে গাইড করেছে।  এরপর রায়ে বলা হয় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস  বিবেচনায়  আমরা এ বিষয়টি  কমন নলেজ হিসেবে নিতে পারি।
পাকিস্তান সৈন্যদের তখন স্থানীয় পাকিস্তানপন্থী এবং জামায়াতে ইসলামের সাথে জড়িতদের সহায়তা নিতে হয়েছিল। আব্দুল কাদের মোল্লা তখন জামায়াতের  ছাত্র শাখা ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্য ছিলেন। অধ্যাপক গোলাম আযম লিখিত জীবনে যা দেখলাম বইয়েও এ তথ্য রয়েছে।

রায়ে বলা হয় সাবির্ক ঘটনা এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা এটা  বিশ্বাস করতে পারি যে, ৬ নং সাক্ষী  কর্তৃক আব্দুল কাদের মোল্লাকে ঘটনা স্থলে  রাইফেল হাতে দেখা কথা সত্য। তিনি নিজেও গুলি চালিয়েছেন রাইফেল দিয়ে ।   তবে  গনহত্যার  মূল হোতা ছিল পাকিস্তান আর্মি।

রাষ্ট্রপক্ষের ৬ নং সাক্ষীর ছোট ভাই আলতাফ উদ্দিন মোল্লা আসামীর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন । তিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন মূলত আসামীকে এ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থেকে রেহাই দেয়ার জন্য। ঘটনার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৭ বছর। গনহত্যার ঘটনা তিনি অস্বীকার করেননি।

আসামী পক্ষের সাক্ষী আলতাফ উদ্দিন মোল্লা বলেছেন সাভারে বিরুলিয়ায় তাদের পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। ২৫ মার্চ রাতে আক্তার গুন্ডা, ডোমাম গুল মোহাম্মদসহ ৪/৫ হাজার বিহারী  পাকিস্তান আর্মির নেতৃত্বে  আলুবদি গ্রামে আক্রমনের পর তারা বিরুলিয়ায় আশ্রয় নেন। তিনি বলেছেন তার বড় ভাই শফিউদ্দিন মোল্লা তখন গ্রামে ছিল এবং ২৪ এপ্রিল যেদিন সকালে গ্রামে হেলিকপ্টার নামল সেদিন সকালে তার চাচা নবিউল্লাহ তাকে বিরুলিয়ায় পাঠিয়েছিল। তিনি (আলতাফ উদ্দিন মোল্লা) এটি  ঘটনা জানল কি করে? তার ব্যাখ্যা করা হয়নি।
রায়ে বলা হয়  নিবউল্লাহ ওই ঘটনায়  মারা যায়। কাজেই  আলতাফ উদ্দিন মোল্লা  কেমন করে জানল যে, তার বড় ভাই শফিউদ্দিন মোল্লাকে নবিউল্লা বিরুলিয়ায় পাঠিয়েছিল? এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল বিস্মিত। এ বিষয়ে আলতাফ উদ্দিন মোল্লা নিশ্চুপ। তিনি ঘটনার আগে থেকেই  বিরুলিয়ায় তার পরিবারের সাথে থাকতেন। কাজেই  এটা সত্য হলে আব্দুল কাদের মোল্লা এ ঘটনার সাথে জড়িত ছিল কি-না তা  বলার উপযুক্ত ব্যক্তি তিনি নন। তিনি বলেছেন আব্দুল কাদের মোল্লা তখন ঘটাস্থলে ছিলনা এবং তিনি তাকে দেখেননি। তিনি আরো বলেছেন এ মামলা শুরুর আগে তিনি আব্দুল কাদের মোল্লার নামও শুনেননি। এটাও যদি সত্য হয় তাহলে  আব্দুল কাদের মোল্লা এ ঘটনায় ছিল কি-না  তাও  তার জানার কথা নয়। আব্দুল কাদের মোল্লা সেখানে ছিলনা বলে যেকথা তিনি বলেছেন তাও অসত্য  হিসেবে গন্য এবং  এ ঘটনার সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার সংশ্লিষ্টতা থেকে তাকে রেহাই দেয়ার জন্য তিনি এটি বলেছেন।
আসামী পক্ষ বলেছে, ৯ নং সাক্ষী আব্দুল কাদের মোল্লাকে রাইফেল হাতে দাড়িয়ে থাকতে দেখেছে এবং অংশগ্রহণ করেছে এবং ৪০০ লোক হত্যা করা হয়েছে  বলে ট্রাইব্যুনালে যে কথা বলেছে সে কথা সে  তদন্ত কর্মকর্তার কাছে  বলেনি। আসামী পক্ষের এ দাবি অস্বীকার করেছে সাক্ষী। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, সাক্ষী তাকে বলেছেন, আব্দুল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে  অসিম, আক্তার গুন্ডা, নওয়াজ, লতিফ, ডোমাসহ  ১৪০-১৫০ জন  লোক আলুবদি গ্রামে হামলা চালায়।
রায়ে বলা হয় ৪০ বছর আগের ঘটনা বর্ননায় সামান্য এদিক সেদিক হওয়া অস্বাভিক নয়।
৯ নং সাক্ষীর বিরুদ্ধে ক্রিমানল কেসের সাথে জড়িত  বিধায় তার বিশ্বাসযোগ্যতা  নেই বলে আসামী পক্ষের দাবির সাথে আমরা একমত নই। ক্রিমিনাল কেসের সাথে জড়িত থাকলেই তার চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হবে তিনি সাক্ষ্য দিতে পারবেননা তা নয়। এমনিক কারো যদি  ক্রিমিনাল কেসে  সাজাও হয় এবং  অপরাধ ঘটিয়েও থাকে তবু আমরা তার সাক্ষ্য বাতিল করার প্রয়োজন মনে করিনা।  ফৌজাদারি অপরাধে সাক্ষীর  সাজা হওয়া এবং অপরাধমূলক কাজের সাথে জড়িত হওয়ার  বিষয়টি  কোর্টে প্রদত্ত সাক্ষ্যকে প্রভাবিত করে কি-না সেটা হল দেখার বিষয়। এ বিষয়টি কিভাবে তার সাক্ষ্যকে প্রভাবিত বা দুর্বল করেছে তা আসামী পক্ষ প্রমান করতে পারেনি।

রায়ে বলা হয় এটা সন্দেহাতিতভাবে প্রমানিত হয়েছে যে, আব্দুল কাদের মোল্লা ঘটনার ঘটনাস্থলে সময় উপস্থিত ছিল। তিনি পাকিস্তানী সৈন্যদের সহায়তা করেছেন, অংশগ্রহণ করেছেন এবং জঘন্য এ গনহত্যায় তার নৈতিক সমর্থন ছিল। আব্দুল কালে মোল্লা শুধুমাত্র ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল আমরা যদি  শুধু এটুকুও ধরে নেই তবু এর  দায়  এবং এর প্রতি নৈতিক সমর্থন তিনি  এড়াতে পারেননা।
কাজেই আসামী আব্দুল কাদের মোল্লা রাইফেল হাতে ঘটনা স্থলে উপস্থিত ছিল  অন্যান্যদের সাথে নিয়ে এ বিষয়টি আইনগতভাবে এবং বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষীর মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে রাষ্ট্রপক্ষ প্রমান করতে পেরেছে।
Verdict analysis of abdul kader mollah
International Crimes Tribunal, Bangladesh




ট্রাইব্যুনালে মাওলানা সাঈদীর সাড়াজাগানো বক্তব্য// আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলে আমি যেন ঈমান নিয়ে মরতে না পারি


Mehedy Hasan
০৬/১২/২০১২
৬ ডিসেম্বর ২০১২। বৃহষ্পতিবার। মাওলানা সাঈদীর সমস্ত  বিচার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। রায়ের তারিখ ঘোষনা করা হবে। ট্রাইব্যুনাল কক্ষে গিজ গিজ করছে সাংবাদিক, আইনজীবী এবং আরো কয়েক শ্রেণি পেশার  মানুষ। ঘড়ির কাটায় তখন বিকাল সাড়ে তিনটা। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়েছে। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে আইনজীবী  মিজানুল ইসলাম  ট্রাইব্যুনালের কাছে অনুরোধ করেন মাত্র পাঁচ মিনিট  মাওলানা সাঈদীকে কথা বলতে দেয়ার জন্য। কাঠগড়ায় অবস্থানরত মাওলানা সাঈদী তখন দাড়িয়ে ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশে বলেন- পাঁচ মিনিট নয় মাত্র দুই থেকে আড়াই মিনিটে  আমি শেষ করতে পারব ইনশাআল্লাহ। এরপর ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক  তাকে কথা বলার অনুমতি দেন শর্তসাপেক্ষে। বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, কাউকে কটাক্ষ করে বা কোন রাজনৈতিক বক্তব্য  দেয়া হবেনা এ নিশ্চয়তা দেয়া হলে কথা বলতে দেয়া হবে।

অনুমতি পাবার পর রায়ের তারিখ ঘোষনার ঠিক পূর্ব মুহুর্তে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী মাত্র আড়াই থেকে তিন মিনিট  আবেগময়ী এবং মর্মস্পর্শী   বক্তব্য রাখেন।    নিজেকে বিশ্বাসের চূড়ান্ত এবং শেষ স্তরে সপে দিয়ে মাওলানা সাঈদী  অত্যন্ত দৃঢ় কন্ঠে উচ্চারন করেন-  আমার বিরুদ্ধে যে ২০টি অভিযোগ আনা হয়েছে তার একটিও যদি সত্য হয় তাহলে আমি যেন ঈমান নিয়ে মরতে না পারি । রোজ কিয়াকমতের দিন যেন রসুল (সা) এর শাফায়াত  আমি না পাই। আর যারা আমার বিরুদ্ধে  মিথ্যা অভিযোগ  এনেছে  তারা যদি তওবা না করে এবং তওবা যদি তাদের নসিব না হয় তাহলে  গত দুইটি বছর  আমি এবং আমার সন্তানরা যে যন্ত্রনা ভোগ করেছি, আমার যে পরিমান  চোখের পানি ঝরেছে, আমার সন্তানদের যে চোখের  পানি ঝরেছে, তার  প্রতিটি ফোটা অভিশাপের বহ্নিশিখা হয়ে  আমার থেকে শতগুন যন্ত্রনা এবং কষ্ট ভোগের আগে যেন তাদের মৃত্যু না হয়। আর জাহান্নাম হয় যেন তাদের চির ঠিকানা।

মাওলানা সাঈদী বলেন, যদি আমার প্রতি  জুলুম করা হয় করা  হয় তাহলে এ বিচারের দুইটি পর্ব হবে। আজ এখানে একটি পর্ব শেষ হবে। আর কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর দরবারে আরেকটি বিচার বসবে। সেই বিচারে আমি হব বাদী। আর আমার বিরুদ্ধে যারা জুলুম করেছে তারা হবে আসামী।

তিনি যখন  কথা বলেন তখন পিনপতন নিরবতা বিরাজ করে ট্রাইব্যুনালে ।
বিচার কার্যক্রম শেষে মাওলানা সাঈদীর   তিন ছেলে, আত্মীয় স্বজন এবং আইনজীবীরা  যখন তার  কাঠগড়ার সামনে যান তখন তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি তার সন্তানদের মাথায় চুমু খান। আইনজীবী এবং অন্যান্যদের সাথে করমর্দন করেন এবং দোয়া করেন। এরপর পুলিশ এসে তাকে  হাজত খানায় নিয়ে যায়।

মাওলানা সাঈদী যা বলেছেন :
আমি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, ৫৬ হাজার বর্গ মাইলের এই বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলার আপামর জনগনের  নিকট অতি পরিচিত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। এই মামলায় আমার নাম বিকৃতি করে তদন্ত কর্মকর্তা কখনো দেলোয়ার শিকদার বর্তমানে সাঈদী, কখনো দেলু ওরফে দেইল্যা, দেউল্লা বলে আখ্যায়িত করেছে আমাকে।
আমার বিরুদ্ধে  চুরি ডাকাতি, জেনা ব্যাভিচার এর অভিযোগ আনছেন তিনি। তিনি ১২/১৪ বার পিরোজপুর গেছেন। রাজনৈতিক কারনে বর্তমান সরকার দ্বারা প্ররোরিচত হয়ে তিনি এসব অভিযো  এনেছেন। স্থানীয় এমপির সাথে বসে তিনি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী সাবুদ তৈরি করেছেন।
রোজ কিয়ামতের ভয় আছে, পরকালে বিশ্বাস আছে এমন কোন মুসলমান কোন মানুষের বিরুদ্ধে এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ আনতে পারেনা।
আমার বিরুদ্ধে যে ২০টি অভিযোগ আনা হয়েছে তার একটিও যদি সত্য হয় তাহলে আমি যেন ঈমান নিয়ে মরতে না পারি । রোজ কিয়াকমতের দিন যেন রসুল (সা) এর শাফায়াত  আমি না পাই। আর যদি আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা হয় এবং যারা এ মিথ্যা অভিযোগ এনেছে তারা যদি তওবা না করে এবং তওবা যদি তাদের নসিব না হয় তাহলে  গত দুইটি বছর আমি এবং আমার সন্তানরা যে কষ্ট এবং যন্ত্রনা ভোগ করেছে,  আমার যে চোখের পানি ঝরেছে, আমার সন্তানদের যে চোখের  পানি ঝরেছে তার  প্রতিটি ফোটা যেন  অভিশাপের বহ্নিশিখা হয়ে আমার থেকে শত গুন যন্ত্রনা ভোগের আগে, কষ্ট ভোগের আগে আল্লাহ তায়ালা যেনো তাদের মৃত্যু না দেন। মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ অযুত ধারায় বর্ষিত হোক। আর জাহান্নাম যেন হয় এদের চিরস্থায়ী ঠিকানা।

আমার  প্রতি যদি জুলুম করা হয় তাহলে এ বিচারের দুউটি পর্ব হবে। আজ এখানে একটি পর্ব শেষ হবে। আর রোজ কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর দরবারে আরেকটি  বিচার বসবে। সেদিন রাজাধিরাজ, সকল সম্রাটদের সম্রাট, সকল বিচারকরদের বিচারপতি, আসমান ও জমিনের  মালিক  মহান আল্লাহ হবেন  বিচারপতি। যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে  আমার প্রতি  জুলুম করা হয় তাহলে আমার প্রতি যারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন, আজ এখানে যারা আছেন তারা হবেন আসামী। আর আমি হব বাদী। আপনাদের তিনজনের প্রতি আমি আশা রেখে বলছি আপনাদের ন্যায় বিচারের তৌফিক দান করুন আল্লাহ।



আমি হাজার বার ফাঁসির মঞ্চে দাড়াতে প্রস্তুত
২৯/০১/২০১৩
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, আমি হাজার বার ফাঁসির মঞ্চে দাড়াতে প্রস্তুত আছি। আমি মৃত্যুকে পরোয়া করিনা। মৃত্যু নিয়ে কোন ভয়ভীতি আমার নেই। আমি আমার যৌবন কাল থেকে শুরু করে  আজ ৭৩ বছর বয়স পর্যন্ত মানুষকে পবিত্র কোরআনের দাওয়াত দিয়েছি।   কোরআনের একজন খাদেম হিসেবে গত ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে কোরআনের দাওয়াত পৌছে দিয়েছি।  লক্ষ লক্ষ মানুষ আমার মাহফিলে যোগ দেয়। অসংখ্য মানুষ এসব মাহফিল থেকে সঠিক পথের দিশা পেয়েছে।  দেশ বিদেশের লক্ষ কোটি মানুষ আমাকে  ভালবাসেন। আমি সাঈদী লক্ষ কোটি মানুষের চোখের পানি মিশ্রিত দোয়া ও ভালবাসায় সিক্ত।  এটাই কি আমার অপরাধ? আমি  কোরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছি। এটাই কি আমার অপরাধ? এটা যদি আমার অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে এ অপরাধে অপরাধী হয়ে হাজার বার ফাঁসির মঞ্চে যেতে আমি রাজি আছি।

আলোচিত স্কাইপ কেলেঙ্কারির জের ধরে ট্রাইব্যুনাল পুনরায় গঠনের পর মাওলানা সাঈদীর মামলার ক্ষেত্রে পুনরায় যুক্তি শোনার ব্যবস্থা করেন ট্রাইব্যুনাল। ২৯ জানুয়ারি ২০১৩  উভয় পক্ষের পুনরায় যুক্তি উপস্থান শেষ হলে সেদিন আবার নতুন করে  রায়ের তারিখ ঘোষনার  আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ।  রায়ের তারিখ বিষয়ে আদেশ ঘোষনার আগ  মুহুর্তে কাঠগড়ায় অপেক্ষমান মাওলানা সাঈদী দাড়িয়ে বলেন, মাননীয় আদালত আনপারা সবার কথা শুনলেন। রাষ্ট্রপক্ষের কথা শুনলেন, আসামী পক্ষের আইনজীবীদের কথা শুনলেন কিন্তু অভিযুক্ত হিসেবে আমার কথা শুনলেননা। আমরা বিরুদ্ধে অভিযোগ বিষয়ে আমার কিছু কথা ছিল তা আপনাদের শোনা উচিত। আমি অতি সংক্ষেপে তা বলতে চাই।
তখন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির বলেন, আপনার কথা বলার সুযোগ নাই। এরপর মাওলানা সাঈদী কথা বলতে শুরু  করেন। কথা বলা শুরুর পরপর বারবার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হয়।   রাষ্ট্রপক্ষের  আপত্তি এবং বাঁধার মুখে ট্রাইব্যুনালও মাওলানা সাঈদীকে অনুরোধ করেন কথা বলা শেষ করার জন্য।  আসামী পক্ষের আইনজীবীদের ট্রাইব্যুনাল অনুরোধ করেন তাকে থামানোর জন্য।  কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের বাঁধা উপক্ষো করে মাওলানা সাঈদী তার কথা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।  এর এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি উত্থাপন করা হলে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে  উত্তেজনা  দেখা দেয়। শেষে এ অবস্থার মধ্যে মাওলানা সাঈদী তার লিখিত বক্তব্যের মূল অংশ পড়ে  শুনিয়ে শেষ করেন।

মাওলানা সাঈদী বলেন,
২০১১ সালের অক্টোবরের ৩ তারিখ এই আদালতের তদানিন্তন চেয়ারম্যান নিজামুল হক আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পড়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমি দোষী না নির্দোষ? আপনি তখন এই আদালতের  একজন বিচারক  ছিলেন। বিচারাতি নিজামুল হক ন্যায়  বিচারে ভ্রষ্ট পথ অনুসরন করেছিলেন বিধায় একরাশ গ্লানি নিয়ে স্বেচ্ছায় সরে পড়তে হয়েছে। আজ সেই চেয়ারে আপনি সম্মানিত চেয়ারম্যান। এটাই আল্লাহর বিচার। 
কোরআনের আয়াত পড়ে মাওলানা সাঈদী বলেন,  আল্লাহ  যাকে খুসী সম্মানিত করেন  আর যাকে খুসী অসম্মানিত করেন।

তিনি বলেন, সেদিন তখনকার চেয়ারম্যান নিজামুল হকের প্রশ্নের জবাবে আমি যা বলেছিলাম, সেখান থেকেই আমার সামান্য কিছু বক্তব্য শুরু করছি। নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে আমি বলেছিলাম- আমার বিরুদ্ধে আনীত ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত এবং শতাব্দীর জঘন্য ও নিকৃষ্টতম মিথ্যাচার। আল্লাহ কসম! আমার বিরুদ্ধে রচনা করা চার সহা¯্রাধিক পৃষ্ঠার প্রতিটি পাতার প্রতিটি লাইন, প্রতিটি শব্দ, প্রত্যেকটি বর্ণ মিথ্যা, মিথ্যা এবং মিথ্যা। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে কোন এক দেলোয়ার শিকদারের করা অপরাধ সমূহ আমার উপর চাপিয়ে দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউশন আমার বিরুদ্ধে মিথ্যার পাহাড় রচনা করেছেন।
আজ আমি আল্লাহর নামে শপথ নিয়ে আপনাদের সামনে বলতে চাই, সরকার ও তার রাষ্ট্র যন্ত্র কর্তৃক চিত্রিত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের হত্যাকারী, লুন্ঠন, গণ হত্যাকারী, ধর্ষক, অগ্নি সংযোগকারী, দেলোয়ার শিকদার বা ‘দেলু’ বা দেইল্যা রাজাকার আমি নই। আমি ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রিয় জন্মভূমি এই বাংলাদেশের আপামর জনসাধারনের নিকট চিরচেনা পবিত্র কোরআনের একজন তাফসীরকারক, কোরআনের  একজন খাদেম, কোরআনের পথে মানুষকে আহ্বানকারী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।
যে আমি সেই যৌবন কাল থেকেই শান্তি ও মানবতার উৎকর্ষ সাধনে পবিত্র কুরআনের শ্বাশ্বত বানী প্রচার করার লক্ষ্যে নিজ জন্ম ভূমি থেকে শুরু করে বিশ্বের অর্ধশত দেশ গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত ভ্রমন করেছি।  সেই আমি আজ ৭৩ বছর বয়সে জীবন সায়াহ্নে এসে সরকার ও সরকারী দলের দায়ের করা ‘ধর্র্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত হানার’ হাস্যকর ও মিথ্যা মামলায় গত ২৯ জুন ২০১০ থেকে আজ পর্যন্ত কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে মানবেতর অবস্থায় দিনাতিপাত করছি।
আমার বিরুদ্ধে ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত হানার অভিযোগ উত্থাপন এবং তজ্জন্য আমাকে তড়িৎ গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করার কাজটি করলো এমন এক সরকার, যারা আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস কথাটি দেশের সংবিধানে বহাল রাখাকে সহ্য করতে না পেরে অবলীলায় তা মুছে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি।
এ পর্যায়ে  রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে  বাঁধা দেয়া হয় মাওলানা সাঈদীর বক্তব্য রাখা প্রসঙ্গে।  সে বাঁধা উপেক্ষা করে মাওলানা সাঈদী  তার কথা বলতে থাকেন। তিনি বলেন,  দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই ৪২ বছরের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে কোন বিষয়েই কোন মামলা ছিলো না। সামান্য একটি জিডিও ছিলো না। গণতন্ত্রের লেবাসধারী বর্তমান এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের বদান্যতায়, মহানুভবতায় মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে আজ আমি ১৭টি মামলার আসামী। সেই জুন ২০১০ থেকে অদ্যাবধি কথিত মানবতাবিরোধী ২০ টি অপরাধের অভিযোগসহ ১৭টি মামলা আমার বিরুদ্ধে দায়ের করে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে সরকার আমাকে তাদের এক রাজনৈতিক তামাশার পাত্রে পরিনত করেছে, যা আজ দেশবাসীর কাছে মেঘমুক্ত আকাশে দ্বিপ্রহরের সূর্যের মতই স্পষ্ট।
যে ২০টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আজ আপনাদের সম্মুখে আমি দন্ডায়মান, সেগুলো সরকারের হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই সাজানো। ১৯৭১ সনে পিরোজপুর বা পাড়েরহাটে পাক বাহিনী যা ঘটিয়েছে, সেসব কাহিনী সৃজন করে চরম মিথ্যাবাদী ও প্রতারক এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও তার সহযোগীরা

নীতি নৈতিকতার মূলে পদাঘাত করে আমার নামটি জুড়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী, আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী, মৃত্যুর পরের আযাবে বিশ্বাসী, পরকাল ও জাহান্নামের কঠিন শাস্তিতে বিশ্বাসী কোন মুসলমানের পক্ষে এতো জঘন্য মিথ্যাচার আদৌ সম্ভব নয়।
তদন্ত কর্মকর্তা এবং সহযোগিতরা তাদের সৃজিত অভিযোগগুলো প্রমানের জন্য কয়েকজন বিতর্কিত চরিত্র, ভ্রষ্ট ও সরকারী সুবিধাভোগী দলীয় লোক ব্যতিত স্বাক্ষী প্রদানের জন্য কাউকেই হাজির করতে পারেননি।
 এ সমসয় আবারো রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি তোলা হয় তার বক্তব্য বন্ধ করে দেয়ার জন্য। তারপরও মাওলানা সাঈদী তার কথা অব্যাহত রাখেন। তিনি বলেন,  প্রচন্ড ক্ষিপ্রতার সাথে এই ট্রাইব্যুনালের প্রাক্তন চেয়ারম্যান বিচার প্রক্রিয়ার সমাপ্তি টেনেছেন। তিনি আইন-কানুন, ন্যায় বিচারের শপথ, অভিযুক্ত হিসেবে আমার বক্তব্য প্রদানের প্রাপ্য অধিকার প্রদান কোন কিছুরই তোয়াক্কা করেননি বরং তিনি রায় ঘোষনার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এরই মধ্যে ঘটে যায় মহান রাব্বুল আলামিনের হস্তক্ষেপের ঘটনা। আজ সেই একদা সমাপ্তকৃত বিতর্কিত মামলার পূন: সমাপ্তির দ্বিতীয় আয়োজন। কিন্তু আমি পূর্বের ন্যায় একই উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি মামলা যেনো-তেনো প্রকারে শেষ করার সেই একই ত্রস্ততা।
মাওলানা সাঈদী বলেন, এই ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৃত বিবেচনায় আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত মামলার রায় প্রকাশ করে গেছেন। সাবেক চেয়ারম্যান মিডিয়ায় প্রকাশিত স্কাইপ সংলাপকে মেনে নিয়ে অন্যায় ও বে-আইনীভাবে পরিচালিত বিচার কার্যের সকল দায়ভার বহন করে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে বিদায় হয়েছেন। ষড়যন্ত্র ও অন্যায়ভাবে বিচার কার্য্য পরিচালনার বিষয়টি তার স্কাইপ কথোপকথনে প্রকাশ পেয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যানের বক্তব্যে প্রচ্ছন্নভাবে উঠে এসেছে কিভাবে সরকারের চাপে পড়ে, সুপ্রীম কোর্টের জনৈক বিচারপতির প্রলোভনে পড়ে, তথাকথিত ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের ডিকটেশন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করে এবং তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে প্রসিকিউশনের সাথে অবৈধ যোগসাজসে বিচার কার্য পরিচালনায় ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে, আদালতের ক্ষমতাকে অবৈধভাবে ব্যবহার করে আমার পক্ষের স্বাক্ষীর অগ্রিম তালিকা জমা দিতে বাধ্য করে সেই তালিকা প্রসিকিউশন এবং তাদের মাধ্যমে সরকার, সরকারী দল ও স্থানীয় প্রশাসনকে সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহন করে স্বাক্ষীদের উপর চাপ সৃষ্টি ও ভয় ভীতি দেখিয়ে স্বাক্ষ্য প্রদানের জন্য আদালতে হাজির না হওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টিসহ নানাবিধ অনিয়ম ও বে আইনী কর্মপন্থার মাধ্যমে সমগ্র বিচার কার্যটি কলুষিত করেছেন।
এ পর্যায়ে আবারো রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি তোলা হয়। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির  মাওলানা সাঈদীকে অনুরোধ করেন থামার জন্য। তখন মাওলানা সাঈদী তার লিখিত বক্তব্য সংক্ষেপ করে বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার এর পূর্বে দু’বার ক্ষমতাসীন ছিলো। তখন আমি যুদ্ধাপরাধী ছিলাম না, আমার বিরুদ্ধে কোন মামলাও হয়নি। একটি জিডিও হয়নি বাংলাদেশের কোথাও। আর তদন্ত কর্মকর্তা এই আদালতে বলেছেন ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পর আমি নাকি ৮৫ সাল পর্যন্ত পলাতক ছিলাম। তিনি আমাকে ছাত্র জীবন থেকে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম বলে মিথ্যচার করেছে। ১৯৭৯ সালে আমি সাধারন সমর্থক হিসেবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করি। এর পূর্বে আমি কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থক ছিলাম না। ১৯৯০ সনের শুরু অবধি আমার রাজনৈতিক কোন পরিচয়ও ছিল না। ১৯৮৯ সালে আমি জামায়াতের মজলিসে শুরায় সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হই।
মাওলানা সাঈদী বলেন, দেশবাসী স্বাক্ষী, রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার কখনো কোনকালেই তেমন কোন ভূমিকা ছিল না। বরাবরই আমার বিচরন ছিলো কোরআনের ময়দানে। জনগনকে কোরআনের দাওয়াত পৌঁছানোই ছিল আমার কাজ। আমার তাফসীর মাহফিলগুলোতে হাজারো লাখো মানুষ অংশগ্রহন করে। এইসব মাহফিল থেকে অসংখ্য অগনিত মানুষ সঠিক পথের দিশা পেয়েছে, নামাজি হয়েছে। এটাই কি আমার অপরাধ? দেশ বিদেশের লক্ষ কোটি মানুষ আমার উপর আস্থা রাখেন, আমাকে বিশ্বাস করেন, আমাকে ভালবাসেন। আমি সাঈদী লক্ষ কোটি মানুষের চোখের পানি মিশ্রিত দোয়া ও ভালবাসায় সিক্ত। এই ভালবাসাই কি অপরাধ? বিগত অর্ধ শতাব্দী ধরে আমি কোরআনের দাওয়াত বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌছে দিয়েছি, এটাই কি আমার অপরাধ? আমি কোরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহন করেছি, এটাই কি আমার অপরাধ? মাননীয় আদালত এটা যদি আমার অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে, এ অপরাধে অপরাধী হয়ে হাজার বার ফাঁসির মঞ্চে যেতে আমি রাজি আছি। আমি  মৃত্যুকে পরোয়া করিনা। মৃত্যু নিয়ে কোন ধরনের ভয় বা ভীতি আমার মধ্যে নেই।
মাওলানা সাঈদী বলেন, আল্লাহর স্বার্বভৌমত্ব ও একত্ববাদ এবং কোরআনের বিপ্লবী দাওয়াত প্রচারে আমি অকুন্ঠ চিত্ত। এ কারনে সরকার তাদের ইসলাম বিদ্বেষী মিশন বাস্তবায়নে আমাকে অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করে আমাকে বিতর্কিত ও জনগন থেকে বিচ্ছিন্ন করার এবং নিশ্চিহ্ন করার জন্যই আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উত্থাপন করেছে। আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চারিতার্থ করার জন্য এবং আমাকে তাদের আদর্শিক শত্রু মনে করে সরকার কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে আমার বিরুদ্ধে শতাব্দীর জঘন্য ও নিকৃষ্টতম মিথ্যা এ মামলা পরিচালনা করেছেন। আমি রাজাবিরাজ, স¤্রাটের স¤্রাট, সকল বিচারপতির মহা বিচারপতি আকাশও জমীনের সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র অধিপতি, মহান আরশের মালিক, সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নামে শপথ করে বলছি, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন মানবতা বিরোধী অপরাধ আমি করি নাই।
আমি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ! আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা, তার সহযোগী প্রসিকিউশন এবং মিথ্যা স্বাক্ষ্যদাতাদের হেদায়েত করো আর হেদায়েত তাদের নসীবে না থাকলে তাদের সকলকে শারিরিক, মানসিক ও পারিবারিকভাবে সে রকম অশান্তির আগুনে দগ্ধিভুত করো যেমনটি আমাকে, আমার পরিবারকে এবং বিশ্বব্যাপি আমার অগনিত ভক্তবৃন্দকে মানসিক যন্ত্রনা দিয়েছে। আর জাহান্নাম করো তাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা। এসময়   রাষ্ট্রপক্ষের তীব্র আপত্তি এবং  বাঁধার  ফলে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।  মাওলানা সাঈদী বলেন, আমি আমার সকল বিষয় সেই মহান আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়েছি, যিনি আমার কর্ম বিধায়ক এবং তাঁকেই আমি আমার একমাত্র অভিভাবক হিসেবে গ্রহন করেছি। সাহায্যকারী হিসেবে মহান আরশের মালিক আল্লাহ রব্বুল আলামীন-ই আমার জন্য যথেষ্ঠ।  এর পর তিনি কথা বলা বন্ধ করেন।




২৪/৪/২০১২
শেষ বিচারের মালিকের ফয়সালার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনি

বিচারের নামে আমাকে নিয়ে যা করা হচ্ছে তাতে আমি হতভম্ব, স্তম্ভিত ও বিস্ময়ে বিমুঢ়। তাই আমি আদালতের কার্যক্রম অনুসরণ করা ও বোঝার প্রচেষ্টা অনেক আগেই পরিত্যাগ করে আদালত চলাকালে পবিত্র কুরআন মাজিদ তেলাওয়াতে মগ্ন থাকি এবং শেষ বিচারের মালিকের ফয়সালার প্রতীক্ষায় প্রহর গুণি। আদালতের রেওয়াজ পূরণের দায়িত্ব আমার আইনজীবিদের হাতে ছেড়ে দিয়েছি।

আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং মিথ্যাচার একাকার হয়ে আমার জন্য যে ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির আবহ সৃষ্টি করেছে তা উপলদ্ধি কিংবা মোকাবিলা করার কোনো ক্ষমতাই আমার নেই। আমি আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বেপরোয়া, যথেচ্ছাচার এবং তা বাস্তবায়নের এক আগ্রাসী মিথ্যাচারের শিকার।

মাননীয় আদালতের কাছে আমার একটি নিবেদন, অন্তত ৭২ বছরের বৃদ্ধ বয়সে এই রাজনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রতিদিন আদালতে উপস্থিত থাকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে অব্যাহতি দিয়ে আমার অনুপস্থিতিতে মাননীয় আদালত ও প্রসিকিউশন মিলে যা যা করার তা সম্পন্ন করতে পারেন।

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার প্রতিবাদে বিএনপি আয়োজিত হরতালের দ্বিতীয় দিন চলছে আজ মঙ্গলবার,  ২৪ এপ্রিল২০১২। গতকাল সোমবার  হরতালের প্রথম দিনে ট্রাইব্যুনাল চলেনি। আজো হরতালের কারনে মাওলানা সাঈদীর সিনিয়র  কোন আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে আসতে পারেননি।

জুনিয়র কয়েকজন আইনজীবী আদালতে হাজির হয়ে বলেন, আমরা পায়ে হেটে এসেছি। সিনিয়র আইনজীবীগন আসতে পারেননি। একথা বলার জন্য তারা আমাদের পাঠিয়েছেন। জুনিয়র আইনজীবীরা এরপর আদালতের কার্যক্রম মুলতবি দাবি করেন। কিন্তু আদালত মুলতবি প্রস্তাবে রাজি না হয়ে কোর্ট  পরিচালনার কথা জানান। তখন   কাঠগড়ায় থাকা মাওলানা সাঈদী দাড়িয়ে আদালতের অনুমতি নিয়ে নিজে  কথা বলেন মুলতবি আবেদনের পক্ষে।

মাননীয় আদালত
দেশে আজও হরতাল পালিত হচ্ছে। ফলে সকল প্রকার চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় সঙ্গত কারণেই গতকালের ন্যায় আজকেও আমার আইনজীবীগণ আদালতে উপস্থিত থাকতে সক্ষম হননি। অনুরূপ পরিস্থিতিতে গতকাল আসামি হিসাবে আমার অবস্থান ব্যাখ্যা করার পর আপনি আদালত মুলতবী করেছিলেন। একই পরিস্থিতিতে আজকে আবার আদালত কার্যক্রম চালানোর প্রয়াস পাবেন তা আমি আশা করিনি।

মাননীয় আদালত
আমাদের দেশে হরতাল চলাকালে নি¤œ কিংবা উচ্চ আদালতের কোথাও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় না। সুবিচারের স্বার্থে এ রেওয়াজ দীর্ঘদিন থেকেই বহাল রয়েছে, ব্যতিক্রম শুধু এই আদালত। তাতেও আমার কোনো আপত্তি থাকার সুযোগ থাকত না, যদি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমার আইনজীবীগণ আদালতে হাজির হতে সক্ষম হতেন।

মাননীয় আদালত
আইন অনুযায়ী ওকালাতনামা আদালতে দাখিল করার পর আসামীর কোনো কিছু বলার অধিকার রহিত হয়ে যায়। আসামীর কৌঁসুলিই তার পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন এবং সুবিচার প্রাপ্তির জন্য তৎপর থাকেন, তাই আইনজীবীর অনুপস্থিতিতে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সুবিচার পরিপন্থি। আসামি হিসাবে আমার এই অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আরো প্রনিধানযোগ্য। বিশেষ করে এমন একটি সময়ে, যখন এই সম্মানিত আদালত একাধারে আইন প্রণয়ন এবং সেই আইনকে অনুসরণপূর্বক বিচারকার্য সমাধান করার দ্বিবিধ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে স্বাক্ষ্য আইনের একটি শ্বাশত ধারার ব্যত্যয় ঘটিয়ে আসামির চিরায়ত অধিকার হরণ করে আই ও-কে দিয়ে স্বাক্ষীদের প্রক্সি স্বাক্ষ্য গ্রহণের এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত প্রদানের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করছেন।

মাননীয় আদালত
আমি একজন ব্যক্তি মাত্র। আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও মিথ্যাচার একাকার হয়ে গিয়ে আমার জন্য যে ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির আবহ সৃষ্টি করেছে তা উপলদ্ধি করা কিংবা মোকাবিলা করার কোনো ক্ষমতাই আমার নেই।

মাননীয় আদালত
আপনার প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক বিচার প্রার্থী হিসেবে আমার অবস্থান তথা অনুভূতি প্রকাশের কোনো অবকাশ থাকলে আমি বলতে চাই যে, বিচারের নামে আমাকে নিয়ে যা করা হচ্ছে তাতে আমি হতভম্ব, স্তম্ভিত ও বিস্ময়ে বিমুঢ়। তাই আমি আদালতের কার্যক্রম অনুসরণ করা ও বুঝার প্রচেষ্টা অনেক আগেই পরিত্যাগ করে আদালত চলাকালীন সময়ে পবিত্র কুরআন মাজিদ তেলাওয়াতে মগ্ন থাকি এবং শেষ বিচারের মালিকের ফয়সালার প্রতীক্ষায় প্রহর গুণি। আদালতের রেওয়াজ পূরণের দায়িত্ব আমার আইনজীবিদের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। এখন আইনজীবি উপস্থিত থাকার সেই নূন্যতম শর্তটা মান্য করার বিলম্বটি মেনে নেয়ার ফুসরতও যদি আপনাদের না থাকে, তাহলে সবর করা ছাড়া আমার কী বা করার আছে! আমার আইনজীবির অনুপস্থিতিতে আমার বিরুদ্ধে স্বাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে আমার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি বিচার প্রাপ্তিতে আমার কোনো পার্থক্য নির্ণয় করবে না।

এক্ষেত্রে মাননীয় আদালতের কাছে আমার একটি নিবেদন থাকবে যে, অন্ততপক্ষে ৭২ বছরের এই বৃদ্ধ বয়সে এই রাজনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রতিদিন আদালতে উপস্থিত থাকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে অব্যহতি দিয়ে আমার অনুপস্থিতিতে মাননীয় আদালত ও প্রসিকিউশন মিলে যা যা করার তা সম্পন্ন করতে পারেন।

কার হিম্মত আছে আপনাদের কাছে জানতে চাওয়ার যে,  ঔটঝঞওঈঊ ঐটজজওঊউ ঔটঝঞওঈঊ ইটজজওঊউ বা ঔটঝঞওঈঊ ঘঙঞ ঙঘখণ ঞঙ ইঊ উঊখওঠঊজঊউ, ইটঞ ঞঙ ইঊ ঝঊঊঘ অখঝঙ -এই অমোঘ বাণীসমূহ এই আদালতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ক্ষেত্রে আপ্ত বাক্য হিসেবেই থেকে যাবে।

মাননীয় আদালত
আমি আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বেপরোয়া যথেচ্ছাচার এবং তা বাস্তবায়নের এক আগ্রাসী মিথ্যাচারের শিকার। আপনার এই মহান আদালত রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমি ব্যক্তি সাঈদীকে আশ্রয় দেয়ার জন্য তথা ন্যায়বিচার করার জন্য ওয়াদাবদ্ধ। আমি আপনার সেই শপথ ও দায়বদ্ধতার বিষয়ে আস্থাশীল থাকতে চাই।
আমাকে কথাগুলো বলতে দেয়ার জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

এরপর আদালত মুলতবি আবেদন বাতিল  করে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু করেন এবং     তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে জুনিয়র আইনজীবীরা আদালতের অনুমতি নিয়ে বেশ কয়েকবার কোর্টরুম ত্যাগ করতে চাইলেও তাদের কোর্টরুম ত্যাগের অনুমতি দেয়া হয়নি। তাদের কোর্টরুমে বসে  থাকতে বাধ্য করেন আদালত এবং এভাবে ১২টারও কিছু সময় পর্যন্ত সাক্ষ্য গ্রহন শেষে মুলতবি করা হয়।


৩/১০/২০১১
শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মিথ্যাচার
আজ ৩/১০/২০১১ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে  চার্জ গঠন করা হল। চার্জ গঠনের আদেশ উপলক্ষে সকাল দশটার দিকে মাওলানা সাঈদীকে আদালত কক্ষের কাঠগড়ায়  হাজির করা হয়। এরপরই চার্জ গঠনের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
যেসব অভিযোগে চার্জ গঠন করা হল তাকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মিথ্যাচার হিসেবে আখ্যায়িত করলেন মাওলানা সাঈদী।
মাওলানা সাঈদী নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে দৃঢকণ্ঠে বললেন, “আমার   বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই মিথ্যা।  একাত্তরে আমি কোনও অপরাধ করিনি । কোনও রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার তো দূরের কথা পদেও আমি ছিলাম না। মাবতাবিরোধী নয়, মানবতার পে বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশে বক্তব্য দিয়েছি। আমাকে অন্য কেউ রাজাকার বলেনা। কেবল ভারতের রাজাকাররাই আমাকে রাজাকার বলে।

আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সহস্রাধিক রচনা লেখা হয়েছে। এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন মিথ্যা। এমন মিথ্যা প্রতিবেদনের জন্য আল্লাহর আরশ কাঁপবে। আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে যারা এমন প্রতিবেদন তৈরি করেছে তাদের ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসবে। আমি সেই লানত দেখার অপোয় আছি।’

ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধে অভিযোগের আদেশ ঘোষণার পর তাকে এজলাসে হাজির করা হয়। এ সময় চেয়ারম্যান তাকে বলেন, ‘আমি অর্ডার ইংরেজিতে দিয়েছি এখন আপনার সুবিধার্তে বাংলায় বলব।  আপনি  যদি দোষী বা নির্দোষ হন তা হলে বলবেন।
জবাবে মাওলানা  সাঈদী বলেন, ‘বাংলায় দেওয়ার দরকার নেই আপনার ইংরেজি অর্ডার আমি বুঝতে পেরেছি।’ এরপর  তিনি তার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে দেওয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন জানান। 
ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান তখন বলেন, ‘এ ধরনের কোনও সুযোগ নেই। মাওলানা সাঈদী তখন  বলেন, ‘সুযোগ না থাকলে আমি দু-তিন কথায় এর জবাব দেবো। এরপর  মাওলানা সাঈদী প্রথমে সবাইকে সালাম দিয়ে তার বক্তব্য শুরু করেন।

আপনি তখন হজ করে এসেছিলেন। হজের নুরানি আভা চেহারায় তখনো নষ্ট হয়নি। আমাকে এখানে আনার পর একজন প্রসিকিউটর আমার নাম বিকৃত করে বলেছিলেন।  আমি আশা করেছিলাম, আপনি জিজ্ঞেস করবেন, এইটা কোথায় পেয়েছেন? উনার সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট বা অন্য কোন দলিলপত্র থেকে পেয়েছেন কি-না?
কিন্তু আপনি তা করলেন না। বরং অর্ডারে ওই নামে আমাকে উল্লেখ করলেন।
আপনি একদিন বলেছিলেন, আল্লাহ আপনাকে অনেক বড় দায়িত্ব দিয়েছেন। আপনি সেই দায়িত্ব পালন করতে চান। আসলেই বিচারকের দায়িত্ব অনেক বড়। হাশরের দিনে সাত শ্রেণীর মানুষ আল্লাহর আরশের নীচে ছায়া পাবেন। এর প্রথম হচ্ছেন, ন্যায় বিচারক।  তাই আমি আশা করি আপনি ন্যায় বিচার করবেন।
বিচারকের দায়বদ্ধতা আল্লাহ ও বিবেকের কাছে। তৃতীয় কোন স্থানে দায়বদ্ধতা থাকলে ন্যায় বিচার করা যায় না। বরং যেটা করা হয়, সেটা জুলুম হয়ে যায়। আর জুলুমের পরিণাম জাহান্নাম। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার পর মানবতা বিরোধী অপরাধের কোন অভিযোগ আসেনি। ১৯৮০ সালে জামায়াতের মজলিসে শুরার সদস্য হওয়ার পর এটা আসতে শুরু করে। যখনই এ ধরণের অভিযোগ এসেছে, আমি প্রতিবাদ করেছি, সংসদে বলেছি, মামলা দায়ের করেছি। যার অনেকগুলো এখনো বিচারাধীন রয়েছে। মানবতা বিরোধী অপরাধ করা তো দূরে থাক, বিগত অর্ধ শতাব্দী ধরে দেশে বিদেশে মানবতার  রক্ষায় কাজ করেছি। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে চার সহস্রাধিক পৃষ্ঠার একটি রচনা তৈরি করা হয়েছে। যারা এটা রচনা করেছেন, তাদের মনে আল্লাহর ভয় ছিলো না। তাই তারা এটা করতে পেরেছেন। রাজাকারের কমান্ডার হওয়াতো দূরে থাক, তাদের সঙ্গে আমার কোনই সম্পর্ক ছিলো না। আমি শাান্তি বাহিনীর সদস্য ছিলাম না, রাজাকার ছিলাম না। পাক বাহিনীর সঙ্গে আমি এক মিনিটের জন্যও বৈঠক করিনি।
আমি চাই, আপনি আমাকে এই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিবেন। দিতে পারবেন। আমি একজন নিরীহ মানুষ। এই অবিচার করা হলে, আল্লাহর আরশ কাঁপবে। আল্লাহর লানতে পড়বে। সারা পৃথিবী  তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে।

আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সহস্রাধিক রচনা লেখা হয়েছে। ‘এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন মিথ্যা। এমন মিথ্যা প্রতিবেদনের জন্য আল্লাহর আরশ কাঁপবে। আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে যারা এমন প্রতিবেদন তৈরি করেছে তাদের ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসবে। আমি সেই লানত দেখার অপোয় আছি।’
আমি কখনোই শান্তি কমিটিতে বা রাজাকার- আলবদর ছিলেন না। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে এক দিনের বা এক মিনিটের জন্যও আমার সাথে কোন সম্পর্ক ছিলনা। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্ভাগ্যজ্জনক। সুরা হুজরাতের ১১ নং আয়াতে  নামের বিষয়ে বলা আছে- ‘কোনও মানুষকে বিকৃত করে ডেকোনা।’

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর আরশের নিচে সাত শ্রেণীর মানুষ ছায়া পাবে। তার মধ্যে ন্যায় বিচারকরা প্রথমেই রয়েছেন। আপনাদের (ট্রাইব্যুনাল) কাছ থেকে সেই ন্যায় বিচার আশা করি। তাই আপনি ন্যায় বিচার করবেন। তিনি বলেন, বিচারকদের নিরপেক্ষতা, বিবেক, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা না থাকলে সুবিচার নিশ্চিত হয়না।

‘৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের এক যুগের বেশি সময় আমাকে নিয়ে কোনও কথা হয়নি।  ১৯৮০ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেয়ার পর আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় আমাকে গ্রেফতারের পর। আমি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। ১৯৯৬ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে সরকার গঠন হয়। সেই সংসদে আমি ২০ মিনিটের বক্তব্য দিয়ে বলেছিলাম, আমি রাজাকার নই। সেই ২০ মিনিটের বক্তব্যের একটি কথাও এক্সপাঞ্জ করা হয়নি।’

বক্তব্য শেষে ট্রাইব্যুনাল সদস্য বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির বলেন, ‘সাঈদী সাহেব তারা (রাষ্ট্রপ) যদি আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে আপনি মুক্তি পাবেন।’
তখন মাওলানা সাঈদী বলেন,  ‘আপনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ’ । এই বলে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।  মাওলানা সাঈদীর বক্তব্যের সময় আদালতে  পিন পতন নিরবতা বিরাজ করে। । প্রসিকিউটর কিংবা সরকার পক্ষে নিযুক্ত কেউই এ বক্তব্যের বিরোধিতা কিংবা দ্বিমত পোষণ করেননি। সবাই সম্মোহিতের মত এই খ্যাতনামা আলেমে দ্বীনের বক্তব্য শোনেন। বক্তব্য শোনার পর ট্রাইব্যুনাল ৩০ অক্টোবর থেকে অভিযোগের ওপর শুনানি শুরুর দিন ধার্য্য করেন।





হে আল্লাহ তোমার ইজ্জতের কসম ৭১ এর কোন কাদা আমার গায়ে লাগেনি। আমি মজলুম তোমার  কাছে বিচার চাই
ছেলের জানাজার পূর্বে  মাওলানা সাঈদী


 ১৪/৬/২০১২
 হে আল্লাহ আমি মজলুম। আল্লাহ আমি তোমার কাছে বিচার চাই। আমি  গত ৫০ বছর ধরে  সারা দেশে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তোমার কোরআনের কথা প্রচার করেছি। আজ আমাকে বলা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী। ও আল্লাহ তোমার ইজ্জতের কসম, তোমার জাতের কসম, তুমি সাক্ষী  ১৯৭১ সালের কোন কাদা  এবং কাদার এক ফোটা পানিও আমার গায়ে লাগেনি। 

আজ বৃহষ্পতিবার ১৪/৬/২০১২ বড় ছেলে রাফকী বিন সাঈদীর জানাজার নামাজের পূর্বে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী  একথা বলেন। মতিঝিল বয়েজ স্কুল মাঠে  সন্ধ্যার পূর্বে অনুষ্ঠিত জানাজায় বিশাল মাঠের গন্ডি পেরিয়ে পুরো রাজারবাগ, শাহজাহানপুর  এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। স্থবির হয়ে পড়ে  ওই এলাকার সকল রাস্তাঘাটের চলাচল ব্যবস্থা।

মাওলানা সাঈদী  অগনিত মানুষের সামনে দাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন, হে আল্লাহ আমি  তোমার জন্য  শহীদ হতে প্রস্তুত আছি।  তবে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে, হত্যাকারী হিসেবে, ধর্ষণকারী হিসেবে, চোর, লন্ঠনকারী হিসেবে আমি ফাঁসি কেন একদিনেরও  সাজা চাইনা। এসব অপবাদ নিয়ে  আমি মরতে চাইনা। হে আল্লাহ আমি মজলুম। মজলুমের দোয়া এবং তোমার মাঝে কোন পর্দা নাই। আমি তোমার কাছে বিচার চাই।
এরপর মাওলানা সাঈদী বলেন, হে আল্লাহ তুমি হয় জালিমকে হেদায়েত দাও না হয় তাদের বিদায় কর। হে আল্লাহ ১৬ কোটি মুসলমানের দেশ বাংলাদেশকে তুমি  কাশ্মীর বানিওনা, আফগান বানিওনা, ইরাক বানিওনা। বাংলাদেশকে  তুমি রক্ষা কর।
হে আল্লাহ  মুসলমানের দেশে আজ মুসলমান তার পরিচয় নিয়ে চলতে পারেনা। তাদের বেইজ্জতি করা হচ্ছে।
মাওলানা সাঈদী বলেন, আমার কোরআন প্রচার  নাস্তিকক্যবাদীরা পছন্দ করেনা। সে কারনে আমাকে বন্দী করে রেখেছে।

৬টা ১০ মিনিটে মাওলানা সাঈদীকে প্রিজন ভ্যানে করে  কড়া পুলিশী নিরাপত্তায় মাঠে নিয়ে আসা হয়। এসময় উপস্থিত জনতা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। নারায়ে তাকবীর  আল্লাহু আকাবর বলে স্লোগান দেয় তারা। তবে জানাজা আয়োজক কর্তৃপক্ষ মাইকে  তাদের কোন ধরনের স্লোগন দিতে নিষেধ করেন এবং মাওলানা সাঈদীকে নির্বিঘেœ মাঠে প্রবেশে সহায়তা করতে অনুরোধ করেন।
মাওলানা সাঈদী  ছেলের লাশের কাছে আসলে জানাজা আয়োজক কর্তৃপক্ষ মাওলানা সাঈদীকে   উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে সালাম  জানানোর অনুরোধ করেন তাকে পাহারাত পুলিশের প্রতি।
এরপর মাওলানা সাঈদী মাইক নিয়ে  উচ্চস্বরে সালাম  দেন। এরপর ইন্নালিল্লাহ পড়েন। এসময় তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কান্নার রোল এসময় ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত শোকাহাত হাজারো জনতার মাঝে। সবাই হুহু করে কাঁদতে থাকেন মাওলানার সাথে।
কান্না থামিয়ে মাওলানা সাঈদী এরপর বলেন, হে আল্লাহ  কয়েক মাস আগে এই এখানে আমি আমার মায়ের জানাজা পড়িয়েছি।
আমাকে আমার বাসায় যেতে দেয়া হয়নি। আমাকে আমার পরিবার পরিজনের সাথে বাসায় গিয়ে মিলিত হতে দেয়া হয়নি।
আজ এখানে আমার ছেলে আমার কলিজার টুকরার জানাজায় আমাকে নিয়ে আসা হল।
হে আল্লাহ  দুনিয়াতে সবচেয়ে ভারী বোঝা হল পিতার কান্ধে পুত্রের লাশ। আমার ছেলে রাফীককে আমি বলতাম তুমি আমার জানাজা পড়াবা। রাফীক বলত না তুমি আমার জানাজা পড়াবা। আজ আমি তার জানাজা পড়াচ্ছি। এসময় আবার তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সাথে সাথে কাঁদতে থাকেন জানাজার উদ্দেশে আগতরা।
মাওলানা সাঈদী বলেন, আমার বড় ছেলে গতকাল  বুধবার  বিকালে মারা গেছে। আজ আছরের সময় আমাকে জানানো হয়েছে। একথা বলে তিনি আবারো কাঁদতে থাকেন।
মাওলানা সাঈদী বলেন, হে আল্লাহ আমার কলিজার টুকরা, হে আল্লাহ আমার কলিজার টুকরা, হে আল্লাহ আমার কলিজার টুকরা রাফীককে তুমি বেহেশত দান কর। তার কবরকে তুমি জান্নাতের টুকরা বানিয়ে দিও। তার কবরের সাথে  তুমি জান্নাতের সরাসরি রাস্তা করে দিও। বেহেশতে তুমি তার সাথে আমাকে মিলিত করে দিও।

মাওলানা সাঈদী বলেন, আমার ছেলে গতকাল  ট্রাইব্যুনালে ছিল ।   কোর্ট রুম থেকে বের হয়ে যাবার সময় আমাকে বলে যেতে পারেনি। আমি বুঝতে পারিনি ওটাই ছিল আমার সামনে তার শেষ যাত্রা।
এরপর মাওলানা সাঈদী উপস্থিত সবাইকে নিয়ে তাহ তুলে দোয়া করেন আল্লাহর দরবারে।
তিনি বলেন, হে আল্লাহ রাফীকের তিনটা ছেলে মেয়ে আছে। আমি তার সন্তান এবং তার স্ত্রীকে তোমার উপর সোপর্দ করলাম।
তারপর  সাড়ে ছয়টার দিকে তিনি জানাজা পড়াতে শুরু করেন তিনি।












সোমবার, ৫ নভেম্বর, ২০১২

ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে মাওলানা সাঈদীর পক্ষের সাক্ষী অপহরন/// আইনজীবীদের আদালত বর্জন


মেহেদী হাসান
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষের একজন সাক্ষীকে ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে  অপহরন করে নিয়ে গেছে ডিবি (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ) পুলিশের লোকজন। তার নাম সুখরঞ্জন বালী। তিনি ছিলেন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের তালিকাভুক্ত  সাক্ষী ।  গতকাল তিনি এসেছিলেন মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে। সাক্ষ্য দিতে আসার সময় ট্রাইব্যুনালের প্রবেশ পথে তাকে  ডিবি পুলিশের লোকজন  ধরে নিয়ে  গেছে।

সাক্ষী অপহরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল বর্জন করেছেন মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা। আইনজীবীদের উপস্থিতি ছাড়াই বিকালে মাওলানা সাঈদীর মামলার যুক্তিতর্ক  গ্রহণ শুরু করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

মাওলানা সাঈদীপর আইনজীবীরা এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন সাক্ষীকে   ধরে নিয়ে  পুলিশের গাড়িতে তোলার সময় তাকে থাপ্পড় মেরেছে ডিবি পুলিশের লোকজন।


এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু ট্রাইব্যুনালে জানিয়েছেন  সাক্ষী অপহরনের কোন ঘটনাই ঘটেনি।

যেভাবে সাক্ষী  ধরে নেয়া হল :

আইনজীবী এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল   সকাল সোয়া দশটার দিকে  মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী  মিজানুল ইসলাম এবং অন্য কয়েকজন আইনজীবী একটি গাড়িতে করে  ট্রাইব্যুনালে আসছিলেন। তাদের সাথেই ছিলেন সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী। তাদের বহনকারী গাড়ি ট্রাইব্যুনালের  পাশে মাজার সংলগ্ন গেটে আসার পর   দায়িত্বরত পুলিশ  গাড়ি থামান। পুলিশ  সব আইনজীবীদের গাড়ি থেকে নামতে বলেন। অ্যাডভোকেট মনজুর আহমদ আনসারী,  হাসানুল  বান্না সোহাগ সবাই নেমে আসেন। তাদেরকে হেটে ট্রাইব্যুনালে যেতে বলেন  দায়িত্বরত। অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম পক্ষাগাতগ্রস্ত হওয়ায় শুধুমাত্র তাকে গাড়িতে চড়ে ট্রাইব্যুনালের  সামনে যাওয়ার অনুমতি দেন পুলিশ। গাড়িতে থাকা সাক্ষীকে সুখরঞ্জন বালীকেও নেমে আসতে বলেন তারা । সাক্ষী নেমে আসেন।
সাক্ষীসহ অন্যান্য আইনজীবীরা গেটে দাড়িয়ে থাকেন। অ্যাডভোকেট মনজুর আহমদ ভেতরে যান অন্য আইনজীবী এবং সাক্ষীর জন্য গেট পাশ আনতে। (অন্যান্য দিন এ ধরনের কড়াকড়ি ব্যবস্থা ছিলনা। সাক্ষী এবং আইনজীবী  এবং সাংবাদিকরা  সরসারি ট্রাইব্যুনালের সামনে চলে যেতে পারতেন। শুধুমাত্র গতকালই বাইরের গেটে এভাবে কড়াকড়ি এবং চেকিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়।)

এসময়  আসামী পক্ষের জুনিয়র আইনজীবী হাসানুল বান্না সোহাগ এবং সাক্ষী গেটে  দাড়িয়ে থাকেন। তখন চারজন সাদাপোশাকধারী লোক এসে  নিজেদের ডিবি পুলিশের লোক পরিচয় দেন। তারা সাক্ষীর নাম জিজ্ঞেস করেন। তারপর  সাক্ষীর দুপাশ থেকে দুজন করে পুলিশ হাত ধরে   রাস্তার দিকে নিয়ে যেতে থাকেন। আইনজীবী এর  প্রতিবাদ করলে  ডিবি সদস্যরা জানান কিছু  পাশেই তাদের কন্ট্রোল রুমে  নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার পর ছেড়ে দেয়া হবে। এরপর সাক্ষীকে  টেনে      শিক্ষাভবনের দিককার  পুরনো হাইকোর্ট  গেট থেকে বের করে দোয়েল চত্বরের দিকে  ট্রাইব্যুনালের অপর গেটের দিকে নিয়ে যায়। এসময় ডিবি পুলিশের এক সদস্য মোবাইলে ফোন করলে ট্রাইব্যুনালের ভেতরের চত্বর থেকে একটি পুলিশের  পিকআপ ভ্যান  গেটে আসলে সাক্ষীকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া  হয়। প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবী জানান,  তাকে গাড়িতে ওঠানোর সময় থাপ্পর দেয়া হয় এবং টেনে চিচড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে ধাক্কা মারা হয়।

ট্রাইব্যুনাল বর্জন :

সকাল সাড়ে দশটায় ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম    শুরু হলে অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে বিষয়টি অবহিত করেন। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেন কোর্ট শেষে আমরা বিষয়টি দেখব। আসামী পক্ষের প্রধান ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন সাক্ষীকে  এ অবস্থায় রেখে আমরা বিচার কাজে অংশ নিতে পারিনা। বিষয়টির বিষয়ে এখনই পদক্ষেপ নেয়া হোক।
এরপর ট্রাইব্যুনাল এক আদেশে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুকে নির্দেশ দেন   অপহরনের বিষয়টি বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে  এবং তাকে ছাড়িয়ে আনার বিষয়ে ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করতে। তিনি আদেশের সাথে সাথে  তাকে  কোর্ট থেকে বের হয়ে চেম্বারে গিয়ে এ বিষয়ে খোঁজ  নেয়ার নির্দেশ দেন।
সাড়ে বারটার দিকে গোলাম আরিফ টিপু ট্রাইব্যুনালে আসেন। তখন অন্য একটি মামলার শুনানী চলছিল।  আসামীপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার  আব্দুর রাজ্জাক সে শুনানী বন্ধ রেখে গোলাম আরিপ টিপুর কাছ থেকে  সাক্ষী বিষয়ক পরিস্থিত  শোনার আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল বলেন চলমান আবেদনের শুনানী শেষ হোক। এরপর   একটা বাজার সামান্য আগে শুনানী শেষ হলে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু ট্রাইব্যনালের সামনে দাড়িয়ে বলেন, আমি  আইনশৃঙখলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সাথে  কথা বলেছি। তারা বলেছেন, আইনের কোন লঙ্ঘন তারা করেননি।  ট্রাইব্যুনালের প্রবেশ পথে তারা  তাদের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
বিচারপতি নিজামুল হক বলেন একজনকে  ধরে  নিয়ে যাবার বিষয়ে আপনাকে খোঁজ নিতে বলেছিলাম তার কি হল। তার কি হল?
গোলাম আরিফ টিপু বলেন, এরকম কোন ঘটনাই ঘটেনি আজ সেখানে। 
বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, একটা হতে পারে কারা  এ কাজ যারা করেছে তারা চিনতে পারেনি অথবা ঘটনা ঘটেনি।
গোলাম আরিফ টিপু বলেন, আদৌ  এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটেনি।
বিচারপতি নিজামুল হক আবারো বলেন, ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে কেউ অপহরন হয়েছে কি-না?
গোলাম আরিফ টিপু বলেন কেউ অপহরন হয়নি।
এর সাথে সাথে আসামী পক্ষের আইনজীবীরা  তীব্র প্রতিবাদ জানান। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমার কয়েকজন আইনজীবী এখানে এসে ঘটনা বলল প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সেটা মিথ্যা হয়ে গেল? মিজান সাহেব কি তাহলে মিথ্যা বলেছেন?  তার সাথে থাকা আমাদের অন্যান্য আইনজীবীরা মিথ্যা বলেছেন?  আর চিফ প্রসিকিউটর পুলিশের কথা শুনে বলে দিলেন এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি?
বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, দুইটার পর আমরা বিষয়টি দেখব। এর মধ্যে আমরাও একটু খোঁজ খবর  নিয়ে দেখি কি হয়েছে। ব্যারিস্টার  আব্দুর রাজ্জাক অনুরোধ করেন বিষয়টি সুরাহা করে তারপর কোর্ট বিরতিতে যাক।

এরই মধ্যে  সাক্ষীকে ধরে নিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত মোবাইলে তোলা ছবি  প্রিন্ট করে ট্রাইব্যুনাল কক্ষে প্রবেশ করেন  আসামী পক্ষের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মো: মনির।   আসামী পক্ষ ট্রাইব্যুনালের সামনে সে ছবি জমা দেন। তিনজন বিচারপতি তা দেখেন। এরপরও তারা দুপুরের বিরুতিতে যাবার প্রস্তুতি নেন। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মিজানুল ইসলাম কিছু  কথা বলেন। এসময় বিচারপতিগন চেয়ার থেকে উঠে যান । চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেন,  এখন আর শোনা হবেনা। মিজানুল ইসলাম তীব্র ক্ষোভের সাথে বলেন, আমাদের কথাও শোনাও হবেনা? তাহলে আমরা এ  কোর্টে আসব কিভাবে? আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক শুরু হয় কোর্টরুমে। মিজানুল ইসলাম উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করতে থাকেন। এরই মধ্যে কোর্টরুম ত্যাগ করে চলে যান বিচারপতিগন।

সকালে শুনানী চলাকালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডন্টে  সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মওদূদ আহমদ, সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি  জয়নুল আবেদনী ট্রাইব্যুনালে হাজির হন। ব্যারিস্টার মওদূদ আহমদ এবং খন্দকার মাহবুব হোসেন শুনানীতে অংশগ্রহণ করেন।
ট্রাইব্যুনাল বর্জনের পর খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা জানিনা  হতভাগ্য সাক্ষীর ভাগ্যে কি আছে। বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে এখন লোকজন গুম হচ্ছে। আমরা জানিনা এ সাক্ষীকে আর খুঁজে পাওয়া যায় কি-না। কারণ সরকার পক্ষ তাকে অপহরনের বিষয়টি অস্বীকার করছে।  কোর্টে আসার পথে সাক্ষী অপরহন করা হচ্ছে। আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?

ঢ়ধৎঃ২ ফি রিঃহবংং ধনফঁপঃবফ, ৎবঢ়ড়ৎঃ, ৫/১১/২০১২
সবযবফু


রাষ্ট্রপক্ষের   অভিযোগ :
সাক্ষী অপহরন বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে এবং ট্রাইব্যুনালের বাইরে সাংবাদিকদের কাছে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, সুখরঞ্জন বালী আসামী পক্ষের কোন সাক্ষী নয়। আজ সাক্ষীর জন্য নির্ধারিত কোন তারিখও ছিলনা।  সে তাদের কাছে গেল কি করে সেটাই আমাদের প্রশ্ন। সৈয়দ হায়দার আলী অভিযোগ করে বলেন, ট্রাইব্যুনাল  বর্জনের অজুহাত হিসেবে এ ঘটনার অবতারনা করা হয়েছে।

কে এই সুখরঞ্জন বালী : মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ  ১৯৭১ সালের ২ জুন পিরোজপুরের উমেদপুরে হিন্দুপাড়ায়  বিশাবালী নামে একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে নারকেল গাছে সাথে বেঁেধ রাজাকাররা হত্যা করে। মাওলানা সাঈদীর উপস্থিতিতে এবং নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। সেই বিশাবালীল ভাই হলেন সুখরঞ্জন বালী।   রাষ্ট্রপক্ষ তাকে সাক্ষী মেনেছিল। তবে  রাষ্ট্রপক্ষ তাকে হাজির করতে পারেনি।

বিশাবালীকে হাজির করতে না পারা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ গত   মার্চ  মাসে ট্রাইব্যুনালে জানিয়েছিল চার মাস আগে  নিজ বাড়ি থেকে বের হবার পর  সুখরঞ্জনবালী নিখোঁজ হয়েছে।

গত ২০ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে একটি আবেদন পেশ করা হয়। আবেদনে বলা হয়  মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে  ৪৬ জন  সাক্ষীকে  হাজির করা আদৌ সম্ভব নয়। তাই  ৪৬ জন সাক্ষী  তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে  জবানবন্দী  দিয়েছেন তা  তাদের অনুপস্থিতিতে আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহন করা হোক।  এই ৪৬ জন সাক্ষীর তালিকায় সুখরঞ্জন বালীর নামও ছিলেন।


সাক্ষী হাজির করতে না পারা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যেসব কারণ উল্লেখ করেছিল তার মধ্যে রয়েছে মাওলানা সাঈদীর পক্ষের সন্ত্রাসী অস্ত্রধারীদের হুমকির কারনে  অনেকে  আত্মগোপন করেছে, কেউ বাড়ি থেকে নিখোঁজ, কেউ গোপনে ভারতে  পালিয়ে গেছে, কেউ অসুস্থ, কারো কারো স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে।
৪৬ জনের সেই তালিকা থেকে ১৫ জনের জবানবন্দী মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধেথ  সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে ২৯ মার্চ আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। সেই ১৫ জনের মধ্যেও ছিলেন সুখরঞ্জন বালী।
রাষ্ট্রপক্ষ যে সাক্ষী সম্পর্কে বলেছিল সে নিখোঁজ সেই সুখরঞ্জন বালী গতকাল  এসেছিলেন মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে।
রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক সাক্ষী হাজির করতে যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল তাকে মিথ্যা এবং প্রতারনা বলে অভিযোগ করেছিল আসামী পক্ষ। আসামী পক্ষ অভিযোগ করে বলেছিল সাক্ষীরা রাষ্ট্রপক্ষের শেখানো মতে মিথ্যা বলতে রাজি নয় বিধায় তাদের হাজির করা হচ্ছেনা।

কড়া নিরাপত্তা ট্রাইব্যুনালে : গতকাল ট্রাইব্যুনালে ছিল কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনি যা আগে কখনো দেখা যায়নি। সাধারনত ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে পাশ নিয়ে প্রতিদিন গেট পাশ নিয়ে সাংবাদিক আইনজীবী এবঙ আসামীর আত্মীয়স্বজনকে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু গতকাল একদন বাইরের গেটে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা কর্র্মী প্রত্যেকের আইডি কার্ড চেক করে ভেতরে প্রবেশের ব্যবস্থা করেন। মিজানুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করে বলেন, আজ কি কারনে এরকম ব্যবস্থা করা হল তা আমরা জানিনা এবং  এরকম যে ব্যবস্থা করা হবে তাও আমাদের জানানো হয়নি। জানালে আমরাও সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে পারতাম। তিনি বলেন নিরাপত্তাকমীর দায়িত্ব হল আমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। কিন্তু তারা যদি আমাদের হয়রানি করে, আইনজীবীদের  গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয় এবং সাক্ষীকে ধরে নিয়ে যায় তাহলে সে নিরাপত্তা কর্মী কিসের জন্য?
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক হয়রানির বিষয়ে অভিযোগ করে বলেন, পুলিশ গাড়ি চেক করতেই পারে,   আগতদের পরিচয় জানতে চাইতে পারে। কিন্তু তারা আমাদের আইনজীবীদের সাথে আজ যা ব্যবহার করছে তা কোনমতেই  গ্রহণযোগ্য নয়।
তাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের দুজন আইনজীবীকে এখনো পুলিশ বাইরে আটকে রেখেছে। তাদেরকে ঢুকতে দিচ্ছেনা। বলা হচ্ছে  পাশ ছাড়া কারো ভেতরে যাবার অনুমতি নেই।  কিন্তু বাইরে তো  গেট পাশ সংগ্রহের কোন ব্যবস্থাই নেই।   ভেতরেই যদি প্রবেশ করতে না দেয়া হয় তাহলে সে পাশ সংগ্রহ করবে কিভাবে? তিনি বলেন আমাদের আইনজীবীদের সাথে একরকম এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের সাথে আরেক রকম ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ অভিযোগের পর ট্রাইব্যুনাল রেজিস্ট্রার নাসরি উদ্দিনকে ডেকে পাঠান এবং এ বিষয়ে জানতে চান।
নতুন নিরাপত্তা বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন আমরাই এ নির্দেশ দিয়েছি। আমরা ট্রাইব্যূনালকে হাট বানাতে দিতে চাইনা। আমরা দেখতে  পাই প্রতিদিন গাউন পরে অনেক লোক এখানে আসেন যারা  কোন পক্ষের আইনজীবী নন। তারা কিভাবে পাশ নিয়ে এখানে আসেন? আমরা আগেই বলেছি আসামীর আইনজীবী ছাড়া শেখার জন্য কেউ কেউ আসবেন। কিন্তু তার একটা মাত্রা তো থাকতে হবে। আমরা আপনাদের জন্য একশ আইনজীবী আসতে দিতে পারিনা।
তাজুল ইসলাম  গতকালের ঘটনার জন্য ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্টতারও অভিযোগ করেন। তিনি বলেন   কারণ ট্রাইব্যুনাল বলেছেন তাদের নির্দেশেই গতকালের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আয়োজন করা হয়েছে।

সুখরঞ্জন বালী  কার সাক্ষী? সুখরঞ্জন বালী রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ছিলেন।  তিনি এবং আরেক সাক্ষী গণেশচন্দ্র সাহাকে আসামী পক্ষের সাক্ষী হিসেবে হাজিরের জন্য সমন জারির আবেদন করেছিলেন মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী। এ বিষয়ে আদেশে ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন আপনারা যাকে খুসী সাক্ষী হিসেবে আনতে পারেন তবে সমন জারি করা  হবেনা।  এরপর গত ২৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী  গণেশচন্দ্রকে হাজির করে আসামী পক্ষ  তিনি মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেন। সুখরঞ্জন বালী বিষয়ে গতকাল আদেশের সময় ট্রাইব্যুনাল  তাকে আসামী পক্ষের সাক্ষী উল্লেখ না করেননি। মিজানুল ইসলাম বলেন তিনি এখন  আমাদের  মানে আসামী পক্ষের সাক্ষী। তাকে সে হিসেবে উল্লেখ করা হোক। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল  তা গ্রহণ করেননি।
এ বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মিজানুল ইসলাম বলেন তিনি আসামী পক্ষের সাক্ষী।







রবিবার, ৪ নভেম্বর, ২০১২

তদন্ত কর্মকর্তার জেরা শেষ//গোলাম আযমের পক্ষে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু রোববার থেকে


মেহেদী হাসান
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার জেরা শেষ হয়েছে আজ । আগামী রোববার ১১ নভেম্বর থেকে আসামী পক্ষের সাক্ষী হাজিরের জন্য ধার্য্য করা হয়েছে।

আজ  বেলা একটার মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমানের জেরা শেষ করার জন্য ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ ছিল আসামী পক্ষের আইনজীবীর প্রতি। তবে একটার মধ্যে জেরা শেষ না হওয়ায় বিকালের সেশন   পর্যন্ত সময় দেয়া হয় এবং আজকের  মধ্যে জেরা শেষ করার নির্দেশ দেয়া হয়।  প্রয়োজনে কোর্টের নির্ধারিত সময় সাড়ে চারটা  পার  হয়ে গেলে  প্রয়োজনে সময় বাড়িয়ে দেয়ার কথাও বলেন কোর্ট। সে অনুযায়ী  গতকাল সোয়া পাঁচটায়  শেষ হয় জেরা।

আজ  তদন্ত কর্মকর্তার জেরার সময়   বেশ কয়েকবার উভয় পক্ষের আইনজীবীর মধ্যে উত্তেজনা বিতর্ক দেখা দেয়।

তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করেন অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে আইনজীবী মিজানুল ইসলাম। তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট মনজুর আহমদ আনসারী, ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক, অ্যাডভোকেট শিশির মো: মনির প্রমুখ।

জেরা :
জেরা : রাজাকার বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা আছে?
উত্তর : নাই।
প্রশ্ন : পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী বাহিনীর কোন সদস্যের নিয়োগ, নিয়ন্ত্রন, আদেশ বা শাস্তি দানের কোন ক্ষমতা অধ্যাপক গোলাম আযমের ছিল এ মর্মে কোন ডকুমেন্ট পেয়েছেন?
উত্তর : সরাসরি ওনার লিখিত কোন  ডকুমেন্ট পাইনি। তবে জামায়াতের প্রধান হিসেবে এসব বাহিনীর ওপর  তার নিয়ন্ত্রন ছিল। আল বদর বাহিনীর ওপর তার নিয়ন্ত্রন ছিল সে কাগজ আমি পেয়েছি।
প্রশ্ন : সহযোগী বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রন, আদেশ, নিয়োগ বা সদস্যদের শস্তিপ্রদানের  বিষয়ে অধ্যাপক গোলাম আযমকে  ক্ষমতা দিয়ে  পাকিস্তান আর্মি কোন আদেশ জারি করেছে এ মর্মে কোন ডকুমেন্ট পেয়েছেন?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালের ২ আগস্টের আগে পর্যন্ত রাজাকার বাহিনী  পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রন ছিল এ মর্মে তথ্য প্রমান আপনি তদন্তকালে পেয়েছেন।
উত্তর : পাইনি।
প্রশ্ন : আপনি তদন্তকালে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর থেকে এ মর্মে সংগৃহীত একটি ডকুমেন্ট দাখিল করেছেন। নেত্রকোনা মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ের ডকুমেন্ট এটি।
উত্তর : হ্যা।
প্রশ্ন : আপনি  পুলিশের যেসব পাক্ষিক রিপোর্ট, সরকারি গোপন নথিপত্র, পুলিশ অ্যাবস্ট্রাক্ট রিপোর্ট সংগ্রহ করেছেন তার একটিতেও শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস এর কোন সদস্যের নিয়ন্ত্রন, নিয়োগ, শাস্তি প্রদানের বা আদেশ প্রদানের কোন  ক্ষমতা অধ্যাপক গোলাম আযমকে দেয়া হয়েছে এ মর্মে কোন তথ্য নেই।
উত্তর :  এসব কাগজপত্রে যা আছে তার বাইরে আমার কোন বক্তব্য নেই।
প্রশ্ন : আপনি যেসব পত্রিকার  খবরের কপি দাখিল করেছেন তার সত্যতা সম্পর্কে আপনি কোন তদন্ত করেননি।
উত্তর : করিনি।
প্রশ্ন : আপনি যেসব দলিলপত্র দাখিল করেছেন তাতে এমন কোন তথ্য নেই যে, অধ্যাপক গোলাম আযমের বিবৃতি পড়ে বা বক্তব্য শুনে কেউ কোন অপরাধ করেছে।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনার দাখিলকৃত দলিলপত্র থেকে  এ মর্মে অন্তত একটি প্রমান দেখান ।
উত্তর : (এ প্রশ্নের উত্তর দিতে দীর্ঘ সময় পার হয়। উভয়পক্ষের আইনজীবীর মধ্যে বিতর্ক চলে। পরে তিনি নিম্নোক্ত জবাব দেন) এতগুলো ডকুমেন্ট পর্যালোচনা না করে এ মুহূর্তে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারবনা।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালে যেসব অপরাধ হয়েছে সেসব অপরাধে অভিযুক্ত কোন ব্যক্তি গোলাম আযমের সাথে পরামর্শ বা যোগাযোগ করে বা তার নির্দেশেনা অনুসারে কোন অপরাধ  করেছে এ  মর্মে কোন দালিলিক প্রমান দাখিল করেছেন?
উত্তর : একটি ক্ষেত্রে সাক্ষ্য প্রমান দাখিল করেছি।
এ উত্তর দেয়ার পর অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, আমি প্রশ্ন করেছি দালিলিক প্রমান আছে কি-না সে বিষয়ে। ট্রাইব্যুনাল বলেন, তিনি যা উত্তর দিয়েছেন তাতে যা অর্থ হয় তা হবে।
প্রশ্ন : দালিলিক প্রমান কথাটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য আপনি ভিন্ন উত্তর দিলেন।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : ৩১ ঘন্টার যে সিডি, ডিভিডি ভিডিও  আপনি  দাখিল করেছেন তা তদন্ত  ছাড়াই দাখিল করেছেন।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : উক্ত সিডি, ডিভিডিতে  বর্নিত প্রফেসর শহীদুর রহমান, মিসেস শহীদুর রহমান, মোহন মুন্সি, গোলাম মোস্তফার ভাই মোশাররফ হোসেন মানিক, ডা. এস এ হাসান, জাতীয় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাংবাদিক মাহবুবু কামাল, শহীদ মুনির চৌধুরীর ভাই শমশের চৌধুরী, পান্না কায়সার, অধ্যাপক ফরিদা খান, শহীদ গিয়াসউদ্দিন আহমেদের বোন, অধ্যাপক  এনামুল হক, এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার,  শাহরিয়ার কবির,  মিছবাহুর রহমান চৌধুরী, আব্দুল বারি, ডলি চৌধুরী, জাহিদ রেজা নূর, ডা. ফাইজুল হক, জয়নাল আবেদীন, মাহমুদুর রহমান, ড. আনিসুজ্জামান, ড. কামাল হোসেন. ড. আবুল বারাকাত কি জীবিত?
উত্তর : আমার সিডিতে এ নামগুলো নেই।
প্রশ্ন : এসব সিডি ডিভিডিতে এমন কোন তথ্য আছে কি-না  যাতে দেখা যায় আল বদর বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয়েছিল?
উত্তর : স্মরন নেই।
প্রশ্ন : আশরাফ হোসেনের নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী গঠিত হয় এমন কোন তথ্য আছে  এসব সিডি ডিভিডিতে?
উত্তর : স্মরন নেই।

ঢ়ধৎঃ২ রড় লবৎধ বহফ, ৎবঢ়ড়ৎঃ, ৪/১১/২০১২
সবযবফু


প্রশ্ন : অপরাধীকে ক্ষমা করার প্রেসিডেন্টের  ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এমন কোন তথ্য আছে  এস সিডি ডিভিডিতে?
উত্তর : স্মরন নেই।
প্রশ্ন : অধ্যাপক মাজহারুল ইসলামকে আহবায়ক করে গঠিত ইতিহাস প্রণয়ন কমিটির রিপোর্ট সংগ্রহ করেছেন?
উত্তর : আমার রেকর্ডে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।
প্রশ্ন : গোলাম আযম এবং টিক্কা খানের সাথে ৪ এপ্রিলের মিটিংয়ে কি আলোচনা হয়েছিল এ বিষয়ে আপনার কাছে কোন তথ্য নেই।
উত্তর : ৫ এপ্রিল দৈনিক আজাদ, ৬ এপ্রিল দৈনিক পূর্বদেশ, আজাদ এবং দৈনিক পাকিস্তানে এ বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।  প্রকাশিত খবরের তথ্য অনুযায়ী বৈঠকে নাগরিক শান্তি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়।  দুষ্কৃতকারী, রাষ্ট্রদ্রোহী সমাজ বিরোধীদের আশ্রয় না দেয়া এবং সামরিক আইন প্রশাসকের নিকট তথ্য পৌছে দেয়ার কথা আছে। দাখিলকৃত তথ্যে এটা খুজে পেয়েছি।
প্রশ্ন : ওইসব রিপোর্টে শান্তি কমিটি কথাটা কি আছে?
উত্তর : তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিটি পত্রিকার রিপোর্ট পড়তে থাকেন। প্রথমে ৫ এপ্রিলের রিপোর্ট পড়ে বলেন, নাগরিক কমিটি কথা লেখা আছে।  মিজানুল ইসলাম বলেন, আমি জানতে চেয়েছি শান্তি কমিটি কথাটা আছে কি-না। এরপর তিনি আবার অন্য পত্রিকার রিপোর্ট পড়া শুরু করেন। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, ৬ তারিখের আজাদে কি আছে বলেন। রিপোর্ট পড়ে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন শান্তি কথাটি নেই। এরপর বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, পূর্বদেশ এবং  ইত্তেফাকের রিপোর্টে কি আছে? তদন্ত কর্মকর্তা রিপোর্ট পড়ে বলেন  শান্তি কথাটি নেই।
এরপর বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, আগের প্রশ্নের জবাবে যেখানে নাগরিক শান্তি কমিটি কথাটি লেখা হয়েছে সেখান থেকে শান্তি  শব্দটি বাদ দেয়া হবে। তিনি কম্পোজারকে নির্দেশ দেন শান্তি শব্দটি মুছে ফেলার জন্য। মিজানুল ইসলাম তীব্র আপত্তি করে বলেন, আমিতো পরের প্রশ্নটি করেছি তার আগের উত্তরকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য। তিনি আগের উত্তরে সঠিক বলেননি সেটা প্রমানের জন্য। এখন আগের উত্তর থেকে শান্তি শব্দটি বাদ দিলে তো আমার উদ্দেশ্য ব্যর্থ   হবে।
বিচারপতি  নিজামুল হক বলেন, সাক্ষী যতক্ষন পর্যন্ত ডকে থাকেন এবং জবানবন্দীতে স্বাক্ষর না করেন ততক্ষন পর্যন্ত তিনি তার উত্তর সংশোধন করতে পারেন। সে অধিকার  তার আছে। ট্রাইব্যুনালও এটি পারে। তিনি বলেন, আগের উত্তর থেকে শান্তি শব্দটি মুছে দেয়া হবে। কিন্তু ততক্ষনেও কম্পোজার শান্তি শব্দটি না মোছায় তিনি তাকে কিছুটা ধমকের সুরে  মুছে ফেলতে নির্দেশ দেন।
এসময় অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম দাড়িয়ে বলেন, আগের অনেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন  খুঁজে পাচ্ছিনা, স্মরন নেই । সেসব  প্রশ্নের উত্তর  আমরা যদি ডকুমেন্ট   খুঁজে দেখতে  বলি  তাহলে কি সেসব প্রশ্নের উত্তর সংশোধন করে  আছে  মর্মে লেখা  হবে? উনি সেযব প্রশ্নের উত্তর গোপন করছেন সেটাতো আপনারা নিচ্ছেনননা। খুঁজে উত্তর দিতে বলছেননা।  উত্তর চ্যালেঞ্জ করার এভাবে যদি আগের   প্রশ্নের উত্তর সংশোধন করা হয় তাহলে আমারা ক্ষতিগ্রস্ত হব। আসামী ন্যায় বিচার থেকে  বঞ্চিত হবে।
জবাবে বিচারপতি নিজামুল  হক বলেন, আমরা যা করছি তা আইন অনুযায়ী করছি এবং আমাদের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। আমরা সরি আপনার  প্রস্তাব গ্রহণ করা হলনা।   সামনে আগান।
প্রশ্ন : আপনি আপনার সংগৃহীত দলিলের কতটি নিয়ে এসেছেন আর কতটি রেখে এসেছেন?
উত্তর : আমি সংগৃহীত সব দলিলই দাখিল করেছি এবং এখানে সবই নিয়ে এসেছি।
প্রশ্ন : যেসব প্রশ্নের উত্তরে খুঁজে পাচ্ছিনা বলেছেন সে দলিলপত্রগুলো কোথায় আছে?
উত্তর : আমার ডকুমেন্টের মধ্যেই আছে। এর বাইরে কিছু নেই।
প্রশ্ন : অধ্যাপক গোলাম আযম রেডিওতে যে ভাষন দিয়েছিলেন তার অডিও  কপি খুঁজে পেয়েছিলেন?
উত্তর : না।
প্রশ্ন সামরিক সরকার যে প্রেসরিলিজগুলো দিয়েছিল তার অধিকাংশই ছিল জনগনের মুক্তির  আকাঙ্খাকে দাবিয়ে রাখার জন্য প্রতারনামূলক কৌশল।
উত্তর : এটা বিশ্লেষনের ব্যাপার।
প্রশ্ন :  পূর্ব পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ যেসব প্রেসরিলিজ দিয়েছিল তার কতটি আপনি তদন্ত করেছেন?
উত্তর : সঠিক সংখ্যা বলতে পারবনা।
প্রশ্ন : কতটি  প্রেসরিলিজ  জব্দ করেছেন?
উত্তর : একটিও, না কারণ পাইনি।
প্রশ্ন :  ৬ এপ্রিল গোলাম আযম টিক্কা খানের সাথে দেখা করেননি।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : মিত্র বাহিনী ৪ ডিসেম্বর ঢাকা আক্রমন করে এটি ঠিকতো?
উত্তর : সঠিক বলতে পারবনা।
 জেরার এ পর্যায়ে  অধ্যাপক মুনতাসির মামুনের জবানবন্দীর কণ্ট্রাডিকশ নিয়ে  তীব্র বিতর্ক দেখা দেয় উভয় পক্ষের আইনজীবী এবং ট্রাইব্যুনালের মধ্যে। মুনসাসির মামুনের জবানবন্দী গ্রহণ করেন তদন্ত কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগম। মিজানুল ইসলাম বলেন, মুনতাসির মামুন কোর্টে এসে কিছু কথা বলেছেন যা তদন্ত কর্মকর্তার  কাছে প্রদত্ত  জবানবন্দীতে নেই আবার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে কিছু কথা আছে যা তিনি কোর্টের জবানবন্দীতে বলেননি। এ বৈষাদৃশ্য তুলে ধরে মিজানুল ইসলাম  প্রশ্ন করলে তদন্ত কর্মকর্তা জবাব দেন  এ বিষয়ে আমার রেকর্ডে নেই।
এ উত্তর লিপিবদ্ধ নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা  দেয়। মিজানুল ইসলাম এবং তাজুল ইসলাম বলেন, আমার রেকর্ডে নেই এর মানে হল তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সাক্ষী   ওইসব কথা বলেননি সে কারনে তার রেকর্ডে নেই। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, জবানবন্দী  নিয়েছেন মনোয়ারা বেগম। কাজেই এ বিষয়টি তার রেকর্ডে নেই এটা বলাই তো স্বাভাবিক।
শেষে মিজানুল ইসলাম নিবেদন করেন মনোয়ারা বেগমকে হাজির করার জন্য। তবে ট্রাইব্যুনাল সে আবেদন  গ্রহণ না করে উত্তরটি এমনভাবে লেখেন যাতে দুই পক্ষই সন্তুষ্ট হয়।
প্রশ্ন : যেহেতু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ  প্রশাসনের ব্যক্তি কর্তৃক অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে সেহেতু আপনি  একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য আপনার ইচ্ছামত সাক্ষ্য সংগ্রহ করে অসত্য প্রতিবেদন দিয়েছেন।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালে গোলাম আযমের ভূমিকা ছিল শুধুমাত্র রাজনৈতিক। তিনি মনে করতেন পূর্ব পাকিস্তান জনগনের ওপর যে শোষন নিপীড়ন হয়েছে তার সমাধান অখন্ড পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব ছিল।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : তিনি এবং তার দলের দর্শন ছিল ভারত তার অধিপত্য  নীতি বাস্তবায়নের জন্য জগনের আন্দোলনকে ভিন্নভাবে চিত্রায়নের চেষ্ট করছে।
উত্তর সত্য নয়।

রাষ্ট্রপক্ষে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সিমন উপস্থিত ছিলেন।
ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক, সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন, সদস্য বিচারপতি আনোয়ারুল হক বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর, সাবেক এমপি মাওলানা আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে তদন্তের অগ্রগতি   প্রতিবেদন দাখিলের জন্য রাষ্ট্রপক্ষকে আরো এক সপ্তাহ সময় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল মাওলানা আব্দুস সোবহানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের আরো ৩ সাক্ষীকে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে হাজিরের জন্য আবেদন


রাষ্ট্রপক্ষের আরো  তিনজন  সাক্ষীকে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে হাজিরের জন্য সমন জারির আবেদন করা হয়েছে আসামী পক্ষ থেকে। এরা হলেন  সুমতী রানী মন্ডল, সমর মিস্ত্রী এবং আশিষ কুমার মন্ডল।  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আজ  এ আবেদন পেশ করা হয়।

তদন্ত কর্র্মকর্তার কাছে প্রদত্ত যে ১৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দী তাদের অনুপস্থিতিতে  আদালত মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহন করেছেন উক্ত তিনজনই সেই ১৫ জনের অন্তর্ভুক্ত।

আবেদন বিষয়ে আজ  শুনানী অনুষ্ঠিত হবার কথা রয়েছে।
এর রাগে রাষ্ট্রপক্ষের  দুজন সাক্ষীকে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে হাজিরের জন্য সমন জারির আবেদন করা হয়েছিল। তারা হলেন গণেশ চন্দ্র সাহা এবং সুখরঞ্জন বালী। এরাও ১৫ জনের  জনের অন্তর্ভুক্ত।

ট্রাইব্যুনাল এ আবেদন বিষয়ে আদেশে বলেছিলেন আসামী পক্ষ যাকে খুসী সাক্ষী হিসেবে হাজির করতে পারে কিন্তু কোর্ট থেকে  এ বিষয়ে কোন সমন জারি করা হবেনা।  এদের মধ্যে শহীদ ভাগীরথী সাহার ছেলে গণেশ চন্দ্র সাহা গত ২৩ অক্টোবার ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে মাওলানা সাঈদীর  পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন।

এদিকে আগামীকাল সোমবার   মাওলানা সাঈদীর মামলায় আর্গুমেন্ট বা যুক্তিতর্ক শুরু হবার জন্য নির্ধারিত রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের  জন্য প্রথমে আর্গুমেন্ট পেশ করার কথা রয়েছে।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে  গতকাল এ বিষয়ে  একটি আবেদন করা হয়েছে । সেটি হল আসামী পক্ষকে প্রথমে আর্গুমেন্ট পেশ করার সুযোগ দেয়া হোক। 

গত ২০ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে একটি আবেদন পেশ করা হয়। আবেদনে বলা হয়  মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে  ৪৬ জন  সাক্ষীকে  হাজির করা আদৌ সম্ভব নয়। তাই  ৪৬ জন সাক্ষী  তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে  জবানবন্দী  দিয়েছেন তা  তাদের অনুপস্থিতিতে আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহন করা হোক।

আবেদনে ৪৬ জন সাক্ষীর  মধ্যে ১৯ জনকে ঘটনার সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ১৯ জন সাক্ষীর মধ্য থেকে ১৫ জনের জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে ২৯ মার্চ আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের দরখাস্তে ১৯ জন ঘটনার সাক্ষী হাজির করতে না পারা বিষয়ে বিভিন্ন কারণ  উল্লেখ করা হয়েছিল।  এদের মধ্যে পাঁচজনকে হাজির করতে না পারা বিষয়ে বলা হয়েছে তারা নিখোঁজ।  ১৪জনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। মাওলানা সাঈদীর পক্ষের অস্ত্রধারীদের হুমকির কারনে  তারা আত্মগোপন করেছে।  নিখেঁাঁজ  পাঁচ জনের তিনজন গোপনে ভারতে পালিয়ে গেছে। এছাড়া একজনের স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে এবং বয়স ও অসুস্থতাজনিত কারনে ভ্রমনে মৃত্যুর ঝুকি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আশিষ কুমার মন্ডল, সুমীত রানী মন্ডল এবং সমর মিস্ত্রী  সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের দরখাস্তে বলা হয়েছিল  তারা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে নিখোঁজ। সম্ভবত তারা গোপনে ভারতে পালিয়ে গেছে। সেই সাক্ষীদেরই মাওলানা সাঈদীর পক্ষে হাজিরের জন্য আবেদন করা হল আসামী পক্ষ থেকে।

বৃহস্পতিবার, ১ নভেম্বর, ২০১২

শান্তি কমিটি আলবদর আল শামসকে সহযোগী বাহিনী গণ্য করে জারিকৃত কোন দলিল পাননি তদন্ত কর্মকর্তা//জেরা শেষ করা নিয়ে বিতর্ক

মেহেদী হাসান
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের মামলায় জেরার সময় তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী, শান্তি কমিটি, আলবদর, আল শামস প্রভৃতি বাহনীকে  সহযোগী বাহিনী গণ্য করে জারি করা কোন  প্রমান্য  দলিল তিনি তার তদন্তকালে পাননি ।

আজ জেরার সময় তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করা হয় “জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পিডিপি, নেজামে ইসলাম, শান্তি কমিটি, আলবদর, আল শামস, বাহিনীকে অক্সিলিয়ারি ফোর্স  (সহযোগী বাহিনী)  হিসেবে  গণ্য করে পাকিস্তান আর্মির ইস্টার্ন কমান্ড বা সেন্ট্রাল কমান্ড কোন প্রজ্ঞাপন  জারি করেছে এ মর্মে কোন ডকুমেন্ট আপনি তদন্তকালে সংগ্রহ করতে পারেননি।”

জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “সরাসরি কোন প্রামান্য দলিল আমি আমার তদন্তকালে পাইনি। তবে  উক্ত  সংগঠনগুলো অক্সিলিয়ারি ফোর্স হিসেবে কাজ করেছে সে প্রমান আমি তদন্তকালে পেয়েছি।”

তদন্ত কমকর্তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন এবং তার উত্তর নিয়ে গতকাল ট্রাইব্যুনালে দীর্ঘ বিতর্ক চলে। এছাড়া  জেরা শেষ করার জন্য  ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সময় বেঁধে দেয়া নিয়েও দর্ঘি বিতর্ক চলে। গতকাল ৪টা ৫০ মিনিটে শেষ হয় বিচার কার্যক্রম।
তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করেন  অধ্যাপক গোলা আযমের   পক্ষে আইনজীবী মিজানুল ইসলাম। জেরার সময় মিজানুল ইসলাম ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান আর্মির আত্মসর্পনের সময় স্বাক্ষরিত দলিল নিয়ে প্রশ্ন করলে তা নিয়েও দীর্ঘ সময় আলোচনা, বিতর্ক চলে। মিজানুল ইসলাম বলেন,  আত্মসর্পনের সময় জেনারেল নিয়াজি কর্তৃক স্বাক্ষরিত ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব সারেন্ডার’ ডকুমেন্ট ছাড়াও  আরো কিছূ  দলিল সম্পাদন হয় এবং তাতে তিনি স্বাক্ষর করেন। সেগুলো তদন্ত কর্মকর্তা জেনেও গোপন করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তা  তা অস্বীকার করেন। মিজানুল ইসলাম সে দলিল থেকে  ট্রাইব্যুনালে যে তালিকা উল্লেখ করেন সেখানে  পাকিস্তান বাহিনীর নিয়মিত, প্যারা, এবং বিভিন্ন সহযোগী বাহিনীর ২৬ হাজার ২৫০ জন সদস্যের পরিসংখ্যান দেয়া আছে। সে তালিকায় মুজাহিদ বাহিনী, রাজাকার বাহিনীর নাম আছে। কিন্তু আল বদর, আল শামস, শান্তি কমিটির নাম নেই সহযোগী বাহিনী হিসেবে।

রাতে  মিজানুল ইসলামের কাছে তার দাবিকৃত   ডকুমেন্টের নাম জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, দলিলটির নাম হল ‘ট্রুপস ইন ঢাকা এট দি টাইম অব সারেন্ডার : রেগুলোর এন্ড প্যারা।

জেরায় মিজানুল ইসলামকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট  তাজুল ইসলাম, কফিল উদ্দিন চৌধুরী, ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক, অ্যাডভোকেট শিশির মো: মনির প্রমুখ।
রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সিমন।
বিচার কার্যক্রম করেন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক, সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এবং সদস্য বিচারপতি আনোয়ারুল হক।

জেরা :

প্রশ্ন : আর্মি এ্যাক্ট ১৯৫২, এয়ারফোর্স এ্যাক্ট ১৯৫৩ ও নেভি অর্ডিন্যান্স ১৯৬১তে অক্সিলিয়ারি ফোর্স হিসেবে কোন  বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল কিনা বা অন্য কোন বাহিনীকে মেইনন্টেইন করা হতো কিনা?
উত্তর : আমার জানা নেই।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর  জেরারেল নিয়াজী যখন আত্মসমর্পন করেন তার সঙ্গে অক্সিলিয়ারি ফোর্সও আত্মসমর্পন করেছিল
উত্তর : অক্সিলিয়ারি ফোর্স হিসেবে প্যারামিলিটারী ও সিভিল আর্মড ফোর্সেস ছিল।
প্রশ্ন : পাকিস্তান সেনাাহিনীর ইষ্টার্ণ কমান্ডার জেরারেল নিয়াজী যখন আত্মসমর্পন করেন তখন তার কোন বাহিনীর  কত  সদস্য ছিল এটার কোন তালিকা ছিল কিনা জানা আছে?
উত্তর : রেকর্ডে দেখা যাচ্ছেনা। আমার জানা নেই।
প্রশ্ন : ইনস্ট্রুমেন্ট অব সারেন্ডার-এ স্বার  করা ছাড়া অন্য কোন দলিলে জেনারেল নিযাজী  স্বাক্ষর  করেছেন?
উত্তর : জানা নেই।
প্রশ্ন জেনারেল নিয়াজী ও জেনারেল অরোরা কোন দলিলে সার  করেছেন এটা জানতে সংশিষ্ট কর্তৃপরে  সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কিনা?
উত্তর : যোগাযোগ করিনি। 
প্রশ্ন : ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজি যখন আত্মসমর্পন করেন তখন যেসব দলিল সম্পাদন করেছেন তার মধ্যে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো ছিল যা আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করেছেন।  সেগুলো হল
হোডকোয়ার্টার্স ইস্টার্ন কমান্ড, এ পর্যন্ত বলার পর রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপত্তি উত্থাপন   করে বলা হয় এটি আসামী পক্ষ প্রদর্শন করেননি ট্রাইব্যুনালে। তাছাড়া উনি ‘যেসব দলিল’ বলে সবকিছু এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে চাচ্ছেন বলে আপত্তি করা হয় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে।

তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, এটি আপনি কি আমাদের  কাছে জমা দিয়েছেন?  মিজানুল ইসলাম বলেন দিয়েছি। তখন ট্রাইব্যূনালের নির্দেশে  তিনটি ভলিউম আলমারি থেকে বের করা হয়। সেগুলো দেখে ট্রাইব্যুনাল বলেন, আপনি যে  দলিলের কথা বলছেন তাতো আমাদের সামনে নেই। কাজেই  ডকুমেন্ট না থাকলে সে বিষয়ে সাজেশন দেবেন কিভাবে?
জবাবে মিজানুল ইসলাম বলেন, আত্মসমর্পনের সময় এক পৃষ্ঠার একটি ডকুমেন্ট স্বাক্ষরিত হয় তাতে পাকিস্তান আর্মির সৈন্য সংখ্যা, কি কি সম্পদন ছিল তার  উল্লেখ ছিল। আমি সাজেশন দিচ্ছি ইনস্ট্রুমেন্ট অব ডকুমেন্ট এর সাথে আরো কিছু ডকুমেন্ট ছিল সেগুলো  তদন্ত কর্মকর্তা গোপন করছেন। তিনি যদি তা অস্বীকার করেন তাহলে তা প্রমানের দায়িত্ব আমার। কিন্তু আমি কেন সাজেশন দিতে পারবনা? আইনে এ বিষয়ে বাঁধা কোথায়।
তখন ট্র্ইাব্যুনাল বলেন, সাজেশনটা অন্যভাবে দেন। সেটা এভাবে  হতে পারে- ওই ডকুমেন্ট এর সাথে  আরো কিছু ডকুমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়েছিল আপনি তা জানেন কি-না।
কিন্তু এরপরও রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপত্তি উত্থাপন করা হলে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, সারেন্ডার ডকুমেন্ট এর সাথে যদি অন্য ডকুমেন্ট থাকে এবং তদন্ত কর্মকর্তা তা গোপান করে থাকেন তাহলে এর বেনিফিট আসামী পক্ষকে নিতে দেবেননা কেন?
এরপর ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দিয়ে বলেন, আমরা এ সাজেশনটি দেয়ার অনুমতি দিলাম। এরপর প্রশ্নটি নিম্নলিখিতভাবে করা হয়।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পনের সময় ইনস্ট্র্রুমেন্ট অব সারেন্ডার ডকুমেন্ট ছাড়াও অন্য কিছু দলিল সম্পাদন করা হয়। তার মধ্যে নিম্নলিখিতি বিষয়গুলো ছিল। ১. হেডকোয়ার্টাস (ক) হেডকোয়ার্টার্স ইস্টার্ন কমান্ড, (খ) রিয়ার হেডকোয়ার্টার্স ১৪ ডিভিশন, (গ) হেডকোয়ার্টাস ৩৬ ডিভিশিন, হেডকোয়ার্টার্স ইস্ট পাকিস্তান লজিস্টিক, (ঘ) স্টেশন হেডকোয়ার্টার্স, (ঙ)  হেডকোয়ার্টার্স অফিসার কমান্ডিং ইস্ট পাকিস্তান, (চ) ওয়স্ট পাকিস্তান পুলিশ, (ছ)  হেডকোয়ার্টাস  ডিজি রাজাকার।

২. ট্রুপস রেগুলার এন্ড প্যারা। এর অধীনে ট্যাংকস, আর্টিলারি, ইনফ্যান্ট্রি, ইঞ্জিনিয়ারিং, সিগনাল, সার্ভিস, মুজাহিদ,  রাজাকার, ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পুলিশ মিলিয়ে মোট ২৬ হাজার ২৫০ জন সৈন্য সংখ্যা উল্লেখ আছে।
অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম এ বিষয়গুলো উল্লেখ করার পর ট্রাইব্যুনাল বলেন, আলাদা দুটি প্রশ্ন করেন।
প্রশ্ন : উপরোক্ত বিষয়গুলো ডকুমেন্টে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনি জেনেও তা পোগন করেছেন।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পিডিপ, নেজামে ইসলাম, শান্তি কমিটি, আলবদর, আল শামস, বাহিনীকে অক্সিলিয়ারি ফোর্স  (সহযোগী বাহিনী)  হিসেবে  গণ্য করে পাকিস্তান আর্মির ইস্টার্ন কমান্ড বা সেন্ট্রাল কমান্ড কোন প্রজ্ঞাপন  জারি করেছে এ মর্মে কোন ডকুমেন্ট আপনি সংগ্রহ করতে পারেননি।
উত্তর : সরাসরি কোন প্রামান্য দলিল আমি তদন্তকালে পাইনি। তবে শান্তি কমিটি, জামায়াতে ইসলাী সারা দেশে রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনী গঠন করে পাকিস্তান আর্মিকে সহায়তা করেছে এবং নিজেরাও অংশগ্রহণ করেছে এর প্রমান আমি তদন্তকালে পেয়েছি।
এ উত্তরের পর দীর্ঘ বিতর্ক চলে আসামী পক্ষ, রাষ্ট্রপক্ষ এবং ট্রাইব্যুনালের মধ্যে।

মিজানুল ইসলাম বলেন, ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারবেন।  সে অধিকার তার আছে। কিন্তু  ফ্যাক্টস এবং দলিল বিষয়ক এ প্রশ্নে এ ব্যাখ্যা প্রাসঙ্গিক নয়। কারণ এটা দলিল। আমার প্রশ্ন হল কোন প্রজ্ঞাপন জারি  বিষয়ে। সেখানে কার্যকলার কেন আসবে। 
ট্রাইব্যুনাল তদন্ত কর্মকর্তা প্রদত্ত ব্যাখ্যাকে প্রাসঙ্গিক আখ্যায়িত করে বলেন, অনেক কাজ হয় যা কাগজে কলমে লেখা  থাকেনা। কিন্তু হয়েছে এটাই সত্য।
মিজানুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা বোঝাতে চেয়েছেন শান্তি কমিটি, জামায়াতে ইসলামী সহযোগী বাহিনী হিসেবে  কাগজে কলমে না থাকলেও এদেরকে পাকিস্তান আর্মি ব্যবহার করেছে তাইতো?
ট্রাইব্যুনাল বলেন  ‘হ্যা’।
তখন মিজানুল ইসলাম বলেন, এটাতো তিনি তার জবানবন্দীতে বলেছেন এবং প্রয়োজনে আবারো  রাষ্ট্রপক্ষ তাকে রিইক্সামিন করে বলাতে পারেন। আইন অনুযায়ী সহযোগী বাহিনী গঠনের অধিকার  মুল বাহিনীর। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা বললেন জামায়াতে ইসলামী এসব সহযোগী বাহিনী  গঠন করেছে। আমার আপত্তি সেখানে।
 ট্রাইব্যুনাল বলেন আপনি যা   চেয়েছেন তাতো ওনার উত্তরের প্রথম অংশে আছে। পরের ব্যাখ্যা থাকলে অসুবিধা নেই।
মিজানুল ইসলাম বলেন, হয় এ প্রশ্নটি বাদ দেয়া হোক অথবা প্রশ্ন উত্তর আকারে রেকর্ড করা হোক।
এরপর ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দিয়ে বলেন, ব্যাখ্যাটি এভাবে নেয়া যায় কি-না দেখেন । তাহল “উক্ত সংগঠনগুলো সহযোগী বাহিনী হিসেবে কার করেছে সে প্রমান আমি তদন্তকালে পেয়েছি”
মিজানুল ইসলাম বলেন ঠিক আছে।
প্রশ্ন : জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পনের সময় রাজাকার বাহিনীর কোন সদস্য উপস্থিত ছিল তদন্তকালে আপনি এমন কোন তথ্য পেয়েছেন ?
উত্তর : আমার রেকর্ডে তা খুঁজে পাচ্ছিনা।
প্রশ্ন : আপনি  কি কোন কেস ডায়েরি ছাড়াই সাক্ষ্য দিতে এসেছেন?
উত্তর ধ চিফ প্রসিকিউটরের কাছে যেসব ডকুমেন্ট জমা দিয়েছি তার সবই আমি নিয়ে এসেছি।
প্রশ্ন : যেসব ডকুমেন্ট জমা দিয়েছেন তার মধ্যে কেস ডায়েরি ছিল?
উত্তর :  থাকার কথা না।
প্রশ্ন : আমি বলছি সত্য উদঘটানের ভয়ে আপনি কেস ডায়েরিসহ আরো অনেক ডকুমেন্ট আনেননি।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : অক্সিলিয়ারি ফোর্স এর গঠন সম্পর্কে কোন ধারণা আছে?
উত্তর : পরিস্কার কোন ধারণা নেই। তবে আমি মনে করি যারা মুল বাহিনীকে সহযোগিতা করে তারাই অক্সিলিয়ারি ফোর্স।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালে পুলিশ বাহিনী আর্মিকে সহযোগিতা করত কি-না।
উত্তর : কিছু কিছু  সদস্য সহযোগিতা করত বলে শুনেছি।
ট্রাইব্যুনাল বলেন,  এখানে তো তাহলে প্রশ্ন এসে যায় বাংলাদেশ সিভিল প্রশাসনও সহযোগিতা করত কি-না। মিজানুল ইসলাম বলেন,  তারা পাকিস্তান আর্মির সহযোগী হিসেবে কাজ করলেও তারা  অক্সিলিয়ারি ফোর্স নয় এটা বোঝাতে চেয়েছি।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ প্রধান কে ছিলেন?
উত্তর : স্মরন নেই।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকার গঠনের পর কতজন এসপি, ডিআইজি  আনুগত্য করে?
উত্তর : অনেক। তবে  সঠিক সংখ্যা বলতে পারবনা।
প্রশ্ন : ডিআইজি বা তার উর্ধ্বতন কতজন আনুগত্য করে?
উত্তর : এ  মুহুর্তে বলতে পারবনা।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালে কেন্দ্রীয় পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামের মজলিশে শুরায় কতজন পূর্ব পাকিস্তানের সদস্য ছিল?
উত্তর : এ তথ্য আমার কাছে নেই।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান  জামায়াতে ইসলামীর মজলিশে শুরা ছিল তা জানেন?
উত্তর : ধারণা নেই।
প্রশ্ন : পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলাম কি প্রকৃয়া সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিত সে বিষয়ে ধারণা আছে?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের অস্ত্র সরবাহের জন্য পাকিস্তান আর্মির কাছে আবেদন করেছিল এ মর্মে কোন তথ্য আপনার কাছে আছে?
উত্তর : আছে।
প্রশ্ন : কি আছে বলেন।
উত্তর : লাহোরে অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছেন পূর্ব পাকিস্তানে এখনো  দুষ্কৃতকারী আছে। পূর্ব পাকিস্তানের শান্তিপ্রিয়  নিরীহ জনগনের জন্য অস্ত্রের  প্রয়োজন। এই নিরহী জনগন মানে তার দলের লোক।
মিজানুল ইসলাম বলেন, আমি নির্দিষ্ট করে বলেছি জামায়াতে ইসলামের সদস্যদের জন্য অস্ত্র চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল কি-না। সেখানে ব্যাখ্যা দিয়ে নিরীহ জনগনকে দলের লোক হিসেবে মেলানোর  কোন সুযোগ নেই। তাহলে পত্রিকার ওই খবরে প্রত্যেকটি শব্দের ব্যাখ্যা আমি দিতে পারব। সে সুযোগ কি আমি পাব?
ট্রাইুব্যনাল বলেন, তার দলের লোকদের ক্ষেত্রে এটা ইমপ্লাইস। কারণ আপনিতো ওই বক্তব্য খন্ডন করতে চাচ্ছেন।
মিজানুল ইসলম বলেন যেহেতু আমার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর আসেনি  আমি এ প্রশ্ন বাদ দিতে চাচ্ছি।
ট্রাইব্যুনাল বলেন শেষবারের মত আপনাকে এ সুযোগ দেয়া হল। এরপর বুঝে প্রশ্ন করতে হবে যাতে বাদ দিতে না হয়।
মিজানুল ইসলাম বলেন, উত্তরও সোজা দিলে আমাকে বাদ দিতে হবেনা।
প্রশ্ন : মসলিম লীগের কোন সদস্য যারা রাজাকার, শান্তি কমিটি, আলবদরে যোগ দেইনি এমন কাউকে মুসলিম লীগার হিসেবে  পাকিস্তান আর্মি অস্ত্র সরবরাহ করেছে এমন তথ্য পেয়েছেন?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : আলবদর কবে কোথায় প্রথম গঠন হয়/
উত্তর : ১৯৭১ সালের ১৬ মে শেরপুরে ৪৭ জন ছাত্রসংঘের কর্মীকে সামরিক প্রশিক্ষন দিয়ে এ বাহিনী গঠন করা হয়।
প্রশ্ন : এ তথ্য আপনি কোথায় পেলেন?
উত্তর : তদন্তে পেয়েছি।
প্রশ্ন  : তদন্তে কিভাবে পেলেন, কেউ কি আপনাকে দিয়েছে?
উত্তর :  আমি তদন্তে পেয়েছি।
প্রশ্ন : এ বিষয়ে কোন প্রামান্য ডকুমেন্ট জব্দ  করেছেন?
উত্তর :  ডকুমেন্ট দেখেছি তবে জব্দগ করিনি।
প্রশ্ন : ডকুমেন্টটির নাম বলতে পারবনে, মানে কোন বই বা পেপার  কার্টি কি-না?
উত্তর : আলবদর বইতে পেয়েছি।
প্রশ্ন : লেখক কে?
উত্তর : সেলিম মনছুর খালেদ।
প্রশ্ন : তিনি কি বাঙ্গালী?
উত্তর : সম্ভবত নয়। কারণ বইটি লাহোর থেকে প্রকাশিত।
প্রশ্ন : এই লেখক ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ছিলেন?
উত্তর : বইয়ে এ বিষয়ে তথ্য নেই।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালে তার বয়স কতদ ছিল?
উত্তর : বইয়ে এ বিষয়ে তথ্য নেই।
প্রশ্ন : যে ৪৭ জন ছাত্রসংঘের কর্মী নিয়ে আল বদর বাহিনী গঠনের কথা বলা হয়েছে তদন্তকালে তাদের নাম পরিচয় সনাক্ত করতে পেরেছেন?
উত্তর  : সবার পারিনি। প্রথম কমান্ডারের নাম কামরান, শেরপুর । এছাড়া অন্যকারো নাম পরিচয় পাইনি।
প্রশ্ন : কামরানের অস্তিত্ব আছে?
উত্তর : শুনেছি আছে। তবে বিস্তারিত তদন্ত  করিনি।
প্রশ্ন : তার পেশা কি ছিল?
উত্তর : বিস্তারিত তদন্ত করিনি।
প্রশ্ন : তার বাড়ি শেরপুরের কোন এলাকায়?
উত্তর : বলেছিতো বিস্তারিত তদন্ত  করিনি।
প্রশ্ন : আলবদর তৈরির পর কেন্দ্রীয় কোন কাঠামো তৈরি হয়েছিল কি-না?
উত্তর : কেন্দ্রীয় কাঠামো জিনিসটা কি বুঝলামনা।
প্রশ্ন  : এই যেমন ধরেন পুলিশের আইজি, তারপর এডিশনাল আইজি, ডিআইজ, এসপি এভাবে।
উত্তর : প্রথম ইউনিট ৩১৩ ক্যাডেট। দ্বিতীয় ইউনিট ৩ কোম্পানী। প্রত্যেক কোম্পানীতে ১০৪ জন মুজাহিদ। ১ কোম্পানীতে ৩ প্লাটুন। প্রত্যেক প্লাটুনে ৩৩ সাজী। ১  প্লাটুনে ৩ সেকশন ট্রুপস। প্রত্যেক ট্রুপে ১১ জন আলবদর।
প্রশ্ন : আমার প্রশ্ন ছিল কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কাঠামো।
উত্তর : আমার তদন্তে এ জাতীয় কিছূ পাইনি।
প্রশ্ন : এইযে কাঠামোর কথা বললেন এটা জেলার না মহকুমার?
উত্তর : বলতে পারবনা।
প্রশ্ন : এই কাঠামো বিন্যাসের তথ্য কোথায় পেলেন?
উত্তর : আলবদর বইতে।
প্রশ্ন : এই কাঠামো অনুযায়ী কোন ইউনিটের সদস্যদের নাম উল্লেখ ছিল?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : ৩১৩ ক্যাডেটের যে প্রথম ইউনিট তার প্রধানের পদবী কি ?
উত্তর : বইয়ে উল্লেখ না থাকায় আমি জানিনা।
প্রশ্ন : ওই ইউনিটসমূহের প্রধানের পদবীর ক্ষেত্রেও একই উত্তর প্রযোজ্য?
উত্তর : হ্যা।
প্রশ্ন : ঢাকা জেলা আলবদর কমান্ডারের নাম কি ছিল?
উত্তর : : ঢাকা জেলা আলবদর কমান্ডার হিসেবে আমি কিছু পাইনি। তবে তিনটি গ্রুপের নাম পেয়েছি। একটি শহীদ আব্দুল মালেক কোম্পানী। এর কমান্ডার আর জাহাঙ্গীর। শহীদ আজিজ ভাট্টি কোম্পানী। এর কমান্ডার আব্দুল হক এবং গাজী সালাহউদ্দিন কোম্পানী। এর কমান্ডার আশরাফুজ্জামান।
প্রশ্ন : এই তিনটি গ্রুপ কোন কোম্পানীর অধীনে ছিল?
উত্তর : বলতে পারবনা।
প্রশ্ন : আল শামস  কবে গঠন হয়?
উত্তর : সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারবনা।
প্রশ্ন : এর প্রধান কে ছিলেন?
উত্তর : এ মুহূর্তে  বলতে পারবনা।
প্রশ্ন : এর কাঠামো কেমন ছিল?
উত্তর : বলতে পারবনা।
প্রশ্ন :  এর সদস্যদের  বেতনভাতা কত ছিল?
উত্তর : বলতে পারবনা।
প্রশ্ন : তাদের পোশাক কেমন ছিল?
উত্তর : বলতে পারবনা।
প্রশ্ন : বেতনবাতা কে দিত?>
উত্তর : বলতে পারবনা।
প্রশ্ন : প্রশ্ন : মুজাহিদ বাহিনীর ক্ষেত্রেও একই উত্তর  প্রযোজ্য?
উত্তর : হ্যা।

জেরা শেষ করা নিয়ে বিতর্ক : গতকাল  দুপুরের পর ট্রাইব্যুনাল বলেন, আপনাদের রোববার   আরেক সেশন পর্যন্ত সময় দেয়া হল জেরা শেষ করার জন্য। এর  মধ্যে জেরা শেষ করতে হবে। গতকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত জেরার পর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, অধ্যাপক গোলাম আযমের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মোট ৫২৩টি প্রদর্শণী মার্ক করা হয়েছে। এগুলো সবই হল  পেপারকাটিং,  প্রেসরিলিজ, নিউজধমী। এর সংখ্যা ৫২৩টি। এরপরও তার পুরো মামলা নির্ভর করা হয়েছে।  এর মধ্যে মাত্র ৭টি প্রদর্শনী বিষয়ে এ পর্যন্ত  আমরা জেরা করতে পেরেছি। ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে  একদম প্রাথমিক দাবী হল সব মৌলিক  ডকুমেন্টের ওপর জেরা করা। আর মাত্র একটি সেশনে জেরা  শেষ করা কোন অবস্থায়ই সম্ভব নয়। এটি আমি আমি আমার আসামীর প্রতি আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবনা। তিনি ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন। আসামীর প্রতি সুবিচার করা সম্ভব  হবেনা। সবকিছুর উদ্দেশ্য হল ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা। আমার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের  সারা দেশের সব অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। সব কিছুর মাস্টারমাইন্ড বলা হয়েছে।   আমরা যতক্ষন পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়ে জেরা করি ততক্ষন পর্যন্ত জেরা করতে দেয়া উচিত।
বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, বিষয়টি প্রাসঙ্গিক অপ্রাসঙ্গিক  নয়। বিষয়টি হল  আমরা টাইম ফ্রেমিং পদ্ধতি অনুসরন করছি। সব ক্ষেত্রেই এটি মেনে চলতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তা মোট ৫ সেশন জবানবন্দী দিয়েছেন।  সে অনুযায়ী আপনারা ১১ সেশন পেলেও ১২ সেশন জেরা করতেদ দেয়া হয়েছে। আমরা মনে করি পর্যাপ্ত জেরা হয়েছে। সাতটি প্রদর্শনী জেরা করতে যাদেত আপনাদের ১২ সেশন লাগে তাহলে ৫২৩টি প্রদর্শনী জেরা করতে কত দিন লাগবে এ প্রশ্ন আপনার কাছে আমরা। জবাব দেন।

বিচারপতি আনোয়ারুল হক বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা যেসব ডকুমেন্ট দাখিল করেছেন সেসব রিপোর্ট তিনি করেননি । তিনি তার কর্তৃপক্ষও নন। কাজেই ওসব রিপোর্ট বিষয়ে আপনারা আরগুমেন্টে বলতে পারবেন। বিচার থেকে খালাস দেয়াও ন্যায়  বিচার নয়, দোষী সাব্যস্ত করাও ন্যায় বিচার নয়।  জাস্টিস ইজ জাস্টিস। দ্রুত বিচার পাওয়াও আসামীর অধিকার। আসামীকে কাস্টডিতে রেখে বিচার  চলছে। কাজেই  দ্রুত বিচার করে তাকে নির্দোষ প্রমান করাও আপনাদের দায়িত্ব।  জাস্টিস ডিলে জাস্টিস ডিনাইড তাও  তো সত্য।

তাজুল ইসলাম বলেন কতদিন লাগবে সেটা বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হল ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা। সেজন্য যদি সময় লাগে সময় দিতে হবে। ৪০ বছর আগের ঘটনার বিচার হচ্ছে। ২ বছর ধরে তারা তদন্ত করেছেন। আর মাত্র ৬টি দিন আমাদের দিলে বিচার বিলম্বিত হয়ে যাবে? যদি তাই হল তাহলে আমাদের বলার কিছু নেই।  তদন্ত কর্মকর্তা ৫  সেশন জবানবন্দী দিয়েছেন সেটা যেমন সত্য তেমনি তিনি ৫সেশনে  কি ডুকমেন্ট হাজির করেছেন তাও বিবেচনা করে দেখার বিষয়।
মিজানুল ইসলাম বলেন তিনি মাত্র এক মিনিটে ৩১ ঘন্টার ভিডিও ডকুমেন্ট হাজির করেছেন। কাজেই আপনাদের হিসেবে এক মিনিটের জবানবন্দীর জন্য অন্তন্ত ৩১ ঘন্টা সময় দরকার জেরায়।
এরপর বিচারপতি নিজামুল হক বলেন রোববার এক সেশনে শেষ করার প্রস্তুতি নিয়ে আসেন। তারপর আমরা দেখব।